আমার সম্পাদক শিকার

শিবরাম চক্রবর্তী

হাম কিংবা টাইফয়েড, সর্পাঘাত কিংবা মোটর-চাপা, জলে ডোবা কিংবা গাছ থেকে পড়ে যাওয়া, এগজামিনে ফেল করা কিংবা কাঁকড়াবিছে কামড়ানো— জন্মাবার পর এর কোনোটা-না-কোনোটা কারু-না-কারু বরাতে কখনো-না-কখনো ঘটেই এক বার। অবশ্য যে মোটর-চাপা পড়ে তার ভাগ্যে সর্পাঘাত খুব বিরল ব্যাপার, সেরকম আশঙ্কা প্রায় নেই বললেই হয়; এবং যার সর্পাঘাত হয় তাকে আর গাছ থেকে পড়তে হয় না। যে ব্যক্তি জলে ডুবে যায় মোটর-চাপা পড়ার সুযোগ তার যৎসামান্যই, এবং উঁচু দেখে গাছ থেকে ভালো করে পড়তে পারলে তার আর জলে ডোবার ভয় থাকে না। তবে কাঁকড়াবিছের কামড়ের পরেও এগজামিনে ফেল করা সম্ভব, এবং অনেক ক্ষেত্রে হামের ধাক্কা সামলাবার পরেও টাইফয়েড হতে দেখা গেছে।

কিন্তু বলেছিই, এসব কারু-না-কারু অদৃষ্টে ঘটে কখনো বা কদাচ। কিন্তু একটা দুর্ঘটনা প্রায় সবারই জীবনে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে অনিবার্যরূপে প্রকট হয়, তার ব্যতিক্রম খুব কমই দেখা যায়। আমি গোঁফ ওঠার কথা বলছি না— তার চেয়েও শক্ত ব্যারাম— গোঁফ ওঠার সঙ্গেসঙ্গেই দেখা দেয়। লেখক হবার প্রেরণা মানুষকে পেয়ে বসে।

আমারও তাই হয়েছিল। প্রথম গল্প লেখার সূত্রপাতেই আমার ধারণা হয়ে গেল আমি দোলগোবিন্দবাবুর মতো লিখতে পেরেছি। দোলগোবিন্দকে আমি রবীন্দ্রনাথের সমকক্ষ মনে করতাম— কেন না, একই কাগজে দু-জনের লেখা এবং দু-জনের নাম একই টাইপে ছাপার অক্ষরে আমি দেখেছিলাম। এমনকী অনেক সময়ে দোলগোবিন্দকে রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বড়ো লেখক আমার বিবেচনা হয়েছে— তাঁর লেখা কেমন জলের মতো বোঝা যায়, অথচ বোঝার মতো মাথায় চাপে না। কেন যে তিনি নোবেল প্রাইজের জন্য চেষ্টা করেন না, সেই গোঁফ ওঠার প্রাক্কালে অনেক বার আমি আন্দোলন করেছি— অবশ্য মনে মনে। এখন বুঝতে পারছি পণ্ডিচেরী, কিংবা পাশাপাশি, রাঁচীতে তাঁর পরামর্শ দেবার কেউ ছিল না বলেই। আরও দুঃখের বিষয়, রবীন্দ্রনাথের লেখা এখনও চোখে পড়ে, কিন্তু কোনো কাগজ-পত্রেই দোলগোবিন্দবাবুর দেখা আর পাই না।

যাই হোক, গল্পটা লিখেই বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ মাসিকপত্রে, দোলগোবিন্দ বা রবীন্দ্রনাথের রচনার ঠিক পরেই সেটা প্রকাশ করার জন্য পাঠিয়ে দিলাম। নিশ্চিন্ত বসে আছি যে নিশ্চয়ই ছাপা হবে এবং ছাপার অক্ষরে লেখাটা দেখে কেবল আমি কেন, রবীন্দ্রনাথ, এমনকী, স্বয়ং দোলগোবিন্দ পর্যন্ত পুলকিত হয়ে উঠবেন— ও হরি! পর পর তিন মাস হতাশ হবার পরে একদিন দেখি বুকপোস্টের ছদ্মবেশে লেখাটা আমার কাছেই ফিরে এসেছে আবার। ভারি মর্মাহত হলাম— বলাই বাহুল্য। শোচনীয়তা আরও বেশি এইজন্যে যে তিন মাসে তিনখানা কাগজ কিনেছিলাম— খতিয়ে দেখলাম সেই দেড়টা টাকাই তাদের নেট লাভ!

তারপর, একে একে আর যে ক-টা নামজাদা মাসিক ছিল সবাইকে যাচাই করা হল — কিন্তু ফল একই। আট আনার পেটমোটাদের ছেড়ে ছ-আনার কাগজদের ধরলাম— অবশেষে চার-অনা দামের নব্যপন্থীদেরও বাজিয়ে দেখা গেল, কিন্তু নাঃ, সব শেয়ালের একই আওয়াজ! গল্পটা ভালোই, তবে ছাপতে তাঁরা অক্ষম! আরে বাপু, এত অক্ষমতা যে কেন তা তো আমি বুঝতে পারি নে, যখন এত লেখাই অনায়াসে ছাপতে পারছ তোমরা! মাসিক থেকে পাক্ষিক, পাক্ষিক থেকে সাপ্তাহিকে নামলাম; অগত্যা, লেখাটার দারুণ অমর্যাদা ঘটছে জেনেও দৈনিক সংবাদপত্রেই প্রকাশের জন্য পাঠালাম। কিন্তু সেখান থেকেও ফেরত এল। দৈনিকে নাকি অত বড়ো 'সংবাদ' ধরবার জায়গা নেই। আশ্চর্য! এত বাজে বিজ্ঞাপন— যা কেউ পড়ে না— তার জায়গা আছে আর আমার বেলাই যত স্থানাভাব? বিজ্ঞাপন বাদ দিয়ে ছাপালেই তো হয়! কিন্তু অদ্ভুত এদের একগুঁয়েমি— সব সংবাদপত্র থেকেই বারংবার সেই একই দুঃসংবাদ পাওয়া গেল।

তখন বিরক্ত হয়ে, শহর ছেড়ে মফস্সলের দিকে লক্ষ দিতে হল— অর্থাৎ লেখাটা দিগবিদিকে পাঠাতে শুরু করলাম। মেদিনীপুর-মন্থন, চুঁচুড়া-চন্দ্রিকা, বাঁকুড়া হরকরা, ফরিদপুর-সমাচার, গৌহাটি-গবাক্ষ, মালদহের গৌড়বান্ধব— কারুকেই বাদ রাখলাম না। কিন্তু শহুরে পেটমোটাদের কাছে যে দুর্ব্যবহার পাওয়া গেছে, পাড়াগেঁয়ে ছিটেফোঁটাদের কাছ থেকে তার কোনো রকমফের দেখা গেল না। আমার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী এক দারুণ ষড়যন্ত্র বলেই আমার সন্দেহ হতে লাগল।

এইভাবে সেই প্রথম ও পুরোবর্তী একমাত্র লেখার ওপরে 'ট্রাই অ্যান্ড ট্রাই এগেন' পলিসির কার্যকারিতা পরীক্ষা করতেই বাংলা মুলুকের তামাম কাগজ এবং সাড়ে তিন বছর ফুরিয়ে গেল— বাকি রইল কেবল একখানি কাগজ— এক কৃষি সম্বন্ধীয় সাপ্তাহিক। চাষাড়ে কাগজ বলেই ওর দিকে এতাবৎ আমি তাকাইনি, তারা কী আমার এই অপরূপ সাহিত্য রচনার মূল্য বুঝবে? ফেরত তো দেবেই, হয়তো সঙ্গেসঙ্গে বলে পাঠাবে 'মশাই, আপনার আষাঢ়ে গল্প আমাদের কাগজে অচল; তার চেয়ে ফুলকপির চাষ সম্বন্ধে যদি আপনার কোনো বক্তব্য থাকে তা লিখে পাঠালে আমরা দেখতে পারি বরং।'

এই ভয়েই এতদিন ওধারে তাকাইনি— কিন্তু এখন আর আমার ভয় কি? (ডুবন্ত লোক কি কুটো ধরতে ভয় পায়?) কিন্তু নাঃ, ওদের কাছে আর ডাকে পাঠাব না, অনেক ডাকখরচা গেছে অ্যাদ্দিন, এবার লেখা সমভিব্যাহারে স্বয়ং আমি যাব।

'দেখুন, আপনি— আপনিই সম্পাদক, না? আমি— আমি একটা— একটা লেখা এনেছিলাম আমি—'

গম্ভীর ভদ্রলোক চশমার ফাঁকে কটাক্ষপাত করলেন। 'কই দেখি!'

'একটা গল্প। একেবারে নতুন ধরনের— আপনি পড়লেই বুঝতে পারবেন।' লেখাটা বাড়িয়ে দিলাম— 'আনকোরা নতুন স্টাইলে একেবারে—'

ভদ্রলোক গল্পে মনোযোগ দিয়েছেন দেখে আমি কথা বাড়ানো স্থগিত রাখলাম। একটু পড়তেই সম্পাদকের কপাল কুঞ্চিত হল, তারপরে ঠোঁট বেঁকে গেল, নাক সিটকাল, দাড়িতে হাত পড়ল— যতই তিনি এগুতে লাগলেন, ততই তাঁর চোখ-মুখের চেহারা বদলাতে লাগল, অবশেষে পড়া শেষ করে যখন তিনি আমার দিকে তাকালেন তখন মনে হল তিনি যেন হতভম্ব হয়ে গেছেন। হতেই হবে। কীরকম লেখা একখান!

'হ্যাঁ, পড়ে দেখলাম— নিতান্ত মন্দ হয়নি। তবে এটা যে একটা গল্প তা জানা গেল আপনি ব্র্যাকেটের মধ্যে কথাটা লিখে দিয়েছেন বলে— নতুবা বোঝার আর কোনো উপায় ছিল না।'

'তা বটে। আপনারা সম্পাদকরা যদি ছাপেন তবেই নতুন লেখক আমরা উৎসাহ পাই।' বলতে বলতে আমি গলে গেলাম, 'এ গল্পটা আপনার ভালো লেগেছে তাহলে?'

'লেগেছে একরকম। তা এটা কী—'

'হ্যাঁ, অনায়াসে। আপনার কাগজের জন্যেই তো এনেছি।'

'আমার কাগজের জন্যে?' ভদ্রলোক বসেই ছিলেন কিন্তু মনে হল আরও যেন বসে গেলেন, 'তা আপনি কি এর আগে আর কখনো লিখেছেন?'

ঈষৎ গর্বের সঙ্গেই আমি জবাব দিলাম, 'নাঃ, এই আমার প্রথম চেষ্টা।'

'প্রথম চেষ্টা? বটে?' ভদ্রলোক ঢোঁক গিললেন, 'আপনার ঘড়িতে এখন কটা বাজে?'

ঘড়িটা পকেট থেকে বার করে অপ্রস্তুত হলাম, মনে পড়ল ক-দিন থেকে এটা বন্ধ যাচ্ছে, অথচ ঘড়ির দোকানে যাওয়ার অবকাশ হয়নি। সত্য কথা বলতে কী, সম্পাদকের কাছে ঘড়ি না হোক অন্তত ঘড়ির চিহ্নমাত্র না নিয়ে যাওয়াটা 'বে-স্টাইলি' হবে ভেবেই আজ এখন পর্যন্ত ওটা সারাতে দিইনি। এখান থেকে বেরিয়েই বরাবর ঘড়ির দোকানে যাব এই মতলব ছিল।

ঘড়িটাকে ঝাঁকুনি দিয়ে বললাম, 'নাঃ, বন্ধ হয়ে গেছে দেখছি। ক-দিন থেকেই মাঝে মাঝে বন্ধ যাচ্ছে।'

'তাই নাকি? দেখি তো একবার?' তিনি হাত বাড়ালেন।

'ঘড়ি মেরামতও জানেন নাকি আপনি?' আমি সসম্ভ্রমে উচ্চারণ করলাম।

'জানি বলেই তো মনে হয়। কই দেখি, চালানো যায় কি না!'

আমি আগ্রহভরে ঘড়িটা ওঁর হাতে দিলাম— যদি নিখরচায় লেখা আর ঘড়ি একসঙ্গে চালিয়ে নেওয়া যায়, মন্দ কী!

ভদ্রলোক পকেট থেকে পেনসিল-কাটা ছুরি বার করলেন; তার একটা চাড় দিতেই পেছনের ডালা সমস্তটা সটান উঠে এল। আমি চমকে উঠতেই তিনি সান্ত্বনা দিলেন, 'ভয় কী? আবার জুড়ে দেব।'

সেই ভোঁতা ছুরি এবং সময়ে সময়ে একটা চোতা কলমের সাহায্যে তিনি একটার পর একটা ঘড়ির সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খুলে ফেলতে লাগলেন। মিনিট এবং সেকেন্ডের কাঁটাও বাদ গেল না। খুঁটিনাটি সব যন্ত্রপাতি টেবিলের উপর স্তূপীকৃত হল— তিনি এক একটাকে চশমার কাছে এনে গভীর অভিনিবেশের সঙ্গে দেখতে লাগলেন। সূক্ষ্ম তারের ঘোরানো ঘোরানো কী একটা জালের মতো— বোধ হয় হেয়ার স্প্রিং-ই হবে— দু-হাতে ধরে সেটাকে লম্বা করার চেষ্টা করলেন। দেখতে দেখতে সেটা দু-খান হয়ে গেল, তিনি মৃদুহাস্য করে আমার দিকে তাকালেন; তার মানে, ভয় কী, জুড়ে দেব আবার।

ভয় ছিল না কিন্তু ভরসাও যেন ক্রমে ক্রমেই কমে আসছিল। যেটা জুয়েলের মধ্যে সবচেয়ে স্থূলকায় সেটাকে এবার তিনি দাঁতের মধ্যে চাপলেন, দাঁত বসে কি না দেখবার জন্যই বোধ হয়। কিন্তু দন্তস্ফুট করতে না পেরে সেটাকে ছেড়ে ঘড়ির মাথার দিকের দম দেবার গোলাকার চাবিটাকে মুখের মধ্যে পুরলেন তারপর। একটু পরেই কটাস করে উঠল; ওটার মেরামত সমাধা হয়েছে বুঝতে পারলাম।

তারপর সমস্ত টুকরোটাকরা এক করে ঘড়ির অন্তঃপুরে রেখে ভেতরের চাপ-ডালাটা চেপে বন্ধ করতে গেলেন; কিন্তু ডালা বসবে কেন? সে উঁচু হয়ে থাকল। ওপরের ডালাটা আগেই ভেঙেছিল, এবার সেটাকে হাতে নিয়ে আমাকে বল্লেন, 'আঠার পাত্রটা এগিয়ে দিন তো— দেখি এটাকে।'

অত্যন্ত নিরুৎসাহে গাম-পাটটা বাড়িয়ে দিলাম। তিনি আঠার সহায়তায় যথেষ্ট সংগ্রাম করলেন কিন্তু তাঁর যৎপরোনাস্তি চেষ্টা সব ব্যর্থ হল। আঠায় কখনো ও জিনিস জোড়ে? তারপর সবগুলো এক মুঠোয় করে আমার দিকে প্রসারিত করলেন— 'এই নিন আপনার ঘড়ি।'

আমি অবাক হয়ে এতক্ষণ দেখছিলাম, বল্লাম— 'এ কী হল মশাই?'

তিনি শান্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন— 'কেন, মেরামত করে দিয়েছি তো?'

বড়দার কাছ থেকে বাগানো দামি ঘড়িটার এই দফারফা দেখে আমার মেজাজ গরম হয়ে গেল— 'এই বুঝি মেরামত করা? আপনি যদি ঘড়ির কিছু জানেন না তবে হাত দিতে গেলেন কেন?'

'কেন, কী ক্ষতি হয়েছে?' একথা বলতে তিনি অনায়াসে হাসতে পারলেন— 'তা ছাড়া, আমারও এই প্রথম চেষ্টা।'

আমি অনেকক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে রইলাম, তারপর বল্লাম— 'ও! আমার প্রথম লেখা বলেই এটা আপনার পছন্দ হয়নি? তাই বললেই পারতেন— ঘড়ি ভেঙে একথা কেন?' আমার চোখ ফেটে জল বেরুবার মতো হল, কিন্তু অবহিষ্কৃত অশ্রু কোনোমতে সম্বরণ করে, এমনকী অনেকটা আপ্যায়িতের ন্যায় হেসেই অবশেষে বললাম— 'কাল না-হয় আর একটা নতুন গল্প লিখে আনব সেটা আপনার পছন্দ হবে। চেষ্টা করলেই আমি লিখতে পারি।'

'বেশ, আসবেন।' এ-বিষয়ে সম্পাদকের বিশেষ উৎসাহ দেখা গেল, 'কিন্তু ওই সঙ্গে আর একটা নতুন ঘড়িও আনবেন মনে করে। আমাদের দু-জনেরই শিক্ষা হবে তাতে। আপনারও লেখার হাত পাকবে, আমিও ঘড়ি সম্বন্ধে পরিপক্কতা লাভ করব।'

পরের দিন 'মরিয়া হয়েই গেলাম এবং 'ঘড়িয়া' না হয়েই। এবার আর গল্প না, তিনটে ছোটো ছোটো কবিতা— শিম, বেগুন, বরবটির ওপর।

আমাকে দেখেই সম্পাদক অভ্যর্থনা করলেন— 'এই যে এসেছেন, বেশ। ঘড়ি আছে তো সঙ্গে?'

আমি দমলাম না— 'দেখুন এবারে একেবারে অন্য ধরনের লিখেছি। লেখাগুলো সময়োপযোগী, এমনকী সবসময়েরই উপযোগী। এবং যদি অনুমতি করেন তাহলে একথাও বলতে সাহস করি যে আপনাদের কাগজের উপযুক্তও বটে। আপনি যদি অনুগ্রহ—'

আরও খানিকটা মুখস্থ করে আনা ছিল কিন্তু ভদ্রলোক আমার আবৃত্তিতে বাধা দিলেন— 'ধৈর্য, উৎসাহ, তিতিক্ষা এসব আপনার আছে দেখছি। আপনি পারবেন। আপনার দ্বারাই হবে। কিন্তু আমাদের কি মুশকিল জানেন, বড়ো লেখকদের ভালো লেখাই আমরা ছাপতে পারি কেবল!

প্রবন্ধের শেষে বা তলার দিকে দেওয়া চলে এমন ছোটোখাটো খুচরা-খাচরা যদি আপনার কিছু থাকে তাহলে বরং—। এই ধরুন, চার লাইনের কবিতা কিংবা কৌতুক-কণা—'

আমি তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিলাম— 'হ্যাঁ, কবিতা। কবিতাই এনেছি এবার। পড়ে দেখুন আপনি, রবীন্দ্রনাথের পরে এমন কবিতা কেউ লিখেছেন কিনা সন্দেহ।'

তিনি কবিতা তিন পিস হাতে নিলেন এবং পড়তে শুরু করে দিলেন।

শিম

শিমের মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর।

ধামার মাঝে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর।।''

সঙ্গেসঙ্গে তাঁর সংপ্রশংস অভিব্যক্তি দেখা গেল— 'বাঃ, বেড়ে হয়েছে। আপনি বুঝি শিমের ভক্ত? শিম খেয়ে থাকেন খুব? অত্যন্ত ভালো জিনিস, পুষ্টিকর এবং যথেষ্ট ভিটামিন।'

'শিম আমি খাই নে। বরং অখাদ্যই মনে করি। তবে এই কবিতাটা লিখতে হিমশিম খেয়েছি বটে!'

'হ্যাঁ, এগুলো চলবে। খাসা কবিতা লেখেন আপনি; বরবটির সঙ্গে চটপটির মিলটা মন্দ না। তুলনাটাও ভালো— তা, এক কাজ করলে তো হয়!' অকস্মাৎ তিনি যেন গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হন। 'দেখুন ভিটামিনের কাগজ বটে কিন্তু ভিটামিন আমরা খুব কমই খাই। কলা বাদ দিয়ে কলার খোসা কিংবা শাঁস বাদ দিয়ে আলু খোসার সারাংশ খাওয়া হয়েই ওঠে না— এই কারণে মাস কয়েক থেকে বেরিবেরিতে ভুগতে হচ্ছে; তা আপনি যদি—' তিনি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে চাইলেন।

'হ্যাঁ, পারব। খুব পারব। ঝুড়ি ঝুড়ি কলার খোসা আপনাকে জোগাড় করে দেব। কিন্তু শুধু খোসা তো কিনতে পাওয়া যায় না, কলার দামটা আপনিই দেবেন!' তাঁর সমর্থনের অপেক্ষায় একটু থামলাম, 'কলাগুলো কষ্টে-সৃষ্টে আমিই খাব না হয়— যদিও অনুপকারী, তবু বেরিবেরি না হওয়া পর্যন্ত খেতে কোনো বাধা নেই তো?'

'না, সে-কথা নয়। আমি বলছি কী, আমি তিন মাসের ছুটি নিয়ে ঘাটশিলায় হাওয়া বদলাতে যেতাম, সেইসময়ে আপনি যদি আমার কাগজটা চালাতেন।'

'আমি?' একেবারে আকাশ থেকে পড়লাম যেন।

'তা লিখতে না জানলেও কাগজ চালানো যায়। লেখক হওয়ার চেয়ে সম্পাদক হওয়া সোজা। আপনার সঙ্গে আমার এই চুক্তি থাকবে আপনাকে নামজাদা লেখকের তালিকা দিয়ে যাব, তাদের লেখা আপনি চোখ বুজে চালিয়ে দেবেন— কেবল কপি মিলিয়ে প্রূফ দেখে দিলেই হল। সেই সব লেখার শেষে পাতার তলায় যা একটু-আধটু জায়গা থাকবে সেখানে আপনার এই ধরনের ছোটো ছোটো কবিতা আপনি ছাপতে পারবেন, তাতে আমার আপত্তি নেই। এইরকম কৃষি কবিতা— ওলকপি, গোলআলু, শকরকন্দ— যার সম্বন্ধে খুশি লিখতে পারেন।'

বলা বাহুল্য, আমাকে রাজি করতে ভদ্রলোককে মোটেই বেগ পেতে হল না, সহজেই আমি সম্মত হলাম। এ যেন আমার হাতে স্বর্গ পাওয়া— গাছে না উঠতেই এক কাঁদি! সম্পাদক শিকার করতে এসে সম্পাদকতা স্বীকার— তোমাদের মধ্যে খুব কম অজাতশ্মশ্রু লেখকেরই এরকম সৌভাগ্য হয়েছে বলে আমার মনে হয়।

সম্পাদনা কাজের গোড়াতেই এক জোড়া চশমা কিনে ফেললাম; ফাউন্টেন পেন তো ছিলই। অতঃপর সমস্ত জিনিসটাই পরিপাটি নিখুঁত হল। কলম হাতড়ে 'কৃষি তত্ত্বের' সম্পাদকীয় লিখতে শুরু করলাম। যদিও সম্পাদকীয় লেখার জন্য ঘুণাক্ষরেও অনুরোধ ছিল না সম্পাদকের তরফ থেকে, কিন্তু ওটা বাদ দিলে সম্পাদকতা করার কোনো মানেই হয় না, আমার মতে। অতএব লিখলাম...

'আমাদের দেশে ভদ্রলোকদের মধ্যে কৃষি সম্বন্ধে নিদারুণ অজ্ঞতা দেখা যায়। এমনকী, অনেকের এরকম ধারণা আছে যে এই যেসব তক্তা আমরা দেখি, দরজা জানলা, কড়িবরগা, পেনসিল, তক্তপোশে যেসব কাঠ সাধারণত দেখতে পাওয়া যায় সে সমস্ত ধান গাছের। এটা শোচনীয় ব্যাপার। তাঁরা শুনলে আশ্চর্য হয়ে যাবেন যে ওগুলো ধান গাছের তো নয়ই, বরঞ্চ পাট গাছেরও বলা যেতে পারে। অবশ্য পাট গাছ ছাড়াও কাঠ জন্মায়, আম, জাম, কাঁঠাল, কদবেল ইত্যাদি বৃক্ষেরাও অকাতরে তক্তাদান করে থাকে। কিন্তু নৌকার পাটাতনে যে কাঠ ব্যবহৃত হয় তা কেবল পাটের।...'

ইত্যাদি— এইভাবে একটানা প্রায় আড়াই পাতা কৃষি তত্ত্ব। কাগজ বেরুতে-না-বেরুতে আমার সম্পাদকতার ফল প্রত্যক্ষ করলাম। মোটে পাঁচ-শো করে আমাদের ছাপা হত, কিন্তু পাঁচ-শো কাগজ বাজারে পড়তেই পেল না। সকাল থেকে প্রেস চালিয়ে, সাতগুণ ছেপেও অনেক 'হকার'কে শেষে ক্ষুণ্ণমনে শূন্যহাতে ফিরিয়ে দিতে হল।

সন্ধ্যার পর যখন আপিস থেকে বেরুলাম, দেখলাম একদল লোক আর বালক সামনের রাস্তায় জড়ো হয়েছে; আমাকে দেখেই তারা সবাই দু-ফাঁক হয়ে আমার পথ করে দিল। দু-এক জনকে বলতেও শুনলাম যেন— 'ইনি, ইনিই সেই!' স্বভাবতই ভারি খুশি হয়ে উঠলাম। না হব কেন?

পরদিনও আপিসের সামনে সেই রকম লোকের ভিড়; দল পাকিয়ে দলা পাকিয়ে দু জন চার জন করে এখানে-ওখানে ছড়িয়ে, রাস্তার এ-ধারে, ও-ধারে, দূরে অদূরে, প্রায় সমস্ত জায়গাটা জুড়েই ব্যক্তিবর্গ। সবাই বেশ আগ্রহের সঙ্গে আমাকে লক্ষ করছে। তাদের কৌতূহলের কারণ আমি বুঝতে পারলাম এবং পেরে আত্মপ্রসাদ লাভ করলাম।

আমি কাছাকাছি হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে জনতা বিচলিত হয়ে ছিন্নবিছিন্ন হয়ে পড়ছিল, আমি দ্বিধাবোধ করার আগেই মণ্ডলীরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে আমার পথ পরিষ্কার করে দিচ্ছিল। একজন বলে উঠল— 'ওর চোখের দিকে তাকাও, কীরকম চোখ দেখেছ!' আমিও যে ওদের লক্ষ এটা যেন লক্ষ করছি না এইরকম ভাব দেখাচ্ছিলাম, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, মনে মনে বেশ পুলকসঞ্চার হচ্ছিল আমার। আমাকে দেখতেই এরা সবাই এখানে জড়ো হয়েছে। ভাবলাম, এসম্বন্ধে লম্বা-চওড়া বর্ণনা দিয়ে আজই মাকে একখানা চিঠি ছেড়ে দেব।

দরজা ঠেলে আপিস ঘরে ঢুকতেই দেখলাম দু-জন গ্রাম্যগোছের লোক আমার চেয়ার এবং টেবিল ভাগাভাগি করে বসে আছে— বসার কায়দা দেখলে মনে হয় লাঙল ঠেলাই ওদের পেশা  আমাকে দেখেই তারা তটস্থ হয়ে উঠল। মুহূর্তের জন্য যেন তাদের লজ্জায় ম্রিয়মান বলে বোধ হল আমার কিন্তু পরমুহূর্তেই আর তাদের দেখতে পেলাম না— ও-ধারের জানলা টপকে ততক্ষণে তারা সটকেছে। আপিস ঘরে যাতায়াতের অমন দরজা থাকতেও তা না ব্যবহার করে অপ্রশস্ত জানলাই বা তারা কেন পছন্দ করল, এই অদ্ভুত আচরণের মাথামুণ্ডু নির্ণয়ে মাথা ঘামাচ্ছি, এমন সময়ে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক সযত্ন-পালিত ছড়ি হাতে আমার সম্মুখে আবির্ভূত হলেন। তাঁর দাড়ির চাকচিক্য দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো। চেয়ারে ছড়ির ঠেসান দিয়ে দাড়িকে হস্তগত করে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন— 'আপনিই কি নতুন সম্পাদক?'

আমি জানালাম, তাঁর অনুমান সত্য।

'আপনি কী এর আগে কোনো কৃষি কাগজের সম্পাদনা করেছেন?'

'আজ্ঞে না,' আমি বল্লাম, 'এই আমার প্রথম চেষ্টা।'

'তাই সম্ভব।' তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেন, 'হাতে-কলমে কৃষি কাজের কোনো অভিজ্ঞতা বোধ হয় নেই আপনার?'

'একদম না।' স্বীকার করলাম আমি।

'আমারও তাই মনে হয়েছে।' ভদ্রলোক পকেট থেকে ভাঁজ করা এই সপ্তাহের একখানা 'কৃষিতত্ত্ব'বার করলেন— 'এই সম্পাদকীয়টা আপনার লেখা, তাই নয় কি?'

আমি ঘাড় নাড়লাম— 'এটাও আপনি ঠিকই ধরেছেন।'

'দেখছি আমার আন্দাজ ঠিক।' বলে তিনি পড়তে শুরু করলেন:

মুলো জিনিসটা পাড়বার সময় সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। কখনই টেনে ছেঁড়া উচিত নয়, কেন না ওতে মুলোর ক্ষতি। তার চেয়ে বরং একটা ছেলেকে গাছের ওপরে পাঠিয়ে দিয়ে ডালপালা নাড়তে দিলে ভালো হয়। খুব কষে নাড়া দরকার। ঝাঁকি পেলেই টপাটপ মুলোবৃষ্টি হবে, তখন কুড়িয়ে নিয়ে ঝাঁকায় ভর।...

'এর কী মানে, আমি জানতে চাই?' ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বরে যেন উষ্মার আভাস ছিল।

'কেন? এর মানে তো স্পষ্ট।' বৃদ্ধ ব্যক্তির বোধশক্তিহীনতা দেখে আমি অবাক হলাম, 'আপনি কি জানেন না, কত হাজার হাজার, লাখ লাখ মুলো অর্ধপক্ক অবস্থায় টেনে ছিঁড়ে নষ্ট করা হয় আমাদের দেশে? মুলো বরবাদ গেলে কার যায় আসে? কেবল যে মুলোরই তাতে অপকার হয় তা নয়, আমাদের— আমাদেরও তাতে ক্ষতি। দেশেরই তাতে সর্বনাশ, তার কি হিসেব রাখেন? তার চেয়ে যদি মুলোকে গাছেই পাকতে দেওয়া হত এবং পাকলে পরে একটা ছেলেকে গাছের ওপরে—'

'নিকুচি করেছে গাছের! মুলো গাছে জন্মায়ই না।'

'কী! গাছে জন্মায় না! অসম্ভব— এ কখনো হতে পারে? মানুষ ছাড়া সব কিছুই গাছে জন্মায়, এমনকী বাঁদর পর্যন্ত।'

ভদ্রলোকের মুখবিকৃতি দেখে বুঝলাম বিরক্তির তিনি চরম সীমায়। রেগে 'কৃষিতত্ত্ব' খানা ছিঁড়ে কুটি কুচি করে ফুঁ দিয়ে ঘরময় উড়িয়ে দিলেন— তারপরে নিজের ছড়িতে হস্তক্ষেপ করলেন। আমি শঙ্কিত হলাম— মারবে নাকি আমায়? কিন্তু না, আমাকে ছাড়া টেবিল, চেয়ার, দেরাজ, আলমারি, ঘরের সমস্ত কিছু ছড়িপেটা করে, অনেক কিছু ভেঙেচুরে অনেকটা শান্ত হয়ে অবশেষে সশব্দে দরজা খুলে তিনি সবেগে বেরিয়ে গেলেন। লোকটা ইস্কুল মাস্টার নয় তো?

আমি অবাক হলাম, ভদ্রলোক ভারি চটে চলে গেলেন তা তো স্পষ্টই, কিন্ত কেন যে কী সম্বন্ধে তাঁর এমন অসন্তোষ তা কিছু বুঝতে পারলাম না।

এই দুর্ঘটনার একটু পরেই আগামী সপ্তাহের সম্পাদকীয় লেখবার জন্য তোড়জোড় করে জাঁকিয়ে বসেছি। এমন সময়ে দরজা ফাঁক করে কে যেন উঁকি মারল। যারা জানলা পথে পালিয়েছিল সেই 'চষ্য' রাজদের একজন নাকি? কিন্তু না, নিরীক্ষণ করে দেখলাম বিশ্রী চেহারার জনৈক বদখত লোক। অদ্ভুত! লোকটা ঘরে ঢুকেই যেন কাঠের পুতুল হয়ে গেল, ঠোঁটে আঙুল চেপে, ঘাড় বেঁকিয়ে, কুঁজো হয়ে কী যেন শোনবার চেষ্টা করল। কোথাও শব্দমাত্র ছিল না। তথাপি সে শুনতে লাগল। তবু কোনো শব্দ নেই। তারপরে অতি সন্তর্পণে দরজা ভেজিয়ে পা টিপে টিপে আমার কাছাকাছি এগিয়ে সুতীব্র ঔৎসুক্যে আমার মুখের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ একেবারে নিষ্পলক, তার পরেই কোটের বোতাম খুলে হৃদয়ের অভ্যন্তর থেকে একখণ্ড 'কৃষি তত্ত্ব' বার করল।

'এই যে, তুমিই! তুমিই লিখেছ? পড়— পড় এইখানটা, তাড়াতাড়ি। ভারী কষ্ট হচ্ছে আমার।'

আমি পড়তে শুরু করলাম:

মুলোর বেলা যেরকম আলুর বেলা সেরকম করা চলবে না। গাছ ঝাঁকি দিয়ে পাড়লে আলু চোট খায়, এই কারণেই আলু পচে এবং তাতে পোকা ধরে। আলুকে গাছে বাড়তে দিতে হবে— যতদূর খুশি সে বাড়ুক। এ রকম ব্যবস্থা করলে এক-একটা আলুকে তরমুজের মতো বড়ো হতে দেখা গেছে। অবশ্য বিলাতেই; এ দেশে আমরা আলু খেতেই শিখেছি, আলুর যত্ন নিতে শিখিনি। আলু যথেষ্ট বেড়ে উঠলে এক-একটা করে আলাদা আলাদা ফজলি আমের মতো তাকে ঠুসি-পাড়া করতে হবে।

তবে পেঁয়াজ আমরা আঁকশি দিয়ে পাড়তে পারি, তাতে বিশেষ ক্ষতি নেই। অনেকের ধারণা পেঁয়াজ গাছের ফল, বাস্তবিক কিন্তু তা নয়। বরং ওকে ফুল বলা যেতে পারে— ওর খোসা ছাড়ানো মানেই ওর কোরক ছাড়ানো। পেঁয়াজের অপর শতদল।

অতি প্রাচীনকালেও এদেশে ফুলকপি ছিল তার পরিচয় পাওয়া যায়, তবে তাকে তখন আহার্যের মধ্যে গণ্য করা হত না। আমাদের শাস্ত্রে বলেছে অলাবু-ভক্ষণ নিষেধ, সেটা ফুলকপির সম্বন্ধেই। আর্যেরা কপি খেতেন না, ওটা অনার্য হাতিদের খাদ্য ছিল। 'গজভুক্ত কপিত্থ' এই প্রবাদে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

বাতাবি লেবুর গাছে কমলা নেবু ফলানোর সহজ উপায় হচ্ছে এই—'

'ব্যাস, ব্যাস— ওতেই হবে।' আমার সমজদার শ্রোতা। উত্তেজিত হয়ে আমার পিঠ চাপড়াবার জন্যে হাত বাড়াল। 'আমি জানি মাথা আমার ঠিকই আছে, কেন না তুমি যা পড়লে আমিও ঠিক তাই পড়েছি, ওই কথাগুলোই। অন্তত আজ সকালে, তোমার কাগজ পড়ার আগে পর্যন্ত এই ধারণাই আমার ছিল। যদিও আমার আত্মীয়স্বজন আমাকে সবসময় নজরে নজরে রাখে তবু এই ধারণা আমার প্রবল ছিল যে মাথা আমার ঠিকই আছে—'

তার সংশয় দূর করার জন্য আমি সায় দিলাম— 'নিশ্চয়ই! বরং অনেকের চেয়ে বেশি ঠিক একথা আমি বলব। এইমাত্র একজন বুড়ো লোক— কিন্তু যাক সে-কথা!'

লোকটাও জোর দিল— 'হ্যাঁ, যাক। তবে আজ সকালে তোমার কাগজ পড়ে সে ধারণা আমার টলেছে। এখন আমি বিশ্বাস করি যে সত্যি সত্যিই আমার মাথা খারাপ। এই বিশ্বাস হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে আমি এক দারুণ চিৎকার ছেড়েছি— নিশ্চয়ই তুমি এখানে বসেই শুনেতে পেয়েছ?'

আমি ঘাড় নাড়লাম কিন্তু আমার অস্বীকারোক্তিকে সে আমল দিন না— 'নিশ্চয় পেয়েছ। দু-মাইল দূর থেকে তো শোনা যায়। সেই চিৎকার ছেড়েই এই লাঠি নিয়ে আমি বেরিয়েছি, কাউকে খুন না-করা পর্যন্ত আমার স্বস্তি নেই। শান্তি হচ্ছে না। তুমি বুঝতেই পারছ আমার মাথার যা অবস্থা তাতে একদিন-না-একদিন কাউকে-না-কাউকে খুন আমায় করতেই হবে— তবে আজই কেন শুরু করা যাক না?'

কী জবাব দেব ভেবে পেলাম না, একটা অজানা আশঙ্কায় বুক গুড়গুড় করতে লাগল।

'বেরুবার আগে আর একবার তোমার প্যারাগুলো পড়লাম, সত্যিই আমি পাগল কিনা নিশ্চিত হবার জন্যে। আর তার পরক্ষণেই বাড়িতে আগুন লাগিয়ে আমি বেরিয়ে পড়েছি। রাস্তায় যাকে পেয়েছি তাকেই ধরে ঠেঙিয়েছি। অনেকে খোঁড়া হয়েছে, অনেকের মাথা ভেঙেছে; সবসুদ্ধ কত জন হতাহত বলতে পারি না, তবে এক জনকে জানি, সে গাছের উপর উঠে বসে আছে। গোলদিঘির ধারে। আমি ইচ্ছা করলেই তাকে পেড়ে আনতে পারব। এই পথ দিয়ে যেতে যেতে মনে হল তোমার সঙ্গে এক বার মোলাকাত করে যাই—'

হৃৎকম্পের অজ্ঞাত কারণ এতক্ষণে আমার আয়ত্তে এল— কিন্তু আসার সঙ্গেসঙ্গে হৃৎকম্প একেবারেই থেমে যাবার জোগাড় হল যেন!

'কিন্তু তোমায় আমি সত্যি বলছি, যে লোকটা গাছে চেপে আছে তার কপাল ভালো। এতক্ষণ তবু বেঁচে রয়েছে। ওকে খুন করে আসাই উচিত ছিল আমার। যাক, ফেরার পথে ওর সঙ্গে আমার বোঝাপড়া হবে। এখন আসি তাহলে— নমস্কার।'

লোকটা চলে গেলে ঘাম দিয়ে আমার জ্বল ছাড়ল। কিন্তু এতগুলো লোক যে আমার লেখার জন্যই খুন-জখম হয়েছে, হাত-পা হারিয়েছে এবং এক জন গোলদিঘির ধারে এখনও গাছে চেপে বসে আছে— এই কথা ভেবে মন আমার ভারী হয়ে গেল। কিন্তু শীঘ্রই এই সব দুশ্চিন্তা নির্বাসন দিতে হল, কেন না 'কৃষি তত্ত্বে'র আটপৌরে সম্পাদক অপ্রত্যাশিতরূপে প্রবেশ করলেন।'

সম্পাদকের মুখের ভাব গম্ভীর, বিরক্ত, ম্রিয়মান। আমরা দু-জনেই চুপচাপ। অনেকক্ষণ পরে তিনি একটি মাত্র কথা বললেন— 'তুমি আমার কাগজের সর্বনাশ করেছ।'

আমি বললাম, 'কেন, কাটতি তো অনেক বেড়েছে!'

'হ্যাঁ, কাগজ বহুত কেটেছে, আমি জানি। কিন্তু আমার মাথাও কাটা গেছে সেইসঙ্গে।' তার পরে দাড়িওয়ালা ভদ্রলোকের কীর্তিকলাপ তাঁর নজরে পড়ল, চারিদিকে ভাঙাচোরা দেখে তিনি নিজেও যেন ভেঙে পড়লেন— 'সত্যি বড়ো দুঃখের বিষয়, বড়োই দুঃখের বিষয়। 'কৃষি তত্ত্বের' সুনামের যে হানি হল, যা বদনাম হল তা বোধ হয় চিরন্তন হয়ে থাকবে। অবশ্যি কাগজের এত বেশি বিক্রি এর আগে আর কখনো হয়নি বা এমন নামডাকও ছড়িয়ে পড়েনি— কিন্তু পাগলামির জন্যে বিখ্যাত হয়ে কী লাভ? কে-ই বা তা চায়?

এক বার জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখ দিকি চারধারে কীরকম ভিড়— কী শোরগোল! তারা সব দাঁড়িয়ে আছে তোমাকে দেখবার জন্য। তাদের ধারণা তুমি বদ্ধ পাগল। তাদের দোষ কী? যে তোমার সম্পাদকীয় পড়বে তারই ওই ধারণা বদ্ধমূল হবে। তুমি যে চাষবাসের বিন্দুবিসর্গ জান তা তো মনে হয় না। কপি আর কপিত্থ যে এক জিনিস একথা কে তোমাকে বলল? গোল আলুর সম্বন্ধে তুমি যে গবেষণা করেছ, মুলো চাষের যে আমূল পরিবর্তন আনতে চেয়েছ সে সম্বন্ধে তোমার কোনোই ধারণা নেই।

তুমি লিখেছ শামুক অতি উৎকৃষ্ট সার, কিন্তু তাদের ধরা অতিশয় শক্ত। মোটেই তা নয়, শামুক আদৌ সারবান নয়, এবং তাদের দ্রুতগতির কথা এই প্রথম শোনা গেল। কচ্ছপেরা সংগীতপ্রিয়, রাগ-রাগিণীর সম্মুখে তারা মৌনী হয়ে থাকে, তোমার এ মন্তব্য একান্তই বাহুল্য— একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। কচ্ছপদের মধ্যে উচ্চাঙ্গ সুরবোধের কোনো প্রমাণ এযাবৎ পাওয়া যায়নি। এমনিতেই ওরা চুপচাপ, মৌনী হয়ে থাকাই ওদের স্বভাব— রাগপ্রধান সংগীতের কোনো ধারই ধারে না ওরা। কচ্ছপদের দিয়ে জমি চষানো অসম্ভব— একেবারেই অসম্ভব। আপত্তি না করলেও জমি তারা চষবে না— তারা তো বলদ নয়! তুমি যে লিখেছ, ঘোড়ামুগ ঘোড়ার খাদ্য আর কলার বিচি থেকে কলাই হয়, তার ধাক্কা সামলাতে আমার কাগজ উঠে না গেলে বাঁচি! গাছের ডাল আর ছোলার ডালের মধ্যে যে প্রভেদ আছে দেড়পাতা খরচ করে তা বোঝাবার কোনোই দরকার ছিল না। কেবল তুমি ছাড়া আর সবাই একথা জানে।

যাক, যা হবার হয়েছে, এখন তুমি বিদায় নাও। তোমাকে আর সম্পাদকতা করতে হবে না। আমার আর বায়ুপরিবর্তনে কাজ নেই— ঘাটশিলায় গিয়েই আমাকে দৌড়ে আসতে হয়েছে— তোমার পাঠান কাগজের কপি পেয়ে অবধি আমার দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। পরের সপ্তাহে আবার তুমি কী গবেষণা করে বসবে সেই ভয়েই আমার বুক কেঁপেছে। বিড়ম্বনা আর কাকে বলে! যখনই তোমার ঘোষণার কথা ভেবেছি— জাম, জামরুল আর গোলাপজাম কী করে একই গাছে ফলানো যায়, পরের সংখ্যাতেই তুমি তার উপায় বাতলে দেবে, তখন থেকেই নাওয়া-খাওয়া আমার মাথায় উঠেছে— বেরিবেরিতে প্রাণ যায় সেও ভালো— তখনই আমি কলকাতার টিকিট কেটে বসেছি। গাড়িতে চেপে বসেছি।'

এতখানি বক্তৃতার পর ভদ্রলোক এক দারুণ দীর্ঘশ্বাস মোচন করলেন। ওঁরই কাগজের কাটতি আর খ্যাতি বাড়িয়ে দিলাম, আয়ও বেড়ে গেল কত, অথচ উনিই আমাকে গালমন্দ করছেন। ভদ্রলোকের নেমকহারামি দেখে আমার মেজাজ বিগড়ে গেল। অতএব, শেষবিদায় নেওয়ার আগে আমিই বা কেন ক্ষান্ত হই? আমার বক্তব্য আমিও বলে যাব। এত খাতির কীসের?

'বেশ তবে আমার কথাটাও শুনুন। আপনার কোনো কাণ্ডজ্ঞানই নেই, আপনি একটি আস্ত বাঁধাকপি। এ ধরনের মন্তব্য যা এতক্ষণ আমাকে শুনতে হয়েছে তা শুনব বলে কোনোদিন আমি ধারণাও করিনি। কাগজের সম্পাদক হতে হলে কোনো কিছু জানতে হয় তাও এই আমি প্রথম জানলাম। এত দিন তো দেখে আসছি যারা বই লিখতে জানে না তারাই বইয়ের সমালোচনা করে, আর যারা ফুটবল খেলতে পারে না তারাই ফুটবলের খেলা দেখতে যায়।

আপনি নিতান্তই শালগম আর গাজর তাই একথা বুঝতে আপনার বেগ পেতে হচ্ছে। যদি নিতান্ত ভূমিকুষ্মাণ্ড না হতেন তাহলে অবশ্যই বুঝতেন যে 'কৃষি তত্ত্বে'র কী উন্নতি আর কতখানি উপকার আমি করেছি! কী আর বলব আপনাকে, পালং শাক, পানফল, তালশাঁস যা খুশি বলা যায়। আপনাকে পাতি নেবু বল্লে পাতি নেবুর অপমান করা হয়—'

দম নেবার জন্য আমাকে থামতে হল। গায়ের ঝাল মিটিয়ে গালাগালের শোধ তুললাম, কিন্তু ভদ্রলোক একেবারে নির্বাক। আবার আরম্ভ করলাম— 'হ্যাঁ, একথা সত্যি, সম্পাদক হবার জন্যে আমি জন্মাইনি! যারা সৃষ্টি করে আমি তাদেরই একজন, আমি হচ্ছি লেখক। ভুঁইফোড় কাগজের সম্পাদক হয় কারা? আপনার মতো লোক— নিতান্তই যারা টম্যাটো। সাধারণত যারা কবিতা লিখতে পারে না, গোয়েন্দা কাহিনি কী গল্পও যাদের আসে না, পিলে চমকানো থিয়েটারি নাটক লিখতেও অক্ষম, সাহিত্য পত্র সম্পাদনেও অপারগ তারাই অবশেষে হাত চুলকানো থেকে আত্মরক্ষার জন্যে আপনার মতো কৃষি কাগজ বার করে।

আপনি আমার সঙ্গে যেরকম ব্যবহার করেছেন তাতে আর এক মুহূর্তও এখানে থাকতে রুচি নেই! এই দণ্ডেই সম্পাদকগিরিতে আমি ইস্তফা দিচ্ছি। 'চাষাড়ে' কাগজের সম্পাদকের কাছে ভদ্রতা আশা করাই বাতুলতা! ঘড়ির দুর্দশা দেখেই আমার শিক্ষা হওয়া উচিত ছিল। যাব তো আমি নিশ্চয়ই, কিন্তু জানবেন, আমার কর্তব্য আমি করে গেছি, যা চুক্তি ছিল তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি আমি। বলেছিলাম আপনার কাগজ সর্বশ্রেণির পাঠ্য করে তুলব— তা আমি করেছিও। বলেছিলাম আপনার কাগজের কুড়ি হাজার গ্রাহক করে দেব— যদি আর দু-সপ্তাহ পেতাম তাও আমি করতে পারতাম। এখন— এখনই আপনার পাঠক কারা? কোনো চাষের কাজের ভাগ্যই যাদের কোনোদিন জোটেনি সেই সব লোক আপনার কাগজের পাঠক— যত উকিল, ব্যারিস্টার, ডাক্তার, মোক্তার, হাইকোর্টের জজ, কলেজের প্রফেসার, যত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। এক জনও চাষা নেই তার মধ্যে— যত গ্রাহক ছিল তারা সব চিঠি লিখে কাগজ ছেড়ে দিয়েছে— ওই দেখুন টেবিলের উপর চিঠির গাদা। কিন্তু আপনি এমনই চালকুমড়ো যে পাঁচ-শো মুখ্যু চাষার জন্যে বিশ হাজার উচ্চশিক্ষিত গ্রাহক পরিত্যাগ করলেন। বলি রাজাও যা কখনো করত না। কিন্তু এতে আপনারই ক্ষতি, আমার কী! আমি চল্লাম।'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%