কাষ্ঠ-কাশির চিকিৎসা

শিবরাম চক্রবর্তী

বড়দির আদুরে খোকাকে একটি কথা বলার কারু জো নেই। বলেছ কী খোকা তো বাড়ি মাথায় করেছেই, বড়দি আবার পাড়া মাথায় করেন! প্রতিবেশীদের প্রতি বেশি রাগ আমার নেই; তাই যতদূর সম্ভব বিবেচনা করে বড়দি আর খোকাকে না ঘাঁটিয়েই আমি চলি।

কালই মিউনিসিপ্যাল মার্কেট থেকে পছন্দ করে কিনে এনেছি, আজ সকালেই দেখি খোকা সেই দামি পাইনের ছড়িটা হস্তগত করে অম্লান বদনে চর্বণ করছে। খোকার এইভাবে ছড়িটি আত্মসাৎ করবার প্রয়াস আমার একেবারেই ভালো লাগল না, ইচ্ছা হল ওকে বুঝিয়ে দিই ছড়ির আস্বাদ মুখে নয়, পিঠে। কিন্তু ভয়ানকভাবে আত্মসংবরণ করে ফেললাম।

ভয়ে ভয়ে বড়দির দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম, 'দেখছ, খোকা কি করছে?'

সঙ্গে সঙ্গে বড়দির খাণ্ডামার্কা জবাব, 'কী তোমার পাকা ধানে মই দিচ্ছে? ও তো ছড়ি চিবুচ্চে।'

আমি আমতা আমতা করে বললাম, 'তা চিবুক ক্ষতি নেই, কিন্তু যত রকমের কাঠ আছে, তার মধ্যে পাইন কাঠ খাদ্য হিসেবে সবচেয়ে কম পুষ্টিকর, তা জানো কি? তা ছাড়া এখন চারধারে যেরকম হুপিংকাফ হচ্ছে—'

বড়দি ঝামটা দিয়ে উঠলেন, 'যাও যাও, তোমাকে আর বোকা বুঝাতে হবে না। সেদিন আমি একটা ওষুধের বিজ্ঞাপনে পড়লাম পাইন গাছের হাওয়ায় যক্ষ্মাকাশি পর্যন্ত সারে— যার হাওয়ায় যক্ষ্মা সেরে যায়, তাতেই কি না হুপিংকাশি হবে? পাগল!'

আমার মনে বৈরাগ্যের উদয় হল, বললাম, 'বেশ, আমার কথার চেয়ে বিজ্ঞাপনেই যখন তোমার বেশি বিশ্বাস তখন আজই আমি এক ডজন ছড়ির অর্ডার দিচ্ছি, তুমি রোজ একটা করে খোকাকে খাওয়াও। আহার ওষুধ দুই হবে।' বলে বিনা-ছড়ি হাতেই বেরিয়ে পড়লাম বাড়ির থেকে।

জীবনটা বিড়ম্বনা বোধ হতে লাগল। সারা দিন আর বাড়ি ফিরলাম না। ওয়াই এম সি এ-তে সকালের লাঞ্চ সারলাম, তারপর সোজা কলেজে গেলাম, সেখান থেকে এক বন্ধুর বাড়ি বিকেলের জলযোগ পর্ব সেরে চলে গেলাম খেলার মাঠে। মোহনবাগান ম্যাচ জেতায় যে স্ফূর্তিটা হল, ক্লাবে গিয়ে ঘণ্টা দুই ব্রিজ খেলায় হেরে গিয়ে সেটা নষ্ট করলাম। সেখান থেকে গেলাম সিনেমায় সাড়ে ন-টার শোয়ে।

রাত বারোটায় বাড়ি ফিরে সদর দরজা খোলাই পেলাম। ডাকাহাঁকি করতে হল না, হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। জ্যাঠামশাই ভারি বদরাগী মানুষ, তাঁর ঘুমের ব্যাঘাত হলে আর রক্ষা নেই! পা টিপে টিপে নিজের ঘরের অভিমুখে যাচ্ছি, বড়দি কোথায় ওত পেতে ছিলেন জানি না, অকস্মাৎ এসে আক্রমণ করলেন।

'শিবুরে, খোকা বুঝি আর বাঁচে না!'

বড়দির অতর্কিত আক্রমণ, তার পরেই এই দারুণ দুঃসংবাদ— আমি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লাম।— 'কেন, কেন, কী হয়েছে? ছড়িটা গিলে ফেলেছে না কি?'

বিপদের মুহূর্তে সবচেয়ে প্রিয় জিনিসের কথাই আগে মনে পড়ে। ছড়িটার দুর্ঘটনা আশঙ্কা করলাম।

'না না, ছড়ির কিছু হয়নি।'

স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে জিজ্ঞাসু নেত্রে বড়দির দিকে দৃষ্টিপাত করলাম, 'যাক, ছড়ির কোনো অঙ্গহানি হয়নি তো! বাঁচা গেছে!'

'না, ছড়ির কিছু হয়নি, তবে সন্ধ্যে থেকে খোকা ভারি কাশছে— ভয়ানক কাশছে। হুপিংকাফ হয়েছে ওর— নিশ্চয়ই হুপিংকাফ। কী হবে ভাই?'

এতক্ষণে মুরুব্বি চাল দেবার সুযোগ এসেছে আমার। গম্ভীরভাবে ঘাড় নেড়ে বললাম, 'তখনই তো বলেছিলাম সকালে! তা তুমি গ্রাহ্যই করলে না। তখন পাইনের হাওয়ায় কত কী উপকারিতার কথা আমায় শুনিয়ে দিলে। এখন ঠেলা সামলাও।'

'লক্ষ্মী দাদাটি, তোমাকে একবার ডাক্তারবাড়ি যেতে হবে এখনই।'

'এত রাত্রে? অসম্ভব, ডাক্তার কি আর জেগে বসে আছে এখনও? তার চেয়ে এক কাজ করো না বড়দি?'

ব্যগ্রভাবে বড়দি প্রশ্ন করলেন, 'কী, কী?'

'পাইনের হাওয়ায় যক্ষ্মা সারে, আর হুপিং সারবে না? ছড়িটা দিয়ে খোকাকে কসে হাওয়া করো না কেন?'

বড়দি রোষ-কষায়িত নেত্রে আমার দিকে দৃকপাত করলেন— 'না তোমাকে যেতেই হবে ডাক্তারের কাছে। নইলে জ্যাঠামশাইকে জাগিয়ে দেব। এই ডাক ছাড়লাম— ছাড়ি?'

'না না, রক্ষে করো— দোহাই! যাচ্ছি ডাক্তারের কাছে।'

খোকার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলাম। হ্যাঁ, হুপিংকাফ, নিশ্চয়ই তাই, ছড়ি খেলে হুপিংকাফ হবে, জানা কথা। কী কাশিটাই না কাশছে, নিজের নাক-ডাকার আওয়াজে শুনতে পাচ্ছেন না তাই, নইলে এই কাশির ধ্বনি কানে গেলে জ্যাঠামশাই নিশ্চয় ক্ষেপে উঠতেন। কিংবা উঠে ক্ষেপতেন।

গেলাম ডাক্তারের কাছে— ভাগ্যক্রমে দেখাও হল। কাল সকালে তিনি খোকাকে দেখতে আসবেন। এখন এক বোতল পেটেন্ট হুপিংকাফ-কিওর দিলেন, ব্যবস্থাও বাতলে দিলেন। বড়দিকে বললাম এই ওষুধটা এক এক চামচ তিন ঘণ্টা বাদ-বাদ খাওয়াতে হবে।

'তিন ঘণ্টা বাদ বাদ? ওতে কী হবে? অসুখটা কতখানি বেড়েছে দেখছ না? ঘণ্টায় ঘণ্টায় খাওয়ালে যদি বাঁচে খোকা।'

'বেশ, তাই খাওয়াও। আমি এখন ঘুমুতে চললাম।'

ঘণ্টা খানেক চোখ বুজেছি কি না সন্দেহ, বড়দির ধাক্কায় জেগে উঠলাম।

'আঃ, কী ঘুমুচ্ছিস মোষের মতো! এদিকে খোকার যে নাড়ি ছাড়ে!'

ধড়মড়িয়ে উঠলাম, 'তাই না কি? যতটুকু নাড়ি জ্ঞান তাই ফলিয়েই বুঝলাম নাড়ি বেশ টন টন করছে। বড়দিকে সে-কথা জানাতেই তিনি আগুন হয়ে উঠলেন, জ্যাঠামশায়ের ভয়ে চ্যাঁচাতে পারলেন না— এই যা রক্ষা! জিজ্ঞাসা করলাম, 'ওষুধ খাইয়েছ?'

'হ্যাঁ, দু-চামচ।'

'এক ঘণ্টায় দু-চামচ? বেশ করেছ!'

'শিবু, খোকার বুকে সেই পুলটিসটা দিলে কেমন হয়? অ্যান্টিফ্লুজিস্টিন— যেটা জ্যাঠামশায়ের নিউমোনিয়ায় সময় দেওয়া হয়েছিল— এখনও তো এক কৌটো রয়ে গেছে। দেব সেটা?'

আমি বললাম, 'ডাক্তার তো পুলটিস দিতে বলেনি!'

বড়দি বললেন, 'ডাক্তার তো সব জানে। সেটা দিয়ে কিন্তু জ্যাঠামশায়ের খুব উপকার হয়েছিল, আমি নিজে দেখেছি। তুই স্টোভ জ্বাল, আমি ফ্যানেল জোগাড় করি।'

আমি ইতস্তত করছি দেখে বড়দি অনুচ্চ চীৎকারের একটা নমুনার দ্বারা জানিয়ে দিলেন, স্টোভ না ধরালেই তিনি অকৃত্রিম আর্তনাদে জ্যাঠামশায়ের নিদ্রাভঙ্গ ঘটাবেন। আমি ভারি সমস্যার মধ্যে পড়লাম— যদি-বা খোকা বাঁচত, বড়দির চিকিৎসার ঠেলায় সকাল পর্যন্ত— মানে ডাক্তার আসা পর্যন্ত টেকে কি না সন্দেহ। অথচ বড়দির চিকিৎসায় সহায়তা না করলে আরেক বিপদ! ওদিকে খোকার মৃত্যু, এদিকে আমার অপঘাত— আমি স্টোভ ধরাতেই স্বীকৃত হলাম।

পুলটিসের হাত থেকে খোকার পরিত্রাণের একটা ফন্দি মাথায় এল। স্টোভ ধরাতে গিয়ে বলে উঠলাম— 'এই যা, ধরচে না তো! যা ময়লা জমেছে বার্নারে। পোকারটা দাও তো বড়দি?'

'সর্বনাশ! পোকার— সে যে জ্যাঠামশায়ের ঘরে!'

আমি তা জানতাম। 'তাহলে কী হবে? যাও তুমি নিয়ে এসোগে। নইলে তো স্টোভ ধরবে না।'

'বাবা! জ্যাঠামশায়ের ঘরে আমি যাব না, তার চেয়ে আমি চ্যাঁচাব।'

'না না, তোমায় চ্যাঁচাতে হবে না। আমিই যাচ্ছি।'

'ওই সঙ্গে, তাক থেকে থার্মোমিটারটাও এনো, জ্বর দেখতে হবে।'

খোকার গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম, বেশ গরম! পোকার আনি আর না আনি, থার্মোমিটারটা দেখা দরকার। নিঃশব্দ পদসঞ্চারে জ্যাঠামশায়ের কক্ষে ঢুকলাম, দরজা আবজানই ছিল। অন্ধকার ঘরের মধ্যে জীবন্ত একমাত্র নাসিকা— নাসিকার কাজে ব্যাঘাত না ঘটিয়েই যদি থার্মোমিটার বাগিয়ে আনতে পারি, তাহলেই আজ রাত্রের ফাঁড়া কাটল।

কাছাকাছি এক বেড়াল শুয়েছিল, অন্ধকারে তো দেখা যায় না, পড়বি তো পড় তার ঘাড়েই দিয়েছি এক পা! সঙ্গে সঙ্গে হতভাগা চেঁচিয়ে উঠেছে— ম্যাঁও!

শুনেছি বেড়ালের দৃষ্টি অন্ধকারেই ভালো খ্যালে, ওরই আগে থেকে আমাকে দেখা উচিত ছিল। আমার পথ থেকে অনায়াসেই সরে যেতে পারত। নিজে দোষ করে নিজেই আবার তার প্রতিবাদ— আমার এমন রাগ হল বেড়ালটার উপর, দিলেম ওকে কষে এক শুট, মহামেডান স্পোর্টিং-এর সামাদের মতন।

আমার শুটটা গিয়ে লাগল একটা চেয়ারে, সেখানেই যে সেটা দাঁড়িয়েছিল জানতাম না। পাজি বেড়ালটা এবার ঠিক নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। শুটের প্রতিক্রিয়া থেকে কোনোরকমে আমি টাল সামলে নিলাম, কিন্তু চেয়ারটা চিতপাত হল।

এইসব গোলমালে নাসিকা গর্জন গেল থেমে, কিন্তু আমার হৃৎকম্প আরম্ভ হল সেই সঙ্গে। ভাবলাম, নাঃ, হামাগুড়ি দিয়ে চার-পেয়ের মতো চলি, তাতে ধাক্কাধুক্কি লাগবার ভয় কম, সাবধানেও চলা যাবে, জ্যাঠামশায়ের নিদ্রা এবং নাসিকা গর্জনের হানি না ঘটিয়ে নিঃশব্দে থার্মোমিটারটা নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারব। একটু পরেই আবার নাক ডাকতে লাগল— আমিও নিশ্চিন্ত হয়ে হামাগুড়ি প্র্যাকটিস শুরু করলাম।

প্রথমেই একটা বস্তুর সংঘর্ষে দারুণভাবে মাথা ঠুকে গেল— হাত দিয়ে অনুভব করলাম ওটা চেয়ার। সব জিনিসেরই দুটো দিক আছে— সুবিধার দিক এবং অসুবিধার দিক; অন্ধকারে হামাগুড়ি অভিযানে পা সামলানো যায় বটে, কিন্তু মাথা বাঁচানো দায়! যাক, গোলটেবিলটা এতক্ষণে পেয়েছি, এবার হয়েছে, ঘরে মধ্যিখানে পৌঁছে গেছি— এখান থেকে সোজা উত্তরে গেলেই সেই তাক— যেখানে থার্মোমিটার আছে। না তাকালেও পাবো।

অনেকটা তো গুড়ি দেওয়া হল— কিন্তু তাক কই? ভালো করে তাক করতে গিয়ে টেবিলটাকে পুনরাবিষ্কার করলাম— এবার মাথা দিয়ে, এবং রীতিমতন ভড়কে গেলাম। একী, এখনও আমি ঘরের মধ্যিখানেই ঘুরছি? আহত মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে ভাবতে লাগলাম— কী করা যায়?

নূতন উদ্যমে আবার যাত্রা শুরু করলাম। এই তো টেবিল— এই একটা চেয়ার, এটা? এটা জ্যাঠামশায়ের পিকদানি— ছিঃ! যাকগে, হাতে সাবান দিলেই হবে; এই তো দেয়াল, এই আরেকখানা চেয়ার, এই গেল গিয়ে সোফা— এ কী? ঘরে তো একটা সোফা ছিল বলেই জানতাম, নাঃ, এবার হতভম্ব হতে হল আমাকে। যে ঘরে দিনে দশ বার আসছি-যাচ্ছি, তাতে এত লুকোনো সম্পত্তি ছিল জানতাম না তো! আরেকটু এগিয়ে দেখতে হল— আরও কী অজ্ঞাত ঐশ্বর্য উদ্ধার হয়! এই যে দেখছি আরেকখানা চেয়ার— ঘরে আজ এত চেয়ারের আমদানি হল কোত্থেকে! এই যে ফের আরেকটা পিকদানি— ছিছিঃ, এ-হাতটাতেও সাবান লাগাতে হবে আবার! ছ্যাঃ!

নাঃ, এবার এগুতে সত্যিই ভয় করছিল। ঘরে আজ যেরকম পিকদানির আমদানি তাতে আর বেশি পরিভ্রমণ নিরাপদ নয়। দরজাটা কোন দিকে? এবার বেরুতে পারলে বাঁচি, আর থার্মোমিটারে কাজ নেই বাবা! উঠতে গিয়ে মাথায় লেগে গেল— এ কোনখানে এলাম? টেবিলের তলায় নাকি? টেবিলটা তো ছোটো এবং গোল বলেই জানতাম। এ যে, যেখানে যত ঘুরে ফিরেই উঠতে যাই মাথায় লাগে। ঘরের ছাদ নোটিস না দিয়ে হঠাৎ এত নীচে নেমে আসবে বলে তো মনে হয় না। তবে আমার দণ্ডায়মান হবার বাধা এই দীর্ঘ প্রস্থ বস্তুটি কী? এটাকে নিয়ে ঠেলে উঠব, যাই থাক কপালে।

যেই চেষ্টা করা, অমনি সহসা জ্যাঠামশায়ের নাসিকাধ্বনি স্থগিত হল। ক্ষণপরেই তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন— 'চোর, চোর! ডাকাত! খুনে! ভূমিকম্প! ভূমিকম্প! খুন করলো!'

ও বাবা! আমি জ্যাঠামশায়ের তক্তপোশের তলায়— কী সর্বনাশ! তাঁকে শুদ্ধ নিয়ে উঠবার চেষ্টায় ছিলাম! এখন ওকে অভয় দেওয়া দরকার। বোঝানো দরকার চোর নয়, ডাকাত নয়, ভূমিকম্প নয়— অন্য কিছু, নগণ্য কিছু। মিহি সুরে ডাকলাম— মিঁয়াও!

জ্যাঠামশাই যে খুব ভরসা পেয়েছেন এমন বোধ হল না। এবার গলা ফুলিয়ে ডাকতে হল— ম্যাঁ-া-া-ও!

বড়দি হ্যারিকেন হাতে ঢুকলেন। জ্যাঠামশাই ভীতিবিহ্বল কণ্ঠে বললেন, 'দেখতো সুশী, আমার তক্তপোশের তলায় কী?'

বড়দি আমাকে পর্যবেক্ষণ করে আশ্বাস দিলেন, 'ও কিছু না জ্যাঠামশাই, একটা ইঁদুর, আপনি ঘুমান।'

জ্যাঠামশাই সন্দিগ্ধ স্বরে বললেন, 'ইঁদুর আমার চৌকি ঠেলে তুলবে? ইঁদুরের এত জোর, একী হতে পারে?'

বড়দি বললেন, 'ধাড়ি ইঁদুর যে!'

'ধাড়ি ইঁদুর! একটু আগে বেড়ালের ডাক শুনলাম যেন? বেড়াল-ইঁদুর একসঙ্গে, ওরা যে খাদ্য—খাদক বলেই আমার জানা ছিল। যাকগে, আলোটা নিয়ে যা আমার সামনে থেকে— ঘুম পাচ্ছে।'

সঙ্গে সঙ্গে আবার জ্যাঠামশায়ের নাসিকা-বাদ্য বেজে উঠল। বড়দির আড়াল দিয়ে আমিও বিপদসঙ্কুল কক্ষ থেকে নিষ্কৃতি লাভ করলাম।

বাইরে এসে হাঁপ ছেড়ে দেখি ভোর হতে আর বাকি নেই— সুদূর আকাশে মুক্তাভা দেখা গিয়েছে। রাত দুটো থেকে এই ভোর পাঁচটা, ওই ঘরে আমি কেবল ঘুরেছি— পায়ে মিটার বাঁধা ছিল না, নইলে জানা যেত কত মাইল মোট ঘুরলাম? তিন ঘণ্টায় তিরিশ মাইল তো বটেই!

বড়দি করুণ কণ্ঠে বললেন, 'তুমি তো থার্মোমিটার আনতে বছর কাটিয়ে দিলে, এদিকে দেখো এসে, খোকা কেমন করছে!'

দেখেই বুঝলাম আর না দেখলেও চলে— খোকার শেষ মুহূর্ত সন্নিকট! যে সময়ে আমি এনডিওরেন্স হামাগুড়ির রেকর্ড সৃষ্টি করছিলাম, আমার ভাগনের অদৃষ্টে সেই সময়ে অন্যবিধ এনডিওরেন্স পরীক্ষা চলছিল। দেখলাম, বড়দি নিজেই কোনো রকমে স্টোভ ধরিয়ে নিয়েছেন, ইতিমধ্যে দু-দুবার খোকার বুকে পুলটিস দেওয়া হয়ে গেছে। ওষুধের দিকে তাকিয়ে দেখি গোটা বোতলটা ফাঁকা! 'ওষুধের কী হল' জিজ্ঞাসা করতেই বড়দি জানালেন, 'দশ মিনিট অন্তর এক চামচ করে খাওয়ানো হয়েছে, তবু তো কই কোনো উপকার দেখা যাচ্ছে না।' আমি বললাম, 'উপকার দেখা যেত যদি খোকার বদলে তুমি খেতে।'

হাত টিপে দেখলাম, কিন্তু খোকার নাড়ি পেলাম না। খোকার আর অপরাধ কী, যে এক বোতল হুপিংকাফ-কিওর ওকে উদরস্ত করতে হয়েছে, তাতে কী আর ওর নাড়ি-ভুঁড়ি হজম হতে বাকি আছে? তাড়াতাড়ি ডাক্তারকে ফোন করলাম— 'আমাদের খোকা মারা যাচ্ছে।'

পায়জামা-পরনেই ডাক্তার ছুটে এলেন। পরীক্ষা করে বললেন, 'না, মারা যাচ্ছে না। তা ছাড়া এর হুপিং কাফই হয়নি। দেখি—' বলে খোকার গলার কাছে সুড়সুড়ি দিতেই খোকা বেদম কাশতে শুরু করল এবং কাশির ধমকে বেরিয়ে এল সূক্ষ্মতম কী-একটা জিনিস। হাতে নিয়ে ভালো করে দেখে ডাক্তার বললেন, 'এ তো পাইন কাঠের টুকরো দেখছি! খোকা বোধ হয় পাইন কাঠের কিছু চিবুচ্ছিল, তার ভগ্নাংশ ভেঙে গলায় গিয়ে এই কাণ্ড ঘটিয়েছে।'

ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বড়দি বললেন, 'হুপিংকাশি নয়, তাহলে এটা কী কাশি?' বড়দির ক্ষোভের কারণ ছিল, সমস্ত রাত ধরে একসঙ্গে হুপিংকাফ, নিউমোনিয়া ও সর্দিগর্মির চিকিৎসার পর সেই প্রাণান্ত পরিশ্রম ব্যর্থ হয়েছে জানলে কার-না দুঃখ হয়?

আমি উত্তর দিলাম, 'এক রকমের কাষ্ঠ-হাসি আছে জানো তো বড়দি? এটা হচ্ছে তারই ভায়রা-ভাই— কাষ্ঠ-কাশি।'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%