শিবরাম চক্রবর্তী
বিদ্যুৎচমকানোতে ভারি ভয় পায় মেয়েরা। বিশেষ করে পিসিজাতীয় মেয়েরা। যদি পূর্বজন্মের অভিজ্ঞতায়, কিংবা ইস্কুলের টেক্সট বুক পড়েও এ-কথাটা আমার জানা থাকত তাহলে গরমের ছুটিতে মুকুন্দপুরে কখনোই আমি মরতে যেতাম না। অজপাড়াগাঁ মুকুন্দপুর— সাধারণত পিসিদেরই সেখানে বসবাস।
বাবা বললেন— 'যা, অনেক দিন ধরে লেখালেখি করছে তরু। তোকে কবে সেই ছোটোবেলায় দেখেছে, দেখতে চায় এক বার। তারই কোলে-পিঠে তুই মানুষ তো! তা ছাড়া, তারিণীও খুশি হবে খুব। গরমের ছুটিটা সেইখানেই কাটিয়ে আয় না কেন? গান্ধীজি ও বলছেন— ব্যাক টু ভিলেজ, তার মানে কী? না, গ্রামাঞ্চলে ফিরে যাও আবার।'
বাবা দারুণ ভক্ত গান্ধীজির। আমি প্রতিবাদ করতে চাই— 'উঁহু। তা কি করে হয় বাবা? ব্যাক টু ভিলেজ মানে হবে গ্রামের দিকে পিঠ ফেরাও। অর্থাৎ কিনা গ্রামের প্রতি বিমুখ হয়ে শহরেই তোমরা পড়ে থাক।'
'তাই নাকি?' বাবা মাথা চুলকোতে থাকেন— 'তাহলে ও দুই-ই হয়! গ্রামেও থাক, শহরেও থাক।'
মা ঘাড় নাড়েন— 'তা কী করে হয়? ব্যাক টু ভিলেজ মানে হল তোমার পিঠ দাও গ্রামকে, অর্থাৎ কিনা গ্রামকেই তোমার পীঠস্থান কর। তার মানে, গ্রামেই পিঠ দিয়ে পড়ে থাক চিত হয়ে।'
মা-র বাক্যে বাবা উৎসাহ হয়— 'তবে তো গান্ধীজির ব্যাখ্যাই ঠিক তাহলে! হুম!' আমার বাবা নিদারুণ ভক্ত গান্ধীজির! 'গান্ধীর কথা তবে শুনতেই হবে তোকে। তা ছাড়া, এখন আমের সময়, পাড়াগাঁয়ে আম প্রচুর। কিনে খেতে হয় না, আমবাগানে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দাঁড়ালেই টুপটাপ পড়বে। হাতেই এসে পড়বে তোর। মাথাতেও পড়তে পারে। সেই যে রবিঠাকুরের কবিতায় আছে— 'সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে আম কুড়াবার ধুম'—
হাত ঝেড়ে মাথা নেড়ে সুর করে শুরু করেছিলেন বাবা। কিন্তু ধুমেই এসে দুম করে তাঁকে থামতে হয়। তার পর আর মনে পড়ে না কিছুতেই। না বাবার, না আমার। আর মা? কবিতার ধার দিয়েই ঘেঁষেন না মা। ও-জিনিস তাঁর দু-কর্ণের বিষ।
যাক, অবশেষে রাজিই হলাম। গান্ধীজির কথায় নয়, অনেকটা রবীন্দ্রনাথের আশ্বাসে।
আমের আশায় আমার মুকুন্দপুর আসা। এসেই দেখলাম পিসিরা খুব ভ্রাতষ্পুত্র বৎসল হয় বিশেষ করে পিসতুতো ভাই-বোন যদি না গজিয়ে থাকে। আমার আদরযত্নের আর অবধি থাকল না। মার কাছেও কখনো এত ভালোবাসা পাইনি। মনে মনেই আমি এক-একটা ব্যাকরণসংগত সূত্র রচনা করে নিই। মা? মা হচ্ছেন শুধুই মা, সীমার মধ্যে তিনি। কিন্তু পিসিমা? তাঁর পরিসীমা কোথায়?
হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম। বিদ্যুতের সঙ্গে মেয়েদের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ হয়তো আছে, কিংবা কিছু বৈদ্যুতিক অংশও তাঁদের মধ্যে থেকে পাওয়া অসম্ভব নয়— তা না হলে বিদ্যুৎচমক শুরু হলে মেয়েরাও কেন চমকাতে থাকে? আমার মাকেও চমকাতে দেখেছি। বিনিকেও দেখেছি। কিন্তু পিসিমার মতো কাউকে নয়। একটা ইঁদুরের সামনেও তিনি অকুতোভয়ে অটল থাকবেন হয়তো— কিন্তু বিদ্যুৎচমকালে? পিসিমা তক্ষুনি খান খান হয়ে ভেঙে পড়েছেন। একেবারে টুকরো টুকরো হয়ে— পিস বাই পিস।
সেই দুর্যোগের রাতের কথাটা চিরদিন আমার মনে থাকবে। ভাবলে কখনো হৃৎকম্প হয়। 'ক্যালামিটি কখনো একা আসে না, খুব খাঁটিই এ-কথা। সে রাত্রে তারিণীবাবুও বাড়ি নেই। (সম্পর্কে তিনিই আমার পিসেমশাই), পাশের গ্রামে গেছেন; জমিদারের ছেলের অন্নপ্রাশন, তারই আমন্ত্রণ রক্ষা করতে। রাত্রে ফিরবেন কি না কে জানে?
বাড়িতে কেবল পিসিমা আর আমি। কাজেই খাওয়া-দাওয়ার হাঙ্গামা চুকোতে বেশি দেরি হল না। রাত দশটার মধ্যেই সব খতম। দরজা, জানালা, ছিটকিনি সমস্ত ভালো করে বন্ধ করবার পিসিমার হুকুম হয়ে গেল। আপত্তির সুরে আমি বলি— 'দরজায় তো খিল এঁটেছি, কিন্তু যা গরম পিসিমা! জানালাগুলো বন্ধ করলে তো মারা পড়তে হবে।'
'গরমে লোকে মারা যায় না', পিসিমা বলেন, 'চোরের হাতেই মারা যায়, ডাকাতের হাতেই মারা যায়। জানালা খোলা রাখলে চোর-ডাকাত লাফিয়ে আসতে পারে তা জানিস? তার ওপরে উনি আবার বাড়ি নেই— সামলাবে কে শুনি?'
যেন উনি বাড়ি থাকলেই সামলাতে পারতেন! পিসে হতে পারেন কিন্তু চোর-ডাকাতকে ধরে পিষে ফেলবেন এতখানি ক্ষমতা ওঁর নেই! আমার মন্তব্য কিন্তু মনে মনেই আমি উচ্চারণ করি। ততক্ষণে পিসিমা কোনো জানালার একটা খড়খড়িরও ফাঁক রাখেন না।
অন্ধকারে দারুণ গুমোটের মধ্যে ছটফট করতে করতে কখন একটু তন্দ্রার মতো এসেছিল, এমন সময়ে ক্কড়-ক্কড়-ক্কড়—ক্কড়াৎ...
আচমকা জেগে উঠি হঠাৎ। তক্ষুনি ঘরের অন্য কোণ থেকে পিসিমার আর্তনাদ শোনা যায়। 'মন্টু! ও মন্টু!'
'পিসিমা! কী হল পিসিমা?'
'চৌকির তলায় সেঁধিয়ে যা। চটপট...দেরি করিস নে।'
আমি উঠে বসি। চৌকির তলায় সেধুঁব কেন? চোর-টোর লাফিয়ে এল নাকি? কিন্তু দোর-জানালা তো বন্ধ, ঘর তেমনি ঘুটঘুট্টি— আসবেই বা কী করে? খড়খড়ি ফাঁক করে তার ভেতর দিয়ে কী গলে আসতে পারে চোর? অন্ধকারের মধ্যে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ভাবতে থাকি।
'ঢুকেছিস?'
'না তো।'
'ঢুকিসনি এখনও? সর্বনাশ করলি তুই। ঢুকে পড় চট করে।'
'কেন, কী হয়েছে পিসিমা?'
'শোনো কথা! এখনও বলে কী হয়েছে! আকাশে বিদ্যুৎ হানছে যে! বাজ পড়ল শুনলি না?—' পিসিমা খেপে ওঠেন— 'এখন কি তর্ক করার সময়? বলছি না ঢুকে পড়তে—'
পিসিমার মুখের কথা মুখেই থেকে যায়। ক্কড়-ক্কড়—ক্কড়—ক্কড়াৎ—দুম-দুম! সঙ্গেসঙ্গে বিদ্যুতের ঝলক জানালার ফাঁকে ফাঁকে ঝলসে ওঠে।
'মরল ছেলেটা! আমাকেও বেঘোরে মারল!' তরঙ্গিনী পিসি তরঙ্গিত হতে থাকেন। চাপা কান্নার শব্দ আসে কানে।
কী করি? হুামাগুড়ি দিয়ে সেঁধোতে হয় চৌকির তলায়। 'ঢুকেছি পিসিমা।' — করুণ সুরে জানাই।
'ঢুকেছিস! আঃ! বাঁচালি! ঝড়-বৃষ্টি-বজ্রপাতের সময় কি বিছানায় থাকতে আছে? শুয়ে পড়িসনি তো চৌকির তলায়?'
'নাঃ। হামাগুড়ি দিয়ে আছি।'
'হামাগুড়ি দিয়ে? কী সর্বনাশ! বিদ্যুৎচমকানোর সময়ে কি কেউ হামাগুড়ি দেয়? হাত-পা গুটিয়ে আসনপিঁড়ি করে সোজা হয়ে বস।'

উদ্যমের সূত্রপাতেই কিন্তু সংঘর্ষ বাধে। 'কী করে বসব বল তো? চৌকি লাগছে যে মাথায়।'
'ভারি বিপদ করলে! এইসময়ে আবার চৌকি লাগছে মাথায়!'
পিসিমা চেঁচাতে থাকেন, 'এই কি মাথায় চৌকি লাগবার সময়? চৌকি মাথায় করে সোজা হয়ে বস।'
'উঁহু। মাথায় করা যায় না, বেজায় ভারী যে!' পিসিমাকে আমি বোঝাতে চেষ্টা করি, 'পিসেমশাই আর আমি দু-জনে হলে হয়তো পারা যেত।'
সত্যি, আমার একার পক্ষে অত বড়ো চৌকি মাথায় করা অসম্ভব— দস্তুর মতোই অসম্ভব। আর, কেবল মাথায় করা নয়, মাথায় করে বসে থাকা তার ওপর।
'কী করছিস, মন্টু—?' পিসিমা হাঁক পাড়েন।
'চৌকির তলাতেই আছি। হাত-পা গুটিয়ে বসেছি। তবে সোজা হয়ে নয়, ঘাড় হেঁট করে।'
'ঘাড় হেঁট করে? তবেই মারা গেলি! এইসময়ে মাথা সোজা করে রাখার নিয়ম যে! চৌকির তলাতেই থাকতে হবে, কিন্তু মাথা উঁচু করে থাকা চাই। তোকে নিয়ে যে কী করি বল তো? একে এই দুর্যোগ— চৌকি কাঁধে করার জন্যে এখন তোর পিসেমশাইকে আমি পাই কোথায়?'
অকস্মাৎ বিদ্যুতের চমকে পিসিমার বাক্য বাধা পায়। সঙ্গেসঙ্গে ভয়াবহ ক্কড়াক্কড় আওয়াজ আর পিসিমার যারপরনাই আর্তনাদ।

'হায় মা কালী! হায় মা দুর্গা! কী বিপদই না ডেকে আনছে ছোঁড়াটা, কী করি এখন, হায় মা—'
আমি মনে মনে বলি, 'হায় মা!' দাঁতে ঠোঁট কামড়াই। কী করি এখন? ওদিকে পিসিমার চিৎকার, এদিকে দশমণি চৌকি! ঐতিহাসিক ব্যক্তি নই যে অসাধ্যসাধন করতে পারব। গন্ধমাদন মাথায় করার মতন অসম্ভব কাজ কেবল ওরাই পারে। আমার কান্না আসে।
আবার বিদ্যুতের ঝলকানি আর বজ্রপাতের শব্দ।
'দেখলি, দেখলি তো? তোর ঘাড় হেঁট করে থাকায় কী সর্বনাশটা হচ্ছে! নিজেও মরবি—আমাকেও মারবি তুই—' পুনরায় পিসিমার ফোঁসফোঁসানি শুরু হয়ে যায়। আমি চুপ করে থাকি।
'উঠোনে ঘটিবাটি পড়ে নেই তো রে? তাহলেই অক্কা পেয়েছি। পেতল কাঁসার বাসনে ভারি বিদ্যুৎ টানে—'
'গিয়ে দেখে আসব পিসিমা?'
এই তটস্থ দুরবস্থা থেকে যেকোনো পথে পরিত্রাণের সুযোগ পেতে চাই।
পিসিমা কিন্তু ঝাঁকিয়ে ওঠেন, 'বাইরে যাবি তুই? এই বিপদের মুখে? কী আক্কেল তোর বল দেখি তো? তোর চেয়ে ঘটিবাটির দামটাই বেশি হল আমার?' একটু থেমে আবার সেই প্রশ্নাঘাত, 'ঘাড় সোজা করলি? করেছিস?'
চৌকির তলায় থাকা এবং মাথা উঁচু করে থাকা যখন একযোগে সম্ভব নয়, তখন অগত্যা ওর আওতা বর্জন করে বেরিয়ে আসি। এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচি, এবং মাথা উঁচু করে। উঃ, ঘাড়টা কী টনটনই না করছে! দারুণ গরমে চৌকির তলায় প্রাণ একেবারে গলায় গলায় এসে গেছল।
'ঘাড় উঁচু করেই আছি এখন পিসিমা।' —অকপটে বলি।
'আহা, বাঁচিয়েছিস।' পিসিমার স্বস্তির নিশ্বাস পড়ে। 'লক্ষ্মী ছেলে, সোনা ছেলে, জাদু ছেলে! যা বলি শোন। আজকের ভয়ানক রাতটা কেটে যাক, মা দুর্গা করুন, কাল সক্কালেই তোকে পিঠে করে খাওয়াব। এ কী, কী করছিস আবার?—'
'দেশলাই জ্বালছি পিসিমা, লন্ঠন ধরাব। যা অন্ধকার—'
'কী সর্বনাশ! এই সময়ে কেউ আলো জ্বালে?' পিসিমা শশব্যস্ত হয়ে ওঠেন— 'আলোয় যে রকম বিদ্যুৎ টেনে আনে এমন আর কিছুতে নয়। নিভিয়ে ফেল—এক্ষুনি। এই দণ্ডে। [কড়—কড়—কড়াত—বাম বাম] দেখলি তো, কী করলি তুই!'
'আমি করলাম? ও তো আপনি হচ্ছে। দেশলায়ে বিদ্যুৎ টেনে আনে কিনা তা তুমিই জান, কিন্তু সৃষ্টি করতে পারে না তো?' আমি একটু বিরক্ত হয়েই বলি।
'এই কি বক্তৃতা করবার সময়? তুই কি মরতে চাস? আমাকেও মারতে চাস সেইসঙ্গে।'
আমি চুপ করে থাকি। কী বলব?
'সেই সপ্তবজ্র নিবারণের মন্ত্রটা তোর মনে আছে? চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে থাক। বজ্রাঘাত থেকে বাঁচতে হলে— ওঃ, কী বিচ্ছিরি রাত। কালকের সকাল দেখতে পাব কি না মা কালীই জানেন! কই, পড়ছিস না মন্তর?'
'জানিই না তো পড়ব কী?'
'কী মুখ্যু ছেলেটা! এও জানিস না? ইস্কুলে কী ছাই শেখায় তোদের? অশ্বত্থামা ব্যাস হনুমন্ত বিভীষণ। কৃপাচার্য দ্রোণাচার্য সপ্তবজ্র নিবারণ।। ঘন ঘন আওড়া।'
আওড়াতে থাকি। কী আর করব?
শ্লোকপাঠের মধ্যিখানে আর এক দুর্ঘটনা। পিসিমার পোষা বেড়ালটা কখন আমার পায়ের তলায় এসে হাজির হয়েছে। বেড়ালে আমার ভারি আতঙ্ক। লাফিয়ে উঠি আমি। বেড়ালের হাত থেকে বাঁচবার চেষ্টায় বেড়ালের গায়েই পা চাপিয়ে দিই।
'ম্যাও—' মন্টুর পা চাপা পড়ে বেড়ালটাও ত্রাহি ত্রাহি করে। 'মিউ—মিয়াও!'

'ধুত্তোর!' অন্ধকারে যে ধারে পা বাড়াই সেখানেই বেড়াল। ও যেন একাই এক-শো। সর্বদা পায়ের সঙ্গে লেপটে আছে। পদে পদে এ-রকম বেড়ালের উৎপাতের চেয়ে বজ্রপাতও আমি সহনীয় জ্ঞান করি।
'মন্টু!' পিসিমার শাসনের কণ্ঠ শোনা যায়, 'এই কি আমোদের সময়? আবার বেড়াল ডাকা হচ্ছে?'
'আমি ডাকিনি পিসিমা।'
'তবে কে ডাকতে গেল শুনি? তোমার পিসেমশাই? এমন মিথ্যেবাদী হয়েছ তুমি? ছি! লিখে দেব দাদাকে চিঠিতে যে, তোমার ছেলে যতই বড়ো হচ্ছে ততই—'
'সত্যি বলছি পিসিমা, আমি ডাকিনি। আমি কেন ডাকব? বেড়াল—'
আমার কথা শেষ হতে পায় না— 'বল কে বেড়াল ডাকল তবে? কার এত শখ হয়েছে? ভূতে ডাকতে গেল নাকি?' পিসিমার কণ্ঠস্বর কঠোর হয়।
'না। বেড়াল নিজেই।'
'অ্যাঁ?' আবার পিসিমার আর্তনাদ। তিনি যে বেশ বিচলিত হয়েছেন, অন্ধকারের মধ্যেই আমি তা টের পাই। 'বেড়াল! তবেই সেরেছে! আমাদের আর রক্ষা নেই আজ তাহলে! বেড়াল ভারি বিদ্যুৎবাহী! বেড়ালের রোঁয়ায় রোঁয়ায় বিদ্যুৎ— বইয়েতেই লিখে দিয়েছে। কী সর্বনাশ! হে মা কালী! হে মা দুর্গা! হে বাবা অশ্বত্থামা, হে বাবা বলি, ব্যাস—'
'বাবা নয়, বাবারা' —আমি ওঁকে সংশোধন করে দিই— 'বহুবচন বলছ যে পিসিমা!'
'এইসময়ে আবার ইয়ার্কি?' পিসিমা ধমক দেন, 'হে বাবা হনুমন্ত, হে বাবা বিভীষণ, হে বাবা জাম্বুবান! ছোঁড়াটাকে বাঁচাও। অবোধ ছেলের অপরাধ নিয়ো না বাবা! [কড়—কড়—কড়াত—বমবম—বমাৎ ! পিসিমা যান খেপে] এখন বুঝি ধরে রয়েছিস বেড়ালটাকে? ছুঁড়ে ফেলে দে— ছুঁড়ে ফেল— এই দণ্ডে।'
ছুঁড়ে ফেলা শক্তই হয়, কেন-না বেড়ালটা ধারণ করিনি তো! কিন্তু পিসিমার আদেশ রাখতেই হবে— যে করেই হোক। অন্ধকারেই আন্দাজ করে বেড়ালের উদ্দেশে এক শুট ঝাড়ি। শুট লাগবি তো লাগ লাগে গিয়ে এক তেপায়া টেবিলে; তাতে ছিল পিসেমশায়ের ঔষধপত্রের শিশি [যত রাজ্যের শৌখিন ব্যারাম সব পিশেমশায়ের একচেটে ] —সেই এক ধাক্কাতেই টেবিল চিতপাত আর শিশি-বোতল সব চুরমার।
পিসিমা গোঁ গোঁ করতে থাকেন; অজ্ঞান হয়ে গেলেন কিনা এই ঘুটঘুট্টির মধ্যে তো বোঝবার জো নেই! কিন্তু যখন জানেন ঘরের মধ্যে বজ্রপাত হয়নি, নিতান্তই টেবিলপাত— তখন তাঁর গোঙানি থামে, সামলে ওঠেন আপনিই।
'যাক, ভগবান খুব বাঁচিয়েছেন এবার! ওটাকে ঝেড়ে ফেলেছিস তো? বেশ করেছিস। [অন্য সময় হলে তাঁর আদরের মেনির গায়ে কাউকে হাত ঠেকাতেও দেন না, কিন্তু এখন বিদ্যুতের সামনে, বেড়ালের ওপরেও পিসিমার আর চিত্তির নেই]। তুই এক কাজ কর মন্টু, ওই তেপায়াটার ওপর খাড়া হ। কাঠের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ চলাচল করে না তো। চেয়ার কিংবা টেবিলের ওপরে দাঁড়ানোই এখন সবচেয়ে নিরাপদ— বুঝলি? দাঁড়িয়েছিস?'
'উঁহুঁ—'
[ফ্যাশ কড়-কড়াৎ—ববম বম—বম বম!]
'কী দস্যি ছেলে রে বাবা! দাঁড়াসনি এখনও? তুই কি আমাকে পাগল করে দিবি নাকি? হে মা দুর্গা— হে মা—'
'দাঁড়িয়েছি পিসিমা!'
[বিদ্যুতের ঝলক—দুমদাম দমাদ্দম—কড়—কড়—কড়াৎ!]

'এমন দুর্যোগের রাত কাটলে হয়! দোহাই মা দুর্গা! তোর পিসেমশাই ফিরে এসে আমাদের জ্যান্ত দেখবে কিনা কে জানে! পরের ছেলেকে টেনে এনে কী বিপদেই পড়লুম যে! দাদাকে আমি কৈফিয়ত দেব কী!'
আমি সন্তর্পণে আর সসংকোচে ক্ষীণপায়া তেপায়ার ওপর সসেমিরা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি! নীরবে পিসিমার কাতরোক্তি শুনি।
'মন্টু, ভূমিকম্পের সময় কী করে রে? শাঁখ ঘণ্টা বাজায় না? ওতেই ভূমিকম্প থেমে যায়— নয় কি? ঝড়-বৃষ্টি কি ভূমিকম্পের চেয়ে কিছু কম মারাত্মক? আয়, আমরা শাঁখ ঘণ্টা বাজাই— তাহলে ঝড়-বৃষ্টি থামবে। বজ্রপাতও বন্ধ হবে। শাঁখ এই কুলুঙ্গিতেই আছে, আমি নিচ্ছি। ওধারের তাক থেকে ঘণ্টাটা তুই পেড়ে আন। অন্ধকারে পারবি তো?'

অন্ধকারেই আমি ঘাড় নাড়ি।
'এনেছিস? বড্ড দেরি করিস তুই। বাঁচতে আর দিলি না আমাদের।'
তাকের এবং শাঁখের অন্বেষণে তিনটে চেয়ার ওলটাই, গোটাকতক গেলাস ফেলি, জলের কুঁজোকে নিপাত করি। তারপর মনে পড়ে শাঁখ আনার দায় আমার নয়, পিসিমার। আমার এক্তিয়ারে হচ্ছে ঘণ্টা। ঘণ্টাটাকে হাতিয়ে বলি, 'এনেছি পিসিমা।'
'বেশ, এবার ওই তেপায়াটার ওপর দাঁড়া। খুব জোরে পেট— আকাশে যেন দেবতারা শুনতে পান। আমি শাঁখ বাজাচ্ছি।'
পিসিমা শাঁখ বাজান, আর আমি ঘণ্টা পিটি। পিসিমা কষে বাজান, আমি প্রাণপণে পিটি। কানের সমস্ত পোকা বেরিয়ে আসে আমার।
হঠাৎ জানালাটা খুলে যায়, একটা ছায়ামূর্তি যেন ঘরের মধ্যে লাফিয়ে পড়ে। চোর নাকি? পিসিমা ভয়ে কাঠ হয়ে যান। আমিও ঘণ্টাবাদ্য থামাই।
'ডাকাত পড়েছে নাকি?'— ছায়ামূর্তি বলে— 'তোরা কী লাগিয়েছিস বল তো? মন্টে? এ সব কী কাণ্ড রে তোদের?'
'বিদ্যুৎ তাড়াচ্ছি পিসেমশাই!' কাতর কণ্ঠে জানাই।
'বিদ্যুৎ! আকাশে মেঘের চিহ্নমাত্র নেই, বিনা মেঘের বিদ্যুৎ? এমন খাসা চাঁদনি রাত— আর তোদের কাছে বজ্রপাত? বাইরে চেয়ে দেখ দেখি!'
তাই তো! বাইরে তাকিয়ে দেখি পরিষ্কার ধবধবে জ্যোৎস্না। আমি ও পিসিমা দু-জনেই দেখি। পিসিমা বলেন— 'তাহলে এতক্ষণ এই দুমদাম, বজ্রপাতের শব্দ— বিদ্যুতের ঝলকানি— এসব কিছুই না?'
'ও, ওই আওয়াজ?' পিসেমশায়ের অট্টহাস্য আরম্ভ হয়— 'জমিদারের ছেলের অন্নপ্রাশন কিনা। যত রাজ্যের বাজির অর্ডার দিয়েছিলেন। কলকাতার থেকে রাত এগারোটার ট্রেনে পৌঁছল সেসব— বোমা, পটকা, তুবড়ি, উড়ন-তুবড়ি, হাউই— আরও কত কী। ভোজের পর এতক্ষণ তো বাজি পোড়ানোই হচ্ছিল— তারই ঝলক দেখেছ, তারই আওয়াজ শুনেছ তোমরা।'
পিসেমশাইয়ের হাসি আর থামতে চায় না।
আমি হাসব না কাঁদব ভেবে পাই না। ভোজও চেখে দেখলাম না, বাজিও চোখে দেখতে পেলাম না। মাঝখান থেকে ঘরের ভেতর যেন এক ভোজবাজি হয়ে গেল!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন