শিবরাম চক্রবর্তী
'নাঃ, বিজ্ঞাপনে কাজ হয় সত্যিই!'
হর্ষবর্ধন এসে ধপ করে বসলেন আমার ডেকচেয়ারে। হাঁফ ছেড়ে বললেন কথাটা।
'হ্যাঁ, কথাটা আপনার যেমন বিজ্ঞাপনসম্মত তেমনি বিজ্ঞানসম্মতও বটে।' বিজ্ঞজনের মতোই তাঁর কথায় আমার সায়।
'সেদিন আপনাকে দিয়ে আনন্দবাজারে বার করার জন্যে সেই বিজ্ঞাপনটা লিখিয়ে নিয়ে গেলুম না?...'
'হ্যাঁ, মনে আছে আমার!' আমি বললাম 'রাতের পাহারাদারের জন্যে লোক চাই— সেই তো?'
'আমাদের কাঠের কারখানায় রোজের বিক্রির বহুত টাকা পড়ে থাকে ক্যাশবাক্সে, বাড়ি নিয়ে আসা সম্ভব হয় না, পরদিন সে টাকা সোজা গিয়ে জমা পড়ে ব্যাঙ্কে— সেই কারণে, রাত্রে টাকাটা আগলাবার জন্যেই কারখানায় থাকবার এক জন সুদক্ষ লোক চেয়েছিলাম আমরা।...'
'রাতের চারপ্রহর পাহারা দেবার জন্য সুদক্ষ এক প্রহরী। বেশ মনে আছে আমার।' আমি বলি 'আমিই তো লিখে দিলাম কপিটা। তা, কিছু ফল পেয়েছেন বিজ্ঞাপনটা দিয়ে?'
'পেয়েছি বইকী ফল। বলতে কী, সেই কথাটা জানাতেই তো আপনার কাছে ছুটে আসা।'
'ফল বলতে!' গোবরাও এসেছিল দাদার সঙ্গে 'রীতিমতন প্রতিফল পাওয়া গেছে বলা যায়।'
'ক-টা সাড়া এল?' আমি শুধাই।
'আপাতত একটাই।' ওর দাদা বলেন 'ক্রমশ আরও সাড়া পাব আশা করছি। আপাতত এই একটাই।'
'ওই একটাতেই সাড়া পড়ে গেছে।' সাড়া পাওয়া যায় গোবরারও! 'সাড়া পড়ে গেছে সারা চেতলায়।' সে জানায়।
'দু-ইঞ্চি বিজ্ঞাপনের দরুন দু-শো টাকা। তা নিক তাতে দুঃখ নেই। সেই দু-ইঞ্চিরই বা দাম দেয় কে?'

'দু-শো টাকার বিজ্ঞাপন দিলে অন্তত তার দু-শো গুণ লাভ তো হয়ই কারবারে— তা নইলে লোকে দেয় কেন?'
'এখানেও বেশ লাভ হয়েছে লোকটার। দু-শো গুণেরও ঢের বেশি।'
'প্রায় ছয়-শো গুণ— তাই না দাদা?' হিসেব করে বলে ভাইটি 'ষাট হাজার টাকার মতোই ছিল না বাক্সটায়?'
'প্রায় আশি হাজারের কাছাকাছি। বিলকুল ফাঁক!'
'আশি হাজার টাকা হলে কত হয়?' গোবরা আঙুল দিয়ে আকাশের গায় পারসেন্টেজের আঁক কষতে লাগে।
আমার সামান্য বুদ্ধির আঁকশি দিয়ে ওদের হিসেবের নাগাল পাই না— 'বিলকুল ফাঁক! তার মানে?' শুধোই দাদাকে।
'মানে কাল সকালের কাগজে বিজ্ঞাপনটা বেরুল না আমাদের? আর কাল রাত্তিরেই কারখানায় সিঁধ কেটে চোর ঢুকে সমস্ত টাকা নিয়ে সরে পড়েছে। আজ ক্যাশবাক্স ভাঙা।'
'অ্যাঁ?' আঁতকে উঠি আমি 'তা, খবর দিয়েছেন পুলিশে?'
'পুলিশে খবর দিয়ে কী হবে? আমাদেরই পাকড়ে নিয়ে যাবে থানায়। এইসা টানা-হ্যাঁচড়া লাগাবে যে বাপ বাপ ডাক ছাড়তে হবে। এখন নিজেদের কারবার দেখব না থানা-পুলিশ করব?' বলেন হর্ষবর্ধন 'আর চোর যা ধরবে ওরা তা আমার জানা আছে বিলক্ষণ!'
'আমি ধরতে পারি চোর।' বলল গোবরা 'তা দাদা আমায় ধরতেই দিচ্ছে না।'
'হ্যাঁ বললেই হল চোর ধরব। ওদের কাছে ছোরা ছুরি থাকে না? ধরতে গেলেই ছুরি বসিয়ে দেবে ঘ্যাচাং করে! ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে দেবে এককথায়। ওর মতন নাবালক একটা ছোঁড়াকে আমি ছুরির মুখে ঠেলে দেব— আপনি বলছেন?'
'কী করে বলি!' বলতে হয় আমায় 'ওসব ছোরাছুরির ব্যাপারে আমাদের বয়স্কদের না থাকাই ভালো।'
'আমি কিন্তু অক্লেশে ধরে দিতাম। কোনো ছোরাছুরির মধ্যে না গিয়েও— স্রেফ গোয়েন্দাগিরি করেই।'
'কী করে ধরতিস?'
'ওই মাটি ধরেই।'
'ও! মাটিতে বুঝি পায়ের ছাপ পড়েছে চোরের?' আমি কৌতূহলী হই 'কারখানার মাটিতে পায়ের দাগ রেখে গেছে চোররা? কবরখানা খুঁড়ে গেছে নিজের?'
'দাগ না ছাই!' মুখ বিকৃত করেন হর্ষবর্ধন 'সিগারেটের ছাইও ফেলে যায়নি একটুকু। কী নিয়ে গোয়েন্দাগিরি করবি শুনি?'
'কারখানার মাটি নয়, সেই মাটি। বলে না যে— যে-মাটিতে পড়ে লোক ওঠে তাই ধরে? সেই মাটি ধরেই আমি চোর ধরব।' ফাঁস করে গোবরা। 'বিজ্ঞাপনটা দিয়ে মাটি হয়েছে তো! ওই মাটি দিয়েই আমার কাজ হাসিল করব আমি।' হাসিখুশি হয়ে সে জানায়।
ওর রহস্যের আমি থই পাই না। এমনকী ওর দাদাও থ হয়ে থাকেন।
'হ্যাঁ চোর ধরবে গোবর!' বলে তিনি উসকে উঠলেন একটু পরেই 'তাহলে...তাহলে তখন ধরল না কেন? এর আগেও তো জিনিস চুরি গেছল আমাদের।'
'এর আগেও গেছে আবার?'
'হ্যাঁ আমিই তো চুরি গেছলাম।' হর্ষবর্ধন ব্যক্ত করেন।
'তোমার জিনিস নাকি?' প্রতিবাদ করে গোবরা 'বউদির জিনিস না তুমি? তুমি কী তোমার নিজের জিনিস— নিজস্ব?'
'ওই হল।' বলে ফোঁস করলেন দাদা 'কেন তুইও কি চুরি যাসনি আমার সঙ্গে? তুই তো আমার জিনিস। আমি তোর অভিভাবক না? তখন চোর ধরতে কী হয়েছিল তোর?'
'তারপর? চোরের হাত থেকে উদ্ধার পেলেন কী করে?' আমি জিজ্ঞেস করি।
'যেমন করে পায় মানুষ' তিনি জানান 'চুরির ধন বাটপাড়িতে যায় শোনেননি? তারপর চোরের হাত থেকে বাটপাড়ের হাতে গিয়ে পড়লাম আমরা।'
'বটে বটে?' আমার সকৌতুক কৌতূহল 'তা শেষমেষ উদ্ধার পেলেন তো?'
'পেতেই হবে উদ্ধার শেষপর্যন্ত। গোয়েন্দাকাহিনির দস্তুর। তা উদ্ধার করল কেটা?'
'ডাকাত এসে পড়ল শেষটায়। ডাকাত আসতে দেখেই না বাটপাড় ব্যাটা ভোঁ-দৌড়!'
'ডাকাত এসে পড়ল আবার তার ওপর?'
'হ্যাঁ, ওর বউদি বাপের বাড়ি থেকে ফিরে যেই না দোরগোড়ায় এসে হাঁক ডাক শুরু করেছে, তাই না শুনে নীচে উঁকি মেরে দেখেই না, সেই বাটপাড়টা সঙ্গেসঙ্গে উধাও! খিড়কির দোর দিয়ে সটাং!...বউ না তো ডাকাত!'
'আমার ডাকসাইটে বউদির নামে যা-তা বলো না, বলে দিচ্ছি।' গোসা হয় গোবর্ধনের।
'ওই হল! তোর কাছে যা ডাকসাইটে আমার কাছে তাই ডাকাত-সাইটে।'
'যেতে দিন।' পারিবারিক কলহের মাঝখানে পড়ে আমি মিটিয়ে দিই 'আপনাদের চুরি যাওয়ার কাহিনিটা বলবেন তো আমায়। সেবারকার আপনাদের যুদ্ধে যাওয়ার গল্পটা বলেছিলেন, তাই লিখে দু-পয়সা পিটেছিলাম, এবারও এটার থেকে...'
'বলব আপনাকে এক সময়। কারখানার জন্য এখন একটা লোহার সিন্দুক কিনতে যাচ্ছি। চোর বাবাজি আবার ঘুরে এলেও সেটা ভাঙা আর সহজ হবে না তার পক্ষে এবার।'
পরদিন সকালে শ্রীমান গোবর্ধন এসে হাজির। 'দেখুন এই বিজ্ঞাপনটা দিতে যাচ্ছি আজ আনন্দবাজারে, দেখুন তো ঠিক হয়েছে কি না?'
গোবর্ধন তার কালজয়ী সাহিত্যকীর্তিটি আমার হাতে দেয়।
বিজ্ঞাপনের কপিটিতে ওদের চেতলার বাসার ঠিকানা দিয়ে লেখা আছে দেখলাম— 'প্রাইভেট ডিটেকটিভ আবশ্যক। আমাদের বাড়ির একটি ঘরে বহুমূল্য তৈজসপত্র রক্ষিত আছে, সেই ঘরের গা-লাগাও একটা জলের পাইপ উঠে গেছে সোজা উপরে— সেই নল বেয়ে কেউ যাতে না উঠতে পারে সেই দিকে সারা রাত্রি নজর রাখার জন্য বিচক্ষণ এক গোয়েন্দার প্রয়োজন। উপযুক্ত পারিশ্রমিক।'
'বুঝেছি। জলে যেমন জল বাধে' ঘাড় নাড়লাম, 'তেমনি বিজ্ঞাপনটা দিয়ে ওইরকম আরেকটা কাণ্ড বাধাবে তুমি দেখছি। চোরটা যেই পাইপ বেয়ে উঠবে আর তোমার ওই ডিটেকটিভ গিয়ে হাতেনাতে পাকড়াবে তাকে। এই তো?'
'সে আপনি বুঝবেন না। সেসব আপনার মাথায় খ্যালে না।' বলে চলে গেল গোবরা।
দিন কয়েক বাদে একটা লোক এসে ডাকছে আমায়— 'আসুন আসুন। চটপট চলে আসুন আমার সঙ্গে।'
অপরিচিত আহ্বানে আমি থতমত খাই— 'আপনি...আপনাকে তো আমি...।'
'চিনতে পারছেন না আমাকে? ছদ্মবেশে রয়েছি কিনা' বলে লোকটা তার গোঁফদাড়ি খুলে ফ্যালে।
'ওমা! গোবরা ভায়া যে! এমন অদ্ভুত বেশ কেন হে? —এর মানে?'
'চোর ধরতে যাচ্ছি না? ডিটেকটিভকে ছদ্মবেশে ঘোরাফেরা করতে হয় না তো? আপনার জন্যেও একজোড়া দাড়িগোঁফ এনেছি, পরে নিন চট করে...'
'আমি, আমি পরব কেন?'
'আপনাকেও ছদ্মবেশ ধারণ করতে হবে না? আপনি আমার শাগরেদ তো এ-যাত্রায়। ব্লেকের যেমন স্মিথ, বিমলের যেমন কুমার। তেমনি আমার সহযোগী গোয়েন্দা যখন-তখন আপনাকেও তো...'
'তুমি পরলেই হবে। আমাকে আর পরতে হবে না ছদ্মবেশ।' বললাম আমি 'দাড়িওয়ালা লোকের ছায়া আমি মাড়াই নে, জানে সবাই। তোমার সঙ্গে ঘুরলে কেউ আর আমায় আমি বলে সন্দেহ করবে না।'
'তাহলে চলে আসুন চটপট। এই ফাঁকে চেতলার বাজারটা ঘুরে আসি একবার।' বলল সে 'দাদাও আবার বাজার করতে বেরিয়েছেন কিনা এখন। পাছে আমায় চিনতে পারেন, আমার ছদ্মবেশ ধারণের সেও একটা কারণ বটে— বুঝলেন?'
'বুঝেছি।' বলে বেরুলাম ওর সঙ্গে। বাজারের মুদিখানাগুলোর পাশ দিয়ে যাবার সময় হঠাৎ একটা লোককে জাপটে ধরে চেঁচিয়ে উঠেছে গোবরা— 'ধরেছি— ধরেছি চোর। পাকড়েছি ব্যাটাকে। একটা পাহারোলা ডেকে আনুন তো এইবার।'
কোনোই দোষ করেনি লোকটা। মুদির সঙ্গে তেজপাতার দর কষাকষি করছিল কেবল, এমন সময় গোবরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার ঘাড়ে। এমন খারাপ লাগল আমার!

লোকটা বাবারে মারে বলে হাঁক পাড়তে লাগল। আর গোবরাও দাদাগো! বউদিগো! বলে চেঁচাতে থাকে।
কাছেই কোথাও বুঝি বাজার করছিলেন দাদা। ভায়ের হাঁক-ডাকে এসে হাজির— 'কী হয়েছে রে? এমন ষাঁড়ের মতন চিল্লাচ্ছিস কেন?'
'পাকড়েছি তোমার চোরকে— এই নাও। ধর।'
লোকটা তখন হর্ষবর্ধনের পা জড়িয়ে ধরে— 'দোহাই বাবু! আমাকে পুলিশে দেবেন না। দোহাই! সেদিন আমি দু-বচ্ছর খেটে বেরিয়েছি এবার জেলে গেলে ছ-বচ্ছরের জন্য ঠেলে দেবে জেলে।
'বেশ, দেব না পুলিশে। বের করে দাও আমাদের মালপত্তর।' গোবরার তম্বি।

'সব বার করে দেব বাবু— চলুন!' সকৃতজ্ঞ লোকটা আমাদের সঙ্গে নিয়ে তার বস্তির কুঠুরিতে যায়। বের করে দেয় হর্ষবর্ধনের আশি হাজার টাকার নোটের বান্ডিল।
'আর আমার তৈজসপত্র? সেসব গেল কোথায়?'
গোবরার রোয়াব।
'ওই যে ওই কোণায় ধরা রয়েছে বাবু! নিয়ে যান দয়া করে।'
ঘরের কোণে দুটো বস্তা পাশাপাশি খাড়া করা দেখলাম। এগিয়ে গিয়ে উঁকি মেরে দেখি... 'ওমা! একী!...খালি তেজপাতা দেখছি যে...এই কী তোমার...'

'তৈজসপত্র।' জানায় গোবর্ধন। 'তেজপাতাকে সাধু ভাষায় কী বলে তাহলে? তৈজসপত্র বলে না? লেখক মানুষ হয়ে আপনি বাংলাও জানেন না ছাই?'
অবাক করল গোবর্ধন! কী বলে ও? বাঙালি লেখক হতে হলে আবার বাংলা ভাষা জানতে হয় নাকি? আশ্চর্য!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন