শিবরাম চক্রবর্তী
আমার নশ্বর জীবনের ওপর দিয়ে অনেক ঝড়ঝাপটা গেছে, তার মধ্যে অশ্বত্থামা হচ্ছে এক নম্বর। ঝড়ঝাপটা যেমন থামানো যায় না তেমনি অশ্বত্থামাকেও কায়দায় আনা শক্ত। আবার, ঝড়ঝাপটা শেষপর্যন্ত আপনার থেকেই থেমে গেলেও অশ্বত্থামা কিন্তু কিছুতেই সহজে থামবার নয়।
ওকে বন্ধুরূপে লাভ করা আমার জীবনের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। কিন্তু যতই আমি ওকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি, ততই যেন সে আমার চারধার থেকে তেড়ে ঘন হয়ে আসে। পদ্মার বুকে মেঘমল্লারের ন্যায় অকস্মাৎ ঘনীভূত হবার ওর আশ্চর্য ক্ষমতা।
সেদিন আপন মনে চলেছি। হঠাৎ যেন সে মাটি ফুঁড়ে গজিয়ে উঠল সামনে। 'এই যে হে!'
'বলি যাওয়া হচ্ছে কোথায়?' বলে আমি ওর পাশ কাটিয়ে যেতে চাই।
'দাঁড়াও, তোমাকে অবাক করে দিচ্ছি।' ও বলল। আমিও ঠিক এই ভয়টিই করছিলাম! 'কী কান নাচাতে শিখেছ বুঝি— কানের নাচ দেখাবে, এই তো?' আমি বললাম।
'কান? কান কেন?' ও অবাক হয়ে যায়, 'কানের আবার নাচানাচি কি? না কান নয়, কানের কোনো কথাই নয়।'
'কানের কোনো এগজিবিশন নয় তো? ঠিক বলছ? তাহলে বল শুনি।'
আমি কান খাড়া করলাম একটু আশ্বস্ত হয়েই। বলতে কী! সেদিন একটা ছেলের আধ ঘণ্টা ধরে কান নাড়া দেখে— তার মতে কানের সার্কাস— আমার মাথা ধরে গেছল। এক কানের দোকানে দু-বার যেতে আমার ভালো লাগে না। উৎসাহ পাই না মোটেই।
'আমি মৌমাছির চাষ করছি!' অশ্বত্থামা বলল। বেশ গুরুগম্ভীর সুরে।
ওর কথায় ধাক্কা খেলাম।
'অর্থাৎ, এবার বুঝি তোমার মৌমাছি কাণ্ড?' সামলে নিয়ে আমি বলি।
'কাণ্ড নয় কারখানা।' অশ্বত্থামা শুধরে দেয় 'মৌমাছির কারখানা। তাহলে আর বললাম কী তোমায়?' এই বলে সে উপরন্তু আরও বলে 'অনেকগুলো মৌমাছির কাণ্ড এক হলে মৌচাক ইত্যাদি হয়ে প্রকাণ্ড একটা কারখানা হয়। বুঝলে?' সে আমাকে বিশদ করে দেয়।
'বুঝলাম।' আমি মাথা নাড়ি 'কিন্তু দুনিয়ায় এত রকমারি থাকতে মৌমাছির কারখানা কেন আবার?'
'বঁড়শিকে চেনো? চমৎকার ছেলে। তার বাবার আছে মৌমাছির কারখানা। অনেকগুলো গাছে তাদের চাষ-আবাদ, তারই একটা গাছ—'
'তোমাকে গছিয়ে দিতে চায়?'
'হ্যাঁ, বেচারার কিছু টাকার দরকার পড়েছে। বাবা বলেছে, যা মৌচাক বেচে নে গে। আর আমিও ভাবছিলাম কী করি কী করি! কাজ-কারবার করাটা কি মন্দ কিছু?'
'না, না, মন্দ কী!'
'চলেছি। বঁড়শির কারখানায়। তুমিও এসো না আমার সঙ্গে। মৌচাকগুলো কেমন দেখবে। দেখলে বুঝতে পারবে— তুমি তো একজন সমঝদার লোক।'
সমঝদার কি না জানি না, তবে মৌচাকের সঙ্গে আমারও একটু সম্পর্ক ছিল বটে! মাঝে মাঝে তাতে লিখে থাকি। কাজেই কৃতজ্ঞতা সূত্রে যাওয়াটা দরকার বোধ করলাম।
শহরের বাইরে কারখানাটা। কারখানা মানে বাগান। বাগানের কাছাকাছি বঁড়শিকে পাওয়া গেল। গুলতি দিয়ে পাখি মারার তালে ঘুরছিল। অশ্বত্থামা বলল, 'এসো তোমাদের আলাপ করিয়ে দিই। এই হচ্ছে—'
'আমি বঁড়শি।' বাধা দিয়ে ছেলেটি নিজের থেকেই বলে।
'আমি জানি।'
'মৌচাক দেখবেন, না কি আগে মধু দেখবেন?' বঁড়শি জানতে চায়।
'মধু? মধু কে? তোমার কোনো বন্ধু বুঝি?' বলে অশ্বত্থামা আমার দিকে তাকাল 'তা দেখতে শুনতে যদি মন্দ না হয় আপত্তি কি?'
'সে মধু নয়। সেই মধু যা নাকি মৌমাছিরা দিয়ে থাকে।' বঁড়শি জানায়।
'অ্যাঁ, মধু কি মৌমাছিরা দেয়। তাই নাকি?' অশ্বত্থামা অবাক হয়ে যায়,
'জানতাম না তো। আমার ধারণা ছিল, মৌমাছির থেকে মৌচাক, আর মৌচাকের থেকে আমরা মোম পেয়ে থাকি। আর সেই মোমের থেকে মোমবাতি হয়। আর তাই থেকে মৌমাছির কারখানার লাভ। এই আমি জানতাম।'

'হ্যাঁ, সে লাভ তো আছেই। মধু হচ্ছে তা ছাড়াও একটা বাড়তি জিনিস। আর খুব খারাপ জিনিস নয়।' বঁড়শি একটু কিন্তু কিন্তু হয়ে মৌমাছিদের পক্ষে সাফাই গাইতে চেষ্টা করে। 'সেটাকে উপরি লাভ বলে ধরতে পারেন।'
'খারাপ? খারাপ কে বল্লে? মধু হচ্ছে খাবার জিনিস! মোমের সঙ্গে মধুও পাওয়া যাবে, তুমি বল কী হে?' অশ্বত্থামা এবারে উল্লসিত হয়ে উঠল 'এই নাও তোমার টাকা। কারখানার দাম। চলো আগে তোমার মৌচাক দেখি। তারপর মধু দেখব। মধু তো চোখে দেখে তৃপ্ত হবার বস্তু নয়, চেখে দেখবার জিনিস।' বঁড়শির সাথে সাথে অশ্বত্থামা মৌচাকের দিকে এগুতে লাগল। আমিও সঙ্গে রইলাম। কিন্তু সত্যি বলতে কী, প্রতি পদক্ষেপেই মনে হচ্ছিল কাজটা খুব হঠকারিতা হচ্ছে। যতই মধু থাক, মৌচাকের ত্রিসীমানায় থাকা আমার বিবেচনায় কোনোমতেই বাঞ্ছনীয় নয়।
'ওঃ এই বুঝি তোমার মৌচাক? একেই বলে মৌমাছির কারখানা? এর মধ্যেই বুঝি মোম হয়? মোমবাতি মধু ইত্যাদি যাবতীয় জিনিস এর মধ্যেই! আশ্চর্য!' অশ্বত্থামা বলে আর হাঁ করে তাকিয়ে থাকে।
'মোমবাতি আপাতত এর মধ্যে নেই, তবে মধু— হ্যাঁ, যা বলেছেন! মধু দেদার। এর ফোকরে ফোকরে মধু।' বলতে গিয়ে বঁড়শির সারা মুখ যেন সুমধুর হয়ে ওঠে।
'এর ফোকরে ফোকরে মধু? বলো কী হে?' বলতে বলতে অশ্বত্থামার জিভ দিয়ে জল গড়ায়, 'তাহলে তো কেমন মধু দেখতে হচ্ছে।'
এই না-বলে অশ্বত্থামা আমি বাধা দেওয়ার আগেই মধুর লালসায় মৌচাকে এক খাবলা মেরে বসেছে। ব্যাস, আর যাবে কোথায়? দেখতে না দেখতেই সেই মৌচাক ভেঙে হাজার হাজার মৌমাছি বেরিয়ে পড়ল। বেরিয়ে পড়ে আকাশে বাতাসে উড়তে আরম্ভ করল। আর দূর থেকে এরোপ্লেন যে রকম হুংকার ছাড়ে প্রায় সেই রকম একটা গোঁ গোঁ আওয়াজ। কবিরা তাঁদের কবিতার মারপ্যাঁচে যাকে মৌমাছিদের গুঞ্জনধ্বনি বলে থাকেন এই হয়তো সেই জিনিস হবে। তবে মৃদু মধুর নয়, তার অনেকগুণ বাড়িয়ে। এক কথায়, গজ্ঞনাধ্বনি হয়তো বলা যায়।
'আমাকে কামড়ে দিয়েছে।' অশ্বত্থামার কানফাটানো আর্তনাদ কানে এল।
আশ্চর্য নয়! ও একেবারে মৌচাকের সম্মুখেই ছিল। 'পালাও— পালাও।' বঁড়শি চেঁচিয়ে ওঠে। এবং নিজের উপদেশের উদাহরণস্বরূপ মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়।
অশ্বত্থামার হস্তক্ষেপে লক্ষ লক্ষ মৌমাছি মুক্তিলাভ করেছিল। মৌমাছির গুঞ্জন, সকলের সমবেত ঐক্যতানে তখন রীতিমতো এক গর্জন। আর সবাই মিলে সামনে পেয়ে—
সামনে পেয়ে যা করেছে তা চোখে দেখা যায় না। অশ্বত্থামা মৌমাছির তাড়নায় মুখ থুবড়ে পড়ে গেছল। কোনো রকমে যখন সে উঠে দাঁড়াল তখন কোনদিক যে সম্মুখ আর কোনদিক যে তার পশ্চাদভাগ তা বোঝা দায়। সে এক ভয়ংকর দৃশ্য।
অদূরে একটা আটচালা মতো দেখতে পেয়ে আমরা দু-জনাই সেদিকে দৌড়েছি। আটচালার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। 'দরজা খোল!' আমরা চেঁচাতে থাকি। 'মৌমাছিরা আমাদের তাড়া করেছে!'

'সে-কথা আর আমাকে বলতে হবে না।' ভেতর থেকে জবাব আসে। বঁড়শিই জবাব দেয়। এবং কিছুতেই দরজা খোলে না। সজোরে চেপে থাকে। অগত্যা দু-জনে মিলে ধাক্কা মেরে তো দরজা ভেদ করে ঢুকে পড়া গেল। সেই ফাঁকে আমাদের পিছু পিছু কয়েক-শো মৌমাছিও পড়ল সেঁধিয়ে।
তারপর? তারপর আর কী? সে ছোট্ট ঘরের মধ্যে সবসুদ্ধ আমরা সাত-শো প্রাণী। দু-পেয়ে মাত্র তিন জনা— তার বিরুদ্ধে বাদ বাকী সব ষটপদ। সবাই সমান উন্মত্ত।
'এইবার ওদের বাগে পেয়েছি।' অশ্বত্থামা চেঁচিয়ে ওঠে। কথাটা এক হিসেবে মিথ্যে নয়। বললে পরে সেভাবেও বলা যায় আমি ভেবে দেখলাম।
'এইবার ওদের এক একটাকে ধরো আর মার।' এই বলে সে পায়ের জুতো খুলে ফেলল। আমি আর বঁড়শি দু-জনে দু-কোণ ঠেঁসা হয়ে কাঁপছি। ওর কাণ্ড দেখে আমাদের কাঁপুনি আরও বেড়ে গেল।
এক-একটা মৌমাছিকে সে তাক করে, আর জুতো দিয়ে ঘা-কতক দেয়। তেড়েফুঁড়ে লাগায়। এইভাবে দশ বিশ বারের অপচেষ্টায় এক-একটাকে সে কাত করতে লাগল। মরছিল কিনা জানি না, কাছে গিয়ে দেখবার সাহস হয়নি, তবে কয়েকটাকে ধরাশায়ী হতে দেখলাম।
মারতে মারতে মানুষের খুন চেপে যায়। মার খেতে খেতে মানুষ খুনে হয়ে ওঠে। আর মারের দিক দিয়ে মৌমাছিরা কামার— যা ওদের কামড়। তার স্যাঁকরার জুতোর ঠুকঠাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মৌমাছিদের কামারের মতন এক এক ঘা— এক একটা কামড়। কামড় খেয়ে খেয়ে অশ্বত্থামাও খেপে গেল— 'দরজা খুলে দাও। আসুক ব্যাটারা। সবাই আসুক। ওদের সব কটাকে জুতিয়ে আজ লাশ বানাব।'
দরজার বাইরে লক্ষ লক্ষ মৌমাছি ভনভন করছে। আমি কাতর হয়ে পড়লাম, 'রক্ষে করো ভাই! দরজা খুল না আর। তাহলে আর বাঁচতে হবে না।'
'বঁড়শির বাবার কারখানা লাটে তুলে দিয়ে তবে আমার শান্তি। বঁড়শি, ছিপ, ফাতনা সব আজ শেষ করব।' অশ্বত্থামা গজরাতে থাকে। তার গলার আওয়াজ প্রায় হ্রেষাধ্বনির মতো আর আমরা দু-জনে মিলে তাকে ধরে থাকি।

না, অশ্বত্থামা আর মৌমাছির কারখানা করেনি। ওই কাণ্ডের দিন কয়েক পরে ওকে দেখতে গিয়েছিলাম। সে বললে, 'আরে রাম, ওর চাষ আবার মানুষে করে! সেরে উঠি আগে। চেহারাটার যা খোলতাই হয়েছে, বাইরে মুখ দেখাবার জো নেই কো। বাইরে বেরুতে পারলে তারপর বঁড়শি ব্যাটাকে আমি একবার দেখে নেব আগাপাশতলা।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন