মোটর চালে মাত

শিবরাম চক্রবর্তী

'ক-রকমের মোটর আছেন কন তো দেখি?' হর্ষবর্ধন সেদিন এসে শুধোন আমাকে, 'ক কিসিমের মোটর দেখেছেন আপনি?'

একটুক্ষণ মগজ হাতড়ে বলি, 'দু-রকমের— যদ্দূর মনে হয়।'

'যথা?'

'এক, মোটর ডাল। ভাতের সঙ্গে দেখেছি নিজের পাতে। আর দু-নম্বর মোটর— মোটর গাড়ি। চেপে দেখেছি।'

'মোটর চালের খবর আপনি রাখেন?' তাঁর দ্বিতীয় প্রশ্ন।

'মোটর চাল? মোটর চালও হয় নাকি আবার?' আমার বিস্ময়।

'হয় না?'

'হ্যাঁ, হয়। হতে পারে।' বলতে বলতে আমার মগজের বুদ্ধি গজায়, 'মোটর চেপে লোক দেখিয়ে চাল মেরে খাওয়ার কথাই বলছেন বুঝি? না, তা নয়? তবে কি মোটর চালিয়ে মানুষ চাপা দেওয়া? তাও না। তবে কী? কী তাহলে মশাই?'

'একটা সূত্র দিচ্ছি, যদি কিছু তার আঁচ পান...' তিনি জানান।

তাঁর কথার চালচিত্র থেকে কিছুই ঠাহর পাই না। বোকার মতো শুধাই, 'কী হয় এই মোটর চালে?'

'কী হয় মানে? কী না-হয়! এই মোটর চালে মাত হতে হয় মানুষকে।' তাঁর বিবৃতি, 'আমিই হয়েছি মশাই!'

'কী করে হলেন শুনি?' ওঁর মাতোয়ারা হবার খবরটা জানার আমার আগ্রহ হয়।

'তাহলে শুনুন— সেদিন কফিহাউসে।...' শুরু হয় তাঁর কাহিনি 'চৌরঙ্গী প্লেসটায়। কোণের একটা টেবিল খালি পেয়ে গেলুম। দুপুরের ফাঁকে বসে একমনে কফি আর কাজুবাদাম খাচ্ছি, বেশভূষায় সুসজ্জিত এক ভদ্রলোক এসে বসলেন আমার সামনে।'

বসেই বললেন, 'আমার নাম চিত্রক রায়। মোটরগাড়ি কেনাবেচার কাজ আমার... গায় পড়ে আলাপ করলাম, মাপ করবেন!'

'না না। মাপামাপির কী আছে! আমার বেচবার মতো কোনো মোটর নেই। সত্যি বললে, কোনো মোটরই নেই আমার।' আমি বললাম, 'মোটর পাওয়া ভারি দুর্ঘট মশাই আজকাল। বিশেষ করে ওই বিদেশি মোটর। অর্ডার দিয়ে নাম লিখিয়ে বসে থাকুন তালিকায়। তারপর কবে মোটর আসবে, কবে আপনার নাম তালিকার মাথায় উঠবে— থাকুন তার অপেক্ষায়। তারপর ভাগ্য প্রসন্ন হলে তবেই আপনার প্রাপ্তিযোগ।'

'তাতে কী হয়েছে!' কফির হুকুম দিয়ে ভদ্রলোক বললেন আমায়, 'আপনার মতন লোকের সঙ্গে আলাপ হয়ে থাকাটাই সৌভাগ্যের। একদিন হয়তো আপনি মোটর কিনতেও পারেন, বেচতেও পারেন আরেকদিন।'

'তা পারি।' জবাব দিই আমি, 'আজকালের মধ্যেই আমি কিনতে পারি একখানা গাড়ি। সেরকম সুযোগ এসেছে... বলতে কী আজই আমার এজেন্সির থেকে খবর পেয়েছি যে আমার নাম এখন তালিকার ওপরে এবং আমার বুক করা গাড়িটাও এসে গেছে বিলেত থেকে এবারকার চালানে। জাহাজ থেকে খালাস করে আনা হয়েছে। তাঁদের শো-রুমে রয়েছে এখন। আজকালের মধ্যেই নিয়ে ফেলব গাড়িটা। সত্যি বলতে, সেইজন্যেই এইদিকে আমার আসা আজ।'

'বটে বটে! আপনি ভাগ্যবান পুরুষ। আমার কনগ্রাচুলেশন।'

'আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়াটাও আমার ভাগ্য বলতে হয়। মোটরগাড়ির কেনাবেচার কারবার যখন আপনার তখন তাবৎ গাড়ির নাড়িনক্ষত্রই তো আপনার নখদর্পণে।'

'তাই কী আর! তবে এই লাইনেই যখন, কিছু কিছু খোঁজখবর রাখতেই হয়। কোন গাড়ির বিষয়ে আপনি জানতে চান বলুন?'

'এই, কনটুর? কেমন গাড়ি? ওইটেই বুক করা আমার।'

'ফ্রেঞ্জ গাড়ি তো। খাসা গাড়ি— তবে যদি প্যারিসে গিয়ে কিনতে পারেন। এখানে ওরা কনটুরের নামে যে গাড়ি পাঠায় তার ভেতর শুধু ওই নামটারই যা দাম, আর সব রদ্দি।'

'সব রদ্দি!'

'বিলকুল। যেসব গাড়ি লাখ লাখ মাইল পার হয়ে গেছে, যেসব গাড়ির কলকবজা ঝরঝরে হয়ে গেছে— সেইসব খারিজ হওয়া লঝঝর গাড়িই ওরা এদেশে পাচার করে, তা জানেন?'

'তাই নাকি?'

'প্রাচ্যের বাজার হচ্ছে ওদের রদ্দি মাল পাচারের জায়গা। যেসব গাড়ির মা-বাপ নেই, বয়সের গাছপাথরও না— তাদের বডিটা রি-মডেল করে ঝকঝকে পালিশ করে নতুনের মতো বানিয়ে বেচতে পাঠিয়ে দেয় এদেশে।'

'ভারি খারাপ তো!'

'খারাপ বলে খারাপ। প্রথম থেকেই বলি, প্রথমত গাড়ির অ্যাকসিলেরেশন হয় না। তারপর ব্রেক খারাপ...।'

'তবে যে বলে ওর চার চাকাতেই ব্রেক?'

'ওই ব্রেকের জন্যেই ব্রোক হতে হবে আপনাকে। এমন অ্যাকসিডেন্ট-এ পড়বেন একদিন...'

'কী বলছেন?'

'তাই বলছি। নিজের চোখেই তো দেখলাম সেদিন। চোখের ওপর একটা কনটুর গাড়ি চুরমার হয়ে যেতে দেখলাম। রাস্তার এক ল্যাম্পপোস্ট-এ ধাক্কা লাগার সঙ্গেই না... সঙ্গে সঙ্গে ছাতু!'

'ছাতু?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ। ছাত থেকে পড়লে যা হয়। সামান্য একটা ল্যাম্প পোস্টের সঙ্গে লেগে তাই হল। ওরা বললে, গাড়িটা পিছলে গেছল হঠাৎ। বাজে কথা মশাই, ডাহা মিথ্যে। আসলে কোথায় ওর গলদ আমার তো তা অজানা নেই।' গম্ভীরভাবে ঘাড় নাড়তে লাগল লোকটা।

'কোথায়?'

'ব্রেকে।' তিনি বলে যান, 'নেই বললেই হয়। তা ছাড়া বলে তো স্টিলের গাড়ি, বিশ্বাস হয় না। মনে হয় পুরোনো কেরোসিন তেলের ক্যানাস্তারায় বানানো। যুদ্ধের পরে বিলেতে এক ছটাক খাঁটি ইস্পাত থাকলে তো!'

'বিলেত নয়, ফ্রান্স।' শুধরে দেন হর্ষবর্ধন।

'একই কথা।' তিনি কন, 'গোটা কনটিনেন্টের ওই এক হাল। এক দশা মশাই।'

'তাই নাকি? আচ্ছা, আপনি এত খবর জানলেন কী করে?'

'বাঃ, আমি জানব না। আমারই তো জানবার কথা। মোটর কেনাবেচাই যে কাজ আমার। আমার সংসার চলে তাইতেই।'

'কনটুর কীরকম পেট্রোল খায় বলুন তো! আজকাল পেট্রোল যা আক্রা হয়েছে না?'

'এক নম্বরের পেট্রোলখোর গাড়ি। এমন আর দুটি দেখিনি আমি।'

'কী সর্বনাশ!' আমি আঁকুপাঁকু করে উঠি, 'আরেকটু হলেই আমি ডুবতে বসেছিলাম।'

'যা বলেছেন।' উনি বলেন, 'হ্যাঁ, ডুবতেন আপনি। ওই পেট্রোলেই ডুবতেন। ভরাডুবি হত আপনার। পেট্রোলখোর, অমন পেটুক গাড়িকে পেট্রোল খাওয়াতে হলে আপনার নিজের পেটেই কিছু জুটত কিনা সন্দেহ!'

'ইস বড্ড বেঁচে গেছি তো! ভাগ্যিস, আজ দেখা হল আপনার সঙ্গে। আপনিই বাঁচালেন।'

'আজ্ঞে?'

'বড্ড বাঁচিয়ে দিয়েছেন আপনি। আরেকটু হলেই আমি কিনে ফেলতাম গাড়িটা। কিনতে যাচ্ছিলাম আজকালের মধ্যেই।'

'সে তো গোড়াতেই শুনেছি— বললেন তখন।'

'তাহলে কী করতে বলেন আমায়?'

'একটা মজার কথা বলি শুনুন। জানেন কি, একটা সেকেন্ডহ্যান্ড কনটুরের দাম নতুনের চাইতে বেশি? অনেক বেশি। অন্তত হাজার তিনেক তো বটেই। নতুন কনটুরের দাম তো? সাতাশ হাজার না? সেকেন্ডহ্যান্ডের দাম হাজার তিরিশ...'

'তা তো জানতুম না।'

'সেকেন্ডহ্যান্ড কনটুর আনকোরার চেয়ে দামি— কিনতে গেলে বেশি দর। এই থেকেই বুঝবেন। নতুন কনটুরের কদর এর থেকেই টের পাবেন আপনি।'

হর্ষবর্ধন কিছু আর কন না। মুহ্যমান হয়ে টের পেতে থাকেন। 'আচ্ছা, এর কি কোনো প্রতিকার নেই?'

'আছে বই কী! আরও কয়েক হাজার টাকা ওই গাড়ির পেছনে খরচা করলে একেবারে নতুনের মতো বানিয়ে নেওয়া যায়। আকসিলেটারটা পালটানো, ইঞ্জিন রিনোভেট করা, ব্রেকগুলি বাতিল করে সেই জায়গায়... তবে হ্যাঁ, মোটরের বডিটা বদলাবার কিছু নেই। কোনো খুঁত নেই ওর। বডিটা ঠিকই আছে। সত্যি চমৎকার চেহারা গাড়িখানার সে কথা বলতে হয়! দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। আর সেই দেখেই তো লোকে পাগল! বড়োলোকের যত আনকোরা ছেলে তাইতেই তো মজছে।'

'অত দাম দিয়ে গাড়ি এত পার্টস পালটালে আর সুবিধেটা কী হল?'

'সুবিধে এই, খোলনলচে দুইই পালটাতে হল না— খোলটা ঠিকই আছে। কেবল ভিতরের ওই নলচেগুলি অদলবদল করে নিলেই... আমার খোলাখুলি কথা মশাই!'

'অনেক টাকার ধাক্কা যে মশাই!' হর্ষবর্ধন বলেন, 'সাতাশ হাজারের ওপর আরও সাত হাজার খরচা করেও কূল পাব কিনা কে জানে!'

'যা বলেছেন! তবে অত কাণ্ডর মধ্যে না গিয়ে একটা চালু কনটুর সেকেন্ডহ্যান্ড কিনুন না কেন— হাজার দু-তিন বেশি দিয়ে। আমি তাই কিনতেই বলি আপনাকে।'

'পাচ্ছি কোথায়? একটা গাড়ি না হলে যে চলছে না। না, আমার জন্যে নয়। আমি তো নিজের কারবার নিয়েই ব্যস্ত— আমার কাঠের কারখানাই পড়ে থাকি দিন-রাত। গাড়ি আমার জন্য নয় ঠিক...'

'বুঝেছি। আপনার শ্রীমতীর জন্যই বুঝি?'

'শুধু শ্রীমতী? শ্রীমতীবৃন্দ। শ্রীমতীর অভাব নেই— আমার বাড়ি এখন বৃন্দাবন— দেশ থেকে শ্রীমতীর বোন বোনাইরা এসে হাজির হয়েছেন বড়োদিনে বেড়াতে কলকাতায়।'

'তা অত ঘাবড়াচ্ছেন কেন? সেকেন্ডহ্যান্ড কনটুরই আপনাকে আমি পাইয়ে দেব। বেশ চালু গাড়ি। দেখতেও চমৎকার। আনকোরা নতুনের মতই পাইয়ে দেব আপনাকে। ভাববেন না। আছে আমার সন্ধানে।'

'দেবেন? আঃ, বাঁচালেন আপনি আমায়! খালি ওই কনটুরের হাত থেকেই না, ঘরের কনের আর কনের বোনেদের হাতে থেকে উদ্ধার করলেন আমাকে। ধন্যবাদ ধন্যবাদ ধন্যবাদ!'

কফিহাউস থেকেই তারপর তিনি সোজা চলে গেছেন তাঁর এজেন্টদের আপিসে।

ম্যানেজার তাঁকে দেখে সহাস্য হয়ে উঠেছেন, 'আপনার গাড়ি—'

'না মশাই, আমার চাইনে। কনটুরের যে অর্ডার আমার বুক করা ছিল তা আমি ক্যানসেল করে দিলাম। যাকে খুশি বেচতে পারেন এখন।'

'অ্যাঁ?'

'হ্যাঁ। এক্ষুনি। ও গাড়ি আমার চাইনে আর।'

ম্যানেজার অবাক হন। কিন্তু বেশি কথা বাড়ান না। বাক্যনিষ্পত্তি হয় বাড়ি ফিরে। উনি কনটুর বর্জনের বার্তা প্রকাশ করতেই তস্য বোন, তস্য বন্ধুরা, তস্য তস্য বোনাইবৃন্দ তাঁকে এসে ছেঁকে ধরে। এতদিন ধরে এহেন শুভদিনের অপেক্ষায় বসে থাকা— এখন কর্তা এসে কিনা একেবারে বসিয়ে দিলেন!

কুরুক্ষেত্রের পর পাণ্ডুপক্ষও আসতে থাকে একে একে। হর্ষবর্ধনের ভ্রাতা গোবর্ধন— তস্য মাসতুতো পিসতুতো পাতানো পাড়াটে যত ভ্রাতৃবৃন্দ এবং দূর-অদূর সম্পর্কের রাঙামামা, সেজোপিসে, বড়ো জ্যাঠা তাঁরাও সব হন্যে হয়ে আসেন। তাঁদেরও ওই গাড়ি নিয়ে কত প্ল্যান আঁটা ছিল। কিন্তু হায় ওইরকম মোটর অবহেলায় উনি তালাক দিয়ে এসেছেন! সাতাশ হাজার টাকায় অমন গাড়ি পাওয়া— এমন বরাত কেউ ছেড়ে দেয়! বেশি টুরের জন্যও— কম টুরের জন্যও। ওই কনটুর!

ফলে আবার টুর দিতে হল হর্ষবর্ধনকে! সুড় সুড় করে গেলেন আবার তিনি সেই মোটর কোম্পানি কার্যালয়ে।

'দেখুন মশাই, ঘণ্টা কয়েক আগে যে গাড়িটা আমি বাতিল করে গেলাম না?' ম্যানেজারের কাছে তিনি কাঁচুমাচু হয়ে শুরু করেন, 'সেটি আমার চাই। আমি আমার মত বদলেছি।'

'ট্যু লেট! মশাই, ট্যু লেট!'

'ট্যু লেট?'

'হ্যাঁ, বড্ড দেরি করে ফেললেন আপনি। ওই দেখুন আপনার গাড়ি রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে স্টার্ট দিতে যাচ্ছে।'

তাকিয়ে দেখলেন তিনি। চেহারা দেখে চোখ ফেরাতে পারেন না। 'বড্ড দেরি হয়ে গেল কেন? এই তো আমি ঘণ্টা কয়েক আগে—'

'হ্যাঁ, আপনার যাবার পরেই আরেক ভদ্রলোক এসে সেটা কিনে ফেলেছেন। এই মিনিট পনেরো আগেই তো। আপনার পরেই তাঁর নাম ছিল আমাদের তালিকায়।'

'ওঁকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ফিরিয়ে নিতে পারেন না?' তবু বলতে যান হর্ষবর্ধন।

'তা কী করে হয়? উনি আমাদের বহুকালের খদ্দের। আমাদের সব লিস্টেই সব সময়ই নাম বুক করা থাকে ওঁর— সব রকমের বিদেশি মোটরের। ভারি মোটর কেনার বাই ভদ্রলোকের। এরকম মোটরের মন দেখিনি আর।'

হর্ষবর্ধন এগিয়ে যান গাড়িটার কাছে। অন্তর্গত ভদ্রলোককে স্টিয়ারিং ধরে বসে থাকতে দেখেন। গাড়ির থেকে মুখ বাড়িয়ে তিনি বলেন, 'আপনি কিনতে চান গাড়িটা? হাজার দু-তিন বেশি দিলেই দিয়ে দেব আপনাকে। কিনুন না, বাধা কী? একটা সেকেন্ডহ্যান্ড কনটুরের দাম আনকোরার চেয়ে একটু বেশি— বলেছিলাম না আপনাকে?'

অধ্যায় ২২ / ২২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%