শিবরাম চক্রবর্তী
হুঁকাকাশি একজন নামকরা গোয়েন্দা। আমাদের কল্কেকাশি তাঁরই ভায়রাভাই। তপ্ত কলেকের মতো গনগনে আর কাশির মতোই খনখনে তাঁর দাপট— তাঁর নামডাকও ভায়রার চেয়ে কিছু কম যায় না।
টিকটিকি হিসেবে তিনিও কিছু কম নন। অনেক খুনের তিনি কিনারা করেছেন— খুনির কিনারে না গিয়েও কত ডাকাতকে তিনি কাত করেছেন, চোরকে ছেঁচড়ে এনেছেন— দেখতে না দেখতে। কত রাহাজানির সুরাহা করেছেন— জানাজানির হবার আগেই।
বদলোক তিনি একপলক তাকালেই টের পান। তাঁর চোখের সামনে সব পরিষ্কার। সমস্ত রহস্য, সবকিছুর হদিস। সরকারি পুলিশে যেসব তথ্যের থই পায় না, থ হয়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত তাদের তাঁর কাছেই ছুটতে হয়। তিনি শখের গোয়েন্দা হলেও, সখ্যের খাতিরে, জলের মতো তাদের সব সমস্যা সমাধান করে দেন।
এহেন ডিটেকটিভ কল্কেকাশি এইমাত্র গোলদিঘিতে এসে বসেছেন। কোনো গোলমালের খোঁজে নয়, হাওয়া খাওয়ার মতলবে। মির্জাপুরের মোড়ে তাঁর টু-সিটারে চাবি মেরে রেখে, এখানে এসে একটু বিশ্রাম করবেন এখন।
বেঞ্চে তাঁর অদূরে আধময়লা জামাকাপড়ে আধাবয়সি এক ভদ্রলোক একমনে কী ভাবছিল। ভাবতে ভাবতে উঠে গেল লোকটা। দীঘির এক কোণের গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল সে। লোকটা উঠে যেতেই এক ছোকরা এসে তাঁর শূন্যস্থান পূর্ণ করল। ধপ করে বেঞ্চির উপর বসে পড়ে সে বললে, 'ধুত্তোর!'
বিরক্তিব্যঞ্জক তার ওই অর্ধস্ফুট আর্তনাদের মধ্যে এমন কিছু ছিল যে কল্কেকাশি কান না দিয়ে পারলেন না।
'তুমি কি কোনো অসুবিধেয় পড়েছ?' তিনি জিজ্ঞেস করলেন ছেলেটিকে।

'অসুবিধে বলে!' বলল ছেলেটি, 'যা মুশকিলে পড়েছি মশাই, এমন অবস্থায় পড়লে কারো মাথায় ঠিক থাকে?'
'কী হয়েছে শুনি তো?'
'শুনবেন তাহলে? এমন বিপদে মানুষ পড়ে! শুনুন তবে। পশ্চিম থেকে আজ দুপুরে এসে নেমেছি কলকাতায়। চেনা এক বন্ধুর বাড়ি উঠব এই স্থির। বছর দুই আগে আরেকবার যখন এসেছিলাম তাদের বাড়িতেই ছিলাম। আজ সেখানে গিয়ে দেখি, এই তো খানিক আগেই মশাই! কোথায় সেই বাড়ি, কোথায় কী! বন্ধুরও কোনো পাত্তা নেই।'
'বল কি হে? খুনটুন করে ফেরার নাকি— তোমার সেই বন্ধুটি?' কল্কেকাশি উচ্চকিত হন, 'কিন্তু বাড়ি? বাড়িও নেই? বাড়ি অবদি লোপাট?'
বাড়ির পলায়ন কল্কেকাশির কাছে ভালো লাগল না। একটু বাড়াবাড়িই বলে মনে হল। বাড়ির পালাবার কি প্রয়োজন ছিল? অ্যাঁ?
'না না, তা কী করে হয়! বাড়ি ঠিকই আছে। কোথাও যায়নি, যেতে পারে না। বাড়ি হচ্ছে ফেরার জায়গা, বাড়ি কি ফেরার হতে পারে? তুমি ভালো করে খুঁজে দ্যাখ গে।'
'খুঁজতে কি আর বাকি রেখেছি মশাই? খুঁজবার কোনো কসুর করিনি।'
যুবকটি জানায়, 'কিন্তু খুঁজে কী হবে? যেখানে বন্ধুর বাড়ি ছিল সেখানে সিনেমা হাউস হচ্ছে, নিজের চোখেই দেখে নিলাম। আপনি কি এর পরেও খুঁজতে বলেন?' সে জানতে চায়।
'হ্যাঁ, এরকম প্রায়ই ঘটে থাকে বটে।' কল্কেকাশি এতক্ষণে আঁচ পান, 'আজ যেখানে ছিল চায়ের দোকান, কাল সেখানে ডাইং ক্লিনিং। আজ যেখানে চুল ছাঁটার সেলুন, কাল সেখানে দেখবে রেস্তরাঁ। কাঁচির খচখচানির জায়গায় কাঁটা চামচের ঠনৎকার! আসল ব্যাঙ্ক ভেবে আজ যেখানে তোমার টাকা রাখলে কাল দেখবে, আসলে সেটা রিভারব্যাঙ্ক ছাড়া কিছু না। তোমার যথাসর্বস্বই জলাঞ্জলি! যে যা পাচ্ছে, যেখানে পাচ্ছে, যাকে পাচ্ছে, মেরে ধরে কেড়েকুড়ে নিয়ে সরে পড়ছে— আকচারই তো দেখা যায়। তুমি এক কাজ করো, ভালো একটা হোটেল দেখে ওঠোগো।'
'উঠেছিলাম তো। ট্যাক্সি ড্রাইভারই তার জানা এক হোটেলে তুলে দিয়ে গেছল। হোটেলে আমার ঘরে ব্যাগ সুটকেস বিছানা মালপত্তর সব রেখে আমি একটা টুথপেস্ট কিনতে বেরিয়েছি— তারপর তারপর আর কি বলব? সেই হোটেল আর খুঁজে পাচ্ছিনে এখন।'
'হোটেলের নাম কী?' কল্কেকাশি জিজ্ঞেস করলেন।
'তাই তো মনে পড়ছে না মশাই, নাম মনে থাকলে তো হতোই! তবে আর মুশকিল কীসের?'
'এ আর মুশকিল কি? এই গোলদীঘির আশপাশ— হ্যারিসন রোড, মির্জাপুর, আমহার্স্ট স্ট্রিট— সব হোটেলে হোটেলে ভরতি। এইখানেই যত রাজ্যের হোটেল আর বোর্ডিং হাউস। তবে একটা তো হোটেল নয়, একটু ঘুরতে হবে এই যা। বাড়িটা দেখলে তো চিনতে পারবে?'
'সেইখানেই তো গোল মশাই! কী রঙের, কোন ঢঙের, কী রকমের, কা-তলা বাড়ি— কিছুই ভালো করে দেখিনি। কাছেপিঠেই একটা টুথপেস্ট কিনে ফিরে আসব— ভালো করে চিনে রাখবার দরকারও মনে করিনি—'
'এখন দেখছ সব চিনেম্যান— কাউকেই চেনা যাচ্ছে না! বটে?'
'তারপর এ-দোকান সে-দোকান করতে করতে কখন রাস্তা টাস্টা গুলিয়ে গেছে—'
'তাহলে তো গোল বাধিয়েছ সত্যিই! বেশ একখানা গোল বাধিয়ে এই গোলদীঘিতে এসে আমাকে বাধিত করছ!' পরের বাক্যটি কল্কেকাশি আর প্রকাশ করেন না— নিজের মনেই বলেন।
খুনখারাপির কিনারায় ওস্তাদ কল্কেকাশির বাড়ি খুঁজতে বেরুবার সাধ হয় না। গোরু খোঁজা আর বাড়ি খোঁজায় কার উৎসাহ হয়? তার ওপরে, গোরুর জন্য বাড়ি খুঁজতে তো হলেই তো হয়েছে!
'আরও মুশকিল, বাড়িটা তো চিনে রাখিই নি—' ছেলেটি বলতে থাকে, 'তারপরে কোন রাস্তায় যে তাও জানিনে— অথচ আমার জিনিসপত্র সব— সেই হোটেলেই থেকে গেল। টাকাকড়ি যা কিছু।... এখন কী যে করি?'
'কী আর করবে? ফিরে যাও। যেখান থেকে এসেছ সেইখানেই ফেরত যাও পত্রপাঠ। নিজের বাড়ি ফিরে যাওয়া ছাড়া এখন আর কী করবার আছে? তবে হ্যাঁ, কাছাকাছি থানায় একটা খবর দিয়ে যেতে পারো। পুলিশ যদি তোমার হোটেল আর জিনিসপত্রের সন্ধান পায় তোমার দেশের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেবে।'
'তা না হয় গেলাম। পুলিশেও খবর দিয়ে গেলাম না হয়। দেশেই ফিরে গেলাম রাত্রের ট্রেনে। কিন্তু— কিন্তু— যাই কী করে? যেতে তো টাকা লাগবে, টাকা কই আমার?'
কল্কেকাশি এই তথ্য বহুক্ষণ আগেই জেনেছেন। তাঁর কাছে এ-সংবাদের কোনো নূতনত্ব ছিল না।
'আপনাকে— আপনি— আমাকে—' যুবকটি বাধা কাটিয়ে বলেই ফ্যালে অবশেষে, 'আপনাকে সদাশয় ভদ্রলোক বলেই বোধ হচ্ছে। আপনি যদি আমায় বিশ্বাস করে— বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না— গোটা পঁচিশেক টাকা আমায়—'
'হ্যাঁ, নিশ্চয়ই তোমাকে আমি দিতাম যদি তোমার কথায় আমার বিশ্বাস হত। মুশকিলটা কোথায় জানো? তোমার হোটেল হারানোয় নয়— টুথপেস্ট কিনতে বেরুনোতেও না—' রূঢ় অপ্রিয় সত্যটা বলবেন কিনা তিনি ভাবেন।

'তাহলে?'
'মুশকিল হয়েছে এই যে, সবই ঠিক, কিন্তু তুমি যে টুথপেস্টটা কিনেছ, সেইটাই কেবল দেখাতে পারছ না।'
কল্কেকাশি মৃদুমধুর হাসেন, 'কাহিনিটা ফেঁদেছিলে মন্দ না— ওস্তাদ গল্পকারদের মতোই, কিন্তু তোমার প্লটের ওইখানটাতেই গলদ রয়ে গেছে। আসল জায়গাতেই কাঁচা রেখে দিয়েছ। সেইজন্যই ধরা পড়ে গেল। বুঝতে পারছি, এখনও ততটা পাকা হয়ে উঠতে পারোনি, বালক!'
কল্কেকাশির অভিযোগের সাথে সাথেই ছেলেটি চমকে যায়, জামার পকেটে হাত পুরে দেয় চট করে— আর তার পরেই সে লাফিয়ে ওঠে।
'কোথায় হারালাম তাহলে?' ককিয়ে ওঠে সে, 'টুথপেস্ট?'
'এক বিকেলের মধ্যে এক বন্ধুর বাড়ি, একটা হোটেল আর এক প্যাকেট টুথপেস্ট একসঙ্গে হারানো— বড়ো কম বাহাদুরি নয়!'
কল্কেকাশি আরও কী বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ছেলেটি শোনবার জন্য অপেক্ষা করে না। সবেগে সেখান থেকে চলে যায়।
'হ্যাঁ, বাহাদুরই তোমাকে বলতাম যদি শেষরক্ষা করতে পারতে। দেশ থেকে সদ্য ট্রেনে আসা, টুথপেস্ট কিনতে বেরুনো, হোটেল হারিয়ে ফেলা সবই ঠিকঠাক করেছ— গল্পটা বানিয়েছো মন্দ না! বলেছও বেশ গুছিয়ে— গড়গড় করে— কোথাও না একটুও আটকে। সমস্তই নিখুঁত, কেবল ওই সামান্য একটুখানি ত্রুটির জন্য সব ভেস্তে গেল। আরও একটু বুদ্ধি খরচ করে আগে থেকে যদি আনকোরা টুথপেস্টের একটা চকচকে প্যাকেট দোকানের ক্যাশমেমো সমেত নিজের পকেটে মজুত রাখতে— তাহলে, বলতে কী, তোমাকে আমি উদীয়মান প্রতিভাই বলতাম। তোমার জন্যে তাহলে আর আমার ভাবনা ছিল না। নিজের লাইনেই করে খেতে পারতে তুমি।'
দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে কল্পেকাশি বেঞ্চি ছেড়ে ওঠেন— আর, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর নজরে কী যেন পড়ে। বেঞ্চির তলায় মোড়কে মোড়া লম্বাকৃতি কী ওটা? টুথপেস্টের প্যাকেট না? হাতে তুলে দ্যাখেন— তাইতো! টুথপেস্টই তো! দোকানের ক্যাশমেমো জড়ানো— সদ্য-কেনা যে তার কোনো ভুল নেই। বোঝা গেল, ছেলেটি যে সময় গা-ঝাঁকি দিয়ে খপ করে বসেছিল, সেই সময়েই এটা ওর পাঞ্জাবির পকেট থেকে টপকে ধরাশায়ী হয়েছে।
নাঃ, ছেলেটাকে খুঁজে বার করতে হল। একটু এদিক-ওদিক তাকাতেই, গোলদীঘির আরেক ধারে, পাত্তা মিলল তার।
'ওহে শোনো শোনো!' কল্কেকাশি তার কাছে গিয়ে ডাকলেন।
যুবকটি উদ্ধতভাবে ফিরে তাকাল।

'তোমার গল্পের প্রধান সাক্ষী এসে পৌঁচেছে।' এই বলে প্যাকেটটা তিনি তার হাতে তুলে দিলেন, 'এই নাও তোমার পেস্ট। বেঞ্চির তলাতেই পড়েছিল। তুমি চলে আসার পর এটা চোখে পড়ল আমার। যাকগে... যেতে দাও... তোমাকে অযথা সন্দেহ করেছি বলে মনে কিছু করো না। তোমার টাকার দরকার ছিল বলছিলে...' এই বলে কল্কেকাশি তাঁর পকেট হাতড়ে নোটে টাকায় রেজকিতে যা ছিল তার হাতে দিয়ে বললেন, 'টাকা কুড়ি বাইশ হবে। এদিয়ে তুমি দেশে পৌঁছতে পারবে। তারপর সেখেন থেকে... এই নাও আমার কার্ড— এতে আমার নাম ঠিকানা লেখা আছে... বাড়ি পৌঁছে তারপর আমার টাকাটা মনি অর্ডারে তোমার সুবিধামতো ফেরত পাঠিয়ো। তাহলেই হবে।'
'ভাগ্যিস, টুথপেস্টটা আপনি পেয়েছিলেন।' এই বলে ছেলেটি টাকাটা নিয়ে তো-তো করে কী যেন বলল— ধন্যবাদের ভাষাই হয়তো-বা— বলেই চোঁ চোঁ করে ছুটল। দেখতে দেখতে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল সে।
ট্রেন ধরতেই ছুটেছে। কল্কেকাশি বললেন আপন মনে। যাক! তিনিও গোলদিঘিতে আর দু-এক চক্কর মেরে বাড়ি ফিরবেন। ঘুরতে ঘুরতে ঘুরপাক খাবার মুখে সেই ভূতপূর্ব বেঞ্চির কাছাকাছি আসতেই আরেক অভূতপূর্ব দৃশ্য তাঁর নজরে পড়ল। এক ব্যক্তি অত্যন্ত ব্যগ্র সতর্কদৃষ্টিতে বেঞ্চির নীচে, তার আশেপাশে, চারিধারে ভারি উঁকিঝুঁকি মারছে।
দেখাবামাত্রই লোকটিকে তিনি চিনলেন। ছেলেটির আবির্ভাবের আগে এই লোকটিই বেঞ্চিতে তাঁর পাশে বসেছিল।
'আপনার কি কিছু হারিয়েছে নাকি? কী খুঁজছেন অত করে?'
'হ্যাঁ মশাই, এইমাত্র কেনা—' লোকটি আর্তকণ্ঠে জানায়, 'একটা টুথপেস্টের প্যাকেট।'
সামলাতে কল্কেকাশির সময় লাগে। তিনি কিছু বলতে পারেন না। লোকটিই বলে যায়, 'টুথপেস্টের জন্য তত না, ওটা হারানোর জন্যেও নয়— কিন্তু ওর মধ্যে ওই প্যাকেটের ভেতরে আমার আজকের পাওয়া মাইনে— এ-মাসের পুরো বেতন—'
'ক-খানা নোট ছিল?'
'আজ্ঞে, আটখানা দশটাকার নোট— এ-মাসের মাইনের সবটাই। ভারি পকেট মারে আজকাল, ভাবলুম প্যাকেটের মধ্যে টাকাটা রাখলে নিরাপদে থাকবে—'
কাহিনিটার এ পর্যন্ত এক বিখ্যাত লেখকের। তাঁর নাম সাকি— তাঁরই গল্পের ছায়ায় এটি লেখা। এখন সাকির গল্পের বাকিটা।
কেরানিটির কথা শুনে কল্কেকাশি গুম হয়ে গেলেন। বললেন, 'হুঁ। বুঝেছি। দেখুন, আপনার টাকাটা খোয়া যাবার জন্য আমিই দায়ী। আপনি এক কাজ করুন, আমার সঙ্গে চলুন, আমি আপনার ক্ষতিপূরণ করে দেব। আমি অবিশ্যি কলকাতার বাইরে থাকি, ডায়মন্ড হারবার রোডেই— তাহলেও আমার বাড়ি খুব বেশি দূরে নয়। সঙ্গে গাড়ি আছে। ফিরতি বাস পাবেন।'

ডায়মন্ডহারবার রোড ধরে কল্কেকাশির মোটর তিরবেগে ছুটেছিল। শহর ছাড়িয়ে শহরতলি পেরিয়ে একটানা পিচঢালা পথের বুকের ওপর দিয়ে। দু-ধারেই ফাঁকা— নির্জন রাস্তা— মাঝে মাঝে এক আধখানা বাড়ি। বাগানবাড়িই বেশিরভাগ।
কল্কেকাশি বেপরোয়া গাড়ি চালাচ্ছেন। কেরানিটি তাঁর পাশে বসে চুপচাপ।
ভাবতে ভাবতে চলেছেন কল্কেকাশি। না,। মানুষের রহস্য বোঝা দায়— জীবনের রহস্যের মতোই জটিল। মানুষের না হলেও, অন্তত বদলোকদের আদি-অন্ত পেয়েছেন বলে নিজের সম্বন্ধে যে উচ্চ ধারণা তাঁর ছিল সেই গর্ব আজ চূর্ণ হয়েছে। নাঃ, মানুষ চেনা বড়ো কঠিন!
হঠাৎ কল্কেকাশির কেমন একটা খটকা লাগল। পার্শ্ববর্তীর দিকে তিনি একবার ভ্রূক্ষেপ করলেন। গোলদীঘির সেই যুবকটি না হয় এক নম্বরের ঠক, কিন্তু এই লোকটিই কি খাঁটি?
সন্দেহ হতেই নিজের বাঁ-পকেটে তিনি হাত পুরে দিলেন— হুম, ঠিক! ঠিকই তো। অবিকল যা ভেবেছেন।
তাঁর সন্দেহ অমূলক নয়।
অমনি ডান পকেট থেকে তাঁর রিভলভার বার হয়ে এল। (গোয়েন্দাদের পকেটে আর কিছু থাক বা না থাক, পিস্তল আর হাতকড়া সর্বদাই লেগে থাকে।) লোকটির দিকে সেটি উঁচিয়ে তিনি বললেন, 'কই, ঘড়ি চেন সব দেখি।'
লোকটিও অমনি একটুও দেরি না করে নিজের পকেট থেকে ঘড়ি চেন বার করে দেয়। বিনা বাক্যব্যয়ে।
ডান পকেট থেকে হাতকড়ি মুক্ত করে কেরানিটির যুক্ত করে পরিয়ে দেন কল্কেকাশি। তারপরে মোটর থামিয়ে পথের মাঝখানেই নামিয়ে দেন তাকে।
'দয়া করে তোমায় আর পুলিশে দিলাম না। এখান থেকে হাতকড়া হাতে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরো। এই তোমার যোগ্য শাস্তি।'
'হ্যাঁ, কে এখন এমন সময়ে থানা পুলিশ করে? সে সবের হয়রানির চেয়েও এই ভালো। এর শয়তানির ঢের সাজা দেয়া হয়েছে। এখান থেকে কলকেতা— এতখানি পথ করজোড়ে আর জোর করে হাঁটানো বড়ো কম শাস্তি না।
তা ছাড়া তাঁর মতো ধুরন্ধর গোয়েন্দার ট্যাঁক থেকেও ঘড়ি চেন চুরি যায়— নিজের এত বড়ো বাহাদুরির পরিচয় থানা পুলিশে কোন মুখে জানাতে যাবেন? এ খবর জানাজানি হওয়ার উৎসাহ তাঁর ছিল না।
'যেমন কর্ম তেমনি ফল! মরুগ যে ব্যাটা সারা রাস্তা নিজের সঙ্গে হাতাহাতি করে।' এই বলে তিনি আরও জোরে গাড়ি চালিয়ে দিলেন। থামলেন এসে সটান বাড়িতে।
বাড়ির ভেতর পা না বাড়াতেই তাঁর ছোটো ছেলে ছুটে এল, 'বাবা, বাবা! তোমার চেনঘড়িটা তুমি আজ নিয়ে যাও নি যে? টেবিলের ওপর ফেলে রেখে গেছ। হাতে পেয়ে আজ ওটাকে আমি ভালো করে সারিয়ে রেখেছি। তুমি তো বলো যে ভালো ঘড়ি আরও ভালো করা যায় না। কিন্তু দেখবে এসো কেমন মেরামত করেছি একবার। ঢাকনি টাকনি সব এঁটে দিয়েছি তেমনি করে। কেবল একটা সুতোর মতন সরু তার— গোলপাকানো কিন্তু বেশ লম্বা— সেটাকে কিছুতেই আর ভেতরে আঁটানো গেল না। তা না যাক, তাতে কিছু যায় আসে না। কাঁটা টাঁটা তোমার সব ঠিক আছে।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন