বিশ্বাস করুন আর না করুন!

শিবরাম চক্রবর্তী

নিরীহ কেরানিও প্রতিহিংসা নিতে জানে। একদিন তারও দিন আসে, সেও খাড়া হয়ে দাঁড়ায়। গোবেচারাও গোঁফে চাড়া দেয় একেকদিন...

তেমনি দিন এসেছে আজ প্রাণহরির। আজ এতদিন পরে সুদীর্ঘ চল্লিশ বছর বাদে। কেরানিগিরির থেকে অবসর নেয়ার দিন তার আজ। আজ এতদিনের পর এতদিনকার শোধ সে তুলবে...

মনের উত্তেজনা দমন করে রোজকার মতো রুটিনমাফিক সব কাজ সে বাজিয়ে গেছে— নিত্যকৃত্যের কোনোটাই বাদ দেয়নি। করেছে নিখুঁত করে, কোনো খুঁতখুঁত না করে। উঠেছে ভোর সাড়ে পাঁচটায়— অ্যালার্ম ঘড়িটা বেজে উঠতেই সে জেগে উঠেছে। ঘড়িটা ঘুম ভাঙায় ঠিক কাঁটায় কাঁটায়— তার তীব্র গঞ্জনার খোঁচায় ঘুমোয় কার সাধ্যি? তার পরে, ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্যাদি সেরে, চা-পানের পর, সকালের খবর কাগজে একটু চোখ বুলোতেই সাড়ে ছ-টা। তারপর বাজার সেরে ফিরে এসে একটুখানি না-জিরোতেই ঘড়ির কাঁটা চলে গেছে আটের ঘরে। সঙ্গে-সঙ্গেই সে লাফিয়ে উঠেছে— নাইবার তাগিদে। ঘড়িটা এবার চেঁচিয়ে তাকে সজাগ করেনি, সেই ভোরাইয়ের পরে আর তাকে করতেও হয় না। কিন্তু তাহলেও তার কাঁটার খচখচানিটা তো মনে ছিলই। মনে-মনেই ছিল তার।

চানটান সারার পর খাবার। নাকে-মুখে দুটি গুঁজেই, নটা না বাজতেই, বেরিয়ে পড়েছে প্রাণহরি। ধরেছে ২এ-র বাস— মরিয়া হয়ে মোড়ের মাথায়।

ছুটেছে প্রাণহরি আপিসের মুখে, আজকেও, হরিণের মতোই প্রাণ হাতে করে— বাসের হাতল ধরে ঝুলতে ঝুলতে। হন্যে হয়েই ছুটেছে, আজ শেষদিনটির জন্যেও।

দশটায় পৌঁছেচে আপিস। বসেছে গিয়ে তার নিজের টেবিলে— তবিলদারিতে। ক্যাশিয়ারের কাজ তার। তবিল মিলিয়ে ক্যাশের খবর নিয়েছে রোজকার মতোই। নিয়েছে আপিসের রোজগারের হিসাব।... আজ, হ্যাঁ, আজই তার এই ক্যাশাকর্ষণের শেষ কাণ্ড।

এই কাজ সে করে চলেছে ঘড়ির কাঁটার মতোই— চল্লিশ বছর। চালশে ধরার পরেও পঁচিশ বছর আরও। পঁচিশ বছর বয়সে সে এই আপিসে ঢুকেছিল আর আজ পঁয়ষট্টি বছরে এসে এতদিন পরে আজ তার এখান থেকে পঁয়ষট্টি দেবার দিন!

চোখ দুটো কি তার চকচক করছে আজ? ঝাপসা চোখেও একটু চাকচিক্য দেখা দিয়েছে কি? দীর্ঘ চল্লিশ বছরের বন্ধন থেকে মুক্তির সম্ভাবনাতেই হয়তো বুঝি-বা...?

তার আপিসের বন্ধুরা তাই ভেবেছে বটে, কিন্তু তাদের ধারণা ভুল। না, তা নয়, অবসর লাভের আশাতেই তার চোখ জ্বলজ্বলে হয়নি, এতদিন ধরে তার মনে যে রাগ সে পুষে এসেছে, এতদিনের শোধ তোলার যে-প্ল্যান এঁটেছে মনে মনে— তার উদযাপনের দিন আজ। তারই বিচ্ছুরিত উৎসাহে তার চাহনি আজ ছুরির মতো। তার মুখ আজ চোখালো, চোখ মুখরা।

দশ বছর আগে এই জিঘাংসা এসেছিল তার মাথায়। বিদ্যুৎচমকের মতোই খেলে গেছল হঠাৎ। তার মস্তিষ্কের খেলা— সেই মতলব— দীর্ঘ দশ বছর পরে আজ খেলিয়ে তোলার দিন। সেই বহুদিনের পুষ্ট প্রতিশোধ-স্পৃহা— পুরোনো রাগ সে ঝাড়বে আজ। ঝেড়ে ফেলবে মনের ঝাল মিটিয়ে।

অবসর না নেয়া পর্যন্ত প্ল্যানটাকে কাজে আনা যাছিল না। এতদিনের আকাঙ্ক্ষিত সেই মুহূর্ত— ব্রত উদযাপনের সন্ধিক্ষণ আসন্ন আজ। তার প্ররোচিত আনন্দেই প্রাণহরি আজ চঞ্চল, সমুজ্জ্বল।

বন্ধুদের সকলের কাছেই সে বিদায় নিয়েছে— আপিসে এসেই। যথোচিত বিদায়ী আলাপ করেছে সবার সাথে। তার বিদায়-সংবর্ধনায় আপিসের সবাই ছোটোখাটো একটা সভার আয়োজন করেছিল— খোদ ম্যানেজার সাহেব সভাপতি হয়ে তার প্রশংসায় একটু ভাষণ দিয়েছেন। সবাই মিলে স্মারকচিহ্ন ছোট্ট একটা হাতঘড়ি উপহার দিয়েছে প্রাণহরিকে। ঘড়িটার একধার রুপোলি, আরেক ধার সোনালি। পিছনে নিকেল, উপরে কেমিকেল।

প্রাণহরিও উপযুক্ত প্রত্যুত্তর দিয়েছে সকলের সম্ভাষণের— সধন্যবাদে। কিন্তু তার মন পড়ে আছে অন্যত্র। হাতে স্বর্ণ-রৌপ্য-খচিত ঘড়ি আর মনে খচখচিত সেই প্ল্যান— ঘড়ি ঘড়ি তাকাচ্ছে সে হাতের দিকে। চরম ক্ষণের আর কতক্ষণ বাকি? দেরি কত, কত দেরি আর?

প্রতিহিংসা জিনিসটা কী মিষ্টি! আঃ, এতদিন পরে প্রাণহরি...! প্রাণ থাকতে যে এমন কাজ করতে পারবে, বেঁচে থেকেই দেখে যাবে, বাজিয়ে যাবে বজায় থাকতে থাকতেই— তা সে ভাবতে পারেনি। আর, তার পক্ষে এমন কাণ্ড তার বন্ধুদের তো স্বপ্নেরও অগোচর। সেই অসম্ভব— সেই অসাধ্যই সাধন হতে যাচ্ছে আজ। জিঘাংসা পরিতৃপ্তির সুমধুর আস্বাদ লেগে রয়েছে তার মনে। তার মনের জিভে। শোধ তোলার মধ্যে এমন আমোদ আছে জানত কে!

ইস, কী ঘৃণা না সে পুষে এসেছে এতদিন! কী বিতৃষ্ণাই না! কত দুঃখই না সয়েছে মুখ বুজে এতকাল— শুধু এই দিনটির জন্যই! সে-সবের মূলোৎপাটন হবে আজ— তার সমস্ত ক্ষতির— সব ক্ষতির খতম।

আপিস থেকে ফিরেই সে সিনেমায় গেল— এতদিন পরে, প্রথম অবসরেই। কী আশ্চর্য, ছবিটাও যে তার মনের মতোই! অবিকল যেন তার মনের ছবিই। গল্পের নায়ক অনেকদিন যাবৎ অত্যাচার সয়ে, সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত অত্যাচারীকে খুন করে বসেছে। একেবারে সাবাড় করে দিয়ে তারপরে নিরবচ্ছিন্ন সুখ শান্তিতে কাটিয়েছে তামাম জীবন।

সেও ঠিক তাই করবে। হুবহু তাই। এক চুলও ওর এদিক-ওদিক হবে না। সিনেমা দেখে ফেরার পথেই সে ভেবে নিল, কী করবে। তার এতদিনের শত্রুকে চুলোয় পাঠিয়ে— তার মুখে ছাই দিয়ে তবেই তার শান্তি।

রাত্রে শুতে গিয়েও ভাবল সেই কথাই। না, আর রক্ষে নেই ওর! 'প্রাপ্তে সন্নিহিতে মরণে— নহি নহি রক্ষতি ডু কৃং করণে' মনে মনে সে আওড়াল, আওড়াল আর হাসল। না, কিছুতেই নিস্তার নেই তার দুশমনের। এমন করে সে মতলব এঁটেছে... বজ্র-আঁটনি কিন্তু ফসকা গেরো নয়। কোনোরকমেই ফসকাবার না। সব গেরোর সমাপ্তি আজ।

কিন্তু ঘুম আসছে না কেন কিছুতেই? শত্রু তার হাতের মুঠোয়, তাই বুঝি চোখের পাতায় ঘুম নেই? আর কত— কতই-বা দেরি আর? কতক্ষণই বা! ঘড়িটা টিকটিক করে। তার কানে বাজতে থাকে— ঠিক ঠিক! এগিয়ে আসছে— এগিয়ে আসছে— মুহূর্তের পর তার চিরদিনের শত্রুকে তার বিরাট চড়ের এক ঘায়— একটি চরম আঘাতে— শেষ করে দেবে সে। তার চরম দণ্ড বিধানের পর প্রাণহরির এতদিনকার দুঃস্বপ্ন দূর হবে, তার গলার জোয়াল ভেঙে পড়বে ঝনঝন করে— এক নিমেষে।

জেগে জেগে সে মুক্তির স্বপ্ন দ্যাখে...

সাড়ে পাঁচটা বাজতেই ঘড়িটাও বেজে উঠল... ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং... প্রাণহরির সুখস্বপ্ন খান খান হয়ে গেল সেই আওয়াজে! জেগে উঠল সে, রোজ যেমন জাগে, রোজ যেমন তাকে জাগায় তার ঘড়ি... তারস্বরে... তার মুখের দিকে তার সুখের দিকে একটুও না তাকিয়ে। উঠে বসল সে বিছানার ওপরে— পাগলের মতোই। হাতুড়ি পিটতে লাগল তার বুকে। চোখ-মুখ পাকাল। লাল হয়ে উঠল তার দু-রগ রাগে। রোষকষায়িত হয়ে সে তাকাল একবার ঘড়ির দিকে।

...ক্রিং ক্রিং ক্রিং কিড়িং কিড়িড়িং

তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল প্রাণহরি। ডাকাত-পড়ার মতো ছাড়ল এক চীৎকার! হুংকার ছেড়ে লাফিয়ে পড়ল সে ঘড়ির ঘাড়ে! জাপটে ধরল ঘড়িটাকে। মারল তুলে এক আছাড়!

কিড়িং... কুং— কড়াৎ! মেঝেয় পড়ে চুরমার হয়ে গেল ঘড়িটা, অন্তিম আর্তনাদ ছেড়ে।

প্রাণহরি আবার গিয়ে পাশবালিশ জড়াল। এতদিনের রাগ তার মিটেছে এবার। জিঘাংসা চরিতার্থ আজ। নিজের শত্রুকে নিঃশেষ করেছে সে। সব গঞ্জনা শেষ করে, তারপর নিশ্চিন্তে সে ঘুমোতে লাগল আরামে, ঘড়িটার বারোটা বাজিয়ে এখন নিজেরও— নিজেও বারোটা না বাজিয়ে উঠবে না আজ...

ঘড়ির চক্রান্ত দূর করেছে। কালচক্রের ঘর্ঘর-ধ্বনি স্তব্ধ। তার বদলে তার নাকের ঘড়াঘড়ানি শোনা যায়...

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%