পারফেক্ট

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

মিথিল খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। বুদ্ধিদীপ্ত চঞ্চল চাউনি। সে উজ্জ্বল চোখের চাউনিতে যেন ঝাড়লণ্ঠনও ম্লান হয়ে যায়, মুহূর্তে প্রেমে পড়ে যায় যেকোনও মানুষ। দেখতে ঠিক ইউরোপিয়ান সুন্দরী মহিলাদের মতো। সেরকম ফিগার। ছিপছিপে লম্বা সতেজ চেহারা। একবার তাকালে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েই থাকতে হয়। এত কাছ থেকে দেখেও বোঝার উপায় নেই যে মেয়েটা রোবট। কী আশ্চর্য! এরকমও হয়!

পাশ থেকে সেলসম্যান লোকটা বলে উঠল— ছুঁয়ে দেখতে পারেন।

—মানে?

—বাহ, জীবনসঙ্গী খুঁজছেন, এত আর শাকসবজি কিনতে বাজারে আসেননি! ছুঁয়ে দেখবেন না! জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্পর্শ খুব ইম্পরট্যান্ট। বুঝতে পারবেন ওর কেমিস্ট্রি আপনার সঙ্গে ম্যাচ করে কিনা!— সেলসম্যান লোকটা দাঁত বার করে হেসে বলে উঠল।

তবু একটু দ্বিধা করছিল মিথিলের। কিন্তু তার আগেই মেয়েটা হাত বাড়িয়ে দিয়েছে মিথিলের দিকে। মেয়েটার সে হাত ধরতেই মিথিলের সারা শরীরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। এত ঠিক মানুষেরই হাত। সেই নারীসুলভ কোমলতা যেন মিশে আছে মেয়েটার নরম হাতের স্পর্শে।

মুহূর্তে মেয়েটার গালে যেন লজ্জার লাল আভা দেখা দিল।

দেখে অবাক হয়ে পিছিয়ে এল মিথিল। এত রোবট হতে পারে না!

—আপনি বোধহয় এসব দেখেননি বহুদিন! অনেক অনেক এগিয়ে গেছে এখন রোবটিক্স, আরটিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স। এখন এদের সঙ্গে মানুষের তেমন তফাত-ই বোঝা যায় না!

মিথিল-এর চোখে তবু দ্বিধা দেখে লোকটা সেলস ম্যান সুলভ চাপ বাড়াল। বলে উঠল— রেডি করে দেব?

—না, না, আজ থাক। আরেকদিন এসে দেখে যাব।

—দেখুন আমি বলি কী, নিয়ে যান। সব সময় যে আপনার পছন্দের মতো পাবেন, এটা বলা যায় না! এটা যে আপনার পছন্দ হয়ে গেছে, তা আপনার চোখ দেখেই বুঝেছি। আসলে এই কেমিস্ট্রিটাই আসল। পরে হয়তো আর কখনও পেলেন না। তখন সারাজীবন আপশোস হবে।

মিথিল চুপ করে দাঁড়িয়ে একটু ভাবল। কথাটা সত্যি। এর আগে গত দেড় ঘণ্টায় আরও প্রায় দশটা দেখেছে। কিন্তু এটাই একমাত্র পছন্দ হয়েছে। বেশ ভালোরকম যে পছন্দ হয়েছে, এটা স্বীকার করতেই হবে।

—দশ বছর ধরে মান্থলি ইনস্টলমেন্ট-এ নেবেন। একবারে টাকা দেওয়ার কোনও দরকার নেই। তাছাড়া আপনি আপনার পছন্দ মতো পাঁচ-পাঁচবার পরিবর্তন করে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

—সেটা আবার কীরকম?

—ওহো, ওটাই তো বলা হয়নি! দেখুন এটা একটা দারুণ ব্যাপার। মানুষ মহিলা জীবনসঙ্গিনীর ক্ষেত্রে একবার ঠিক করলেন তো ব্যাস, তারপরে আর কোনও কিছু পরিবর্তন করার উপায় নেই। দেখবেন কিছু দিন পরেই মনে হবে এটা হলে ভালো হত, ওটা হলে ভালো হত। কিন্তু সে তো আর ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করা যাবে না! সেটা কিন্তু এদের ক্ষেত্রে খাটে না। আমরা এখানে এরকম রোবট পাঁচবার আপগ্রেড করার সুযোগ দিই।

—কীরকম ভাবে?— ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হল মিথিলের।

—ধরুন মনে হল বেশিজোরে কথা বলছে। নিয়ে আসবেন, আপনার পছন্দমতো যাতে কথা বলে, সেরকমভাবে সেটিং করে দেব।

—সেরকম করা যায়!

—অবশ্যই। এসবের জন্যই তো আজকাল আর কেউ বিয়ে করছে না। আপনি তো অবিবাহিত, তাই তো?

মিথিল চুপ করে আছে দেখে সেলসম্যান লোকটা একটু অবাক হয়ে বলে উঠল— সে কী। বিয়ে করে ফেলেছেন এর মধ্যে? এখন নিশ্চয়ই পস্তাচ্ছেন!

—না, ডিভোর্স হয়ে গেছে।

—ওহো, তাই বলছি। ওই সব ঝুটঝামেলায় আজ আর কেউ যায়। আমার যত কাস্টমার কেউ আজকাল আর বিয়ে করে না। তাও হয়তো কারও কারও গার্লফ্রেন্ড ছিল। কিন্তু এই সব মডেলের রোবট মহিলাদের দেখার পরে আর কেউ তাদের গার্লফ্রেন্ড-এর দিকে ফিরেও তাকায়নি। কোনওরকম ঝামেলা নেই, শুধু মান্থলি ইনস্টলমেন্ট। একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখুন। যেন শিল্পীর হাতে নিখুঁতভাবে তৈরি শরীরের প্রত্যেকটা অংশ।

একটু দোনামনা করে শেষে কিনেই ফেলল মিথিল। তবে এধরনের রোবট এখনও বেশ দুর্মূল্য। সাধারণের ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে হলেও মিথিলের ক্ষেত্রে সেটা ঠিক খাটে না। মিথিল কম উপার্জন করে না।

বাড়িতে আনার কিছু দিনের মধ্যেই মিথিল বুঝতে পারল ভাগ্য করে পেয়েছে ইন্দ্রাণীকে। হ্যাঁ, ইন্দ্রাণী বলেই ডাকে মেয়েটাকে।

এত উন্নত শ্রেণির রোবট মহিলা গার্লফ্রেন্ড থাকতে এখনও যারা মানুষ গার্লফ্রেন্ড বা বউ খোঁজে তাদের নেহাতই বোকা বলা চলে। মিথিলও যেমন ছিল। কোনওদিন ভাবেইনি এসব কথা। সিনথেটিক গার্লফ্রেন্ড ব্যাপারটাই কেমন যেন ব্রাত্য ছিল মিথিলের কাছে।

এখনকার দিনে আজকাল কেউ তেমন বিয়ে করে না। কী দরকার এত ঝুটঝামেলা দায়িত্ব নেওয়ার। তবে বিয়ে উঠে গেলেও জীবনসঙ্গিনীর জন্য এখনও রোবটরমণীর প্রচলন হয়নি। তবে আগামীদিনে যে সেই দ্বিধা আর থাকবে না, সে বিষয়ে এক দিনেই বুঝতে পেরেছে মিথিল।

দু বছর আগে মিথিলের বিয়ে হয়েছিল গার্গীর সঙ্গে। কিন্তু এক বছর থাকার পরেই সে বিয়ে ভেঙে গেছে। আসলে মিথিল সব ব্যাপারে পারফেকশনিস্ট। সেখানে গার্গী ছিল সবদিক থেকে তার উলটো।

প্রথমে বুঝতে পারেনি। কিন্তু যতদিন গেছে, তত যেন এই খামতিগুলো বেশি করে চোখে পড়েছে।

গার্গী কখনও কোনও জিনিস ঠিক জায়গায় রাখত না। কখনও ভোরে ঠিক সময়মতো উঠত না। কোনও কাজ দিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটা ঠিক সময়মতো শেষ করত না।

অন্যদিকে মিথিল ছিল সব ব্যাপারে পারফেক্ট। যেখানে যা রাখার, ঠিক সেখানে রাখবে। সময়মতো সবকিছু করবে। কোনও কাজ শুরু করলে মাঝপথে ফেলে রাখবে না। শেষ করে তবেই থামবে।

গার্গী ওকে খুব ভালোবাসত। হয়তো মিথিলও গার্গীকে ভালোবাসত। কিন্তু সেটা একটু একটু করে বদলে যাচ্ছিল।

সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল। সেই ফাটলের সুযোগ নিয়ে সেখানে বেড়ে উঠেছিল অশ্বত্থের চারার মতো পারস্পরিক ক্ষোভ-বিতৃষ্ণা। বুকের মধ্যে নিরুচ্চার ক্ষোভের স্বর বাড়ছিল।

একদিন ও লক্ষ্য করল গার্গীর দাঁতও পারফেক্ট নয়। ডানদিকের দুটো দাঁত যেন সামান্য উঁচু। পরে আরেকদিন লক্ষ্য করে দেখল কপালও যেন একটু বেশি চওড়া।

বিরক্তিটা বাড়ছিলই। মিথিলের ধৈর্য এমনিতেই কম। শেষে সবকিছু নিয়ে রীতিমতো কথা কাটাকাটি শুরু হল। কিছুদিনের মধ্যেই মিথিল সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল ডিভোর্সের, যদিও গার্গী সেটা এখনও মেনে নেয়নি। তবে একসঙ্গে থাকত না। কোনও যোগাযোগও আর ছিল না।

ভাগ্যিস এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

এখন ভাবে, কোথায় গার্গী আর কোথায় ইন্দ্রাণী।

ইন্দ্রাণীকে ঘিরে মিথিলের মুগ্ধতা বেড়েই চলল দিনের পর দিন।

কী অপরূপ সুন্দরী! সেদিন একটা জায়গায় গিয়েছিল ওরা দুজনে। চারদিকে সবাই বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছিল ইন্দ্রাণীকে। একজন তো এস্ক্যালেটর থেকে দেখতে গিয়ে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েই যাচ্ছিল। এটা ঠিক যে এরকম সুন্দরী শুধু কলকাতায় কেন কোনও দেশের রাস্তায় সচরাচর দেখা যায় না।

দেখে রোবট তা বোঝার কোনও উপায় নেই। এমনকী সামনে থেকে খুঁটিয়ে দেখলেও বোঝা যায় না। ভাগ্য ভালো যে এখনও এসব জিনিসের দাম সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের তাই সচরাচর এরকম রোবটরমণী দেখার সুযোগ হয় না।

ইন্দ্রাণীর ঠোঁটের কোণে সবসময় একটা লাজুক হাসি লেগে থাকে। দীঘল চোখদুটোতে যেন এক মায়াবী আকর্ষণ। যখন জলপ্রপাতের মতো খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে, তখন চোখ সরানো যায় না।

ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিয়ে গেলেই যেন হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেত মিথিলের। মাঝেমধ্যে স্পর্শের গভীর মুহূর্তে মিথিল ভুলে যেত যে ইন্দ্রাণী মানুষ নয়। ইন্দ্রাণীর পুরো শরীরটাই যেন কোনও জাদুকরের জাদুতে মোড়া, কাছে এলেই সে জাদুর জগৎ থেকে বেরোনো মুশকিল হয়ে পড়ে। তখন ঘণ্টা, মিনিট, সেকেন্ড সব কিছুর বোধ হারিয়ে যায়।

তাছাড়া কত রকমের ফীচার। ইন্দ্রাণীর চুলের গন্ধ ইচ্ছেমতো পালটে নেওয়া যায়। চোখের মনির রঙ ইচ্ছেমতো বদলে নেওয়া যায়। চামড়ার রঙে পরিবর্তন আনা যায়। আরও কত কিছু।

প্রায় দু-তিন মাস একটা ঘোরের মধ্যেদিয়ে কাটল মিথিলের। অফিসের যথেষ্ট সিনিয়র পজিশনে আছে। তবু এর মধ্যেমাঝে মধ্যেই ইন্দ্রাণীর জন্য কারণে-অকারণে ছুটি নিয়েছে। কেন নেবে না?

ইন্দ্রাণী সামনে থাকলেই চারদিকের বিবর্ণতা কেটে গিয়ে দিনটা যেন ঝলমলিয়ে ওঠে। সামনে বসলেই যেন মন ভালোলাগায় ভরে ওঠে।

তাছাড়া গার্গীর মতো কথায় কথায় মান অভিমান নেই। সবকাজ হাসিমুখে সময়মতো করে। কোনও ভুলচুক নেই।

কিন্তু একদিন খেতে বসে ওর মনে হল কথাটা যেন খুব কম বলে। দু-একটা কথা বলার পরেই থেমে যায়। তখন ওই শরীরী আকর্ষণ ছাড়া বাকি সবকিছু ফিকে হয়ে আসে। প্রয়োজনের বাইরে বিশেষ কথা বলে না। যা বলে তা নেহাত ধরাবাঁধা।

খাওয়ার পরে উঠে 'ইন্দ্রাণী'র ওয়ারান্টি চেক করল মিথিল। ভাগ্য ভালো এক বছর ওয়ারান্টি আছে। পাঁচবার পরিবর্তনের সুযোগ আছে তার মধ্যে।

পরের দিনই ইন্দ্রাণীকে নিয়ে সেই 'মনের মানুষ' সংস্থায় গেল মিথিল। এত টাকার জিনিস।

কিছু সেটিং পরিবর্তন করে ওরা আবার এনে দেখাল মিথিলকে। প্রগলভতাও নীরবতার মাঝে এরকম নানান সেটিং আছে। সেটাকে গ্রাহকের ব্যাকগ্রাউন্ড পছন্দ অনুযায়ী ফাইনটিউন করা যায়। বেশ কয়েক ঘণ্টা এদিক ওদিক সেটিং পরিবর্তন করার পরে মিথিলের ঠিক মনঃপূত হল।

ভাগ্যিস গিয়েছিল। তারপর থেকে মাঝেমধ্যেই মিথিলের সঙ্গে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে শুরু করত ইন্দ্রাণী। মিথিলের বিভিন্ন আগ্রহের বিষয় ওর জানা ছিল। সেভাবেই কথোপকথন শুরু করত। সে কথা যেন শেষই হতে চাইত না। ওরা দুজনে পাশাপাশি বসে কথা বলতে বলতে কখন যে দেরি হয়ে যেত তা মিথিলের মতো ঘড়ি মিলিয়ে চলা ছেলেও বুঝতে পারত না।

এরকমভাবে কয়েক মাস চলল। এরপর একদিন ওরা এলকের ধারে ঘুরতে গিয়েছিল। মিথিল ইন্দ্রাণীর হাত ধরে হাঁটছে, হঠাৎ ওর মনে হল ইন্দ্রাণীর আঙুলগুলো যেন ঠিক স্বাভাবিক নয়। লম্বা লম্বা আঙুলগুলো দেখতে খারাপ যে তা নয়, কিন্তু সে আঙুল ধরার পরেই যেন সে উষ্ণতার অনুভূতি হয় না। আঙুলগুলো আড়ষ্ট প্রাণহীন হয়ে থাকে।

পরের দিনই আবার তড়িঘড়ি 'মনের মানুষ'-এ চলে গেল মিথিল। খুব তাড়াতাড়ি একটা সলিউশনও পাওয়া গেল। দুই আঙুলের মাঝের গ্যাপে সামান্য ম্যানুফাকচারিং প্রবলেম ছিল। ইন্দ্রাণী যখন ফিরে এল তখন ইন্দ্রাণীর আঙুল ধরেই মিথিল বুঝল এবারে একেবারে পারফেক্ট।

ঠোঁটটা আপনা থেকেই ইন্দ্রাণীর ঠোঁটের কাছে চলে এল। দীর্ঘ চুম্বন যখন থামল তখন মিথিল-এর মাথায় অন্য একটা চিন্তা এসেছে। আরেকবার কাছ থেকে ভালো করে দেখল ইন্দ্রাণীকে। ঠোঁটটা যেন একটু বেশি আগ্রাসী, মডেলসুলভ ঠোঁট। খুব আকর্ষণীয় এটা ঠিক, কিন্তু ঘরোয়া বাঙালি মহিলাদের মতো আদৌ নয়।

এ জিনিসটা যে ওর আগে চোখে পরেনি কেন কে জানে! অনেক আগেই খেয়াল করা উচিত ছিল।

এবার এটা ঠিক করাটা খুব সহজ হল না। বেশ কয়েকবার ট্র্যায়াল অ্যান্ড এরর করার পরে তবে ঠোঁট ঠিক মিথিলের পছন্দমতো হল।

আরও কয়েক মাস গেল। সে যেন এক স্বপ্নের মতো। ইন্দ্রাণীর নেশায় মিথিল যখন মেতে উঠে, তখন দিনক্ষণের কোনও হিসেব থাকে না। মরুভূমির মধ্যে পথ হারিয়ে অনেক দিন বাদে কোনও মরুদ্যানের সন্ধান পেলে যেরকম হয়।

তবে এরমধ্যে অবশ্য আরও দুবার ইন্দ্রাণীকে 'মনের মানুষ'— এ নিয়ে গিয়েছিল মিথিল। আরও পারফেক্ট জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গড়ে তোলার জন্যে।

কয়েক মাস বাদে একদিন এক পার্টিতে ইন্দ্রাণীকে সঙ্গে নিয়ে গেল মিথিল। আগে সাহস করে কখনও নিয়েনি। যদি এলাকে কিছু মনে করে। মানুষ সঙ্গিনীনা নিয়ে রোবটসঙ্গিনী! তখন মিথিলকে ভাবতেই পারে বিকৃতমস্তিষ্ক পারভারট!

কিন্তু খানিকক্ষণ বাদেই মিথিল বেশ বুঝতে পারল কেউ আন্দাজ করতে পারেনি যে ইন্দ্রাণী মানুষ নয়। নিজে মুগ্ধ দৃষ্টিতে মাঝেমধ্যে তাকিয়ে দেখছিল ইন্দ্রাণীকে। কী সুন্দর সহজাতভাবে সবার সঙ্গে মিশে গেছে। গার্গী স্মার্ট ছিল না। এক কোণে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। ইন্দ্রাণী ঠিক তাঁর উলটো। নিজের থেকে এগিয়ে গিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলছে। সবার মুগ্ধ দৃষ্টি ওকে ঘিরে। যেন এক স্টেজের সব স্পটলাইট ওর উপরে নিবদ্ধ। মনে হচ্ছে যেন এক পরী এসে কোথা থেকে উদয় হয়েছে সাধারণ কিছু মানুষের মধ্যে।

এমনকী মিথিলের টপ বস ম্যানেজিং ডিরেক্টার রাজা শিকদার মজা করে বলে উঠলেন— নাহ, এরকম সুন্দরী স্ত্রী আমার থাকলে আমি তাকে এসব পার্টিতে ভরসা করে নিয়ে আসতাম না। ইউ আর রিয়ালি ফরচুনেট মাই বয়। শুধু রূপ নয়, গুনেও। সব ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। এমনকী গলফ নিয়েও দেখলাম সবরকম খবর রাখে। আমার গলফে আগ্রহ আছে জানো নিশ্চয়ই! কিন্তু সে ব্যাপারে কথা বলার লোকই পাই না। দেখলাম গলফ নিয়ে আমার থেকেও বেশি জানে। তারপর এই মিডল ইস্ট-এর বর্তমানের যাচ্ছেতাই পলিটিকাল সিচুয়েশন নিয়ে কথা হচ্ছিল। তারও সব খবর রাখে। অ্যামেজিং, জাস্ট অ্যামেজিং।

টপবসের কাছে কথাটা লুকনো ঠিক নয়। কোনওদিন ঠিক জেনে যাবেন এ ব্যাপারে। এমন অভিজ্ঞ লোকের চোখেও ইন্দ্রাণী যে রোবট হিসেবে ধরা পড়েনি, এটাই সবথেকে ইন্টারেস্টিং।

তবু মিথিল ইন্দ্রাণী সম্বন্ধে আসল রহস্যটা আর বলল না। না জানাই ভালো। যতদিন গোপন রাখা যায়।

মিসেস শিকদার অবশ্য ইন্দ্রাণীর উপরে অতটা খুশি নন। সেটা এজন্য শুধু নয় যে পুরো পার্টিতে মিস্টার শিকদার শুধু ইন্দ্রাণীর পিছুপিছুই ঘুরেছেন।

তার বাইরেও একটা কারণ আছে।

সেটা হল ইন্দ্রাণীকে কথায় কথায় মিসেস শিকদার জিজ্ঞেস করেছিলেন ওনার পোশাক সম্বন্ধে। —কীরকম লাগছে আমার এই স্কার্টটা?

তাতে ইন্দ্রাণী মুচকি হেসে 'ভালো লাগছে না, মানায়নি। এখনও ওজন অনেক কমাতে হবে।'— বলেছে।

উত্তরে মিসেস শিকদাব-এর মুখ মুহূর্তে কালো হয়ে গিয়েছিল। বিরক্তি না লুকিয়ে উনি ইন্দ্রাণীর সঙ্গে আর কোনও কথা না বাড়িয়ে অন্যদিকে চলে গেলেন।

মিথিল কাছেই ছিল। শোনার সঙ্গে সঙ্গে মিথিলের মুখ বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল।

'মনের মানুষ'-এ আবার নিয়ে যেতে হবে। এ কী ব্যাপার। সামান্য কমনসেন্স নেই! কাকে কখন কী বলতে হয়, সেটুকু জানা নেই!

কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল ওকে তো পাঁচবার অলরেডী নিয়ে যাওয়া হয়েছে 'মনের মানুষ'-এ। ওরা তো এখন আর কিছুই করবে না। তাহলে?

ঠিক এখান থেকেই আবার বিরক্তি শুরু হল মিথিলের। সে বিরক্তি যেন উত্তরোত্তর বাড়তেই থাকল।

একদিন মনে হল— আশ্চর্য মেয়ে ইন্দ্রাণী, এতটুকু সেনস অফ হিউমার নেই। সেজন্য ওর সঙ্গে ঠিক মজাও করা যায় না। খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে ঠিকই কিন্তু মিথিলের মনে হয় সে হাসি পুরোপুরি মেকী হাসি। না বুঝেই হাসে।

শুধু তাই নয়, খুব খারাপ খবর শুনে চোখ থেকে জল বার করে ঠিকই, কিন্তু সেই কান্নার আবেগ যেন তাতে থাকে না। সুখ-দুঃখের, অভিমানের অন্তরঙ্গ অনুভূতিগুলোও যেন ওর ঠিকভাবে জানা নেই।

এত দামি জিনিস। এখনও দশ বছর ইন্সস্টলমেন্ট দিয়ে যেতে হবে। অথচ এরকম 'ইম-পারফেক্ট' জীবনসঙ্গীকে নিয়ে সারাজীবন কাটাতে হবে!

'মনের মানুষ'-এ বেশ কয়েকবার গেল। ওরা কোনও আপগ্রেড করবে না আর! পাঁচবার ম্যাক্সিমাম লিমিট। ফেরত দেওয়ারও কোনও উপায় নেই।

এখন ইন্দ্রাণী, এই ডিফেকটিভ ইন্দ্রাণীকে নিয়েই কাটাতে হবে বাকিটা জীবন। আরও নয় বছর এই মহার্ঘ্য পুতুলের জন্য টাকা দিয়ে যেতে হবে।

সেদিন বিকেলে ফ্ল্যাটের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মিথিল। বাইরের চত্বর থেকে নানান শব্দ আসছে। বাচ্চারা খেলছে। ঘরে ফেরা পাখিদের কলকাকলিতে চারদিক মুখর হয়ে উঠেছে। দূরে রাধাচুঁড়া গাছটা হলুদ ফুলে ঢেকে গেছে। তার নীচে যেন কেউ ফুলের পাপড়ি সাজিয়ে রেখেছে। কিছু দূরে সুইমিং পুলের জলে সদ্য জ্বলে ওঠা ল্যাম্পের আলোর বিন্দুগুলো তিরতির করে কাঁপছে। শেষ বিকেলের সোনাগলা রোদের মুকুট পরে সেজে উঠেছে সার দিয়ে লাগানো ঝাউগাছগুলো। একটা টিয়া 'ট্যা ট্যা' শব্দ করে ডাকতে ডাকতে উড়ে চলে গেল।

কী অপূর্ব দৃশ্য। কিন্তু মিথিলের মনে শান্তি নেই। বারান্দায় ইতিমধ্যে ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ইন্দ্রাণী। মিথিলের ডান হাতটা জড়িয়ে ধরে টেনে নিয়েছে বুকের মধ্যে। সে হাত ছাড়িয়ে নিল মিথিল।

সেই আকর্ষণ যেন হারিয়ে গেছি। সব 'ইম-পারফেক্ট' জিনিস কী শেষে মিথিলের ভাগ্যেই এসে জোটে! দূরে বারান্দার অন্য প্রান্তে সরে এসে দাঁড়াল মিথিল।

এর দু দিন বাদে ইন্দ্রাণীকে গ্যারেজে রেখে দিয়ে এল মিথিল। ওর মুখটাই সহ্য করতে পারছিল না। বারবার মনে পড়ছিল নকল হাসি, হাজারো খুঁতের কথা।

পারফেক্ট না হলে কী আর তাকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে ভাবা যায়!

অধ্যায় ২২ / ২২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%