অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
হোয়াইট ফিলড ম্যানর। মুগ্ধ হয়ে ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। বিশাল বিশাল ঘর। দেওয়ালজুড়ে মার্বেল পাথরের উপরে খুব সুন্দর কাজ। কোনও ঘরে আবার শুধুই ওক কাঠের কাজ। প্রায় সব ঘরেই আছে একাধিক দামি কারুকার্য করা ঘড়ি ও সুদৃশ্য গ্র্যান্ডফাদার ক্লক। অত্যন্ত দামি কাঠের আসবাব। কিছু কিছু ঘরের দেওয়াল জুড়ে ওয়েল পেন্টিং।
এই বাড়ি বা ম্যানসন হাউস 'রথসচাইল্ড' পরিবারের। বিশ্বের সবথেকে ধনী পরিবারগুলোর মধ্যে 'রথসচাইল্ড' পরিবার অন্যতম। প্রায় একশো বছর ধরে অষ্টাদশ শতাব্দীতে এরাই ছিল বিশ্বের সবথেকে ধনী পরিবার। এখন অবশ্য সেরকম অবস্থা নেই। তবুও এখনও এদের নানান ব্যবসা, ব্যাংক থেকে ওয়াইন প্রস্তুতি সারা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে।
এই ম্যানর হাউসে অবশ্য ওই পরিবারের কেউ এখন থাকেন না। শুনেছি বছরে কয়েকদিনের জন্য পরিবারের কয়েকজন আসেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই পুরো প্রাসাদ এমন সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা থাকা পুরো বছর। এই রক্ষণাবেক্ষণের কাজটা ওদের অবর্তমানে একটা ট্রাস্ট করে। সেই ট্রাস্টকেই দান করে দিয়েছে ওরা।
বাড়ির একটা ঘরে, খুব সম্ভবত সেটা পড়ার ঘরই হবে, বুককেসের সামনে দাঁড়িয়ে বইগুলো দেখছিলাম। ১৭০০ সাল থেকে শুরু হয়েছে। দুর্মূল্য সব বই। বেশ কিছু বই এই পরিবারের উপরে। ইজরায়েলকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার পিছনে এই পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এরকম আরও নানান তথ্য।
বইটা পড়তে গিয়ে বেশ বুঝতে পারছিলাম যে এই পরিবারের সঙ্গে সেই সময়ের বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতাদের ওঠাবসা ছিল। একই সঙ্গে দেশবিদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করত এই পরিবার। এই পরিবারের শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে ছিল ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।
বইটা এতই আবিষ্ট করে রেখেছিল যে খেয়াল করি নিবাইরে অন্ধকার হয়ে এসেছে। গ্র্যান্ড ফাদার ক্লকে সময়টা দেখে আরও চমকে উঠলাম, সন্ধে ছ'টা।
সাড়ে পাঁচটায় এই ম্যানর হাউস বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কোনও অ্যানাউন্সমেন্ট হল না তো!
এবারে কেন সেটা শুনিনি সেটা বুঝতে পেরে নিজের সারা শরীরে একটা শিহরণ খেলে গেল।
কী করে শুনব! এতক্ষন একটা নয়েজলেস হেডফোন কানে গুঁজে ঘুরছিলাম আর তাতে গান শুনছিলাম। বাইরের কোনও শব্দ আমি শুনতে পাইনি।
বিশাল বিশাল কাচের জানলার সামনে পর্দা ঝুলছে। সরিয়ে দেখলাম, বাইরে আলো কমে এসেছে। কোনও লোকও দেখতে পেলাম না।
ওই ঘর থেকে বেরোতে যাব, ঠিক এমন সময় এক বছর ষাটের ভদ্রলোককে দেখে খানিকটা স্বস্তি পেলাম। ভদ্রলোক পাশের ঘরে একটা সোফায় বসে আছেন। একটু অবাক হলাম। এমনিতে এসব সোফায় না বসাই নিয়ম।
তবে বয়স্ক মানুষ, সেই জন্যেই হয়তো ক্লান্ত হয়ে বসেছেন। লক্ষ করলাম বেশ অভিজাত চেহারা। মাথাভর্তি সাদা চুল। সাদা শার্টের উপরে একটা দামি লং কোট।
উনি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলে উঠলেন— কী রথস চাইল্ড দের ইতিহাস পড়ছিলে?
মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালে বলে উঠলেন— আসলে কী জানো, বইতে অনেক কিছুই লেখা হয় না। এই পরিবারকে নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। সেটা জানো তো?
—হ্যাঁ, কিছু শুনেছিলাম। যেমন এই পরিবার নাকি একটা সময় পৃথিবীর সববড় বড় ঘটনা, এমনকী যুদ্ধ বিগ্রহ কোনও কোনও দেশের মধ্যে কবে হবে, তাও নাকি ঠিক করত, যাতে এদের ব্যবসার সুবিধে হয়?
হেসে উঠলেন ভদ্রলোক।— ঠিকই বলেছ। এরকম ধারণা আছে। তবে এগুলো হল শুধুই ধারণা। কন্সপির্যা সি থিয়োরি।
একটু থেমে ফের বলে উঠলেন—তবে আমি কে জানো?
—কে আপনি? আপনি কী এ পরিবারের কেউ?
—হ্যাঁ, আমি এই পরিবারের একজন। সেজন্য এমন অনেক কিছু জানি যা কোনও বইতে লেখা থাকবে না। আমি লুইস রথসচাইল্ড।
এবারে আমার বিব্রত হওয়ার সময়। তাহলে কী আমি ভুল করে এই বাড়ির প্রাইভেট অংশে, অর্থাৎ যেখানে এঁরা এসে থাকেন, সেই অংশে চলে এসেছি?
বলে উঠলাম।— আমি সময় খেয়াল করিনি। দেরি করে ফেলেছি। আমার একটু আগেই বেরিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। আপনাকে বিরক্ত করলাম। আসলে
—আরে না, না, আমার ভালোই লাগছে। এই যে তুমি বইটা নিয়ে এতক্ষণ এত মন দিয়ে পড়ছিলে, সেটা দেখেই আমার তোমার সঙ্গে আলাপ করার আগ্রহ হল। এই—এই সোফাটায় বসো।— বলে ভদ্রলোক সামনের একটা সুদৃশ্য কাঠের চেয়ারে বসতে বললেন।
কী যে ছিল সে অনুরোধের মধ্যে কে জানে! বসতে বাধ্য হলাম। এই ঘরটাও বেশ বড়। মনে হয় অতিথিদের জন্য এই ঘরটা ছিল। একদিকে বড় কারুকাজ করা বিশাল খাট।
ঘরের অন্য দিকে বেশ কয়েকটা পুরনো দিনের কাজ করা কাঠের চেয়ার ছড়িয়ে আছে। এছাড়া আছে একটা বড় লাল সোফা, গ্র্যান্ড ফাদার ক্লক, মাটিতে পাতা দামি উলের কার্পেট, কোণে একটা বিশাল পিয়ানো, তার পাশে এক মার্বেলের মূর্তি।
দেওয়ালে কয়েকটা ওয়েল পোট্রেট আছে, যেখানে খুব সম্ভবত এই পরিবারের কয়েকজনের ছবি আছে।
উনি ফের বলে উঠলেন— বলতে পারো সারা বিশ্বের আধুনিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা আমরাই চালু করেছিলাম। সে প্রায় আড়াইশো বছর আগে।
বলে উঠলাম— শুনেছি এই পরিবারের জন্য নাকি নেপোলিয়নের হার হয় ১৮১৫ সালে ওয়াটারলুর যুদ্ধে।
—আমরা ইংরেজদের অর্থসাহায্য করেছিলাম, তবে তার বেশি কিছু নয়। আমরা তখন অস্ট্রিয়া, জার্মানি, ফ্রান্সের মতো বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিলাম। যুদ্ধতে আমাদের কোনও আগ্রহ ছিল না। তবে হয়তো এইভাবে অর্থসাহায্য করা উচিত হয়নি।
—এতে নিরপেক্ষতা অবশ্যই নষ্ট হয়।
—হ্যাঁ, সেটা ঠিক। আসলে একটা বড় সময় জুড়ে আমরাই ছিলাম বিশ্বের সবথেকে ধনী পরিবার। অর্থ আর রাজনীতি সবসময় খুব কাছাকাছি চলে আসে। সেজন্যই একটা সময় এসব কারণে আমাদের পরিবারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমরা তারপরে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সবক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখব। কিন্তু মানুষ কোনওদিনই আমাদের সেভাবে বিশ্বাস করেনি।
—কেন?
—আমাদের বিরুদ্ধে অনেকেই অপপ্রচার চালিয়েছিল যার মধ্যে হিটলার আর নাৎসিরাও ছিল। আসলে ওরা আমাদের পরিবারের এই অর্থ-ক্ষমতা-প্রতিপত্তি সহ্য করতে পারেনি। হয়তো আমরাই দায়ী লক্ষ লক্ষ ইহুদিদের মৃত্যুর জন্য। আমাদের জন্যই ওদের উপরে রাগ আক্রোশ গড়ে উঠেছিল।
—কেন? আপনাদের উপরে এত রাগের কী কারণ ছিল?
—আসলে একটা অংশ অপপ্রচার করেছিল যে আমাদের জন্যই জার্মানির এত খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থা। আমি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের সময়ের বলছি। অনেকের ধারণা হয়েছিল আমরা সবকিছুই করি আমাদের ব্যবসার কথা মাথায় রেখে। বুঝতেই পারছ ধনীদের শত্রুর অভাব হয় না।
—কিন্তু আপনারা তো পারতেন সাধারণ ইহুদিদের বাঁচাতে?
ঘাড় নাড়লেন ভদ্রলোক।— না, পারতাম না। মানুষের মধ্যেই যে এরকম শয়তান বাস করে, তা আগে জানতাম না। আমাদের পরিবারের সবাই পালিয়ে গিয়েছিল ১৯৩৮ সালে আমেরিকায়। শুধু আমিই থেকে গিয়েছিলাম।
—আপনি এখানে ছিলেন?
—না, আমি প্রথমে ছিলাম অস্ট্রিয়ায়। পরে পালিয়ে প্রূসিয়ায় চলে আসি। পুরো সময়টা পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল। আমাদের অস্ট্রিয়ার ব্যাংক জলের দরে বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। আমাদের দুর্মূল্য আর্ট কালেকশন নাৎসিরা জোর করে নিয়ে গিয়েছিল। শুধু ছবি নয়, আরও অনেক কিছুই কেড়ে নিয়েছিল, যার মধ্যে কিছু দুর্মূল্য জুয়েলারিও ছিল।
—কিছু প্রতিবাদ করেননি!
—সেটাই ভুল ছিল। আমরা চুপ করে মার খেয়েছিলাম। আমরা সবাই ভেবেছিলাম সংঘাতে না যাওয়াই বোধহয় ভালো রাস্তা। এতে নিজেদের প্রাণ বাঁচানো যাবে। যদি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতাম, সংঘবদ্ধভাবে ওদের বিরুদ্ধে লড়াই করতাম, তাহলে এই অবস্থা হত না। ষাট লক্ষ ইহুদি অকারণে মারা যেত না ওই নাৎসিদের হাতে।
আরও কিছু কথা বলার পরে বেরোতে চাইলাম।
উনি যেন অবাক হয়ে বলে উঠলেন— সে কী এই তো সবে কথা শুরু হল। তুমি কী দাবা খেলতে পারো?
কিছু দূরে একটা কাঠের টেবিলের উপরে একটা দাবার বোর্ড রাখা ছিল। সেটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে হয় আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে উনি বুঝতে পেরেছেন।
সম্মতি জানাতে বলে উঠলেন— দারুণ, চলো একটা গেম হয়ে যাক।
—এখন?
—হ্যাঁ, দাবা যেকোনও সময়ে খেলা যেতে পারে।
উঠে গিয়ে বোর্ডটা নিয়ে এলাম। আমাদের মাঝের টেবিলের উপরে রাখলাম। বেশ দামি কোনও মেটালের গুটি। প্রত্যেকটা গুটি যেন কোনও শিল্পীর অসামান্য হাতের কাজ। এমনকী প্রত্যেকটা বোড়ে বা সাধারণ সৈন্যও নিখুঁতভাবে তৈরি। তবে একটা জিনিস দেখে খুব অবাক লাগল।
বলে উঠলাম— এর গুটিগুলো সব এক রঙের। কোনওটা সাদা, কোনওটা কালো?
ভদ্রলোক হেসে বলে উঠলেন,— ঠিক বলেছ, এটাই এই দাবার বোর্ডের বৈশিষ্ট্য। সব গুটি এক রঙের। সাদা গুটি বা কালো গুটি নেই। যে খেলবে তাকে তার নিজের গুটি খেয়াল রখতে হবে, মনে রাখতে হবে কোনওটা তার।
—কিন্তু এরকম কেন?
ভদ্রলোক যেন একটু দার্শনিক হয়ে গেলেন। আস্তে আস্তে বলে উঠলেন— আসলে দাবা হল আমাদের মানবজীবনের মতোই। এখানে এসব গুটি হল, আমার তোমার মতো মানুষ। কেউই শুধু সাদা নয়, কেউই শুধু কালো নয়। সবার চরিত্র ভালো খারাপ মিশিয়ে।
বলে চাল দিতে দিতে ফের কথা বলতে থাকলেন।— আমাদের পরিবারের সবাই পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি যাইনি। ভেবেছিলাম কিছুদিনের মধ্যে এসব কেটে যাবে। কিন্তু সে পরিবর্তন চট করে এল না। হিটলার ঝড়ের বেগে একের পর এক দেশ জয় করে চলল। আমিও পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে লাগলাম। তখনই বুঝলাম নাৎসিদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য আমি। হিটলারের পরেই সবথেকে শক্তিশালী যিনি ছিলেন নাৎসিদের মধ্যে, সেই হারমান গোরিং ও তার পুরো সিক্রেট পুলিশ 'গেস্টাপো' ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাকে খুঁজে বার করতে।
—কিন্তু আপনি তো ইউরোপ ছেড়ে পালাতে পারতেন।
—না, যখন বুঝলাম, তখন সেই সুযোগ চলে গেছে। তাছাড়া বুঝতেই পারছ, আমি কোনও সাধারণ ইহুদি ছিলাম না। আমার মুখ অনেকের কাছেই পরিচিত। কীভাবে বেরোব? তখন চারদিকে ইহুদিদের নিধনযজ্ঞ চলছে। আমি আবার ওদের মূল নিশানা।
—তারপর কী করলেন?
একটু থেমে বলে উঠলেন— শেষে একটা লোককে অনেক টাকা দিয়ে একটা বাড়ির চিলেকোঠার ঘরেরকোণে আশ্রয় পেয়েছিলাম। সেখানে ছিলাম বেশ কয়েক মাস। সে লোকটাই খাবার ও অন্যান্য দরকারি জিনিস দিয়ে আসত আমার জন্যে। কিন্তু একদিন সে লোকটা এল না। তার পরের দিনও এল না। কয়েকদিন বাদে খিদের চোটে বাধ্য হলাম আমার সেই হাইড-আউট থেকে বেরোতে। বাড়ির দোতলার একটা ঘর থেকে খাবার চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলাম এক এস এস গার্ডের হাতে। বুঝতেই পারছ, আমি তখন ভেবেই নিয়েছিলাম আমার নিশ্চিত মৃত্যু। ওদের কাছে মানুষ মারা পিঁপড়ে মারার মতো। সম্পূর্ণ বিনা কারণে গুলি করে মারত। কিন্তু ভাগ্য এমন বেঁচে গেলাম।
—কী ভাবে? ছেড়ে দিল?
—হ্যাঁ, সেটাই বলছি। সে লোকটা আমাকে দেখে অবাক হয়ে আমি কীভাবে ওখানে এতদিন লুকিয়ে আছি জানতে চাইল। বাধ্য হলাম চিলেকোঠার কোণে আমার সেই লুকোনো জায়গাটা দেখাতে। সেটা দেখতে গিয়েই ও প্রথম দেখল আমার আঁকা বিভিন্ন ওয়েল পেন্টিং, যা ছিল ওখানে আমার সময় কাটানোর একমাত্র উপায়।
—আপনি ছবি আঁকতেন?
—শুধু আঁকতাম না। বেশ ভালোই আঁকতাম। এই পরিবারের সন্তান না হলে আমি হয়তো আর্টিস্টই হতাম। এই যে এ ঘরের পেন্টিংগুলো দেখছ, তার মধ্যে কয়েকটা আমার আঁকা।
বলে ঘরের কয়েকটা ছবি আঙুল তুলে দেখালেন।
আমি অবাক হয়ে কাছে গিয়ে দেখলাম। সত্যি অসাধারণ তুলির ছোঁয়া।
বলে উঠলাম— তার পরে? সেই লোকটা ছবি দেখে কী করল?
—লোকটার নাম কী ছিল জানি না। কিন্তু কেন জানি না শিল্পীদের খুব কদর করত। মনেহয় নিজেও আঁকত। আমাকে শুধু সে জন্যেই মারেনি। অথচ পরে জেনেছিলাম লোকটা নাকি প্রচণ্ড নিষ্ঠুর ছিল। কত ইহুদিদের মেরেছে তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু সেই লোকটাই আমি শিল্পী বলে আমার কথা অন্য কাউকে জানাল না। আমাকে মারল না। মাঝেমধ্যে এসে এমনকী আমার আঁকার সরঞ্জাম, খাবার, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে যেত। এভাবে আরও কয়েক মাস ছিলাম। শেষে রাশিয়ান রেড আর্মি এসে আমাকে মুক্ত করে। তারপরে আমি এদেশে চলে আসি।
—আচ্ছা, তখন আপনার বয়স কী খুব কম?
—না, না, তখন আমি আটষট্টির কাছে।
অবাক হলাম।— তাহলে এখন আপনার বয়স কত? এখনও তো বয়স ওরকমই লাগে।
ভদ্রলোক হেসে উঠলেন— হ্যাঁ, আমার আর বয়স বাড়েনি। ওই আটষট্টিতে আটকে আছে। এদেশে আসার পরে প্রায় দেড় মাস খুব ভালোই ছিলাম। কিন্তু আমার এক অত্যন্ত প্রিয়জন আমার খাবারে বিষ মিশিয়ে আমাকে হত্যা করে।
—মানে? —চমকে উঠি। ভয়ে তখন আমার গলা কাঠ হয়ে গেছে।
—মানে হল আমাকে মেরে ফেলে। নীচে সেলারে একটা লুকোনো ঘর আছে। ওখানে আমি আজও শুয়ে আছি।
আমার মুখ-চোখের চেহারা দেখে ভদ্রলোক ফের বলে ওঠেন— আহা, অত ভয় পাচ্ছ কেন? এখনও এই ম্যাচটা বাকি আছে। এজন্যই বলেছিলাম মানুষের চরিত্রে? সাদা-কালো, ভালো মন্দদুটো রঙই মেশানো থাকে। আমি কী ভেবেছিলাম যে আমার ওই অত্যন্ত প্রিয়জন আমার খাবারে বিষ মিশিয়ে আমাকে মারবে!
—কে ছিলেন তিনি?
ভদ্রলোক আঙুল তুলে দেখালেন। চমকে উঠলাম, অন্ধকারের মধ্যে ঘরের খাটের উপরে মাঝবয়সি এক সুন্দরী মহিলা বসে আছে।
ভদ্রলোক বলে উঠলেন— আমার স্ত্রী। ওই বিষ মিশিয়েছিল। সেটা অবশ্য বাইরের কেউ জানতে পারেনি। তাদের ধারণা আমি ওই নাৎসিদের হাতেই মারা গিয়েছিলাম।
ঘুম যখন ভাঙল, তখন দেখি সকাল হয়ে এসেছে। আমি শুয়ে আছি ওই ঘরের খাটের উপরে। সূর্য উঠবে উঠবে করছে। আকাশ রক্তিম হয়ে উঠেছে। একটা টেবিলের উপরে দাবার বোর্ডটা পড়ে আছে।
স্বপ্নই দেখছিলাম হয়তো।
কিন্তু চারদিকে তাকাতেই দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবিতে গতকাল রাতে দেখা সেই ভদ্রলোকও সেই মহিলাকে খুঁজে বের করতে বেশি সময় লাগল না।
নীচে লেখা লুইস রথসচাইল্ড অ্যান্ড মারটিনা রথসচাইল্ড।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন