গেম ওভার

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

গেম ওভার! গেম ওভার!

হঠাৎ রাস্তা থেকে চিৎকারের আওয়াজে চমকে উঠল রূপম।

—কি টি ২০ ম্যাচ শুরু হয়ে শেষ হয়ে গেল, আর তুমি ডাকো নি?— বিছানা ছেড়ে তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে রূপম।

—ধুর! সারাদিন মাথায় শুধু ক্রিকেট আর ক্রিকেট! আরে না, না। সেসব নয়। ও হল গবা পাগলা। ছেলে হারিয়ে যাওয়ার পর থেকেই মাথা খারাপ। মাঝেমধ্যেই ওরকম চেঁচাতে চেঁচাতে যায়।

—কিন্তু গবা পাগলা ওরকম 'গেম ওভার' গেম ওভার' বলে কেন মা?

—কে জানে? তবে তুমি গবা পাগলা বলো না। গবাদাদু বলো। ওর ছেলে অমলদাদা, সে বহু বছর আগের কথা, হঠাৎ করে হারিয়ে যায়। আমার বয়স তখন চার-কি পাঁচ। আমার থেকে বছর তিনেক বড় ছিল। কত খোঁজাখুঁজি হল। কিন্তু পাওয়া গেল না। তবে থেকে নিরুদ্দেশ। আর ছেলে হারিয়ে ওর মাথাটাও খারাপ হয়ে গেল।

দুদিন হল রূপম ওর মামাবাড়ি বসিরপুর এসেছে।

বসিরপুর বসিরহাট থেকে এক ঘণ্টার রাস্তা। একটা ছোট গ্রাম। গ্রাম মানে সত্যি গ্রাম। এখনও এখানে শুধু শুক্রবারে হাট বসে। পাশ দিয়ে একটা ছোট তিরতিরে নদীও বয়ে গেছে। সেদিন গিয়েছিল রূপম। গিয়েই মনে হয়েছিল রবি ঠাকুরের 'হাট' কবিতাটা যেন এখানেই লেখা। 'হাট বসেছে পদ্মাপারে, বক্সী গঞ্জে পদ্মাপারে।'

একটাই মুদির দোকান আছে। গ্রামে স্কুল নেই বলে পাশের গ্রামে তিন মাইল হেঁটে স্কুল যেতে হয়। বটতলাতে বিকেল হলেই তাসের আসর বসে। সন্ধে হলেই সারা গ্রাম যেন চাঁদ আর তারার আলোয় ঘুমিয়ে পড়ে।

কলকাতায় স্কুলের ছুটি হলেই রূপম এখানে চলে আসে। কলকাতায় বড় রাস্তার উপরে রূপমদের ফ্ল্যাট। বাড়ি থেকে বেরোলেই বাস-গাড়ি, অনেক লোকজন। ব্যস্ত রাস্তা। মা-বাবা ওখানে তাই একা বেরোতে দেয় না।

শুধু স্কুল আর বাড়ি। এর বাইরে আর কোথাও যাওয়ার উপায় থাকে না। এখানে এলে মজা হয় রূপমের। যেখানে ইচ্ছে যেতে পারে। এ যেন একটা অন্য জগৎ।

সারা দিন বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। কিছু দিনের জন্য কোনও বাধানিষেধ থাকে না। এখানে চারদিকে এখনও বেশ জলা-জঙ্গল। অমলের শখ বিভিন্ন গাছের পাতা সংগ্রহ করা। এটা একটা নেশার মতো।/ মার বারণ তাই কে শোনে! সারাদিন একা একা জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। অচেনা গাছ খুঁজে বেড়ায়।

সেদিন রাতে মা আবার বলে উঠল— যেখানে সেখানে যাসনি! বসিরপুরে অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে। সকালে শুনলি তো অমলের কী হয়েছিল!

রূপমের দাদু হেসে বলে উঠল— মনি, ওসব ভয় দেখাসনি তো! কবে কী হয়েছিল! আমার তো ধারণা গবার সে ছেলে পুকুর টুকুরে পড়ে গিয়েছিল।

—কিন্তু সব জায়গা খোঁজাখুঁজি তো হয়েছিল। কোথাও তো কিছু পাওয়া যায়নি।

—কে জানে হয়তো এখনও কোথাও বেঁচে আছে— বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল রূপমের দাদু।

বলা বাহুল্য মায়ের কথা শোনে নিরূপম। সকাল সকাল আবার বেরিয়ে পড়েছে। তাছাড়া এখানে বাড়িতে বসে করবে টাই বা কি! ফোনের নেটওয়ার্কও নেই।

সেদিন দুপুরেই লোকটাকে প্রথম রূপম দেখল। জঙ্গলের ভিতরে। হারু কাকুর মতো বয়সে হবে। মানে ওই পঞ্চাশ কি ষাট। টাক মাথা। সাদা দাড়ি। চোখ দুটো খুব উজ্জ্বল। হাড় জিরজিরে চেহারা। দেখে ঠিক গ্রাম্য লোক মনে হয় না। গায়ে একটা খানিক ছেঁড়া আধময়লা সাদা জামা। এই কি গবা দাদু? কে জানে!

একটা বিশাল বট গাছের থেকে কিছুটা দূরে মাটিতে শুকনো পাতার উপরে বসে আছে। পাশেই একটা আধভাঙা চওড়া ইটের দেওয়াল। উচ্চতায় ফুটআটেক হবে। মনে হয় খুব পুরনো কোনও বাড়ির ধ্বংসাবশেষ।

রূপম লোকটার নাম জিজ্ঞেস করতে বলে উঠল— নাম নেই। হয়তো ছিল। কাজে লাগে না। ভুলে গেছি।

আশ্চর্য উত্তর।

লোকটা এখানে এই জঙ্গলের মধ্যে বসে কী করছে?

—আচ্ছা, এখানে কি কোনও পুরনো বাড়ি ছিল আগে? — ইটের দেওয়াল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল রূপম। তারপরে উত্তর না পেয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল ওই দিকে।

লোকটা তড়াক করে লাফিয়ে উঠে রূপমের হাত টেনে ধরে বলে উঠল— খবরদার, দেওয়ালের এই ফোকরটার কাছাকাছি আর যেও না খোকা!

—কেন? কী আছে ওখানে?

—সব বুঝিয়ে বলা যাবে না। কিন্তু ফোকর দিয়ে ওদিকে গেলেই গেমের বাইরে চলে যাবে। ব্যাস, তারপরেই সব শেষ। সে জন্যই তো এখানে বসে বসে পাহারা দিচ্ছি।

—কিসের গেম? কী শেষ? কী পাহারা দিচ্ছ?— কিছুই না বুঝে একগাদা প্রশ্ন করে বসল রূপম।

লোকটা উত্তর দিল না। দেওয়ালটার ফোকরটার নীচে গা ঘেঁষে বসে পড়ল।

রূপম কিছু সময় দেওয়ালটার চারদিক দিয়ে কয়েকবার ঘুরে ফিরে এল। দেওয়ালটার অন্য দিকে বেশ ঘন জঙ্গল। ঝোপে আগাছায় এমন ভাবে ঘিরে রেখেছে যে অন্যদিক দিয়ে দেওয়ালটার কাছে যাওয়ার জো নেই। মনে হয় এখানে খুব পুরনো কোনও বাড়ি ছিল। এখন শুধু ভাঙা দেওয়ালটাই পড়ে আছে।

খানিকবাদে রূপম ফিরে এসে দেখল লোকটা দেওয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। দ্বিতীয়বার কাছে যাওয়ার সাহস হল না। আবার যদি তেড়ে আসে। কিই বা থাকতে পারে ওদিকে? গুপ্তধন?

ও শুনেছে পুরনো অনেক বাড়িতে গুপ্তধন থাকে। হয়তো অন্য দিকে এক ঘড়া মোহর আছে। লোকটা হয়তো তাই আগলাচ্ছে।

রূপম বাড়ি ফিরে ওই জায়গাটার কথা বলেছিল। কেউ বুঝতে পারেনি।

মা বকেছিল— ওসব জায়গায় অনেক সাপখোপ থাকে। যেখানে সেখানে একদম যাবি না।

রূপম লোকটার কথা আর বলেনি। কোথাকার কে পাগল! মা আরও বেশি চিন্তা করবে।

পরের দিন সকালবেলা রূপম ওখানে আবার খুঁজে খুঁজে গেল। খুঁজে পাওয়াটা অতটা সোজা ছিল না অবশ্য। কিন্তু যাতে খুঁজে বার করতে পারে, তার জন্য গতকালই কিছু চিহ্ন রেখে এসেছিল। ওর কাছে একটা ছোট ছুরি ছিল। সেটা দিয়ে গাছের গায়ে পথ চেনার জন্য দাগ কেটে রেখে এসেছিল ও। কিন্তু কাছে যেতেই আজও রূপম হতাশ হল। সেই লোকটা এখনও বসে আছে। একইভাবে যেন পাহারা দিচ্ছে।

খানিক বাদে ফের ফিরে আসতে হবে। কিছু দূরে একটা বড় আমগাছ আছে। খানিকটা খোলা জায়গা। ওখানে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল রূপম।

বেশ কয়েকটা সাদা পায়রা সামনের খোলা জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ কিছু খাবার দিয়েছিল। এখন অবশ্য কেউ নেই সেখানে। রূপম আস্তে আস্তে একটা পায়রার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু ধরার আগে ওরা সব উড়ে গেল। রূপম চুপ করে একটা গাছের পিছনে লুকিয়ে রইল। খানিকবাদে আবার কয়েকটা পায়রা ফিরে এল। ওরা অন্য দিকে মুখ করে খাচ্ছে। নিঃশব্দে আবার একটাকে ধরতে এগিয়ে গেল রূপম। কিন্তু কাছে যেতে না যেতেই আবার সব ক'টা উড়ে গেল। এমনিতে ধরে খানিকবাদে আদর করে ছেড়েই দিত রূপম। কিন্তু ওরা টের পায় কী করে!

আবার গাছের পিছনে এসে লুকোয় রূপম। হঠাৎ এমন সময়ে পিঠে হাত। চমকে উঠল রূপম। পিছনে সেই লোকটা। মুচকি মুচকি হাসছে।

বলে উঠল— ভাবছ ওরা কী করে টের পেয়ে যাচ্ছে। তাই তো? আসলে ওই যে মাটিতে যে ক'টা পায়রা দেখছ, তার বাইরে আরেকটা পায়রা আছে। ওই দূরের জামগাছটার দিকে তাকাও।

—কই, কিছু তো নেই।— বলতে বলতে রূপম টের পেল।— সত্যি আছে আরেকটা পায়রা। পাতার আড়ালে।

—ওই পায়রাটা আসলে লক্ষ্য রাখছে, যাতে এদের কোনও বিপদ না হয়। তুমি যখন কাছে যাচ্ছ, ও ওদেরকে সাবধান করে দিচ্ছে। পাখিরা এভাবেই পাহারা দেয়। যে পাখিটা গাছের সবথেকে উপরে থাকে, তার দায়িত্ব থাকে অন্যদের পাহারা দেওয়ার। সে অন্যদের উপরে নজর রাখে। কোনও বিপদ বুঝলেই সে অন্যদের জানিয়ে দেয়। তাই তো আমরা ধরতে পারি না।

—কিন্তু কোনও আওয়াজ করছে না তো?

—সেটাইতো মজা। আমরা ওর সংকেত বুঝতে পারছি না। কিন্তু মাটিতে যে কটা পায়রা আছে, তারা ঠিক ওর সংকেত বুঝে যাচ্ছে। তাই ওরা উড়ে যাচ্ছে। তুমি যেদিক দিয়েই যাও না কেন। ও হল ওদের পাহারাদার। আমিও যেমন তোমাদের জন্য।

—কিন্তু তুমি কি পাহারা দাও? ওখানে তো শুধু জঙ্গল।

লোকটা ফের হাসল। —বিপদ আছে বলেই তো আমি পাহারা দিচ্ছি।

—কিসের বিপদ?

—সে বলা যাবে না। কিন্তু একবার ওদিকে গেলে আর ফেরা যায় না।

—কেন?

লোকটা হেসে বলে উঠল— আমরা সবাই একটা গেমের মধ্যে আছি। কিন্তু বুঝতে পারি না। কিন্তু গেমের কিছু রুল আছে। রুল ভাঙলে আর ফেরত আসা যায় না। ওটা ধরে নাও সেরকমই একটা রুল ভাঙা।

—কিসের গেম?

রূপমের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে লোকটা দ্রুত পায়ে আবার ওই দেওয়ালের দিকে এগিয়ে চলল। বেশ গুছিয়ে কথা বলে লোকটা। কিন্তু বদ্ধ পাগল।

এর পর থেকে রূপম রোজ গিয়ে বিভিন্ন সময়ে ওই জায়গাটা দূর থেকে দেখত। কিন্তু লোকটা সারাদিন যেন দেওয়ালটার ওই ফোকরটাকে আগলে বসে আছে। এমনকী কখনও সুযোগ আসবে না, যখন ওই লোকটা থাকবে না!

সে সুযোগ অবশেষে এল। সেদিন ছিল কলকাতায় ফেরার আগের দিন। কিছুক্ষণ আগে অবধি ভারী বৃষ্টি হয়েছে। সেদিন রূপম তাই বিকেলের দিকে ওই জায়গাটায় গিয়েছিল। বৃষ্টিতে মাটি থেকে সোঁদা গন্ধ বেরোচ্ছে। বেশ কিছু জায়গা জল কাদা হয়ে গিয়েছে। ভিজে পাতায় সাবধানে পা ফেলে এগোতে হচ্ছে। কিছু জায়গা বেশ পিছল।

ওখানে গিয়ে নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিল না রূপমের। লোকটা নেই। হয়তো ভেবেছে এই বৃষ্টি বাদলার দিনে এখানে আর কে আসবে!

রূপম কাছে এগিয়ে এল। দেরি না করে ফোকরটার মধ্যে দিয়ে মাথা বাড়িয়ে তাকিয়ে অবাক হল। অন্য দিকে যেন ভারী অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হাতে ভর দিয়ে পাটা কোনওরকমে তুলে অন্যদিকে লাফ দিল রূপম। উলটো দিকের মাটি খুঁজে পেল পা। কিন্তু পরক্ষণেই রূপমের মনে হল, ও কোথায়!

এ দিকে হঠাৎ এত অন্ধকার কেন? আকাশ যেন ঘন মেঘে ঢেকে আছে। অনেকক্ষণ তাকানোর পরে আকাশের তারাগুলো ধরা দিল। একটু একটু করে। সেরকম জঙ্গলও নেই। এ কোথায় এল ও?

মাথা ঘুরিয়ে পিছনের দিকে দেখে চমকে উঠল। কোথাও তো কোনও দেওয়াল নেই। কোনও বড় গাছ নেই। শুধু ঘাসজমি। যতদূর দেখা যায়, ততদূর। সে ঘাসজমি দিগন্তরেখার সঙ্গে মিশে গেছে। দূরে অন্ধকারে একটা পাথরের উপরে একটা ছেলে বসে আছে। রূপমের থেকে একটু ছোট হবে। আস্তে আস্তে ওর দিকে এগিয়ে এল রূপম।

—কী নাম তোমার?

—আমি অমল।

অবাক হয়ে গেল রূপম। এই কি সেই অমল?

বলে উঠল— তোমাকে তো সবাই খুঁজে বেড়ায়।

—তাই বুঝি? হ্যাঁ, আমাকে তো খুঁজবেই। তা তোমার নাম?

—আমার নাম রূপম। আচ্ছা, এ কোনও জায়গা। এ কোথায়? বসিরপুরের সঙ্গে তো এর কোনও মিল নেই। ইনফ্যাক্ট, বইতে পড়া কোনও জায়গার সঙ্গেই মিল নেই। আমরা এখানে কী করে চলে এলাম?

—তুমিও কি ওই দেওয়ালের ফোকরটা দিয়ে এসেছ?

—হ্যাঁ। কিন্তু ওই দেওয়ালটা কোথায় গেল বলো তো?

—সে তো আমিও গত কয়েকদিন হল খুঁজে বেড়াচ্ছি।

—গত কয়েকদিন? তুমি তো চল্লিশ বছর হল নিরুদ্দেশ!

—চল্লিশ বছর মানে?

ওরা কথা বলতে থাকে।

লোকটা ঠিকই বলেছিল। এদিকে এলে আর ফেরা যায় না।

এখানে সময় থেমে থাকে। আকাশ শুধু বদলে যায়।

এখানে কখনও দিন হয় না। এখানে একটা রাত কাটে, আরেকটা রাত শুরু হয়। রাতের তারারা শুধু বদলে বদলে যায়। এখানে কোন তারা লাল, তো কোনওটা নীল, কোনওটা সবুজ। মনে হয় মাথার উপরে যেন রঙের খেলা চলছে।

এখান থেকে ফেরার পথ নেই। এটাই জীবন। গেমের বাইরের আসল জীবন।

পরেরদিন বসিরপুরের রাস্তায় গবাপাগলা হেঁটে যায়। অনেক জায়গায় এলাকের জটলা। রায়বাড়ির নাতিকে গতকাল থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কলকাতায় থাকত। এখানে কয়েকদিনের জন্য এসেছিল।

গবাপাগলা কাঁদো কাঁদো গলায় চেঁচিয়ে ওঠে— গেম ওভার/ গেম ওভার।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%