মিস্টার পাই এর কৌটো

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

—আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে?

—সে বলতে পাচ্ছি না। স্যার খুব ব্যস্ত আছেন গতকাল থেকে।

—হ্যাঁ, সে তো সকাল থেকেই শুনছি। প্রায় দু'ঘণ্টা হয়ে গেল অপেক্ষা করতে করতে— গণেশ তাড়া দেয়।— বলছি না, ব্যাপারটা খুব আর্জেন্ট।

—ঠিক আছে আবার দেখছি।

আরও প্রায় এক ঘণ্টা বাদে গণেশের ডাক পড়ে। অশোকনগর থানার ওসি দীপ্তমানবাবুর ঘরে।

দীপ্তমানবাবু যে সকাল থেকে প্রচুর ছোটাছুটি করেছেন, আর টেনশনে আছেন তা দেখেই বোঝা যায়। গণেশকে দেখেই বলে ওঠেন— কী ব্যাপার বলুন! আজ খুব ব্যস্ত আছি। বিকেলে এখানে মুখ্যমন্ত্রীর সভা আছে।

গণেশ বলতে যায়। কিন্তু তার আগেই দীপ্তমানবাবুর কাছে একটা ফোন এসেছে। ফোনটা নিয়ে দীপ্তমানবাবু আরও মিনিট দশেক কারও সঙ্গে কথা বললেন। মুখ্যমন্ত্রীর সভাপ্রসঙ্গে। তারপরে গম্ভীর গলায় গণেশকে বলে ওঠেন —কী ব্যাপার বলুন, চুপ করে বসে আছেন। একদম সময় নেই, তাড়াতাড়ি বলুন।

—আমার স্যার প্রখ্যাত বিজ্ঞানী মিস্টার পাই এর কথা শুনেছেন নিশ্চয়ই। আমি ওঁর আপ্তসহায়ক হিসেবে কাজ করি।

—হ্যাঁ, হ্যাঁ, শুধু শুনেছি না, নিয়মিত অনেক কমপ্লেন পাচ্ছি। কী সব নাকি উলটোপালটা এক্সপেরিমেন্ট করেন সারাক্ষণ। আচ্ছা, এখনকারদিনে বিজ্ঞানের আর কী দেওয়ার আছে বলুন তো! সবই তো আবিষ্কার হয়ে গেছে?

গণেশ মূলপ্রসঙ্গে আসার চেষ্টা করে।— স্যারের একটা কৌটো হারিয়ে গেছে। দরকারি কৌটো-থামিয়ে দিয়ে দীপ্তমানবাবু তীক্ষ্ন গলায় বলে ওঠেন— কীসের কৌটো? হীরে না জহরতের?

—না, না সেরকম কিছুর নয়।

—তাহলে? একটা সাধারণ কৌটো হারিয়ে গেছে বলে তা নিয়ে আমার সময় নষ্ট করছেন। সকাল থেকে ব্রেকফাস্ট খাওয়ার পর্যন্ত সময় পাইনি। বলছি মুখ্যমন্ত্রীর সভা আছে আজ এখানে। আর তার মধ্যে আমার মহার্ঘ্য সময় নষ্ট করছেন?

—না, না, এ কৌটো ঠিক সাধারণ কৌটো নয়।

—সাধারণ নয় মানে? খুব দামি?

—না না, দামি নয়।

—তাহলে? দেখুন আমার সময় একদম নষ্ট করবেন না। এমনিতেও আপনার স্যারের সম্বন্ধে নিয়মিত অনেক অভিযোগ পাচ্ছি। ওনার প্রতিবেশী অবিনাশবাবু এসেছিলেন এই একসপ্তাহ আগেও। অবিনাশবাবুর কুকুরটাকে নাকি না বলে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফিরে আসার পর থেকে কুকুরটা নাকি আর অবিনাশবাবুর কথা শুনছে না।

—হ্যাঁ, সে তো 'ডগ ল্যানগোয়েজ ট্রান্সলেটর' এর উপরে এক্সপেরিমেন্ট ছিল। কুকুরের ভাষা বোঝার যন্ত্র বার করার জন্য। একই সঙ্গে কুকুরটা যাতে কিছু বাংলা কথা ভালো বুঝতে পারে সেজন্য। আবার ফেরতও দিয়ে দিয়েছেন। তারপরে যদি অবিনাশবাবু কুকুরকে ও অন্যদের নিয়মিত বাজে গালাগাল দেন, সে কুকুর তো মনিবের উপরে শ্রদ্ধা হারাবেই।

—এই দেখুন, মানুষে মানুষের কথা বুঝতে পারছে না। উনি আবার কুকুরকে মানুষের ভাষা বোঝানোর চেষ্টা করছেন।— একটু থেমে দীপ্তমানবাবু গজগজ করে বলে উঠলেন —ঠিকই শুনেছিলাম, বদ্ধ উন্মাদ।

—যা বলছিলাম। ওই কৌটোটা স্যার-এর খুব জরুরি। ওতে—

দীপ্তমানবাবুর আরেকটা ফোন এসেছে। মুখের কাছে আঙুল দেখিয়ে গণেশকে থামতে বলে ফোনটা ধরলেন। গণেশের সঙ্গে যে কনস্টেবল ঘরে এসেছিল তাকে ইঙ্গিতে বললেন গণেশকে ঘর থেকে বার করে দিতে। গণেশ বেরিয়ে এল।

—আপনি আবার এসেছেন? গতকাল বললাম নাওসব ছোটখাটো কাজ আমরা থানা থেকে করি না।— দীপ্তমানবাবু উত্তেজিত হয়ে উঠলেন গণেশ ঘরে ঢোকা মাত্র। এই একদিনেই দীপ্তমানবাবুর চোখের তলায় কালি পড়ে গেছে।

—আসলে কৌটোটা খুব জরুরি ছিল। সে বিষয়ে জানাতেই

—কী জরুরি! ওটা কি আলেকজ্যান্ডারের কৌটো না কি শাহজাহান-এর? কৌটোটা হারিয়েছে বেশ হয়েছে। আরও হারাবে। আমার একদম সময় নেই। গতকাল রাতে কী হয়েছে শুনেছেন তো! সেসব নিয়ে আমার চাকরি যায় যায়। এর মধ্যে কৌটোর গল্প।

—কিন্তু কৌটোটাতে ওঁর

—থামুন, ফের কৌটো। — ফের থামিয়ে দিয়ে একটু নরমস্বরে দীপ্তমানবাবু ফের বলে উঠলেন— বুঝতে পারছি। হয়তো কোনও পার্সোনাল কানেকশন থেকে থাকবে। হয়তো মিস্টার পাই- এর মা বা বাবার প্রিয় কৌটো ছিল। দাম দিয়ে কী আর সব বিচার হয়? আমার কাছেই বাবার এক প্রিয় নস্যির ডিবে ছিল। সে হারানোর পরে আমারও কী মন খারাপ। তাই তো? কিন্তু ওসব কৌটো-ফৌটো খোঁজা পুলিশের কম্মো নয়। এমনিতেই কত মানুষ দিনে দুপুরে হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের খুঁজে পাচ্ছি না। সেখানে কৌটো! গতকাল কী হল শুনেছেন নিশ্চয়ই। এসবের মধ্যে কী অন্যকিছু করা যায়।

—গতকাল ওই পঙ্গপাল হানার কথা বলছেন কি?

—হ্যাঁ, আর কিসের কথা বলব। আমাদের সবার মাথা হেঁট হয়ে গেল। আজকের সব কাগজের হেডলাইন দেখুন। কল্যাণগড় আর কল্যাণগড়। ভাবুন, মুখ্যমন্ত্রী ভাষণ দিতে উঠেছেন, হঠাৎ কথা নেই, বার্তা নেই, আকাশ অন্ধকার হয়ে গেল। আমরা মনে করলাম হয়তো ঝড় আসছে। কিন্তু সে ঝড় পঙ্গপালের ঝড়। সোজাসুজি অ্যাটাক মুখ্যমন্ত্রীর সভার উপরে। লক্ষ লক্ষ পঙ্গপালের। ভাবুন। আমার মতো এফিসিয়েন্ট ওসি, সেই আমি পর্যন্ত কিছু করতে পারলাম না। আমাকে পুরো নকআউট করে দিল ওই উচ্চিংড়ের বাচ্চাগুলো।

—পঙ্গপাল— গণেশ কারেক্ট করে দেয়।

—হ্যাঁ, ওই একই হল। মুখেও সে নাম আনতে ইচ্ছে করছে না। বিরোধীরা এখন পঙ্গপালদিবস উজ্জাপন করার কথা ভাবছে। বলছে সবাইকে চুপ করে রাখা গেলেও পঙ্গপালকণ্ঠ চুপ করানো যায় না। গতকাল কোনওরকমে মুখ্যমন্ত্রীকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। এখনও মুখ্যমন্ত্রীর পঙ্গপাল ফোবিয়া যায় নি। এই খানিক আগে খবর পেলাম চিফ সেক্রেটারি হঠাৎ করে আরজেন্ট একটা বিষয় জানাতে ওনার চেম্বারে ঢুকতে গিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী পঙ্গপাল ভেবে পেপারওয়েট ছুঁড়ে মেরেছেন। এই একঘণ্টা আগের ঘটনা। এমন পঙ্গপাল-এর জন্য আমার প্রমোশনের আর কোনও চান্স থাকল না।

নিজের উপরে ধিক্কারে মাথা ঝাঁকালেন দীপ্তমানবাবু।

গণেশ তবু চুপ করে বসে আছে। সেটা দেখে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে দীপ্তমানবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন—এখনও বসে আছেন? বেরোন এখান থেকে। আপনার স্যার মিস্টার পাইকে বলে দেবেন ওসব কৌটো খুঁজতে পারব না। আর একই সঙ্গে সাবধান করে দেবেন যেন একদম উলটোপালটা কাজ না করেন। আমাদের নজর আছে ওনার উপরে।

একটু থেমে ফের বলে উঠলেন— এই যে আমাদের পাড়ার কালু গুন্ডা, সে বেচারা পর্যন্ত আপনার স্যারের সম্বন্ধে অভিযোগ করে গেছে দু দিন আগে। তার বন্ধু শাকরেদ কানা পঞ্চুকে নাকি আপনার স্যার ব্রেনম্যাপিং যন্ত্রের সাহায্যে কীসব করে তার অঙ্কের প্রতি ভালোবাসা বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন সে সমাজের জন্য ভালো ভালো কাজ না করে একটা মুদির দোকান খুলে চাল-ডাল বেচছে আর শুধু অঙ্ক কষে যাচ্ছে।

—ভালো কাজ মানে সে তো শুধু বোমা বানাতা বসে বসে।

—সে যাই হোক। সেটাও তো কাজ। অঙ্ক করে কী হবে? তা কী না কী করে তার অঙ্কের ভক্তি বাড়িয়ে দিয়েছেন আপনার স্যার। এনিয়ে সেদিন আবার কালু আমাকে ধমকি দিয়ে গেল।

—তাহলে উঠি স্যার, শুধু কৌটোটার ব্যাপারে—

—খবরদার, কৌটো নিয়ে আর একটা কথাও শুনতে চাই না।— উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন দীপ্তমানবাবু। একটু থেমে ফের বলে উঠলেন।— উঠুন। আমাকে এখন পঙ্গপাল নিয়ে তদন্ত করতে হবে। আমার প্রমোশনটা এবারেও হল না।— দীর্ঘশ্বাস ফেললেন দীপ্তমানবাবু।

—ওই পঙ্গপালের ব্যাপারটা কী হয়েছিল স্যার সেটা জানেন।

—মানে? এতক্ষণ সেটা বলেন নি!— লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালেন দীপ্তমানবাবু।— কী করে?

—আসলে পঙ্গপাল এমনিতে সলিটারী পোকা অর্থাৎ একা একা থাকতে ভালোবাসে। কিন্তু ভারী বর্ষণে যখন জলা জঙ্গল বেড়ে যায়, তখন একটা বিশেষ ফেরোমন এদের শরীরে বেড়ে যায়। এদের ব্যবহার পালটে যায়। তখন এরা একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয়। লক্ষ লক্ষ পঙ্গপালের দল গড়ে তোলে আর একসঙ্গে খাবারের সন্ধানে দিনে একশো মাইল পর্যন্ত উড়ে চলে। পথে শস্যক্ষেত, ফসল যা পায় সব খেয়ে ধ্বংস করে ফেলে। তার জন্য আমাদের দেশে চাষিদের পঙ্গপাল হানায় এত ক্ষয়ক্ষতি হয়।

—আরে বাবা পঙ্গপাল নিয়ে লেকচার দিতে কেউ বলেনি। বলি এটা তো শস্যক্ষেত নয়, আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর সভা। সেখানে হঠাৎ হানা দিল কেন?

—আসলে পঙ্গপালের ঝাঁক মাঝে মধ্যে ভারতের বিভিন্ন শস্যক্ষেতে হানা দিয়ে যেভাবে সব নষ্ট করে দেয়, তার জন্য অনেক চাষি প্রতি বছরে আত্মহত্যা করে। যদি এদেরকে কোনওভাবে অন্য কোনওদিকে পাঠানো যায়, বা এদের যাত্রাপথ পালটে দেওয়া যায়, সেজন্য স্যার পরীক্ষানিরীক্ষা করছিলেন। উনি একটা কেমিক্যাল তৈরি করেছেন যারনাম '৪- ভাইনাইল অ্যানিসোল'। এই কেমিক্যালের গন্ধ পঙ্গপালের দল চারশো মাইল দূর থেকেই পায়। এর গন্ধের টান ওরা কোনওভাবে এড়াতে পারে না। এভাবে ওদের ফাঁদে ফেলা যেতে পারে। অন্য দিকে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। ওনার পরীক্ষা ঠিক সেদিকেই এগোচ্ছিল।

—মানে? হোয়াটডু ইউ মিন? গতকালের ঘটনার পিছনেও কী মিস্টার পাই? ক্রিমিন্যাল কন্সপিরাসি, মুখ্যমন্ত্রীর উপরে হামলা, ১০০ বছর জেল— কাঁপতে কাঁপতে দীপ্তমানবাবু বলে উঠলেন।

—ওই জন্যেই তো কৌটোটা খুঁজছিলেন স্যার। ওতেই ওই কেমিক্যাল রাখা ছিল। উনি মাঠের মধ্যে রেখে দিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন ঠিকভাবে কাজ করে কিনা অর্থাৎ আশেপাশের সব পঙ্গপালের ঝাঁককে এদিকে নিয়ে আসা যায় কিনা। সে জায়গায় তার উপরেই মাঠের মধ্যে আপনারা যে সভা করবেন, তা কে জানত! তাও যখন আন্দাজ করলাম, আমার কথা আপনি তো কাল শুনতেই চাইলেন না।

—মাই গড। কী সর্বনাশ।— বলে চেয়ারে ফের ধপ করে বসে পড়লেন দীপ্তমানবাবু।

গণেশ ফের বলে উঠল— আপনাকে স্যার আজ নিয়ে যেতে বলেছেন। মিষ্টি খাওয়াতে। কৌটো শুধু পাওয়া গেছে বলে নয়, পরীক্ষা দারুণ ভাবে সাকসেসফুল। বিশেষ করে এত ভিড়ের মধ্যেও যে ওটা এভাবে কাজ করবে, সেটা স্যার একদম আন্দাজ করতে পারেননি! আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া এত সুন্দরভাবে পরীক্ষা সম্ভব ছিল না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%