অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
—আলিম, গাড়িটা এখানে একটু দাঁড় করাও তো!
ব্যস্ত রাস্তার পাশে মার্সেডিজটাকে থামাতে বলল রঞ্জন। ফের বলে উঠল—
—এখানে রেখো না। কাছাকাছি যেখানে পার্কিং করতে পারবে করে নিও। আমি পাঁচ মিনিটে চলে আসছি। ফোন করে নেব।
—স্যার, একা নামবেন কোনও অসুবিধে হবে না তো! কেউ চিনে ফেললে?
—না, না, কে চিনবে আমাকে এখানে? এরা নেতা— অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চেনে শুধু। তাছাড়া, স্যুট-টাই-অফিসের পোশাক নেই। সাধারণ পোশাক। কেউ খেয়াল করবে না।
—কিন্তু এরকম ব্যস্ত জায়গায়? কোনও জায়গায় যাবেন বলুন। ঠিক সেখানে নামিয়ে দেব।
—আরে না, না, আমি এখানে বড় হয়েছি। কোনও অসুবিধে হবে না।
—দাঁড়ান, আপনি বসুন। আমি দরজা খুলে দিচ্ছি।
—ধুর, তুমি পারো বটে। আমি নিজে নামছি।
রঞ্জন গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। আস্তে করে এসে দাঁড়ায় রাস্তার একপাশে। সেই ছোটবেলার রাস্তা। রোজ এখান দিয়েই পার হত। সে রাস্তার ছবি এখনও চোখে লেগে আছে। সে রাস্তার গন্ধ এখনও যেন নাকে মিশে আছে। এই রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় ওর চোখে স্বপ্নের ঘোর থাকত।
লক্ষ্য করল উলটো দিকের জুয়েলারির দোকানটা উঠে গিয়ে এখন একটা ফার্নিচারের দোকান হয়েছে। গাড়ির সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বিবেকানন্দরোড ও সিমলা রোডের মোড়ে যে পুরনো চপ কাটলেটের দোকান ছিল, সেটা উঠে গিয়ে একটা ফাস্ট ফুডের দোকান হয়েছে। একটু মনখারাপ হয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই সে দোকানের উপরে কোল্ডড্রিংক্সের বড় বিজ্ঞাপনটা দেখে মনখারাপ চলে গিয়ে একটু আত্মতৃপ্তি হল।
সারা বিশ্বে ছড়িয়েথাকা ওই সফট ড্রিংকস কোম্পানির সর্বেসর্বা আজ ও। এত বছর পরে নিজের শহরে ফিরে এসে ওর প্রিয় জায়গাতেই এই কোম্পানির প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপন দেখে খুব ভালো লাগল। এ রাস্তা ওকে পুরোপুরি ভোলেনি তাহলে।
কেউ হয়তো জানেই না যে এখান থেকে কিছু দূরেই ওর ছোটবেলা কেটেছে।
—স্যার, স্যার, আপনি রঞ্জন সরকার না?— একটা বছর পঁচিশেকের ছেলে এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। চোখে তার অবিশ্বাস, আর একই সঙ্গে আনন্দের ছোঁয়া।
ছেলেটার প্রশ্নে চমকে উঠলে রঞ্জন।
রঞ্জনের চোখে সানগ্লাস। জিন্সের উপরে, একটা সাদামাটা টিশার্ট। কোথায় ক্যালিফোর্নিয়া আর কোথায় কলকাতা। ওর এখানে আসার কথা তো কেউ জানে না। তবু ছেলেটা চিনে ফেলেছে?
ছেলেটা ওর উত্তরের অপেক্ষা করল না ফের বলে উঠল— স্যার, আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি রঞ্জন সরকারের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছি। জাস্ট আনবিলিভেবল।
রঞ্জন জানে এখন আরও লোক ওকে চিনে ফেললে ও বিপদে পড়বে। ওকে না চিনলেও ওর কোম্পানির সফট ড্রিংকসকে সারা বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটা লোক চেনে। যারা শিক্ষিত, যারা সামান্য খবর রাখে, তারা ওকে চিনবেই। কিছুদিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও একটা মিটিং ছিল। সে ছবি সব কাগজেই বেরিয়েছে। মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন চ্যানেলেও না চাইলেও ওর মুখ দেখায়।
—স্যার, একটা কথা বলব। একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিলে খুব ভালো হত। খুব বাজে অবস্থা। বাবা রিটায়ার করে গেছে। আমার দিকেই সবাই তাকিয়ে আছে। বেশ কিছু বছর ধরে পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছি। কবে চাকরির ডাক আসবে জানি না। স্যার, আপনি চাইলেই তো হয়ে যাবে।
রঞ্জন এটাই আশঙ্কা করছিল। যেন চাকরির জন্য শিক্ষা, যোগ্যতা কোনও কিছুরই দরকার পড়ে না, জানাশোনা থাকলেই চাকরি হয়ে যায়। কলকাতার চাকরির যা অবস্থা, তাতে এই রাস্তার মাঝে এখন ওর পরিচয় জানলে এখন ও মবড হয়ে যাবে।
ছেলেটার যেন কোনও কথাই শোনে নিরঞ্জন এরকম একটা ভাব করে দ্রুতপায়ে গাড়ির ভিড়ের মধ্যে দিয়ে বেশ কয়েকটা হর্ন পেরিয়ে ছুটে রাস্তার অন্যদিকে চলে এল।
একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। ছেলেটা পিছু নেয়নি। দ্রুত পায়ে অন্য ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে থাকল। এই রাস্তায় কত হাজারবার হেঁটেছে ও। এই ইটগুলোর স্মৃতিশক্তি থাকলে নিশ্চয়ই চিনে নিত ওকে।
মনে পড়ে গেল সেই দিনটা। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগের সেই দিনটা।
সেদিন অবশ্য ও এই রাস্তা পার হতে চায়নি। ও অন্যরকম কিছু চেয়েছিল।
কিন্তু সে চেষ্টা সফল হয়নি। সফল হয়নি বলেই ও আজও আছে।
রঞ্জন পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। কিন্তু ওর বাড়ির অবস্থা ভালো ছিল না। পড়ত কলেজ স্ট্রিটের এক নামী সরকারি স্কুলে। প্রথম হত। অনেকেই জানত যে ও শুধু উচ্চমাধ্যমিক কেন রাজ্য জয়েন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং-এর পরীক্ষায় প্রথম দশে থাকবে।
কিন্তু ওর যখন ক্লাস টুয়েলভ, তখন শুরু হল হঠাৎ করে একের পর এক বিপর্যয়। টানাটানির সংসার। বাবার একটা ছোট বই-এর দোকান ছিল। গল্পের আর স্কুলের বই-এর সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের দরকারির টুকিটাকি নানান জিনিস থাকত সেখানে। সামান্য রোজগার হত। তাতে কোনওরকমে চলে যেত ওদের সংসার।
কিন্তু ঠিক সে সময় হঠাৎ করে ধরা পড়ল বাবার ক্যান্সার। লাং ক্যান্সার। তখন এর বিশেষ চিকিৎসা ছিল না। টাকাও ছিল নাওদের। তবু শেষ চেষ্টা তো করতেই হবে। মনে আছে বাবাকে নিয়ে বিভিন্ন টেস্ট করতে যেত সে সময়। জলের মতো টাকা খরচ হতে শুরু করল।
তার মধ্যে আরেকটা বিপদ হল।
রঞ্জনের দিদি রঞ্জনের থেকে তিন বছরের বড়। অবিবাহিত। একটা ছোট প্রাইভেট স্কুলে পড়াত। সামান্য টাকার চাকরি। কিন্তু স্কুল থেকে আসার পথে একদিন বাস থেকে পড়ে অ্যাক্সিডেন্ট হল। এক পায়ের উপর দিয়ে চাকা চলে গেছে। ছোটাছুটি— হাসপাতাল — ডাক্তার এসবের পরে প্রাণ বাঁচল, কিন্তু ডান পাটা বাদ পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে বাদ পড়ল সবকিছুর সম্ভাবনা।
কী অদ্ভুত ছিল সেই সময়। বাড়ির সব রোজগার বন্ধ। এমনিতেও বাবার চিকিৎসার জন্য বেশ কিছু দেনা হয়েছিল। এখন একমাত্র ভরসা রঞ্জন। তাকে জয়েন্টে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পেতেই হবে। এবারেই পেতে হবে। এটাই রোজগার করার সবথেকে তাড়াতাড়ি উপায়।
রঞ্জনের পক্ষে অবশ্য না পাওয়াটাই অস্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তবু সে সময়ে হাজার হাজার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছিল না। সারা ভারতে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চান্স পেত শুধু কয়েক হাজার সেরা ছাত্রছাত্রী। তবু রঞ্জন পাবে না, এটা ভাবাই যায় না। ওর আগের ব্যাচে যে প্রথমত স্কুলের পরীক্ষায়, সেই দীপেন্দুদা জয়েন্টেও প্রথম হয়েছিল। তাই রঞ্জনকে ঘিরেও বিশাল প্রত্যাশা ছিল।
রঞ্জন জয়েন্টের পরীক্ষার আগের দিন ঘুমোতে পারেনি। বারবার ঘরে শুয়ে থাকা দুই রোগীর দিকে তাকিয়েছিল। বাবা যন্ত্রণায় ছটফট করছে। মা মাঝেমধ্যে উঠে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছে। জল দিচ্ছে। বাবার একদম লাস্ট স্টেজ। কোনও আশা নেই।
উঠে বাবার বিছানার পাশে খানিকক্ষণ বসে থাকল রঞ্জন। বাবা যদি জেনে যেতে পারত যে রঞ্জন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পেয়েছে, মৃত্যুর আগে খানিকটা শান্তি পেত। মুখ— চেহারাগত কয়েকমাসে সব কীরকম যেন পালটে গেছে। চেনা যায় না। আগে বাবাকে এত মিস করত না রঞ্জন, কিন্তু যত দিন ফুরিয়ে আসছে ততবেশি বুঝতে পারছে, এই সামান্য মাঝের সময়টুকু কত মূল্যবান।
দিদি মার সঙ্গে নীচে মেঝেতে শুয়ে আছে। কীরকম অসহায় মুখ। দিদির বিয়ের জন্য অনেক চেষ্টা হচ্ছিল। এখন আর সে ভেবে লাভ নেই। কোনও পাত্র এক বিকলাঙ্গ মেয়েকে অত সহজে বিয়ে করবে না। দিদির পক্ষে চাকরি পাওয়াও সহজ হবে না।
পাশে শুয়ে মা। মাকে কখনও বসে থাকতে দেখেনি রঞ্জন। সারাক্ষণ কাজ করে। একের পর এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তবু মাকে যেন মাটির থেকে উপড়ে ফেলতে পারেনি। মা যেন মরুভূমিতে এখনও এক ফোঁটা জলের খোঁজ করে যাচ্ছে। রঞ্জনই সেই জলের সন্ধান দিতে পারবে।
উত্তেজনার ঘুম এল না রঞ্জনের। ওর পড়ার টেবিলে এসে বসল। রঞ্জনের জীবনের একটা বড়সময় কেটেছে এই টেবিলে। সামনে একটা খড়খড়ির জানলা। এই জানলাটা রঞ্জনের খুব প্রিয় জায়গা। জানলার বাইরেই যেন ওর সৌরজগৎ। সে সৌরজগৎ ওর ঘরের মতো থেমে নেই। উলটো দিকের বাড়িতে বহু ভাড়াটে থাকে। কিছু না কিছু হতেই থাকে। সেই রঙিন জীবন দেখতে ওর ভালো লাগে।
ল্যাম্প জ্বেলে বইতে চোখ রাখল। কিছু ফরমুলা, ইকুয়েশনে চোখ বুলিয়ে নিল। এবারে না পেলে, আর কখনও ওর কাছে এ সুযোগ আসবে না। আরেক বছর অপেক্ষা করার মতো অবস্থা নেই ওর। যদি চার বছর বাদে ভালো চাকরি হয়ে, তাহলে তখনই হয়তো চিকিৎসাটা ভালো করে করানো যাবে। আরেকবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল বাবার মুখটা। রঞ্জনের উপরে কত আশা।
গভীর বেদনা দুঃখকষ্ট একটা পরিবারের সবাইকে অনেক কাছে এনে দেয়। সেটা ও দিব্বি বুঝতে পেরেছে।
সকালের দিকে ঘুম পাচ্ছিল। খানিকক্ষণ শুয়ে ছটফট করার পর সামান্য কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে ফের উঠে পড়ল। উত্তেজনায় চিন্তাভাবনা কীরকম যেন অসংলগ্ন হয়ে উঠছিল।
পরীক্ষা হলে এরকম পরিস্থিতির সামনাসামনি আগে কখনও হয়নি রঞ্জন। সেদিন ছিল অঙ্কের পরীক্ষা। একটা অঙ্ক খানিকটা করার পরেই মনে হচ্ছিল, না, এটা বোধহয় ও পারবে না। পারলেও অনেক সময় লেগে যাবে। সামান্য সময়ের মধ্যে অনেক অঙ্ক করতে হবে। প্রথম দশে আসতে গেলে অংকে অন্তত ১৮০, হ্যাঁ, ২০০ তে অন্তত ১৮০ করতেই হবে।
সেটা যে রঞ্জন করতে পারে, সেটা শুধু রঞ্জন নয়, সবাই জানে। এমনকী অনেকে বলে রঞ্জনের মতো এত ভালো অঙ্কে গত বছরের দীপেন্দুদাও ছিল না।
কিন্তু এ কী হল! বারবার মনে পড়ছে বাবার সেই অসহায় মুখ। মনে পড়ছে দিদির আরক্ত অসহায় সেই মুখ। মনে পড়ছে ওর জানলার বাইরের বেড়ালগুলোকে। মনে হচ্ছে যেন একটা ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ও ধরতে গিয়ে ধরতে পারছে না।
হাত যেন কাঁপতে শুরু করল। চিন্তা অবিন্যস্ত। বুক ধড়ফড় করছে। সব অঙ্কগুলোই যেন ওর কাছে অজানা অচেনা হয়ে উঠছে। কিছুই ভাবতে পারছে না। ও কী পাগল হয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে! বুদ্ধি যেন আর ওর বশে নেই।
—আর ইউ ওকে?
গার্ডের প্রশ্নে ঘোর ভাঙল রঞ্জনের। গার্ড অবাক হয়ে দেখছে। ছেলেটার চোখে যেন কোনও দৃষ্টি নেই। সেই গার্ড অবশ্য রঞ্জনকে চেনে না। ভাবল শক্ত প্রশ্নপত্রের জন্য বোধহয় এই অবস্থা হয়েছে। তা না হলে কোনও পরীক্ষার্থী-এর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তে পারে!
অনুমতি নিয়ে বাথরুম গিয়ে চোখ মুখ ধুয়ে এল রঞ্জন। কিন্তু বুঝতে পারল সব শেষ হয়ে গেছে। বাকি দেড় ঘণ্টায় তেমন কিছু করার নেই। মোটে ষাট নাম্বার উত্তর দিতে পেরেছিল সে দিন।
সে দিন প্রথম বার এই রাস্তাকে অন্য ভাবে দেখেছিল ও। এই রাস্তার মোড়ে এসে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা ভেবেছিল রঞ্জন।
কীভাবে ও মুখ দেখাবে সবাইকে? যে রঞ্জনকে ঘিরে সবাই আশা করে বসে আছে প্রথম দশে থাকবে বলে, সে কী করে বলতে পারবে যে সে পায়ইনি। কীভাবে বোঝাবে বাবা-মাকে, যাদের দিন গোনা শুধু ওর কথা ভেবে।
রাস্তার ধারে এসে দাঁড়িয়েছিল। অপেক্ষা করছিল দ্রুতগামী বড় কোনও একটা বাসের যেটা চট করে থামতে পারবে না। সেই সামান্য কিছু মুহূর্তে পৃথিবীটা যেন বদলে গিয়েছিল ওর কাছে। মনে হচ্ছিল উলটোদিকের বাড়িগুলো যেন কিছু বাচ্চার হাতে রঙ পেনসিলে আঁকা। মনে হচ্ছিল ওর থাকা না থাকাতে কিছু এসে যায় না এই ছবিরঙের মিথ্যে পৃথিবীর। ওকে অন্তত সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হবে না— আই অ্যাম এ কমপ্লিট ফেলিওর। আমি হেরে গেছি।
একটা বড় লাল ৮ নাম্বার বাস আসছে। ও এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ কে যেন হাত ধরে টান দিল। ও দেখল পাশে একটা অন্ধ বৃদ্ধ ভিখারি, ওর হাত এসে ধরেছে।
—আমাকে একটু রাস্তা পার করে দেবে বাবা?
একটু সময় নিল রঞ্জন এই পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য। লোকটাকে উপকার করে এসে তার পরেও এটা করা যায়। ওর মনের অবস্থা বোঝা এই অন্ধ ভিখারির পক্ষে সম্ভব নয়। অন্ধ ভিখারির হাত ধরেও অন্য দিকে নিয়ে গেল।
বৃদ্ধ লোকটা বলে উঠল— তুমি খুব ভালো ছেলে। আসলে আমার যে লাঠিটা থাকে, সেটা আজ খুঁজে পাইনি। তা ভাই তোমার নাম কী?
লোকটা সেটা জানার পরে আবার বলে উঠল—বড্ড খিদে পেয়েছে। কী সুন্দর চপের গন্ধ আসছে। খাওয়াবে?
এত ভারী সমস্যা। মরার সময়েও এরকম অনুরোধ।
রঞ্জন এর কাছে সব সময় পাঁচ টাকা রাখা থাকে। যদিও খরচ হয় না, কারণ হেঁটেই স্কুল সবসময় যাতায়াত করে, আজও তাই করেছে।
ও পাঁচ টাকাটা গরিব লোকটার হাতে দিয়ে বলে উঠল, কিছু খেয়ে নাও।
—সে কী করে হয়। একা খাব কেন? তুমিও চলো!
এ কী ধরনের আব্দার। কিন্তু তবু ফেলতে পড়ল না রঞ্জন। দুটো লঙ্কা আর আলুর চপ খাওয়ার পরেই না হয় বাসের তলায় যাওয়া যাবে। বাসের অভাব পড়েনি এই রাস্তায়! কতদিন খায়নি এসব!
লোকটা চপ খেতে খেতে কথা বলে চলল— বুঝলে বাপু। আমি এখনও আশা হারায়নি। যতদিন আবার চোখে না দেখতে পাব, ততদিন চেখেই শুধু দেখে যাব।
—বলে হেসে উঠল লোকটা।
—নাহ, এসব হালকা কথার সময় নয় এটা। ওর হাতে সময় নেই।— উঠতে যাচ্ছিল।
লোকটা এবার ওকে অবাক করে বলে উঠল— যা করতে যাচ্ছিলে, সেটা করো না। আমি অন্ধ হতে পারি। কিন্তু সব বুঝতে পারি। কী হয়েছে? প্রেম ভেঙে গেছে নাকি অন্য কিছু!
চুপ করেছিল রঞ্জন।
লোকটা ফের দার্শনিকের মতো বলে উঠল—অন্ধরা খুব সুখী হয়। কারণ কী জানো? আমরা পৃথিবীটাকে ভালো দেখতে শিখি। সবাই ভালো। তা না হলে ভাবোতো আমি আর আমার বুড়ি বউ কী করে এতদিন বেঁচে আছে। তোমাদের মতো ভালোমানুষদের জন্যই, তাই না! আমার বউ-এর এখন শরীর খুব খারাপ। একটা ওষুধ দিয়েছে ডাক্তার। কিন্তু আমি জানি কঠিন অসুখ, ও বাঁচবে না। কিন্তু যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল লোকটা।
—যাই হোক না কেন বাপু, লড়ে যাও। জীবন অনেক অনেক বড়। পরে দেখবে এসব ছোটখাটো দুঃখ-কষ্ট পথে পড়ে থাকা নুড়ি পাথরের মতো। লড়ে যাও, এত সহজে হেরো না। ভাবো তো আমি তাহলে কিসের আশায় বসে আছি!
এই যে আমি ওখানে বসি। আর ভাবি জীবনটা কী সুন্দর। কতরকম আওয়াজ। কতরকম গন্ধ। কতরকম মানুষ। সব যেন ভালোবাসা দিয়ে মোড়া। এ ফেলে যেতে বড় মায়া লাগে। আমাকে রানী, মানে আমার বউ মাঝেমধ্যে বলে ওই আকাশটার কথা। কত নাকি তারা ওঠে। আমি শুনি আর ভাবি। সত্যি কত সুন্দর সবকিছু।
সেদিন কেন জানি আরও অনেকক্ষণ লোকটার সঙ্গে গল্প করেছিল রঞ্জন। ও আর সেরকম কিছু করার কথা ভাবেনি।
রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে রঞ্জন ভাবছিল সেদিনের কথা। তারপর কত বছর পেরিয়ে গেছে। সেদিন অঙ্ক পরীক্ষা প্রায় না দিতে পারলেও বাকি পরীক্ষাগুলো খুব ভালো হয়েছিল রঞ্জনের। প্রথম দশে অবশ্য ও থাকতে পারেনি। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে অসুবিধে হয়নি।
সত্যি এসব ছোটখাটো নুড়ি পাথর কতই এসে পড়ে জীবনের রাস্তায়। কিন্তু তাতে কী কিছু পালটে যায়! ও আবার মাথা তুলে চারদিকে তাকালো। এখনও শহরটার গায়ে কত রঙ। চারদিকে লোকজন ছোটাছুটি করছে। হয়তো এদের মধ্যে কারও ছেলে অসুস্থ, কারও হয়তো রোজগার নেই, কারও হয়তো আরও অন্য কিছু বিপদ। কিন্তু তারা জীবনের আশায় তবু ছুটে চলেছে।
লক্ষ্য করল রাস্তার উলটো দিক থেকে সেই ছেলেটা এখনও ওকে লক্ষ করছে।
তাকে লক্ষ করে হাত নাড়াল রঞ্জন। শুধু এটা বলতে উলটোদিকে যেতে হবে— লড়ে যাও, হেরো না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন