কলিংবেল

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

বাইরের কলিংবেলটা বেজে উঠতে চমকে উঠলাম। ভয়ে বিহ্বল হয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ।

কে এল এখন? বাইরে প্রবল ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। তার মধ্যে কে আসতে পারে এত রাতে?

এরকম সময় তো আমাদের ফ্ল্যাটে কারও আসার কথা নয়।

আমার আজ এখন এখানে থাকার কথা ছিল না। মিমির একা থাকার কথা। অবশ্য প্রতিবেশীদের সেটা জানার কথা নয়। আজকালকার দিনে কলকাতার উপরে এরকম কমপ্লেক্সে কে কার খবর রাখে!

কিন্তু তা বলে এতরাতে কে আসবে?

দেওয়াল ঘড়িটা দেখলাম। রাত একটা।

আমি অনেক রাত অবধি অনেক সময় জেগে থাকি ঠিকই। কিন্তু সেটা প্রতিবেশী কারও জানার কথা নয়। কখনোই রাত অবধি কারও সঙ্গে আড্ডা দিতে যাই না।

ঘরের কোনও আলো বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে কী?

বাইরের দরজার নীচে সামান্য ফাঁক আছে। কিন্তু ড্রয়িং রুমে আলো জ্বলছে না।

একটা বেডরুমের আলো জ্বলছিল, সেটা নিভিয়ে চুপ করে বসে রইলাম যাতে কোনও শব্দ না হয়। আধ মাইলের মধ্যে একটা ফ্যাক্টরি আছে। সেখানে থেকে লোহালক্কড়ের আওয়াজ আসছে। তবে আমাদের ফ্ল্যাটে কোনও শব্দ নেই।

শুধু আমার নিশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। সে শব্দ নিয়ন্ত্রণ করার উপায় আমার জানা নেই। একটা অদ্ভুত উত্তেজনা এখন ছড়িয়ে পড়েছে স্নায়ুর প্রত্যেকটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

কিছু দূরে মিমি শুয়ে আছে। ওর নিশ্বাসের শব্দ অবশ্য শোনা যাচ্ছে না। খানিক আগে ওর হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয়েছে। যদিও সেটা স্বাভাবিক হার্ট অ্যাটাক নয়। সুপরিকল্পিত, সুপরিচালিত হার্ট অ্যাটাক।

কেউ জানবে না যে আমি আগামীকাল সকালের পরিবর্তে আজ রাতেই ফিরে এসেছি দুর্গাপুর থেকে। শুধু এর জন্যেই। কাল ভোররাতে চুপিসাড়ে হাওড়া স্টেশনে যেতে হবে। দুর্গাপুর থেকে ট্রেন আসার কথা সকাল আটটায়। দেখাতে হবে যেন সেই ট্রেনেই ফিরেছি। স্টেশনে বই-এর দোকান থেকে বই কিনব। বেশি দাম চাওয়ার জন্যে ঝগড়া করব। চায়ের দোকানে চা খেতে গিয়ে চা জামায় ফেলব। সব প্ল্যান করা আছে, যাতে বেশ কিছু লোক আমাকে মনে রেখে দেয়। তাড়াহুড়োতে বেরিয়েছি বলে টিকিট কাটার টাইম পাইনি, এরকম বলে টিকিট না কেটে আসার জন্যে বেরোনোর সময় চেকারকে ফাইনও দেব।

এখানে যে রাত দশটায় ফিরে এসেছি, সেটা কেউ দেখেনি। দেখলেও চিনতে পারত না। মাস্ক পরে ছিলাম। ভাগ্যও সঙ্গে ছিল। যেরকম বৃষ্টি হচ্ছে তাতে বাড়ির কাছাকাছি বা পথে চেনা কারওর সঙ্গে দেখা হয়নি।

গত দশদিন হল এই কমপ্লেক্সের সি সি টিভি ক্যামেরা সিস্টেমটাও কাজ করছে না। কমপ্লেক্সের আবাসিকদের মাতব্বরদের মধ্যে আমি একজন। সেজন্যে তাড়াহুড়ো করে সারাইনি। ক্যামেরাতে ধরা পড়ার ভয়ও নেই।

বাইরে কলিংবেলটা আর বাজেনি। মাঝে পাঁচ মিনিট কেটে গেছে।

তবে কি ভুল শুনলাম? নাকি কেউ এসেছিল। না পেয়ে চলে গেছে।

নিশ্চিন্ত হয়ে সোফায় বসলাম।

কিন্তু পরক্ষণেই চমকে উঠলাম। আবার কলিংবেল বাজছে।

কে আসতে পারে? আমাকে আসার সময় কেউ দেখেনি তো! অবশ্য যা পোশাকে এসেছিলাম তাতে কারও চেনার কথা নয়। এমনকী এই যে বাড়িতে ঢুকেছিলাম বা এই ফ্ল্যাটে এসেছি, সেটাও কারও খেয়াল করার কথা নয়। নিশ্চয়ই কেউ অকারণে আমার পিছু নেয়নি। আমি ছাড়া কে জানবে যে আমি এরকম কাজ করতে চলেছি!

এরকম কী হতে পারে যে আমি ট্যাক্সিতে কিছু ফেলে এসেছি! ট্যাক্সি ড্রাইভার ফেরত দিতে এসেছে। নাহ, মানিব্যাগ, ব্যাগ সবই তো ঠিক আছে। তাহলে?

বাইরে খানিকক্ষণ কোনও শব্দ নেই। হয়তো ভুল শুনেছি।

কেউ যদি এখন আমাকে এখানে দেখে ফেলে, তাহলে ওই পুরো প্ল্যান একেবারে মাঠে মারা যাবে।

না, না, এখন কোনওভাবেই দরজা খুলব না।

কিন্তু কী হতে পারে? আরেকটু ভাবার চেষ্টা করলাম।

আমাদের জন্য অন্য ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীদের কী কোনও অসুবিধে হচ্ছে? সেজন্য জানাতে এসেছে? নাহ, সেরকম হওয়ার কথাও নয়।

কিছুদিন আগে আমাদের ঘরের এসি চালানোর জন্যে, এই ব্লকের ফিউজ উড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজ এসি চলছে না। ফিউজ ও ওড়েনি। সে ক্ষেত্রে আমাদের ঘরেও আলো জ্বলত না।

আবার কলিংবেলটা বেজে উঠল। চমকে উঠলাম আবার। এবারে যেন মনে হল আমার বুকের ভেতরেই বেজে উঠেছে।

তাহলে কী মিমির চেনা কেউ! কেউ হয়তো জানে যে আজ রাতে আমি এখানে থাকব না। কোনও প্রেমিক? কিন্তু সেটা কী আমি এতবছর টের পেতাম না। অবশ্য গত দু-বছর সেভাবে প্রয়োজনের বাইরে কথাই হত না।

মিমিকে সেরকম আকর্ষণীয় দেখতে নয়। তবু কে বলতে পারে! আজকাল সবাই সবার প্রেমে পড়ে।

সে প্রেমিকের হয়তো এরকম সময়ে অভিসারে আসার কথা ছিল। আমি নেই। এটাই বেস্ট টাইম। কিন্তু সেক্ষেত্রে সে এসে দরজা কেউ না খুললে, বারবার কলিংবেল না বাজিয়ে, অবশ্যই আগে মিমিকে ফোন করবে। কিন্তু নাহ, মিমির ফোনে কোনও মিসড কল দেখছি না। আমার ফোনটাও একবার দেখে নিলাম। তাতেও কোনও মিসড কল নেই। কেউ খুব জরুরি কিছু হলে আগে আমাদের ফোনেই করত।

দরজার আইহোলে চোখ দিয়ে দেখব একবার?

কিন্তু যদি আমার উপস্থিতি উলটো দিক থেকে টের পায়। যতই সাবধানী হই না কেন, হয়তো বোঝা যেতে পারে।

কিন্তু আর এটাকে ইগনোরও করা যাচ্ছে না। তাছাড়া, মিমি তো শুয়ে আছে। হার্ট অ্যাটাক কে জানবে! শুধু আমি জানি। ঘুমোচ্ছে বললেই হবে। যে ওষুধটা খাবারে মেশানোর জন্যে এটা হয়েছে, সেটারও আর কোনও চিহ্ন নেই ঘরে।

তবে? আমি অহেতুক এত ভয় পাচ্ছি কেন? আমার প্রথম খুন বলে! আমারও এত রাতে শুয়ে থাকারই কথা। দরজা খুলতে দেরি হতেই পারে। না শুনতেই পারি।

যেন নিজেকে আরেকটু কনভিনসড করার জন্যেই আবার করে এলাম। শুয়ে পড়ে গেমপ্ল্যান বানাতে থাকলাম।

যদি খুলতেই হয়, সেক্ষেত্রে কী বলব?

এক, সবে ফিরলাম। এসে দেখি এই অবস্থা। ডাক্তার ডাকব ভাবছিলাম।

দুই, বলব শরীর খারাপ লাগছে বলল। আমিও তাই আর ডিস্টারব না করে অন্য ঘরে গিয়ে আমার কাজ করছিলাম।

মনে মনে এরকম বিভিন্ন সিনারিও অ্যানালিসিস করলাম।

কিন্তু পুরোটাই ডিপেন্ড করছে এই আগন্তুক আমাদের কতটা জানে তার উপরে বা আমাকে দেখেছে কিনা তার উপরে।

এই বৃষ্টির মধ্যে এত রাতে যেই এসে থাকুক না কেন, নিশ্চয়ই খুব জরুরি কাজে এসেছে! আমি অবশ্য না খুলতেই পারি। পরে বলতে পারি এত রাতে কেউ এলে দরজা খুলি না। বা বলতে পারি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

ঘরের পোশাক পরেই মিমির পাশে চুপ করে শুয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ।

অন্ধকারে মিমির মুখটা দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য না দেখাই ভালো। এত ঘৃণা আমি আগে কাউকে কখনও করিনি। অবশ্য বাইরের কেউ সেটা জানত না।

জানত আমাদের আইডিয়াল 'কাপল' বলে। প্রতি বছর খুব ঢাকঢোল পিটিয়ে বিবাহবার্ষিকী পালন করতাম। জন্মদিনে বন্ধুবান্ধবদের সামনে বিশাল কেক কাটি। স্কচ নিয়ে মাতামাতি করি। কিন্তু সবই ওই বাইরে বাইরে।

বিয়ের পর থেকেই যখন জানতে পারি যে ওর জন্য আমাদের কখনও সন্তান হবে না, তখন থেকেই ওর উপরে আমার রাগ। ওর দিক থেকে সেটা যেনও খুব সহজে মেনে নিয়েছিল। আমি শুধু মেনে নিতে পারিনি। এমনকী আত্মীয়স্বজনের পড়শীর সামনে আমি বেশি বিব্রত বোধ করতাম। ওর সেই সামান্য লজ্জাটুকু ছিল না। একই সঙ্গে আবার বাবা-মা যে আমার সঙ্গে থাকবে এটাও ও কোনওদিন চায়নি। শেষ বয়সে গিয়ে ওদের স্থান হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে। এসবের জন্যেই উত্তরোত্তর ওর উপরে আমার সে রাগ ঘৃণায় পরিণত হয়েছিল।

যে সম্পর্কতে এমনিতেই আমাদের মধ্যে কোনও শব্দ বিনিময় ছিল না, সেটাকে একেবারে নিস্তব্ধ করে দিতে অসুবিধে কী!

সেজন্য শেষে এই সিদ্ধান্ত।

বাইরে আবার কলিংবেল। এভাবে বারবার বাজালে এবারে প্রতিবেশীরা এসে হাজির হবে। কী বলব তখন?

অন্ধকারে পা টিপে টিপে এগিয়ে গেলাম বাইরের দরজার দিকে। দরজার আইহোলে চোখ রাখলাম।

কেউ, কেউ তো নেই। তবে কে বাজাচ্ছে? নাকি, আমি ভুল শুনছি বারবার। বাইরে দরজার সামনে প্যাসেজে ঘন অন্ধকার। সেখানে কেউ নেই।

একটু ইতস্তত করে দরজা খুললাম।

নাহ, বাইরে কেউ নেই।

ফিরে আসছিলাম। কিন্তু আবার কলিংবেলের শব্দে চমকে উঠলাম। কেউ তো নেই, তবে কে বাজাচ্ছে!

নাকি কেউ আছে।

কিছু দূরে লিফটের দরজার সামনে ও কে! কে, কে ওটা? এই দরজার দিকে এগিয়ে আসছে। ঠিক মিমির মতোই। মিমির মতো নয়। মিমিই।

ভয়ে দরজা তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দিলাম। ভয়ে যেন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এসেছে।

কিন্তু ঘাড় ঘুরিয়ে চমকে উঠলাম। দু-হাত দূরে আরেকজন মিমি এসে দাঁড়িয়েছে।

সেই মিমি ঘুমচোখে বলে উঠল— কে এসেছে এত রাতে? বারবার কলিংবেল বাজছে। একটু খুলে দিতে পারছ না। সেই আমাকেই উঠে আসতে হল ঘুমের মধ্যে!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%