স্বপ্নের শেষ নেই

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

বেশ কয়েক সপ্তাহ কলকাতার বাইরে ছিল অনিলিখাদি। শুনেছিলাম দিল্লি ও ব্যাঙ্গালোরে অফিসের নানান কাজে যাচ্ছে। কবে ফিরবে সেটা জানতাম না।

আজ অনিলিখাদিকে আমরা কেউ তাই দেখব আশা করিনি। দরজার সামনে সেই পরিচিত চটির শব্দ আর চেনা গলা শোনা মাত্র, আমরা সবাই লাফিয়ে উঠলাম। আজ পোশাক নীল লং স্কার্ট, সাদা টপ। কানে স্কার্টের সঙ্গে রঙ মিলিয়ে নীলপাথরের ঝোলা দুল। খোলা চুল।

আমাদের শনিবারের আসরের ঝিমিয়ে পড়া পরিবেশ যেন মুহূর্তে বদলে গেল।

আমরা নানান প্রশ্ন করে উঠলাম।

—কবে ফিরলে? কোথায় কোথায় ঘুরলে? টিপু সুলতান প্যালেস দেখলে? লালবাগ কেমন? ওয়েদার কেমন ছিল? দিল্লিতে ক'দিন ছিলে —ইত্যাদি ইত্যাদি।

—দাঁড়া, বসতে দে আগে। এবারে এক এক করে প্রশ্ন কর—বলে এক কোণে পড়ে থাকা হাতলভাঙা চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে পড়ল। এক এক করে আমাদের প্রায় সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পরে ব্যাগ থেকে একটা কালো নোটবুক বার করল। অবশ্য তার উপরে কোনও সাল লেখা নেই। এরকম নোটবুক আমরা আগে কোনও দিন অনিলিখাদির হাতে কখনও দেখিনি।

ওটা দেখা মাত্র আমরা বাকি সব প্রশ্ন ভুলে গিয়ে বলে উঠলাম— কী আছে ওই নোটবুকে?

অনিলিখাদি বলে উঠল— বলছি। এটা খুঁজে বার করতে গিয়েই দেরি হয়ে গেল। আজ সকালের একটা খবর দেখে প্রথমেই এই নোটবুকটার কথা মনে পড়ল। সে সময় কয়েক বছর রীতিমতো নিয়ম করে নোটবুক লিখতাম। বিশেষ করে কোথাও বেড়াতে গেলে। রোজ কী হচ্ছে, তা লিখে রাখতাম। পরে পড়লে ভালো লাগত।

—আজ সকালে আবার কিসের খবর? সেরকম কোনও খবর দেখিনি তো!— আমরা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। আমরা অবশ্য জানি যে খবরগুলো আমরা সচরাচর হুমড়ি দিয়ে পড়ি, সেগুলো কোনওটাই অনিলিখাদিকে বিশেষ আকর্ষণ করে না।

অনিলিখাদি বলে, তোরা পারিসও বটে, সারাদিন ধরে ওয়ান ডে দেখলি, তারপর আবার সে খবর বার বার করে বিভিন্ন কাগজে পড়ছিস। যেন তাতে অন্যরকম কিছু লেখা থাকবে।

যাই হোক আমাদের নীরব দেখে অনিলিখাদি বলে উঠল— না, না, এ সব খবর তোদের চোখে পড়বে না। এখানকার খবরের কাগজে সেভাবে বেরোয়ও নি। সকালে বিবিসি নিউজে দেখলাম। উইলিয়াম ডেমেন্ট মারা গেছেন।

—কে-কোন ডেমেন্ট? কোন দেশের প্রেসিডেন্ট? — প্রতীক বলে উঠল।

—না, না, উনি ছিলেন ঘুমের জগতের প্রেসিডেন্ট। স্ট্যানফোর্ডের প্রফেসার, বিজ্ঞানী। পুরো জীবনটাই ঘুম নিয়ে রিসার্চ করে কাটিয়েছেন। শেষে কাল রাতে ঘুমের মধ্যেই চলে গেছেন।

—ও বুঝেছি। ওনার নাম থেকেই ডেমেনশিয়া কথাটা এসেছে— তন্ময় বিজ্ঞের মতো ভাব করে চোখের চশমাটা খুলে পরিষ্কার করতে করতে বলে উঠল।

—না, না। গুড গেস। কিন্তু ডেমেনশিয়া কথাটা ল্যাটিন শব্দ ডেমেন্স থেকে এসেছে। ডেমেন্স বলতে বোঝায় মনের উপরে নিয়ন্ত্রণ হারানো। সেটা ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে চলে আসছে।

আমরা সবাই কটমট করে তন্ময়ের দিকে তাকালাম। সব বিষয়ে খুব কম জেনে বেশি জ্ঞান ফলানোর অভ্যেসটা ওর আর গেল না।

—তা হঠাৎ করে ওঁর কথা? তোমার ডায়েরির মধ্যে এ ব্যাপারে কিছু আছে?— সহেলী ফের অনিলিখাদিকে বলে উঠল।

—হ্যাঁ, পুরোটা বলছি। তার আগে একটু জল দে তো। বেশ খানিক্ষণ লাগবে এ লেখা পড়তে।

একটু পরে এক গ্লাস লেবুজল শেষ করে অনিলিখাদি ফের বলে উঠল —উনি স্ট্যানফোর্ডে ঘুমের উপরে একটা ক্লিনিকও তৈরি করেন। সেই ১৯৫০ সাল থেকে সারাজীবন গবেষণা করে গেছেন ঘুমের উপরে। স্বপ্নের উপরে। আমার সঙ্গে ওখানেই দেখা। ভালো আলাপ ছিল। উনি তখন স্বপ্ন নিয়ে রিসার্চ করছিলেন। সেটা অবশ্য আমার সাব্জেক্ট ছিল না। নেহাত আমি মাঝেমধ্যে ওঁর ক্লিনিক-এ যেতাম বলে কথা হত।

বলতেন আমরা জীবনের তিনভাগের এক ভাগ ঘুমিয়ে কাটাই। সে তুলনায় ঘুম নিয়ে ভাবি কম। রিসার্চ হয় কম। তোমার মতো ভালো মেয়ে কখনোই ঘুম নিয়ে রিসার্চের কথা ভাববে না। অথচ দেখো, রোবট ছাড়া আমাদের দিব্বি চলে যাবে, কিন্তু ঘুম ছাড়া আমাদের কারও চলবে না।

ওঁর ক্লিনিকেই ইইজি-র মাধ্যমে বিভিন্ন টেস্ট সাবজেক্টের ব্রেন অ্যাক্টিভিটি মাপা হত। মাথার খুলিতে ইলেক্ট্রেড লাগিয়ে নানান ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতেন। যখনই যেতাম, দেখতাম ওঁকে ঘিরে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়। কখনও কখনও মিডিয়ার লোকেদের ভিড়। আসলে এটা ঠিক যে উনি 'ঘুম'এর বিষয়টাকে সবার সামনে নিয়ে এসেছিলেন। সবার আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

সে বিষয়ে আরও কিছু বলার আগে তোদের কিছু প্রশ্ন করে নিই। দেখি তোদের জেনারেল নলেজ ক'রকম? উত্তর দিতে না পারলে গল্প বলব কিনা ভেবে দেখব।

সাগ্নিক তীব্র প্রতিবাদ করে উঠল— না। না, অনিলিখাদি। আমরা শুধু গল্প শুনতে চাই। ওসব শর্ত মানতে পারব না।

—ঠিক আছে। চেষ্টা অন্তত কর।— বলে অনিলিখাদি বলে উঠল—স্বপ্ন বলতেই প্রথম কার নাম মনে পড়ে?

—সিগমন্ড ফ্রয়েড।— সহেলী বলে উঠল।

—বাহ। পারফেক্ট। এই তো ঠিক বলেছিস। সিগমন্ড ফ্রয়েড এর লেখা 'দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অফ ড্রিমস' ১৮৯৯ সালে বেরোয়। তাতে ফ্রয়েড বিভিন্ন ধরনের স্বপ্ন, স্বপ্নের মধ্যে কীভাবে সেই ব্যক্তির ইচ্ছে, উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়, সেসব নানান বিষয় নিয়ে লেখেন। কিন্তু স্বপ্ন নিয়ে এই প্রশ্ন কিন্তু এ সময়ে এসে হঠাৎ করে শুরু হয়নি। এ প্রশ্ন মানুষের বহুকালের।

আড়াই হাজার বছর আগে লেখা জেনেসিস-এ জোসেফ মিশরের ফ্যারাও-এর স্বপ্নে দেখা স্বাস্থ্যবান এবং শীর্ণ গরু পর্যায়ক্রমে দেখেই বুঝতে পেরেছিল যে পরপর কয়েক বছর ভালো ফসল এবং তারপরে দুর্ভিক্ষ শুরু হবে।

তারও পাঁচশো বছর আগে শুধু স্বপ্নের উপরে একটা বই লেখা হয়েছিল চীনে। 'জো গং জোমুং'— ঠিক উচ্চারণ করলাম কিনা জানি না— সেখানে ভালো খারাপ—অদ্ভুত—এরকম নানান ধরনের স্বপ্ন ও স্বপ্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অর্থ ডিকশনারির আকারে বেরিয়েছিল। সে তুলনায় সিগমন্ড ফ্রয়েড এর লেখা 'দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অফ ড্রিমস' অনেক অনেক পরে লেখা। তবে সেটা আবার করে সেই বড় প্রশ্নটাকেই আবার করে সামনে নিয়ে আসে। স্বপ্নের অর্থ কী? কেন দেখি? এর উৎস কী? এসব নিয়ে সবার কৌতূহল বেড়ে যায়।

আসলে স্বপ্ন তিন হাজার বছর আগেও আমাদের কাছে রহস্য ছিল। এখনও আছে। এখনও নানান রিসার্চ হচ্ছে এর উপরে।

এবারে আমার দ্বিতীয় প্রশ্নে চলে আসি। র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট বা REM— কী বলতে পারবি?

প্রতীক উত্তেজিত হয়ে হাত তুলে দাঁড়িয়ে উঠে বলল— জানি। কিছুদিন আগেই ওই বিষয়ে পড়েছিলাম। এটা ঘুমের একটা অংশ, এ সময় সামান্য সচেতনতা থাকে। স্বপ্ন আমরা ঠিক এই সময়ে দেখি।

—এই যে বললি তোরা কিছু পারবি না! দেখ। কীরকম চটপট ঠিক উত্তর বলে ফেলছিস। বিজ্ঞানীরা এখন বলেন 'র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট'-এর সময় বাইরের জগতের সঙ্গে আমাদের সামান্য যোগাযোগ থাকে। সেই সময়ে চাইলে ওই ঘুমন্ত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখাও সম্ভব। এমনকী তাদের স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে কিছু প্রশ্নও রাখা যায়। এ সময় মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে। হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ বাড়ে। সিনেমা দেখার মতো চোখের মণি নড়াচড়া করে চোখের পাতার আড়ালে। জেগে থাকা ও ঘুমের এই সময়ে ব্রেন ওয়েভে খুব বেশি তারতম্য হয় না। কিন্তু এই র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM) ঘুমের পুরো সময়ের মোটে কুড়ি শতাংশ সময় জুড়ে হয়। বাকি আশি শতাংশ 'নন-র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট (NREM) ঘুম'। যেটুকু রিসার্চ হয়েছে REM ঘুমের উপরে, সে তুলনায় খুব কম রিসার্চ হয়েছে NREM ঘুমের উপরে। এই NREM-এর সময় মস্তিষ্কের স্নায়ু কোষ স্লো ইলেকট্রিক ওয়েভ তৈরি করে। এক সেকেন্ডে একটা সাইকেল কম্পাঙ্কে।

শোওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে এই ব্রেন ওয়েভ মস্তিষ্কের প্রত্যেকটা স্নায়ুকোষকে স্পর্শ করে। প্রথম দিকে এই ব্রেন ওয়েভ শক্তিশালী হয়, আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে পড়ে। এসব নিয়ে এখন অনেক রিসার্চ হচ্ছে। এগুলো বললাম কারণ আজকের গল্পের পিছনে এসবের কিছুটা ভূমিকা আছে।

—তুমি তো আজ পুরো ক্লাস নিতে শুরু করলে এদের। —বিশ্বজিৎদা ঢুকতে ঢুকতে বলে ওঠে।

হেসে ওঠে অনিলিখাদি। —কী ব্যাপার আজ এত দেরি করে!

—বাহরিনের একটা ফরমুলা ওয়ান রেসিং দেখাচ্ছিল। দেখতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। তা আজ হঠাৎ করে এসব? শেষে প্রফেসার-এর চাকরি নিলে নাকি কোথাও?

—আজ আমার একটা গল্প বলতে যাচ্ছিলাম। তার আগে ভাবলাম কিছু জিনিস বুঝিয়ে দিই। কারণ আজকের গল্পের অনেকটা জুড়ে ঘুম আর স্বপ্ন।

এসব কথায় দেরি হচ্ছে দেখে আমি বলে উঠলাম— তারপরে? পরের প্রশ্ন?

—ঠিক আছে। পরের প্রশ্ন। ঘুম না হলে কী হয় জানিস?

—সে তো খুব সোজা। ঘুম না হলে কোনও কিছুই ঠিক ভাবে করা যায় না। কোনও কিছু মনে রাখার জন্য ঘুম খুব জরুরি— রাতুল বলে উঠল।

—হ্যাঁ, ঠিকই বলেছিস। না ঘুমোনোর জন্যই তো কত অ্যাক্সিডেন্ট হয়। ঘুম ব্রেনকে একটু থেমে থাকার সময় দেয়, যাতে আবার করে তা ঘুম থেকে ওঠার পরে পূর্ণ দক্ষতায় কাজ শুরু করতে পারে। এজন্য দিনের পর দিন ঘুমোতে না দিলে অপরাধী তার অপরাধ স্বীকার করে নিতেও বাধ্য হয়।

মাছির উপরে পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে যদি তাদের ঘুম কমিয়ে দেওয়া হয় জিন-মিউটেশনের মাধ্যমে, তাহলে তারা প্রায় কিছুই মনে রাখতে পারে না। একটা সাধারণ মাছি যেখানে আট থেকে চোদ্দো ঘণ্টা দিনে ঘুমোয়, সেখানে এভাবে পরিবর্তিত মাছি ঘুমোয় মোটে দুই থেকে তিন ঘণ্টা। কিন্তু তার পরে তারা প্রায় কিছুই মনে রাখতে পারে না। ঘুমের সঙ্গে মেমারি বা স্মৃতি শক্তি সরাসরি কানেক্টেড। ঘুমের সময় যেসব জিনিস অদরকারি সেরকম অনেক কিছু বাদ দিয়ে ফিল্ম এডিটিং-এর মতো যেটুকু মনে রাখা দরকার, ঠিক সেটুকুই স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষিত হয়। সেজন্য তুই সাত দিন আগে সকালে কী খেয়েছিস সেটা মনে করতে পারিস না! কিন্তু কবে অঙ্কে ফেল করেছিলি সেটা ঠিক মানে রাখিস। —শেষ কথাটা বলার সময় অনিলিখাদি আড়চোখে বিশ্বজিৎদার দিকে তাকাল। কারণটা আমারা সবাই জানি।

ফের বলে উঠল— অনেক সময় স্বপ্ন আবার আবিষ্কারেও সাহায্য করেছে। জার্মান রসায়নবিদ ফ্রেড্রিক অগাস্ট স্বপ্নে বেঞ্জিনের স্ট্রাকচার দেখতে পান। উনি বুঝতে পারছিলেন না কীভাবে ছ'টা কার্বনের পরমাণু ছ'টা হাইড্রোজেনের পরমাণুর সঙ্গে কেমিক্যাল বন্ডিং-এর নিয়ম মেনে একসঙ্গে থাকতে পারে। ফায়ার প্লেসের ধারে ঘুমিয়ে পড়েন। স্বপ্নে উনি দেখেন দুটো সাপ একে অপরের ল্যাজ কামড়ে ধরেছে। তার জন্যেই উনি বেঞ্জিনের স্ট্রাকচার নাকি বার করতে পেরেছিলেন।

যেসব কিছু মনে রাখে সে কোনোকিছুই বিশ্লেষণ করতে পারে না, নতুন কিছু ভাবতে পারে না। ঘুমের মধ্যে আমরা তাই অনেক তথ্য ছেঁটে ফেলি, যার তেমন কোনও গুরুত্ব নেই।

মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাসে কোনও তথ্য বেশিক্ষণের জন্য সংরক্ষিত হয় না। বেশিক্ষণের জন্য তথ্য রাখা হয় প্রি-ফ্রন্টাল করটেক্সে। আর সে কাজটা ঘুমের মধ্যেই হয়।

এবারে পরের প্রশ্ন। মরভান সিন্ড্রোম কী?

আমরা কেউ এর উত্তর জানতাম না। আমাদের নীরব দেখে অনিলিখাদি ফের বলে উঠল—

মরভান সিন্ড্রোম একধরনের একটা অসুখ। এক বিরল মস্তিষ্কের অসুখ যারজন্য যাদের এটা হয় তারা মাসের পর মাস ঘুমোতে পারে না, ঠিক ? মাছিদের মতোই। শেষে তাদের এর জন্যই মৃত্যু হয়।

যেটা রাতুল বলল, সেটা ঠিক। অতীতে বড় বড় অ্যাক্সিডেন্ট শুধু ঘুমের অভাব থেকে হয়েছে। থ্রি মাইল আইল্যান্ড-এ ১৯৭৯-এ পরমাণু শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রে যে দুর্ঘটনা হয়েছিল বা তেলের ট্যাঙ্কার 'এক্সন ভ্যাল্ডেজ' জাহাজের ধাক্কার জন্য যে বিপর্যয় হয়েছিল, সে সবই ঘুমের অভাব থেকে।

তা যা বলছিলাম। তোরা পরীক্ষায় পাশ। এবার আমার সেই ঘটনায় চলে আসি।

বিশ্বজিৎদা পাশ থেকে বলে উঠল— ঘটনা না গল্পে।

অনিলিখাদি মুচকি হেসে বিশ্বজিৎদার বিদ্রূপ অগ্রাহ্য করে বলে উঠল —গ্যাব্রিয়েল-এর সঙ্গে আমার পরিচয় ওই প্রফেসার ডেমেন্টের ল্যাবে। গ্যাব্রিয়েল এর পুরো নাম গ্যাব্রিয়েল এগারট। এগারট পদবিটা শুনেই বুঝেছিলাম যে গ্যাব্রিয়েল ইহুদি।

ও তখন প্রফেসারের আন্ডারে রিসার্চ করছিল স্বপ্নের উপরে একটা বিশেষ বিষয় নিয়ে। প্রফেসারের খুব প্রিয় ছাত্র।

কীভাবে স্বপ্নের মাধ্যমে অপরাধীর অপরাধ বোঝা যেতে পারে সে বিষয়ে! ইন্টারেস্টিং বিষয়। সে বিষয়ে ও একটা স্বপ্নের ক্যাটালগ বা ডেটাব্যাঙ্কও তৈরি করার চেষ্টা করছিল। হাজার হাজার টেস্ট সাবজেক্টের স্বপ্ন বিচার করে সব ধরনের স্বপ্নের উপরে নির্ভর করে ও এই ডেটাব্যাঙ্ক তৈরি করছিল। ওর উদ্দেশ্য ছিল 'র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট'-এর সময়ে সে ঘুমন্ত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে তার পুরনো অপরাধ খুঁজে বার করা। সেই সময়ে কোনও প্রশ্ন করে চোখের পাতার নীচে মণির নড়াচড়া দেখে আর ব্রেন ম্যাপিং করে তার উত্তর খুঁজে বার করা ও অপরাধ সম্বন্ধে আন্দাজ করা। অতীতে সে ব্যক্তি কী করেছে তার উপরে নির্ভর করে একটা লোকের দেখা স্বপ্নে তার ছাপ থেকে যায়। এর থেকেই ওর ধারণা হয় যে স্বপ্নের মধ্যে থেকেই খুঁজে পাওয়া যাবে অপরাধীকে! অপরাধী চাইলেও সেটা লুকোতে পারবে না।

যুদ্ধে যে সৈনিক লড়েছে, তার স্বপ্ন সবথেকে ভয়ানক হয়। এর একদম বিপরীত প্রান্তে আবার অন্ধের স্বপ্ন। সে অন্যের সাহায্যের উপরেই বেঁচে থাকে। তাই তার স্বপ্নে হিংসা সবথেকে কম থাকে। আবার যে দশকে কোনও দেশে যুদ্ধ হয়েছে, সে সময়ে সেখানকার অধিবাসীদের স্বপ্নেও তার প্রভাব পড়েছে। সে সময়ে লোকেরা স্বপ্নে বেশি হিংসা বা ভায়োলেন্স বেশি দেখে।

আমি ওখানে তিনমাস মতো ছিলাম। তার মধ্যে বেশ কয়েকবার ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল।

গ্যাব্রিয়েল-এর কাছ থেকেই জেনেছিলাম যে আমরা পূর্ণিমার দিন গড়ে অন্যদিনের তুলনায় কুড়ি মিনিট কম ঘুমোই। এমনকী জানলা বন্ধ করে শুলেও তার কোনও পরিবর্তন হবে না। সেই সব দিনে মেলাটোনিন হরমোনও কমে যায়, যার ঘুমের পিছনে বড় ভূমিকা থাকে।

গ্যাব্রিয়েল বলেছিল এর পিছনে একটা কারণ থাকতে পারে। আগে পূর্ণিমার রাতে আলোর জন্য অন্য প্রাণীর হামলার সম্ভাবনা বেশি থাকত। সেজন্য অনেক বেশি সতর্ক থাকা দরকার বলেই এরকম বিবর্তন হয়েছে, যাতে অন্য প্রাণীর আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

ওখান থেকে চলে আসার পরে ওর সঙ্গে আর যোগাযোগ ছিল না। পরে শুনেছিলাম কেম্ব্রিজের নোকিয়া বেল ল্যাবস-এ ও এই ব্যাপারে রিসার্চ করতে চলে আসে।

এতটা বলার পরে অনিলিখা থামল। একটু থেমে ফের বলে ওঠে—

এবারে আমি আমার ডায়েরি থেকে পড়ে শোনাই। এটা কয়েকবছর আগের কথা। ইচ্ছে করেই কিছু জিনিস বলিনি তোদের আগে। লিখে রাখার একটা সুবিধে হল, এতদিন পরেও সেই দিনে ঠিক কী হয়েছিল সেটা বলতে গিয়ে কোনও ভুল হয় না। সে দিনটা এখনও যেন চোখে ভাসে।

বিশ্বজিৎদা পাশ থেকে ফুটনোট যোগ করল—আগে থেকে গল্প লেখা থাকলে, এমনিতেও বলা অনেক সুবিধে। ফাঁকফোকর কম থাকে।

অনিলিখাদি কথাটা যেন শোনেনি এমন ভান করে একটু গলা খাঁকরে ডায়েরি হাতে নিয়ে নিল। কিছু পাতা ওলটানোর পরে একটা পাতায় এসে থামল।

পাশ থেকে তন্ময় উঁকি মারছিল ডায়েরির পাতায়। অনিলিখাদি বলে উঠল —দাঁড়া, আমি পড়ছি। চুপ করে বস। শুধু ছটফটানি।

১২ জুন, ফ্রান্সের স্যামোনি

এখন রাত ন'টা। খানিক আগেই গির্জার ঘড়ি মৃদু গম্ভীর স্বরে রাত ন'টাকে স্বাগত জানিয়েছে। হোটেলে ফিরে এসেছি ঘণ্টাখানেক। এসে ডায়েরি লিখতে বসেছি।

আজ সারাদিন বেশ ছোটাছুটি গেছে।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে বাসে করে বেরিয়েছিলাম সকাল ছ'টায়। এখানে সকাল ন'টা নাগাদ এসে পৌঁছেছি।

স্যামোনি বিখ্যাত স্কি রিসোর্ট। ফ্রান্সের মধ্যে। কিন্তু সুইজারল্যান্ড ও ইতালির খুব কাছে।

এসেই হোটেলে ব্যাগ রেখে শহর দেখতে বেরিয়ে পড়েছিলাম।

এদিক ওদিক থেকে উঁকি দিচ্ছে পাইনের জঙ্গলে ঢাকা সবুজ পাহাড়। তার কিছুটা দূরে দেখা যাচ্ছে বরফে ঢাকা আল্পস। শহরের যে কোনও জায়গা থেকেই দেখা যায় ফ্রেঞ্চ আল্পস। মনে হয় বাড়িগুলোর খুব কাছেই যেন সে পর্বতশ্রেণি দাঁড়িয়ে আছে। দূরে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা মেঘের মধ্যে তারা লুকোচুরি খেলছে।

যারা আল্পসের মঁব্লা শৃঙ্গে উঠতে চায়, তাদের এখানেই আসতে হয়। মঁব্লাকে হোয়াইট মাউন্টেন বলা হয় কারণ সারাবছর বরফে ঢাকা থাকে আল্পসের এই শৃঙ্গ। যারা মঁব্লা শৃঙ্গে উঠতে চায়, তারা এখান থেকেই যায়। এটাই ইউরোপের সবোচ্চ শৃঙ্গ।

তাই আজ হাঁটতে গিয়েই টের পেলাম রাস্তায় যাদের দেখা যাচ্ছে, তাদের প্রায় সবাই টুরিস্ট। তারা রাস্তার মোড়ে মোড়ে প্রকৃতির নতুন নতুন রূপের চমকে থমকে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। চোখে তাদের সেই মোহিত বিহ্বল দৃষ্টি। মানুষজন যেন বারবার এই অপার্থিব সৌন্দর্যে তাদের পথ ভুলে যাচ্ছে।

শহরের মাঝখান দিয়ে বেশ খরস্রোতা এক নদী বয়ে যাচ্ছে। তার পাশ দিয়ে হাঁটার সময় নদীর অবিরাম ঝিরঝিরানি বাতাসে ভেসে আসছিল। মনে হল এ শহরের হাওয়ায় নানারকম লতাপাতার মিলিত সুবাসে সারাক্ষণ যেন এক মৃদু আতরের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। নদীর উপর দিয়ে কয়েকটা ছোট ছোট কাঠের ব্রিজ আছে। চড়াই উতরাই ভেঙে হাঁটতে লাগলাম। রাস্তার পাশে লম্বা ঝাকড়া গাছের দল একে অপরের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেঘছেড়া মিঠে রোদ্দুর এসে পড়েছে পাশের ঘাসজমি আর উপত্যকায়।

শহর জুড়ে নানান রঙের নানান স্টাইলের বাড়ি। তবে হলুদ আর কমলা রঙের বাড়ি বেশি। কিছু বাড়ি বেশ পুরনো। বেশিরভাগই কাঠের বাড়ি। কিছু দোতলা বাড়ির চারধারে দিয়ে গোল বারান্দা। অ্যালপাইন আরকিটেকচার। এরকম জেনেভায় দেখিনি। সবুজ খড়খড়ি দেওয়া জানলা। বেশিরভাগ বাড়িতে ছোট ছোট ব্যালকনি আছে। সেসব ব্যালকনি ফুলের টব দিয়ে সাজানো। কিছু বাড়ির দেওয়ালে ফুল-লতা পাতা আঁকা। ফ্রান্স, ইতালি আর সুইজারল্যান্ডের বর্ডারে এই শহর বলে তিনটে দেশেরই কিছু কিছু প্রভাব পড়েছে।

শহরের কেন্দ্রে বড় খোলা চত্বর। বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে রেস্টুরেন্ট, পাব, ক্যাফে, ক্যাসিনোও আরও নানান পসরা সাজিয়ে বসা ছোট ছোট দোকান। এখানে শুধু পায়ে হাঁটার রাস্তা। রাস্তা জুড়ে টেবিল চেয়ার পাতা। সেখানে সব টুরিস্ট বসে খাচ্ছে।

একটা বিশাল ব্যারোক স্টাইলের চার্চ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে কেন্দ্রে।

এককথায় ছবির মতো শহর। শহর বলছি কিন্তু সে তুলনায় খুবই ছোট শহর। দেড় ঘণ্টা হাঁটার পরেই বুঝলাম শহরের সব প্রান্ত ঘুরে এসেছি।

আকাশ ঘন নীল। উষ্ণতা খুব উপভোগ্য হলেও উজ্জ্বল চড়া রোদ। আমার আবার রোদ চশমার আড়ালে চোখ ঢাকতে ভালো লাগে না। সে রোদে ছাতার তলায় বসে আমিও আমার লাঞ্চ সারলাম। আজ বিশেষ তাড়া ছিল না। আগামীকাল সকালে কেবল কার আর মঁব্লা পিকে যাওয়ার প্ল্যান।

কেন্দ্র থেকে কিছু দূরে 'গার্ডে স্যামোনি- মঁব্লা' স্টেশন। এখান থেকে ট্রেনে করে হিমবাহ দেখতে যাওয়া যায়। শুনেছি সে হিমবাহ গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর জন্য বছরে বছরে আরও দূরে সরে যাচ্ছে।

মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল এখানে যেন টুরিস্ট ছাড়া স্থানীয় কেউ নেই।

বাইরে বসে লাঞ্চ করছি, আর আল্পসের অবর্ণনীয় সৌন্দর্য ও রোদ মেঘের খেলা দেখছি, হঠাৎ এর মধ্যে পরিচিত গলায় 'অনিলিখা' ডাক শুনে চমকে উঠলাম।

মুখ তুলে দেখি রাইকার। রাইকার-এর সঙ্গে চারদিন আগেও দেখা হয়েছিল। জুরিখে। ওখানে একটা প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকারের কাজ করে। বেশ বড়লোক। জার্মান।

বিশাল লম্বাচওড়া চেহারা। কথাবার্তায় বেশ অহমিকা প্রকাশ পায়। একই সঙ্গে সব ব্যাপারে খুব ডিসিপ্লিনড। এক কথায় টিপিকাল জার্মান। পাব থেকে একটা বড় বেলজিয়ান বিয়ার 'লিফি'র মাগ নিয়ে এসে বসল। তারপরে কথা বলতে শুরু করে দিল। আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল। কিন্তু আমি খাই না জানিয়ে দিলাম।

লক্ষ্য করলাম ওর চোখের নীচে কালি পড়ে গেছে। ক্লান্তির বা না ঘুমোনোর লক্ষণ। দু দিন আগে জুরিখে যখন দেখা হয়েছিল, তখন এরকম দেখিনি। পরে কথা বলে বুঝলাম কেন এ চেহারা হয়েছে ওর।

শুনলাম ও নিজে জুরিখে থাকলেও ওর বাবা মা এখানেই থাকেন। এখানেইও বড় হয়েছে। এখানে শহরের বাইরে আল্পসের ঢালে বেশ কয়েকটা গ্রাম আছে। সেখানেই বেশিরভাগ স্থানীয় লোক থাকে। সেরকমই একটা গ্রামে ওর বড় হয়ে ওঠা। স্থানীয় লোকেদের প্রায় সবার অবস্থাই বেশ ভালো। বেশিরভাগ লোকাল হোটেল ও লজ তাদের। কিন্তু গত এক মাস ধরে এখানে এক অদ্ভুত জিনিস শুরু হয়েছে। তার জন্যেই ও এখানে আসতে বাধ্য হয়েছে।

কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতে ও বলে উঠল—এখানকার খবর শুনেছ নিশ্চয়ই।

বললাম যে আমি আজ সকালেই এসেছি। তেমন কারও সঙ্গে কথা হয়নি।

ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল—প্রায় একমাস যাবৎ এখানে একটা অদ্ভুত জিনিস শুরু হয়েছে। সম্পূর্ণ সুস্থ লোক, সন্ধে অবধি একদম স্বাভাবিক, হঠাৎ করে পরদিন সকাল থেকে তার মধ্যে পাগলামো দেখা যাচ্ছে। যেন অন্য কোনও জগতে হারিয়ে গেছে। হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে বা শুয়ে বসে আছে। কিন্তু কথার মধ্যে কোনও লজিক নেই, কোনও বাস্তবতা নেই। বিড়বিড় করে কী সব বলে যাচ্ছে মাঝেমধ্যে। কারও কারও চোখ-মুখ হঠাৎ করে হিংস্র হয়ে উঠছে। বলছে কাউকে বাঁচতে দেবে না। চেনা পরিজনদের চিনতে পারছে না। যেন অন্য কোনও জগতে সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে।

জিজ্ঞেস করে জানলাম প্রায় সত্তর জন লোকের এরকম হয়েছে। প্রায় সবাইকে মানসিক রোগীদের জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ডাক্তাররা দেখছে। কিন্তু এখনও এর পিছনের কারণ খুঁজে পায়নি। সবার হাবভাব, সিম্পটম মোটামুটি একই রকম।

একটা শেষ করে আরকেটা বড় বিয়ার ম্যাগ নিয়ে এসে চুমুক দিতে দিতে ও বলে উঠল—পারলে একবার আমাদের বাড়িতে এসো। ভালো লাগবে। আমরা এখানে আছি প্রায় গত পঞ্চাশ বছর ধরে। এখানে যারা আছে তাদের মধ্যে অনেকে আরও বেশি বছর ধরে আছে। আগে জায়গাটা দুর্গম ছিল। কিন্তু আমরাই অনেক ইনভেস্ট করে রাস্তা ঠিক করে নিয়েছি। সরকারি সাহায্য ও নিজেদের ফান্ড ব্যবহার করে স্যামোনিকে বিশ্বের সেরা স্কি রিসোর্ট হিসেবে গড়ে তুলেছি। এখন স্যামোনির শহরাঞ্চল সম্পূর্ণ টুরিস্ট প্লেস হয়ে উঠলেও শহরের বাইরের এসব গ্রাম, গ্রামাঞ্চল কিন্তু এখনও সেই চল্লিশ বছর আগের সময়কে ধরে রাখতে পেরেছে।

আমাদের বাড়ি ও খামারবাড়ি দেখলেই বুঝবে। মনে হবে যেন আল্পস বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন এখানে যে কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার ভয় হচ্ছে বাবা— মার না কিছু হয়। ছোট এলাকা। আমরা প্রায় প্রত্যেকে প্রত্যেককে বহুবছর ধরে চিনি। সে জন্য এ ক'দিন ডাক্তারখানা আর হাসপাতাল ছুটোছুটি করে সত্যি ক্লান্ত হয়ে গেছি। ঠিক করে ঘুমও হচ্ছে না। মনে হচ্ছে যদি আর জেগে না উঠি।

আমি ওকে দেখে বুঝলাম আরও বেশ কয়েক বিয়ারের মাগ শেষ না করে ও উঠবে না। আমার আরেকটু ঘুরে দেখার ইচ্ছে আছে।

নেক্সট কয়েক দিন যেখানে যেখানে যাব, তার টিকিট আগে থেকে কাটতে হবে। সে সব ভেবে ওকে বিদায় জানিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। তা না হলে আর আগামী ক'দিন এখান থেকে স্থানীয় বিভিন্ন আকর্ষণে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় টিকিট কাটার সুযোগ পাব না।

ইচ্ছে আছে, যদি সময় হয় অবশ্যই একবার রাইকার-এর গ্রামে যাব। এটা কী ধরনের অসুখ সেটাও বুঝতে হবে হাসপাতালে গিয়ে।

১৩ জুন, রাত আটটা

আজ সকালে গিয়েছিলাম মঁব্লা দেখতে।

স্যামোনি থেকে দুটো গন্ডোলা নিয়ে যায় 'এগুই দু মিদি' শৃঙ্গে। সেই গন্ডোলা যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে লিফট করে আরও উপরে উঠলাম। সেটা একদম পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে দিল।

যেখানে পৌঁছলাম, সেখানে একটা বড় চাতাল। উপর থেকে মঁব্লা ও তার চারদিকের পাহাড় দেখা যায়। পায়ের অনেক নীচে হালকা ছোট ছোট মেঘের টুকরো ঘোরাফেরা করছে, যেন বরফের মুকুটপরা পাহাড়গুলোকে ঘিরে তারা উৎসবে মেতেছে।

আশেপাশে যেদিকেই তাকাই, শুধু বরফ।

তার মধ্যে অনেক স্কি করছে। আমি হিমালয়ে ট্রেক করতে অনেকবার গেছি, কিন্তু এরকম কোনও জায়গায় যেতে হলে প্রায় তিন-চার দিনের দুর্গম পথ ট্রেক করতে হয়। এখানে যেন প্রযুক্তির কল্যাণে খুব সহজেই সেখানে চলে আসা সম্ভব হয়েছে।

দূরে অনেক নীচে ছবির মতো পাইনের বনের আড়ালে ছোট ছোট গ্রাম দেখা যাচ্ছিল। সাদা ক্যানভাসের মধ্যে কোনও শিল্পী যেন তুলি আর সবুজ রঙ দিয়ে কিছু ছবি এঁকেছেন। মুগ্ধ হয়ে দেখতে হয়। ভেসে বেড়ানো মেঘের ছায়া যেন নীচে দূরের বন-প্রান্তরের উপরে সমানে বুনে চলেছে নতুন নতুন ছায়ার সোয়েটার।

একটা জায়গায় বেশ লম্বা লাইন। পরে বুঝলাম লাইন করে ঝুলন্ত ব্যালকনির মতো একটা জায়গায় যাওয়া যায় যেখানে পায়ের নীচে কাচের মেঝে। দু-একজন যাদের উচ্চতার প্রতি ভীতি আছে, তারা ওই জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতেই ভয় পাচ্ছিল। পায়ের নীচে প্রায় হাজার মিটার গভীর গিরিখাত। মনে হয় কাচ যে কোনও সময় সরে গেলেই সোজা এক কিলোমিটার নীচে পতন।

ঠিক করলাম একদিন এখানে স্কি করতে আসব। সব স্কি-এর যন্ত্রপাতি এখানেই ভাড়া করা যায়। আগে কলোরাডোর অ্যাসপেনে করেছি। দেখলেই বোঝা যাচ্ছে এ জায়গা স্কি-এর জন্য আদর্শ। কিন্তু আজ আর সময় পেলাম না।

ফিরে আসতে আসতে চারটে হয়ে গেল। আগে ভেবেছিলাম কিছু দূরে একটা আইস কেভ আছে। ওটা দেখতে যাব। কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ঘন কালো মেঘ ঘিরে ধরছে। বৃষ্টি আসতে পারে। ঠিক করলাম আজ আর ওই আইস কেভ দেখতে যাব না। কাছাকাছি কোথাও যাওয়া ভালো।

স্থানীয় লাইব্রেরী গেলাম।

লাইব্রেরী যে কোনও জায়গার চরিত্র তুলে ধরে, বিশেষ করে সে চরিত্র যেটা চট করে সামনে আসে না। সে জন্য কোথাও গেলেই আমি স্থানীয় লাইব্রেরীতে যাই। এখানকার লাইব্রেরীটা প্রায় তিনশো বছর পুরনো। পাহাড়ের একদম ধারে কাঠের বিল্ডিং। যে কেউ যেতে পারে। অবশ্য বই এলান করতে গেলে লাইব্রেরীর কার্ড থাকতে হবে।

অনেক বই আছে। তবে অবাক লাগল যে জার্মান ভাষার বই এর সংখ্যা বেশি। ফ্রেঞ্চ না ইতালিয়ান হলে অবাক হতাম না। মনে হয় এখানে রাইকারের মতো জার্মান এলাকেদের সংখ্যা বেশি। তবে সঙ্গে কিছু ইতালিয়ান, ফ্রেঞ্চ ও ইংরাজি বইও আছে।

আমি স্যামোনির ইতিহাস জানার জন্য একটা বই নিয়ে অনেকক্ষণ পড়ছিলাম। আমাকে ওই বইটা পড়তে দেখে দেখি এক বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে এলেন অন্য একটা বই হাতে নিয়ে। মাথার পিছনের দিকে শুধু পাকা চুল। বয়স আশির কাছাকাছি হবে। একটু কুঁজো হয়ে হাঁটেন। আমাকে একটা বই এগিয়ে দিয়ে বললেন— টুরিস্ট? এখানকার ইতিহাস জানার চেষ্টা করছ?

সায় দিতে খুশি হয়ে বলে উঠলেন— খুব ভালো। আমিও এটাই মনে করি যে কোনও জায়গায় গিয়ে সেখানকার ইতিহাস কিছুটা না জানলে ঘোরার অর্ধেক আনন্দ থাকে না। তবে এই বইটা আরও ভালো। এটা পড়ো। বাইরে কিছু বই-এর দোকানে এটা হয়তো কিনতে পারবে।

কথা বলে জানলাম বৃদ্ধ এখানে প্রায় পঞ্চাশ বছর আছেন। এখানকার সবকিছুই প্রায় জানেন। নাম ডেভিড। ভারতে বেশ কয়েকবার বেড়াতে গেছেন। আমাকে ওঁর বাড়িতেও আসতে বললেন। জানি না অবশ্য এর মধ্যে যাওয়া হবে কিনা।

পাঁচটা নাগাদ লাইব্রেরী বন্ধ হয়ে গেল। বাইরে এসে বসলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ঘন কালো মেঘ যেন হঠাৎ করে এগিয়ে এল তাড়া খাওয়া খরগোশের মতো। মুহূর্তে অন্ধকারে বাক্সবন্দি করে নিল এই শহরটাকে।

তার পরপরই বলা-কওয়া নেই প্রবল ধুলোর ঝড় এল। একটা শীতল বাতাস যেন পাহাড় থেকে ঝাঁপিয়ে এসে পড়ল শহরের রাস্তায়।

সেটা মিনিট খানেক চলার পরে মুশলধারে বৃষ্টি এল। ছুটে পাশের এক রেস্টুরেন্টে গিয়ে ঢুকলাম। শুধু আমি নই, আশেপাশের সবাই বৃষ্টির জন্য এখানে আশ্রয় নিয়েছে বলে বেশ ভিড়। কিছু না কিনে শুধু শুধু ভিড় বাড়ানো ঠিক হবে না ভেবে একটা চিকেন বার্গারের অর্ডার দিয়ে টেবিলে বসলাম।

শুনেছি এই শহরে মাঝেমধ্যেই হানা দেয় খামখেয়ালি বৃষ্টি। কিন্তু এতটা আশা করিনি।

টেবিলে রাখা স্থানীয় কাগজ হাতে নিয়ে দেখব, ঠিক এমন সময় পাশ থেকে কানে কিছু কথা ভেসে এল। তারা জার্মানে কথা বললেও বুঝতে পারলাম যে গতকাল রাইকার যে বিষয়ে কথা বলছিল, সেটা নিয়েই এরা কথা বলছে। বেশ কয়েকজন লোক গতকালও মারা গেছে। একটা আতঙ্ক সবার মধ্যে টের পেলাম।

কেন এ নিয়ে আলোচনা তা হাতের ইংরেজি কাগজটাতে চোখ বোলাতেই বুঝলাম। সেটার প্রথম পাতার হেডলাইন ‘Mysterious disease spreads in Chamonix’।

পুরোটা পড়লাম। শুরু হয়েছে এক মাস আগে। ঠিক যেরকম রাইকার বলেছিল। যাদের হচ্ছে তাদের সবার এই হঠাৎ করে পাগলামো শুরু হচ্ছে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে। বলা যায় ঘুমের মধ্যেই। যেন হঠাৎ করে তারা তাদের সচেতনতা হারিয়ে ফেলছে। এরকম শুরু হওয়ার দু-তিন দিনের মধ্যে মারা যাচ্ছে।

একটা জিনিস রাইকার বলেনি। তা হল যাদের এটা হচ্ছে, তাদের প্রায় সবার বয়স আশির বেশি। সেক্ষেত্রে যা হয় আর কি, প্রথমে এটা নিয়ে খুব একটা চিন্তাভাবনা করা হয়নি। নিশ্চয়ই অন্য কোনও অসুবিধে ছিল, এরকমই ভাবা হয়েছে। কিন্তু দেখতে দেখতে এ চার সপ্তাহে বাহান্নজন মারা গেছে। ইতিমধ্যে আক্রান্ত আরও প্রায় কুড়িজন যারা নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে। তাদের আয়ু বড়জোর আর এক কী দু দিন। কী করে হচ্ছে কেউ জানে না। এর পিছনে নতুন কোনও নতুন ভাইরাস কিনা সেটা দেখা হচ্ছে।

খানিকবাদে বৃষ্টি যখন থামল, তখন সন্ধে সাতটা। রেস্টুরেন্টের বাইরে বেরিয়ে এলাম। দূরে বরফে ঢাকা পাহাড় দেখা যাচ্ছে। ভিজে রাস্তা। মনে হল যেন জোনাকিরা শুয়ে আছে রাস্তায়। একইরকমভাবে ভিজে যাওয়া গাছের পাতা জ্যোৎস্নায় চকচক করে উঠছে।

রাস্তার হলদেটে ল্যাম্প শেডের আলো জ্বলে উঠেছে। সে হলুদ আলোয় আর বৃষ্টিতে ভেজা রাস্তায় স্যামোনি তখন ফের মায়াপুরী হয়ে উঠেছে।

১৪ জুন, রাত ন'টা

খানিক আগে হাসপাতাল থেকে ফিরলাম। আমার ঘরের লাগোয়া বারান্দায় এসে বসে লিখছি। এখন দ্রুত নিভতে থাকা বিকেলের আলো চারদিকে যেন কমলা রঙের আবির ছড়িয়ে দিয়েছে। চারদিক নিস্তব্ধ। এ শহর যেন এখন হঠাৎ করে অবসর নিয়েছে। দূরে মাঝেমধ্যে দু-একটা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে শুধু।

সকাল থেকে লিখি।

সকালে ব্রেকফাস্ট খাওয়ার সময়ই মনে হল ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভাবা দরকার। সংখ্যা যদিও খুব বেশি নয়, কিন্তু এরকম একটা অসুখ কী করে শুরু হল জানা দরকার। কে বলতে পারে এটাই হয়তো পরে মহামারী হয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে নানান দেশে যদি না এখনই সতর্ক হওয়া হয়।

স্যামোনি স্কি রিসোর্ট। নানান দেশের লোক এখানে আসে। যদি এটা তাদের মাধ্যমে অন্য জায়গাতেও ছড়িয়ে যায়! আমি নিজে যদিও ডাক্তার নই, কিন্তু কিছু রোগীকে যদি সচক্ষে দেখা যায়। অবশ্য ওরা যদি কাছে যেতে দেয়।

আমার কাছে রাইকার-এর নাম ছিল। ওকে ফোন করলাম। ওর মাধ্যমে দেখতে যাওয়া সহজ হবে। বেশ খানিকক্ষণ রিং হয়ে গেল। কেউ ফোন ধরল না। আমি বাধ্য হয়ে একটা মেসেজ করলাম। কিন্তু ফিরতি কোনও মেসেজ পেলাম না। সকাল সাতটা। হয়তো বেশি ভোরে ফোন করছি, তাই আর করলাম না।

আজ আইস কেভ যাওয়ার প্ল্যান ছিল। পায়ে হাঁটা পথে এখানকার স্টেশন। সেখান থেকে প্রতি ঘণ্টায় একটা ট্রেন ওই বরফের গুহায় যায়। দু-কামরার লাল ছোট ট্রেন। এখনও সেই একই রকম আছে। এখানে সবকিছু ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় চলে। গতকাল ঝড়ের জন্য ট্রেনলাইনে গাছ পড়ে বেশ কিছুক্ষণ ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঝড় কাটতেই সব আবার স্বাভাবিক। ১৯০৮ সালে এ লাইন তৈরি হয়। সিঙ্গল ট্র্যাক ট্রেনলাইন চলে গেছে পাহাড়ের উপর দিয়ে। এরকম একটা হিমবাহ দেখতে যাওয়ার জন্য ট্রেন লাইন তৈরি বিশ্বে এই প্রথম।

ট্রেনে করে যেতে আধঘণ্টার মতো সময় লাগল। ভারী সুন্দর সে পথ। পাশ দিয়ে কার্পেটের মতো মসৃণ সবুজ উপত্যকা। দু-ধারে পাহাড়। সেখানে ভেড়া চরে বেড়াচ্ছে। মাঝেমধ্যে ছবির মতো কিছু কাঠের বাড়ি। রোদ্দুরে পাইনের বন ঝলমল করছে। তাদের পিছন দিকে আরও দূরে আরও উঁচু পাহাড়ের সারি। পাইনগাছে ঢাকা জঙ্গলের মাথার উপর দিয়ে বরফের মুকুট উঁকি মারছে। খানিকক্ষণের মধ্যেই সে বরফে ঢাকা পাহাড় যেন ট্রেনের সামনে এসে পথ আগলে দাঁড়াল। চারদিক শুধু বরফ আর বরফ। যেখানে এসে পড়লাম সেখানে চারদিকে শুধুই বরফের রাজত্ব। সবুজ প্রায় হারিয়ে গেছে।

'মার দে গ্লাস' হিমবাহ। সূর্যের আলোয় চারধারের বরফ যেন হীরের দ্যুতিতে চকচক করে উঠছে। যেখানে ট্রেন থামল, সেখান থেকে প্রায় চারশো ধাপ নীচে নামার পরে বরফের সে গুহায় পৌঁছলাম। মনে হয় পুরো লোকাটাই একসময় হিমবাহ এলাকা ছিল। সে হিমবাহ গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর দৌরাত্মে দূরে সরে গেছে। দূরে পিছুহাঁটা হিমবাহে যেন সেই মন খারাপের সুর।

নামার পথে কিছু জায়গায় হিমবাহ দশ বছর আগেও কোথায় ছিল সে চিহ্ন করা আছে।

গুহার মধ্যে বরফের মূর্তির মাধ্যমে আগেকার গুহামানবের জীবনযাত্রা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবছর আবার নতুন করে এসব বরফের মূর্তি তৈরি হয়। সারা বিশ্বে এরকম আর বেশি নেই।

দেখে আবার অত ধাপ পেরিয়ে ট্রেন স্টেশনের কাছে আসতে হয়। শারীরিকভাবে খুব ফিট না হলে এখানে আসা সম্ভব নয়। নেহাতই পথে আমেরিকার এক ইতিহাসের মহিলা প্রফেসারকে পেয়ে গিয়েছিলাম সঙ্গী হিসেবে। তাই কথা বলতে বলতে অত ধাপ উঠতে কষ্ট হয়নি। ফেরার ট্রেন সময় মতোই এল।

স্যামোনিতে ফিরতে ফিরতে প্রায় চারটে। এতক্ষণ ফোনের নেটওয়ার্ক ছিল না। দেখি মেসেজ এসেছে রাইকারের কাছ থেকে। ওর বাবাকে আজ সকালে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। একই অসুখের শিকার।

ফোন করলাম। শহরের বাইরে হাসপাতাল। অ্যাড্রেস নিয়ে সোজা ট্যাক্সি নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে গেলাম। হাসপাতলের রিসেপশনে রাইকারকে পেয়ে গেলাম। শুনলাম সকালে বাবার ঘুম থেকে উঠতে দেরি দেখে রাইকার বাবার ঘরে গিয়ে দেখে উনি খাটের হেডবোরডে হেলান দিয়ে বিড়বিড় করে কীসব বলে যাচ্ছেন। এমনকী সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রাইকারকে যেন দেখতে পাচ্ছিলেন না। রাইকারের বুঝতে দেরি হয়নি কী হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার ডাকে।

ডাক্তারের কথা অনুযায়ী সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। সব ওই অসুখের সিম্পটম।

জিজ্ঞেস করলাম—তোমার বাবার শরীর কীরকম ছিল?

—দারুণ। উনি তো এখন ও নিয়মিত গলফ খেলেন। এখনও সকাল বিকেল রোজ হাঁটতে যান। আসলে উনি একটা সময় আর্মিতে ছিলেন বলে এত ফিট। কী যে হল!

—কিন্তু এখানে এখন কী ট্রিটমেন্ট করছে?

—নানান ধরনের টেস্ট করছে। ব্রেন স্ক্যান। ইইজি সবকিছু। মাঝেমধ্যে বাবা আবার একটু ভায়োলেন্ট হয়ে যাচ্ছেন। তখন ঘুমের ওষুধ ইঞ্জেক্ট করে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছে। কী হচ্ছে সেটাও বোঝার চেষ্টা করছে। ট্রিটমেন্টটা এক্সপেরিমেন্টাল। এখনও সুস্থ হয়ে ওঠেনি কেউ। একটাই পরিণতি। মৃত্যু।— গলা বুজে এল রাইকারের।

—তোমার মা কেমন আছেন?

—মা ঠিক আছেন। সেটাই আমিও ভাবছিলাম। কোনও ভাইরাস থেকে হলে আমাদের সবারই হতে পারে। কী যে হচ্ছে কে জানে! বয়স হয়েছে। চলে একদিন যেতেই হবে, কিন্তু তা বলে এরকম হঠাৎ করে!—রাইকারের গলা যেন কান্নায় অবরুদ্ধ হয়ে এল। বুঝলাম বেশ ভেঙে পড়েছে। স্বাভাবিক।

খানিকবাদে ভিজিটিং আওয়ারে দেখা করতে গেলাম। উনি আমাদের যেন লক্ষ্যই করলেন না। দেখলাম খাটের উপরে বসে আছেন। চোখ একবার খুলে ফের বন্ধ করে দিলেন। কী সব কথা নিজের মনে বলে যাচ্ছেন। বিড়বিড় করে। মাঝেমধ্যে একটা দুটো কথা জোরে বলে উঠছেন। মনে হল একবার যেন 'হাইল' কথাটা বলে উঠলেন। যেন অন্য কোনও জগতে হারিয়ে গেছেন। স্বপ্নের মধ্যে কথা বলছেন।

খানিকক্ষণ থেকে বেরিয়ে এলাম।

১৫ জুন, রাত দশটা

অনেক রাত হয়ে গেছে। কিন্তু বাইরে এখনও আবছা আলো আছে। কিছুক্ষণ আগেও বিদায়ী সূর্যের সোনালি আলো এসে পড়েছিল পাইন আর বার্চের গাছের মাথায়। এখন ডুবে গেছে, তবু যেন চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়নি।

পাশের প্রান্তরের উপর দিয়ে মেঘের সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসছে ঘন কুয়াশা।

তার মধ্যে দিয়ে মিটমিট করে তাকিয়ে আছে দূর পাহাড়ে ছড়িয়ে থাকা বাড়ির আলো।

হোটেলের বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে লিখছি। যদিও এত সৌন্দর্যের মধ্যে বারবার অন্যমনস্ক হয়ে ওঠা খুব স্বাভাবিক। চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত আজ শ্বেতশুভ্র ফ্রেঞ্চ আল্পস। মেঘের সঙ্গে চাঁদের লুকোচুরি খেলার আলোছায়ায় আল্পস যেন সত্যি রূপকথা হয়ে উঠেছে।

১৭৪১ সালে দুই ইংরেজ পর্যটক প্রথম পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই ছেট গ্রাম আবিষ্কার করেন। তারপরে আস্তে আস্তে স্কি রিসোর্ট হিসেবে এটা গড়ে ওঠে। এখন বিশ্বের সবথেকে জনপ্রিয় স্কি রিসোর্টগুলোর মধ্যে এটা একটা।

আজকের দিনটা বেশ ইভেন্টফুল। সকাল থেকে অনেক ছোটাছুটি চলেছে।

স্যামোনিতে বেশ কিছু মিউজিয়াম আর গ্যালারি ছড়িয়ে আছে।

সকালে একটা ক্রিস্টাল মিউজিয়ামে গিয়েছিলাম। সেখানে নানান ধরনের ক্রিস্টাল রাখা আছে। সব এখানকার পাহাড় থেকে উদ্ধার হয়েছে। এখানে কমলা রঙের এক বিশেষ ধরনের ক্রিস্টাল পাওয়া যায়। তা ছাড়াও আরও নানানরকমের ক্রিস্টাল।

সেখানে খানিকক্ষণ থেকে চলে গেলাম প্যারা গ্লাইডিং করতে। 'এগুই দু মিদি' থেকে। আগেও করেছি কয়েক বার। কিন্তু এখানে আল্পসে করার অনুভূতিই আলাদা। অনেকটা দূরত্ব জুড়ে অনেক উঁচু থেকে প্যারা গ্লাইডিং। যেখান থেকে লাফ দিলাম সেখানে বেশ খানিকটা পথ জুড়ে পায়ের কিছুটা নীচে প্রথমে বরফের সাদা চাদর। তারপরে সেটা পেরিয়ে পাহাড়ের উপর থেকে যখন নীচের উপত্যকা দেখলাম সে এক অন্যরকমের রোমাঞ্চ। জুন। তাই দুপাশের পাহাড়ের ধারের দিকে কিছু জায়গায় বরফ আর নেই।

নীচে দূরে স্যামোনি। উপরে পাহাড়ের উপর থেকে যখন নীচে ঘাসে ঢাকা উপত্যকায় নেমে আসছিলাম, তখন পায়ের নীচে স্যামোনির আশেপাশে সবুজের রাজ্য আর তাকে ঘিরে ফ্রেঞ্চ আল্পসের সেই অনির্বচনীয় উপস্থিতি যেন আরও বেশি করে টের পাচ্ছিলাম।

মাঝেমধ্যে বেশ ঝড়ো হাওয়া দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল পাহাড়ের গায়ে গিয়ে ধাক্কা খাব না তো!

প্রত্যেকটা বাঁক যেন পাহাড়কে অন্য অন্য ভাবে আমার সামনে নিয়ে আসছিল। প্রত্যেকটা দৃশ্যপট যেন আলাদা। প্রায় পয়তাল্লিশ মিনিট বাদে নীচে পাইনে ঘেরা এক খোলা জায়গায় এসে নামলাম।

কিছু দূরে একটা ক্যাফে ছিল। ওখানে গিয়ে কফি খেতে বসেছি, হঠাৎ অন্য টেবিলে বসে থাকা একজনকে খুব চেনা লাগল। গ্যাব্রিয়েল। গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে আমার স্ট্যানফোর্ডে আলাপ হয়েছিল। উঠে গিয়ে কথা বললাম। প্রথমে চিনতে পারল না। সেটা অবশ্য কিছুই অস্বাভাবিক নয়। প্রায় সাত বছর বাদে দেখা। প্রফেসার উইলিয়াম ডেমেন্ট -এর কথা বলতেই ওর সব মনে পড়ে গেল। শুনলাম এখানে এক ঘুমের ক্লিনিক করেছে। বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা করে।

ঘুম, স্বপ্ন এসব নিয়ে রিসার্চ বহু বছর আগেও করত। এখন কী কাজ করছে জিজ্ঞেস করতে ও বলে উঠল মনের গভীরে পুরনো স্মৃতির ভিড়ে হিংসার ছাপ, অতীতের অপরাধের ফিঙ্গার প্রিন্ট থেকে যায়। কোনও অপরাধীতার অপরাধ জ্ঞানত বাধ্য না হলে বলে না। এড়িয়ে যায়। এখনও এজন্য অনেকক্ষেত্রে অপরাধী ধরা পড়ে না। কিন্তু স্বপ্নে সেই ছাপ থেকে যায়।

সেই বিষয়েই আমার রিসার্চ। আমার বিশাল ড্রিম ব্যাংক আছে, যার থেকে আমি বুঝতে পারি যে কেউ কী নিয়ে স্বপ্ন দেখছে। সেটা কীভাবে তার অতীতের সঙ্গে কানেক্টেড। এই পদ্ধতি সাকসেসফুল হলে পুলিশ অপরাধীদের কাছ থেকে অনেক সহজেই অপরাধের স্বীকারোক্তি পেয়ে যাবে। স্বপ্ন এর মধ্যে এমন অনেক কিছু লুকিয়ে থাকে যে তার থেকে আসলে কী হয়েছিল তা উদ্ধার করা এমনিতে শক্ত। কিন্তু আমি সে সাংকেতিক ভাষা বুঝতে পেরেছি। কাজটা অনেক এগিয়ে নিয়ে এসেছি।

—কিন্তু যদি সে না ঘুমোয়?

—সে আর না ঘুমিয়ে ক'দিন থাকবে! একসময় তাকে তো ঘুমোতেই হবে। তখনই না হয় এভাবে অপরাধীকে শনাক্ত করা যাবে। আর যদি কোনও হার্ডকোর ক্রিমিন্যাল থাকে, যে ঠিক করে নিয়েছে যে কোনও ভাবে ঘুমোবে না, তার ক্ষেত্রে তো কাজটা আরও সোজা। পুলিশ অপরাধীদের ঘুমোতে না দিয়ে প্রশ্ন করে করে ঠিক স্বীকারোক্তি আদায় করে নেবে।

—কিন্তু এত জায়গা থাকতে এখানে এলে কেন?

—আমার খুব স্কি করার শখ। স্যামোনির মতো স্কি রিসোর্টে বসে কাজ করার ফান্ডিং যখন পেয়ে গেলাম, তখন আর দ্বিতীয়বার ভাবিনি। তা ছাড়া সারা বিশ্বের লোক এখানে বসেই পেয়ে যাই। এটাও একটা বড় সুবিধে।

—তা কিছু যদি মনে না করো, এখনওকি এটা স্ট্যানফোর্ড-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে করছ! নাকি অন্য কোথাও?

—না, না। 'তেভা' বলে একটা ইজরায়েলের এক ফারমা সংস্থা এ রিসার্চ ফান্ড করছে। তা তুমি কী আগামীকাল আছো? চলে এসো আমার ক্লিনিকে। দেখতে পাবে, কীভাবে আমরা কাজ করি।

—সে তো দারুণ সুযোগ। অবশ্যই যাব।

আরও কিছু কথা বলার পরে আমরা উঠে পড়লাম।

গ্যাব্রিয়েল-এর সঙ্গে গাড়ি ছিল। ও আমাকে হোটেল পৌঁছে দিল। পথে প্রফেসার ডেমেন্টের সম্বন্ধে ও এ ক' বছর কী কী রিসার্চ করেছে, এসব বিষয় নিয়ে গল্প করতে করতে এলাম। শুনলাম এখানে ও মোটে তিনমাস আগে এসেছে।

১৬ জুন, রাত ন'টা

হোটেলের বারান্দায় এসে বসেছি। সামনে আল্পসের দিকে তাকালে যেন আর লিখতেও ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে শুধু বিভোর হয়ে দেখি।

দূরে পাহাড়ের শিরা-উপশিরা বেয়ে যেন চাঁদের আলোর স্রোত বরফের গা বেয়ে নদীর মতো নেমেছে। সে আলো যেন মাঝেমধ্যে ঠিকরে ঠিকরে উঠছে কোনও রাজার বরফের পোশাকে পড়ে। এটুকু না লিখলে এ সন্ধ্যাকে ধরে রাখা যাবে না। তাই লিখলাম। এবারে আসল প্রসঙ্গে আসি।

এখানে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। আজও পাঁচজন মারা গেছে। যারা মারা গেছে তাদের সবার বয়স আশির উপরে। একটা আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। টুরিস্টদের মধ্যেও খানিকটা ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েকদিন আছি বলে বুঝতে পারছি, এখন যেন এখানে একটু কম টুরিস্ট আসছে। অনেকেরই ধারণা এটা নতুন কোনও ভাইরাস যা ব্রেন ফাংশান আস্তে আস্তে থামিয়ে দিচ্ছে। যতক্ষণ এই ভাইরাসের রহস্য সমাধান না হচ্ছে, ভয় আরও বাড়ছে। এমনকী রেস্টুরেন্ট, পাবেও এলাকে দূরত্ব রাখতে শুরু করেছে। কী থেকে কী হয় কে জানে!

আজ সকালে স্কি জোরিং করতে গেলাম। ঘোড়ার সঙ্গে লাগানো দড়ি ধরে বরফের উপর দিয়ে স্কি করা। অনেকবার স্কি করেছি আগে কলোরাডোতে। কিন্তু এরকম করার সুযোগ হয়নি। ঘোড়া চালাচ্ছিলেন এক মহিলা। ঘোড়াটার পায়ে একটা বিশেষ ধরনের জুতো পরানো ছিল, যাতে তা বরফের উপরে স্লিপ না করে। আমার কাজ ছিল দড়ি টেনে ধরে বরফের উপরে স্কি করতে করতে ব্যালান্স রাখা। ঘোড়াটা শুরুতে আস্তেআস্তে যাচ্ছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই যখন চল্লিশ মাইলের থেকেও জোরে ওই বরফ ঢাকা জায়গায় দিয়ে ঘোড়া ছুটতে শুরু করল, তখন বুঝলাম কেন এর আকর্ষণ। বেশ কয়েকবার ছিটকে পড়লাম। তার পরে উঠে আবার করলাম। একটা বেশ উড়ে যাওয়ার মতো অভিজ্ঞতা হয়।

দেড় ঘণ্টা ও বেশ কয়েকবার ছিটকেপড়ার পরে বুঝলাম বিষয়টা কিছুটা আয়ত্তে এসেছে। একই সঙ্গে আমাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার কাজটা ঘোড়া করলেও আমার যে পরিশ্রম কিছু কম হয়নি তা এই ঠান্ডাতে ঘামে ভিজে যাওয়া জামা থেকেই বুঝতে পারছিলাম।

আসলে এরকম নতুন নতুন অভিজ্ঞতা নিয়েই একটা জীবন। তাকে কখনও থামতে দেওয়া উচিত নয়।

ফিরে এসে একটার সময় গ্যাব্রিয়েলের ক্লিনিকে গেলাম। বেশ আধুনিক ব্যবস্থা। যেখান থেকেই ফান্ড পেয়ে থাকুক না কেন তারা বেশ ভালোই খরচ করছে। শহরের বাইরের দিকে যেখানে স্থানীয় লোকেদের বসবাস, সেখানেই এই ক্লিনিক। রিসেপশনে এক কমবয়সি মহিলা ছিলেন, তাকে আমার পরিচয় দিয়ে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। দেখলাম এক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা দম্পতি বসে আছেন।

আধঘণ্টা বাদে গ্যাব্রিয়েল বেরিয়ে এল আমার সঙ্গে দেখা করতে। দেখলাম একই সঙ্গে ওই বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে ভিতরে ডেকে নিল। শুনলাম ওদের উপরে আজ পরীক্ষা হবে।

আমাকে দেখে বলে উঠল—ভালো সময়ে এসেছ। এদের উপরে পরীক্ষা করতে এখনও প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে এদের ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত।

—কিন্তু এরা কী স্বেচ্ছায় আসছেন?

—হ্যাঁ। মানে কী বলতে চাইছ?

—না, আমি বলতে চাইছি তুমি যে অপরাধী মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য এদের নিয়ে আসছ, এদের স্বপ্ন থেকে এদের অতীতের কোনও অপরাধের ফুটপ্রিন্ট আছে বোঝার চেষ্টা করছ, তা এঁরা জানেন? সেক্ষেত্রে তো কেউ আসতে চাইবে না।

গ্যাব্রিয়েল আমার দিকে একবার তীক্ষ্নভাবে তাকিয়ে বলে উঠল— চলো, আমার চেম্বারে যাই। তারপরে তোমাকে ঘুরিয়ে দেখাব। ওখানে নিরিবিলিতে কথা বলা যাবে।

খানিকবাদে ওর চেম্বারে এলাম। তিন দিকে কাচে ঘেরা। আমার হাতে একটা অরেঞ্জ জুসের ক্যান ধরিয়ে আর নিজে একটা ডায়েট কোক নিয়ে বলে উঠল— না, এখানে কাউকে সেটা বলা হয় না। বুঝতেই পারছ সেটা জানলে কেউই আসবে না। তবে আমার উদ্দেশ্য শুধু এই টেকনিক বা এই অনুসন্ধান পদ্ধতিকে পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে আরও উন্নত করা। ইতিমধ্যেই বড় সাকসেস এসেছে। মনে হয় ঠিক দিকেই এগোচ্ছি।

—তার মানে এদের মধ্যে তুমি অতীতে করা কোনও অপরাধ খুঁজে পেয়েছ?

—হ্যাঁ, পেয়েছি। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই পেয়েছি। সে বিচারের ভার অবশ্য আমার নেই। আমি কাউকে সেটা জানাবও না।

—কী ধরনের অপরাধ পেয়েছ?

—না, সেটাই তো বললাম, বলতে পারব না। সেটা আমার আগ্রহের বিষয়ও নয়। আমার আগ্রহ শুধু এটা জানা যে এই পদ্ধতিতে কোনও খামতি আছে কিনা।

—কিন্তু কী ভাবে?

—দেখো সেটা আমার পেটেন্টেড প্রসেস। তবে তুমি তো এ ব্যাপারে কিছুটা জানো। আমার পেশেন্ট যখন ঘুমোয়, বিশেষ করে র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট-এর সময় আমার কাজ হল এদের সঙ্গে যোগাযোগ করা। এরা তখন ঘুমিয়ে থাকলেও অনেকটা সচেতনতা থাকে। এদের প্রশ্ন করে করে এমন কিছু জায়গায় নিয়ে আসা হয় যেখানে এরা অতীতে কোনো অপরাধ করেছে। ঠিক সেই সময়ে আমি আরও প্রশ্ন করে করে আসল সত্যটা বার করার চেষ্টা করি।

—কিন্তু ঘুমের মধ্যে এদের সঙ্গে যোগাযোগ বা ইন্টারাক্ট করো কীভাবে?

—সেটাই তো আমার আবিষ্কার। সে বিষয়ে ডিটেলে কিছু বলতে পারব না। তবে ধরে নাও আমি সেটা পারি। সবথেকে শক্ত কাজ হল মনের গভীর থেকে ওই অপরাধ-এর সন্ধান পাওয়া। সেটা পাওয়ার জন্যে আমাকে আমার ড্রিমব্যাঙ্কেরও সাহায্য নিতে হয়। অন্য অপরাধীরা যারা এরকম কাজ করেছে,তাদের স্বপ্ন কীরকম হয় সেটা জানা আছে। তার সঙ্গে কোনও মিল পাওয়া গেলে বাকিটা বার করা খুব শক্ত হয় না। আমার কাছে স্বপ্নের সেই সাংকেতিক ভাষা, প্রশ্ন ও উত্তর থেকে পুরো ব্যাপারটা বার করার পদ্ধতি জানা আছে। সেটাই আসল। এটুকু বলতে পারি যা আমি আবিষ্কার করেছি তা আগামী দিনে অপরাধ বিজ্ঞানের সবকিছু পালটে দিতে পারে। কোনও অপরাধী কখনোই নিজের অপরাধ নিজের মুখে সহজে স্বীকার করে না। এজন্য অনেকে প্রমাণের অভাবে শাস্তি পায় না। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনও পালানোর উপায় নেই। তার অবচেতন মন, স্মৃতি থেকে অপরাধ খুঁজে নিয়ে তার অপরাধ প্রমাণ করছি। এমনকী তা কোর্টেও প্রমাণ করা যাবে।

ফের আমার শুরুর প্রশ্নটাই আবার করে উঠলাম। সেটা গ্যাব্রিয়েল পাশ কাটিয়ে চলে গিয়েছিল। —কিন্তু এরা এখানে আসে কেন? ওদের এতে কী আগ্রহ?

—এখানে একজন অত্যন্ত বিখ্যাত লোকাল ডাক্তার আছেন। নাম ডেভিড। এখানকার প্রায় সবাই ওঁর বহুদিনের পেশেন্ট। এখানকার সবাই ওঁকে খুব বিশ্বাস করেন। উনি বলায় ওরা এখানে আসে। বুঝতেই পারছ বয়স হলে কিছু না কিছু মানসিক সমস্যা থাকে। অনেকেরই ঘুমের সমস্যা থাকে। ঘুম আসে না ইত্যাদি। কেউ বা খুব একাকীত্বে ভোগে। উনি ওদের বলেন যে এই ট্রিটমেন্ট ওদের সাহায্য করবে। সত্যি তাই। করেও। সেটা আমি ওঁকেও বুঝিয়েছি।

আমিও এদের ঘুম—স্বপ্নের নেচার দেখে ঘুম আরও ভালো কীভাবে হয়, কী কী করতে হবে সে ব্যাপারে খুব স্পেসিফিক কিছু জানাই। বুঝতেই পারছ লোকটার স্বপ্ন-অতীত আমার কাছে একটা খোলা খাতার মতো। তাই কী দেখেছি না বলে কী করা উচিত সেটা বলা সম্ভব। কিছু কিছু স্মৃতি মধুরও হয়, তাই না! সে সব কথা যখন বলি, তখন এদের ভালো লাগে। তা ছাড়া আমার এই ফেসিলিটিতে স্পা ট্রিটমেন্ট, স্টিম, সনা— সব রোগীদের জন্য ফ্রি। তাই এরা এই সময়টা ভালো উপভোগও করে। তা যাই হোক, আমার অন্য পরীক্ষার কথাটা সামনে আনি না।

একটু থেমে মুচকি হেসে ফের বলে উঠল— আমি জানি তুমি বলবে না। তুমি নিজেও জানো বিজ্ঞানে অগ্রগতি করতে গেলে কীরকম পরীক্ষানিরীক্ষার প্রয়োজন হয়।

আরও কিছু কথা বলার পরে গ্যাব্রিয়েল আমাকে পুরো ক্লিনিকটা ঘুরে দেখাল। খুব আধুনিক নানান যন্ত্রপাতি। যেসব রুমে রোগী অর্থাৎ টেস্ট সাবজেক্টকে ঘুমন্ত অবস্থায় এসব পরীক্ষানিরীক্ষা করা হয়, সেটা দেখাল। অজস্র যন্ত্র। কোনওটাতে 'পজিট্রন এমিসন টোমোগ্রাফি' বা পেট স্ক্যানের মাধ্যমে ব্রেন অ্যাক্টিভিটি দেখা হয়, কোনওটাতে ইলেক্ট্রো-এন-সেফ্যালোগ্রাফি-র মাধ্যমে ব্রেনের মধ্যে ইলেকট্রিকাল অ্যাক্টিভিটি দেখা হয়। এরকম নানান যন্ত্র। মনে হয় যেন কোনও অত্যাধুনিক ল্যাবের মধ্যে ঢুকে গেছি।

আড়াই ঘণ্টার মতো ছিলাম ওখানে।

বেরিয়ে এসে কিছু প্রশ্ন মাথায় ঘুরছিল। কারা গ্যাব্রিয়েল-এর রিসার্চে এত খরচ করছে? গ্যাব্রিয়েল-এর রিসার্চ কী শুধুই অপরাধীর মনস্তত্ত্ব নিয়ে নাকি এর আড়ালে অন্য কিছু আছে?

আমি গ্যাব্রিয়েলের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্বন্ধে তেমন কিছু জানি না। একটু জানলে ভালো হত।

কে জানতে পারে? স্ট্যানফোরর্ডে ওর সমসাময়িক কয়েকজনকে চিনি। তারা কিছু বলতে পারবে ওর ব্যাপারে!

কেন জানি না মনে হচ্ছিল এখানকার এই মহামারীর সঙ্গে গ্যাব্রিয়েল-এর কোথায় যেন যোগাযোগ আছে। কয়েকটা জিনিস জানা দরকার।

১। যারা মারা গেছে তারা গ্যাব্রিয়েল-এর ক্লিনিক এ সাম্প্রতিককালে এসেছিল কিনা। কিন্তু সেটা জানতে হলে আমাকে ওই ক্লিনিকের রেজিস্টার চেক করতে হবে। সেটা পুলিশের সাহায্য ছাড়া হবে না।

২। তাদের সবাই কী মারা গেছে? সেক্ষেত্রে সেটা তো খুব সহজেই লোকে রিলেট করতে পারত। হয়ত সে রকম নয়।

৩। এটা কী গ্যাব্রিয়েল-এর ট্রিটমেন্টের সাইড এফেক্ট নাকি ইচ্ছাকৃত? সেক্ষেত্রে ও কেন করছে? ওর মতো একজন বিজ্ঞানী এতজনকে কেন অহেতুক মারবে? জানার জন্য গ্যাব্রিয়েল ও এখানকার লোকেদের মধ্যে যারা মারা গেছে তাদের সম্বন্ধে জানা দরকার।

ক্লিনিকের পরে লাইব্রেরিতে গেলাম। তখন অবশ্য চারটে।

স্যামোনির মধ্যে ১৬ টা ছোট ছোট গ্রাম পড়ে। তার মধ্যে 'এল প্রাজ'— এ আর 'এলজ মুলসে' -তে বয়স্কদের মধ্যে এই অসুস্থতার লক্ষণ বেশি দেখা যাচ্ছে। বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে যেটা খুঁজছিলাম, সেটা পেয়ে গেলাম। এই দুটো জায়গাতেই জনপদ গড়ে উঠেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। একটা বড় অংশ এসেছিল বার্লিন থেকে। এই অংশে সেই জন্য জার্মান প্রভাব এখনও বেশি। এরা যারা এসেছিল তারা প্রত্যেকে বেশ অর্থবান। সেজন্য তারা আসার পরেই এখানকার লোকাল ইকোনমি আরও চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। পাঁচটায় লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে যায়।

একটা ধারণা মনের মধ্যে বাসা বাঁধছে। কিন্তু সেটা এখানে বসে আমার পক্ষে একা শলভ করা সম্ভব নয়।

এখন সারা গায়ে ব্যথা। বুঝতে পারছি স্কি জোরিং-এ এই বরফের উপরে বারবার আছাড় খাওয়ার ব্যথা বেশ কয়েকদিন থাকবে। আজ এখানেই ডায়েরি লেখা শেষ করে কিছু প্যারাসিটামল খেয়ে নিই। তা না হলে কাল আর বেরোতে পারব না।

১৭ জুন, রাত ন'টা

আজ সকাল থেকে এত কিছু ঘটে গেল যে এখনই লিখে রাখি।

সকালে ভাবছিলাম পুলিশের কাছে যাব। একবার গিয়েওছিলাম। কমলা রঙের একটা ছোট দোতলা বিল্ডিং। ঠিক পুলিশ স্টেশন বলে মনে হয় না। কিন্তু ঢোকার আগে একটু দ্বিধায় পড়ে গেলাম। ভাবলাম কীভাবে বলব! এখনও হাতে তেমন কোনও প্রমাণ নেই। যদি বলি এসব মৃত্যুর সঙ্গে গ্যাব্রিয়েল-এর যোগাযোগ থাকতে পারে, তার জন্য গ্যাব্রিয়েল-এর উপরে লক্ষ রাখা দরকার, ওরা কী আমার কথা বিশ্বাস করবে! এখনও অবধি তেমন কোনও প্রমাণ পাইনি যার জন্য গ্যাব্রিয়েলকে কোনওরকম ভাবে সন্দেহ করা যায়। একই সঙ্গে আমিও চাই না গ্যাব্রিয়েল অহেতুক কোনও অসুবিধের মধ্যে পড়ুক।

তাছাড়া কাজ চালানোর মতো যেটুকু ফ্রেঞ্চ জানি, তাতে এদের এসব জটিলতা বোঝানো বেশ শক্ত কাজ। কী বুঝতে কী বুঝবে কে জানে! শেষে আমার ঘুমের কোনও সমস্যা আছে, এরকম কিছু না ভাবে!

হয়তো আমারই ভুল। এই অসুখের সঙ্গে হয়তো গ্যাব্রিয়েল-এর স্বপ্নের রিসার্চের কোনও সম্পর্ক নেই। এটা হয়তো সম্পূর্ণ অন্য কিছুর জন্য হচ্ছে।

যাই হোক শেষে পুলিশ স্টেশনে ঢুকলাম না। আরভে নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। পাহাড়ি নদী। বেশ স্রোত আছে এ সময়। দু-ধার দিয়ে নানান রঙের টিউলিপ, ম্যাগনোলিয়া, ক্রোকাস, সূর্যমুখী ও গাঁদা ফুল ফুটে আছে। মনে হচ্ছে যেন এক ফুলের বাগানের মধ্যে দিয়ে আরভে নদী তার পথ খুঁজে নিয়ে দূরে বরফে ঢাকা আল্পসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

আজ মাথার উপরে ঝলমলে নীল আকাশ। নানান শেপের সাদা মেঘ ভাসছে।

একটা ছোট দোকান থেকে সেদিনকার খবরের কাগজ কিনে খবরে চোখ বোলাচ্ছিলাম।

বড় করে ওই অসুখের খবর হেডলাইনে। ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্টও এই বিষয়ে গভীর দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছেন। একটা মেডিকেল টিম ইতিমধ্যে এখানে চলে এসেছে। গতকাল আরও সাত জন মারা গেছে এখানে।

আমি গতকাল অনেক রাতে ফিলিপ-এর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। ফিলিপ স্ট্যানফোর্ডে বেশ কয়েক বছর গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে রিসার্চ করেছে। ওকে বন্ধু হিসেবে ভালো করে চেনে। ফিলিপ এখন ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকে। তাই ওর তখন বিকেল। ওর কাছ থেকে যা খবর পেয়েছি,তাতে গ্যাব্রিয়েল সম্বন্ধে তাতে সন্দেহ আরও বেড়েছে।

গ্যাব্রিয়েল এমনিতে খুব শান্ত, চুপচাপ থাকত। কারও সঙ্গে মিশত না। গোড়া ইহুদি। খাওয়ার সময় মাথায় 'কিপাহ' পরত। রোজ চারবার করে নাকি প্রার্থনা করত। নিয়মমতো ইহুদিদের পবিত্রতম দিন 'ইওম কিপ্পুর'-এ সিনাগগে সারাদিন প্রার্থনায় কাটাতো। ওর পরিবারের সম্বন্ধে ফিলিপ তেমন কিছু জানে না। তবে অনেক ইহুদিদের মতোই গ্যাব্রিয়েল নাৎসি জার্মানদের পছন্দ করত না।

ওদের পরিবার অর্থাৎ ওর বাবা খুব কম বয়সে আমেরিকাতে এসেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই। গ্যাব্রিয়েল আমেরিকায় বড় হয়েছে। কিন্তু ওর ধর্ম, পরিচয় কখনও হারায়নি। সেটা আঁকড়ে থেকেছে।

একটা কথা মাথায় ঘুরছে। এরকম কী হতে পারে যে স্যামোনিতে যারা এসেছিল জার্মানি থেকে দ্বিতীয় যুদ্ধে পরে, তাদের মধ্যে একদল নাৎসি ছিল। তারা এখানে পালিয়ে এসেছিল যুদ্ধের অপরাধের শাস্তির থেকে রেহাই পেতে। সেখানে তাদের মধ্যে কিছু নাৎসি থেকে থাকতেই পারে।

গতকাল এখানকার লাইব্রেরিতে এমন কিছু তথ্য পেয়েছি, যাতে সেটা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্তত সেরকম একটা পরিবারের সন্ধান পেয়েছি।

হিটলারের ইনার সারকেলের অর্থাৎ খুব কাছের লোক ছিলেন হারমান গোরিং। গোরিং 'গেস্টাপো' বা সিক্রেট পুলিশ তৈরি করেছিলেন। ইনটারনাল অ্যাফেয়ার্স-এর মন্ত্রী ছিলেন। গোরিং যুদ্ধ শেষের পরে সায়ানাইড খেয়ে সুইসাইড করে। তার মেয়ে এখানে চলে এসেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে। তার কথা লাইব্রেরির বইতে দেখেছি। নিশ্চয়ই এরকম আরও বেশ কিছু নাৎসি এসেছিল।

আমি জানি এরকম অনেক নাৎসি হান্টার এখনও আছে যাদের অনেকক্ষেত্রে ইজরায়েলি সরকার ফান্ড করে। টাকা দেয়। তাদের কাজ নাৎসিদের খুঁজে বার করা, যারা সেই সময় ইহুদিদের উপর অত্যাচার করেছিল। অনেক এস এস গার্ড যারা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ইহুদিদের উপরে অকথ্য অত্যাচার করেছিল, তারা এখনও তাদের পরিচয় গোপন করে বিভিন্ন দেশে লুকিয়ে আছে। কোনওরকম শাস্তি পায়নি। সে কারণেই কী গ্যাব্রিয়েল এখানে এসেছে! বদলা নিতে? ও টার্গেট করছে তাদের, যারা একসময় নাৎসি ছিল। কিন্তু এত নামকরা এক বিজ্ঞানী এত বছর বাদে কী এসব মনে রাখবে! নাকি এসবই আমার কল্পনা।

এসব ভাবছি। ঠিক এর মধ্যে 'অনিলিখা' ডাক শুনে চমকে উঠলাম।

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি পাশের বেঞ্চে কখন জানি ডেভিড এসে বসেছেন। ডেভিড মানে যার সঙ্গে গতকাল লাইব্রেরীতে দেখা হয়েছিল।

আমি একটু অবাক হলাম। কারণ কাল আমার নাম ওঁকে শুধু সহজ করে অনি বলেছিলাম আমার পুরো নামটা বলা শক্ত হতে পারে ভেবে। উনি কী করে পুরো নামটা জানলেন?

উনি হেসে বলে উঠলেন—হোয়াট অ্যা সারপ্রাইজ। দ্য ফেমাস লেডি ইস হিয়ার, ইন দিস লিটল হ্যাঁমলেট।

পরিষ্কার ইংরাজিতে তারপরে উনি যা বললেন—তা হল আমাকে দেখেই তার চেনা চেনা লেগেছিল। তার পরে লাইব্রেরীর ভিজিটার রেজিস্ট্রেশনে আমার পুরো নাম খুঁজে পান। ইন্টারনেট সার্চ করে আমার অজস্র রিসার্চপেপার-এর উল্লেখ, আমার কীর্তিকলাপ সম্বন্ধে অনেক ডিটেলস পেয়েছেন, যার কিছু অবশ্য উনি আগেই জানতেন।

হেসে ফের বলে উঠলেন—খুব বাজে সময় এখানে বেড়াতে এসেছো। এখন কী হচ্ছে এখানে তাই ভাবছ তো? হঠাৎ করে এতজন অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মারা যাচ্ছে। এই কাগজে এবিষয়ে আমার একটা লেখা আছে। পড়ে দেখো।

বলে আমার হাতে ধরা কাগজের নীচের দিকে একটা প্রতিবেদনের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।

—এটা পড়েছো? ওখানে আমার বক্তব্য তুলে ধরেছে। অবশ্যই সেটা একটা অন্যতম সম্ভাবনা। নাও হতে পারে। এখানে একটা মেডিকেল টিম এসেছে, তারা সেই সম্ভাবনাটা খতিয়ে দেখছে।

আমি অবাক দৃষ্টিতে ওই আর্টিকেল-এ দ্রুত চোখ বুলিয়ে বলে উঠলাম— আপনিই ডক্টর ডেভিড কোহেন? গতকাল যখন দেখা হয়েছিল তখন আপনার পরিচয় জানতাম না। আপনিও তো কম বিখ্যাত নন। আপনার মতো একজন বিখ্যাত নিউরোলজিস্ট এখানে আছেন জানতাম না। এখন বুঝতে পারছি আপনার কথাই গতকাল গ্যাব্রিয়েল বলেছিল।

—গ্যাব্রিয়েলকে তুমি চেনো! কী বলেছিল?

কীভাবে গ্যাব্রিয়েলকে আগে থেকে চিনি, সেটা বলে জানালাম যে গ্যাব্রিয়েল বলেছিল যে ডেভিডের সাহায্য ছাড়া ওর ক্লিনিকে ও রোগী পেত না।

উনি হেসে বলে উঠলেন—এ আর কিছুই নয়। গ্যাব্রিয়েল তো এখানে নতুন এসেছে। আমার সঙ্গে এসে ও তাই যোগাযোগ করেছিল। আমার নিজের ওর কাছ থেকে ওই চিকিৎসা পদ্ধতি শুনে ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং লাগে। এবারে রোগীদের আমি না রেকমেন্ড না করলে কে আর এরকম এক্সপেরিমেন্টাল ট্রিটমেন্ট-এ নিজে থেকে আগ্রহী হবে।

এদের অনেকের নানান ধরনের বয়সজনিত মানসিক অসুস্থতা থাকে। কারও ঘুম আসে না তো কেউ ডিমেন্সিয়াতে ভোগে। ওর এই রোগীর ঘুম ও স্বপ্ন বিশ্লেষণ করে তাদের চিকিৎসা বা ঘুম বাড়ানোর উপায় বাতলে দেওয়া আমার বেশ ভালো লেগেছিল। যারা গিয়েছে তাদের বেশ কয়েকজন ওর সম্বন্ধে বেশ ভালো ফিডব্যাক দিয়েছে। তাই রেকমেন্ড করি। তা ও কী করে এসব করে সেটা ভালো বুঝি না অবশ্য।

তার মানে বুঝলাম, ডেভিডকে পুরোটা বলেনি গ্যাব্রিয়েল। আসলে যে ও এর মাধ্যমে তাদের পুরনো অপরাধ খুঁজে বার করার চেষ্টা করে, সেটা সম্পূর্ণ গোপন করে গেছে।

আমি এবার কাগজের প্রতিবেদনটার ব্যাপারে এলাম। বেশ ইন্টারেস্টিং। আমি বলে উঠলাম—আপনি যেটা লিখেছেন সেটা তো রীতিমতো চাঞ্চল্যকর ব্যাপার। এখানেই যে এরকম এত বড় মাইক্রোবায়োলজি রিসার্চ সেন্টার তা জানতাম না।

উনি সায় দিলেন। বলে উঠলেন—হ্যাঁ, সেটা অনেকেই জানে না। খুব বড়।

কী লেখা ছিল সেটা একটু সহজ করে এখানে লিখে রাখি। গ্রিসের সমুদ্রের নীচের সীবেড থেকে একটা ব্যাকটিরিয়াল ইকোসিস্টেম উদ্ধার করা হয়েছে। এটা মাটির লেভেল থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার গভীরে। তাই আগে এরকম জায়গায় ড্রিল করা অসম্ভব ছিল। দু-মাস আগে একটা টিম সমুদ্রের তলার এই লেয়ার থেকে কিছু ব্যাকটিরিয়া নিয়ে আসে। তারা পরীক্ষা করে দেখে যে এসব ব্যাকটিরিয়া প্রায় ১০১ মিলিয়ন বছর ধরে বেঁচে বয়েছে। এটা একটা মিরাকেল। এই এতটা দীর্ঘ সময় তারা সী বেডে সুপ্ত অবস্থায় ছিল। ক্রেটেসিয়াস টাইমের এসব ব্যাকটিরিয়ায় মধ্যে চার-চারটে প্রজাতি পাওয়া গেছে, যারা এখন বিশ্বে আর কোথাও নেই।

এধরনের প্রজাতির ব্যাকটিরিয়া বাকি পৃথিবী থেকে বহুকাল আগে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এদের নিয়ে এখন এখানে রিসার্চ হচ্ছে। ডক্টর ডেভিড এর ধারণা যে সমুদ্রের তলা থেকে পাওয়া ওই মাইক্রোব কোনও না কোনওভাবে মাইক্রোবায়োলজি রিসার্চ সেন্টার থেকে লিক করে এখানে বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। সে বিষয়ে ইমিডিয়েটলি খতিয়ে দেখা দরকার। সেটা নিয়েই এই লেখা।

আমি ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম—কিন্তু ব্যাকটিরিয়া কি এরকম ঘটনার পিছনে দায়ী থাকতে পারে?

উনি বলে উঠলেন— কেন নয়! অটিজম, সেটাও তো হয় পাকস্থলীতে এক বিশেষ ধরনের ব্যাকটিরিয়া না থাকার জন্য হয়। সেজন্য আমেরিকাতে এত বেশি অটিজম হয়, আর ভারতে কম হয়। এরকম আরও অনেক উদাহরণ দিতে পারি যেখানে কোনও ব্যাকটিরিয়া থাকা বা না থাকার জন্য ব্রেন ফাংশান প্রভাবিত হয়েছে। হয়তো এই ব্যাকটিরিয়া বয়স্কদের জন্য বেশি ডেঞ্জারাস। কোনও ভাবে তাদের ব্রেনকে প্রভাবিত করছে। দেখা যাক বিশেষজ্ঞরা এসে কী বলেন! আসলে বুঝতেই পারছ এখানে আমরা চার চারটে প্রজাতির ব্যাকটিরিয়ার কথা বলছি যারা সারা বিশ্ব থেকে ১০১ মিলিয়ন বছর আগে বিলুপ্ত। অথচ এখন তারা এই—এই শহরের ল্যাবে আছে। সেজন্য কোনওভাবে সেখান থেকে সংক্রমণ হওয়াটা খুব লাইকলি।

বললাম না কিছু। অসম্ভব নয়, বিশেষ করে এটা শুধু সমাপতন নাও হতে পারে। এখানেই যখন এ বিষয়ে রিসার্চ শুরু হয়েছে। এখানকার ল্যাবেই যখন একমাত্র আছে সে ব্যাকটিরিয়া!

আরও কিছু কথার পরে ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম— আচ্ছা, আপনাকে একটা সম্পূর্ণ অন্য বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। আপনার কী মনে হয় এখানে যারা থাকে, তাদের মধ্যে কিছু নাৎসি আছে!

—হতে পারে, সেটা অসম্ভব নয়। তবে সে তো ইউরোপের অনেক শহরেই থাকতে পারে লুকিয়ে। আমি এখানে আছি সত্তর বছর ধরে। সেরকম কেউ আছে বলে মনে হয় না। থাকলেও সব মারা গেছে। এতদিন কী আর কেউ বেঁচে থাকবে? কবেকার কথা। তাছাড়া আমরা তো ওদের দুষ্কর্মের কথা ভুলেই গেছি প্রায়। কিন্তু হঠাৎ করে এ প্রশ্ন?

—না, এরকম তো হতে পারে যে তারাই মারা যাচ্ছে। কেউ তাদের মারার চেষ্টা করছে।

—এত বছর বাদে হঠাৎ করে কেন করবে? তাদের মারার ইচ্ছে থাকলে তো আগেই মারা যেত। না না, এটা নেহাতই ওয়াইল্ড গেস। কষ্টকল্পনা।

—হয়তো যে বা যারা মারছে, তারা আগে এদের উপস্থিতি জানত না। এখনই জানতে পেরেছে।

উনি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপরে বলে উঠলেন— হ্যাঁ, তা হতেই পারে। যাদের সে সময়ের কথা মনে আছে, তাদের ওদের প্রতি তীব্র ঘৃণা থাকাটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু হঠাৎ নাৎসিদের কথা মনে এল কেন?

—আসলে লাইব্রেরির একটা বইতে দেখেছিলাম যে বেশ কিছু জার্মান এসেছিল এখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে।

—সে আসতেই পারে। তার মানে তারা যে নাৎসি ছিল, তা নয়। তা ছাড়া কোনওরকম অপরাধ করে থাকলে তারা কী আর এত দিন এখানে নিশ্চিন্তে থাকতে পারত? আমি সেরকম কিছু শুনিনি কখনও।

আরও খানিকক্ষণ কথা হল। এখানে কী কী অবশ্যই ঘুরে দেখা উচিত, সেসব ব্যাপারে কিছু খবর পেলাম।

খানিক বাদে আমি উঠে পড়লাম। কিছু কাজ করতে হবে। এখানে যারা মারা গেছেন, তাদের পরিবারের সঙ্গে যদি কথা বলা যায়। বেশিরভাগই কাছাকাছি থাকেন।

১৮ জুন, রাত ন'টা

আমার ধারণা যে খুব ভুল নয়, ঠিক দিকেই যে এগোচ্ছি, তার প্রমাণ পেলাম।

তবে এখানে আমার পক্ষে একা কিছু করা সম্ভব নয়।

প্রথমেই রাইকারের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। ওর বাবা এখনও খুব অসুস্থ। চিকিৎসায় কিছুই উন্নতি হয়নি। মৃত্যু শয্যায়। যেকোনও সময় খারাপ খবর আসতে পারে। মন তাই খুব খারাপ। বাধ্য হয়েই জিজ্ঞাসা করতে হল গ্যাব্রিয়েলের ক্লিনিকের ব্যাপারে। ওর সঙ্গে কথা বলে জানলাম যে কিছুদিন আগে গ্যাব্রিয়েলের ক্লিনিকে ওর বাবা ও মা দুজনেই গিয়েছিল।

আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পরে খানিকটা অবাক হয়েই বলে উঠল—কিন্তু হঠাৎ করে এ প্রশ্ন? তার সঙ্গে অসুস্থতার কী কিছু সম্পর্ক আছে?

ওকে বললাম যে নারকোলেপ্সী বলে একরকম ব্রেন ডিসঅর্ডার আছে যেখানে ঘুম আর জেগে থাকা মিলেমিশে যায়। এর জন্য সেই রোগীর মনে একধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।

যদি কোনও ভাবে ব্রেনকে এমনভাবে প্রভাবিত করা যায় যাতে কেউ ঘুমের র‌্যাপিড অ্যাই মুভমেন্টের অবস্থা থেকে বেরোতে না পারে, তাহলে সে তার স্বপ্নের মধ্যেই হারিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে আমার সেরকম কিছু হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ হচ্ছে। তবে তার জন্য অন্য যারা অসুস্থ হয়েছে, তাদের সবার কথা জানতে হবে।

ও শুনে বেশ কিছু প্রশ্ন করে উঠল। এক এক করে সে সব প্রশ্নের উত্তর দিলাম। শুনতে শুনতে ও খুব উত্তেজিত হয়ে উঠল। পারলে তখনই গিয়ে গ্যাব্রিয়েলের বাড়ি গিয়ে হামলা করে। আমি ওকে নিরস্ত করে বললাম যে এটা শুধু একটা ধারণা। ভুল হতে পারে।

এটা সম্পূর্ণ গোপনীয় রাখতে হবে। অন্য যারা মারা গেছে তাদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের সবার আগে যোগাযোগ করতে হবে। জানতে হবে তারাও গ্যাব্রিয়েল-এর ক্লিনিকে যাওয়ার পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়েছে কিনা।

ও সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজনকে ফোন করল। যারা মারা গেছে তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ও চিনত। তারা ওর গ্রামেই থাকত। তাদের আত্মীয়দের ফোন নাম্বার পেতে বিশেষ সময় লাগল না।

এক ঘণ্টার মধ্যেই আমি আর রাইকার মিলে এরকম দুজন মৃত ব্যক্তির আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলাম। অনুমান ঠিক। তারাও গ্যাব্রিয়েলের ক্লিনিকে গিয়েছিল। তবে বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে। আবার এমন কয়েকজনের খবরও পেলাম যারা গ্যাব্রিয়েল এর ক্লিনিকে গেছে, কিন্তু কিছু হয়নি। সেটার জন্য এটা কখনও বলা যায় না যে গ্যাব্রিয়েল এর রিসার্চ-এর পিছনে আছে। বিশেষ করে যখন তাদের ক্লিনিকে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু হয়নি। তাছাড়া পছন্দ না করা এক জিনিস, আর হত্যা করা আরেক জিনিস।

রাইকার-এর পরিবারের নাৎসি যোগাযোগের ব্যাপারে আর জিজ্ঞাসা করলাম না। খুব সেন্সিটিভ ব্যাপার। তাছাড়া কেউ স্বীকার করবে না।

এসব করতে করতে হোটেল ফিরলাম রাত সাড়ে আটটায়। আজ আর রাতে খাওয়ার ইচ্ছে নেই। তাই ডায়েরি নিয়ে লিখতে বসে গিয়েছিলাম। আপাতত আমার ফেরা পিছোতে হবে। সেটা সহজ হবে না যদিও, বেশ কিছু কাজ ছিল। কিন্তু এটার সমাধান না করে ফেরা সম্ভব নয়।

২১ জুন, রাত এগারোটা

খানিক আগেই বাইরের নৈঃশব্দ্যতাকে থমকে দিয়ে গির্জার ঘড়ি এগারোবার বেজেছে।

আমিও ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও প্রায় জোর করেই ডায়েরি নিয়ে বসেছি।

এ তিনদিনের মধ্যে অনেক কিছু ঘটে গেল। এজন্য গত দুদিন আর ডায়েরি লেখারও সময় হয়নি। প্ল্যান মতো ঘুরতে যেতেও পারিনি।

আজ গ্যাব্রিয়েলকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে। আমার কথামতো ওরা গত কয়েকদিন ধরে গ্যাব্রিয়েলের উপরে নজর রেখেছিল। ওকে বুঝতে দেয়নি। আমাকে ওরা শুধু মাঝেমধ্যে কিছু কিছু খবর দিচ্ছিল। আমিও ওদের কিছু বিষয়ে গাইড করছিলাম, কী করতে হবে সে ব্যাপারে পরামর্শ দিচ্ছিলাম।

আমার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখেছিলেন এ বিষয়ে তদন্তের দায়িত্বে থাকা ফ্রেঞ্চ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল অলিভিয়ে ব্লাঁশে। উনি আমার নাম শুনেছিলেন আগেই। সরাসরি এই তদন্তে যুক্ত ছিলেন বলেই এত তাড়াতাড়ি সবকিছু হল।

আমি ওদের বলেছিলাম গ্যাব্রিয়েলের ক্লিনিকে কারা কারা এসেছে গত তিন মাসে এসেছে, সে সব তথ্য বার করতে। তারা এখন সবাই কেমন আছে সেটা জানতে।

দেখা গেল যারা ক্লিনিকে এসেছে, তাদের মধ্যে সামান্য কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কিন্তু বেশিরভাগের উপরে সেরকম কোনও প্রভাব পড়েনি। কিন্তু অন্যদিক দিয়ে দেখতে গেলে, যারাই মারা গেছে বা গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে, তাদের সবাই কোনও না কোনও দিন গ্যাব্রিয়েলের ওই ক্লিনিকে ওর এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল। এর থেকে বোঝা যায় যে গ্যাব্রিয়েলের ওই ক্লিনিকের সঙ্গে এই অসুস্থতার নিশ্চয়ই কোনও সম্পর্ক আছে।

কিন্তু দুটো প্রশ্ন আছে। প্রথম প্রশ্ন সবার হয়নি কেন? কারও কারও শুধু হয়েছে। যদি গ্যাব্রিয়েল কিছু ওষুধ দিয়ে যাবে, তাহলে সবারই হওয়ার কথা ছিল। নাকি এটা সবার হয় না।

দ্বিতীয় আরেকটা প্রশ্ন আছে।

এই মৃত্যুটা ক্লিনিক থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে হয়নি। কারও ক্ষেত্রে হয়েছে দশ দিন বাদে, কারও ক্ষেত্রে প্রায় এক মাস বাদে। মাঝে কোনওরকম অসুস্থতা বা সিম্পটমও দেখা যায়নি। তারপরে রাতারাতি অসুস্থতা ও দু-এক দিনের মধ্যে মৃত্যু। সেজন্য অবশ্য এই যোগাযোগটাও শুরুতে কেউ বুঝতে পারেনি।

এটা যে ও কীভাবে করছিল কে জানে!

পুরো ব্যাপারটা সামনে এল পেশেন্ট ফাইল দেখার পরে।

আমি পুলিশকে বলেছিলাম ক্লিনিক থেকে পেশেন্ট ফাইল উদ্ধার করতে। নিশ্চয়ই পরীক্ষার পর রোগীর স্বপ্নের উপরে কোনও ডিটেল্ড রিপোর্ট থাকত।

কিন্তু সেটা প্রথমে পাওয়া যায়নি।

একটা সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট রোগীদের দেওয়া হত যেখানে তাদের ঘুম ভালো করার জন্য কী কী করতে হবে, টেনশন কমানোর জন্য কী করতে হবে— এরকম অনেক কিছু লেখা থাকত। কিন্তু এর বাইরে আমি আরেকটা রিপোর্ট খুঁজছিলাম।

আমার ধারণা ছিল এরকম নিশ্চয়ই কোনও রিপোর্ট আছে যেখানে স্বপ্নে ঠিক কী কী পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে।

সেটাই তো গ্যাব্রিয়েলের গবেষণা, যেখানে স্বপ্ন থেকে পুরনো কোনও অপরাধের সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু সেই রিপোর্টটা পাওয়া যাচ্ছিল না।

কিন্তু মন বলছিল সেরকম কিছু অবশ্যই আছে। ওর ক্লিনিকে ও ঠিক কী কী করে সেটা বোঝার জন্য আমার পরামর্শে ঘরের কিছু জায়গায় দ্বিতীয় দিনে সি সি টিভি ক্যামেরা লাগানো হয়। তাতে দেখা যায় যে প্রত্যেকটা টেস্ট সাবজেক্টের উপর পরীক্ষার পরে কিছু তথ্য গ্যাব্রিয়েল ওর পারসোনাল ল্যাপটপে লিখে রাখে। অনেক সময় কাটায় সে রিপোর্টে। সেটা শুধু ওর ল্যাপটপে থাকে। ক্লিনিকের অন্য কোনও কম্পিউটারে সে তথ্য থাকে না। তার কোনও প্রিন্ট আউট নেওয়া হয় না।

এরকম এক রোগীর ক্ষেত্রে নোট নেওয়ার সময়ে আমার কথামতো পুলিশ হঠাৎকরে ওর ক্লিনিকে ঢোকে। প্রায় হাতে নাতে ওকে ধরা হয়। প্রথমে রাজি না হলেও বাধ্য হয়েও সেই রিপোর্ট শেয়ার করতে বাধ্য হয়। পরে একটা এনক্রিপটেড ফাইল ওই পারসোনাল ল্যাপটপ থেকে পাওয়া যায়, যেখানে সবার তথ্য ছিল।

সেখানে কে অতীতে কী কী অপরাধ করেছে, সেরকম অনেক কিছুই ডিটেলসে লেখা আছে।

সেটা দেখার পরেই ওকে অ্যারেস্ট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কারণ যারাই মারা গেছে, দেখা গেছে তাদেরকেওর ওই রিপোর্টে নাৎসি বলে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের পুরনো অপরাধের উল্লেখ সেখানে আছে।

এমনকী সে রিপোর্টে তারা কী কী ধরনের স্বপ্ন দেখেছিল এবং তার ভিত্তিতে কীভাবে ও ওই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে, সে বিষয়েও লেখা ছিল। ঠিক যেন ও নিজের কাছে সৎ থাকতে চেয়েছে, নিজের বিচার যে কোনওভাবে ভুল নয়, সেটাই প্রমাণ করতে চেয়েছে।

সেখানে ড্রিম ব্যাংকের অন্য অপরাধীদের স্বপ্নের সঙ্গে তুলনা তুলে ধরা হয়েছে। কীভাবে স্বপ্নে সাংকেতিক ভাষায় সে অপরাধ ধরা পড়েছে তা বোঝানো হয়েছে। সেটা লিখতে গেলে অনেক লেখা হয়ে যাবে। এখানে উল্লেখ করছি না।

কিন্তু সে পদ্ধতির মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিদের উপরে কে কী ধরনের অপরাধমূলক কাজ করেছিল, তা বোঝা গেছে।

অনেকে আউসউইৎজ বা ট্রেব্লিঙ্কা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে এস এস গার্ড হিসেবে কাজ করেছিল। কেউ বা গেস্টাপো বা নাৎসিদের সিকরেট পুলিশের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কেউ বা ক্যাম্পের পাঁচিলের উপর থেকে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো বন্দিদের গুলি করে মারত। কেউ বা গ্যাস চেম্বারে বিষাক্ত 'জাইক্লোন বি' গ্যাসের ক্যাপ্সুল ফেলার পরে ইহুদিদের মৃত্যুর আগের সেই আর্ত চিৎকার শুনে পৈশাচিক আনন্দ পেত। কারও কাজ ছিল শুধুই ক্যাম্পের বন্দিদের উপরে কারণে-অকারণে অত্যাচার করা, অপমান করা যাতে তারা তাদের নিজেদের মানুষ ভাবতে লজ্জা পায়। কেউ আবার অজস্র ইহুদি নারীকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে। এ সবই স্বপ্ন থেকে বোঝা গেছে।

আমার অনুমান মতো এই নাৎসিদের প্রত্যেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে ও পরে মারা গেছে গ্যাব্রিয়েলের চিকিৎসায়। রাইকারের বাবার রিপোর্টে উল্লিখিত যে রাইকারের বাবা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের গ্যাস চেম্বারে কাজ করত। কাজ ছিল ক্যাম্পের বন্দিদের ওই গ্যাস চেম্বার অবধি নিয়ে আসা।

রাইকার নিজেও বাবার এই পূর্ব অপরাধ সম্বন্ধে জানত না।

অর্থাৎ স্বপ্নের মাধ্যমে গ্যাব্রিয়েল নাৎসিদের চিহ্নিত করত। তারপরে হয়তো তাদের জন্য এমন কিছু করত যাতে তারা স্বপ্নের মধ্যে আস্তে আস্তে হারিয়ে যায়। কীভাবে করত সেটা অবশ্য বোঝা এখনও যায়নি।

তবে সেটা সহজে সামনেও আসবে না যদি না ও বলে। সেটাই ওর পেটেন্টেড প্রসেস।

আজ পুলিশের জেরার সময় গ্যাব্রিয়েল স্বীকার করে নিয়েছে ওর অপরাধ। একই সঙ্গে বলেছে যে এদের পঞ্চাশ বছর আগে নুরেমবারগ ট্র্যায়ালে শাস্তি পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আইনকানুনের ফাঁক দিয়ে, ঘুষ দিয়ে, অন্য দেশে পালিয়ে গিয়ে এরা বহাল তবিয়তে সারাজীবন কাটিয়েছে। এমনকী এরা বন্দি ইহুদিদের থেকে কেড়ে নেওয়া ধনসম্পত্তি দিয়েও সারাজীবন বৈভবের মধ্যে আনন্দে কাটিয়েছে। সেদিক থেকে ও যে এতজনকে শাস্তি দিতে পেয়েছে তাতে ও আনন্দিত। ওর এর জন্য কোনও অপরাধবোধ নেই।

কিন্তু কীভাবে ঠিক এটা করত সে ব্যাপারে এখনও কিছু বলেনি। অবশ্য এটা জানতে খুব বেশি সময় লাগবে না। ওর সব যন্ত্র, নোটস দেখলেই এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা আশা করি এই পদ্ধতি বুঝতে পারবে।

গ্যাব্রিয়েলের বাবা পোল্যান্ডের ট্রেবলিঙ্কা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ছিল। ওর ঠাকুরদা ও ঠাকুমা দুজনেই সেখানেই মারা যায়। বাবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ক্যাম্প থেকে ছাড়া পায়। আমেরিকায় চলে আসে।

তাই এই গভীর ঘৃণা অস্বাভাবিক কিছু নয়। হয়তো এই লোকগুলোর জন্য এটাই ছিল উপযুক্ত শাস্তি।

এতটা বলে অনিলিখাদি ডায়েরিটা নামিয়ে রাখল।

আমরা বলে উঠলাম— তারপরে? গ্যাব্রিয়েলের কী হল? কীভাবে এদের এরকম অবস্থা করছিল, সেটা বোঝা গেল!

অনিলিখাদি এবারে থেমে বলে উঠল— বলছি। বিশেষ কারণে এর পরে আমি আর ডায়েরি লিখিনি। কখনও ওই ডায়েরি কারও হাতে গিয়ে পড়লে আমার মুশকিল হতে পারত। তবে বাকিটা বলছি।

—মানে? এর পরে আর না লেখার মতো কী বাকি থাকে? তুমি তো বলেই দিলে।— প্রতীক বলে উঠল।

—না, না। এখনও সব শেষ হয়নি। সে কথায় আসছি। আগেই তোদের মরভান সিনড্রোমের কথা বলেছি। এরা অনিদ্রা রোগে ভোগে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস শুধু জেগে থাকে। মাসখানেক পরে মৃত্যু হয়। সারাদিন কাজের পরে দুর্বল হয়ে যাওয়া মস্তিষ্ক কোষের সিনাপ্সেসগুলো আবার কিছুটা সতেজ হয়। না ঘুমোতে পারলে সেই সিনাপ্সেসগুলো দুর্বল হতে হতে মানুষ তার চিন্তাভাবনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। শেষে মৃত্যু হয়। প্রশ্ন ছিল, সেরকম কিছু কী করেছে গ্যাব্রিয়েল?

নাকি এদের অবস্থা 'নারকোলেপ্সি'র রোগীদের মতো হয়! নিদ্রা আর জাগরণ মিশে যায়। গ্যাব্রিয়েল কী কোনওভাবে এই র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট অবস্থাটাকে প্রলম্বিত করে দিচ্ছিল যাতে সে রোগী না ঘুমোতে পারে, না জেগে থাকতে পারে। সেজন্য তাদের দেখে মনে হত যেন তারা যেন স্বপ্নের মধ্যে হারিয়ে গেছে। আসলে তারা বাস্তবে আর ফিরে আসতে পারছে না।

কিন্তু প্রশ্ন এ দুই ক্ষেত্রেই এটা সঙ্গে সঙ্গে হওয়ার কথা। অর্থাৎ ক্লিনিক থেকে ফেরার পরের সেই রাতে, যার জন্য পরের দিন ভোরবেলায় রোগীর মধ্যে এ পাগলামি দেখা যেত। কিন্তু সেরকম তো কোনও ক্ষেত্রেই হয়নি। একই সঙ্গে কোনও ওষুধও দেয়নি গ্যাব্রিয়েল। এত দিন বাদে কীভাবে হঠাৎ করে এটা হচ্ছে, সেটাই প্রশ্ন। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে যে কোনও ক্ষেত্রেই গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে এর পরে আর সেই রোগীর দেখা হয়নি। তাহলে?

—এগুলো তো তোমার ধারণা। তারপরে? তুমি কী করলে?—তন্ময় অধৈর্য হয়ে বলে উঠল।

—বলছি। আমি নিজে গ্যাব্রিয়েলের ক্লিনিক সম্বন্ধে আরেকটু জানতে চাইছিলাম। এসব ক্ষেত্রে সব থেকে ভালো তথ্য দিতে পারে ওর ক্লিনিকের সেই রিসেপশনিস্ট মহিলা। সেলিন। ফ্রেঞ্চ মহিলা। কিন্তু ইংরেজি সামান্য বলতে পারে। সেলিন এর বয়স বেশি নয়। বছর কুড়ির কাছাকাছি। ছটফটে বাচ্চা মেয়ে। কিন্তু তাকে তো পুলিশ অনেক প্রশ্ন করেছে। সে কী আমাকে এত সহজে সবকিছু বলবে! তার জন্য ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করা দরকার।

তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার একটা সুযোগ এল ঠিক পরের দিন। টেনিস কোর্টে। দেখি সেলিন এক মাঝবয়সি মহিলার সঙ্গে টেনিস খেলছে। সেলিন যেরকম ভালো খেলে, সে তুলনায় অন্য মহিলা প্রায় খেলতেই পারছেন না। তোরা তো জানিস আমি নিয়মিত টেনিস খেলেছি বহু বছর। এখানেও বেঙ্গল টেনিস অ্যাকাডেমিতে খেলেছি। একটু অপেক্ষা করলাম। প্রায় হঠাৎ করেই এখানে এসেছি, এরকমভাবে অবশ্য সাজাতে হয়েছিল। আমাকে সেলিন গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে দেখেছে। আমাকে ওর বন্ধু হিসেবে জানে। এ সবের পিছনে আমার ভূমিকা নিয়ে কিছুই জানে না।

কিছুক্ষণ বাদে সেলিনের সঙ্গে খেলার সুযোগ এল। তারপরে যে কোনও খেলায় যা হয় আর কি, আগে কোনও বন্ধুত্ব না থাকলেও এক ঘণ্টা বাদে সে দূরত্ব চলে গেল।

খেলার পরে ওখানকার ওই ক্লাব লাগোয়া এক ক্যাফেতে ওর সঙ্গে বসলাম। জানতাম ও অন্য চাকরির সন্ধানে থাকবে। সে বিষয়ে কথা বলতে বলতে কিছু জিনিস জানলাম। তার মধ্যে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ যেটা আগে জানা ছিল না।

রোগীদের সম্বন্ধে এই ডিটেল্ড রিপোর্ট আর কারও পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না! সেলিন সেটা সম্বন্ধে কিছু বলতে পারল না। ও নিজেও ওটার অস্তিত্ব সম্বন্ধে ভালো করে জানত না। শুধু বলল ডেভিডের পক্ষে জানা সম্ভব হতে পারে। কারণ এরা প্রত্যেকেই ডেভিডের পেশেন্ট ছিল।

রোগীরা গ্যাব্রিয়েলের ক্লিনিকে আসত যেমন ডেভিডের পরামর্শ অনুযায়ী, ঠিক তেমনই ক্লিনিকের পরীক্ষার পরে তাদের আবার ডেভিডকে দেখানোটাই স্বাভাবিক। ঠিকই তো!

তাহলে কী ডেভিড এতে ইনভলভড? ডেভিডই কী কিছু করছে এসবের আড়ালে থেকে?

জিজ্ঞেস করলাম ওর কাছে ক্লিনিকের পরে সব পেশেন্টকে দেওয়া সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট আছে কিনা! পুলিশ দেখলেও সব ক'টার কপি এখনও ওর ক্লিনিকেই আছে। ও বলল আমি দেখতে চাইলে ও দেখাতে পারে। যদিও তার জন্য পুলিশের পারমিশন লাগবে কারণ এসব রোগীর পারসোনাল রেকর্ড। ডেটা প্রাইভ্যাসির ব্যাপার আছে।

বলা বাহুল্য ফ্রেঞ্চ পুলিশের অলিভিয়ের কাছ থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সে পারমিশন পেতে আমার অসুবিধে হয়নি। সে সূত্রে পুরো পেশেন্ট রেজিস্টারও দেখলাম যেখানে কে কবে এসেছে সে সব লেখা আছে। অলিভিয়ের কাছ থেকে ডিটেল্ড রিপোর্টের এনক্রিপ্টেড ফাউলটাও দেখার সুযোগ পেলাম।

এর পরে যেটা হয়েছিল, সেটাকে বলা যায় খুটিয়ে এই তথ্যগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য দেখা। আগে আমি নিজে দেখিনি। দেখতে গিয়ে একটা আকর্ষণীয় জিনিস চোখে পড়ল।

৩৩১ জন ওই ক্লিনিকের এক্সপেরিমেন্টে অংশগ্রহণ করেছে। তার মধ্যে গ্যাব্রিয়েলের ডিটেল্ড রিপোর্ট অনুযায়ী ৮৮ জনকে নাৎসি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

তার মধ্যে ৮৭ জন এখনই অসুস্থ বা ইতিমধ্যে মৃত। একজনই বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন। কে তিনি?

কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার খবর পেতে অবশ্য মুশকিল হল না। সেই ভদ্রলোক হলেন হ্যাঁন্স মুলার। উনি এখনও দিব্বি সুস্থ আছেন। বাড়িতেই আছেন।

ভদ্রলোকের সম্বন্ধে খোঁজ শুরু করলাম। তার অতীত, বর্তমান সবকিছু নিয়ে। আর তখনই বুঝতে পারলাম যে এখনও সবকিছু শেষ হয়নি। তাহলে উনি হয়তো বেঁচে থাকতে পারতেন না।

পুলিশ এমনিতেও গ্যাব্রিয়েলের ফোন রেকর্ড সব ট্র্যাক করেছিল। এমনকী কোথায় কোথায় যেত, কারণ সঙ্গে দেখা হত, সেসব ডিটেলস। অবাক হলাম যে গ্যাব্রিয়েলের কল লিস্টে ডেভিড-এর নাম্বার পাওয়া গেল না। অর্থাৎ ওদের মধ্যে ফোনে কখনও কথা হত না। অন্য কোথাও রোজ দেখা হওয়ার সুযোগ ছিল না। দুজনে কখনও দেখা করেনি নিজেদের মধ্যে সাম্প্রতিক কালে।

আরও চার দিন বাদে আমার ফেরার দিন। ওখান থেকে জেনেভা হয়ে স্পেনের মাদ্রিদ যেতে হবে। হাতে সময় খুব কম। কিন্তু একেই বলে ভাগ্য। যার জন্য অপেক্ষা করছিলাম সেটা ঠিক ফেরার আগের দিনেই হল।

সেদিন ছিল বুধবার। ডেভিড এর চেম্বারে পৌঁছলাম বিকেল পাঁচটায়। খুব ব্যস্ত ডাক্তার। এসময় ভিড় একটু ফাঁকা হয়ে এসেছে। আমি রিসেপশনে গিয়ে আমার নাম জানালাম। বললাম আমার তাড়াহুড়ো নেই। আমি অপেক্ষা করছি। যদিও জানতাম উনি আমাকে সঙ্গে সঙ্গে ডেকে নেবেন।

ঠিক তাই হল। ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে ডাক পড়ল। সোজা ওর চেম্বারে গিয়ে হাজির হলাম। দেখি জানলার দিকে মুখ করে চেয়ার ঘুরিয়ে বসে আছেন।

আমি ঢুকতেই চেয়ার ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বসতে বললেন। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি।

আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন— এতদিনে আসার সময় পেলে? তা কী কফি চলবে?

আমি সম্মতি জানাতে উনি চেম্বার থেকে বেরিয়ে কাউকে কফির কথা বললেন। খানিকবাদে আবার ফিরে এলেন।

বলে উঠলাম—

আমি 'ডেভিড অ্যান্ড হল ড্রিম স্কেল'-এর কথা পড়েছিলাম যা দিয়ে কারও স্বপ্ন তার দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত, কতটা রিলেটেড তা পরিমাপ করা হয়। কিন্তু আপনি যে সেই বিখ্যাত ডেভিড, সেটা জানতাম না। আপনিও যে স্বপ্ন নিয়ে এত রিসার্চ করেছেন জানতাম না।

উনি মৃদু হাসলেন। বলে উঠলেন— বাহ, তোমার সব বিষয়ে বেশ পড়াশোনা আছে তো! হ্যাঁ, প্রায় কুড়ি বছর আগে আমার কাজের উপরে ভিত্তি করে এটা করা হয়েছিল।

—আজ তো আপনার কাজ শেষ।

—না, না, কাজ আর শেষ কোথায়। এখনও আরও ছ'জন দেখা বাকি। বেরোতে বেরোতে সাতটা হয়ে যাবে।

—না, মানে অন্য কাজটার কথা বলছিলাম। আজ হ্যাঁন্স — এর অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল না!

চমকে উঠলেন ডেভিড। চোখে একটা ঝিলিক খেলে গেল। মুখের উপরে যেন একটা কালো ছায়া এসে পরক্ষণে সরে গেল। খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। পাশে গ্লাসে রাখা জল খেলেন।

তারপরে হেসে বলে উঠলেন—তুমি সত্যি খুব ইন্টেলিজেন্ট অনিলিখা। তুমি কতটুকু জানো, বলো তো? কীভাবে বুঝলে?

—আপনার রিসার্চ পেপার, আগ্রহ সবকিছুই আমি স্টাডি করেছি। ওটাই আমার বড় ভুল ছিল। বুঝতে পারিনি যে এখানে শুধু একজন বিখ্যাত স্বপ্নের বিজ্ঞানী নেই। গ্যাব্রিয়েলের থেকেও এই বিষয়ে এগিয়ে থাকা এক বিজ্ঞানী আছেন যিনি স্বপ্ন-ঘুম এসব নিয়ে বহু বছর ধরে রিসার্চ করছেন। বিশেষ কিছু প্রোটিনের সাহায্যে 'র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট'কে প্রলম্বিত করার আপনার লেখা একটা রিসার্চ পেপার আমার চোখে পড়ে। তারপরে খোঁজ নিয়ে বুঝি আপনিই গ্যাব্রিয়েলকে এখানে ডেকে নিয়েছিলেন। যদিও নিজেদের মধ্যে সবরকমভাবে দূরত্ব রাখতেন। ঠিক কিনা!

মিনিট দুয়েক চুপ করে রইলেন ডেভিড। যেন কী বলবেন নিজেও জানেন না।

আমি আবার বলে উঠলাম— চিরস্থায়ী স্বপ্নের আবিষ্কার আপনার হাতে হলেও একটা জায়গায় আপনার গ্যাব্রিয়েলকে দরকার ছিল। সেটা হল স্বপ্নের মাধ্যমে অতীতের অপরাধ খুঁজে বার করা, যার উপায় গ্যাব্রিয়েল আবিষ্কার করেছিল। কিন্তু একটা কথা বলুন তো! আপনি এতদিন বুঝতে পারেননি যে এই আপনি যেখানে আছেন, সেখানেই বহু বছর ধরে বসতি গড়েছে একদল নাৎসি যুদ্ধ অপরাধী, যারা তাদের পরিচয় গোপন করে এখানে আশ্রয় নিয়েছিল। কীভাবে আপনার প্রথম সন্দেহ হল?

—একটা আর্ট কালেকশনে কিনতে গিয়ে। আমার ঠাকুরদা ছিলেন খুব বড় আর্ট কালেক্টার। তাঁকে ১৯৩৭ সালে বার্লিনের রাস্তায় গুলি করে মেরেছিল ওইসব পাগলের দল। তারপর ওঁর কালেকশনের সব ছবি চলে যায় হিটলারের ডানহাত গোরিং-এর কাছে। ওটা এখানে এক অকশনে দেখেছিলাম দেড় বছর আগে। সেই দুটো ছবি থেকেই আমার প্রথম সন্দেহ হয়। এসেছিল একটাই পরিবারের থেকে যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এখানে এসেছিল। অন্যরা কেউ এটা বুঝতে পারত না। কিন্তু আমার কাছে ঠাকুরদার কালেকশনে কী কী ছবি ছিল সে সম্বন্ধে সম্পূর্ণ তথ্য ছিল। এদুটো ছবি ছিল সালভাদোর ডালি-র প্রথম দিকে আঁকা দুটো ছবি। ওটা আমারও আগ্রহের বিষয়। গোরিং-এর বংশধর ছাড়া ওটা কারও কাছে থাকা সম্ভব ছিল না। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি যে গোরিং-এর মেয়ে ও তার সঙ্গে আরও কিছু উগ্র নাৎসি সে সময় এখানে চলে এসেছিল। এরা প্রত্যেকে খুব সিরিয়াস কিছু ক্রাইম করেছিল সে সময়কার যুদ্ধবন্দিদের ও ইহুদিদের উপরে। কিন্তু এরা সারাজীবন কোনও শাস্তি না পেয়ে মহা আনন্দে বছরের পর বছর কাটিয়েছে।

—কিন্তু আপনি চাননি কোনও নিরপরাধ জার্মান শুধু সন্দেহের বশে মারা যাক। আপনি নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন, তাই তো? সে জন্য আপনার গ্যাব্রিয়েলকে প্রয়োজন হয়েছিল। কারণ গ্যাব্রিয়েলের পক্ষে স্বপ্নের মাধ্যমে কারও অতীতের অপরাধ সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব ছিল। একই সঙ্গে আপনার পক্ষে অন্য কোনও উপায়ে এতজন ইনফ্লুয়েনশিয়াল লোককে পরপর মারা সম্ভব ছিল না। একই সঙ্গে আপনার কোনও অপরাধ প্রমাণ করাও নেক্সট টু ইম্পসিবল।

ডেভিড হাত তুলে ইঙ্গিতে আমাকে একটু থামতে বললেন। এক মহিলা ইতিমধ্যে চেম্বারের কাচের দরজা খুলে আমার কফি রেখে গেল।

সে মহিলা চলে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করলাম।

তারপরে আমি কফিতে চুমুক দিয়ে বলে উঠলাম—আমার ধারণা অনুযায়ী ঠিক কীভাবে হয়েছিল, সেটা আমি বলি। আপনি আগেই একটা লিস্ট করেছিলেন। বয়স, কোথা থেকে কবে এসেছে, তার স্বভাব, কী ধরনের কাজে দক্ষতা, কীধরনের বিষয়ে ইন্টারেস্ট— এসব বিচার করে। আপনার সঙ্গে এখানকার সবার ভালো আলাপ। তাই এদের সবাইকে আপনার রেগুলার পেশেন্ট করে তোলা আপনার পক্ষে শক্ত হয়নি। দরকার ছিল নিশ্চিত হওয়ার। আপনি তাই গ্যাব্রিয়েলকে এখানে ডাকেন ক্লিনিক খুলতে।

আপনার সঙ্গে পরিচয়ের জন্য এদেরকে গ্যাব্রিয়েলের কাছে রেকমেন্ড করা আপনার পক্ষে খুব সহজ কাজ ছিল। গ্যাব্রিয়েলের মাধ্যমে আপনি জেনে নিতেন এদের মধ্যে কে কে ইহুদি হত্যা বা বড় ধরনের কোন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আপনিই আবার তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। তারা আপনার কাছে পরবর্তী অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেলে তাদের ওষুধের মধ্যে এমন কিছু ড্রাগ দিতেন যাতে এই অসুস্থতা শুরু হয়। আমার বিশ্বাস সেরকম কোনও ড্রাগ আপনি আবিষ্কার করেছেন। ঠিক কিনা!

—কিন্তু আমার সঙ্গে তো গ্যাব্রিয়েলের কথাও হত না, দেখাও হত না। আমি কীভাবে জানব ও সেই রোগীর স্বপ্নের মধ্যে ঠিক কী দেখতে পেয়েছে। সেটা তো আমার জানার কথা নয় কোনও ভাবে।— উনি মুচকি হেসে বলে উঠলেন।

আমিও হেসে উত্তর দিলাম— সেটা আমিও প্রথমে বুঝতে পারিনি। এজন্যই পুলিশও আপনাকে ধরতে পারেনি। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল যে একটা উপায় আছে। এরকম যদি হয় যে সেটা রোগীই আপনাকে জানাত! কিন্তু নিজের অজান্তে।

সেক্ষেত্রে দেখতে হবে কী থাকত ওদের দেওয়া রিপোর্টে! এমন কী আছে সে রিপোর্টে যা দেখে আপনি তাদের অতীতের অপরাধ বুঝতে পারছেন আর সেভাবে ক্ষেত্রবিশেষে তাদের কাউকে কাউকে বিশেষ কোনও ওষুধ দিচ্ছেন। সেজন্য রোগীদের দেওয়া সংক্ষিপ্ত রিপোর্টগুলো আমি এক এক করে দেখি। দেখি স্বপ্নে এমন কিছু কথা দেখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা বাকি রিপোর্টের সঙ্গে ঠিক প্রাসঙ্গিক নয়। তার মধ্যে স্বপ্নে দেখা অপরাধের বিন্দুমাত্র উল্লেখ থাকত না। থাকত অন্য কিছু বর্ণনা ও এমন কিছু অবজেক্টের উল্লেখ যা নাকি তারা ঘুমের মধ্যে দেখেছে।

সেখানে এক এক জনের রিপোর্টে এক এক রকম বস্তুর কথা হালকা করে উল্লেখ করা আছে। কেউ স্বপ্নে বাড়ি দেখেছে, কেউ বেলুন, কেউ বা গ্লাস, কেউ ওয়াইনের বোতল, কেউ বৃত্ত, কেউ গোলক, কেউ ফুটবল, কেউ বা ডলারের ছবি, ত্রিভুজ বা কেউ স্কোয়ার দেখে। কেউ বা দেখেছে স্টপ সাইন।

মুখ আরক্ত হয়ে উঠল ডেভিডের।

বলে উঠলেন— হ্যাঁ, তাতে কী প্রমাণ হয়?

হেসে উঠে বললাম— কোনওটা দুই মাত্রার, কোনওটা তিনমাত্রার বস্তু। আর সেটা পড়েই আপনি বুঝে নিতেন সে রোগী অতীতে নাৎসি ছিল কি ছিল না! নাৎসি হলে সেক্ষেত্রে গ্যাব্রিয়েল দুমাত্রার বস্তুর কথা উল্লেখ করত স্বপ্নের ওই অংশে। বৃত্ত, ত্রিভুজ, বর্গক্ষেত্র বা স্টপ সাইন— এই জাতীয় কিছু। আপনারা বোধহয় ওর এখানে আসার আগেই এরকম কিছু প্রোটোকল ও সাংকেতিক ভাষা নিজেদের মধ্যে ঠিক করে নিয়েছিলেন। এটাও তার একটা অংশ।

খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলেন ডেভিড। তারপরে ফের বলে উঠলেন

—সবই বুঝলাম। কিন্তু আমাকে তুমি ছেড়ে দিলে কেন অনিলিখা? তুমি তো চাইলেই আমাকে ধরিয়ে দিতে পারতে।

—আজ হ্যাঁন্স এসেছিল। মনে হয় আপনি তাকে সে ড্রাগ দিয়েছেন, তাই তো?

—ও বুঝলাম। একেবারে প্রমাণসহ হাতেনাতে ধরা। তাই তো? ওই ড্রাগ এখন টেস্ট করলেই আমাকে ধরতে পারবে।

—হয়তো তাই করতাম। যদি না হ্যাঁন্সের কথা জানতাম। হ্যাঁন্স ছিল আপনাদের মেন টার্গেট। তাই তো?

থতমত খেয়ে গেলেন ডেভিড। বলে উঠলেন— কী করে বুঝলে?

—ওই একজনেরই সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট অন্যরকম ছিল।

—মানে? কীরকম?

—একমাত্র ওর ক্ষেত্রেই বলা হয়েছিল যে ও স্বপ্নে দুটো স্কোয়ার বা দুটো বৃত্ত দেখে। অর্থাৎ ওর ক্ষেত্রে অপরাধ আরও গুরুতর।

—এক্সেলেন্ট। কিন্তু তুমি তবু আন্দাজ করতে পারবে না, সে কে? কোনওভাবে আন্দাজ করতে চাও।

—আসল নাম তো হ্যাঁন্স নয়, তাই না? আসল নাম আমার মনে হয় জোসেফ মেঙ্গেল, যাকে সারা বিশ্ব খুঁজে বেরিয়েছে অপরাধী হিসেবে। কিন্তু লোকটা সবার চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে বেরিয়েছে।

ডেভিড অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপরে বলে উঠলেন —তুমি কী করে জানলে? এটা তো ইজরায়েলী ইন্টেলিজেন্স সংস্থা 'মোসসাদ' ছাড়া আর কারও জানার কথা নয়।

—ওই যে দুটো স্কোয়ার বা দুটো বৃত্তের কথা লিখলাম, তার থেকেই। জোসেফ মেঙ্গেল জমজদের নিয়ে অনেক এক্সপেরিমেন্ট করত। বলতে গেলে জমজ সন্তান ছিল ওর পরীক্ষার আর অত্যাচারের একটা বড় অংশ। সে জন্যই হয়তো 'দুটো' কথাটা ব্যবহার করা হয়েছিল। অবশ্য আমার কিছুটা সন্দেহ ছিল। কারণ সবাই জানে বহু বছর আগে মেঙ্গেল জলে ডুবে মারা গেছে। কিন্তু চেহারার বর্ণনা কিছুটা মিলে যাওয়ায় আর হ্যাঁন্স— এখানেও দীর্ঘদিন সার্জারিতে যুক্ত থাকায় মনে হয়েছিল। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল মুখ দেখেও চেনা যায় না।

ডেভিডের চোখ চকচক করে উঠল— অসাধারণ অনিলিখা। কী করে যে আন্দাজ করলে! ঠিক বলেছ। মুখে ও প্লাস্টিক সার্জারি করে কিছু পরিবর্তন করেছে। আসলে ওকে ধরার জন্যই 'মোসসাদ' কথাটা ছড়িয়েছিল। যাতে ও নির্ভয়ে সামনে চলে আসে। কিন্তু তবু এত বছর ধরা পড়েনি। সত্যি এরকম বাজে লোক বিশ্বের ইতিহাসে কমই হয়। ক্যাম্পে কত ইহুদিকে যে মেরেছে কে জানে! সব বয়সের। কখনও বিষ ইঞ্জেক্ট করে, কখনও বা সার্জারির মাধ্যমে। ও নাৎসিদের উন্নত জাতিতত্ত্বে বিশ্বাস করত। সেজন্য ইহুদিদের উপরে নানা ধরনের মেডিকাল এক্সপেরিমেন্ট করত। কত লোক যে তাতে মারা গেছে, কত বাচ্চা যে মারা গেছে তার ইয়ত্তা নেই। সে লোকটাই ছিল আমার প্রাইম টার্গেট। কিন্তু সে লোকটাই আমার কাছে আসছিল না। যাক, আজ এসেছে। এখন আমার কাজ প্রায় শেষ।

একটু থেমে ডেভিড বলে উঠলেন—তোমাকে একটা ছবি দেখাই।

বলে টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা সাদা কালো ছবি বার করলেন। সাদা কালো ছবি। এক মহিলা একটা বাচ্চাকে বুকে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। এক এস এস গারডের উদ্ধত বন্দুককে পিছন করে। নিজের প্রাণ দিয়ে বাচ্চাকে বাঁচানোর মরিয়া প্রয়াস। এটা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের আইকনিক ছবি। আগেও দেখেছি। নিজের বাচ্চাকে বাঁচাচ্ছেন তার জীবনের বিনিময়ে।

ডেভিডের চোখ ছলছল করে উঠল। ধরা গলায় ফের বলে উঠলেন— আসলে অনিলিখা এ ছবি আমার বা আমার মার নয়। কিন্তু আবার আমারও। আমরা ছিলাম অত্যন্ত অভিজাত ইহুদি পরিবার। সেখান থেকে আমাদের স্থান হয় ট্রেব্লিঙ্কা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। একজন এস এস গার্ডকে বিয়ের দামি হিরের আংটি উপহার দিয়ে আমি যাতে পালিয়ে যেতে পারি তার ব্যবস্থা করে মা। বাবা আগেই মারা গিয়েছিল গ্যাস চেম্বারে। মাকেও দেখিনি আর। পরে জেনেছিলাম ওই গ্যাস চেম্বারেই মাও মারা গিয়েছিল। ওই নরপিশাচদের হাতে। তার আগে নানান ধরনের শারীরিক অত্যাচারের ও ধর্ষণের শিকার হয়েছিল মা।

এই ছবির মধ্যে তাই আমি আমার মাকে আজও দেখতে পাই। মনে হয় ওরাই সেই লোকগুলো যাদের হাতে সেদিন বন্দুক ছিল, যাদের হাতে আমাদের রক্ত লেগেছিল, তাদের শেষ না করলে আমার কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

একটু থেমে ডেভিড বলে উঠলেন— আমার একটা অনুরোধ অনিলিখা। তুমি এখন এ বিষয়ে কিছু জানিও না। আমি তিন দিন বাদে ধরা দেব। কিন্তু ওই লোকটাকে শেষ করার পরে। ওকে তিনদিন বাদে সেই ওষুধটা দিয়েছি। এবিষয়ে কাউকে কিছু জানিও না এই ক'দিন। আমাকে এটুকু সময় দিতে পারবে অনিলিখা! আমি তোমার কাছে শুধু কিছুটা সময় ভিক্ষা করছি। তুমি আমার সম্বন্ধে রিসার্চ করেছ। তুমি নিশ্চয়ই জানো আমার কথার কী দাম। জীবনে কোনওদিন সামান্যতম অপরাধ করিনি। কিন্তু এত শুধু আমার বদলা নয়, এ আমাদের সবার।

তুমি ঠিকই ধরেছ আমি ওই আবিষ্কারটাই করতে পেরেছিলাম যার অন্য কোনও ভালো দিক ছিল না। ওই ড্রাগ শুধু নিদ্রা আর জাগরণের মধ্যের দূরত্বটা মুছে ফেলা। মরভান রোগকে ঠিক উলটে দিলে যা হয়। সেখানে মানুষ ঘুমোতে পারে না আর এক্ষেত্রে মানুষ জেগে উঠতে পারে না। সে স্বপ্নটাকেই এতটাই বাস্তব মনে করে যে সে সেই জগতের মধ্যে হারিয়ে যায় আস্তে আস্তে গভীর ঘুমের মধ্যে। কখনও বাস্তবে ফিরে আসে না।

আমি ফ্রুট ফ্লাই এর উপরে প্রথমে সফল হই, তারপরে আস্তে আস্তে দেখি মানুষের ক্ষেত্রেও একই ট্রিটমেন্ট সম্ভব বিশেষ কিছু প্রোটিনের সাহায্য নিয়ে।

একটু থেমে থাকলেন ডেভিড। বলে উঠলেন— আমি জানি তুমি হয়তো আমার অনুরোধ রাখবে না। কারণ সেটা তোমার দিক থেকে অনৈতিক, অপরাধ।

আমি বলে উঠলাম— ডেভিড, আমার যদি আপনাকে ধরানোর কোনওরকম ইচ্ছে থাকত, তাহলে কী আমি এতদিন অপেক্ষা করতাম। আমি কাল ফিরে যাচ্ছি। গ্যাব্রিয়েলের বিরুদ্ধেও কোনও প্রমাণ নেই। আশা করি ও খুব তাড়াতাড়ি ছাড়া পেয়ে যাবে। তাছাড়া আমার মনে হচ্ছে আপনি সেই যে বলেছিলেন না সেই মিলিয়ন বছর পুরনো ব্যাকটিরিয়া, সেটা তো থাকতেই পারে এ সবের পিছনে। কী তাই না!

ডেভিডের চোখ ছলছল করে উঠল।

আমার হাতের উপরে ওঁর হাত রেখে বলে উঠলেন— গড ব্লেস ইউ মাই চাইল্ড। গড ব্লেস ইউ। তুমি আমাকে আমার শেষ কিছু ইচ্ছা পূর্ণ করার সময় দিয়েছ।

ফের বলে উঠলেন— আচ্ছা। তুমি তো এত বুদ্ধিমতী। তা তুমি এত কিছু জানার পরেও কীভাবে আমার চেম্বারে ঢুকে কফি খেলে বল তো? যদি ওর মধ্যেও ওই ক্যাপসুল থাকত?

আমি হেসে বলে উঠলাম—ডেভিড, আপনি যাতে একজন নিরীহ মানুষও যাতে না মারা যায়, তার জন্য এত কিছু করেছেন। আপনার সন্দেহ হওয়া সত্ত্বেও বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন হার্ড এভিডেন্সের। আমি জানতাম আপনি আমারও কোনও ক্ষতি করবেন না। আপনি সেরকম মানুষ নন।

পরের দিন এয়ারপোর্টে আমাকে ছাড়তে এসেছিলেন ডেভিড। হ্যাঁন্সের মৃত্যুর খবরটা মাদ্রিদে গিয়ে পেয়েছিলাম। একইরকম ভাবে মৃত্যু। তবে তখনও কেউ জানতে পারেনি যে এই হ্যাঁন্সি ছিল কুখ্যাত ওয়ার ক্রিমিন্যাল অপরাধী জোসেফ মেঙ্গেল।

বলে অনিলিখাদি একটু থেমে বলে উঠল—গত পরশু একটা ইমেইল পেয়েছিলাম ডেভিডের সলিসিটারের কাছ থেকে। ডেভিড এক সপ্তাহ আগে মারা গেছেন। আমাকে দিয়ে গেছেন গোরিং-এর বংশধরের কাছ থেকে উদ্ধার করা সালভাদোর ডালির বিখ্যাত দুটো পেন্টিং, যার দাম বেশ কয়েক কোটি ডলার।

—মানে? তুমি এখন কোটিপতি। ছবিটা পাবে কীভাবে?— বিশ্বজিৎদা লাফিয়ে উঠল।

—ধুর! অত মূল্যবান একটা জিনিস কী আর আমি নিজের কাছে রাখব। ওটা ঠিক করেছি ল্যুভর মিউজিয়ামকে দিয়ে দেব। আমার টাকা দিয়ে আর কী হবে! এরকম ছবি নিজের কাছে রাখলে কারও দেখার সুযোগ হবে না।

ও একটা জিনিস বলা হয়নি। আমি একটা ভুল করেছিলাম। হ্যাঁন্সের মৃত্যুর পরেও ডেভিডের কাজ শেষ হয়নি। সেজন্য উনি 'প্রায়' কথাটা বলেছিলেন।

—মানে?

ফিরে আসার দু-সপ্তাহ বাদে খবর পেয়েছিলাম মাইক্রোবায়োলজির বিখ্যাত প্রফেসার রজার শিন্স-এর মৃত্যু হয়েছে ঠিক একইভাবে। উনিও একইভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন স্যামোনিতে আসার পর। স্যামোনিতে উনি এক বিশেষ প্রজাতির মাইক্রোব এর উপরে তদন্ত করতে গিয়েছিলেন। হয়তো ওই মাইক্রোব থেকেই মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছিল সংবাদপত্র। এতে আরও প্রমাণ পাওয়া যায় যে এই সব মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল সেই ব্যাকটিরিয়া। সমুদ্রের তলা থেকে পাওয়া সেসব ব্যাকটিরিয়া তাই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

—মানে, এটা তো বুঝলাম না, কী করে হল!—প্রতীক বলে উঠল।

অনিলিখাদি বলে উঠল— খবরটা পেয়ে তখনই বুঝতে পারলাম যে ডেভিড শুধু শুধু ওই অন্য গল্পটাকে নিয়ে আসেনি। তার আসল উদ্দেশ্য ছিল আরেক নাৎসি 'রজার শিন্স'কে স্যামোনিতে নিয়ে আসা ও একই ভাবে মারার।

রজার শিন্স-এর একটা পরিচয় তার মৃত্যুর একবছর বাদে সামনে আসে। রজার শিন্স ছিল ওই কুখ্যাত ডাক্তার জোসেফ মেঙ্গেল-এর সহকারী। আসল নাম ছিল অবশ্য অন্য।

এতক্ষণে অনিলিখাদি থামল। উঠে গিয়ে কাচের জাগ থেকে খানিকটা জল গ্লাসে ঢেলে বলে উঠল—উফ, তোদের এসব বলতে গিয়ে এতক্ষণ বকবক করে আমার গলা শুকিয়ে গেছে।

আমরা হতবাক হয়ে বসেছিলাম।

বিশ্বজিৎদা এতক্ষণে মুখ খুলল। বলে উঠল—সবই তো বুঝলাম। গল্পটাও ভালো। কিন্তু গল্পের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য কোনও এভিডেন্স আছে। যেমন ধরো, ওই দুটো ছবি। সেটা না হয় এখনও হাতে পাওনি বুঝলাম। কিন্তু ওই ক্যাপসুল। সেই ক্যাপসুল অন্তত একটা চেয়ে আনতে পারতে ডেভিডের কাছ থেকে উপহার হিসেবে। প্রমাণ হিসেবে।

অনিলিখাদিকে চুপ করে থাকতে দেখে বিশ্বজিৎদা বেশ একটা তৃপ্তির হাসি হাসল।

আমাদের মধ্যে এখন তন্ময় আজকাল বিশ্বজিৎদার সাপোর্টার হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বিশ্বজিৎদা একটা টি ২০ ম্যাচ দেখাতে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে।

তন্ময়ও বেশ উৎসাহের চোটে বিশ্বজিৎদার সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলে উঠল— ঠিকই তো। তোমার অন্তত সেরকম একটা স্পেশাল ক্যাপসুল নিয়ে আসা উচিত ছিল। সেটা দেখালেই সব বিশ্বাস করতাম।— ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলে উঠল তন্ময়।

অনিলিখাদি সেসব কথায় কোনও পাত্তা না দিয়ে ব্যাগ খুলে ছোট একটা দেড় ইঞ্চি ব্যাসের গোল কাঠের বাক্স বার করল। এরকম বাক্স আগে কখনও দেখিনি। তারপর সেটা খুলে ধরল। আমরা স্পষ্ট দেখলাম তার মধ্যে জ্বলজ্বল করছে একটা লাল ক্যাপসুল।

তার পরক্ষণেই যেটা হল, সেটা আমরা কেউ প্রত্যাশা করিনি। অনিলিখাদি ক্যাপসুলটা বাক্স থেকে সযত্নে তুলে নিয়ে মুখে ফেলে জল দিয়ে গিলে নিল।

বিশ্বজিৎদা লাফিয়ে উঠল— ও মাই গড অনিলিখা। এ কী করলে!

তন্ময় চিৎকার করে বলে উঠল— ও শিট।

সহেলী 'অনিলিখাদি' বলে চেঁচিয়ে উঠল।

প্রতীক 'সর্বনাশ' বলে লাফিয়ে উঠতে গিয়ে টেবিলের উপরে রাখা জলের জাগটা উলটে ফেলল।

অনিলিখাদি দেখি শান্তভাবে গ্লাসটা টেবিলের উপরে নামিয়ে জলের জাগটা ঠিকভাবে তুলে রেখে হেসে বলে উঠল — তোরা পারিসও বটে। মাথা ধরেছিল। তাই একটা প্যারাসিটামল খেলাম।

অধ্যায় ১ / ২২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%