অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
ডোরবেলটা বেজে উঠল। পরপর দু'বার। কে না জানে দরজা খোলা বারণ! তাই দিপু দরজার কাছে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, 'কে?'
উত্তর এল না। বেলটা আবার বেজে উঠল। আবার চেঁচিয়ে উঠল দিপু, 'আমি একা আছি, বাবা-মা বাড়িতে নেই। নাম না বললে খুলব না। কে?'
উত্তর নেই। নাহ, এরকম অভিজ্ঞতা কখনও হয়নি দিপুর। উলটো দিক থেকে সাড়া তো আসেই। আচ্ছা, ঋক মজা করছে না তো? চেয়ার টেনে তার উপর উঠে আইহোলে চোখ রাখল দিপু।
পরিষ্কার বোঝা না গেলেও দরজার বাইরে আধো অন্ধকারে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর যে বেশ বয়স হয়েছে তা বুঝতে সময় লাগল না দিপুর। ধুতি পরা। নাহ, ডাকাত অন্ত নয়। ডাকাতরা কি আর বুড়ো হয়?
তবু ব্যাডমিন্টন র্যাকেটটা হাতে নিয়ে দরজা খুলল ও। বাবা বলেন, সাবধানের মার নেই। ডাকাত হলে র্যাকেটটা দিয়ে ধাঁই করে এক মারে কাত করে ফেলবে দিপু। নাহ, সেরকম কিছু করতে হল না। লোকটি খানিকক্ষণ চুপ করে দিপুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আস্তে-আস্তে একটু এগিয়ে এসে ঘরের মধ্যে মুখ বাড়িয়ে বলে উঠলেন, 'এটাও না।'
'কী না দাদু?' ফস করে দাদুই বলে বসল দিপু।
'নাহ, এটাও আমার ফ্ল্যাট নয়। এখানেই কোথাও...' বলে মাথা নিচু করে দু'দিকে দু'বার নাড়লেন লোকটি। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আস্তে-আস্তে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।
অদ্ভুত তো! নিজের বাড়ি কোথায় জানেন না? দিপুর কেন জানি বেশ কষ্ট হল। ওরও একবার এরকম হয়েছিল গতবার পুজোতে ঠাকুর দেখতে গিয়ে। ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গিয়ে আধঘণ্টা এদিক-ওদিক ঘুরেছিল। তারপর ওকে কাঁদতে দেখে একজন এগিয়ে আসে। মাইকে অনেক অ্যানাউন্সমেন্ট করার পর দশ মিনিট বাদে বাবা-মাকে খুঁজে পাওয়া গেল। তখন দিপুর কী রাগ। আরও বেশ খানিকক্ষণ কেঁদেছিল ও।
'দাদু, ও দাদু!' আবার চেঁচিয়ে ওঠে দিপু।
লোকটি সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে গেলেন। ঘুরে তাকালেন দিপুর দিকে। তারপর আস্তে-আস্তে এগিয়ে এলেন।
'আমাকে ডাকছিলে, খোকা?'
'হ্যাঁ, দাদু। ডাকছিলে, খোকা?'
'হ্যাঁ, দাদু। তুমি ভিতরে এসে বোসো। তা হলেই তোমার বাড়ির কথা মনে পড়ে যাবে।'
লোকটি চুপচাপ দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ কী ভাবলেন কে জানে। তারপর চটি পরেই ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। দিপুও প্রায়ই এটা করে, আর তার জন্য বকাও খায়। দাদু ধীর পায়ে হেঁটে এসে সোফায় বেশ আরাম করে বসে পড়লেন। এতক্ষণে চেহারাটা ভালো করে খেয়াল করল দিপু। রোগা, ক্ষয়াটে। চোখ একটা বড় কালো ডাঁটির চশমা। মুখে-চোখে কেমন যেন উদাস ভাব। গালভর্তি খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, চোখও ভালো করে ধোয়া নয়। মুখটা শুকিয়ে গিয়েছে। মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ কিছু খাননি।
ঠিকই ধরেছে দিপু। দাদুর নির্ঘাত খুব খিদেই পেয়েছে। তা না হলে কিছু না বলে সামনের টেবিলে রাখা দিপুর আধখাওয়া কলাটা ছাড়িয়ে-ছাড়িয়ে খেতে শুরু করেন! দিপু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। একমনে কলাটা শেষ করে দাদু আবার এদিক-ওদিক মুখ ঘুরিয়ে দেখছেন। মনে হচ্ছে, আরও কিছু খাওয়ার ইচ্ছে।
'দাদু, আরও কিছু খাবে?'
মাথা নেড়ে 'হ্যাঁ' বলেন লোকটি। তারপর আবার দৃষ্টিহীন চোখে সামনের শো-কেসের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কলা, বিস্কিট, চকোলেট এনে একটা প্লেটে করে দাদুকে দিলে দিপু। নিজের খাবার নিজে নিয়ে খাওয়ার অভ্যেস নেই ওর। আর কারও জন্য নিয়ে আসা? ভাবাই যায় না।
দাদু খান। সেই ফাঁকে প্রিয় টিভি শো কী দেখতে শুরু করল দিপু। সিনচ্যানের একটা বশে মজার মুভি হচ্ছে। সিনচ্যান একটা ম্যাজিক বল পেয়েছে কোত্থেকে। সেটা হাতে নিলেই ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে ও। দেখতে-দেখতে ঘরে উপস্থিত দাদুর কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল দিপু। খানিকবাদে তাকিয়ে দ্যাখে, দাদুর প্লেট একেবারে পরিষ্কার। সোফায় পা তুলে বসে ঘাড় হেলিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন দাদু।
মুশকিল, সত্যিই মুশকিল। মা-বাবা যদি জানতে পারেন যে, একটা অজানা-অচেনা লোককে এভাবে ঘরে ডেকে আনা হয়েছে, তা হলে পরের দিন থেকে দরজার বাইরে গেটেও তালা পড়ে যাবে।
'দাদু, ও দাদু, তুমি বাড়ি যাবে না?'
বেশ খানিকটা ধাক্কাধাক্কির পর দাদু চোখ খুললেন। তারপর একবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে, অন্য দিকে ঘাড় ফিরিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
আচ্ছা বিপদ! যাকগে, বাবা-মায়ের আসতে এখনও অনেক দেরি আছে। নিশ্চিন্তে আবার সিনচ্যানের সিনেমাটা দেখতে বসে গেল দিপু। ঘণ্টাদেড়েক বাদে আবার খেয়াল হল। দাদু ঘুম ভেঙে সোজা হয়ে বসেছেন। টেবিলের উপরে রাখা দিপুর স্কুলের ওয়ার্কবুক আর পেনসিলটা নিয়ে কী সব আঁকিবুকি কাটছেন। উঁকি মেরে দেখল দিপু। একটা রোগা ছেলে আর একটা মোটা ছেলের ছবি আঁকছেন দাদু। দিপুর মতো অবশ্য অত ভালো আঁকার হাত নয়। কী করে হবে? দিপু তো আঁকার মাস্টারমশাইয়ের কাছে আঁকা শেখে। দাদু কি শেখেন? নিশ্চয়ই নয়।
বাবা বলেন, আঁকা শিখতে অনেক টাকা লাগে। দাদুর কি আর অত টাকা আছে। না বোধ হয়। তা হলে কি আর ওরকম নোংরা ধুতি আর একগাল দাড়ি হয় নাকি?
'দাদু, ও দাদু, তুমি ওর ছবি আঁকতে পারবে?'
'কার সোনা?' আস্তে-আস্তে বলেন দাদু। ডাকটার মধ্যে একটা অদ্ভুত আপনার টান আছে।
'ওই-ওই যে, টিভিতে দেখছ না সিনচ্যান? ওই ছেলেটার।'
'অ,' বলে আবার মাথা নিচু করে পেনসিলের আঁচড় দিতে শুরু করলেন দাদু আগের ছবিটাতেই। সেই মোটা ছেলেটির মাথায় একটা টুপি আঁকছেন। দিপুর একটু রাগই হয়।
'কী দাদু, সিনচ্যানকে আঁকবে না?'
'না।'
'কেন? তোমার ছবির ওই ছেলে দুটো তো বিচ্ছিরি। সিনচ্যানকে অনেক ভালো দেখতে। জানো তো, ও ভারী দুষ্টু। বাবা-মা না থাকলেই নানা দুষ্টুমি করে। ওর আবার এক বোন আছে।'
সিনচ্যানের গল্প বলতে থাকে দিপু। ছবির থেকে মুখ সরিয়ে দিপুর দিকে তাকিয়ে থাকেন দাদু। বেশ খানিকক্ষণ শোনার পরে আবার আঁকার দিকে মন দেন। দীপু এবার ভীষণ বিরক্ত হয়। দাদু তো কথাই বলতে চান না।
এবার লুডো নিয়ে আসে দিপু। এই লুডোটা বাড়িতে পড়েই থাকে। খেলার লোক নেই। কতদিন বাবা আর মাকে সাধাসাধি করেছে। কিন্তু ওঁদের কোনও আগ্রহ নেই।
'দাদু, খেলবে লুডো? সাপলুডো?'
'হ্যাঁ,' এতক্ষণ বাদে বেশ জোরে উত্তর পায়। যাক, দাদুটা তা হলে অতটা বোরিং নয়।
'কিন্তু,' একটু ভেবে দাদু বলেন, 'আমার সবুজ ঘুঁটি চাই, সবুজ ঘুঁটি।'
দিপু রাজি হয়। লাল ঘুঁটিই ওর বেশি পছন্দ।
খেলা এগোয়। সাপ, সিঁড়ি নামা, ওঠা। দাদু কখনও-কখনও হাসছে। কখনও বা সাপের মুখে পড়ে ব্যাজার হয়ে বসে থাকছে।
খেলতে-খেলতে দিপু বলে, 'দাদু, তোমার বাড়ি কোথায়?'
দাদু মুখ তোলেন। কাঁদো-কাঁদো মুখে বলে ওঠেন, 'এটা না?'
'না দাদু, এটা তো আমাদের ফ্ল্যাট। আমি, মা, বাবা থাকি। ওঁরা খানিকক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবেন। সিনেমা দেখতে গিয়েছেন।'
'তা, আমাকে ওরা থাকতে দেবে না, তাই না?'
দিপু ভারী চিন্তায় পড়ে যায়। মাসি মাঝেমধ্যে এসে থেকে যায়। ড্রাইভার কিশোরকাকু, সেও কখনও-সখনও থাকে বটে। কিন্তু দাদু?
'তুমি কি কোনও কাজ জানো দাদু?'
'না', সংক্ষেপে উত্তর দেন দাদু।
'তা হলে তোমাকে থাকতে দেবে না। কাজ জানে না, এরকম লোকদের ওরা থাকতে দেয় না। এই তো দ্যাখো না, আমার ঠাম্মা। তারও তোমার মতো অনেক বয়স। কিন্তু ঠাম্মার শরীর খারাপ, শুধু শুয়ে থাকে। তাই দূরে একটা বাড়িতে থাকে।'
'তোমার দাদু?' এতক্ষণে দিপুর কথা শুনছেন বলে মনে হল।
'নেই, আমি দেখিইনি।'
'হুঁ, বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আর তারপরই এক ছক্কা দুই পেয়ে সরাসরি নব্বইয়ের ঘরে উঠে যান দাদু। ভারী খুশি হয়ে বলে ওঠেন, 'আর মোটে একটা সাপ।'
'দাঁড়াও, তোমায় দেখাচ্ছি', বলে বেশ খানিকক্ষণ নাড়িয়ে ছক্কাটা ফ্যালে দিপু। না, ফের দুই। পুট পড়লেও একটা সিঁড়ি পেত দিপু।
'দাদু, তোমার বাড়ি নেই?'
খানিকবাদে দাদু বলে ওঠেন, 'আছে, খুঁজে পাচ্ছি না।'
'তা তোমার কাছে অ্যাড্রেস নেই?'
'থাকার কথা, তাই না?' বলে পাঞ্জাবির পকেটে হাতড়ান দাদু।
'দাঁড়াও, আমি দেখছি,' বলে দিপুও দাদুর পকেটে হাত ঢোকায়।
'এই, এই তো দাদু, তোমার পকেটে একটা কাগজ। কিন্তু তোমার কাছে টাকা, মানিব্যাগ এসব নেই।'
দাদুর অবশ্য তাতে কোনও ইন্টারেস্ট নেই। তিন ফেলে শেষ সাপটাও পেরিয়ে আটানব্বইয়ে পৌঁছে খুব খুশি-খুশি ভাব। দিপু কাগজটায় চোখ বোলায়। ইংরেজিতে লেখা।
'দাদু, তোমার আর চিন্তা নেই। অ্যাড্রেস পেয়ে গিয়েছি। আমি এখনই বিল্টুদাকে ডাকছি। পাশের ফ্ল্যাটে থাকে। ও সব জায়গা চেনে। তোমাকে নিয়ে যেতে পারবে।'
দাদুর মুখে তবু হাসি নেই। শুধু বলে ওঠেন, 'কোনও বাড়ি?'
'ওই দ্যাখো, নীচে দমদমও লেখা আছে। তার মানে এখান থেকে দূরে নয়।'
দাদু পিছনে হেলান দিয়ে বসেন। 'বাড়ি?' আস্তে-আস্তে বলতে থাকেন, 'সেখানে গাছ ছিল, পুকুর ছিল, কত লোকজন ছিল। আমরা বটগাছের তলায় বসে গল্প করতাম, মাঠে ফুটবল খেলতাম, ছিপ দিয়ে মাছ ধরতাম। এটা বাড়ি নয়। এখানে লোক নেই, কেউ নেই। শুধু কতকগুলো চেয়ার, খাট, আলমারি...।' দাদু বলতে থাকেন। দিপুও অবাক হয়ে শুনতে থাকে।
খানিকবাদে দিপু বলে, 'তা দাদু, তোমার আগের কথা এত মনে আছে, আর বাড়ি কোথায় তা মনে নেই?'
দাদু বলে ওঠেন, 'এখনকার কথা মনে থাকে না। কেমন যেন সব হারিয়ে যায়। ঠিক যেমন ওরাও হারিয়ে গিয়েছেন।'
'কারা দাদু?'
চুপ করে থাকেন দাদু। খানিকবাদে বলে ওঠেন, 'সবাই, মন্টু, সন্তু, সবাই।'
আধঘণ্টা বাদে দিপু বিল্টুদাকে ডাকে। বিল্টুদা দিপুর চেয়ে অনেক বড়। সবে কলেজে ঢুকেছে। আজ বাড়িতেই ছিল। বিল্টুদা আসার পরে দিপু ওর সঙ্গে দাদুকে নিয়ে বেরোয়। বেশি দূরে নয়। ওদের কমপ্লেক্সের উলটোদিকেই একটা গলি আছে, সেখানকারই অ্যাড্রেস। বাড়ি খুঁজে পেতে সময় লাগে না। একটাই বিল্ডিং, অনেকগুলো ফ্ল্যাট। একতলার পিছনের দিকের ফ্ল্যাটটা দাদুর।
বেল বাজাতে একজন লোক বেরিয়ে আসে। দেখে মনে হয়, কাজের লোকই হবে। দাদুকে দেখে খুব উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠে, 'সকাল থেকে আপনাকে আমি খুঁজে-খুঁজে হয়রান। রান্না করে এসে দেখি, আপনি আর বারান্দায় নেই। বায়না করছিলেন বলে বাইরে চেয়ার টেনে বসতে দিয়েছিলাম। আর দেব না। দাদাবাবুকেও এই ফোন করলাম। উনিও ভারী চিন্তায় পড়ে গিয়েছেন। কী যে করেন না! কতবার বলেছি, বাড়ি থেকে বেরবেন না। ভুলো মানুষ, ডাক্তার একা বেরতে বারণ করেছেন।'
দাদু কোনও কথা না বলে মাথা নিচু করে ঘরে ঢোকেন অপরাধীর মতো। দাদুর কাজের লোকের নাম ভগীরথ। দিপুরা জানতে পারে যে, দাদু একাই থাকেন এখানে। প্রায় তিন বছর। দুই ছেলেই বাইরে থাকে। এখনকার কোনও কথা দাদুর খেয়াল থাকে না। সব ভুলে যান। তাই সব সময় সঙ্গে ঠিকানা রাখা থাকে।
এসব কথার মধ্যে দাদু আবার বেরিয়ে এসেছেন ঘর থেকে। হাতে একটা পাতলা কমিকসের বই। বইটা দিপুর হাতে দিয়ে ওর মাথায় হাত রেখে বলেন, 'পড়ো, আমার আঁকা।'
বিল্টুদা বইয়ের দিকে একঝলক তাকিয়ে বলল, 'আপনিই সনাতন চৌধুরী? আপনার কত বাংলা কমিকস পড়েছি একসময়।'
দাদু হাসেন। তারপর দিপুর দিকে তাকিয়ে বলেন, 'তোমার টিভির ওই ছেলেটির চেয়ে আমার এই ছেলেগুলো অনেক ভালো।'
'দাদু, তুমি আবার আসবে আমাদের বাড়িতে?'
খানিকক্ষণ চুপ করে থাকেন দাদু। তারপর ভগীরথের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলেন, 'দরজা খোলা পেলেই।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন