অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
—না, না, অবাক হওয়ার কিছুই নেই। মাইক যাতে রাত এগারোটার পর আর না বাজতে পারে, সে ব্যবস্থা তো আমিই নিয়েছিলাম।
—মানে?
—কিছুই নয়। ওটা আমার একটা ছোট্ট আবিষ্কার। অডিও ক্যাপ যন্ত্র। অন করলে এক মাইল রেডিয়াসে আর কেউ ৪০ ডেসিবেলের বেশি আওয়াজ করতে পারবে না। কাল রাতে বাইরে অমন চিৎকার হচ্ছিল দেখে চালিয়ে দিয়েছিলাম। ব্যাস, মাইক বন্ধ।
অবাক হয়ে শুনছিলাম। ভদ্রলোক বলেন কী! যেটা নিয়ে কালকে অর্থাৎ দুর্গাপুজোর সপ্তমীর রাতে দু দলের মধ্যে বেজায় মারামারি হয়ে গেল— মাইকের দোকান ভাঙচুর হল— যার জন্য কলকাতা থেকে আসা গানের দল ফিরে গেল— সেটা নিয়ে— বদ্ধ উন্মাদ না হলে কেউ এত সহজে এ কথা বলতে পারে? আর এরকম কি সত্যিই সম্ভব?
এ প্রসঙ্গে বলে রাখি যার সম্বন্ধে এ কথা বলছি তার নাম মিঃ পাই। পরে জেনেছিলাম আসল নাম সমুদ্র বসু। আমার গত দশ বছরের প্রতিবেশী। যদিও গত দশ বছরে দশ বারও দেখা হয়নি। আর যতবারই দেখা হয়েছে ভদ্রলোক একবারও আমার দিকে না তাকিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে চলে গেছেন।
কল্যাণগড়ে আমার বাড়ির ঠিক পাশেই এনার বাড়ি। প্রায় দশ একরের উপর উঁচু পাঁচিল ঘেরা জায়গা। বাইরে থেকে কিছুই বোঝার উপায় নেই। বাড়ি থেকে বছর তিরিশের এক সুসজ্জিত যুবক মাঝেমধ্যে বেরোয়। জিজ্ঞেস করে জেনেছি তার নাম গণেশ।— মিঃ পাই এর অ্যাসিস্ট্যান্ট। কিন্তু কিসের অ্যাসিস্ট্যান্ট মিঃ পাই কী করেন তা নিয়ে যা জিজ্ঞেস করেছি— তার খুব সহজ উত্তর কখনও পাইনি। এটুকু শুধু জেনেছি মিঃ পাই হলেন সায়েন্টিস্ট। কিন্তু একটা মফসসল শহরে বসে— একা একা— কী নিয়ে বিজ্ঞানের গবেষণা করতে পারেন তা বোধগম্য হয়নি। আমাদের কল্যাণগড়ে বৈজ্ঞানিক কাজকর্ম বলতে আমরা যা বুঝি তা হল দু-একটা টিভি-ফ্রিজ-রেডিও সারাই-এর দোকান আর বোমা তৈরি।
মিঃ পাইকে কখনোই প্রায় বাড়ির বাইরে দেখা যায় না। লোকমুখে শোনা গেছে ভোর চারটে নাগাদ না কি মাঝেমধ্যে হাঁটতে বেরোন। সঙ্গে ওই গণেশও থাকে। আবার সাড়ে চারটে নাগাদ, সূর্য ওঠার অনেক আগে নাকি বাড়িতে ঢুকে আসেন। অবশ্য এ কথাটা যাদের মুখে শোনা গেছে—বলা বাহুল্য তারা নিজেরাও খুব স্বাভাবিক লোক নয়। তার মধ্যে জগা পাগলাও পড়ে। ও টের পেয়েছিল তার কারণ এক শীতের ভোরে মিঃ পাই ওর গায়ের উপর একটা দামি কম্বল ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলেন।
আমিও এ ধরনের এলাকের সঙ্গে আগ বাড়িয়ে আলাপ করার সাহস পাইনি। কে জানে কী ধরনের উটকো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ব। চারদিকে নানান ধরনের সন্ত্রাসমূলক কাজ হচ্ছে। কৌতূহল দেখিয়ে বিপদে পড়ার কোনও মানে হয়! আর মিঃ পাইকে দেখে এমনিতেও খুব স্বাভাবিক মানুষ বলে মনে হয় না। কিরকম বড় বড় চোখ, গোল কাচের চশমা দিয়ে ঢাকা। কাঁধ অবধি কাঁচা-পাকা ঝাঁকড়া চুল। সবসময় ব্যস্ততা। মুখে সর্বদা একগাল হাসি। এই এখনকার দিনে কেউ সারাক্ষণ হেসে যেতে পারে!
তা যা বলছিলাম। এটাই বলতে গেলে মিঃ পাই-এর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ। দশ বছর বাদে। তবে এবারেও দেখাটা খুব স্বাভাবিকভাবে হয়নি।
অষ্টমীর দিন সকালে উঠে দেখি কুচো উধাও। কুচো হল আমাদের বাড়ির পোষা ল্যাব্রাডর। মাস ছয়েক বয়স। ভারী দুষ্টু। চেনা, অচেনা যেই হোক না কেন, গাল চেটে দেবে। লাফিয়ে কোলে উঠে পড়বে। বলা বাহুল্য আমার বাড়িতে আসে এমন অনেকেই সেটা পছন্দ করে না। চেন দিয়ে বেঁধে রাখারও উপায় নেই। কুঁই-কুঁই কান্নার শব্দে আমাদের বিরক্ত করে তোলে।

তাই ওকে খোলাই রাখা হয়। কেউ আসার কথা থাকলে আগে থেকে চেন দিয়ে বাঁধা হয়। তা, এরকম একটা প্রাণবন্ত কুকুর হঠাৎ করে সকাল সকাল উধাও হয়ে যাবে, আর উধাও হয়ে যাওয়ার পরে কেউ নালিশ করতে আসবে না এটা খুবই অস্বাভাবিক।
সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজছি, হঠাৎ বাইরের দরজায় ধাক্কা। খুলে ভূত দেখার মতো দেখি দরজার সামনে গণেশ। যথারীতি সুসজ্জিত। কালো প্যান্ট, লাল-সাদা ডোরাকাটা শৌখিন শার্ট। তার উপরে ব্লেজার, ব্লেজারটা দেখেই চিনলাম। গতবছরে পাড়ার নাটক মাইকেল মধুসূদন-এ এ ব্লেজারটা চেয়ে নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল।
কোনওরকম সহবৎ না দেখিয়ে বেশ জমিদারি লেঠেলদের কায়দায় গণেশ বলে উঠল— স্যার আপনার খোঁজ করছিলেন। এক্ষুনি যেতে হবে।
—কী ব্যাপার?
ওকালতি করি। সে ব্যাপারে কোনও পরামর্শ? এরকম শাঁসালো মক্কেল হাতছাড়া করা একেবারেই উচিত নয়— তবু কুচোর কথা খেয়াল করে বলে উঠলাম—
—আমার কুকুরটাকে সকাল থেকে পাচ্ছি না। ওটার একটু হদিশ করে আসছি।
গণেশ নির্বিকারভাবে বলে উঠল,— কুকুরটা স্যারের কাছেই আছে। ও ব্যাপারেই ডাকছেন।
—সেকি! কাউকে কামড়ে-টামড়ে দিয়েছে না কি? সর্বনাশ, ও তো সেরকম নয়।
বলে মনে মনে ভাবলাম, আর কাউকে না কামড়ালেও মিঃ পাইকে কামড়ানোর অনেক কারণ থাকতে পারে।
গণেশ বলে উঠল— না, না, সেরকম কিছু না। আমিই সকালবেলা এখান থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলাম। স্যার বলেছিলেন।
—মানে? ঘরে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা ছিল। তার উপরে একটা হালকা শাল জড়িয়ে গণেশের পিছু নিলাম। গণেশের দশ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা স্পীডের হাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাশের বাড়ির গেট পেরিয়ে ওর সঙ্গে বাড়ির মধ্যে ঢুকলাম। বাগান পেরিয়ে বাড়িতে ঢোকার পরই সামনে বিশাল ড্রয়িংরুম। বই বোঝাই সার সার আলমারি। ঘরে দামি সোফাসেট।
—আপনি এই সোফাতে বসুন, আমি কুচোকে নিয়ে আসছি।
মিনিট দুয়েকের মধ্যে কুচো ঘরে ঢুকল। সঙ্গে গণেশ। আর একটা বিচ্ছিরি দেখতে কুচকুচে কালো বেড়াল। চোখদুটো একদম হলুদ। কুচো আমার কোলে উঠে পড়ে একবার আমার গালটা চেটে আবার নেমে গিয়ে বেড়ালটার পাশে গায়ে গা লাগিয়ে মেঝেতে বসল। অদ্ভুত কাণ্ড! বেড়াল দেখলে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করে, আর হঠাৎ এর সঙ্গে এরকম আদিখ্যেতা! আমার ডাকে কোনও সাড়া না দিয়ে নখ দিয়ে বেড়ালটার পিঠ চুলকোতে শুরু করল।
অবাক হয়ে কুচোর কাণ্ড দেখছি—তার মধ্যে মিঃ পাই ঘরে ঢুকলেন। সাদা পাজামার উপর ভারতীয় জাতীয় পতাকার রঙের পাঞ্জাবি। এসেই আমার উলটোদিকের সোফায় বসে প্রথমেই সে কথাটা বললেন তা হল এই—
—ক'দিন ধরে দেখেই মনে হয়েছিল আপনার থেকে আপনার কুকুরটা অনেক বেশি ইনটেলিজেন্ট। তাই এক্সপেরিমেন্টের জন্য সকাল সকাল ধরে আনলাম। আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়নি। কুকুরটা সত্যিই অসাধারণ। আমার ক্যাট ল্যাঙ্গোয়েজ ট্রান্সলেটর ব্যবহার করে ঠিক দু'ঘণ্টার মধ্যে বেড়ালের ভাষা দিব্যি তুলে নিয়েছে। ওই, ওই যে কুকুরটার কানের মধ্যে কালো ছোট সুইচের মতো জিনিসটা দেখছেন না, ওটাই হল ট্রান্সলেটর। বেড়ালটার মুখের কাছেও আছে। তবে কালো রঙের জন্য দেখা যাচ্ছে না। কি সুন্দর নিজেদের মধ্যে কথা বলছে দেখছেন। আর তাই তো দু'ঘণ্টার মধ্যে এত বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। ভাবুন তো বাড়ির কুকুর-বেড়ালের মধ্যে যদি সম্পর্ক ভালো করা যায়, কত বড় সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলাম— আপনি ভেবেছেনটা কী! আমাকে না জানিয়ে আমার বাড়ি থেকে আমার কুকুর ধরে এনেছেন— তার উপরে পরীক্ষানিরীক্ষা করছেন! ওর যদি কিছু হয়! আপনাকে জেলে পাঠাতে পারি জানেন?
মিঃ পাই বেশ অমায়িকভাবে হেসে বলে উঠলেন— তবে এখন থেকে কুচো কিন্তু আপনার কথার থেকে আমার কথাই বেশি শুনবে। আর আপনি না চাইলেও এখানে চলে আসবে।
তারপর গণেশের দিকে তাকিয়ে বললেন— কী হল? ওনার জন্য চিংড়ির কাটলেটটা এখনও এল না?
গণেশ কিছু বলার আগেই সুসজ্জিত বাবুর্চি ট্রেতে করে একটা ভারী সুন্দর প্লেটে দুটো বিশাল চিংড়ির কাটলেট আর চা নিয়ে ঢুকল।
বেশ অবাক হলাম। সত্যি বলতে কি, চিংড়ির কাটলেট আমার ফেভারিট। কিন্তু উনি তা জানলেন কী করে!
ভ্যাবাচ্যাকা ভাবটা কাটানোর আগেই মিঃ পাই বলে উঠলেন— কলকাতার মিত্র ক্যাফে থেকে কাল সন্ধেবেলা আপনার জন্য আনিয়েছি। আপনি আপনার স্ত্রী সঙ্গে কাল দুপুরে এই নিয়ে কথা বলছিলেন, তাই তো?
—হ্যাঁ, মানে— কিন্তু আপনি কী করে জানলেন?
—ওই আপনার জানলার উপরে লেসার ফেলে কুকুরটার কথা বোঝার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু তা কি আর শোনার উপায় আছে? আপনি আর আপনার স্ত্রী যা চিল চিৎকার করছিলেন! আমি তো স্পষ্ট শুনতে পেলাম আপনি বাড়িতে চিংড়ির কাটলেট বানাতে বলছেন আর আপনার স্ত্রী কিছুতেই তা করবেন না। ঠিক কি না? সত্যি বলতে কি এত ছোট ব্যাপার নিয়ে আপনার এতটা রাগারাগি করাটা মোটেও ঠিক নয়।
—আপনি তো ডেঞ্জারাস লোক মশাই! জানেন আমি আপনার বিরুদ্ধে এজন্য আইনি ব্যবস্থা নিতে পারি। এটা কী ধরনের ভদ্রতা!
মিঃ পাই কথাটা প্রায় উড়িয়ে দিয়ে বলে উঠলেন— না, না, এসব কথা নিয়ে একদম মাথা গরম করবেন না। এবার খেতে শুরু করুন। ঠান্ডা হয়ে গেলে ভালো লাগবে না।
সত্যি বলতে কি চিংড়ির কাটলেটে কামড় বসানোর পরপরই মাথাটা বেশ ঠান্ডা হয়ে গেল। মিঃ পাই কুচোর এরকম ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক কারণগুলো বোঝাতে শুরু করলেন। আর কথায় কথায় গতরাতে বাইক থামানোর কথাটা উঠতে বেশ সপ্রতিভভাবে তার কারণটাও বোঝালেন।
আধঘণ্টা বাদে কুচোকে নিয়ে বিদায় নিলাম। এটাই হল আমাদের প্রথম আলাপ। এটুকু বুঝলাম— আমার প্রতিবেশী ভালো না খারাপ সেটা জানি না, তবে পাগলাটে ও খুব ইন্টারেস্টিং মানুষ এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
———
প্রথম আলাপের পর থেকেই খুব ইচ্ছে ছিল আবার মিঃ পাই-এর বাড়ি যাব। কিন্তু না বলে কয়ে তো আর যাওয়া যায় না। যদিও কুচোর মধ্যে সেই বোধ একেবারেই নেই। বেশ টের পাই মাঝেমধ্যেই পালিয়ে ও বাড়ি চলে যায়। শেষে কুচোকে সঙ্গে নিয়েই একদিন হাজির হলাম মিঃ পাই-এর বাড়ি। শনিবার সকালের দিকে। গেটের সামনে মনে হয় ক্যামেরা আছে। সামনে এসে দাঁড়ানো মাত্র গেট খুলে গেল। ঢোকার পথে বড় বাগান। তার মধ্যে দিয়ে এক চিলতে ইট বাঁধানো পথ। সেটা পেরিয়ে বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়াতেই দরজা খুলে গেল। গণেশই খুলল। সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, লাল টাই। একদম অফিসের পোশাক। এরকম মফসসল শহরে এ ধরনের পোশাক পরে থাকতে কাউকে দেখিনি। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে কুচো দুলাকে ভিতরে কোথায় উধাও হয়ে গেল।
আমাকে নিয়ে গণেশ ড্রয়িংরুমে বসালো। আর তারপরেই মার্জিতভাবে বলে উঠল— আজকে কিন্তু স্যার খুব ব্যস্ত। দেখা করতে পারবেন না। কিছু বলার আছে?
আমি একটু বিব্রত হয়েই বলে উঠলাম— না, না সেরকম কিছু নয়। ভাবলাম, সেদিন আলাপ হল। আজকে একটু সময় আছে, দেখা করে আসি। কেমন আছেন উনি?
গণেশ কাঠ কাঠ ভাবে বলে উঠল— ভালোই আছেন। আসলে স্যার গত এক সপ্তাহ এত ব্যস্ত আছেন টেসলার এক্সপেরিমেন্টটা নিয়ে —ল্যাবেই দিনরাত পড়ে থাকেন।
—গণেশ, অবিনাশবাবু এসেছেন, বলিসনি তো!— বলতে বলতে মিঃ পাই হঠাৎ ঘরে ঢুকলেন। আজ পুরোদস্তুর সাহেবি পোশাকে। সুট-টাই।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, — চলুন। ভালো সময়ে এসেছেন। ল্যাবে চলুন। আপনাকে একটা মজার জিনিস দেখাই।
ওনার এত তাড়া দেখে একটু অবাক হয়ে মিঃ পাই-এর পিছন পিছন এগিয়ে গেলাম। একটা ঘর থেকে আরেকটা ঘর। নানান ধরনের অজানা অচেনা যন্ত্র সাজিয়ে রাখা বেশিরভাগ ঘরে। বেশ কটা ঘর পেরোনোর পরে মিঃ পাই এর পিছু পিছু একটা বড় ঘরে ঢুকলাম। ঘরের মাঝখানে একটা মানুষ-প্রমাণ লোহার খাঁচা। খাঁচাটার থেকে কয়েক ফুট দূরে দু'ধারে দুটো তারের জালি দাঁড় করানো।
—একটা মজা দেখবেন। ওই খাঁচার মধ্যে গিয়ে দাঁড়ান।
আমি অবাক হয়ে বললাম— আমি? ওই খাঁচার মধ্যে?
—হ্যাঁ, ঢুকুন। তারপরে বলছি।
— মিঃ পাই এর বলার মধ্যে কী ছিল জানি না, —বোকার মতো খাঁচাটার মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালাম। খাঁচাটা হাইটে আমার থেকে ইঞ্চি দুয়েক বড়। চুল তাই লেগে যাচ্ছে।
একটু হাত পা ছড়াব সেরকম জায়গাও নেই। কোনওরকমে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
মিঃ পাই খাঁচার দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিলেন।
বললেন— আপনি সেটার মধ্যে, দাঁড়িয়ে আছেন, ওটা হল ফ্যারাডের খাঁচা। অবশ্য তার ওপর আমি বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছি। আর সেটাই আমার আবিষ্কার। বলে পাশের একটা সুইচ বোর্ডের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন—
—এই সুইচটা অন করলে খাঁচার দুধারে রাখা ওই কয়েলগুলো মিলিয়ন ভোল্টে চার্জড হয়ে উঠবে আর খাঁচার মধ্যে দিয়ে ইলেকট্রিক স্পার্ক চলে যাবে। একে বলে টেসলা এফেক্ট। জানেন তো? বাতাসে স্ট্যাটিক ইলেকট্রিসিটির জন্য এটা হয়।
আমি চমকে উঠলাম।
—তার মানে? আমার মধ্যে দিয়ে ইলেকট্রিক স্পার্ক চলে যাবে?
মিঃ পাই আমার কথায় কোনও ভ্রুক্ষেপ না করে সুইচের উপর হাত রেখে বললেন—
—না, আপনার কিছু হবে না। আপনি যে খাঁচাটার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন, সেটা আপনার থেকে অনেক ভালো তড়িৎপরিবাহী। তাই খাঁচাটার মধ্যে দিয়ে যাবে। আপনি স্পার্ক দেখতে পাবেন, আপনার দিকে ছুটে আসবে।
খাঁচা থেকে বেরোনোর চেষ্টা করতে যাচ্ছিলাম। মিঃ পাই বলে উঠলেন— খবরদার! বেরোবেন না। খাঁচার মধ্যে পুরো নিরাপদ। বেরোলেই মুহূর্তে পুড়ে ছাই হয়ে যাবেন।
শুনে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার চুল, হাত, পা মাঝেমাঝেই খাঁচার গায়ে লাগছিল। বললাম—
—খাঁচার গায়ে তো হাত লেগে যাচ্ছে। কোনও অসুবিধে হবে না তো?
—খাঁচার কোনও অংশে হাত না দেওয়াই ভালো। কিসে যে কী হয়!
আর্তনাদ করে উঠলাম— কিন্তু হাত তো লেগে যাচ্ছে। কোনও উপায় নেই।
মিঃ পাই বললেন— এখন আর কিছু করা যাবে না। তা সঙ্গে মেটাল কিছু নেই তো?
—মানে? আমার সঙ্গে ঘড়ি, সেলফোন এসব তো রয়েছে!
মিঃ পাই চুকচুক আওয়াজ করে ওনার লাল টাইটা ঠিক করতে করতে বলে উঠলেন— নাহ, কাজটা ঠিক হল না, আগেই চেক করা উচিত ছিল। এ সব এক্সপেরিমেন্টে কখন যে কি হয়!
চেঁচিয়ে উঠলাম। কিন্তু ততক্ষণে বাতাসের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ কিছুক্ষণ আমার দিকে ছুটে আসছে। তীব্র চোখ ঝলসানো আলো তারপর কি হয়েছিল জানি না।
জ্ঞান যখন ফিরল তখন দেখি একটা খাটে শুয়ে আছি। পাশে মিঃ পাই দাঁড়িয়ে। আমাকে আশ্বস্ত করে বলে উঠলেন—
—আরে, এত ভয় পেলে হবে? ভয়ে অজ্ঞানই হয়ে গেলেন! এ ধরনের এক্সপেরিমেন্টে মারা যাওয়ার ঘটনা খুবই কম। লং টার্ম মেমারি বাড়াতে এটা খুব সাহায্য করে। তাই তো এই যন্ত্রটা তৈরি করেছিলাম। ভালোই হল আপনার উপর পরীক্ষাটা হয়ে গেল। ঠিক সময়ে এসেছিলেন বলে।
কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলাম না। তবে এটা সত্যি— হঠাৎ করে স্কুলের দিনগুলো মনে পড়ে গেল। আর শুধু মনেই পড়ল না। বেশ ভালোরকম ডিটেলসও মনে পড়ল। যেমন ফিজিক্সের টিচার জীবনবাবুর সে প্রশ্নটা না পারার জন্য হাতে স্কেলের বাড়ি খেয়েছিলাম— সে প্রশ্নটাও।
মিঃ পাই পাশ থেকে বললেন— বাঙালি মানেই ভিতু। আচ্ছা, বলুন তো, মারা যাবার প্রোবাবিলিটি খুব বেশি হলে কি আপনাকে ওখানে ঢুকে দাঁড়াতে বলতাম? আর তাছাড়া বিজ্ঞানের স্বার্থে সামান্য আত্মত্যাগ করতেই হয়। গণেশটাও দিনকে দিন ভিতু হয়ে যাচ্ছে। ওকেই বলেছিলাম ভিতরে যেতে। আমার নিজের পক্ষে আর ওখানে ঢুকে কিছু করা সম্ভব নয়। নোটস নিতে হবে।
পাশ থেকে গণেশ কিন্তু কিন্তু করে বলে উঠল— স্যার আমার আর কোনও অসুবিধে ছিল না। কিন্তু লাস্টবার আমার মাথার চুলে আগুন ধরে গিয়েছিল কি না!
—দ্যাটস দ্য প্রবলেম, একটুকুতেই ভয় পেয়ে যাও। চুল থাকলেই বা কি, না থাকলেই বা কি! এতবড় একটা এক্সপেরিমেন্ট!— মিঃ পাই ধমকে বলে উঠলেন।
হাত-পা অবশ লাগছিল। তবু তার মধ্যেই মাথায় হাত দিলাম। নাহ, চুল এখনও আছে।
গত কয়েক সপ্তাহে কানা হেবোর বাড়াবাড়িটা সত্যিই বেড়েছে। রাজনীতিতে দাদা হলে যেন চারটে হাত আর চারটে পা হঠাৎ করে গজিয়ে যায়। এমনিতেই সবাই হেবোকে ভয় পেত। এখন এ এলাকার ত্রাস। বোমা তৈরি করতে গিয়ে ওর একটা চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাই থেকে নাম কানা হেবো। শুনলাম ছেলেদের হাইস্কুলের হেডস্যার বিপিনবাবুকে সবার সামনে চড় মেরেছে। সবজিওয়ালা সবজির দাম চাওয়ায় সেই গরিব লোকটাকে সবার সামনে জুতো পেটা করেছে। মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার পথে একটা চাতালে বেশিরভাগ সময় দলবল নিয়ে বসে থাকে, টীকা-টিপ্পনী কাটে। কারও সাহসও নেই কোনওরকম প্রতিবাদ করার।
সেদিন দলবল নিয়ে আমার বাড়িতে চড়াও হল। কালীপুজোর চাঁদা। হাজার টাকা। আমি বিলটা দেখে একটু গাঁইগুঁই করতেই বলে উঠল— দু'হাজার হয়ে গেল। আরেকবার বললে চার করে দেব।
কথা বাড়ালাম না, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে টাকাটা এনে দিলাম।
এর দু'দিন পরের কথা। রাত আটটা নাগাদ শুনি বাইরে বেল বাজছে। বেশ শীত পড়তে শুরু করেছে। এসময়ে এখানকার লোক সাধারণত অন্যদের বাড়িতে যায় না। ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে দেখি, বাইরে গণেশ। আমাকে দেখে বলে উঠল—
স্যার কালকে আমাকে ভোর পাঁচটায় পুকুরপাড়ের বুড়ীগাছতলায় আসতে বলেছেন। ওখানে যে শীতলার থান আছে সেখানটাতে।
—ভোর পাঁচটায় কেন?
—না, মানে উনি একটা এক্সপেরিমেন্ট করছেন। বললেন আপনার ভালো লাগবে।
ব্যস্ত হয়ে বলে উঠি— না, না অত ভোরে আমি কোথাও যাব না।
গণেশ হেসে বলল— না, না। এবার আপনার উপর পরীক্ষা নয়। গিয়ে দেখবেন। মজা পাবেন। না গেলে খুব মিস করবেন। — বলেই হাঁটা দিল।
আমি ঠিকই করেছিলাম যে যাব না। কিন্তু তবু কেন জানি পৌনে পাঁচটায় উঠে পড়লাম। গায়ে একটা শাল জড়িয়ে টর্চ হাতে বুড়ীগাছতলার দিকে হাঁটা দিলাম।
পাঁচ মিনিটের পথ। শীতের রাত চট করে শেষ হয় না। বাইরে বলা যায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাতে আবার এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। টর্চ জ্বালিয়ে জল-কাদা পেরিয়ে পৌঁছতে মিনিট দশেক লাগল।
বুড়ীগাছতলায় যখন পৌঁছলাম পুবের আকাশে সামান্য রঙ লেগেছে। কিছু পাখির ডানা ঝটপটানির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। একটা বিশাল অশ্বত্থ গাছ— তার নীচে শীতলার থান। তাকেই আমরা বুড়ীগাছতলা বলি। হঠাৎ দ্রুত পায়ের শব্দ পেলাম। গণেশকে নিয়ে মিঃ পাই কোথা থেকে যেন হঠাৎ করে উদয় হলেন। দেখলাম গণেশ রীতিমতো হাঁপাচ্ছে। আর মিঃ পাই ধমকের সুরে বলছেন—
—এই সামান্য বয়সে জোরে হাঁটতে গিয়ে হাঁফিয়ে যাচ্ছ গণেশ! নাহ, তোমার কিছু একটা ব্যবস্থা করতেই হবে।
এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন— আমাদের আরও পাঁচমিনিট অপেক্ষা করতে হবে। আপনার এক বিশেষ বন্ধু আসবে।
—আমার বন্ধু! কে?
—আরে, ধৈর্য ধরুন। সবুরে মেওয়া ফলে।
মিঃ পাই এর হাতে একটা টর্চ মতো কিছু। যদিও সাইজটা বেশ বড়। প্রায় একফুট লম্বা।
আমরা কথা বলছি, তার মধ্যে দেখি বিপিনবাবু আসছেন। কল্যাণগড় হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। খুবই নিরীহ প্রকৃতির মানুষ। সেদিন ছাত্রদের সামনে কানা হেবোর কাছে চড় খেয়ে অপমানে কেঁদে ফেলেছিলেন। তারপর থেকে আর স্কুলে যাচ্ছেন না। তা উনি হঠাৎ এই ভোর রাতে এখানে!
মিঃ পাই বিপিনবাবুকে দেখে বললেন— শরীর ঠিক আছে তো স্যার? আপনাকে সকাল সকাল এখানে ডাকলাম, তার একটা বিশেষ কারণ আছে। দু-পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বুঝতে পারবেন কেন ডেকেছি।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। দু মিনিটের মধ্যে শুনি ভারী পায়ের শব্দ এদিকে এগিয়ে আসছে। হঠাৎ করে আবছা আলোতে আগন্তুকের মুখ দেখে চমকে উঠলাম। কানা হেবো। ভয়ে বিপিনবাবুর মুখ সাদা হয়ে গেছে। কানা হেবোর হাতে একটা থলি। আমাদের দেখে কড়া গলায় বলে উঠল—
—এসবের মানে কী মিঃ পাই? বলা হয়েছিল একা আসতে। বন্দুক লাগবে। টাকা কোথায়?
একটু থেমে আবার ধমকে উঠল— একটু চালাকি হয়েছে কি, সবকটাকে মেরে মাটির নীচে পুঁতে ফেলব। এরা এখানে কী করছে?
মিঃ পাই বেশ সপ্রতিভভাবে এগিয়ে গেলেন হেবোর দিকে। তারপর বললেন— না, না— বন্দুক তো কিনবোই। তার আগে— একটু দেখি ভাই— বলে চেষ্টা করলেন সেটার জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। ওনার হাতের টর্চের মতো জিনিসটার থেকে একটা ফ্ল্যাশ হেবোর মুখের উপর গিয়ে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে হেবোর বিশাল চেহারাটা ছিটকে দু ফুট দূরের মাটিতে গিয়ে পড়ল।
বলে উঠলাম— সর্বনাশ! মেরে ফেললেন না কি?
—না, না। দু'মিনিটের মধ্যে জ্ঞান ফিরবে। তখনই দেখব এক্সপেরিমেন্টটা কাজ করে কি না। বলে গণেশের দিকে তাকিয়ে বললেন—
—ঠিক যন্ত্রটা নিয়েছিলে তো?
গণেশ দেখি কাঁদো কাঁদো মুখে বলে উঠল— আসলে ঘরে আলো কম ছিল তো— ঘুম ঘুম ভাবটাও ছিল। তাই টেবিলের উপর যেটা ছিল সেটাই নিয়ে—
মিঃ পাই গম্ভীর মুখে বললেন— না, না। আরেকটু কেয়ারফুল হওয়া উচিত ছিল গণেশ। ঠিক যন্ত্রটা না হলে আমাদের কাজ কী অবস্থা হবে বুঝতে পারছ? এই মাটির নীচে।
এর মধ্যে দেখি হেবো উঠে বসেছে। গোল গোল চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর যেটা করল সেটার জন্যও আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। অন্তত আমি আর বিপিনবাবু তো নই ই।
হামাগুড়ি দিয়ে বিপিনবাবুর দিকে এগিয়ে গিয়ে নীলডাউন হয়ে বসল। তারপর কান ধরে বলে উঠল— স্যার আর কখনও অঙ্ক টুকবো না। মাফ করে দিন স্যার।
বিপিনবাবু তখনও আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, মিঃ পাই বলে উঠলেন— এটা আমার ছোট্ট একটা আবিষ্কার। ওই একটা ফ্ল্যাশে ওকে পাঠিয়ে দিয়েছি কুড়ি বছর আগে। তখনও বোধহয় ক্লাস নাইনে পড়ত। আর আপনি ছিলেন অঙ্কের টিচার। ও সেকথাই বলছে।
হেবো ইতিমধ্যে কান ধরে ওঠবোস শুরু করেছে। মিঃ পাই গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন— পরীক্ষায় বই দেখে দেখে অঙ্ক টুকেছিলে— কেন? এর শাস্তি কী জান?
—হ্যাঁ জানি স্যার। আর কোনওদিন করব না। ওই শান্তনুই আমাকে বলল। অঙ্কের বইটা ওই ক্লাসে নিয়ে এসেছিল।
—আর লাস্ট বেঞ্চে বসে দুজনে মিলে বই দেখে অঙ্ক টুকেছো— তাও আবার ভুল অঙ্ক।
বিপিনবাবু গম্ভীরভাবে ধমকের সুরে বলে উঠলেন— সারাবছর ফাঁকি দেওয়ার ফল। কতবার বলেছি যে অঙ্ক এমন একটা জিনিস যে সারাবছর না করলে মাথায় ঢোকে না।
—আর করব না স্যার! — ভেউ ভেউ করে কাঁদতে শুরু করেছে হেবো।
বিপিনবাবু উৎসাহিত হয়ে হেডটিচারের মেজাজে কানটা ধরে আচ্ছা করে মুলে দিলেন। তারপর বললেন—
—এক পা তুলে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক।
হেবো তা-ই করল।
আমি পাশ থেকে মিঃ পাইকে জিজ্ঞেস করলাম— আমিও কি দু-একটা চড় থাপ্পড় মারতে পারি?
—হ্যাঁ, হ্যাঁ, মারুন না।
আমিও সপাটে একটা চড় মারলাম গালে। কয়েকদিন আগে স্কুলে যাবার পথে আমার মেয়েকে উলটোপালটা কথা বলে বিরক্ত করছিল। অন্য গালটাতেও আর একটা চড় মারলাম। কালীপুজোর চাঁদাটার কথা মনে করে।
হেবো দেখি বাচ্চা ছেলের মতো কান ধরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে। আর মাঝেমধ্যে পা পালটে ব্যালান্স রাখার চেষ্টা করছে।
মিঃ পাইকে জিজ্ঞেস করলাম— তা ও এখন থেকে এরকমই থাকবে? ক্লাস নাইনের ছাত্রে অবস্থায়?
—না, না, এ তো একটা এক্সপেরিমেন্ট। এক-দেড় ঘণ্টা বাদে আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, মস্তিষ্কের অ্যামিগডেলা থেকে পুরনো স্মৃতি যেভাবে জাগিয়ে দিয়েছি তাতে স্বভাব খানিকটা পালটাবে আশা করি। এ যন্ত্রটার নাম দিয়েছে কৈশোরের হামাগুড়ি'। এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি।
উদ্বিগ্ন হয়ে বলে উঠলাম— তার মানে? এই যে চড় মারলাম— মানে দু দুটো চড়— সেটা কি মনে থাকবে? তাহলে তো আমার সর্বনাশ! আমাকে তো আর আস্ত রাখবে না।
মিঃ পাই খুব গম্ভীর হয়ে বলে উঠলেন— আমাদের মস্তিষ্ক খুবই জটিল। এসব নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করলে তো ঠিকভাবে বলা যায় না— কী মনে থাকবে আর কী মনে থাকবে না! তবে হ্যাঁ, মনে থাকলে আমাদের সবারই একটু বিপদ তো হবেই। আপনার তো আরও বেশি। এমনিতেও অত জোরে চড় মারাটা উচিত হয়নি। চলুন, যাওয়া যাক। আমার ওর কান্না শুনতে একদমই ভালো লাগছে না। হেবো এখানেই কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকুক।
তারপর গণেশের দিকে তাকিয়ে বললেন— চলো, চলো গণেশ। বাড়িতে গিয়ে আজ অনেক কাজ। তোমাকে আবার আজকে একটা চিলের বাচ্চা ধরে আনতে হবে।
যাওয়ার আগে পাশে পড়ে থাকা থলেটা হাতে নিয়ে মিঃ পাই একবার ভিতরটা দেখলেন। তারপর বলে উঠলেন—
—দেখেছো!— চাইতে না চাইতেই পাঁচটা বিদেশি রিভলভার হাজির। ভালো দাম দেব বলেছিলাম। এগুলো সব পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে। বলে থলেটা নিয়ে তড়তড়িয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। পিছনে পিছনে গণেশ।
আমি আর বিপিনবাবুও বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। এখানে কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে কে জানে! এমনিতেই মিঃ পাই যা বললেন তাতে হার্টবিট বেড়ে গেছে। শেষে অন্য জায়গায় না বাড়ি খুঁজতে হয়। চড় খাওয়ার কথা মনে পড়লে হেবো আমাকে সহজে ছাড়বে না।
এর কিছুদিন পরের কথা। বলতে নেই এখনও বেশ সুস্থ শরীরে বেঁচে-বর্তে আছি। কানা হেবো পাড়ার মোড়ে একটা বইয়ের দোকান খুলেছে। তবে বিক্রিবাটা কিরকম হয় জানিনা। কারণ যখনই দোকানের সামনে দিয়ে যাই, দেখি একমনে অঙ্ক কষছে। সেদিনের ঘটনা ও মনে রেখেছে বলে মনে হয় না।
একদিন আমি আর বিপিনবাবু সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, আমাদের দেখে ছুটে এল। বিপিনবাবুকে প্রণাম করে বলে উঠল—
—স্যার, আসুন, একটু চা খেয়ে যান। আর যদি দু-একটা চক্রবৃদ্ধির অঙ্কও দিয়ে দেন। দিনরাত অঙ্ক করছি। দেখবেন, আমি আগের থেকে অনেক ভালো পারছি।
চা-মিষ্টি খেয়ে— কিছু অঙ্ক করতে দিয়ে আমরা বিদায় নিলাম। হেবোর অঙ্কের স্ট্যান্ডার্ড ভালো হয়েছে, সন্দেহ নেই।
মিঃ পাই এর সঙ্গে সে দিনের পরে আর দেখা হয়নি। তবে আজ সন্ধেবেলা দরজার নীচে একটা কাগজের টুকরো পেলাম।
আগামী পরশু রাত চারটের সময় আমার বাড়িতে আসবে। খুব দরকারি কথা আছে। কাউকে জানাবেন না, আপনার স্ত্রীকেও নয়।
—মিঃ পাই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন