নিয়ম যখন ভাঙে

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

কাচের জানলার বাইরে তাকাল দীপন। বাইরে নীল আকাশ। যেন ছবির পাতা থেকে উঠে এসেছে। দূরে কম্পাউন্ডের দেওয়ালের উপর একটা চিল বসে আছে। কি যেন দেখে, ডানা দুটো স্থির রেখে কম্পাউন্ডের মধ্যে একপাক খেয়ে বাইরে চলে গেল। ইস, দীপনও যদি এত সহজে এই 'আরওগ্য'-র বাইরে যেতে পারত!

ছোট থেকে ও এখানেই আছে। ও একা নয়— ওর বয়সি, ওর থেকে বড় আরও অনেকে আছে। ওরা প্রত্যেকেই ক্লোন। ছোটবেলা থেকে ক্লোনদের সরল নীতি ও রোজ মুখস্থ করে এসেছে। প্রথম নীতি— ক্লোনদের জীবনের একটাই উদ্দেশ্য। তার জিনদাতাকে রক্ষা করা— প্রয়োজন মতো নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দানের মাধ্যমে। দ্বিতীয় নীতি-ক্লোনদের তার নিজের জীবন রক্ষার অধিকার থাকবে ঠিক ততক্ষণ, যতক্ষণ না প্রথম নীতির জন্য সে অধিকার ভাঙতে হয়। ক্লোনদের যাবতীয় খরচ তার জিনদাতাই বহন করে। পরিবর্তে, যখন দরকার হয় তখনই জিনদাতা ক্লোনের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ব্যবহার করতে পারে।

ওদের এখানে তাই অন্য জগৎ। ওরা বাইরের কারুর সঙ্গে মেশে না। বাইরের কোনও খবর রাখতে দেওয়া হয় না। সবকিছু নিয়মে বাঁধা। সময় বেঁধে পড়া, স্বাস্থ্যচর্চা, খেলা, খাওয়া, ঘুমোনো। সুস্থ না থাকলে অঙ্গদান করবে কি করে! সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু দেড়বছর আগে এই 'আরওগ্য'তে একজন লোক এসেছিল— সবার জন্য চকলেট, মিষ্টি এসব নিয়ে। কোনও একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে কাজ করে। ওই লোকটা বেশ কয়েকটা গল্প বলেছিল। তারমধ্যে একটা ছিল বাবা-ছেলের গল্প। ছেলের মৃত্যুর ভুল খবর পেয়ে সে লোকটা যুদ্ধক্ষেত্রে সব অস্ত্রশস্ত্র ফেলে দিয়ে শত্রুসেনার হাতে মৃত্যুবরণ করেছিল। এটা শোনার পর দীপন শম্ভুকে জিজ্ঞাসা করেছিল— বাবা কি হয়?

শম্ভু ওদের সবার দেখাশোনা করে। রোবট। ও বলেছিল—

—আমি কি জানি! আমি হলাম মুখ্যুসুখ্যু রোবট। আমাদের কি আর বাবা হয়? তবে বাবারা খুব ভালো হয়, একথা আমি শুনেছি।

—আমাদের বাবা হয় শম্ভুদা?

—হ্যাঁ, হয় বইকি! তোমরা তো মানুষ। যার থেকে জিন নিয়ে তোমায় তৈরি করা হয়েছে— তুমি যার ক্লোন— সেই তো তোমার বাবা।

—বাবা এখানে কখনও আসে না কেন শম্ভুদা?

—সে কি আর আমি জানি? এটাই নিয়ম।

এর বেশি আর কোনও উত্তর পায়নি দীপন। এটাই নাকি পৃথিবীর নিয়ম। এটাই আরোগ্যের নিয়ম।

হঠাৎ শম্ভু এসে ঘরে ঢোকে, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও। তোমার বাবা আসবে।

—বাবা? এত অবাক দীপন আগে কখনও হয়নি। শম্ভুর কথায় বিশ্বাস হল না দীপনের— সত্যি বলছ শম্ভুদা?

—হ্যাঁ, নয়তো কি? এই তো স্যার জানাতে বললেন বলেই এলাম। খানিকক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বেন— বলে শম্ভু ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওর আরও অনেক কাজ আছে। এই আরোগ্যতে যে চৌত্রিশ জন বাসিন্দা আছে তাদের সবার দেখাশোনার ভার শম্ভু আর হরির ওপর। তাই একফোঁটা সময় নেই ওর।

দীপন খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। আনন্দে কি করবে ঠিক করতে পারে না। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। প্যাসেজ দিয়ে ছুটতে শুরু করে। হাতদুটো প্লেনের ডানার মতো ছড়িয়ে। প্রথমেই ছুটে এসে ঢোকে অনিমেষ জ্যেঠুর ঘরে। অনিমেষ জ্যেঠুই দীপনের সবথেকে বন্ধু। সবরকম খবর তাই প্রথমে অনিমেষ জ্যেঠুকেই শোনায় দীপন।

—জ্যেঠু, জ্যেঠু-বাবা আসবে। শম্ভুদা বলল।

যতটা খুশি হওয়ার কথা— অনিমেষ জ্যেঠু সেরকম কিছুই খুশি হল না।

—কি, ফোন করেছিল?

—তা জানি না—শম্ভুদা জানে। তবে আসছে শিওর।

—শম্ভু আর কিছু বলেছে? কেন আসবে?

দীপন মাথা নাড়ল। বাবা আসছে। এটাই বড় কথা। কেন আসছে তা নিয়ে দীপনের কোনও মাথাব্যথা নেই।

অনিমেষ জ্যেঠু দীপনের চুলে হাত বোলাতে বোলাতে আনমনে কি যেন ভাবতে লাগল। অনিমেষের বয়স পঞ্চান্ন। এই পঞ্চান্নটা বছর ও কাটিয়েছে 'আরোগ্য'-র চার স্কোয়ার মাইল এলাকার মধ্যে। ওর একরঙা জীবনে ও বাবার দেখা পেয়েছে মাত্র দু'বার। শেষবার বছর পনেরো আগে। কিডনি অপারেশনের সময়। ওর কিডনি ওর বাবার কাজে লেগেছিল। দিতে পেরে খুশিই হয়েছিল ও। এ জন্যেই তো ওর বেঁচে থাকা।

তবু অনিমেষের মাঝেমধ্যে খটকা লাগে। ওর বাবার নাম অরিজিৎ। দেখতে ঠিক ওরই মতো। হওয়ারই কথা। ওর জিনের গঠন তো হুবহু ওর বাবারই মতো। কিন্তু ওই চেহারাতেই যা মিল। ওর বাবা একটা ব্যাঙ্কে খুব উঁচু পোস্টে কাজ করেন। সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ান। আর অনিমেষ! অনিমেষের সারাজীবন কেটেছে এই 'আরোগ্য'-র চার স্কোয়ার মাইলের মধ্যে।

এই আরোগ্য-তে কোনও বই নেই, ইন্টারনেট নেই, কোনও কিছু জানার অধিকার নেই। কম্পাউন্ডের বাইরে যাওয়ারও অনুমতি নেই।

অনিমেষ অবশ্য এখন এই জীবনেই অভ্যস্ত। কিন্তু দীপনের কথাটা মনে হতেই মনটা কেমন যেন করে উঠল। ওর পঞ্চান্ন বছরের জীবনে অনেকবার ও দেখেছে ওর ক্লোজ বন্ধুরা বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আর ফেরেনি। পরে শুনেছে দ্বিতীয় নীতির কথা। প্রাণ দিয়ে জিনদাতাকে বাঁচানোর মহৎ গল্প।

অনিমেষ উঠে দাঁড়াল— শম্ভুর কাছে খোঁজ নিতে। কেন দীপনের বাবা আসছে তা জানা দরকার।

দীপন ততক্ষণে ছুটেছে বিল্টু, চয়ন, অর্ণব-এর কাছে। প্রথমেই বিল্টুর সঙ্গে দেখা। দাঁত ব্রাশ করছিল। বিল্টুকে খানিকটা চমকে দিয়েই দীপন বলে উঠল— 'জানিস শম্ভুদা বলল বাবা আসবে।' বিল্টুর বয়সও দীপনের মতোই, ওরও আজ অবধি বাবার সামনাসামনি হওয়ার সুযোগ হয়নি।

খবরটা এতই অবাক করার মতো যে কোনওরকমে পেস্টটা গিলে ফেলে ও বলে উঠল— বলিস কিরে! দাঁড়া, রাতুলকে খবরটা দিই।

দুজনে মিলে রাতুলের ঘরে ছুটল। রাতুল ডেস্কে বসে খাচ্ছিল। কথাটা শুনে মুখ ভেংচে বলে উঠল— সে আবার বড় কথা কি? আমার বাবাও তো তিনমাস বাদে আমার জন্মদিনে আসবে বলেছে।— বলে আবার খাওয়ায় মন দিল। রাতুল এরকমই। একটু হিংসুটে প্রকৃতির।

ইতিমধ্যে দীপনের ফোনটা বেজে উঠেছে। শম্ভুদার ফোন।

—শোন, ডাক্তারবাবু এসেছে। তোমার টেস্ট করবে। এই ডাক্তারবাবু লোকটাকে দীপনের একেবারেই পছন্দ নয়। এলেই এই ভ্যাকসিন— ওই ভ্যাকসিন— সারাক্ষণ ইঞ্জেকশানের সিরিঞ্জ নিয়ে ঘোরে।

—কেন শম্ভুদা? এই তো সেদিন ডাক্তারবাবু টেস্ট করে গেল।

—আহা, আমি কি আর শতশত জানি! আমি হলাম গে মুখ্যুসুখ্যু রোবট। তুমি হল ঘরে চলে এসো।

অগত্যা দীপন ধীরে সুস্থে হল ঘরের দিকে এগোল। ডাক্তারবাবু যথারীতি সুট-টাই পরে এসেছে। দীপনকে দেখামাত্র বলে উঠলেন— ভয় পেও না দীপনবাবু। টুক করে কয়েকটা টেস্ট সেরে নেব। টেরও পাবে না।

মিনিট পনেরো টেস্ট করে ডাক্তারবাবু দীপনের পিঠ চাপড়ে বলে উঠলেন— পারফেক্ট। সব ঠিক আছে। অনিমেষ জ্যেঠু পাশেই দাঁড়িয়েছিল। বলে উঠল— ডাক্তারবাবু কি ট্র্যান্সপ্লান্ট হবে?

—হার্ট।

সে কী? তাহলে দীপনের কী হবে?

—আপাতত শুয়োরের হার্ট বসিয়ে দেব। ভয় নেই। এরকম কেস আকছার হচ্ছে। দীপন দুদিনেই আবার ছুটবে।

দীপনের অবশ্য এসবে কোনও ভয় নেই। ওর একটাই চিন্তা— বাবা শেষমেষ আসবে তো? তা না হলে রাতুল যা পিছনে লাগবে!

ঘরে গিয়ে চট করে চান করে জামাকাপড় পরে নিল দীপন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার নিজের চেহারাটা দেখে নিল। বাবাকে কি একইরকম দেখতে? নীল বলছিল বাবাদের গোঁফ থাকে। পেন দিয়ে একটা গোঁফ এঁকে নিল দীপন। ইস মোটেও ভালো লাগছে না। অনেক লম্বা? আয়নার মতো? রাগী নয় তো! একটু যেন ভয় লাগল দীপেনের। বই-জামা কাপড় সব গুছিয়ে রাখল। যদি ঘরে আসে! পরশু শেখা ইংরেজি কবিতাটা দু'বার আওড়ে নিল। বাবাকে শোনাতেই হবে। আর একটা গল্প বলতে পারলে আরও ভালো হত। অনিমেষ জ্যেঠু যে ভূতের গল্পটা বলেছিল সেটা অবশ্য খানিকটা মনে আছে।

দীপনের এই ব্যস্ততার মাঝে হঠাৎ শুভ এসে হাজির।

—এ্যাই, শুনলাম তোর বাবা আসছে?

—হ্যাঁ, এই এক্ষুনি এসে পড়বে।

— তা, বাবাকে কী দিবি?

—হার্ট। পট করে বলে ফেলল দীপন।

—আরে ও দেওয়া নয়— কোনও গিফট দিবি না?

তাই তো! একথাটা তো একদমই খেয়াল হয়নি। কিন্তু কী দেওয়া যায়?

জিজ্ঞেস করতে শুভ বেশ গম্ভীর হয়ে বলে উঠল— চশমা, আসলে শুভ ওর বাবাকে এক ছবিতে চশমা পরতে দেখেছে। তাই ওটাই আগে মনে এল।

কিন্তু দীপন চশমা এখন কোথায় পাবে? অনেক ভেবে ও ঠিক করল যে একটা ছবিই এঁকে দেবে। রং-পেনসিল নিয়ে আঁকতে বসে গেল ও। কতক্ষণ আঁকছিল কে জানে? হঠাৎ হুঁশ ফিরল। বাবার আসতে এত দেরি হচ্ছে কেন? ছুটে চলল শম্ভুদার কাছে।

—শম্ভুদা, বাবা কখন আসবে?

—বলল তো ফোনে জানাবে। দাঁড়াও ফোন করে দেখি।

ফোন খানিকক্ষণ বেজে গেল। কেউ ধরল না।

—দাঁড়াও, পরে আবার ফোন করব। তুমি ঘরেই থেকো।

দীপন ঘরে ফিরে আসে। ঘড়ির সামনে বসে থাকে। নটা-দশটা-এগারোটা- বারোটা। ঘড়ির কাঁটা এগিয়েই চলেছে। দুপুরের খাওয়ার ডাক পড়ে।

—শম্ভুদা আমি এখন খাব না। আমার খিদে পায়নি।

—আহা, রাগ করছ কেন? দাঁড়াও, আমি আবার ওনাকে ফোন করি। এবার শম্ভুর ফোনে উলটোদিকে থেকে সাড়া মেলে।

—হ্যালো, আমি অনিরুদ্ধ বলছি।

—হ্যালো স্যার, আমি আরোগ্য-র কেয়ারটেকার শম্ভু বলছি। আপনি কখন আসবেন? দীপন অপেক্ষা করছে সকাল থেকে।

—নাহ, আসার দরকার হবে না। এইমাত্র ডাক্তার বলে গেল এখন আর তেমন রিস্ক নেই। পরে দরকার হলে যোগাযোগ করব।

—হ্যালো, হ্যালো স্যার! দীপেনকে কী বলব? ও যে কাল থেকে অপেক্ষা করে বসে আছে। বাচ্চা ছেলে তো— আপনার জন্য ছবি এঁকেছে। আপনি না এলে খাবে না বলছে।

—আমার জন্য!—আকাশ থেকে পড়ে অনিরুদ্ধ। একটু থেমে বলে ওঠে।— শম্ভু, তুমি তো নিয়মকানুন জানোই। আমার দেখা করাটা ঠিক হবে না। ছেলেটার ওপর মায়া পড়ে গেলে ভারী মুশকিল। বলে দিও-বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। নাহ-তানা বলো অফিসের কাজে আটকে পড়েছে। পরে একদিন আসবে।

ফোন কেটে যায়।

দীপনের দিকে তাকিয়ে শম্ভু বলে ওঠে—ভারী মুশকিল হল তো! উনি আসছিলেন, হঠাৎ 'ভারী দরকারি কাজ পড়ে গেছে। পরে একদিন আসবেন।

শম্ভুর কথায় বাধা আসে। আবার ফোন বাজছে। অনিরুদ্ধবাবুর ফোন।

—শম্ভু, ছেলেটার নাম কী যেন?

—দীপন।

—ওর কবে যেন জন্মদিন?

—16 অক্টোবর।

—ওকে বলো ওর জন্মদিনে আমি আসব। একটু থেমে আবার বলে— ফোনটা ছেলেটাকে দাও তো। কাছে আছে কি?

—হ্যাঁ, হ্যাঁ, দিচ্ছি।

শম্ভু ফোনটা দীপনকে বাড়িয়ে দেয়। ওদিক থেকে কী কথা বলছে শোনা না গেলেও দীপনের মুখ-চোখের চেহারা দেখে মুচকি হাসে শম্ভু। এত খুশি আগে কোনওদিন দেখেছে বলে মনে হয় না। দীপন একটা কবিতা বলছে ফোনে। ফোনে কথা চলতেই থাকে— অনেকক্ষণ ধরে।

শম্ভু মুচকি হেসে মাথা নাড়ে। এটা 2065 সাল। এখনও নিয়ম ভাঙে। এভাবেই। শম্ভুর মাথায় এসব ঢোকে না। ও হল গিয়ে মুখ্যুসুখ্যু রোবট। তবু নিয়ম ভাঙলে খুব ভালো লাগে ওর।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%