আলো-ছায়া

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

প্রত্যেকেই কোনও না কোনও জিনিসকে ভয় পায়। কেউ আরশোলায়, কেউ বাঘে, কেউ সাপে, কেউ বা ভূতে। আর আমি? হ্যাঁ, আমিও কিছু জিনিসকে ভয় পাই। তার মধ্যে একটা হল রকিং চেয়ার। দেখলেই মনে হয় চেয়ারে কে যেন বসে আছে। অথচ দেখা যাচ্ছে না। আর তাই রকিং চেয়ারটা না থেমে দুলে যাচ্ছে। এই এক মুহূর্ত আগেই কে যেন বসে ছিল, আর তার পরমুহূর্তেই সে যেন আর বসে নেই।

জানি না এটাকে আমার রকিংচেয়ার ফোবিয়া বলব কিনা। এটা আগে ছিল না। দু-বছর হল হয়েছে। কেন হল সেটা বোঝাতে গেলে সেই ঘটনা দিয়েই শুরু করতে হয়।

তখন মাস ছয়েকের জন্য অফিসের কাজে ইংল্যান্ডে গেছি। শহরটার নাম চেলতেনহ্যাঁম। পুরনো বর্ধিষ্ণু শহর। শহর জুড়ে ভিক্টোরিয়ান আমলের বাড়ি। অক্সফোর্ডও বেশি দূরে নয়। তাই শহরে বহু শিক্ষিত মানুষের বাস। ইংল্যান্ডের বেশ কয়েকটা বড় বড় ফেস্টিভ্যাল, যার মধ্যে সাহিত্য উৎসব আর বিজ্ঞানের উৎসবও পড়ে, এখানেই হয়। আর একটা বিখ্যাত ঘোড়ার রেসও হয় শহরটাতে। আর তা দেখতে দেশবিদেশ থেকে অনেক লোক আসে।

কর্মসূত্রে চেলতেনহ্যাঁমে তখন মাসতিনেক হয়ে গেছে। শহরের প্রান্তে একটা ছোট বাড়ি ভাড়া করে থাকি। অফিস শহরের কেন্দ্রে। ইংল্যান্ডের বেশিরভাগ শহরের মতো এখানেও পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বেশ ভালো। তাই গাড়ি কিনতে হয়নি। বাসেই অফিস যাতায়াত করি। শীতের সময়। দিনেরবেলা সূর্যের দেখা মিলতে মিলতে আটটা বেজে যায়। আবার বিকেল চারটে বাজতে না বাজতে ঝুপ করে ডুব মারে। আর তাছাড়া বেশিরভাগ সময় মেঘলা আর তার সঙ্গে মাঝেমধ্যে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। ছুটির দিনগুলো তাই ঘরেই বেশি কাটে।

সেদিনটা ছিল বক্সিং ডে। অর্থাৎ ক্রিসমাসের পরের দিন। ২৬শে ডিসেম্বর। রাস্তা শুনশান, ফাঁকা। সবাই বাড়ির ভিতরে। শুধু ক্রিসমাস উপলক্ষ্যে লাগানো ইলেকট্রিক আলোর রোশনাইতে সব বাড়ি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

সেদিন আমার অফিস ছুটি। বন্ধুর বাড়ি থেকে ফিরছিলাম। বাস খুব কম। বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে বাসের দেখা না পেয়ে ঠিক করলাম আর অপেক্ষা না করে হেঁটেই মাইল তিনেক পথ চলে যাব। ঠান্ডা থাকলেও, বৃষ্টি নেই। আলোয় সেজে ওঠা বাড়িগুলো দেখতে দেখতে হাঁটা যাবে। গত কয়েক সপ্তাহ শুধু বাড়ি আর অফিস, অফিস আর বাড়ি। শহরটাকে আর দেখা হয়নি। সেও আজ আমার মতোই একাকী। নির্জন রাস্তায় তাকে আরও কাছ থেকে দেখা যাবে।

তখন রাত আটটার মতো হবে। হাঁটতে হাঁটতে শহরের এক অভিজাত পাড়ার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। পরপর প্রায় একই ধাঁচের বেশ কয়েকটা ভিক্টোরিয়ান বাড়ি। এগুলো বেশিরভাগ ১৮০০ সালের মাঝামাঝি তৈরি। এ ধরনের পুরনো বাড়িগুলো সরকার থেকে বিশেষভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। বিশাল বিশাল কাচের জানলা। প্রত্যেকটা বাড়ির সামনে বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে বাগান। বোঝাই যায় যারা এসব বাড়িতে থাকে তারা যথেষ্ট অবস্থাপন্ন। এরকমই একটা বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ মনে হল বাড়ির সামনের বাগানে রকিংচেয়ারে কে যেন বসে আছে। বাড়িতে কোনও আলো জ্বলছে না। ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়েছে লনে। আর তাতেই যা একটু দেখা যাচ্ছে। এই সময় এত ঠান্ডায় অন্ধকারে কোনওরকম আলো না জ্বেলে বাইরে বসে থাকা খুবই অস্বাভাবিক। একটু খেয়াল করে তাকাতেই মনে হল একজন বৃদ্ধা যেন রকিং চেয়ারের উপরে হেলান দিয়ে অজ্ঞানের মতো পড়ে আছেন। আর চেয়ারটা নিজের ছন্দে দুলে যাচ্ছে। ঘুমোচ্ছেন কি? না, তা তো মনে হয় না। ব্যাপারটা যে আদৌ স্বাভাবিক নয়, তা বুঝতে দেরি লাগল না।

বাড়ির বাগানের নিচু গেট খুলে ভিতরে এগিয়ে গেলাম। কাছে এসে ভালো করে খেয়াল করলাম। প্রায় আশির কাছাকাছি বয়েস হবে। বিড়বিড় করে কী বলছেন। কপালে হাত রাখলাম। যা ভেবেছি তাই। গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। বেহুঁশ হয়ে বাইরে পড়ে আছেন। প্রথমেই এমারজেন্সিতে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকলাম। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স আসতে আসতে মিনিট কুড়ি লেগে যাবে। ওনাকে তো আর এই ঠান্ডার মধ্যে ফেলে রাখা যায় না। তাই ওনাকে ধরে ধরে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেলাম। ঢুকেই বাঁদিকে ড্রয়িং রুম। সেখানে সোফার উপরে বসিয়ে বাড়িতে আর কেউ আছে কিনা জানার জন্য কয়েকবার চেঁচিয়ে উঠলাম—এনিবডি হোম?

উত্তর পেলাম না। অন্য কোনও ঘরেও আলো জ্বলছে না। তার মানে উনি এখানে একাই থাকেন। কিন্তু এই বয়সে বিশাল বাড়িতে একা থাকা সত্যিই কষ্টকর। ওনাকে সোফায় শুইয়ে দিয়ে পাশে বসে থাকলাম। খানিকক্ষণের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স এসে গেল। অ্যাম্বুলেন্সে পুরো পথটাই উনি জ্বরে বেহুঁশ অবস্থায় পড়ে ছিলেন।

হাসপাতালে পৌঁছে ওখানকার লোকদের কাছ থেকেই পরে শুনলাম যে উনি এখানে যথেষ্ট পরিচিত। শহরের খুব বড় একটা অকশন হাউসের, বেশ কয়েকটা বড় স্পা-এর আর একটা চেন রেস্টুরেন্টের মালিক উনি। ওনার এক ছেলে আর এক মেয়ে। দুজনেই বিদেশে থাকেন। তাদেরকেও ফোনে ওনার অসুস্থতার কথা জানানো হল।

আমি সারারাত ওখানেই ছিলাম। এই সময়ে ক্রিসমাসের ছুটির জন্য ডাক্তার - নার্স বেশ কম। আমি না থাকলে উনি বেশ সমস্যাতেই পড়তেন। মাঝেমধ্যেই তাগাদা দিতে হচ্ছিল। তা না হলে উনি হয়তো স্ট্রেচারেই পড়ে থাকতেন। ভোররাতে নানান টেস্ট করার পর ওনাকে একটা বেডে দেওয়া হল। আমি আরও কয়েক ঘণ্টা ওখানে থেকে সকাল দশটা নাগাদ বাড়ি ফিরলাম। দুপুরের দিকে হাসপাতালে ফোন করে জানলাম ওনার ছেলে এসে গেছে। ওনার সঙ্গেই আছে। আমার আর তাই যাওয়ার দরকার নেই।

পরের দিন আর যাওয়া হয়নি। হাসপাতালে ফোন করে একবার খোঁজ নিয়েছিলাম। ছেলে সঙ্গে আছে। উনি পুরোপুরি সুস্থ না হলেও অপেক্ষাকৃত ভালো।

এরপরে আমি আর কয়েকদিন খোঁজ নিইনি। অফিসের কাজে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, যে ওনার কথাটা মাথাতেই ছিল না। দু-সপ্তাহ বাদে এক অচেনা নাম্বার থেকে হঠাৎ ফোন পেলাম। বেশ কয়েকবার 'হ্যাঁলো' বলার পরে উলটো দিকে এক ভদ্রমহিলার সাড়া পেলাম। দু-মিনিট বাদে পরিষ্কার হল সেদিনের সেই বৃদ্ধাই আমাকে ফোন করেছেন। উনি বাড়ি ফিরে এসেছেন। আমাকে দেখতে চান। আমার নাম্বার হাপাতালের কাছে ছিল। সেখান থেকেই পেয়েছেন। সেদিন আমার সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। কিন্তু আমাকে শুধু ফোনে মৌখিক ধন্যবাদ জানিয়েই উনি ক্ষান্ত নন। দেখা করতে চান।

বৃদ্ধার অনুরোধ ফেলতে পারলাম না। পরদিন অফিস ফেরত ওখানে গেলাম। ওই পাড়াতে যখন পৌঁছলাম, তখন সন্ধে সাতটা। বেশ ভালো ঠান্ডা। দশ দিন আগেও শীত তেমন ছিল না। আর আজ! খেলার শেষ মুহূর্তের গোলশোধের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে জানুয়ারির শীত। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া। তার মধ্যে সামান্য বৃষ্টিও হচ্ছে। গায়ে লংকোট আর মাথায় টুপি থাকলেও মুখে বরফের ছুরির মতো বৃষ্টির কণাগুলো এসে পড়ছে।

রাস্তার ষড়ভুজ ল্যাম্পশেডের আলোগুলো জ্বলে উঠেছে। তাদের হলদেটে আলোয় বৃষ্টির ফোঁটায় যেন রঙ লেগেছে। ২৯ ক্রাইস্টচার্চ রোড। থমথমে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। ড্রয়িংরুমের পর্দার ফাঁক থেকে শুধু সামান্য আলোর আভাস আসছে। বাগানের গেট খুলে নুড়ি ফেলা এক চিলতে পথ পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম। বাঁ দিকের বাগানে রকিং চেয়ারটা আজকেও দেখলাম। মনে হল দুলছে। কেউ যেন এক্ষুনি এখান থেকে উঠে গেছে। বাড়ির মেন দরজার দিকে এগোলাম। বিশাল কাঠের দরজা। সামনে যেতেই খুলে গেল। এক মাঝবয়সি মহিলা দরজা খুলে দিলেন। আমি ওনার পিছন পিছন এগিয়ে গেলাম। সামনেই দোতলায় ওঠার কাঠের চওড়া সিঁড়ি। সেদিকে না এগিয়ে আমাকে বাঁ পাশে বিশাল ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে যেতে বললেন। দরজা খোলা। বৃদ্ধা একটা কাঠের চেয়ারে বসে আছেন। উনি আমাকে দেখে মৃদু হেসে সম্ভাষণ করে সামনের লেদার সোফায় বসতে বললেন। ঘরের পরিবেশ বেশ সাবেকী। ফায়ারপ্লেসে কাঠের আগুন জ্বলছে। তার সামনে কিছু দূরে একটা নিচু ওভালো শেপের কাঠের টেবিল। তাতে একটা ভারী সুন্দর কাচের মোমদানীতে মোমবাতি জ্বলছে। তার আলোয় আলোর থেকে ছায়াই যেন বেশি। আর সে আলোছায়ায় ধরা দিয়েছে বিশাল ড্রয়িংরুম। ঘরের অন্যদিকে আরেকটা বিশাল ডিনার টেবিল। প্রায় কুড়ি জন একসঙ্গে বসতে পারে তাতে। ঘরের দু'ধারে বিশাল কাচের জানলা। সেদিন এই ঘরেই এসেছিলাম। তবে অন্ধকার ছিল। আর ওনার দিকেই সমানে লক্ষ রাখতে হচ্ছিল বলে এত খেয়াল করিনি। ঘরের দেওয়াল জুড়ে অনেক ছবি আর নানান কাঠের কাজ।

বৃদ্ধাকে আজ দেখলাম ভালো করে। আভিজাত্য পোশাকে, মুখমণ্ডলীতে। ঘরের আবছা আলোতেও উজ্বল হয়ে উঠেছে মুখটা। মাথাভর্তি সাদা কোঁকড়া চুল। মুখের মধ্যে ভারী সুন্দর একটা প্রশান্তির ছাপ।

মৃদু স্বরে বলে উঠলেন— তুমি আমার জন্য যা করেছো, তা নিজের ছেলেরাও করে না। তাই তোমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ছোট করব না। তা তুমি এখানে কী করো? কতদিন আছ?

আমার পরিচয় জানিয়ে বললাম— আরও কয়েকমাস থাকব। তা আপনি একাই থাকেন?

—হ্যাঁ, গত দশ বছর একাই থাকি। আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে। তবে বাড়িতে কাজের লোক আছে। বেশ কয়েকজন।

—তা সেদিন তো কেউ ছিল না! ছুটিতে ছিল?

—হ্যাঁ, সেদিন একাই ছিলাম। আর তাই-বলে একটু থেমে বললেন—দাঁড়াও তোমার জন্য চিকেন সুপ করেছি। খেয়ে নাও।—বলে 'লিয়ন' বলে আস্তে করে ডেকে উঠলেন। দেখলাম দরজার কাছে একজন বছর ষাটের সুসজ্জিত বাটলার এসে দাঁড়াল। তারপরে চোখের ইশারায় কত্রীর নীরব নির্দেশ বুঝে আবার চলে গেল। মিনিট পাঁচেক বাদে সামনের টেবিলে সুপ রেখে গেল। লিয়নকে লক্ষ্য করে বৃদ্ধা বলে উঠলেন—ও আমাদের এখানে বহু বছর আছে। আমার শ্বশুরের সময় থেকে। খুব ভালো রান্নার হাত।

বৃদ্ধা আস্তে আস্তে ওনাদের কথা বলতে লাগলেন। চারপুরুষের বাস এই শহরে। তবে এই বাড়ি কেনেন ওনার শ্বশুর স্টিভ। ফায়ারপ্লেসের উপরে রাখা সুট-টাই পরে সোফায় বসা অভিজাত এক বৃদ্ধ ভদ্রলোকের ছবি দেখিয়ে বলে উঠলেন— ওনার আরও অনেক ব্যবসা থাকলেও আসল ব্যবসা ছিল পুরনো জিনিস বিক্রির। আর তাতেই অনেক টাকা লাভ করেন উনি। ওই একই ব্যবসা আমার স্বামী জনও দেখতেন। কিন্তু খুব কম বয়সে জন মারা যান। তারপরে আমাকেই একা এই সব ব্যবসা পুরোপুরি সামলাতে হত। তারপরে আরও অন্যান্য কিছু ব্যবসা শুরু করি।

শুনলাম কীভাবে অন্য ব্যবসাতেও এর পরে উনি যথেষ্ট সাফল্য পান। খুবই উদ্যমী পরিশ্রমী মহিলা। এখন নেহাত বয়েস হয়েছে। কিন্তু তবু ব্যবসার খুঁটিনাটি সম্বন্ধে বেশ ওয়াকিবহাল। এমনকী ভারতেরও অনেক খোঁজ খবর রাখেন। ব্যবসা সূত্রে কয়েকবার রাজস্থান গেছেন। ওনার এক ছেলে আর এক মেয়ে। এখন একজন আমেরিকা আর একজন অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। অসুস্থতার কথা শুনে ছেলে এসে দুদিন থেকে আবার ফিরে গেছে আমেরিকায়।

ওনাদের অবস্থা আগে এত ভালো ছিল না। এই বাড়ি-গাড়ি সবই ওই অ্যান্টিকের দোকান থেকে।

কথায় কথায় বললাম— হ্যাঁ, আপনার শ্বশুরমশাইকে দেখেই মনে হয় খুব পরিশ্রমী লোক ছিলেন। একই সঙ্গে খুব তুখোড় ব্যবসায়ী বলে মনে হয়।

—শুধু পরিশ্রম করলে কি হয়! ভাগ্যও লাগে। আর সেটাও ওনার ছিল। আর উনি, নাহ সে কথা থাক— থেমে গেলেন বৃদ্ধা। একটু থেমে আবার বলে উঠলেন— অনেক সময় আমরা সব কিছু পেয়েও শেষে হেরে যাই। উনি সারাজীবন প্রচুর রোজগার করেছেন, কিন্তু ওনার মতো অসুখী মানুষ খুব কম দেখেছি। আমার স্বামী জনও একইরকম ছিল। এত অর্থ, তবুও কোনও কিছুতে যেন শান্তি নেই। ব্যবসা তো নয় সবসময় যেন একটা যুদ্ধ। সবসময় টেনশন। সেখানে ভালো খারাপ বলে যেন কিছু নেই। তা জনও খুব অসুখী ছিল। কত কম বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে গেল। চলে যাওয়ার আগের দিনও এখানে সারারাত পার্টি হল। ও একটা বড় ব্রিজ তৈরির বরাত পাবে কিনা সে ব্যাপারে খুব চিন্তিত ছিল। ভোর রাতে আমাকে ঘুম থেকে তুলে বলল, মনে হয় ওই কন্ট্রাক্ট পাবে। কেন পাবে সেটা বোঝাল। কয়েকদিন বাদে পেলামও। কিন্তু তখন ও আর নেই।

বৃদ্ধা থামলেন। ইতিমধ্যে বাটলার লিয়নের পিছু পিছু আরও দুজন ঘরে প্রবেশ করেছে ডিনার নিয়ে। বৃদ্ধা পরিচয় করে দিলেন। হেনরি আর মার্ক। বহু বছর ধরে আছে। চেহারায়-পোশাকে—ব্যবহারে সাবেকী কালের চিহ্ন। ডিনার টেবিলে খাবার সাজিয়ে রেখে ওরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকল। রোস্ট চিকেন, তিন ধরনের সবজি। স্যালাড। ডেসার্ট।

কথায় কথায় ওনার ছেলের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলাম। ছেলের নাম ম্যাট। পড়াশোনায় বেশ ভালো ছিল। আমেরিকায় বড় ব্যবসা। কথায় কথায় উনি বলে উঠলেন— ও এসেছিল আমাকে দেখতে নয়। অন্য কাজে।

আমি একটু অবাক হয়ে বলে উঠলাম,— কিসের কাজ?

—একটা ছবির খোঁজে। সে ছবিটা বাড়ির মধ্যে কোথায় আছে, সেটা আমিই শুধু জানি। আমি যদি মারা যাই, আমার সঙ্গে ওই ছবিটাও হারিয়ে যাবে। তাই এসেছিল এত তাড়াহুড়ো করে। ছবিটা নিয়ে চলে গেল।

—কেন? ওর কি ছবির খুব শখ?

—হ্যাঁ, তা বলতে পারো। তবে একটু অন্যধরনের শখ। সেটা ও ওর বাবা-ঠাকুরদার থেকে পেয়েছে। আসলে ওর রক্তে তো শিল্প নেই, ব্যবসা আছে। আর আমাদের বাড়িতে কত ছবি আছে, দেখেছ তো? এগুলো সাধারণ এলাকে দেখতে পেল না কোনওদিন।— বলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

সেদিন আরও দেড় ঘণ্টা ছিলাম। আসার সময় বৃদ্ধা বললেন— দাঁড়াও তোমার জন্য একটা ছোট উপহার আছে।— বলে আমার দিকে একটা আড়াই ফুট লম্বা টিউব দিয়ে বললেন— এর মধ্যে একটা ছবি আছে। তোমার জন্য। পরে বাড়ি গিয়ে খুলে দেখো।

আমি তখনই খোলার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু দেখলাম ঢাকাটা বেশ শক্ত করে আটকানো।

সেটা দেখে উনি মৃদু হেসে বলে উঠলেন, পরে দেখো। যত্ন করে রেখো। এই আলোতে ছবি ভালো বুঝতে পারবে না।

সেদিন আরও খানিকক্ষণ থেকে চলে এসেছিলাম।

বাড়িতে এসে ওই টিউবটা থেকে ছবিটা বার করে দেখলাম। ছবির সঙ্গে একটা টাইপ করা চিঠি আছে, যেখানে উনি আমাকে এই ছবিটা উপহার দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। বেশ পুরনো ছবি। দু ফুট বাই দেড় ফুট। অয়েল অন ক্যানভাস। একটা মাঝবয়েসি এলাকের ডানহাতে ধরা ফলের ঝুড়ি। ঝুড়ির মধ্যে আপেল, লেবু, চেরী, আঙুর, বেরী, পিয়ার এরকম নানান ফলের সঙ্গে কিছু পাতা সাজানো আছে। লোকটা অন্য হাতের তর্জনী তুলে উপরের দিকে কিছু একটা নির্দেশ করছে। আর সেদিকে তাকিয়ে আছে। যেদিকে নির্দেশ করছে ঠিক সে দিক দিয়েই আলো এসে লোকটার মুখে এসে পড়েছে। লোকটার মুখভর্তি দাড়ি। ঘাড় অবধি কোঁকড়ানো চুল। চোখের নীচটা সামান্য বসা। মুখের মধ্যে একটা বিষণ্ণতা। সব মিলিয়ে বেশ ভালো ছবি। পরের দিন দোকান থেকে একটা ফ্রেম কিনে ছবিটা ঘরের দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখলাম।

এরপরে বেশ কিছু দিন কেটে গেছে। রঞ্জন আমার স্কুলের বন্ধু। ও বেশ কয়েক বছর ধরে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল শহরে থাকে। এক উইক এন্ডে হঠাৎ এসে হাজির। ও ছবির বেশ ভালো সমঝদার। নানান আর্ট একজিবিশনে যায়। নিজেও খুব ভালো ছবি আঁকে। আমার ওই ছবিটা ড্রয়িংরুমে রাখা ছিল। ওটা দেখে কেন জানি না —ও বারবার করে ঘুরে ফিরে বেশ খানিকক্ষণধরে লক্ষ্য করতে থাকল। তারপরে বলে উঠল— তুই এ ছবিটা কোথায় পেয়েছিস?

—কেন? কী ব্যাপার?

—আহা, আগে বলই না। এ ছবিটা কোথায় পেলি?

আমি পুরো ঘটনাটা বললাম। ও খুব গম্ভীর হয়ে শুনল। তারপরে হঠাৎ করে ওর ফোনে কীসব সার্চ করতে শুরু করল। মুখ-চোখ দেখে মনে হল বেশ উত্তেজিত।

বেশ কয়েকবার প্রশ্ন করলাম, কোনও উত্তর পেলাম না। শুধু একবার উত্তেজিতভাবে বলে উঠল— এ ছবিটার কোথাও কোনও উল্লেখ পাচ্ছি না। আর্টলস রেজিস্টারেও না। কিন্তু আমার মন বলছে এটা ক্যারাভাজ্জিওর আঁকা। সেই এক স্টাইল। কিন্তু তারপরেই মনে হচ্ছে তা কী করে সত্যি হয়?

—কী বল না, খুলে। আর্টলস রেজিস্টারটা কী?

—যে কোনও নামকরা ছবি চুরি হয়ে গেলে, ওই রেজিস্টারে থাকে। আর তাই চুরি করা ছবি বিক্রি করা সহজ হয় না।

—চুরি? কিসের চুরি?

—বলছি, তার আগে আমার ওই মহিলার সম্বন্ধে আরও কিছু তথ্য লাগবে। আমি এটুকু জানি এরকম একটা ছবি ক্যারাভাজ্জিও তার শেষ জীবনে এঁকেছিল। কিন্তু গত চারশো বছরে তার কোনও হদিশ পাওয়া যায়নি। নেহাতই আমার এ বিষয়ে বেশ কিছু পড়াশোনা আছে, কিছুটা রিসার্চও আছে, তাই জানি।

বৃদ্ধা সম্বন্ধে আমার যা জানা ছিল সব বললাম।

ও চুপ করে শুনল। তারপরে বলে উঠল— আমার সন্দেহ যদি সত্যি হয়, তাহলে তুই কি পেয়েছিস ভাবতে পারছিস না। ক্যারাভাজ্জিও-র নাম শুনেছিস?

—না। খুব নামকরা কোনও আর্টিস্ট?

—তুই ক্যারাভাজ্জিওর নাম শুনিসনি? ব্যারোক স্টাইলের পেন্টিং-এর অন্যতম পুরোধা। পনেরোশো সালের মাঝামাঝি খ্রিস্টধর্মের বার্তা সাধারণের কাছে আরও ভালোভাবে পৌঁছে দেওয়ায় জন্য এই ধরনের পেন্টিং ক্যাথোলিক চার্চের উৎসাহে আঁকা শুরু হয়। বাইবেলের বিভিন্ন ঘটনাকে চাক্ষুষ তুলে ধরার জন্য এ ছবি আঁকা হত। ক্যারাভাজ্জিও ইতালির সবথেকে নামকরা চিত্রশিল্পীদের মধ্যে একজন। এত বছর বাদেও ওনার আঁকা সব চিত্রশিল্পীদের প্রভাবিত করে। অবশ্য মানুষ হিসেবে উনি খুব ভালো ছিলেন না। একদিকে শিল্পী হলেও, অন্যদিকে ছিলেন একদম গুন্ডা। সারাজীবনই খুনখারাপি করে কাটিয়েছেন। খুব রগচটা ছিলেন। যখন তখন ছোরা বার করে আক্রমণ চালাতেন। তাও আবার পিছন থেকে কাপুরুষের মতো। একবার এক পুলিশকে ছোরা মেরে জখম করেন। পরে অন্য এক ঘটনায় রোমের রাস্তায় ছোরা চালিয়ে একজনকে মেরেও ফেলেন। ওনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। উনি তখন রোম থেকে পালিয়ে মালতা চলে যান। বাকি জীবনটা পালিয়ে পালিয়ে কেটেছিল। শুনেছি শেষদিকে ওনার মাথারও ঠিক ছিল না। ১৬১০ সালে ৩৯ বছর বয়সে মারা যান। কীভাবে মারা যান তা আজও কেউ সঠিক জানে না। এ ছবিটা খুব সম্ভবত শেষদিকেরই আঁকা। শোনা যায় বেশ কয়েকজন প্রাইভেট কালেকটরের হাত বদল হয়েছিল এ ছবিটা। কিন্তু কখনোই জনসমক্ষে আসেনি। এটাই যদি সেই ছবি হয়, তার দাম কী হবে ভাবতে পারছিস?

—কত?

—জানা নেই। হয়তো একশো মিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি। ভাবতে পারছিস, যে ছবি এত বছর ধরে সব চোখের আড়ালে আছে, যার খোঁজ সারা বিশ্বময় চলছে, তার দাম কী হতে পারে? তবে একে তো আর শুধু টাকার বিচারে ভাবা যায় না। যদি এটাই সেই আসল ছবি হয় তাহলে এককথায় এ ছবি অমূল্য। অবশ্য এটা আসল ছবি না হওয়ার সম্ভাবনাই নিরানব্বই শতাংশ। তা হলে তো এই ছবি কবেই বিখ্যাত কোনও মিউজিয়ামে স্থান পেত।

—আমারও মনে হয় এটা একটা সাধারণ ছবি। না হলে এই সামান্য পরিচয়ে আমার হাতে কেউ এ ছবি তুলে দেয়? তা তোর কেন মনে হল এটা ক্যারাভাজ্জিওর?

—কারণটা বলি। ছবিটা দেখেই মনে হয় খুব পুরনো। তাই তো? এবার ক্যারাভাজ্জিওর কথায় আসি। ওনার পেন্টিং স্টাইলের সঙ্গে এ আঁকা হুবহু মিলে যায়। সেই একই রকম আলোছায়ার কাজ। যেন ত্রিমাত্রিক কোনও ছবিতে নাটকের একটা মুহূর্ত ধরা হয়েছে। ওর ১৫৯৩ সালে আঁকা সেই বিখ্যাত ছবি 'ফলের ঝুড়ি'র সঙ্গে এ ছবির ফলের ঝুড়ি একদম মিলে যায়। একই রকমের ফল, একই রকমের পাতা। ছবির পিছনে তেমন কোনও ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, যেটা ওনার ছবিতেও থাকত না। আর তাছাড়া খুব শক্তিশালী কারুর হাতে আঁকা সেটা তো দেখেই বুঝতে পারছিস। দেখেই মনে হয় যেন দর্শকও ওই ছবির একটা অংশ। তবে আমি অন্য কয়েকজন চিত্রশিল্পের সমঝদারকে দেখাতে চাই। তবে তার আগে তুই একবার বৃদ্ধাকে গিয়ে হালকাভাবে জিজ্ঞেস কর যে এ ছবিটা কোথা থেকে পেয়েছেন। কিন্তু ভুল করে আবার বলে দিস না, যে এ ছবি নিয়ে তুই কি সন্দেহ করছিস। এ ছবির মূল্য হয়তো বৃদ্ধা জানেন না, ভুল করে তোকে দিয়ে দিয়েছেন সেটাও হতে পারে। আর সবকিছু জানার পরে মন বদলাতেই পারেন। আর নকল হলেও এটুকু বলতে পারি, এছবি বেশ ভালো কারুর হাতেই আঁকা। আর সে শিল্পী নির্ঘাত ক্যারাভাজ্জিওরই শিষ্য।

—না, রঞ্জন। এ ছবি আমি নেব না। যদি জানতে পারি এটা দামি কোনও ছবি, তাহলে আমি ওনাকে ফেরত দিয়ে দিতে চাই। কোনওভাবেই নেব না।

—আহা, সে কথার এখনই দরকার কী? আগে তো গিয়ে দেখ, কী বলেন!

আমাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল রঞ্জন। কিন্তু আমি মনে মনে ঠিকই করে ফেলেছিলাম যে এ ছবি ক্যারাভাজ্জিও-র আঁকা হলে বা দুর্মূল্য কোনও ছবি হলে আমি কোনওভাবে নেব না। ও কথা দিল যে এ ছবির কথা কেউ জানবে না। তবে এরকম কোনও ছবি ছিল কিনা সেটা জানার জন্যও খোঁজখবর নেবে। এ ব্যাপারে যারা এক্সপার্ট আছেন তাদের পরে একদিন নিয়ে আসবে। আমি সেটাতে এখনই সম্মতি দিলাম না। জানালাম যে তার আগে আমি বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলে নিতে চাই।

পরের দিন আমি আবার ওই বাড়িতে গেলাম। অফিস ফেরত। যথারীতি ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছে। সঙ্গে ছবি অবশ্য নিয়ে আসিনি। যদি সত্যি এ ছবি সে ছবি হয়, সেটা নিয়ে তো আর রাস্তায় ঘোরা চলে না। তবে আমার বিশ্বাস এটা খুব সাধারণ কোনও শিল্পীর আঁকা ছবি। হতে পারে পুরনো। হতে পারে এর কোনও ইতিহাস আছে। আর সেটা জানতেই আসা।

বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে অবাক হলাম। বাঁদিকে ঘাসের লনে সেই রকিং চেয়ার দুলছে। অথচ কেউ নেই। ভিতরে সেদিনকার মতো মৃদু আলো জ্বলছে শুধু ড্রয়িংরুমে। মেন দরজার সামনে যেতেই দরজা খুলে গেল। দরজা খুলে দিয়েছে সেদিনকার সেই মধ্যবয়সি মহিলা। মহিলা মৃদু হেসে সম্ভাষণ করে বাঁ দিকে ড্রয়িংরুমের দিকে নির্দেশ করল। দেখি বৃদ্ধা ঠিক সেদিনকার মতোই বসে আছেন। ফায়ার প্লেসের দিকে মুখ করে। আমার পায়ের শব্দ শুনে ঘুরে তাকালেন। তারপর মৃদু হেসে বলে উঠলেন— কি ভালো আছ তো?

—হ্যাঁ, আমি আপনাকে না জানিয়ে এসে বিরক্ত করলাম। আসলে আপনি আমাকে যে ছবিটা দিয়েছিলেন তার সম্বন্ধে—

—ছবিটা ক্যারাভাজ্জিও-র আঁকা কিনা তাই জানতে চাও তো?— বৃদ্ধা আমাকে থামিয়ে বলে উঠলেন।

থমকে গেলাম। একটু থেমে কোনওরকমে বলে উঠলাম— হ্যাঁ।

—হ্যাঁ, ওটা ক্যারাভাজ্জিও-রই আঁকা। অন্তত তাই তো শুনেছি। আর এও শুনেছি এ ছবি অমূল্য। কয়েকটা কারণে। এক, এটাতে ক্যারাভাজ্জিও নিজেই আছেন। উনি নিজেকেই এঁকেছেন। দুই, ওনার আঁকার রহস্য খানিকটা হলেও এ ছবিতে তুলে ধরেছেন।

—কীরকম?

—উনি ওনার সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন। এটা বোঝা যেত না, অত নির্ভুলভাবে ওনার ছবিতে আলো আর ছায়ার দাগ তুলে ধরতেন কীভাবে। এত নিখুঁতভাবে ছবির সাবজেক্টকে কীভাবে আঁকতেন। এটা একটা বিশাল রহস্য। বেশিরভাগ শিল্পী তাদের আঁকার কথা লিখে যান। উনি কিন্তু কিছুই লিখে রেখে যাননি। এ ছবি খুঁটিয়ে দেখলে দেখবে লোকটা যেদিকে আঙুল তুলে নির্দেশ করছে, সেখানে একটা ছোট আয়না আছে। বাইরে থেকে আসা সূর্যের আলো ওই আয়নার উপরে পড়ে প্রতিফলিত হয়ে লোকটার উপরে এসে পড়েছে। আয়না ইচ্ছেমতো ঘুরিয়ে সূর্যের আলোর প্রতিফলন ছবির সাবজেক্টের উপরে নানানভাবে ফেলা সম্ভব হত। আর তাই আলোছায়ার শেডগুলো, মুখের এই অভিব্যক্তি এত নিখুঁতভাবে তুলে ধরা সম্ভব হত। এ ছবিতে ওনার আঁকার মেথড প্রমাণিত হয়। আর তাছাড়া এটাই বোধহয় ওনার আঁকা শেষ ছবি। আর তাই ওনার চোখে এই বিষণ্ণতা। দৃষ্টি অন্ধকারের দিকে নয়, আলোর দিকে। হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন যে সারাজীবন অন্ধকার জগতে থাকলেও শেষ দিকে উনি আলোর জগতে ফিরে আসার চেষ্টা করেছিলেন। চেষ্টা করেছিলেন ভালো কাজের মধ্যে ফিরে আসার। আর তারই প্রতিফলন এই ছবি। আমাদের সবারই হয়তো কোনও না কোনও সময় তাই ইচ্ছে হয়। মনে হয় কীভাবে আলোর জগতে ফেরা যায়। তাই না?

—আমি কিন্তু এই ছবি আপনাকে ফেরত দিয়ে দিতে চাই। আমার এত দামি উপহারের কোনও প্রয়োজন নেই।

—কেন? তুমি ভয় পাচ্ছ যে এটা চুরি করা ছবি? তোমাকে পুলিশ ধরবে, তাই? তোমাকে তাহলে এর ইতিহাস বলি। বলেছি না, আমার শ্বশুরমশাইয়ের হঠাৎ করে ভাগ্য ফেরে। এটা আমার শ্বশুরমশাই কেনেন এক পুরনো দোকান থেকে। যে বিক্রি করেছিল, সে ছবির কিছুই বুঝত না। জানতও না যে এ ছবির এত দাম হতে পারে। মাত্র ২০ ডাচ গিল্ডারে আমার শ্বশুরমশাই এটা কেনেন তার কাছ থেকে। তখন উনি নেদারল্যান্ডে থাকতেন। উনি কিন্তু এটার দাম ঠিকই বুঝেছিলেন। এক কথায় বলতে পারো জেনেশুনে ঠকিয়ে ছিলেন। উনি ভালো জিনিসের খুব বড় সমঝদার ছিলেন। আর ছবির ব্যাপারেও ওনার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। এভাবে আরও বেশ কিছু জিনিস উনি কেনেন, যার আসল দাম ছিল অনেক বেশি। আস্তে আস্তে আমার শ্বশুরের সমৃদ্ধি হয়। এ ছবিটা আর উনি বিক্রি করেননি। ওনার কাছেই রেখে দেন। তার অবশ্য একটা কারণও ছিল। উনি জানতেন এ ছবি বিক্রি করা অত সহজ হবে না। কারণ ততদিনে সারা বিশ্বের কাছে এ ছবির খবর পৌঁছে গেছে। বিক্রি করতে গেলেই ধরা পড়ে যাবেন।

নেদারল্যান্ডের নিয়ম অনুযায়ী তিরিশ বছর কোনও ছবি কারুর কাছে থাকলে সেই এ ছবির মালিক হয়ে যায়। উনি তার অপেক্ষায় থাকলেন। তখন আইনত বিক্রি করতে কোনও অসুবিধে হবে না। তিরিশ বছর কাটল। উনিও ছবির আইনত মালিক হলেন। কিন্তু তার দুদিন বাদেই মারা গেলেন। আমরা ততদিনে অবশ্য ইংল্যান্ডে চলে এসেছি। এরপরে ছবির মালিক হলেন আমার স্বামী। কিন্তু উনিও এ ছবি বিক্রি করলেন না। এটা আমাদের বাড়িতেই রয়ে গেল। তা তুমি এখন ছবি বিক্রি করতে পারো, কারণ আমার চিঠি অনুযায়ী তুমিই এখন এ ছবির মালিক।

—না, আমার টাকার কোনও দরকার নেই। আপনি আমায় ক্ষমা করবেন। আপনার জন্য যা করেছি, তা তো আমি কোনও পুরস্কারের লোভে করিনি। আপনাকে অনুরোধ করব এ ছবি ফেরত নিয়ে নিন।

—তুমি এ ছবির দাম জানো তো? এ ছবি তোমাকে অবশ্য কোনও প্রাইভেট আর্ট কালেকটারকে বিক্রি করতে হবে। কিন্তু এর দাম কত হতে পারে, তা হয়তো তুমি ভাবতেও পারছ না।

আমি মৃদু হেসে বলে উঠলাম,— জানি বলেই তো আর নিচ্ছি না। আমার সত্যিই টাকার কোনও প্রয়োজন নেই। আপনি এ ছবি ফেরত নিন। আপনি এটা কোনও আর্ট মিউজিয়ামে দান করে দিন, যাতে সবাই এ ছবি দেখতে পায়।

বৃদ্ধার মুখে এতক্ষণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। বলে উঠলেন,— তোমাকে দেখেই বুঝেছিলাম। ঠিক হাতেই ছবিটা গেছে তাহলে। তুমি ওটা কোনও ভালো কাজে লাগিও। তোমাকে আমি আরও কিছু কথা জানাই। আমার স্বামী জনও খুব ভালো লোক ছিল না। ও এ ছবি একবার বিক্রিও করে। কিন্তু আসলটা নয়। এর হুবহু নকল। এ ছবি পঁচিশ মিলিয়ন পাউন্ডে বিক্রি করে এক বড় প্রাইভেট আর্ট কালেক্টারকে। আসল ছবি বিক্রি না করে অবিকল একইরকম একটা ছবি অন্য শিল্পীকে দিয়ে আঁকিয়ে বিক্রি করে। যিনি কেনেন, তিনি পরে বুঝতে পারেন যে ওনাকে ঠকানো হয়েছে। কিন্তু এমনিতেও এ ছবির কেনাবেচা খুব গোপনীয়ভাবে হয়েছিল, আইনত কেনা হয়নি, তাই ওনার পক্ষে কিছু করার উপায় ছিল না। শুনেছিলাম ওই লোকটা পরে ব্যাংকের দেনা না মেটাতে পেরে আত্মহত্যা করেছিল। আসল ছবিটা আমাদের কাছেই থেকে যায়।

বৃদ্ধা একটু থামলেন— দু-দুবার আমাদের পরিবার এ ছবিটা নিয়ে অন্যদের ঠকিয়েছে। আমি চাই না এ ছবি আমার কাছে রাখতে। সেদিন আমার ছেলে ম্যাটও এই ছবির খোঁজেই এসেছিল। কিন্তু আমি ওকে এর অন্য একটা নকল ছবি দিয়ে দিয়েছি। নিজের ছেলে তো! চাইনি ওর মধ্যেও ওর বাবা ঠাকুরদার মতো খারাপ ভাবে অর্থ রোজগারের ইচ্ছা জেগে উঠুক। আমরা খুব বড়লোক হলেও, কখনও সুখের খোঁজ পাইনি। হয়তো আমরাও এ ছবি পাওয়ার পরে ওই ক্যারাভাজ্জিওর মতোই হয়ে উঠেছিলাম। আর ঠিক যেভাবে উনি শেষজীবনে অন্ধকার থেকে আলোতে ফেরার চেষ্টা করেছিলেন, আমিও তারই চেষ্টা করছি এখন। নাও, এ ছবি তোমার কাছেই রেখে দাও। তোমার কাজে না লাগুক, তুমি এটা কোনও ভালো কাজে লাগিও।

আমি চুপ করে রইলাম। উনি আবার বলে উঠলেন— আর আমি চাইলেও তো আর ফেরত নিতে পারব না।

—কেন? পারবেন না কেন? আইনত কোনও বাধা আছে?

কথাটা বলেই থেমে গেলাম। চোখের সামনেই বৃদ্ধা যেন হাওয়াতে মিলিয়ে গেলেন। ফায়ার প্লেসের আগুনটা জ্বলছে। মোমবাতিটা জ্বলছে। কিন্তু হঠাৎ করে উনি উধাও। ঘরে কেউ নেই। কাঠের চেয়ারটা ফাঁকা। কেউ বসে নেই।

আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম। অন্য যে মহিলা আমার পিছনে এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল, আমাকে এ ঘরে নিয়ে এসেছিল, সেও নেই। আমি কোনওরকমে উঠে দাঁড়ালাম। ফায়ার প্লেসের উপরে ওনার শ্বশুরের ছবিটা চোখে পড়ল। সেদিনও দেখেছি। কিন্তু আগে লক্ষ করিনি। উনি সোফায় বসে আছেন। সোফার পিছনে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে আছে সেই মহিলা, যে আমাকে দরজা খুলে দিয়ে এখানে নিয়ে এসেছিল। সোফার অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সেই বাটলার লিয়ন, যে আমাকে সেদিন সুপ খাইয়েছিল। সেই একইরকম চেহারা। একইরকম বয়েস। ছুটে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু বাইরে এসে অবাক হয়েছিলাম। সেই রকিং চেয়ার। সেটা তখনও একইভাবে দুলে যাচ্ছে। আর তাতেও কেউ নেই। কোনওরকমে একছুটে নুড়ি ফেলা পথ পেরিয়ে গেট খুলে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলাম।

পরে বাড়ি এসে খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম যে আমি যেদিন ওনাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম, তার দুদিন বাদেই উনি মারা যান। অর্থাৎ আমি প্রথমবার ওনার বাড়ি যাই ওনার মৃত্যুর পরে।

তোমরা ভাবছ, ছবিটার কী হয়েছে, তাই তো? আমি ইংল্যান্ড থেকে ফিরে আসার আগেই ওখানকার এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় ওটা দান করি। ওরা বিভিন্ন দেশের গরিব বাচ্চাদের সাহায্য করে। শুনেছিলাম ওরা ওই ছবিটা অনেক টাকায় এক আর্ট কালেকটরকে বিক্রি করেছে। আর সে টাকা দিয়ে বেশ কিছু বাচ্চার জীবনসংস্থান হয়েছে।

আমার মনে হয় আমরা সবাই এক আলোছায়ার জগতে থাকি। কখনও সেখানে আলো, কখনও সেখানে ছায়া। সুখের খোঁজে ছোটাছুটি করতে গিয়ে আয়নায় নিজের প্রতিফলন দেখতেও ভুলে যাই। বুঝিও না যে ছায়ার মধ্যে হারিয়ে গেছি। আমারও হয়তো তাই হত। ওই ছবিটাই আমাকে সেদিন আলোর সন্ধান দিয়েছিল।

আজ আমি তাই ভালো আছি। শুধু ওই রকিং চেয়ার ফোবিয়াটা বাদ দিলে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%