অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
আজ ল্যাবে ঢুকে রোমিতকে দেখেই চমকে উঠলাম। ওর তো এ ল্যাবে ঢোকার কথা নয়! ঢোকা বারণ। কখন কীভাবে ঢুকল! আমি কী ল্যাবের দরজা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলাম!
আমার বাড়ির আর ল্যাবের মাঝে বাগান। সে বাগান পেরিয়ে ও ল্যাবে ঢুকেছে। শুধু ঢুকেছে তাই নয়, ল্যাবের ঠিক সেই কোণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে আমি কিছু জিনিস আলাদা করে রেখেছি। বাতিল জিনিসগুলোকে।
এত অজস্র জিনিসের, এত আলোর গোলকের ভিড়ের মধ্যে ঠিক ওটাই ওর চোখে পড়ল! ওটা ইচ্ছে করে আলাদা করে সরিয়ে রেখেছিলাম যাতে চট করে কারও চোখে না পড়ে। দেখলে আমারই মন খারাপ হয়ে যায়। মনে হয় কত সম্ভাবনা ছিল, কত কিছু হতে পারত। কিন্তু শেষে কিছুই হল না।
এখন আর কী করার আছে! আড়চোখে দেখলাম। ও চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখছে। এত অজস্র আলোর বিন্দুর মধ্যে ও ঠিক অন্ধকার কোনওটুকু খুঁজে নিয়েছে। ঠিক ওই ছোট গোলকটার দিকে ওর চোখ নিবদ্ধ।
রোমিত আমার একমাত্র ছেলে। ও একটু একা একা থাকতে ভালোবাসে। স্কুলেও ওর বেশি বন্ধু নেই। খেলাধুলো অতি সামান্যই করে। বাড়িতে এসে পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। ও জানে বাড়ির পিছনের এই ল্যাবে আমি আমার দরকারি কাজ করি। এখানে ওর আসা একদম বারণ।

এমনিতে খুব বাধ্য। কেন যে আজ এখানে এসেছিল, কে জানে! তবে এ বিষয়ে বকাবকি করলাম না। এতে অহেতুক জেদ বেড়ে যাবে। শুধু বললাম আর কোনওদিন যেন এখানে না আসে। ওর দেখি মুখ লাল হয়ে গেছে। মাথা নিচু করে বেরিয়ে এল।
বাড়িতে এসে আমাকে এ ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন করল না। মনে মনে খুশি হলাম। হয়তো অন্য গোলকগুলোর সঙ্গে ওই গোলকটার কোনও তফাত দেখতে পায়নি। অবশ্য দেখা সম্ভবও নয় অত সহজে। ল্যাবের সবকিছু একটা আলাদা আস্তরণের আড়ালে থাকে। সেই সময় আর মাত্রার বিভাজন রেখার জন্য সবকিছু স্পষ্ট দেখা যায় না। অহেতুক চিন্তা করছিলাম।
সেদিনের ঘটনাটার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম।
পরের কয়েকদিন খুব কাজে ব্যস্ত ছিলাম। অন্য কোনও কিছুরই সময় পাইনি। বেশ কয়েকদিন বাদে একসঙ্গে খেতে বসলাম।
আমার স্ত্রী দেখি খেতে খেতে রোমিতকে বলে উঠল— বাবুন, কী হয়েছে রে তোর? কোনও কথাবার্তা নেই? এ ক'দিন এত চুপচাপ হয়ে গিয়েছিস? স্কুলে কিছু অসুবিধে হয়েছে? কারও সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে?
আমিও ওর দিকে তাকিয়ে অবাক হলাম। সত্যি তো! এতটা চুপচাপ হয়ে গেছে কী করে! অন্যসময় খেতে খেতে নানান হাবিজাবি কথা বলে। আজ কীসব ভাবতে ভাবতে মুখে খাবার তুলছে। যেন একটা অন্য জগতে হারিয়ে গেছে। মার কথাও যেন শুনতে পেল না।
খানিকবাদে আমি জিজ্ঞেস করে উঠলাম— কী রে, কী হয়েছে তোর?
ও দেখি প্রশ্নটার কোনও উত্তর না দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল— আচ্ছা বাবা, তোমার ল্যাবে তুমি কী নিয়ে কাজ করো?
—কেন? হঠাৎ করে এ প্রশ্ন। বড়দের সবকিছু কী তুই বুঝবি? কিছু দেখেছিস?
ও দেখি চুপ করে রইল।
আমার নিজেরই মনে হল—ওকে একটু বলি। কিন্তু তার পরেই মনে হল না বলাই ভালো। বলতে বলতে আবার কী বলে ফেলব। বাচ্চাদের মনের উপরে প্রভাব পড়তে পারে।
খানিকবাদে ও আবার বলে উঠল— ওই গোলমতো জিনিসটার মধ্যে কিছু একটা যেন আছে। কীরকম সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওর রঙ পালটে পালটে যাচ্ছে। ওটা কি তোমার তৈরি করা? অন্যগুলোর মতো।
—কোনও জিনিসটা? ল্যাবে তো অজস্র গোল জিনিস আছে?
—ওই যে ল্যাবের মধ্যে আলাদা করা অংশটাতে যে একটা বল রাখা আছে না, তার কথা বলছিলাম। ওই অংশের অন্য বলগুলো যেমন পুরো কালো, এটা ঠিক সেরকমও নয়। এটার রংটা যেন পালটে পালটে যাচ্ছে। শুধু কালো অংশটা আস্তে আস্তে বাড়ছে।
—ও বুঝেছি। না-না, আমি কিছু করিনি। ওটা এমনি এমনি রঙ পালটায়। আমি ওটা তৈরি করেছিলাম অন্যগুলোর মতোই। কিন্তু কেন যে এরকম হচ্ছে বুঝতে পারছি না। কিছু এরকম সময়ে সময়ে নষ্ট হয়ে যায়। সব কী আর চিরকাল একরকমভাবে টিঁকে থাকে! তখন সেগুলো ওদিকে সরিয়ে রাখি।
ও চুপ করে গেল। কিন্তু মনে হল পুরোটা বিশ্বাস করল না। আরও প্রশ্ন আশা করছিলাম। কিন্তু ও করল না। ও কী কিছু আন্দাজ করছে? কে জানে?
এখন ও মাঝেমধ্যে ল্যাবে আসে। গত কয়েকদিনে বেশ কয়েকবার এসেছে।
এখন আমি আর ওকে বারণ করি না। আমি আমার মতো কাজ করি।
স্কুল থেকে ফিরে এসেই আমার ল্যাবে এসে ঢোকে। অবশ্য আমার কাজের মাঝে কোনও কথা বলে না।
শূন্যে ভাসমান গোলকগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লক্ষ করে। চুপ করে অন্ধকারের মধ্যে আলোর খেলা দেখে। আমার ছেলে। হয়তো আমার থেকেই নেশাটা পেয়েছে। ওর বয়সি ছেলেরা ছুটোছুটি করে বাইরে খেলবে, সেটাই স্বাভাবিক। সেটা না করে চুপ করে বসে দাঁড়িয়ে দেখে। মাঝেমধ্যে আবার খুব কাছে গিয়ে দেখে।
তবে আমার যে খারাপ লাগে তা না। এ সব আমারই সৃষ্টি। আমার এক্সপেরিমেন্টের অংশ। অবশ্য পুরোটা নয়। আমি শুধু শুরুটা করে দিই। তারপরে পুরোটাই ওদের উপরে।
শেষ কয়েকদিন পরীক্ষা করছিলাম আমার তৈরি কোয়ান্টাম জগতের কিছু কিউবিট-এর উপরে। বাটারফ্লাই এফেক্ট পরীক্ষা করছিলাম। অর্থাৎ দেখছিলাম অতীতে গিয়ে সামান্য কিছু পরিবর্তন করলে বর্তমানের কিউবিটের অবস্থান ও মানের উপরে কীরকম প্রভাব পড়ে!
যেটা ভেবেছিলাম ঠিক সেটাই প্রমাণিত হচ্ছিল। শেষপর্যন্ত কিউবিটগুলো বর্তমানে ঠিক আগের যে অবস্থায় ছিল, সেই অবস্থায় ফিরে আসছিল। অতীতে গিয়ে যে সামান্য নয়েজ বা তথ্য বিকৃতি তৈরি করেছিলাম, অবাক হয়ে দেখছিলাম যে বর্তমানে তার কোনও প্রভাব ওই কিউবিটের উপরে থাকছে না। এন্টেঙ্গেলমেন্ট এফেক্ট। কোনও কিউবিট বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে না। সব মিলিয়ে আবার ওই অতীতে যাত্রা শুরুর আগের অবস্থায় ফিরে আসে। এই কিউবিটগুলো দিয়েই তৈরি আমার এই পুরো জগৎ। এরাই আমার এই জগতের অণু-পরমাণু।
অর্থাৎ বাটারফ্লাই এফেক্ট যখন ওদের উপরে কাজ করেনি, তখন কিছু পরিবর্তনের ক্ষমতাও নেই আমার।
এখানেই আমার তৈরি কোয়ান্টাম জগৎ সব ক্লাসিক্যাল সিস্টেমের থেকে আলাদা। এখানে ভবিতব্য পালটানো যায় না। সব ভাগ্য যেন আগে থেকেই স্থির হয়ে আছে।
যাই হোক, এটা নিয়ে বেশ কয়েকদিন মেতে ছিলাম। নিশ্বাস ফেলার সময় পাইনি।
আজ আমার পড়ার টেবিলে বসে একটা বই পড়ছি, এমন সময় আমার স্ত্রী দেখি রোমিতকে নিয়ে এসেছে।
মীরা বলে উঠল—তুমি ওকে কিছুই বলছ না! কিছুই খাচ্ছে দাচ্ছে না। আমি বার বার করে বলি তোমার ল্যাবে না ঢুকতে। তবু দেখছি সেখানে রোজ যাচ্ছে। অনেকক্ষণ থাকে। তারপরে বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। পড়াশোনায় কোনও মন নেই। তুমি সেটাও লক্ষ করছ না। শুধু নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত আছো।
আমি রোমিতের দিকে তাকালাম। ও আমার দিকে একবার তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল। চোখে মুখে কী যেন বিষণ্ণতার ছাপ।
বলে উঠলাম— কী হয়েছে রোমিত?
—আচ্ছা বাবা, ওই বলের মধ্যে কী আছে? যে বলটার কথা সে দিন বলছিলাম!
—কেন? কী ব্যাপার? কোন বল?— যেন কিছুই জানি না, এমন ভাবে বললাম।
—ওই যে বলটার আলো সমানে পরিবর্তন হচ্ছে বলেছিলাম, তার মধ্যে কি কেউ আছে? আমাদের মতো লোকেরা আছে? আমার মনে হচ্ছে ওখানে অনেক লোক আছে। ওরা সবাই যেন আমাদের কাছে সাহায্য চাইছে। সবাই খুব বিপদে পড়েছে। মারা যাচ্ছে। দেখছ না বলটার রঙ কীরকম কালো হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। পাশের অন্য বলগুলোর মতো। নীল-সাদা- খয়েরি - সবুজ থেকে আস্তে আস্তে লাল হল। প্রথমে কিছু কিছু জায়গা লাল হত। তারপর সে লাল রঙ ছড়িয়ে পড়ল পুরো বলটাতে। তখনও বেশ লাগত। এখন যেন আস্তে আস্তে সব কালো হয়ে যাচ্ছে।
—কী এসে যায় ওর রঙ লাল-নীল না কালো— কী হল তা নিয়ে! এরকম বল তো আরও কত আছে। আমার পক্ষে কী আর সব ক'টার খোঁজ রাখা সম্ভব। সব নিজের মতো জ্বলে-নেভে।
—না, না, বাবা, ওই একটাই অন্যরকম। আমার মনে হয় ওর মধ্যে যেন অনেকে আছে। তারা যেন আমার আর তোমার কাছে সাহায্য চাইছে। যেন অনেকের কান্না ভেসে আসছে। যেন তারা বাঁচতে চায়।
মীরা বলে ওঠে—দেখেছ, কী সব বলছে। সারাক্ষণ কী সব উলটোপালটা কম্পিউটার গেম খেলে। এসব আজব কথা ভেবে ভেবে শরীর খারাপ হচ্ছে। পড়াশোনায় একদম মন নেই।
—না মা, আমি ওদের দেখতে পাই। ওদের কথা শুনতে পাই। মনে হয় ওরা যেন অনেকটা আমাদেরই মতো। খুব ছোট ছোট। ওরা মনে হয় কেউ আর বেশিদিন বাঁচবে না। ওদের সব কিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে। ওদের থাকার ওই বলটা নষ্ট হয় যাচ্ছে।
এবারে বকুনি দিয়ে উঠলাম— কী সব বলছিস? এসব আমার পরীক্ষানিরীক্ষার অংশ। এগুলো সব আমার কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সিমুলসেশন। এর মধ্যে কোনও প্রাণ নেই। কোনও জীবন নেই। কিছু নেই— আমি চেঁচিয়ে বলে উঠলাম।
আসলে মিথ্যে বলছি বলেই হয়তো জোর দিয়ে বলার দরকার হল।
—আমি ঠিক বলছি বাবা। তুমিও জানো। তাই আলাদা করে রেখেছ। ওই গোল বলটার মতো আর কোনও বল নেই। ওখানে আমাদের মতোই লোক আছে। ওরা সবাই কষ্টে ছটফট করছে। ওদের আমি স্বপ্নে দেখতে পাই। দেখি ওরা যেন আমার কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইছে। আচ্ছা, ওদের অন্য কোনও বলে নিয়ে যাওয়া যায় না, যাতে ওরা বেঁচে যায়? তোমার ওখানে তো এতরকম বল আছে। যেসব বল ফাঁকা পড়ে আছে, সেখানে নিয়ে গেলেই ওরা বেঁচে যাবে।
গম্ভীর হয়ে বলে উঠলাম—সে হয় না। এসব উদ্ভট চিন্তা তোর মাথায় আসে কী করে! আজ থেকে তোর সব কম্পিউটার গেম খেলা বন্ধ। এসব খেলেই তোর মাথায় হাবিজাবি চিন্তা ঢুকছে। ওগুলো সব নেহাত গোলক। কিচ্ছু নেই তাতে।
ও ফের অবুঝের মতো একই কথা বলে উঠল
—বাবা, কিছুই কী করা যায় না? তুমিই তো ওদের সৃষ্টি করেছ। তুমি নিশ্চয়ই জানো কী হচ্ছে ওখানে! তুমি ছাড়া আর কে কী করবে!
—এ বিষয়ে আমি আর একটা কথাও বলব না। তুমি পড়তে বসো গিয়ে।
রোমিত আর কিছু বলল না। চলে গেল ঘর থেকে।
সত্যি কথাটা ওকে হয়তো কোনওদিন বলতে হবে।
জানি কিছুই করা যায় না। ওর আয়ু শেষের দিকে। সে জন্যই দেখছিলাম অতীতে গিয়ে কিছু করে আসা যায় কিনা যাতে ওদের ভাগ্য পরিবর্তন করা যায়। কিন্তু সেটা করা যায় না। ভবিতব্য।
আজ রোমিত আর স্কুলে যায়নি। সারাদিন ওই বলের দিকে তাকিয়ে বসে ছিল ল্যাবে। দু-বার এসেছিল বলতে—আমি কিছু করতে পারি কিনা! এখন পুরো বলটা কালো হয়ে গেছে। মিশে গেছে পাশের অন্ধকারের সঙ্গে।
এ নিয়ম আমি লিখিনি। এ নিয়ম ভাঙার সূত্রও আমার জানা নেই। আমি ওই সব বল শুধু তৈরি করতে পারি। নানান সাইজের। ল্যাবে ওদের জগৎ তৈরি করতে পারি যেখানে ওই গোল বলগুলো বিভিন্ন নিয়মে কাছে-দূরে থেকে নানানভাবে নিজেদের চারদিকে ঘুরতে পারবে। আমি ওদের জন্য সে পরিবেশ তৈরি করতে পারি।
বাকিটা ওদের হাতে। ওরা ধাক্কা খেয়ে ভাঙে, টুকরো হয়, আবার অন্য কক্ষপথে গিয়ে ঘোরে ওদের নিজেদের নিয়মে। সেখানে আমার কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই।
কিছু দিন পরে ওরা ধ্বংস হয়ে যায়। ওদের তখন সরিয়ে নিয়ে আসি আমার বাতিলের অংশে।
এ ল্যাব আসলে আমার খেলনা ঘর। ওই ল্যাবের মধ্যে সময় অনেক তাড়াতাড়ি এগিয়ে যায়। আমি নিজেও জানি না ওখানে কীভাবে প্রথম প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়। যদিও সেটা খুব কমই হয়। কিন্তু সেটা আমার কাছে সত্যি বড় রহস্য। তারপরে কীভাবে জানি ওরা তিলে তিলে সভ্যতা গড়ে তোলে। কীভাবে ওরা ওদের নিজস্ব বিশ্ব গড়ে তোলে। ওরা ভাবে ওরাই সবকিছু— ওদের আকাশ, ওদের বাতাস— সবকিছু ওদের কথা শুনবে।
আমার ক্যালেন্ডারে ওরা থাকে শুধু কয়েকটা দিন। এর মধ্যেই ওরা ওদের সভ্যতা গড়েতোলে, তারপরে আবার আস্তে আস্তে সব ধ্বংস হয়ে যায়। কোনও চিহ্ন থাকে না। ঠিক ওই বলটার মতো।
আমার ছেলে ভুল দেখেনি। ওরা দিনের পর দিন নিজেদের গ্রহ পৃথিবীকে ধ্বংস করেছে। নিজেদের পরিবেশ নষ্ট করেছে। শেষে যখন বুঝতে পেরেছে তখন আর কিছুই করার ছিল না।
তখন ওদের জঙ্গলে জঙ্গলে আগুন ছড়িয়ে গেছে। প্রবল জল-ঝড়ে ওদের সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে। হিমবাহ গলে ওদের তৈরি সব শহর সমুদ্রের তলায় হারিয়ে গেছে। সামান্য যেটুকু জায়গা জলের উপরে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ বাঁধিয়েছে। শেষে যেটুকু বাকি ছিল তাও পরমাণু যুদ্ধে সব শেষ হয়ে গেছে। শুধু ওরাই যে শেষ হয়ে গেছে, তাই নয়, ওদের সঙ্গে শেষ হয়ে গেছে ওই পৃথিবীতে শেষ প্রাণের স্পর্শ।
রোমিত তারই লাল রঙ দেখেছিল। এখন আর কিছু বাকি নেই। সব পুড়ে গেছে। সব কালো হয়ে গেছে। ওরা নিজেদের মানুষ বলত। ওরা ওই গ্রহের বাকি সব প্রাণীর উপরে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ওখানকার জলে স্থলে আকাশে সব জায়গায় ছিল ওদের রাজত্ব। সবসময় ভাবত ওদের মতো উন্নত জীব আর কোথাও নেই, কিন্তু শেষে সব শেষ হয়ে গেল। ওরা আর কেউ নেই।
আমিই ছিলাম ওদের ঈশ্বর। ওরা চিরকাল আমার খোঁজ করে গেছে, শেষে খুঁজে পায়নি। খোঁজ পায়নি ওদের মতো অন্য কারও, অন্য কোনও গ্রহ যেখানে ওদের মতো উন্নত আরও কেউ আছে।
আসলে তারা অন্য আরেকটা সময়ে এসেছিল, আবার ওদের মতোই সময়ের দাগে মুছে গিয়েছিল। রোমিত ঠিকই বলেছিল ওই বলটা ছিল সত্যি অন্যরকম। লক্ষ কোটিতে ওরকম একবারই হয়।
মানুষ বুঝতেও পারেনি যে ওদের এই গ্রহ— ওদের এই চেনা জানা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আসলে শুধুই আমার ল্যাব, শুধুই আমার কিউবিটের জগৎ।
হ্যাঁ, অবশ্যই আমাকে স্রষ্টা বলা যায়। কিন্তু আমি নিজেই এই খেলার নিয়মকানুন কিছুই বুঝি না। এই যে আমার ল্যাবের পরিসর, ওই জগৎ কেন যে আস্তে আস্তে দিনের পর দিন বাড়ছে, কেন তা আরও ছড়িয়ে পড়ছে আমার বাগানে, তাও জানি না। কিছুদিন পরে আরও জায়গা করে দিতে হবে।
এই যে আমার নিজের এই জগৎ, যেখানে আমি আছি, রোমিত আছে, মীরা আছে, সেটাও যে কে গড়েছে তা জানি না। শুধু জানি আমার এই বিশ্বও একদিন শেষ হয়ে যাবে। আমরাও হয়তো পড়ে আছি অন্য কারও ল্যাবে। তারাও হয়তো আমার উপরে লক্ষ্য রাখছে। হয়তো আমাদের উপরে পরীক্ষানিরীক্ষা করছে।
এই সৃষ্টির রহস্য বোঝার জন্য আমি তাই আমার ল্যাবে এই এক্সপেরিমেন্ট চালাই। বিভিন্ন ধরনের গ্রহ-তারা তৈরি করে সিমুলেশন করি। বোঝার চেষ্টা করি। দিনরাত চোখ রাখি আমার সৃষ্টির উপরে। উদ্দেশ্য যদি কোনওদিন আমার মাথার উপরে থাকা এই সবুজ আকাশের রহস্য খুঁজে পাই।
সামনে রোমিত এখনও বসে কাঁদছে। কি করে যে ওদের কান্নার শব্দ ওর কাছে এসে পৌঁছচ্ছিল কে জানে! ও সত্যি হয়তো ওদের ঈশ্বর হয়ে উঠেছিল। তাই শুনতে পাচ্ছিল।
তবে এখন আর কোনও কান্নার শব্দ ওর কাছে নিশ্চয়ই পৌঁছচ্ছে না। সব থেমে গেছে। এখন ওখানে আর কেউ নেই।
তবে আমি আশাবাদী। এখানেই সব শেষ নয়। হয়তো ঠিক এই মুহূর্তে আমার ল্যাবের অন্য কোনও গ্রহে বা গ্রহাণুপুঞ্জে আবার কোনও প্রাণের সম্ভাবনা তৈরি হতে চলেছে। যারা আবার ভাববে তারাই এই মহাবিশ্বের শেষ কথা। তারাই আবার তৈরি করবে সেরা সভ্যতা। ধ্বংসের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত খুঁজে যাবে আমাকে, রোমিতকে, ওদের ঈশ্বরকে। ঠিক যেমন আমিও তাঁকে খুঁজে যাই।
কানে যেন ভেসে আসে সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর, সেই পরিচিত মন্ত্র।
'ইয়ং বিসৃষ্টির্যত আবভূব
যদি বা দধে যদি বা ন
যো অস্যাধ্যক্ষ পরমে ব্যোমন
সো অঙ্গ বেদ যদি বা নবেদ'
যিনি এই সৃষ্টির আদি উৎস, তিনি তা সৃষ্টি করুন বা নাই করুন, তিনি তা সর্বোচ্চ স্বর্গে বসে প্রত্যক্ষ করেন। তিনি হয় সবকিছু জানেন, বা হয়তো কিছুই জানেন না।
জানি না এ মন্ত্র কেন শুনতে পাই। কেন বারবার শুনতে পাই সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পরেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন