অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
প্রত্যেকবারই এখানে এসে খানিকক্ষণ বসে থাকে অরিজিৎ। ফ্র্যাঙ্কফুর্ট এয়ারপোর্টের ঠিক এই জায়গাটায়। এতবার এখানে এসেছে যে চারপাশের প্রত্যেকটা দোকান ওর অত্যন্ত পরিচিত। শুধু দোকান নয়, দোকানের ভিতরে কোথায় কী থাকে তাও অরিজিৎ খুব ভালো করে জানে।
গত পনেরো বছরে এই দোকানগুলোর চেহারা যে একেবারে বদলায়নি তা নয়। কিন্তু অরিজিৎ এতবার এখান দিয়ে গেছে যে, সে পরিবর্তনের ছোঁয়া আর আলাদা করে কোনও চমক জাগায়নি। বলা যায়, ধরাই পড়েনি। বাঁদিকের ডিউটি-ফ্রি দোকানটিতে একসময় সবরকম পারফিউম সাজানো থাকত। চার-পাঁচজন সেলস গার্ল ঘুরে বেড়াত আর প্রসপেকটিভ কাস্টমার দেখলে মুচকি হেসে 'মে আই হেল্প ইউ' জিজ্ঞেস করে যেত। একটা প্লেন থেকে নেমে আরেকটা প্লেনে ওঠার মাঝের সময়টায় টুরিস্টরা টেস্টার ব্যবহার করে গন্ধ বিচার করে বেড়াত।
আর এখন?
ওই দোকানে ঢোকামাত্র প্লেনের বোর্ডিং পাস অটোমেটিক্যালি স্ক্যান হয়ে যাবে। ওই বোর্ডিং পাস থেকেই বেরিয়ে আসবে ওই ব্যক্তির যাবতীয় তথ্য। কী পছন্দ, কী অপছন্দ। বর্তামানে কী পারফিউম ব্যবহার করেন ইত্যাদি। সে অনুযায়ী সেলস রোবটগুলো গাইড করে নিয়ে যাবে পছন্দের পারফিউম কাউন্টারে। কাউন্টারেও কিন্তু এখন আর পারফিউমগুলো রাখা থাকে না। শুধু মুখে একটা ছোট্ট মাস্ক পরে নিতে হয়। সুইচ টিপলে এক এক করে সুগন্ধীর গন্ধ ভেসে আসে। এবার সিলেক্ট করে নাও— যেরকম পছন্দ। এই হল পরিবর্তন। তা, সে পরিবর্তন তো আর শুধু ফ্র্যাঙ্কফুর্টের এয়ারপোর্টের টার্মিনাল টু-তে নয়, সে পরিবর্তন হয়েছে সর্বত্র।
দীর্ঘশ্বাস পড়ল অরিজিতের। শুধু একটা জিনিসেরই কোনও পরিবর্তন হয়নি। তা হল বুদ্ধর নিখোঁজ হওয়া। তা পনেরো বছর আগের কথা। অরিজিৎ, ডোনা আর বুদ্ধ আমেরিকা থেকে ফিরছিল ফ্র্যাঙ্কফুর্ট হয়ে। বুদ্ধর বয়স তখন সাড়ে পাঁচ। ছটফটে দুষ্টু ছেলে। যেখানেই যায়, মাতিয়ে রাখে। চেনা-অচেনা সবার সঙ্গে গিয়ে আলাপ জুড়ে দেয়। ফ্র্যাঙ্কফুর্টে সেদিন ছ'ঘণ্টার গ্যাপ ছিল। লুফৎহ্যাঁনসার কানেক্টিং ফ্লাইট বিকেল পাঁচটায়। মাঝে বেশ খানিকটা সময়। ঘুরতে ঘুরতে টার্মিনালের ঠিক এই জায়গাটায় এসে বসেছিল ওরা। ছোট্ট একটু সময়। কিন্তু তা-ই সব ওলট পালট করে দিয়ে গেল। রুমালের প্রান্ত দিয়ে চোখ থেকে নেমে আসা জলের ফোঁটাটাকে চট করে মুছে ফেলে অরিজিৎ। ঝাপসা হয়ে আসা চোখটা মুছে সেদিনের সেই স্মৃতি থেকে নিষ্কৃতি চায় অরিজিৎ। কিন্তু পায় কই? সে-ই তো ফিরে ফিরে আসে সেদিনটা।
ডোনা ওর স্কুলের এক বান্ধবীর দেখা পেয়ে কথা বলছিল। আর অরিজিৎ ওই বুদ্ধকে বসতে বলে ঢুকেছিল পাশের ইলেকট্রনিক্সের দোকানটায়। তখন ছোট ছোট ল্যাপটপ সবে বেরিয়েছে। বলা হত নেটবুক। ওই নেটবুকই দেখতে ব্যস্ত ছিল অরিজিৎ। মিনিট দশেক বাদে যখন বেরিয়ে এল তখন বুদ্ধও নেই, ডোনাও নেই। হয়তো ডোনার সঙ্গেই কোথাও গেছে বুদ্ধ। পাশের একটা বই-এর দোকানে ঢোকে অরিজিৎ। বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে থাকে। এরকমভাবে যে কতক্ষণ সময় কেটেছে কে জানে! হুঁশ ফেরে ডোনার কথায়।
'আই, আর তো মোটে দেড়ঘণ্টা বাকি আছে। আবার সিকিউরিটি চেক হবে। এবার যেতে হবে, চলো। সিকিউরিটি চেক-এও সময় লাগবে। কোনও কোনও গেটে দিয়েছে দেখেছ?'

'আট নম্বর', বলে একটু থেমে বুদ্ধকে পাশে না দেখে অরিজিৎ বলে ওঠে, 'বুদ্ধ কোথায়?'
'কেন, ও তো তোমার সঙ্গে ছিল।'
দুজনে মিলে বই-এর দোকানটা থেকে বেরিয়ে আসে। বসার জায়গাটার পাশে কোথাও লুকিয়েছে কিনা তা একবার দেখে নিয়ে আশেপাশের দোকানগুলোতে খুঁজতে থাকে। বুদ্ধ দুষ্টু হলেও না বলে চলে যাবে এমন ছেলে নয়।
আধঘণ্টা ধরে ওরা খুঁজে চলে। না পেয়ে পাগলের মতো জিজ্ঞাসা করতে থাকে— যাকে পায় তাকে।
'দেখেছেন? লাল-সবুজ ডোরাকাটা জামা, নীল প্যান্ট। বছর পাঁচেকের। এই— এই সাইজের।' কোমরের উচ্চতায় হাত রেখে অরিজিৎ জিজ্ঞেস করে।
এইসব ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে প্রতিমুহূর্তে কোনও না কোনও ফ্লাইট নামছে। আবার প্রতিমুহূর্তে কোনও না কোনও ফ্লাইট চলে যাচ্ছে পৃথিবীর অন্য কোনও প্রান্তে। কিন্তু তা বলে যে কোনও ফ্লাইটে উঠে বসা অত সোজা নয়। প্রত্যেকটার আগে আলাদা আলাদা সিকিউরিটি চেক হয়। তারপরে বোর্ডিং পাস চেক করে দেখে অন্তত দুজন। আর বাচ্চা একা থাকলে তো কথাই নেই। নিশ্চিত না হলে কখনোই কোনও এয়ারলাইন্স তাকে ফ্লাইটে উঠতে অ্যালাউ করবে না।
খানিকবাদে ওরা এয়ারপোর্ট পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তখন আরও একঘণ্টা কেটে গেছে, ফ্লাইট মিস করা একেবারে নিশ্চিত। অনেক টাকা গচ্চা। নন-রিফান্ডেবল টিকিট। নতুন টিকিট কাটতে হবে। সে যাক। এখন যে করেই হোক বুদ্ধকে খুঁজে বার করতে হবে।
অরিজিতের মাথা আর কাজ করছে না। ও ধপ করে ডোনার পাশে বেঞ্চে বসে পড়ে। ডোনা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে।
'মন শক্ত করো ডোনা। নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। কখনও শুনেছ যে কেউ কোনো এয়ারপোর্ট থেকে হারিয়ে গেছে? ওরা চারদিকে খবর পাঠিয়ে দিয়েছে। আমার কাছ থেকে ওর একটা ছবিও নিয়ে গেছে। খানিকক্ষণের মধ্যেই আমরা জানতে পারব।'
কিন্তু সে খবর আর পায়নি ওরা। পনেরো বছর কেটে গেছে। কী না করেছে? পুরো এয়ারপোর্টের সিসিটিভি ফুটেজ খুঁটিয়ে দেখা হয়েছে। কোনওরকমে ইমিগ্রেশন এড়িয়ে যদি এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আসে একথা ভেবে ফ্র্যাঙ্কফুর্ট শহরেও খোঁজাখুঁজি হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। পুরো এয়ারপোর্ট চিরুনি তল্লাশি হয়েছে। প্রত্যেকটা টার্মিনালে। সব প্লেনের যাত্রীতালিকা খুঁটিয়ে দেখা হয়েছে। সেদিন যত বাচ্চা ফ্র্যাঙ্কফুর্ট হয়ে ট্রাভেল করেছে, তার লিস্ট দেখা হয়েছে। তবু বুদ্ধকে পাওয়া যায়নি। নিরুদ্দেশের ছবি হয়ে রয়ে গেছে।
প্রত্যেক বছর অন্তত ছ'বার অরিজিৎ আসে এখানে। কেন আসে তা ও নিজেও জানে না। ওকে এখন এখানকার সবাই চিনে গেছে। এখন সব চুল উঠে মাথা জোড়া টাক। মুখে বয়সের ছাপ। পায়ের জোর খানিকটা কমে এসেছে। আগে ভালো ফুটবল খেলত। কিন্তু দুবার হাঁটুর অপারেশনের পর খেলা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছে।
জ্বলন্ত দৃষ্টিতে সামনের দোকানটার দিকে তাকায় অরিজিৎ। ওই দোকানটার জন্যই যত গন্ডগোল। যদি না ও ওইদিন নেটবুকটা দেখতে যেত— যদি না ওইদিন ফ্র্যাঙ্কফুর্ট আসত, যদি না— নাহ অরিজিৎও জানে যে এই যদিরই নাম ভাগ্য। আর এরকম ক'টা মুহূর্তই জীবনের সবকিছু পালটে দিয়ে যায়।
আজ ওর সঙ্গে না আছে বুদ্ধ, না ডোনা। অথচ জীবনটা অন্যরকমও হতে পারত। হয়তো, ওই ছেলেটার মতো— সামনের সোফায় বসা বছর চব্বিশের ছেলেটার মতো— বুদ্ধও আজ এখানেই থাকতে পারত।
'বুদ্ধ', বিড়বিড় করে বলে উঠল অরিজিৎ। তারপরেই পাশের আফ্রিকান লোকটার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল—ওকেই লক্ষ করছে। ইনফ্যাক্ট আরও যে অনেকের লক্ষ ওরই দিকে তাও ও জানে। জার্মানিতে অনেকেই বুদ্ধর হারানোর ঘটনাটা জানে। আর এও জানে যে তার আকর্ষণে প্রতিবছর বারবার এই টার্মিনালের ঠিক এই জায়গায় ছুটে আসে বুদ্ধর বাবা।
এখনও তিনঘণ্টা সময় আছে পরের ফ্লাইটের আগে। অরিজিৎ টলমল করতে করতে উঠে দাঁড়ায়। ট্রলি ব্যাগটাকে সঙ্গে নিয়ে বাথরুমের দিকে এগোয়। চিন্তায় এতটাই বিভোর যে আশপাশের ব্যস্ত হাঁটাচলার চেহারাটা ওর চোখে পড়ে না। মনে হয় সব যেন থেমে আছে। ঠিক যেমনভাবে ওর পৃথিবীটা থেমে আছে গত পনেরো বছর ধরে একই জায়গায়।
বাথরুমে ঢোকার ঠিক আগেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে অরিজিৎ। টয়লেটের ঠিক আগেই বাঁদিকে একটা সরু প্যাসেজ চলে গেছে। আশ্চর্য, এটা তো কখনও চোখে পড়েনি! নতুন হয়েছে? নাহ, তাও তো নয়। অন্তত দেওয়ালের চেহারা বা পথের চেহারা দেখে তো তা মনে হচ্ছে না। আরেকটা অবাক ব্যাপার। সব প্যাসেজেরই সামনে মার্কিং করা থাকে। কোনওটা গেছে গেট ১-৮, তো কোনওটা ৯-১৫, কোনওটাতে এলখা আছে লাউঞ্জে যাওয়ার রাস্তা। কিন্তু এটাতে সেরকম কিছুই এলখা নেই। আর রাস্তাটাও সরু। আচ্ছা, বুদ্ধ সেদিন এদিকে আসেনি তো? ভাবনাটা যে কতটা অলীক তা অরিজিৎ জানে। আর গেলেও তো সে পনেরো বছর আগেকার কথা। সময়ের পিছন দিকে তো আর হাঁটা যায় না। তবু মনে হল আরেকটু এগিয়ে দেখাই যাক না।
রাস্তাটা কীরকম অন্য ধরনের। এয়ারপোর্টের অন্য জায়গার মতো ঝকঝকে সাদা আলো নেই। কীরকম একটা নীলচে আলো ওপর থেকে এসে পড়েছে সরু রাস্তাটার ওপর। ওই রাস্তা ধরেই এগোতে থাকে অরিজিৎ। বেশ খানিকটা যাওয়ার পর রাস্তাটা এসে শেষ হয়েছে একটা কাঠের দরজার সামনে। তার ওপরে লেখা 'প্রজেক্ট বক্স'। লেখাটা সবুজ আলোতে ফুটে উঠেছে।
দরজাটা খোলার চেষ্টা করল অরিজিৎ। বন্ধ। নীচ থেকেও কোনো আলো আসছে না। তাহলে কি কেউ নেই? দরজাতে কান পাতল অরিজিৎ। একটা ইনস্ট্রুমেন্টের আওয়াজ ভেসে আসছে। দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিল। তবু কোনও সাড়াশব্দ নেই। হয়তো ভিতরে কেউ নেই। ফিরেই আসছিল। কিন্তু, মনে হল আরেকটু দেখা দরকার। এবার আরও জোরে ধাক্কা দিল অরিজিৎ। ভিতরে কেউ থাকলে নিশ্চয়ই শুনতে পাবে। কিন্তু নাহ, এবারও কোনও সাড়াশব্দ মিলল না। হঠাৎ চোখে পড়ল দরজার পাশের দেওয়ালে লিফটের সুইচের মতো একটা স্বচ্ছ সুইচ। টিপতেই কাঠের দরজাটা পাশাপাশি খুলে গেল।
স্বল্প আলোকিত একটা ঘর। সারা ঘর জুড়ে হালকা সবুজ আলো। ঘরে কেউ নেই, একটা মিউজিক আস্তে বাজছে। দেওয়ালে প্রজেক্ট এক্স সম্পর্কে নানা কথা লেখা আছে। দেওয়াল মানে অবশ্য বিশাল কম্পিউটার স্ক্রিন— যার উপরে ফুটে উঠেছে পৃথিবীর ম্যাপ, কিছু লোকের ছবি, ডি. এন. এ-র ছবি। হেড সেট লাগিয়ে বর্ণনাও শোনা যাচ্ছে।
অরিজিৎ প্রজেক্ট এক্স-রে হিস্ট্রি শুনতে থাকে। ২০১১-এ দশজনকে এই প্রজেক্টে নেওয়া হয়। তাদের বয়স ছিল পাঁচ থেকে ষাটের মধ্যে। এই দশজনকে স্পেশালি সিলেক্ট করা হয়েছিল তাদের অস্বাভাবিক কিছু ক্ষমতার জন্য। যেমন থমাস ক্যুরিয়নকে নেওয়া হয়েছিল ফটোগ্রাফিক মেমারির জন্য। জিয়োভানি পারসানো— ১০০ মিটার দৌড়ে যে পরপর দু'বার অলিম্পিকে সোনা জিতে বিশ্বরেকর্ড করেছিল, তাকেও নেওয়া হয়েছিল। নেওয়া হয়েছিল বিখ্যাত বক্তা সাংচেন শুশাইকেও, যার কথা শুনে হাজার হাজার লোক মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে থাকত। এরকম আরও সাতজনের কথা লেখা। এদের সবাই যে খুব পরিচিত ছিল তা নয়। যেমন, সারা প্যাগানেলা— ষাট বছরের এই বৃদ্ধাকে দেখতে লাগত বছর তিরিশেকের মতো। এদের সবাইকে নেওয়ার উদ্দেশ্য পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখা এদের জিনে কী ব্যতিক্রম থাকার জন্য এদের এরকম অস্বাভাবিক ক্ষমতা আছে। সেই ডি.এন. এ মার্কারগুলো চিহ্নিত করে মিউটেশনের মাধ্যমে উন্নততর মানব প্রজাতি তৈরি করা। এমন এক শ্রেণির মানুষ তৈরি করা যাদের বয়স বাড়বে না, যারা ছুটবে চিতাবাঘের মতো, যাদের গায়ের জোর হবে খুব বেশি...।
আশ্চর্য, এসব যে হচ্ছে তা তো আদৌ জানা ছিল না অরিজিতের। হয়তো গোপনীয়তার কারণে এ খবর কোথাও বেরোয়নি। ২০১১-তে এ জায়গা থেকেই উধাও হয়ে গেছে বুদ্ধ। কিন্তু বুদ্ধ! ও তো তখন মোটে পাঁচ বছরের। একদম সাধারণ—ভাবতে গিয়ে চমকে উঠল অরিজিৎ। সত্যিই কি বুদ্ধ সাধারণ ছিল?
মনে পড়ল, বুদ্ধ একদম খেতে চাইত না, বলত সবকিছুতে পোকা আছে। খাবারের উপর নাকি পোকা ঘুরে বেড়ায়। নানান ডাক্তার দেখিয়েছিল, তারা সবাই বলত এটা ওর মানসিক। খেতে না চাওয়ার বাহানা। এখানে আসার ঠিক দু'দিন আগেই অরিজিৎ জানতে পেরেছিল এর আসল রহস্য। বুদ্ধর অস্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তির কথা। টেস্ট করে দেখেছিল বুদ্ধর দৃষ্টিশক্তি ঈগলের থেকেও শক্তিশালী। ও মাইলখানেক দূর থেকেও কোনও কিছু দেখতে পারে। আর খুব ছোট লেখাও পড়ে ফেলতে পারে। এটা জানতে পারার দু'দিন বাদেই ও এখান থেকে হারিয়ে যায়।
উত্তেজিত হয়ে ওঠে অরিজিৎ। তাহলে কি বুদ্ধও এখানেই আছে? সারা গায়ে শিহরন জাগে অরিজিতের। অনিরুদ্ধ রয়। বুদ্ধর ভালো নাম। নামটা খুঁজতে থাকে অরিজিৎ নাহ, ওর নামটা তো নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অরিজিৎ। একটু আশার আলো দেখেছিল।
'দিস ইজ নট দ্য ফুল লিস্ট। দেয়ার আর আদার্স', গলা শুনে চমকে ঘুরে দাঁড়ায় অরিজিৎ। একজন মাঝারি হাইটের সাহেব অরিজিতের সামনে। টাকমাথা, শুধু মাথার পিছন দিকে গোল করে চুল। গায়ে বাদামি জ্যাকেট। পায়ে স্পোর্টস শু।
'বাঙালি? তাহলে বাংলাতেই বলি,' বলে ট্রান্সলেটরের সাহায্যে লোকটা যান্ত্রিক উচ্চারণে বলতে থাকে, 'এর বাইরেও অনেককে নেওয়া হয়েছিল। এখানে শুধু তাদের নাম আছে যারা স্বেচ্ছায় এতে যোগ দিতে রাজি হয়েছিল। তা না হলে তো হইচই পড়ে যেত।'
'বাকিরা? তাদের নাম জানার কোনও উপায় আছে?'
'তুমি কি বিশেষ কাউকে খুঁজছ?'
'হ্যাঁ, আমার ছেলে।' কান্নায় অরিজিতের গলা অবরুদ্ধ হয়ে আসে। 'আমার পাঁচ বছরের ছেলে। নাম অনিরুদ্ধ রয়। প্রায় পনেরো বছর আগে এখানে হারিয়ে যায়।'
'কীরকম দেখতে?'
'নীলচে চোখ। বাঁ চোখের পাশে কালো আঁচিল।'
'বুঝতে পেরেছি। অনিরুদ্ধকে চিনি।' লোকটা বলে।
'কোথায়? কোথায় ও?' চেঁচিয়ে ওঠে অরিজিৎ।
চুপ করে থাকে লোকটা।
'কী... কী হয়েছে বুদ্ধর? ও বেঁচে আছে তো?' লোকটা চুপ করে থাকায় সব থেকে খারাপ চিন্তাটাই আগে মাথায় আসে অরিজিতের।
'হ্যাঁ, তা আছে। তবে তোমার সামান্য দেরি হয়ে গেছে। মাত্র দু'দিন আগে ওকে মঙ্গলে পাঠানো হয়েছে। বসতি বানানোর কাজে। ফিরে আসবে আরও সাত বছর পরে। যেতে-আসতেই তো সাড়ে ছ'বছর লেগে যায়।'
অরিজিৎকে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লোকটা ফের বলে ওঠে, 'আয়্যাম রিয়ালি স্যরি। দু'দিন আগে এলেই দেখা পেতে পারতে। তবে সাত বছর ওয়েট করতে হবে না যদি তুমি নিজেই মঙ্গলে চলে যাও। ও তো ওখানে ছ'মাস থাকবে। তবে তাতে অনেক অনেক খরচ তা তো জানই।'
'আমার যা আছে সর্বস্ব দিয়েও যদি মঙ্গলে যাওয়া যায় আমি যাব। ও ছাড়া আমার আছেই বা কে? আমি যাব। আমার সারা জীবনটাই তো ওর অপেক্ষায় কেটে গেছে।' উত্তেজিত হয়ে অরিজিৎ বলতে থাকে। চোখ থেকে জলের ধারা নামতে থাকে। আনন্দাশ্রু।
অরিজিৎ হাসপাতালে বিছানায় উঠে বসে। 'বুদ্ধ, বুদ্ধ কোথায়?'
তিনজন ডাক্তার সাদা গাউন পরে অরিজিতের বিছানার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। তারমধ্যে একজন ডাক্তার পিট। চোখে ডিম্বাকার ফ্রেমের চশমা। জিজ্ঞাসা করেন, 'কেমন মনে করছেন? শরীর কেমন লাগছে?'
'বুদ্ধ, বুদ্ধ কোথায়? আমি ওর কাছে যাব। মঙ্গলে। আমাকে যেতে দিন প্লিজ', কাঁদো কাঁদো গলায় বলে অরিজিৎ।
'বুদ্ধ বলে আপনার কোনও ছেলে নেই। কোনওদিন ছিলও না। পুরো গল্পটা আমাদেরই সৃষ্টি। এর সাহায্যে।' — অরিজিতের দিকে একটা ছোট যন্ত্র এগিয়ে দেয় পিট। 'এটাই আপনার নার্ভাস সিস্টেমের ওপরে কাজ করে এ ঘটনাটা তৈরি করেছিল। আপনি স্বপ্নে তাই দেখছিলেন।'
অরিজিৎ অবিশ্বাসী চোখে বলে ওঠে, 'না না, এ হতে পারে না। এত স্পষ্ট! কোথায় গেলেন ওই ভদ্রলোক, আমার ছেলের কথা বললেন?' মাথা ঘুরিয়ে উদভ্রান্তের মতো চারদিক দেখতে থাকে অরিজিৎ।
'একটু মনে করিয়ে দিই। আপনার ছেলের নাম বুদ্ধ নয়, সোম। আপনি সোমের জন্যই আমাদের কাছে এসেছিলেন। আর সে কারণেই আমরা এই পুরো গল্পটা আপনার মস্তিষ্কে আরও করতে বাধ্য হই।'
একটু অবাক হয়ে খানিকক্ষণ বসে থাকে অরিজিৎ। আস্তে আস্তে সব কথা মনে পড়ে ওর। হ্যাঁ, এবার মনে পড়ছে বটে। 'তাহলে বুদ্ধ বলে কেউ নেই!'
'ঘটনাটা সত্যি। তবে আপনার সঙ্গে লিঙ্কড নয়। অন্য একজন তার ছেলেকে হারিয়েছিল ওই এয়ারপোর্টে। তারপর পনেরো বছর ধরে সে ছেলেকে খুঁজেছিল। পরে সে পাগল হয়ে যায়। বহু বছর আগের ঘটনা। সেই ঘটনাকে নিয়েই আমাদের এই গল্প তৈরি। যখনই আপনার মতো কেউ আসে তখন আমরা তাদের এই গল্পটা বলি, যদি তারা তাদের ভুল বুজতে পারে।'
'কিন্তু আমার হয়েছেটা কী?' বলেই থেমে যায় অরিজিৎ। পিটের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি।
'মনে পড়ছে না; সোমের কথাটা?'
এবার অরিজিতের খেয়াল হয়।
পিট আবার বলে ওঠে, 'তাহলে আপনার ডিসিশনটা কী? সোমকে কি মেরে ফেলা হবে? আপনি ওকে চান না?'
'না না', আর্তনাদ করে ওঠে অরিজিৎ। 'আমি ওকে আমার ছেলে বলে অ্যাকসেপ্ট করছি।'
সম্পতিসূচক মাথা নেড়ে পিট বলে ওঠে, 'রাইট ডিসিশন। সমাজ অনেক পালটে গেছে। তবুও সামান্য বার্থ ডিফেক্টের জন্য আপনার ক্লোনড ছেলেকে মেরে ফেলাটা মানবিক নয়। হাজার হোক ও তো আপনারই ছেলে। ওর শরীরে তো আপনারই রক্ত। সব থেকে বড় কথা ওরও তো একটা জীবনের অধিকার আছে। এত ছোট কারণে সে অধিকার কেড়ে নেওয়া উচিত নয়।'
'তা এটাই তো আপনার ফাইনাল ডিসিশন?' পাশ থেকে ড . সাইমন বলে ওঠেন। 'হাতের আঙুলে ডিফেক্ট থাকা সত্ত্বেও আপনি সোমকে, আপনার ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখতে চান, ঠিক তো?'
'অবশ্যই। ও তো আমারই ছেলে। তা ও যেরকমই হোক না কেন। ছেলের খোঁজে কেউ পনেরো বছর অপেক্ষা করতে পারে, আর আমি ওকে...,' কথাটা শেষ করতেও লজ্জা হয় অরিজিতের।
সময় বদলে গেছে। মানুষ নিজের ইচ্ছেমতো ডি. এন. এ থেকে ক্লোন করে বাচ্চা তৈরি করতে পারে অনেক সহজে। সহজে পাওয়া যায় বলেই হয়তো প্রাণের দাম গেছে কমে। তাই বাচ্চার সামান্য ডিফেক্ট থাকলেও আবার করে এক্সপেরিমেন্ট করতে চান এনারা। সোমের মতো ডিফেক্টিভ বাচ্চারা যাতে হারিয়ে না যায়, বাঁচার সামান্য সুযোগ পায়, সে জন্যই এই গল্পের সাহায্য নেন পিটেরা। যারাই এই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়, খানিকক্ষণের জন্য হলেও, তারাই ডিসিশন চেঞ্জ করে। সন্তানকে স্বীকার করে নেয়। পিটের অভিজ্ঞতা অন্তত সেরকমই বলে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন