অনাথবন্ধু

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

আলুকাবলি খেতে খেতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিশ্বজিৎদা বলে উঠল। 'সকলের জন্য সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।— কী লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ!'

প্রতিবাদ জানালাম— 'রবীন্দ্রনাথ নয়, কামিনী রায়।'

'সে যাই হোক বুকলি ঘোচুকে লিখলেন তা দিয়ে কি এসে যায়। আসল কথাটা বুঝলেই হল। আমিও এই কথাটাই ভেবে ভেবে গত সাত-আটদিন নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। অন্যের জন্য কিছুই করা হল না।'

'হ্যাঁ, সে তোমার ওই আলুকাবলি খাওয়া দেখেই বোঝা যায়।'

'যাঃ, এই ফেলে দিলাম।'— বলে বিশ্বজিৎদা চেটে খাওয়া শালপাতাটাতে আরেকবার চোখ বুলিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দিল। তারপর বলে উঠল— যাহোক, যা হবার হয়ে গেছে। গতস্য শোচনা নাস্তি। আর একটা দিনও নষ্ট নয়। আমি একটা প্ল্যান করেছি। একটা ফ্রিস্কুল খুললে কেমন হয়? দেশের মূল সমস্যা তো অশিক্ষা। আর গরিবদের শিক্ষার সুযোগ কোথায়।

আমরা সবাই মিলে চেঁচিয়ে উঠলাম— খুব ভালো হয়। খুব ভালো হয়। ভোম্বল বলল— 'আমিও পড়াব।'

বিশ্বজিৎদা বলে উঠল— 'হ্যাঁ, তুই পড়াবি না! তুই ক্লাস সিক্সে পড়াস। এই নিয়ে তো বারতিনেক ওই ক্লাসে ফেল করলি। ক্লাস সিক্সের পড়ার ব্যাপারে তোর রীতিমতো অভিজ্ঞতা আছে বলতেই হবে।'

'আহ, তুমি এত ভোম্বলের পিছনে লাগো কেন বল তো? তুমিও তো বি. এ. ফেল!'

'কিছু না জেনে বকিস না! আমার সময় বি.এ.তে ফেল না করলে লোকে সম্ভ্রমের চোখে দেখত না। ইউনিয়ন লিডারও হওয়া যেত না। যে যত্তো বেশিবার ফেল করেছে, সে কলেজের তত্তো সিনিয়র লিডার। দেখিস না দেশের বড় বড় মন্ত্রীদের! তা সে কথা ছেড়ে আসল কথায় আসা যাক। আজ থেকে আমাদের প্রত্যেককে স্কুলের জন্য যে কোনও ধরনের আত্মত্যাগে প্রস্তুত থাকতে হবে। ঘোচুর বাড়ির একতলায় স্কুল হবে।'

আমি আঁতকে উঠলাম— 'আমার বাড়ির একতলায় কিন্তু দিদিমা যে একতলার ঘরে...'

'থাম ঘোচু। দেশ আগে, না দিদিমা আগে। দিদিমাকে বার করে দে, অথবা দিদিমাকে বল আমাদের স্কুলে ভর্তি হতে।' একটু থেমে বিশ্বজিৎদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে ফের বলে উঠল— 'আমাদের স্কুলের নাম হবে অনাথবন্ধু। বলতো ভোম্বল, অনাথবন্ধু মানে কী?'

'কি আবার! বন্ধুদের অনাথ করা।'— ভোম্বল বলে উঠল।

বিশ্বজিৎদা সায় দিয়ে বলে উঠল—'আমরা পরশু থেকে স্কুলের ব্যাপারে লিফলেট বিলি করব।'

দুদিন পরে রাস্তোয় রাস্তায় বিজ্ঞপ্তি পড়ে গেল। 'বিনা খরচে সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করুন। অনাথবন্ধু স্কুল। শেখাবেন কৃতী ও অভিজ্ঞ ছাত্রেরা। প্রধান শিক্ষক বিশ্বজিৎ মিত্র।'

ভোম্বলের মতো সুদীপ আর শান্তনুও আছে যাদের একাধিক বার এক ক্লাসে ফেল করার অভিজ্ঞতা আছে। তাই অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু কৃতী কথাটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম। তাতে বিশ্বজিৎদা একটা জনপ্রিয় চ্যানেলে কৃতী বলে যাদের মাকে মধ্যে আলোচনায় ডাকা হয় তাদের উদাহরণ দিয়ে বলে উঠল— ওরা যদি কৃতী হতে পারে, তাহলে আমরা সবাই কৃতী। আমাদের ভোম্বলও।

এর সঙ্গে সঙ্গে হাজার খানেক লিফলেটও তৈরি করলাম। খানিকক্ষণের মধ্যেই যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার আশেপাশের অজস্র লিফলেট জড়ো হল। লোকে নিচ্ছে, দেখছে আর ফেলে দিচ্ছে। একজন উৎসাহী মহিলা একটা নিয়ে খানিকটা গিয়ে ফিরে এসে আরও দুটো চাইলেন উৎসাহে আরও তিনটে দিলাম। ওনার চেনাজানার মধ্যে বেশ কয়েকটা ছেলেমেয়ে আছে হয়তো। কিন্তু না ওকি! খানিক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে গেলেন উনি।

'কই কই, দেখি শার্টের কোথায় কাকে পায়খানা করেছে!' বলে কাগজের সদ্ব্যবহারে ব্যস্ত হলেন।

ভোম্বলের বাবা একটা জিনিসই সহ্য করতে পারেন না। তা হল সিনেমা দেখা। ভোম্বল একটা সিনেমাহলের সামনে দাঁড়িয়ে লিফটে বিলি করছিল। হঠাৎ কোত্থেকে ওর বাবা এসে হাজির।

ছিঃ ছিঃ ভোম্বল, তুই এতটা নীচে নেমে গেছিস। সিনেমার টিকিট ব্ল্যাক করছিস।— বলে হিড়হিড় করে ভোম্বলের কান টানতে টানতে কোথায় উধাও হলেন। ভোম্বল কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু কানের টানে কিছুই বলতে পারল না।

লিফলেটের ভাষাটা এখনও বলা হয়নি। ওটা বলা যাক।

'মহাশয় সবিনয় নিবেদন,

আমাদের বেপরোয়া ক্লাবের পক্ষ থেকে অবৈতনিক স্কুল খোলা হচ্ছে। আপনাদের অশিক্ষিত ছেলেরা যাতে আপনাদের মতো অশিক্ষিত না হয়, সেই মহৎ উদ্দেশ্যেই এই স্কুল। এই উপলক্ষে আপনারা সবান্ধবে স্কুলে উপস্থিত থেকে বাধিত করবেন।'

একজন ষণ্ডামার্কা লোক পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। ডেকে দিলাম। বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়ল। ফিরে এসে জিজ্ঞেস করল—তুমি লিখেছ?

পুরো কৃতিত্ব আমারই প্রাপ্য। একটা বিয়ের কার্ড থেকে খানিকটা ভাষা চুরি করে লিখেছিলাম। লজ্জার হাসি হেসে বিনয়ের সঙ্গে বললাম 'হ্যাঁ'।

'এক চড়ে দাঁতগুলো ফেলে দেব। আমাকে অশিক্ষিত বলা। সবান্ধবে স্কুলে ভর্তি হতে বলা। ছোঁড়া এসেছে শেখাতে!' লোকটা হাত নাড়িয়ে মুখভঙ্গি করে বলে উঠল।

না, আপনি অশিক্ষিত থাকতে চাইলে, সেরকমই হবে— বাধা দেব না। শুধু আপনার ছেলেকে শিক্ষিত করব।'— আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

'চামড়া ছাড়িয়ে নেব মেরে।' বলে লোকটা আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। জনা কয়েক লোক এসে আমায় উদ্ধার করল। কিন্তু ততক্ষণে আমি কয়েকটা রামচড় খেয়ে গেছি।

আমরা সবাই সন্ধেতে ফের জমায়েত হলাম। আমি গালে, ডোম্বল কানে হাত বোলাচ্ছি দেখে বিশ্বজিৎদা বলে উঠল— 'দেখ ভালো কাজে বাধা একটু আসে। ওতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। তা আমরা কে কোন ক্লাসে কে কোন সাবজেক্ট পড়াব সেটা একটু ঠিক করে নিই।'

একেকজনের উপর একেটা সাবজেক্ট পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হল। আমার উপরে অঙ্ক। দাদু-বাবা-মা প্রত্যেকেই অঙ্কে বেশ ভালো ছিলেন। আশা করা যায় উত্তরাধিকার সূত্রে আমারও অঙ্কে ভালো দখল থাকবে। হাফিয়ার্লিতে ১০০তে ১০ পাওয়ার কথাটা আর বললাম না।

বিশ্বজিৎদা দুটো বড় ছবি ফ্রেমে বাঁধিয়ে এনেছে। স্কুলের দেওয়ালে টাঙানো হবে। একটা বিদ্যাসাগরের অন্যটা নিজের। আমাদের কথা চলছে এর মধ্যে এক মোটাসোটা কালো মাঝবয়সি মহিলা ঘরে ঢুকলেন। সঙ্গে বছর আটেকের ছেলে। তার চোখেমুখে ছটফটে ভাব। রাস্তার চটি পরে ঘরে ঢুকতে বারণ করায় ছেলেটা বলে উঠল— 'হাজারবার ঢুকব।' তারপর ওর মার দিকে তাকিয়ে নালিশ করল। 'মা এমন হলে আমি কিন্তু পড়ব না।' আমরা সবাই হাই-মাই করে উঠলাম। বিশ্বজিৎদা মিছরি ভেজানো গলায় বলে উঠল— 'না, ভাইটু চটি পরবে না কেন, অবশ্যই পরবে। চটি পরেই খাটে বস।'

ছেলেটা একটু শান্ত হয়ে বসে আমার খাটের উপর রাখা রবীন্দ্র রচনাবলীর পাতা ছিঁড়ে নৌকা বানাতে লাগল। বিশ্বজিৎদার গদগদ ভাব। পারলে শরৎ রচনাবলীও ছেলেটার হাতে দিয়ে বসে।

'তা আপনাদের টিফিনের কি ব্যবস্থা আছে?' মহিলা গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন।

'না, আমরা তো টিফিন নিয়ে এখনও কিছু ভেবে দেখিনি।'

'কি? দেবেন না। টিফিন দেবেন না তো ও আসবে কি জন্যে! চল কালু। স্কুল খুলেছে। অথচ জানে না ফ্রি স্কুলে খাওয়াতে হয়।'

কালুকে নিয়ে মহিলা গটগট করে বেরিয়ে গেলেন। বাইরে ঝনঝন করে আওয়াজ হল। কালু কাচের জানলার উপর ঢিল ছুড়ে লক্ষ্য পরীক্ষা করে বেরিয়ে গেছে।

পরের কদিনে কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী পাওয়া গেল। এদের মধ্যে আছে শান্তি। প্রতীকদের কাজের মেয়ে। আমাদের ক্লাবের সদস্যরা বাড়ির কাজ করে দেবে এ শর্তে প্রতীকের বাবা শান্তিকে স্কুলে পাঠাতে রাজি হয়েছেন। বুবলে, আমাদের ফুচকাওয়ালা ফুচুকাকুর ছেলে ভর্তি হয়েছে। বুবলেকে আমরা পড়াশোনা শিখিয়ে নষ্ট করে দিতে পারি বলে ফুচুকাকুর যে এমনভাবে পড়ার যাতে ও বড় হয়ে ফুচকাওয়ালাই হয়।

গণু আমাদের গয়লার মেয়ে। সেও অন্যতম ছাত্রী। গণুকে রাজি করাতে গিয়ে বিশ্বজিৎদাকে খুন্তির ছ্যাঁকা খেতে হয়েছে। গণুর মাকে বিশ্বজিৎদা গিয়ে বলেছিল আপনার মেয়েকে নিতে এসেছি মাসিমা। গণুর মা যে ওইটুকু একটা কথার পরে এতখানি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে তা আমরা কেউ ভাবতে পারিনি। শুধু দূর থেকে দেখলাম তাগড়াই বিশ্বজিৎদা পাই-পাই করে ছুটছে আর তার পিছন পিছন গণুর মা খুন্তি হাতে। বলতে বলতে চলেছে, 'কি সাহস হতচ্ছাড়ার বলে কিনা মেয়েটাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাবে।' — আমরা পরে অবশ্য সদুদ্দেশ্যটা বুঝিয়েছিলাম। কিন্তু তার আগেই খুন্তি বিশ্বজিৎদার পিঠে স্থান করে নিয়েছে।

সবথেকে ভালো প্রতিক্রিয়া পেলাম লিচু বাগান বস্তিতে। ঢুকেই ডানদিকের প্রথম বাড়িতে দেখি একজন রান্না করছেন। বিশ্বজিৎদার ঘটনার পর থেকে রান্নার সময়ে আমরা কাউকে কিছু বলতে যাই না। প্রথম বাড়ি ছেড়ে তাই দ্বিতীয় বাড়িতে ঢুকলাম। একজন মাঝবয়সি লোক দালানে বসে তেল মাখতে মাখতে জলের ভাগাভাগি নিয়ে ঝগড়া করছিলেন। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যেতেই বললেন, না, চাঁদা দেব না। তারপর আমরা মিনিট পাঁচেক ধরে বোঝানোর পর উনি ভারী খুশি হয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, নিশ্চয়ই যাবে। আমাদের বাড়ির উনিশটা বাচ্চার প্রত্যেকেই যাবে।'

শুনে আমরা তো প্রায় নাচতে শুরু করি আর কি। স্কুলের ঠিকানা, ক্লাস শুরু হওয়ার তারিখ ইত্যাদি জানিয়ে আমরা ফিরে এলাম। ফেরার পথে ভোম্বলকে বলতে শুনলাম, 'মিশনারীজ অব চ্যারিটিস-এর পরেই অনাথবন্ধু স্কুল।' বিশ্বজিৎদা কঠিন উদাত্ত গলায় জানালে 'সামনে আমাদের কঠিন চ্যালেঞ্জ। প্রস্তুত হ ভোম্বল।'

পরের সোমবার, অর্থাৎ স্কুল খোলার দিন, ভোরবেলা ছটার সময়ে চোখ খুলে দেখি বিশ্বজিৎদা বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি এক কাঁধের ওপর ভাঁজ করা চাদর। চোখে নির্মোহ দৃষ্টি। খানিকবাদে নীচে নামলাম। ক্লাস দশটায় শুরু। আজকে আমরা শুধু ক্লাস ওয়ানের ছাত্রদের ডেকেছি। লিচুবাগান সাড়ে-নটায় এসে গেছে। শুধু এসেছে না, সঙ্গে আছে বেশ কয়েকটা ব্যাট ও বল। বাকিরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাড়ির উঠোন খেলার মাঠের চেহারা নিল।

বিশ্বজিৎদা আমাদেরকে উৎসাহিত করতে শান্তিনিকেতনের উদাহরণ দিয়ে বলল, 'প্রকৃতির মধ্যে বসে না শেখালে বাচ্চাদের প্রকৃত শিক্ষা হয় না। তোরা এর মধ্যেই ক্লাস শুরু কর। বিশ্বজিৎদার কথা মতো অচিন্ত্য অর্থাৎ আমাদের ক্লাস ওয়ানের বাংলার শিক্ষক বারান্দায় দাঁড়িয়েই শুরু করল, 'অ-য় অজগর আসছে তেড়ে।'

—কেউ শুনেছে না দেখে দ্বিগুণ জোরে চেঁচিয়ে ফের বলে উঠল। শোনার মধ্যে উৎসাহী শ্রোতা বলতে একটা কালো কুকুর, যেটা লিচুবাগান বস্তির লোকেদের সঙ্গে এসেছিল। নাম জিমি। বাকিরা সব একমনে ক্রিকেট খেলে যাচ্ছে। হঠাৎ যেই না অচিন্ত্য আমটি আমি খাব পেড়ে... বলল, কি হল বুঝলাম না— জিমি ঘ্যাঁক ঘ্যাঁক করে অচিন্ত্যর দিকে তেড়ে গেল— আম ভেবে কিনা জানি না। অচিন্ত্য আর জিমির বেশ চারদিকের বারান্দায় বেশ খানিকক্ষণ চলল। বাকিরা এখন ক্রিকেট ছেড়ে ওদের দৌড় বেশ উৎসাহের সঙ্গে দেখছে। বেশিরভাগের সমর্থন জিমির দিকে। শেষপর্যন্ত অচিন্ত্য একটা পাইপে পা বেঁধে আছাড় খেতেই জিমি এসে অচিন্ত্যর পাশে বসল। কামড়ালো না, নখ বসালো না— শুধু জিভ দিয়ে মুখ চাটতে থাকল। দূর থেকে বাচ্চাদেরকে একজন বলে উঠল, 'ফার্স্ট উইকেট ডাউন।'

এরপর আমার অঙ্ক করানোর পালা। বারান্দায় বোর্ড টেনে বোর্ডে এক লিখে এক বলতে বললাম। উত্তরে একটা বল এসে বোর্ডে লাগল। উত্তেজিত হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি তখনও সবাই একমনে ক্রিকেট খেলে চলেছে। কে একজন চেঁচিয়ে বলে উঠল, 'বোর্ডটা হল আমাদের বাউন্ডারি লাইন। রেগে উঠে বললাম, 'না পড়লে কান ধরে বের করে দেব।'

নেতাজী কণ্ঠে বললাম, 'বল এক'। শুনলাম 'ঘ্যাঁক'। নাঃ এবার আর চাটা নয়। অচিন্ত্যকে ছেড়ে জিমি মোক্ষমভাবে দাঁত বসিয়ে দিয়েছে আমার পায়ের গোড়ালিতে। উঃ-বলে লাফাতে লাফাতে ঘরে ঢুকলাম, তারপরে নার্সিং হোমে।

ফিরলাম দিন দুই পরে। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বজিৎদা, চোখের নীচে কালি, জিজ্ঞাসা করলাম, 'কী বিশ্বজিৎদা, পড়ানো কেমন চলছে? ছাত্র বেড়েছে?'

উত্তরটা অচিন্ত্য দিল। 'হ্যাঁ, বেড়েছে মানে দেখে আয়। ছাত্ররা আর বাড়ি ফিরতে চাইছে না।'

ভিতরে ঢুকে হতবাক। একি! এযে পুরো লিচুবাগান বস্তিই আমার বাড়ির উঠোনে চলে এসেছে। একধারে ক্রিকেট, একধারে তাস, আরেকধারে জামা কাপড় শুকোনো। বাচ্চা, বুড়ো, বুড়ি কেউ বাদ নেই। রীতিমতো সবান্ধবে উপস্থিত। বিশ্বজিৎদা আমার সঙ্গেই ঢুকেছিল। ওদের উদ্দেশ্যে বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে উঠল, 'এরকম হলে সব্বাইকে বাড়ি থেকে বের করে দেব।' পরক্ষণেই অবশ্য মিনমিনে গলায় বলে উঠল, 'না, না আমি সেরকম বলছিলাম না। আপনারা থাকুন। আমি-ই যাই।'

সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি গোটা পাঁচেক কুকুর। জিমিরই বন্ধুবান্ধব হবে। চোখের দৃষ্টি খুব সুবিধের নয়।

বাইরে বেরিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বিশ্বজিৎদাকে বললাম, 'এ কি হল বিশ্বজিৎদা স্কুলের জন্য শেষে ঘরছাড়া হলাম!'

বিশ্বজিৎদা আশ্বস্ত করল, 'ঘর আগে না দেশ আগে!'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%