প্রীতম পুরকাইত
ওয়াকি টকিটা গাড়ির ড্যাশবাক্স থেকে বের করলেন বিমলবাবু, দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন বাইরে। ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা কনস্টেবলকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
"তুমি সামনে গাড়িটা পার্ক করে দিয়ে এসো, আমি প্যান্ডেলের ওদিকটায় আছি। আর পার্কিংয়ের ওখানে সুরেশ আর ঋষিকে দেখতে পেলে বলে দেবে যাতে লাইন করিয়েই ঢোকায় সবাইকে। কেউ যেন বে-লাইনে ঢুকে না যায়।"
বলে ভিড় ঠেলে প্যান্ডেলের দিকে এগিয়ে গেলেন বিমলবাবু। এই একটা জিনিস কোনোকালেই পছন্দ হয় না বিমলবাবুর, মানে পুলিশ হয়ে ভলান্টিয়ারের মতো প্যান্ডেলে মানুষের ভিড় সামলাও… কোনো মানে হয়! মনে মনে বললেন,
"ধুত্তোর পুজো! এই কটা দিন খেটে খেটে শেষ হয়ে যাবো।"
বলে ফ্যাকাশে মুখ নিয়ে আবার প্যান্ডেলের দিকে এগিয়ে গেলেন। ওনাকে যদিও প্যান্ডেলের ভেতরেই বসে থাকতে হবে, সেরকম খাটাখাটনি নেই, কিন্তু মন্ত্রীর পুজো বলে কথা! সারাক্ষণ আশেপাশে না থাকলে উপরতলা থেকে ভালো ঝাড় খেতে হবে। কী আর করা যাবে? যা হচ্ছে সেটা মেনে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। নিজেকে বোঝালেন বিমলবাবু। একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে প্যান্ডেলের ভেতরে ঢুকলেন, তারপর ক্লাবের সভাপতি অর্থাৎ স্বয়ং মন্ত্রী মহাশয়ের দিকে এগিয়ে গেলেন, তাঁকে একটা স্যালুট জানিয়ে আবার গেটের দিকে দু’জন উর্দিধারী পুলিশ কর্মচারীর কাছে এগিয়ে গেলেন। এরা এখন লোক সমাগমকে যতটা সম্ভব সামলানোর চেষ্টায় মগ্ন। তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন বিমলবাবু, তারপর গলাটা নামিয়ে বললেন,
খাওয়াদাওয়া হয়েছে কিছু, নাকি পুরো ফেঁসে গেছো?"
একজন কর্মচারী ফ্যাকাসে বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে বিমলবাবুর দিকে তাকালো,
"আর স্যার খাওয়া! কখন হবে কে জানে?"
বিমলবাবু সহানুভূতির একটা হাত তার কাঁধে রাখলেন। তারপর ভিড়ের দিকে চোখ ফেরালেন।
এতক্ষণে সামনের দড়ি খুলে দেওয়া হয়েছে, হুড়মুড়িয়ে লোকের ভিড় এগিয়ে আসছে। ঠেলাঠেলির চক্করে বেশিরভাগ মানুষই ধৈর্য আর টাল দুটোই ধরে রাখতে পারছেন না। তাও যতটা সম্ভব নিজেদের শান্ত রেখে গুটি গুটি পায়ে ভিড়ের মাঝেও এগিয়ে যাচ্ছেন প্রতিমা দর্শনের উদ্দেশ্যে। বিমলবাবু সেদিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছেন আর ভাবছেন, মানুষের ঠাকুর দেখার কত শখ! এত কষ্ট-শিষ্ট করে মানুষ ঠাকুর আর প্যান্ডেল দেখে, সত্যিই এদের ধৈর্য! মনে মনে এদের প্রত্যেককে একটা করে স্যালুট দিতে ইচ্ছা হলো বিমলবাবুর। ঠিক তখনই একটা বাচ্চা ছেলে ধাক্কা খেয়ে তার পায়ের সামনে এসে পড়লো, হঠাৎ ঘটনাটা ঘটায় বিমলবাবু একটু চমকে গেলেন। পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বাচ্চাটির দুই হাত ধরে তাকে তুলে ধরলেন। বাচ্চাটার সমস্ত জামা ধুলোয় ভর্তি হয়ে গেছে, বিমলবাবু হাত দিয়ে সেই ধুলো ঝাড়া শুরু করলেন। ঝাড়তে ঝাড়তেই বাচ্চাটাকে ভালোভাবে লক্ষ্য করলেন বিমলবাবু… বেশ সুন্দর বাচ্চা, বয়স নয় কী দশ হবে, অসম্ভব রকমের সাদা চামড়া তার, হয়তো ফরেনার হবে। বাচ্চাটার দিকে চেয়ে অল্প হাসলেন বিমলবাবু, তখনই দুজন দম্পতি এগিয়ে এলেন বিমলবাবুর দিকে, কাছে এসে ছেলেটার দিকে উদ্দেশ্য করে একটু বকুনির সুরে দুজনেই বললেন,
"হোয়াই ডিড ইউ রান?"
তাদের ভাষা আর বলার ধরণ শুনে বিমলবাবু নিশ্চিত হলেন যে, এরা বিদেশি, পুজো দেখতে কলকাতায় এসেছে।
বিদেশি মহিলা ছেলের জামায় লেগে থাকা বাকি ধুলো ঝাড়তে শুরু করলেন, পুরুষটি বিমলবাবুর দিকে এগিয়ে এলেন,
"থ্যাঙ্কিউ স্যার ফর হোল্ডিং আউর বেবি হেয়ার, হি ইজ সো নটি।"
বিমলবাবু অল্প হাসলেন,
"এভরি চাইল্ড ইজ নটি, বাট হি ইজ সো সুইট। অ্যান্ড ইটস্ মাই ডিউটি টু হ্যান্ডেল এভরিথিং অ্যান্ড এভরিওয়ান।"
পুরুষটি আবার হেসে বিমলবাবুর সাথে হাত মিলিয়ে নিজের স্ত্রী আর পুত্রকে নিয়ে মণ্ডপের দিকে পা বাড়ালেন, কিন্তু বিমলবাবু তাদের পিছু ডাকলেন,
"এক্সকিউস মি স্যার…"
সঙ্গে সঙ্গেই তারা পেছন ফিরলেন, দেখলেন বিমলবাবু একটা চকোলেট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, আর তাদের ছেলের উদ্দেশ্যে হেসে বলছেন,
"শুড আই টেক দিস বয়?"
বাচ্চা ছেলেটা জোরে একবার "নো" বলে বিমলবাবুর দিকে ছুটে গেলেন। বিমলবাবু তার হাতে চকোলেটটা দিয়ে তার মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে দিলেন,
"হোয়াট ইজ ইউর নেম মাই সান?"
ছেলেটা দাঁত বের করে লম্বা একটা হাসিওয়ালা ঠোঁট নিয়ে উত্তর দিলো,
"সিডিয়াস…"
(সমাপ্ত)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন