প্রীতম পুরকাইত
ধড়মড়িয়ে উঠে বসলো নিধি, জোরে জোরে হাঁপাতে শুরু করলো। নিঃশ্বাস যেন একেবারে বেরোতে চাইছে না, কিছু একটা যেন আটকে আছে ভেতরে। মুখ খুলে ভালোভাবে বাইরের বাতাস ভেতরে নেওয়ার চেষ্টা করলো সে, অনেকক্ষণ একভাবে চেষ্টা করার পরে কিছু স্বস্তি পেলো সে। লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস বের করলো। যাক! এ যাত্রায় বাঁচা গেল। সত্যি বলতে কী এই শ্বাসকষ্ট বহুদিন ধরে ভোগাচ্ছে তাকে, কোনোভাবেই পিছু ছাড়ছে না তার। এর আগেও অনেকবার ঘটনাটা ঘটেছে। মা যদিও অনেকবার তাকে বলেছে, একা না শুয়ে তার সঙ্গে গিয়ে ঘুমাতে, কিন্তু নিজের রাত জেগে পড়া, সিনেমা দেখা, গল্প শোনা এগুলো থেকে বিরত থাকতে হতে পারে ভেবে আর সেই প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ বলেনি নিধি।
কিন্তু আজ যেটা দেখলো, সেটা তো কোনো স্বাভাবিক কিছু নয়, এরকম বীভৎস ঘটনা তো আগে কোনোদিন ও স্বপ্নে দেখেনি! তবে আজ কেন? এখনো যেন স্বপ্নের দেখা ওই মুখটা ভেসে আসলে কেঁপে উঠছে সমস্ত শরীর, সত্যি কী বীভৎস সেই দৃশ্য! কী কুৎসিত! না! আর ভাবতে পারলো না নিধি, স্বপ্ন স্বপ্নই হয়। তাই আর বেশি এটা নিয়ে না ভেবে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো সে। ধীর পায়ে দরজা পেরিয়ে এগিয়ে গেল ড্রয়িংরুমের দিকে, গলাটা প্রচণ্ড শুকনো হয়ে আছে, একটু জল না ঢাললে সেটা আরও কর্কশ হয়ে উঠবে। ডাইনিং টেবিলের সামনে গিয়ে জলের বোতলটা তুলে নিলো নিধি, তারপর আলগোছে সেটাকে মুখের সামনে এনে খানিকটা জল গলার অন্তর্দেশে ঢাললো। জল খেয়ে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া গেল, বোতলটা যথাস্থানে রেখে নিজের ঘরের দিকে ফিরে এলো নিধি।
বিছানায় বসে জানলা দিয়ে আলো-আঁধারিতে ভরা জ্যোৎস্না রাতের মায়াময় দৃশ্যকে মন ভরে দেখতে থাকলো। সত্যিই আজ কী সুন্দর লাগছে সমস্ত আকাশটাকে, একটা যেন মায়াময় জগৎ সৃষ্টি করে নিয়েছে সমস্ত পৃথিবীকে কেন্দ্র করে, যেন সবাইকে একসাথে টেনে নিয়ে গিয়ে ফেলবে। মুগ্ধ হয়ে সেদিকেই তাকিয়ে থাকে নিধি, ভুলে যায় বাকি সমস্ত কিছুকে, কিছুক্ষণ আগের সেই ভয়াবহ স্বপ্নটাকেও। চাঁদটা আজ যেন একটু বেশিই বড়ো লাগছে। না! ঠিক বড়ো লাগছে না, যেন কিছুটা বেশিই কাছে সরে এসেছে। নিধি বিছানা ছেড়ে উঠে জানলার দিকে এগিয়ে গেল। হ্যাঁ সত্যিই! চাঁদটা সত্যিই যেন অনেকটা কাছে সরে এসেছে, এরকমও হয় নাকি! পৃথিবী চাঁদের কাছে সরে এলে চাঁদের আকার স্বাভাবিক চোখে বড়ো দেখায় ঠিক কথা, কিন্তু এরকম অদ্ভুত ধরণের বড়ো কি হওয়া সম্ভব! জানলা দিয়ে আরও খানিকটা মুখ বাড়িয়ে ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করে সে, আর হঠাৎ তখনই সাদা চাঁদটা এক মুহুর্তে রক্তাভ লাল হয়ে উঠলো, আর একটা বিশালাকার দৈত্য যেন সেটাকে ফুঁড়ে এগিয়ে এলো তার দিকে। চমকে উঠলো নিধি, কিন্তু ভয়ে একটুও নড়াচড়া করতে পারলো না। স্থির বরফের মতো একঠায় দাঁড়িয়ে যেন সেই দৈত্যের অপেক্ষা করতে শুরু করলো। নিস্পলক দৃষ্টিতে তার আগমনের পথের দিকে চেয়ে রইলো সে, ধীরে ধীরে সেই দৈত্যাকার মুখ এগিয়ে এলো তার দিকে, যেন এক্ষুনি গ্রাস করবে তাকে। প্রচণ্ড ভয়ে চোখদুটো বন্ধ করে নিলো নিধি, আর কিছুতেই খুলবে না এই চোখ, যা খুশি হয়ে যাক, চোখ আর খোলা যাবে না। মিনিট কয়েক এইভাবেই চোখ বন্ধ করে একঠায় বরফের মতো ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে রইলো সে। কিন্তু কোথায় কী! কিছু হলো না তো! ধীরে ধীরে চোখের পাতা আলতো করে খুললো সে, খুলতেই খানিকটা অবাক হলো, নিজেকে বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় খুঁজে পেলো সে, কিন্তু কী করে! সঙ্গে সঙ্গে জানলার দিকে চোখটা নিয়ে গেল, ভোরের আলো ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ করছে, সকালেই সূচনা হচ্ছে। কিন্তু একটু আগেই তো আলো-আঁধারিতে ভরে উঠেছিল সমস্ত আকাশ, কালো দৈত্য সমস্ত আকাশ জুড়ে ছেয়ে ছিল। তাহলে কী হলো সেটার! তাহলে কি সে স্বপ্ন দেখছিল! তাহলে ওই স্বপ্নটা কী ছিল? স্বপ্নের মধ্যে আরেকটা স্বপ্ন! এও কি সম্ভব! ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না সে। সত্যিই হয়তো এগুলো সব নিছকই স্বপ্ন। নিশ্চয়ই এটা অবচেতন মনে চলতে থাকা বিভিন্ন সব গল্পের বইয়ের বাহ্যিক চরিত্রায়ন। এগুলো নিয়ে যত চিন্তা করবে হয়তো ততই আরও এরকম স্বপ্ন আসবে, তাই আর এইসব চিন্তা নিয়ে বেশি ভাবার পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ত্যাগ করলো সে। বিছানা ছেড়ে উঠে জানলার দিকে এগিয়ে গেল সে। জানলার বাইরে সবে ভোরের আলো খাপ ছাড়া খাপ ছাড়া করে ছড়িয়ে পড়েছে, বেশ সুন্দর লাগছে এই পরিবেশটা। মুগ্ধ চোখে সেদিকেই তাকিয়ে রইলো সে, নিজের অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন