(এগারো)

প্রীতম পুরকাইত

বাস থেকে সাবধানে নেমে এলো নিধি, বাসটাও সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ফেলে এগিয়ে গেল নিজের গন্তব্যের দিকে। নিধি একবার এদিক-ওদিক ভালোভাবে দেখে নিলো। তারপর হাতঘড়ির দিকে চোখ দিলো, প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে, আজ অনেকটা দেরি হয়ে গেল। মাথাটা প্রচণ্ড গরম হয়ে গেল নিধির, আজ বাসটা খারাপ না হয়ে গেলে এত রাত হতো না। এখন এত রাতে এতটা হেঁটে যেতে হবে। মুখ দিয়ে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করলো নিধি, তারপর হাঁটা দিলো গলির রাস্তার দিকে।

গলির ভেতরটা এখন অনেকটাই অন্ধকার হয়ে এসেছে… একটা লাইট অবশ্য টিমটিম করে জ্বলছে, কিন্তু সেটার উজ্জ্বলতা এতটাই কম যে, সামান্যতম অন্ধকারকেও সে ঘোচাতে পারছে না। মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটটা অন করে ধীরে ধীরে গলির পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া শুরু করলো নিধি। এমনিতে সে ভয় খুব একটা পায় না, কিন্তু আজকাল মেয়েদের সাথে যা সব হচ্ছে, তাতে একটু হলেও সব মেয়েদের মনেই অল্প হলেও দুশ্চিন্তার কালো মেঘ জমে আছে। তাই ভালোভাবে চারিদিকটা পর্যবেক্ষণ করতে করতে হেঁটে চললো সে। কিছুটা গিয়েই ডানদিকে বাঁক নিয়েছে গলিটা, নিধিও সেদিকেই বেঁকে গিয়ে এগিয়ে গেল। আজ দিনটা কীরকম যেন একটা কাটলো ওর, সেই সকাল থেকেই কীরকম অদ্ভুত যাচ্ছে দিনটা। সকালে ইউনিভার্সিটির ক্লাসেও মন ছিল না, আর টিউশনি পড়াতে গিয়ে পড়ানোতেও… স্টুডেন্ট আজ নির্ঘাত নিজের বাবা-মার কাছে নিধির নামে কমপ্লেইন করবে। কেন যে দিনটা এরকম অদ্ভুত কাটলো নিজেই জানে না, কেবল সারাদিন শুধু কিছু অদ্ভুত খাপছাড়া ছবি ভেসে উঠছে মনের মধ্যে। ঝাপসা কিছু ছবি, যেগুলো সে আগে দেখেছে, কিন্তু কোথায় দেখেছে! কিছুতেই মনে পড়ছে না, কোথায় দেখেছে আগে। আরেকবার মাথার উপর জোর দিয়ে ভাবার চেষ্টা করলো নিধি। কিন্তু না! কিছুতেই মনে পড়ছে না। হয়তো মনেরই ভুল, হয়তো ওগুলো এমনিই আজ দেখেছে, শরীরটা হয়তো খারাপ হয়েছে বলে এইসব ভুলভাল দিবাস্বপ্ন দেখছে। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলো নিধি, এগুলো সবই ওর মনের ভুল। চিন্তাগুলোকে ঝেড়ে ফেলে আবার সামনের পথের দিকে চেয়ে এগিয়ে চললো সে। কিছুটা এগোনোর পর থমকে দাঁড়ালো নিধি। পেছনে কীসের একটা যেন শব্দ হচ্ছে! এক ঝটকায় পেছন ফিরলো সে, কিন্তু না! কিছুই তো দেখতে পেলো না। একঠায় সেদিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ, তারপর আবার সামনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে হাঁটা শুরু করলো। কয়েক পা যাওয়ার পর আবার কানে এলো সেই শব্দটা! শরীরটা একবার কেঁপে উঠলো নিধির, একটা চাপা ভয় যেন ধীরে ধীরে শরীরকে গ্রাস করতে চাইছে। নিজেকে সামলে নিয়ে আবার পেছনে ঘুরলো নিধি। আর সঙ্গে সঙ্গেই ভয়টা আরও কিছুটা বেড়ে গেল ওর। একটা কালো পোশাক পরা লোক ধীরে ধীরে অতি সন্তর্পণে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। তার মুখটা অন্ধকারে একদম বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু সে যে নিধির দিকেই এগিয়ে আসছে, সেটা বুঝতে একটুও অসুবিধা হচ্ছে না। নিধির মনে একটা শিহরণ খেলে গেল! কে আসছে ওটা? কী চায় সে! না, যেভাবেই হোক ওকে এক্ষুণি বাড়ি ফিরতেই হবে। তড়িঘড়ি সামনের দিকে ফিরে দ্রুত পদে এগিয়ে যাওয়া শুরু করলো সে। আর মাঝে মাঝেই পেছনে ফিরে ফিরে লক্ষ্য করতে থাকলো সেই অচেনা মানুষটিকে। নিধিকে দ্রুত হাঁটতে দেখে লোকটাও যেন নিজের হাঁটার গতি আরও কিছুটা বাড়িয়ে নিলো। না! এভাবে চলতে থাকলে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকটা নিধির একদম কাছে এসে পৌঁছাবে। নিধি নিজের হাঁটার গতি আরও বাড়িয়ে নিলো। যেভাবেই হোক সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় বাড়ি ফিরতেই হবে। কিন্তু পেছনের লোকটাও নিজের গতি আবার বাড়িয়ে নিলো। নিধি এবার দৌড়ানো শুরু করলো, দৌড়াতে দৌড়াতেই নিজের ভেনিটি ব্যাগের চেনটা খুললো, তারপর পারফিউমটা বের করে নিজের হাতের আড়ালে অতি সন্তর্পণে লুকিয়ে আরও দ্রুতভাবে দৌড়ানোয় মন দিলো। কিন্তু সে যতই দ্রুত পা চালাচ্ছে পেছনের লোকটাও ঠিক ততটাই দ্রুত পা চালিয়ে তার দিকে ধেয়ে আসছে। কয়েক সেকেণ্ড এভাবেই ছুটে চললো নিধি, কিন্তু এর বেশি দূর পারলো না। হাঁপিয়ে উঠলো, জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছে এখন। বড়ো বড়ো শ্বাস নিতে নিতেই ছুটতে থাকলো সে, যতই কষ্ট হোক ছোটা থামালে চলবে না। কিন্তু পেছনের লোকটা এতক্ষণে তার অনেকটা কাছে এসে পড়েছে, আর সামান্য কিছু দূরত্বের ব্যবধান। আর কিছুটা এগিয়ে এলেই একদম ধরে ফেলবে নিধিকে। আরও কয়েক সেকেণ্ড এইভাবে কেটে গেল। তারপর পেছনের লোকটা আরও দ্রুত পা চালিয়ে নিধির একদম সামনে এসে থামলো। নিধি আতঙ্কে শিউরে উঠলো। ঠোঁট আর দাঁত কাঁপতে শুরু করলো। লোকটার মুখটা অন্ধকারে প্রচণ্ড আবছা, সারা শরীর কালো পোশাকে ঢাকা। স্থির পায়ে সে এগিয়ে আসছে নিধির দিকে। নিধির শরীরটা ভয়ংকর রূপে কাঁপছে। কিন্তু এরকম ঘাবড়ে গেলে চলবে না, যেভাবেই হোক তাকে পালাতেই হবে। নিজেকে কোনোমতে শান্ত করলো সে, তারপর পারফিউমের স্প্রেটা শক্ত করে চেপে ধরলো। এতক্ষণে লোকটা তার একদম মুখের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে লোকটা কিছু একটা শব্দ করার চেষ্টা করলো, কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ করার আগেই ডান হাতে লুকানো পারফিউম স্প্রেটা সামনের লোকটার চোখের সামনে নিয়ে গেল নিধি, তারপর বারকয়েক তার খোলা চোখের উপর এলোপাথাড়ি স্প্রে করা শুরু করলো। আচমকা এরকম ঘটনা হওয়ায় চমকে উঠলো সামনের লোকটা, যদিও কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলেও নিলো। তবে অন্য কিছু হলে নয় সামলে নেওয়ার পর স্বাভাবিক থাকতে পারতো, কিন্তু পারফিউমের চোখ জ্বালানো ঝাঁঝানি থেকে নিজেকে আর এক ঝটকায় স্বাভাবিক করতে পারলো না সে। চোখ’দুটো ডলা শুরু করলো সে, মুখ দিয়ে জোরালো শব্দে তার চোখের জ্বলনের প্রতিফলন ভেসে উঠলো। এই সুযোগে নিধি সজোরে ছুটতে লাগলো নিজের বাড়ির পথের দিকে। এক নিঃশ্বাসে প্রায় মিনিট কয়েক ছুটতে থাকলো সে। তারপর বাড়ির একটু আগে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো। ভালোভাবে একটু হাঁপিয়ে নিলো নিধি। একবার পেছনে ফিরে দেখে নিলো সে। না! কেউ নেই। যাক বাবা, শান্তি। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো নিধির মুখ দিয়ে। স্থির পায়ে কিছুটা এগিয়ে বাড়ির সামনে এসে গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকে এলো সে, তারপর চৌকাঠের সামনে দাঁড়িয়ে কলিংবেলটা বাজিয়ে দিলো। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই খুলে গেল দরজার পাল্লা। আর নিধিও তড়িঘড়ি বাড়ির মধ্যে ঢুকে ভেতর দিয়ে দ্রুত দরজার পাল্লাটা বন্ধ করে দিলো।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%