(পাঁচ)

প্রীতম পুরকাইত

উজ্জ্বল যখন রাজারহাট থানায় এসে পৌঁছালো, ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা দুপুর বারোটা ছাড়িয়ে গেছে, মাথার উপর সূর্যদেব প্রবল তাপ বর্ষণ করা শুরু করে দিয়েছে। সূর্যের তাপে থানার ভেতরটাও কেমন যেন ঝলসে উঠছে, ভেতরের কয়েকজনের হাবভাব সেই ঝলসানির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান দিচ্ছে। উজ্জ্বল তাঁদেরকে লক্ষ্য করেই একটু মুচকি হেসে এগিয়ে গেল বিমলবাবুর কেবিনের দিকে।

দরজার পাল্লা ঠেলে ভেতরে ঢুকে এলো উজ্জ্বল। বিমলবাবু তাকে ভেতরে আসতে দেখে কিঞ্চিৎ উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন, যেন তিনি এতক্ষণ তার অপেক্ষাতেই ছিলেন। সামনের একটা চেয়ারের দিকে ইশারা করে বলে উঠলেন,

"আসুন মশাই, বসুন। আপনার অপেক্ষাতেই ছিলাম।"

উজ্জ্বল চোখ কুঁচকে মুচকি হাসলো,

"কেন বলুন তো? কেস সল্ভ করে ফেলেছেন নাকি!"

বিমলবাবু হো হো করে হেসে উঠলেন, যেন এরকম মজার কথা পৃথিবীতে আর দুটি নেই। উজ্জ্বলও সেই হাসির সুরে তাল মেলালো। কয়েক মুহূর্ত এইভাবেই কেটে গেল। তারপর বিমলবাবু হাসিটাকে এবার কিছুটা জোর করেই থামালেন, এবং উজ্জ্বলকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

―কী যে বলেন, আপনারা দায়িত্ব নিয়ে নিলে কি আর আমাদের উপর কোনো চাপ থাকে নাকি! আমরা এখন বাঁধনমুক্ত, এক্কেরে যাকে বলে রিলিফড।

বলেই মুচকি হাসলেন বিমলবাবু।

কথাটার মধ্যে কিঞ্চিৎ ব্যঙ্গের সুর থাকলেও উজ্জ্বল আর সেটাকে গায়ে মাখলো না। সেও সামান্য হেসে কথাটা সমর্থন করার ভঙ্গিমা করলো, তারপর সেই হাসির রেশ মুখে নিয়েই বলে উঠলো,

―বাদ দিন ওসব কথা, আসল কথায় আসা যাক। একটু ভালোভাবে বলুন তো মশাই আমাকে ইমিডিয়েটলি এরকম ডেকে পাঠানোর কারণটা কী!

বিমলবাবু হাসলেন,

―আরে বলবো মশাই, বলবো… বলবো বলেই তো ডেকে পাঠিয়েছি।

বলেই নিজের ডেস্কের সামনের ডানপাশের ড্রয়ারটা খুলে একটা ফাইল বের করে আনলেন, তারপর সেটা টেবিলের উপর এমন কায়দা করে ফেললেন, যাতে সামনের মানুষ বুঝতে পারে এটা ভীষণ দরকারী কিছু।

উজ্জ্বলও হতাশ করলো না বিমলবাবুকে, বিস্ময় আর কৌতূহলী দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো ফাইলটার দিকে। তারপর মুখ ঘোরালো বিমলবাবুর দিকে,

―এটা কী? দরকারি কিছু!

বিমলবাবু মুচকি হাসলেন,

―কী বলছেন মশাই! দরকারি মানে! হেব্বি দরকারি। ফরেন্সিক রিপোর্ট আছে এর মধ্যে।

উজ্জ্বল চোখ’দুটো বড়ো বড়ো করে বলে উঠলো,

―বলেন কী! আপনারা তো দেখছি ভীষণ কুইক সার্ভিস দিচ্ছেন!

―হু হু মশাই, রাজারহাট থানার সার্কেল ইন্সপেক্টর বিমল মজুমদার বলে কথা! আমার নাম কি আর এমনি এমনি এতটা ছড়িয়েছে! আজ সকালে ফরেন্সিক ল্যাবে নিজে গিয়ে তড়িঘড়ি ওদের চাপ দিয়ে কাজ করিয়েছি। এত বড়ো একটা কেস বলে কথা!

―সে তো বটেই… বলেই ফাইলের দিকে হাত বাড়ালো উজ্জ্বল।

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই উজ্জ্বলকে অবাক করে একটা হ্যাচকা টান দিয়ে ফাইলটা নিজের দিকে টেনে নিলেন বিমলবাবু। ঘটনাটা এতটা দ্রুত ঘটলো যে, উজ্জ্বল ঠিক পরিস্থিতিটা সামলে নিতে পারলো না। বড়ো বড়ো চোখ করে হতভম্বের মতো যে জায়গাটায় ফাইলটা রাখা ছিল সেদিকে একদৃষ্টে অনেকক্ষণ চেয়ে রইলো। তারপর খানিকটা সময় পরে পুরোপুরি নিজেকে সামলে উত্তেজিত গলায় সে বলে উঠলো,

―এটা কী হলো? ফাইলটা সরিয়ে নিলেন কেন?

একটা দুষ্টু হাসি হাসলেন বিমলবাবু,

―এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন মশাই! আপনার আরেকটা কাজ বাকি আছে তো, ওটা করে নিয়ে না হয় রিপোর্টটা দেখবেন!

উজ্জ্বল ভ্রু কোঁচকালো,

―আর কী কাজ আছে?

―আরে আপনি বিশাল ভুলোমনা তো! কালই তো বললেন ইন্দ্রবাবুর স্ত্রীকে ডেকে পাঠাতে, জিজ্ঞাসাবাদ করবেন!

―ইন্দ্রটা কে আবার?

জিভ কাটলেন বিমলবাবু,

―মশাই আপনি ঠিক আছেন তো? মানে শরীর-টরির ভালো আছে তো? না মানে স্বরাষ্ট্র সচিবের নাম ভুলে যাচ্ছেন কীভাবে!

উজ্জ্বলের চোখদুটো কিছুটা বড়ো হয়ে উঠলো, মুখ দিয়ে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে সে বললো,

―আরে দেখেছেন তো নামটাই ভুলে মেরেছি। যার লাশ নিয়ে কেস, তার নামই নাকি আমার মনে ছিল না। আমার চাকরি-বাকরি আর থাকলে হলো! যাই হোক, উনি এসেছেন কি? মানে ইন্দ্রবাবুর স্ত্রী!

বিমলবাবু মাথা নাড়লেন,

―হ্যাঁ, উনি আপনার আসার একটু আগেই এসেছেন। আমি একদফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছি, বাকিটা আপনিই নাহয় করবেন। তবে মশাই আপনাকে নিয়ে আমার একটু চিন্তা হচ্ছে। আপনার শরীর সত্যিই ঠিক আছে তো?

―শরীর ঠিক আছে বিমলবাবু, কিন্তু মাথাটা একটু ধরে আছে। আসলে কাল রাতে একটা আশ্চর্য স্বপ্ন দেখলাম, তারপর থেকেই…

―তারপর থেকে কী? কী স্বপ্ন দেখেছিলেন?

উজ্জ্বল কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল, বিমলবাবুর কথায় হুঁশ ফিরলো, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিছুক্ষণ বিমলবাবুর দিকে তাঁকিয়ে রইলো। তারপর বললো,

―ওসব বাদ দিন, চলুন ওনার সাথে কথা বলে আসি। যদি কিছু তথ্য পাওয়া যায়!

বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠতে গেল উজ্জ্বল, তড়িঘড়ি তাকে বাধা দিয়ে বিমলবাবু বলে উঠলেন,

―আরে যাচ্ছেন কোথায়! ওনাকে ভেতরে ডেকে নিচ্ছি। বাইরে সবার সামনে জিজ্ঞাসাবাদ না করে এখানে করাটাই বেটার হবে।

উজ্জ্বল পেছন ফিরে ঘাড় নাড়তে নাড়তে আবার নিজের চেয়ারে হেলান দিলো,

―হ্যাঁ ঠিক বলেছেন, মাথাটা আমার একদম কাজ করছে না। আপনি বরঞ্চ কাউকে বলে ওনাকে ডেকে নিন ভেতরে।

বিমলবাবু পকেট থেকে তাঁর মোবাইল ফোনটা বের করলেন, তারপর স্ক্রিনে দু’বার টাচ করে সেটা ধরলেন কানে,

"হ্যাঁ ওনাকে ভেতরে পাঠিয়ে দাও তো! বলবে, ভেতরেই যা জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার হবে।"

বলেই ফোনটা কেটে সেটাকে আবার বুকপকেটে চালান করলেন, আর নিজের চেয়ারে আরেকটু হেলান দিয়ে আরেকটু আরাম করে বসলেন।

উজ্জ্বলও মাথাটা একটু পেছনে হেলিয়ে চোখটা বুজলো, যেন কোনো গভীর ভাবনার স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিলো।

মিনিট তিনেক এইভাবেই কেটে গেল, তারপর দরজায় একটা ঠকঠক শব্দ হওয়ায় দু’জনেরই চমক ভাঙলো। দরজার দিকে তড়িঘড়ি চোখ নিয়ে গেল দু’জন, বিমলবাবু তাঁর সবচেয়ে গম্ভীর গলাটাকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে বললেন,

"ভেতরে আসুন…"

একজন বছর সাতাশের সুশ্রী যুবতী দরজা ঠেলে ঢুকে এলো ভেতরে। চোখ-মুখ ফ্যাকাসে, শরীরটা কীরকম যেন ঝিমানো। ধীর পায়ে আস্তে আস্তে উজ্জ্বলের পাশের চেয়ারটার কাছে এসে দাঁড়ালো। উজ্জ্বল এতক্ষণ তাকেই পর্যবেক্ষণ করছিল, কিন্তু তার একদম পাশে এসে দাঁড়াতে সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো,

―"আ… আপনি বসুন…"

যুবতীও আর কোনো বাক্য ব্যয় না করে উজ্জ্বলের পাশের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসলো। উজ্জ্বল আবার একমনে তাকিয়ে রইলো তার দিকে, কীরকম যেন একটা সম্মোহনী শক্তি আছে মেয়েটার মধ্যে, অতি সাধারণ হওয়া সত্ত্বেও বারবার নিজের দিকে অন্যের আকর্ষণ টেনে নিতে বিন্দুমাত্রও সময় লাগছে না তার। তার কথা বলার ধরণ, দেহের হাবভাব― সবই একটা পুরুষকে ঘায়েল করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো তার চোখ’দুটো, তীক্ষ্ণ টানা টানা চোখ, ভেতরের মণি ঈষৎ নীলচে― একবার সে চোখের দিকে তাকালে যেন আর চোখ ফেরানোই যায় না। একদৃষ্টে সেই চোখজোড়ার ফিকেই চেয়ে রইলো উজ্জ্বল। চমক ভাঙলো বিমলবাবুর গলার স্বরে,

―উজ্জ্বল বাবু! আমাদের উচিত তাড়াতাড়ি প্রশ্নোত্তর পর্ব সেরে নিয়ে ওনাকে ছেড়ে দেওয়া, বুঝতেই তো পারছেন ওনার অবস্থা।

উজ্জ্বল এতক্ষণ একমনে তাকিয়ে ছিল মেয়েটার দিকে, বিমলবাবুর কথায় হুঁশ ফিরে পেতেই ঘাড় নাড়িয়ে বললো,

"হ্যাঁ, অবশ্যই।" বলেই আবার চোখ ফেরালো মেয়েটির দিকে, "আপনিই তাহলে ইন্দ্রনীল দাশগুপ্তর স্ত্রী?"

মেয়েটা মাথা নাড়লো। উজ্জ্বল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় আবার প্রশ্ন করলো,

"আপনার নাম?"

মেয়েটা এবার মুখ তুলে তাকালো, ফ্যাকাসে মুখ নিয়ে উত্তর দিলো,

―শ্রীনিকা দাশগুপ্ত।

গলাটা অধিক কান্নার চোটে বসে গেলেও এটুকু বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, মেয়েটার গলা অত্যধিক মিষ্টি। চোয়াল শক্ত করে গম্ভীরভাবে ঘাড় নাড়লো উজ্জ্বল,

―বিয়ের আগের সারনেমও দাশগুপ্ত?

শ্রীনিকা দু’পাশে মাথা নাড়ালো,

―না, আগের টাইটেল বসু, শ্রীনিকা বসু।

―ওকে! সো মিসেস শ্রীনিকা, আপনার আর ইন্দ্রনীল বাবুর কতদিন হলো বিয়ে হয়েছে?

―ম…মাস দুয়েক…

―লাভ ম্যারেজ, না অ্যারেঞ্জ?

―ল… লাভ…

―আপনি আর আপনার স্বামী অর্থাৎ ইন্দ্রনীল বাবু কলকাতার নিউটাউনে একটা ফ্ল্যাটে থাকতেন, তাই তো?

আবার ঘাড় নাড়লো শ্রীনিকা,

―হ্যাঁ।

―আপনার স্বামী কী করতেন?

শ্রীনিকা একটু অবাক হয়ে উজ্জ্বলের মুখের দিকে তাকালো। উজ্জ্বল তার চোখের প্রশ্ন বুঝতে পেরে উত্তর দিলো,

―আমরা জানি উনি কী করতেন, কিন্তু এগুলো রুটিন কোয়েরী, করতেই হয়। তো আপনার স্বামী কী করতেন?

―হি ওয়াজ অ্যান আই.এস অফিসার অ্যান্ড দ্য সেক্রেটারি অফ স্টেট হোম মিনিস্টার।

―আচ্ছা আপনার স্বামীর বয়স কত?

―তিরিশ।

―এত কম বয়সে স্টেট হোম মিনিস্টারের সেক্রেটারি? স্ট্রেঞ্জ!

―হোয়াট স্ট্রেঞ্জ?

―না মানে আগে কাউকে এত কম বয়সে মিনিস্টারের সেক্রেটারি হিসেবে দেখিনি।

―হি ওয়াজ আ ডি.এম ইন আ স্টেট অফ গুজরাট, তারপর সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট ইয়ং আই.এস দের লোকসভা আর রাজ্যসভার মিনিস্টারদের সেক্রেটারি হিসেবে নিযুক্ত করা শুরু করেন। অ্যান্ড হিজ ট্র্যাক রেকর্ড ওয়াজ সো গুড দ্যাট দ্য কমিটি ওয়াজ ইম্প্রেসড, তারপরই ওকে আমাদের রাজ্যেই স্বরাষ্ট্র সচিব করে পাঠানো হয়।

―মিসেস দাশগুপ্ত, আপনার কী মনে হয়, আপনার স্বামী কতটা অনেস্ট ছিলেন…

শ্রীনিকার মুখ লাল হয়ে এলো, কঠিন গলায় বললো,

―হোয়াট ডু ইউ মিন?

―আই ডোন্ট মিন অ্যানিথিং মিসেস দাশগুপ্ত, ইটস জাষ্ট আ রুটিন কোয়েরী। আই রিপিট, আপনার স্বামী কতটা সৎ ছিলেন?

―হি ওয়াজ নট লাইক আদার্স, ও খুব নিষ্ঠার সাথে নিজের কাজ করতো, প্রচুর প্রচুর টাকার হাতছানি আসা সত্ত্বেও নির্দ্বিধায় সেগুলো পর করেছিল।

―তার মানে আপনার মতে, আপনার স্বামী প্রকৃত অর্থে সৎ!

―হ্যাঁ।

―আচ্ছা আপনি কী করেন?

―আমি টি.সি.এস এর ফিনান্সিয়াল ডিপার্টমেন্টে আছি, আই মিন আই অ্যাম অ্যান প্রাইভেট এমপ্লয়ি।

―ওকে। আচ্ছা গত সোমবার আপনি কোথায় ছিলেন?

―আ… আমি?

―হ্যাঁ আপনি?

―আমি তো অফিসের কাজে কয়েকদিন বাইরে গিয়েছিলাম, তো ওইদিন ফার্স্ট সকালে কলকাতায় ব্যাক করেছিলাম, ইন্দ্ররই আমাকে ওখান পিক করার কথা ছিল, কিন্তু…

শ্রীনিকা কথা শেষ করতে পারলো না, উজ্জ্বল মাঝেই তাকে থামিয়ে দিলো,

―কিন্তু ইন্দ্রনীল বাবু আসেননি, তাই তো?

শ্রীনিকা সম্মতিসূচক ভঙ্গি করলো,

―হ্যাঁ, প্রায় এক ঘণ্টা আমি ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তারপর আসছে না দেখে নিজেই একটা ক্যাব বুক করে চলে আসি বাড়ি। কিন্তু এসে ওকে দেখতে পাইনি সেদিন। ভেবেছিলাম হয়তো কোনো কাজে বেরোতে হয়েছে তাড়াতাড়ি!

―তারপর তো আর বাড়ি ফেরেননি উনি। আচ্ছা আপনিই কি পুলিশ কমপ্লেইনটা করেছিলেন?

―হ্যাঁ, ওইদিন রাত পার হয়ে যাওয়ার পরও যখন কোনো খোঁজ পেলাম না, বারবার ফোন করা সত্ত্বেও যখন দেখলাম ফোন সুইচড অফ, তখনই আমি কমপ্লেইনটা লজ করি…

বলেই হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো শ্রীনিকা, তার কান্নার শব্দ সমস্ত ঘর জুড়ে প্রতিধ্বনিত হওয়া শুরু করলো। এতক্ষণ বিমলবাবু একমনে উজ্জ্বল আর শ্রীনিকার প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুগমন করছিলেন, হঠাৎ শ্রীনিকার কান্নার দমকে চমকে উঠলেন, পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য তড়িঘড়ি সহানুভূতির স্বরে বলে উঠলেন,

―ম্যাডাম আপনি কাঁদবেন না প্লিজ। আমরা জানি, আপনার উপর দিয়ে এখন কী যাচ্ছে। দয়া করে কাঁদবেন না প্লিজ। আসলে আমাদের কোনো উপায় নেই, থাকলে আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতামই না। আপনি দয়া করে কাঁদবেন না। বলতে বলতে বিমলবাবুর গলার স্বরও খানিকটা কেঁপে উঠলো।

এতক্ষণে শ্রীনিকার কান্নার জোর অনেকটাই কমে এসেছে, হাত দিয়ে চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়া মোটা জল মুছতে থাকলো সে। উজ্জ্বল নিজের রুমালটা তার দিকে এগিয়ে দিলো, শ্রীনিকা সেটা নিয়ে ভালোভাবে চোখ’দুটো মুছে নিলো।

উজ্জ্বলের চোখ এখনো তার দিকে স্থির, কিন্তু সেই চোখে সহানুভূতির লেশমাত্র নেই, বরঞ্চ কৌতূহল আর ভ্রূকুটির পরিমাণই লক্ষণীয়। শ্রীনিকা রুমাল দিয়ে নিজের চোখের জল ভালোভাবে মুছে নিয়ে রুমালটা উজ্জ্বলকে ফেরত দিলো, তারপর কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টায় বললো,

―আপনি বাকি প্রশ্ন করতে পারেন… কান্না থেমে গেলেও গলার স্বরে কান্নার অনুভূতির ছোঁয়া এখনো রয়ে গেছে।

উজ্জ্বল একবার ঘাড় নেড়ে আবার প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু করলো,

―আপনার বাড়ি কোথায়?

শ্রীনিকা একটু ঢোক গিলে বললো,

―সাউদার্ন অ্যাভিনিউ।

―আচ্ছা ইন্দ্রনীল বাবুর বাবা-মা কোথায় থাকেন?

―শিবপুর। ওঁদের স্থায়ী বাড়ি ওটাই। ইন্দ্র অনেকবার ওনাদের এখানে এসে থাকতে বলেছেন, কিন্তু ওনারা রাজি হননি।

―আচ্ছা বুঝলাম। ঠিক আছে মিসেস শ্রীনিকা দেবী আপনি আসতে পারেন। আপনার অনেকটা সময় নষ্ট করলাম, কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই, গভর্নমেন্ট-এর কড়া হুকুম, যেভাবেই হোক কিনারা করতে হবে। আপনি বুদ্ধিমতী, আশা করছি, আমাদের সিচুয়েশনটা আপনি বুঝতে পারছেন।

শ্রীনিকা ঘাড় নেড়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লো, ধীর পায়ে দরজার কাছে এগিয়ে গেল। ঠিক তখনই উজ্জ্বল তাকে পিছু ডাকলো,

―সেস দাশগুপ্ত…

শ্রীনিকা ঘাড় ঘুরিয়ে উজ্জ্বলের দিকে তাকালো, উজ্জ্বল তার দিকে তীর্যক দৃষ্টি রেখে বললো,

―আপনার ওই গলার চেনের সাথে আটকানো পাথরটা বেশ সুন্দর তো, ওটা কি রুবি?

শ্রীনিকা নিজের গলার চেনের সাথে লেগে থাকা পাথরটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললো,

―আসলে আমি ঠিক বলতে পারবো না। তবে মনে হয় না, অত দামি কিছু হবে। আমি আসলে একটা মন্দিরের পাশে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম এটাকে, খুব ভালো লেগেছিল তাই নিজের কাছে রেখে দিয়েছি।

―ঠিক আছে ম্যাম। আপনি আসতে পারেন।

এরকম কাঠখোট্টা গলা শুনেও যদি কেউ বেশিক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে তার মান-সম্মান কিছু আছে বলে শ্রীনিকার মনে হয় না, তাই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে দরজাটা ঠেলে বেরিয়ে গেল সে।

সঙ্গে সঙ্গেই বিমলবাবু মুখ ফেরালেন উজ্জ্বলের দিকে,

―যাই বলুন উজ্জ্বল বাবু, আমার এই মেয়েটিকে ঠিকঠাকই লাগলো, স্বামীর অকাল মৃত্যুতে ভারী কষ্ট পেয়েছে। আহা! বাচ্চা মেয়ে একদম।

উজ্জ্বল এতক্ষণ দরজার দিকেই চেয়ে ছিল, হঠাৎ বিমলবাবুর এই মন্তব্যে তার হুঁশ ফিরলো, বিমলবাবুর দিকে ফিরে খানিক হেসে বললো,

―আপনার তাই মনে হলো!

বিমলবাবু ভ্রু কুঁচকালেন,

―কেন আপনার সেটা মনে হয়নি?

―একদম মনে হয়নি। মেয়েটা খুব ধূর্ত, ফাটিয়ে অভিনয় করেছে। নইলে আপনার মতো জাঁদরেল পুলিশ অফিসারকেও নরম করে তুলতে পারে নাকি!

―ঠিক স্পষ্ট হলো না ব্যাপারটা, একটু খুলে বলুন তো মশাই!

উজ্জ্বল আবার মুখ ফেরালো দরজার দিকে,

―মেয়েটার স্বামী কাল মারা গেছেন, এত তাড়াতাড়ি কীভাবে কোনো স্ত্রী তার স্বামীর মৃত্যু মেনে নিতে পারে!

বিমলবাবু বিরক্তিসূচক ভঙ্গি করলেন,

―ধুর মশাই, কোথায় মেনে নিয়েছে! কী কান্না কাঁদলো, দেখলেন না! একদম মেনে নিতে পারেনি।

উজ্জ্বল বিমলবাবুর দিকে আবার মুখ ফেরাল,

―একদিন আগে স্বামী মরে গেলে কেউ কনস্ট্যান্টলি প্রত্যেকবার স্বামীর প্রসঙ্গে "ওয়াজ" আর "ছিল" শব্দটা ইউজ করে না বিমলবাবু। এই মহিলা মেনে নিয়েছেন এনার স্বামীর মৃত্যু। এটাই আমার কাছে সবচেয়ে অস্বাভাবিক জিনিস। এই মহিলা ধূর্ত, বিশাল ধূর্ত। পারলে এনার পেছনে লোক লাগান, অনেক ইনফরমেশন পাওয়া যাবে। আর ওই পাথরটা কীরকম যেন অস্বাভাবিক! কিছুক্ষণ চুপ করে ওই পাথরটার ব্যাপারেই যেন চিন্তা করলো উজ্জ্বল, তারপর অবাস্তব এই চিন্তাটা ত্যাগ করে বললো, "যাই হোক, ফাইলটা বের করুন তো এবার! পোষ্টমর্টেম রিপোর্টটা একটু দেখি, যদি কিছু পাওয়া যায়।"

বিমলবাবু মুচকি হাসলেন,

―কিছু নয় মশাই, অনেক কিছু পাবেন… বলে ফাইলটা টেবিল থেকে তুলে উজ্জ্বলের দিকে এগিয়ে দিলেন।

উজ্জ্বল সেটাকে হাতে নিয়ে পাতা উল্টে ভালোভাবে দেখা শুরু করলো। আর সঙ্গে সঙ্গেই তার ভ্রু অত্যাধিক কুঁচকে গেল, একের পর এক যতই পাতা ওল্টালো ততই ভ্রুকুটি স্পষ্ট হলো তার চেহারায়, যেন কিছু অসম্ভব তথ্য সামনে এসে ধরা দিয়েছে। ভ্রুকুটি অত্যাধিক বেড়ে গেল। ফাইলটা টেবিলে রেখে অবাক, ফ্যাকাসে দৃষ্টিতে তাকালো বিমলবাবুর দিকে। বিমলবাবু গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,

―কী বুঝলেন মশাই?

উজ্জ্বল মুখের উপর একবার হাত চালিয়ে আবার নিজের স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার চেষ্টা করলো, তারপর ভারী গলায় বললো,

"গলার ওই ফুটোগুলো সাপের ছোবলের দাগ! আর অতগুলো!" বলতে বলতে কেঁপে উঠলো তার গলা।

বিমলবাবু উপর নীচ ঘাড় নাড়লেন,

―ওনার মৃত্যু সাপের ছোবলেই হয়েছে, তবে মশাই এতগুলো ছোবল! আমি ঠিক ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না। একটা সাপ যদি হয় তাহলে এতগুলো ছোবল মারবে না। আর অসংখ্য সাপ কী করে হবে! মানে যেখানে লাশ পাওয়া গেছে তার আশেপাশে তো কোথাও সাপের গোটা ঝাঁক আছে বলে তো শুনিনি। ব্যাপারটা বোধগম্য হচ্ছে না মশাই।

বলে কপালে একটা হাত দিলেন বিমলবাবু, যেন কিছু ভাবার কঠিন চেষ্টায় মগ্ন হলেন।

―কিন্তু তার চেয়েও অবাক করা বিষয় কালচে সাদা চামড়ার রহস্যটা। মানে চামড়ার উপরিভাগটা পুরোটা সিলিকা, যেন আস্ত একটা মানুষের পাথুরে মূর্তি।

বিমলবাবু মাথায় হাত দিয়ে মন দিয়ে কথাগুলো শুনছিলেন, এবার হাতটা সরিয়ে বলে উঠলেন,

―আর মশাই চামড়া কিন্তু শক্তও নয়, একদম নরম। মানে আমরা জানি, সিলিকা পাথরে থাকে, আর সেটা বিশাল কঠিন হয়, কিন্তু এখানে টেষ্ট করে পাওয়া গেছে উপরের পুরো চামড়া সমেত মাংস সিলিকার মোটা আস্তরণ তাও প্রচণ্ড নরম সেই চামড়া। বিশাল জটিল কেস মশাই, এ কী ধরণের ব্যাপার কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।

উজ্জ্বল চোয়াল শক্ত করে গভীর চিন্তায় নিজেকে নিমজ্জিত করলো, বিমলবাবুও কপাল চুলকাতে চুলকাতে কিছু একটা ভাবতে শুরু করলেন। ওদিকে জানলার বাইরে খোলা আকাশে ভরাট মেঘের সঞ্চার ঘটলো, ধীরে ধীরে কালো হয়ে এলো গোটা আকাশটা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%