প্রীতম পুরকাইত
বিমলবাবু ফোনের পাওয়ার বাটনটা ক্লিক করলেন, লকস্ক্রিনের ছবিটার দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। নিজের অজান্তেই ওনার চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। চশমাটা খুলে আঙুল দিয়ে দু’চোখ মুছে নিলেন বিমলবাবু। আজ প্রায় দশদিন হয়ে গেল উজ্জ্বল আর নেই। ছেলেটাকে বড়ো ভালো লাগতো বিমলবাবুর, ঠিক নিজের ছোটো ভাইয়ের মতো লাগতো। স্ক্রিনের ছবিটার দিকে আরেকবার তাকালেন বিমলবাবু, এক চিলতে হাসি ফুটলো ওনার ঠোঁটে, ছবিটা উজ্জ্বলই মজা করে তুলেছিল। কে জানতো এই একটা ছবিই স্মৃতি হিসেবে রেখে যাবে সে! চোখ দিয়ে অঝোরে জল বেরিয়ে এলো বিমলবাবুর। এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না যে, উজ্জ্বল আর নেই। এ যে কী সর্বনাশ শহরের উপর হানা দিলো, কে জানে! একে একে কতগুলো মানুষ এরকমভাবে মারা গেল, এমনকি উজ্জ্বলও একইভাবে। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো বিমলবাবুর, প্রচণ্ড রাগ হলো নিজের উপর, কী অপদার্থ তিনি! শহরে একের পর এক মানুষ এইভাবে খুন হচ্ছে, আর তিনি আর পুলিশ ডিপার্টমেন্ট তার কোনো কূলকিনারা করতে পারছেন না। আর সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয়, প্রত্যেকটা লাশও একে একে গায়েব হয়ে যাচ্ছে! কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে যাচ্ছে― তা ঘুণাক্ষরেও কেউ টের পারছে না। রাগে, দুঃখে, লজ্জায় মুখ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বিমলবাবুর। সজোরে টেবিলে একটা চাপড় মেরে উঠে গেলেন চেয়ার ছেড়ে।
আবার একটা লাশ পাওয়া গেছে আজ, পোষ্টমর্টেমে পাঠানো হয়েছে, সেখানেই যেতে হবে, যদি কিছু পাওয়া যায় লাশটা থেকে। কিন্তু কী আর পাওয়া যাবে, এতদিন ধরে এতগুলো লাশকে নিয়ে তো কাটাছেঁড়া করা হলো, কিছুই তো পাওয়া গেল না, এটা থেকে আর কী পাওয়া যাবে! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে নিজের চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
মর্গ থেকে বেরিয়ে সামনের চায়ের দোকানের দিকে এগিয়ে গেলেন বিমলবাবু। বেকার এতক্ষণ বসে থাকা, সেই একই জিনিস বারবার শুনতে আর কার ভালো লাগে। শরীরের উপরের আস্তরণ সম্পূর্ণ সিলিকা দিয়ে তৈরি, সাপের অসংখ্য ছোবলে মৃত্যু… আর ভালো লাগে না এই এক লাইন বারবার শুনতে। মাথা ধরে যায়। বিমলবাবু একটা চায়ের অর্ডার দিয়ে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলেন। মাথাটাকে যতটা সম্ভব ঠান্ডা করার চেষ্টা করলেন। মাথা গরম করলে এখন কিচ্ছু মাথায় আসবে না। চোখ বন্ধ করে তিনি একদম প্রথম থেকে সমস্ত ঘটনা সাজাতে থাকলেন, কিছু একটা লিঙ্ক তো নিশ্চয়ই থাকবে। অনেকক্ষণ ভেবেও কোনোকিছুই মাথায় এলো না, খানিক বিরক্ত হলেন বিমলবাবু। মুখ দিয়ে "ধুস" জাতীয় বিরক্তিসূচক শব্দ করে চা’টা না নিয়েই বেরিয়ে গেলেন সেখান থেকে। গাড়ির ভিতরে উঠতে যাবেন এমন সময় পাশ দিয়ে শুনতে পেলেন।
"বাবা গত তিনদিন হলো মারা গিয়েছে গো, হার্ট অ্যাটাক।"
"সে কী! দিব্যি তো সুস্থ-সবল মানুষ…"
আর কোনো কথা কানে গেল না বিমলবাবুর। গাড়ি ততক্ষণে দ্রুত বেগে পাড়ি দিয়েছে। মনের মধ্যে একটা মোচড় দিয়ে উঠলো বিমলবাবুর। নিজের বাবার কথা মনে পড়ে গেল ওনার। আজ প্রায় পনেরো বছর হলো বাবা আর নেই, সত্যিই কত দূরে আজ বাবা। একটা সময় বাবাকে ছাড়া যে থাকতে হবে, সেটা ভাবতেই পারতেন না বিমলবাবু। কিন্তু আজ কোথায় কী! আচ্ছা আজ বাবা যদি থাকতেন, তাহলে নিশ্চয়ই তিনি এই কেসের সমাধান বের করে দিতেন। মনে মনে হাসলেন বিমলবাবু। নিশ্চয়ই কেন, অবশ্যই পারতেন… এমনি এমনি কি আর পুলিশ ডিপার্টমেন্টে বাবার এত সুখ্যাতি! এমনি এমনি কি আর বিমলবাবুকে সিনিয়র কর্মচারীরা ওনার বাবার নাম চেনেন! বাবার এরকমই দাপট ছিল একসময়। বুক ফুঁড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বিমলবাবুর। আর হঠাৎ তখনই ভ্রু দুটো অস্বাভাবিক রকমের কুঁচকে গেল তাঁর, চোখে একটা ঝিলিক খেলে গেল। তড়িঘড়ি তিনি ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,
"গাড়ি ঘোরাও, হেড অফিসে যেতে হবে।"
ড্রাইভার কিছুটা থতমত খেলো,
"ইয়ে… মানে… কেন স্যার?"
―আহ! এত বলার সময় নেই, জলদি ঘোরাও।
ড্রাইভার আর কোনো প্রশ্ন করলো না, স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে একটা লম্বা ইউটার্ন নিলো। তারপর চার নম্বর গিয়ারে গাড়ি গুলির মতো এগিয়ে নিয়ে চললো।
মিনিট পনেরো সময় লাগলো লালবাজার হেড অফিস পৌঁছতে। গাড়ি থামতেই তড়িঘড়ি দরজা খুলে প্রায় লাফিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন বিমলবাবু। তারপর দৌড়ে এগিয়ে গেলেন ভেতরের দিকে। ভেতরে ঢুকে আসতেই একজন কনস্টেবল তাঁকে স্যালুট করে বললো,
"গুড অফটারনুন স্যার, কিন্তু স্যার ডি.এস.পি স্যার তো এখন নেই।"
বিমলবাবু শান্ত গলায় বললেন,
"আমি ওনার সঙ্গে দেখা করতে আসিনি। আমাকে একটা কথা বলো তো, পুরোনো আর্টিকেল আর কেস ডিটেইলস কোথায় থাকে? পুরোনো বলতে কিন্তু পঁচিশ-তিরিশ বছরের বেশি।"
কমস্টেবল তাঁকে ঠিকানা বলে দিতেই তিনি তড়িঘড়ি এগিয়ে গেলেন সেই ঘরের দিকে। বেশি যেতে হলো না, অল্প কিছুটা এগোতেই চোখে পড়লো ঘরটা, ঘরের বাইরে আরেকজন কনস্টেবল দাঁড়িয়ে। বিমলবাবু তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন,
"তুমি কি এখানে গার্ড দাও?"
সামনের কনস্টেবল একটু ইতস্তত করে বললো,
"হ্যাঁ স্যার…"
বিমলবাবু নিজের পরিচয় দিলেন,
"আমি সিনিয়র ইন্সপেক্টর বিমল মজুমদার, রাজারহাট থানা। একটা কেস রিলেটেড কিছু ফাইল চেক করবো।" বলেই নিজের আইডি কার্ডটা সামনে ধরলেন বিমলবাবু।
কনস্টেবল আর কোনো প্রশ্ন না করে তাঁকে ভেতরের দিকে হাত দেখালো, বিমলবাবু সঙ্গে সঙ্গেই ভেতরে প্রবেশ করলেন।
ভেতরের সমস্ত ফাইল আর আর্টিকেল তন্ন তন্ন করে খুঁজলেন তিনি, সালটা তাঁর এখনো মনে আছে, উনিশশো বিরাশি! ওই একটা কেসই তো বাবাকে চরম ব্যর্থতা দিয়েছিল, স্পষ্ট মনে আছে ওনার। আরও কয়েকটা কাগজ ঘাঁটার পর অবশেষে খুঁজে পেলেন। কাগজে স্পষ্ট লেখা― আনন্যাচারাল ডেথ, কাগজটা ওল্টালেন তিনি, পেছনে একটা খবরের কাগজের ছোট্ট টুকরো, যার হেডলাইনে লেখা― "টালিগঞ্জে ব্যবসায়ীর অস্বাভাবিক খুন"।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন