(পনেরো)

প্রীতম পুরকাইত

ফাদার সিডিয়াস ধীরে ধীরে ফাঁকা অন্ধকার গলি ধরে এগিয়ে গেলেন, নিধিও তাঁর পিছু পিছু শান্ত পায়ে এগিয়ে গেল। একটা নির্দিষ্ট জায়গায় এসে ফাদার সিডিয়াস দাঁড়িয়ে পড়লেন, তারপর নিধির দিকে মুখ ফেরালেন,

"তুমি প্রস্তুত?"

নিধি মাথা নাড়লো। ফাদার আবার দৃঢ় গলায় বলে উঠলেন,

"তোমায় যে স্পেলগুলো শিখিয়েছিলাম, মনে আছে তো?"

নিধি আবার ঘাড় নাড়ালো। ফাদার আবার বললেন,

"ওই জঙ্গলে এখন ও নেই, কিন্তু ওর দেহাংশ সর্বক্ষণ পাহারায় মগ্ন, কোনো আশঙ্কা কোনো বিপদ লক্ষ্য করলেই ওরা তোমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, তোমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু তোমাকে মনে রাখতে হবে, ওই দেহাংশগুলো শুধুমাত্র তোমাকে ভয়ই দেখাতে পারবে, তোমার কোনো ক্ষতি করার ক্ষমতা ওদের নেই, তাই ভয় পেলে চলবে না, এগিয়ে যেতে হবেই। তবুও যদি ভয় লাগে, তাহলে প্রথম স্পেলটা পর পর তিনবার বলবে, আর ঠিক মনে মনে দশ গুনবে, তাও যদি ওরা তোমার পথ ছেড়ে চলে না যায়, তাহলে আবার তিনবার বলে আবার মনে মনে দশ গুনবে, যদি তাও না হয় তাহলে তৃতীয়বারও একই কাজ করবে। এইবার ওরা নিশ্চিতরূপে তোমার পথ ছাড়তে বাধ্য হবে। আর তোমাকে বিভ্রান্ত করার জন্য কিন্তু ওরা অনেক কিছু করবে, যেমন তোমার সামনে উদ্দীপিত বাস্তবতার সৃষ্টি করবে, অর্থাৎ একটা মিথ্যে রিয়েলিটি মানে তোমার সামনে মিথ্যে মন্দির, মিথ্যে মূর্তি ওরা সৃষ্টি করবে তোমাকে কনফিউস করার জন্য, কিন্তু তোমাকে মনে রাখতেই হবে যে, মেডুসার মূর্তির মাথায় যে সাপগুলো বিরাজমান, তার একদম মধ্যিখানে যে সাপ থাকবে তার চোখের মণি অদ্ভুত রকমের লাল হবে, ঠিক একটা ছোট্ট গোল পাথরের মতো হবে। খুবই সূক্ষ্ম একটা চিহ্নর মতো কিন্তু তোমাকে ওটা লক্ষ্য করতে হবেই কারণ একমাত্র ওটাতে আঘাত করলেই শেষ হবে ও, নইলে ওরা জিতে যাবে।"

নিধি আবার মাথা নাড়লো, তারপর শুকিয়ে আসা গলায় বললো,

"আর কিছু?"

ফাদার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

"আরেকটা শেষ কথা, যখন তুমি একদম গন্তব্যে পৌঁছে যাবে, তখন হয়তো ও নিজেই তোমার সামনে উপস্থিত। হবেই বলছি না, তবে হতেই পারে, তখন কিন্তু তুমি ভয় পাবে না, একদৃষ্টে ওর চোখের দিকে চেয়ে থাকবে, আর শেষ যে স্পেলটা শিখিয়েছি ওটা একনাগাড়ে বলতে থাকবে, একদম থামবে না, যতক্ষণ না ও নিজের চোখ বন্ধ করে নিচ্ছে। তবে চোখ বন্ধ করলেও মন্ত্রটা বলা থামাবে না, ওটাই একমাত্র উপায় ওকে আটকে রাখার, ওই স্পেলটা বলতে বলতেই মূর্তির দিকে এগিয়ে যাবে, আর এইটা দিয়ে আঘাত করবে ঠিক ওই মধ্যিখানের সাপটাকে, তাহলেই সব ধ্বংস হয়ে যাবে।"

বলেই একটা বর্শা নিধির দিকে এগিয়ে দিলেন সিডিয়াস। নিধি সেটাকে সহস্তে গ্রহণ করল।

সিডিয়াস সঙ্গে সঙ্গে নিজের ডান হাতটা সামনে রেখে বাঁ’হাতের বুড়ো আঙুল ও প্রথমাটা ঠেকালেন কপালে, তারপর বিড়বিড় করে একটা মন্ত্র জপ করা শুরু করলেন, আর ডান হাতটা গোল বৃত্তের ন্যায় ঘোরাতে শুরু করলেন। কয়েক মুহূর্ত এইটা চললো, তারপর ধীরে ধীরে একটা বৃত্তাকার চক্রের মতো আগুনের ফুলকির সৃষ্টি হলো, যার পরিধি দিয়ে আগুনের ফুলকি বেরিয়ে আসছে আর ঠিক ভেতরের অংশে একটা অরণ্যের ছবি ফুটে উঠছে। আরও কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল, তারপর ধীরে ধীরে ফাদার নিধির দিকে মুখ ফেরালেন,

"যাও, এখান থেকে বাকি পথ তোমাকে হেঁটেই পার করতে হবে।"

নিধি কোনো শব্দ না করে ধীরে ধীরে সেই বৃত্তাকার অংশের দিকে পা বাড়ালো, আর প্রবেশ করলো সেই মায়াময় অদ্ভূত অরণ্যে। সঙ্গে সঙ্গেই বৃত্তাকার অংশটা মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেল। ঘটনাটা এতটাই দ্রুত ঘটলো যে নিধি খানিকটা চমকে গেল, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে নিজেকে সামলেও নিলো। তারপর ধীরে ধীরে সামনের পথ ধরে এগোনো শুরু করলো।

জঙ্গলটা বেশ শান্ত ও নির্জন, কীরকম যেন একটা গা ছমছমে ব্যাপার রয়েছে এখানে। অল্প অল্প ভয় লাগছে নিধির, কে জানে এই গহীন অরণ্যে কী বিপদ লুকিয়ে আছে তার জন্য। স্থির পায়ে সে হেঁটেই চললো, হাঁটা একবারের জন্যও থামালো না। চারপাশটা ভালোভাবে লক্ষ্য করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে সে। বেশ কিছুটা এগোনোর পর একটা জলাশয় চোখে পড়লো তার, গলাটাও প্রচণ্ড শুকিয়ে এসেছে, একটু যদি জল দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নেওয়া যেত তাহলে বেশ হতো। কিন্তু ফাদার সিডিয়াস বারবার বলে দিয়েছেন, এখানকার সমস্ত জিনিসই অভিশপ্ত, সবকিছু। তাই খুব সাবধানে এগোতে হবে, আর একটুও ভুল করলে হবে না। যদি জল খেলে কিছু হয়ে যায়! না না! জল খাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। নিজেকে ভালোভাবে বুঝিয়ে আবার হাঁটা দিলো সে, পেছনে ফেলে এলো নীল জলাশয়টিকে।

কিছুটা এগোতেই ক্লান্ত হয়ে পড়লো নিধি, না! আর পারা যাচ্ছে না, একটু যদি বিশ্রাম নেওয়া যেতো, তাহলে ভালো হতো। হাঁপাতে হাঁপাতে কথাগুলো মাথায় এলো নিধির, কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়লো, যত দ্রুত সম্ভব কাজটা সারা যাবে ততই মঙ্গল, তাই আর দাঁড়ালো না সে, দৃঢ় পায়ে এগিয়ে চললো গন্তব্যের দিকে। কিছুটা এগিয়ে যেতেই হঠাৎ করে আকাশটা অন্ধকার হয়ে এলো, কালো কালো মেঘ সমস্ত আকাশ জুড়ে ছেয়ে গেল। নিধি তাও হাঁটার গতি কমালো না। যেভাবেই হোক দ্রুত তাকে পৌঁছতে হবেই, যেভাবেই হোক। কিন্তু অল্প পথ পেরোতেই আবার একটা গাঢ় নীল জলাশয় চোখে পড়লো তার। জলাশয়ের ঠিক সামনে একটা পাথরের ঢিপির উপর বসে একটা মেয়ে, কিন্তু তার মুখ দেখা যাচ্ছে না, চুল দিয়ে সমস্ত মুখ ঢাকা। নিধির ভয় লাগতে শুরু করলো, সমস্ত শরীরটা একবার কেঁপে উঠলো… কিন্তু না, কিছুতেই থামবে না সে, থামলেই বিপদ। হাঁটার গতি আরও কিছুটা বাড়িয়ে নিলো সে। হঠাৎ তখনই সেই মহিলা মূর্তি এক ঝটকায় এসে থামলো তার সামনে, চমকে গেল নিধি! ধীরে ধীরে সামনের মহিলা ভেসে ভেসে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। নিধির সমস্ত সাহস, সমস্ত জেদ যেন নিমেষের মধ্যে উধাও হওয়ার উপক্রম হলো। সামনের মহিলা ধীরে ধীরে তার চুল মুখের উপর দিয়ে সরালো, আর সঙ্গে সঙ্গেই শিউরে উঠলো নিধি। একটা ভয়ঙ্কর পিশাচিনী তার দিকে এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে, যার সমস্ত শরীর কালো কুৎসিত, অসংখ্য দাগ যেন শরীর জুড়ে খেলে বেড়াচ্ছে, মুখটা পৈশাচিক আর চোখের বর্ণ অদ্ভুত লাল। নিধির একবার মনে হলো, ছুটে পালিয়ে যায়… কিন্তু না, পালালে হবে না। যত সে পালাবে, ততই এরা আরও পেয়ে বসবে, আর আজীবন তার স্বপ্নের মধ্যে এসে এভাবেই তাকে ভয় দেখাবে। তাই একটুও পিছোলো না নিধি, কঠিন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। মহিলার মাথার উপর বিস্তৃত সাপগুলো যেন ফণা উঁচিয়ে তার দিকেই এগিয়ে আসতে চাইছে, যেন তার সারা শরীরে তাদের বিষাক্ত তরল প্রবেশ করাতে চাইছে। না, না! ভয় পেলে চলবে না, ভয়কে জয় করতেই হবে। চোখটা বন্ধ করে মনে মনে একটু ভেবে নিলো নিধি। ফাদার বারবার বলেছেন, যদি কেউ ভয় দেখায় তাহলে প্রথম স্পেলটা জপ করতে। সেই মতোই চোখটা খুললো নিধি। আর মুহূর্তের মধ্যে আরও চমকে উঠলো। সামনের মহিলার সেই ভয়ঙ্কর মুখ এখন ঠিক তার মুখের চেয়ে এক আঙুল দূরে। কিন্তু না, ভয় পেলে চলবে না। নিজেকে বোঝালো নিধি, তারপর ফাদারের শিখিয়ে দেওয়া স্পেল বিড়বিড় করা শুরু করলো। একবার, দু’বার, তিনবার। তারপর চোখ বন্ধ করে এক থেকে দশ পর্যন্ত গুনলো। তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুললো… না, কেউ নেই। কিন্তু হঠাৎ আবার সেই নারীমূর্তি কোথা থেকে যেন এক ঝটকায় সামনে এসে দাঁড়ালো নিধির, আবার চমকে উঠলো সে, কিন্তু ভয় পেলো না। আবার সেই মন্ত্র বলা শুরু করলো সে। তিনবার একই মন্ত্র বিড়বিড় করে আবার চোখ বন্ধ করে মনে মনে দশ গুনলো সে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ মেললো। না, কেউ নেই। কিছুক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলো নিধি, যদি আবার সে ফিরে আসে… কিন্তু এবার আর আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো না। কেউই আর এলো না। নিধিও আবার হাঁটা শুরু করলো।

জঙ্গলটা বেশ সুন্দর, ঘন ঘন গাছে ভরে আছে। গাছের কম্বিনেশনটাও কীরকম অদ্ভুত, ইউক্যালিপটাসের সাথে পাইন… কিন্তু দেখতে বেশ লাগছে। সবচেয়ে ভালো লাগছে আকাশটা, গাঢ় নীল হয়ে যেন জঙ্গলটাকে আরও অনেকটা সুন্দর করে তুলেছে। আকাশের দিকে চেয়ে চেয়েই কিছুক্ষণ এগিয়ে চললো সে। কয়েক মুহূর্ত পর হঠাৎ করেই যেন পায়ের নিচে কীরকম ঠান্ডা ঠান্ডা অনুভব হলো। ব্যাপার কী? এত ঠান্ডা ঠান্ডা অনুভব হচ্ছে কেন? যেন কোনো ঠান্ডা কিছুর সাথে ঠেকছে পা’টা। সঙ্গে সঙ্গে পায়ের দিকে চোখ ফেরালো সে, আর মুহূর্তের মধ্যে তার শিরদাঁড়া অবশ হয়ে গেল। সবুজ ঘাসে ভরা অরণ্যের মাটি এখন প্রাণহীন লাশের আস্ত স্তূপ, যেখানে একের পর এক অসংখ্য লাশ পর পর সাজানো, আর তার উপর দিয়েই হেঁটে চলেছে সে। বুকটা একবার কেঁপে উঠলো নিধির, না জানি আর কত বিপদ আছে সামনের পথে… জোরে একটা নিঃশ্বাস নিলো সে, তারপর ধীরে ধীরে সেটা ছেড়ে আবার হাঁটা শুরু করলো। একটার পর একটা ঠান্ডা লাশ পেরিয়ে এগিয়ে চললো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারলো না, তার আগেই সমস্ত নির্জীব লাশ হঠাৎ করেই সজীব হয়ে উঠলো। তাদের শরীর কালচে সাদা পাথরের মতো, গলা জুড়ে অসংখ্য সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ছিদ্র। যেন আস্ত শয়তান! এত কাছ থেকে এদের দেখে শিউরে উঠলো নিধি, হৃৎপিণ্ডটা ভয়ঙ্কর রকম কাঁপতে শুরু করলো। জানে না কেন আর একটুও ভরসা পাচ্ছে না, একটুও জোর পাচ্ছে না, সমস্ত শক্তি যেন ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছে। ধপাস করে বসে পড়লো সে, সারা শরীর প্রচণ্ড পরিমাণে কাঁপছে, চোখ’দুটো বিস্ফারিত। ওই নরপিশাচগুলো ধীরে ধীরে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। চোখ’দুটো ভয়ে বন্ধ করে নিলো নিধি। দেহটা যেন অবশ হয়ে আসছে। আর পারছে না, পরাজয় আসন্ন। কিন্তু না! একদম না, কোনোদিন না। কিছুতেই হেরে গেলে চলবে না। মনের ভেতর থেকে কেউ যেন চেঁচিয়ে উঠলো… তার উপর… যেভাবেই হোক তাকে এই বিপদ পার করতেই হবে। সমগ্র পৃথিবীর মানুষের বাঁচা-মরা তার সাথে, এত সহজে সে কীভাবে হাল ছেড়ে দিতে পারে। না! কিছুতেই হারলে হবে না। বুকে জোর আনলো সে, একমুহূর্তে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালো, চোখের পাতা ধীরে ধীরে খুললো। এখনো সেই পিশাচগুলো এগিয়ে আসছে তারই দিকে, কিন্তু একটুও বিচলিত হলে চলবে না। চোখ’দুটো তাদের দিকে স্থির রেখে ফাদারের শিখিয়ে দেওয়া প্রথম স্পেলটা পরপর তিনবার বললো নিধি, তারপর চোখ বন্ধ করে মনে মনে দশ গুনলো। তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুললো। না! কেউ নেই। সব স্বাভাবিক। মনে মনে ফাদারকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলো নিধি।

কিছুটা এগিয়ে যেতে একটা মন্দির চোখে পড়লো তার। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলো সেই মন্দিরটিকে। ফাদার যেরকম বলেছিলেন ঠিক সেরকমই, তাহলে কি গন্তব্যে এসে পৌঁছেছে সে! চারপাশটা আরেকবার ভালোভাবে দেখে নিলো সে। একটু দূরেই মূর্তিটা চোখে পড়লো, হ্যাঁ, ওই মূর্তিটাই তো! ওটার কথাই তো বলেছিলেন ফাদার। ধীরে ধীরে মূর্তিটার দিকে এগিয়ে গেল নিধি। মূর্তির একদম কাছে এসে বর্শাটাকে সামনে ধরলো নিধি, তারপর সেটাকে তাক করে ধরলো মূর্তির মাথার দিকে। মনে মনে একবার ভেবে নিলো সে, এই মূর্তিটাকে ভেঙে দিলেই সমস্ত অশুভ ধ্বংস হয়ে যাবে। চোখটা উপরে তুলে মূর্তির মাথার উপরে ঠিক মাঝের সাপটার দিকে বর্শাটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া শুরু করলো, ঠিক তখনই মনে পড়লো, ফাদার বলেছিলেন সাপের চোখটা দেখে নিতে একবার। ভালোভাবে মাথা একটু উপরে তুলে সাপটার দিকে ভালোভাবে চোখ রাখলো নিধি, মন দিয়ে সাপের চোখটাকে দেখতে থাকলো কিছুক্ষণ… কিন্তু কোনো লাল বর্ণের গোল পাথরের মতো মণি খুঁজে পেলো না। তার মানে এটা আসল মূর্তি নয়, এটা তার ভ্রম। ভাগ্যিস বর্শা দিয়ে সাপটাকে আঘাত করেনি, নইলে সবকিছু শেষ হয়ে যেতো। হয়তো আর কিছু করাই যেতো না। ভগবানকে একবার ধন্যবাদ জানিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সে। তারপর আবার এগিয়ে চললো সামনের দিকে। মিনিট কয়েক এইভাবেই হেঁটে চললো সে। তারপর আবার দেখতে পেলো একটা নীল জলাশয়। মনে মনে ভাবলো, ক’টা জলাশয় আছে কে জানে! কিন্তু এতকিছু ভাবনার সত্ত্বেও একবারের জন্যও হাঁটা থামালো না সে, যতটা সম্ভব দ্রুত এগোতেই থাকলো। কয়েকটা মিনিট এইভাবেই কেটে গেল। তারপর আবার সেই মন্দিরের কাছে এসে দাঁড়ালো সে। কিন্তু এটা কি আসল? মনে আশঙ্কার মেঘ ঘনীভূত হলো। চারপাশটা ভালোভাবে দেখে নিয়ে মূর্তিটাকে খুঁজে পেলো সে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল মূর্তিটার দিকে। ভালোভাবে মাথার উপরের মাঝের সাপটার চোখের মণির দিকে তাকালো, কিছুটা কষ্ট করে দেখতে পেলো লাল বিন্দুর আবছা উপস্থিতি। অর্থাৎ ঠিক জায়গায় উপস্থিত। বর্শাটাকে উঁচিয়ে ধরলো নিধি, ভালোভাবে তাক করলো সাপের লাল বর্ণের গোল পাথর ন্যায় মণির দিকে। যেই না বর্শাটা ছুঁড়তে যাবে যাবে তখনই কেউ যেন তাকে একধাক্কায় মাটিতে ধরাশায়ী করে ফেলে দিলো। ঘটনাটা এতটা দ্রুত ঘটলো যে, কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না সে। নিজেকে কিছুটা সামলে মাথা তুলে দেখলো, যার ভয় পেয়েছিল সে’ই এসে দাঁড়িয়েছে সামনে।

"মেডুসা"

গলা কেঁপে উঠলো নিধির, সত্যি সত্যিই সে সামনে দাঁড়িয়ে। তার কুৎসিত কালো ফাটা শরীর আর অসংখ্য দাগযুক্ত মুখ নিয়ে নিধির দিকেই এগিয়ে আসছে। প্রচণ্ড ভয় লাগছে নিধির, কিন্তু কী করবে সে! কোনো উপায় কী আছে? মনে মনে ভাবতে থাকলো সে, কিন্তু বেশিক্ষণ ভাবতে পারলো না, তার আগেই আরেকবার তাকে আকাশে তুলে নিয়ে গেল কেউ। চোখ মেলে দেখলো, হ্যাঁ সে’ই তাকে একহাতে ধরে উপরে উঁচিয়ে ধরেছে… নিধি কোনো প্রতিক্রিয়া দেওয়ার আগেই তাকে মুহূর্তের মধ্যে মাটিতে আছাড় মারলো। প্রচণ্ড জোরে মাটিতে গিয়ে ধাক্কা খেলো তার শরীর, হাত-পা ছড়ে গেল। মাটির মধ্যে পড়ে থাকা বালির সংস্পর্শে সেই ছড়ে যাওয়া জায়গাগুলো জ্বলতে শুরু করলো। প্রচণ্ড জ্বলন নিয়েও কী করা যায়, সেটাই ভাবতে থাকলো নিধি। কিন্তু সামনের পিশাচিনী তার দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে, কতক্ষণ ভাবতে পারবে সে নিজেও জানে না। ধীরে ধীরে সে নিধির একদম কাছে এসে তার চুলের মুঠি চেপে ধরলো, তারপর একটানে নিজের সামনে এনে ধরলো নিধিকে। নিজের মাথার উপরের ফণা উঁচিয়ে থাকা সাপগুলো একদৃষ্টে যেন নিধির দিকেই চেয়ে আছে, দ্রুত সেগুলো নিজেদের বিষদন্ত নিধির দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল। ঠিক তখনই নিজের চোখ’দুটো খুললো নিধি… তার চোখ এখন গাঢ় লাল, মুখে কিছু একটা যেন বিড়বিড় করে বলছে। সেই দ্বিতীয় স্পেলটা! যেটা ফাদার সিডিয়াস শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তার চোখ মেডুসার চোখের দিকে স্থির। একনাগাড়ে সে মেডুসার চোখের দিকে চেয়ে মন্ত্রটা আউড়ে যাচ্ছে। মেডুসার সমস্ত শরীরটা নিমেষের মধ্যেই শান্ত হয়ে উঠলো, মাথার উপরে ফণা উঁচিয়ে থাকা সাপগুলোও কীরকম নিথর হয়ে উঠলো। নিধি মন্ত্র পড়া থামালো না, আরও জোরে পড়া শুরু করলো। কয়েকটা মুহূর্ত এইভাবেই কেটে গেল, তারপর মেডুসার চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। নিধি মন্ত্র পড়া থামালো না, মন্ত্র পড়তে পড়তেই ধীরে ধীরে মেডুসাকে একা রেখে এগিয়ে গেল পাথরের মূর্তিটার দিকে। মূর্তিটার একদম কাছে এসে দাঁড়ালো, তারপর মূর্তির পায়ের কাছে পড়ে থাকা বর্শাটাকে তুলে নিলো হাতে। ভালোভাবে মূর্তির মাথার উপরের মাঝের সাপটার চোখের লাল বর্ণের সূক্ষ্ম পাথর ন্যায় মণির দিকে তাক করলো বর্শাটাকে। মন্ত্র তখনও পড়ে চলেছে সে। মন্ত্র পড়া না থামিয়েই সেই চোখের লাল মণি লক্ষ্য করে বর্শাটাকে উঁচিয়ে তিরের মতো ছুঁড়ে দিলো সে, আর মুহূর্তের মধ্যেই ওই সাপের চোখের লাল মণি সমেত সমগ্র মাথাটা ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল, আর সাথে সাথেই সমস্ত মূর্তিটাও চারিপাশ দিয়ে ভেঙে যাওয়া শুরু করলো। এবার মন্ত্র পড়া থামালো নিধি। ধীরে ধীরে মূর্তির ধ্বংস লক্ষ্য করতে থাকলো সে। কিন্তু বেশিক্ষণ পারলো না… মনে হলো, কেউ যেন পেছন থেকে এগিয়ে আসছে তার দিকে। এক ঝটকায় পেছন ফিরলো সে… মেডুসা! চমকে উঠলো! কী করবে বুঝে ওঠার আগেই একটা গলার স্বরে চমকে উঠলো সে,

"এদিকে এসো নিধি, পালিয়ে এসো এদিকে…"

গলাটা আসছে পেছন দিক অর্থাৎ মূর্তির দিক থেকে, আবার মূর্তির দিকে মুখ ফেরালো নিধি। দেখলো, ফাদার সিডিয়াস সেই চক্রাকারে আবর্তিত অগ্নিফুলকির ওপাশে দাঁড়িয়ে তাকে সেদিকে যেতে বলছেন। নিধি একমুহূর্তও সময় নষ্ট না করে দ্রুত গতিতে সেদিকে ছুটে যাওয়া শুরু করলো। তার মন যেন অজানা আশঙ্কার ভয়েই বুকের ভেতরে সময় গোনা শুরু করলো, এক! দুই! তিন! চার!

দ্রুত ফাদারের কাছে পৌঁছতেই ফাদার তার হাত ধরে একটানে তাকে ভেতরে টেনে নিলেন, আর মুহূর্তের মধ্যেই মন্ত্র পড়ে চক্রাকারে আবর্তিত ওই অগ্নিফুলকি দ্বারা বেষ্টিত পথ বন্ধ করে দিলেন। নিধি দেখতে পায়নি, কিন্তু ফাদার শেষবারের জন্য দেখেছিলেন মেডুসা সমস্ত শক্তি দিয়ে এগিয়ে আসছিল তাদের দিকে, এমনকি নিজের মাথার খোঁপায় সজ্জিত সাপগুলোও নিজেদের মারণবিষ ছুঁড়তে উদ্যত হয়েছিল, আর ঠিক তখনই পথটা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

নিধি ফাদার সিডিয়াসকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ পাগলের মতো নিঃশ্বাস নিয়ে নিলো, তারপর সেগুলো ত্যাগ করে উঠে দাঁড়িয়ে ক্ষিপ্র কণ্ঠে বললো,

"আপনি তো বলেছিলেন মূর্তি ভেঙে পড়লেই ও শেষ হয়ে যাবে, তাহলে শেষ মুহূর্তে আমাকে আক্রমণ করার জন্য কীকরে বেঁচে ছিল ও! বলুন…"

ফাদার হাসলেন,

"কাউকে যদি তুমি বুকে ছুরি মারো, তাহলে কি সে সঙ্গে সঙ্গেই মরে যায়? অল্প সময়ের জন্যও কি বেঁচে থাকে না?"

নিধি অবাক হয়ে বললো,

"হ্যাঁ, তা তো কিছুক্ষণ বেঁচে থাকেই…"

"সেরকমই ওর’ও একটু সময় তো লাগবেই!"

"কিন্তু ফাদার আমার কিছু প্রশ্ন আছে।"

ফাদার হাসলেন,

"হ্যাঁ, বলো না।"

"আমি সত্যি ভবিষ্যতের অর্থাৎ আপনাদের সময়ের পৃথিবীকে বাঁচিয়ে দিলাম?"

ফাদার ঘাড় নাড়ালেন,

"হুম।"

"আর কোনোদিন আমার ঘুমে ওই স্বপ্নগুলো আসবে না তো?"

"না, কখনো আর আসবে না।"

কথাটা শুনে নিধি কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। কিন্তু আবার কৌতূহলী গলায় বললো,

"আচ্ছা আপনি যে এতকিছু জানেন, এতকিছু পারেন, সেটা কীভাবে?"

ফাদারের ঠোঁটে একটা সরল হাসি খেলে গেল,

"আমরা পারি, আমাদের সেই ক্ষমতা আছে। আমরা সাধারণ মানুষের থেকে অনেকটা আলাদা, আমাদের ছোটো থেকেই এইসব শেখানো হয়েছে। আমরা এই পৃথিবীকে অতিলৌকিক আতঙ্ক থেকে বাঁচানোর জন্যই জন্মেছি। এর বেশি আমি আর কিছু বলতে পারবো না।"

নিধি অল্প হাসলো,

"কীভাবে করলেন সেটাই বললেন না। থাক, বলতে হবে না, নিশ্চয়ই গোপনীয় সংগঠন আপনাদের। কিন্তু একটা কথা…"

―কী কথা?

"আপনি আমাকে বর্শা’ই দিলেন কেন? মানে অন্য অস্ত্রও দিতে পারতেন!"

ফাদার আবার হাসলেন,

"গ্রীক দেব-দেবীর কার কী অস্ত্র, সেটা জানো?"

নিধি ঘাড় নাড়লো,

"হ্যাঁ না জানার কী আছে, জিউসের থান্ডারবোল্ট অর্থাৎ বজ্রপাত, অ্যাথেনার বর্শা আর…"

নিধি কথা শেষ করার আগেই ফাদার তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,

"এবার বুঝলে কেন তোমায় ওটা দিয়েছিলাম?"

নিধির মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠলো,

"আচ্ছা, অ্যাথেনার সঙ্গে শত্রুতা, তাই তাঁর অস্ত্র দিয়েই ধ্বংস করা বেশি সুবিধার। বাহ! আচ্ছা আরেকটা কথা, আমিই কেন? আরও অনেক মানুষ তো ছিল এই পৃথিবীতে, তাহলে শুধুমাত্র আমিই কেন?"

ফাদার কিছু বললেন না, শুধু নিজের হাতের প্রথমাটা নিধির কপালে ছুঁইয়ে চোখটা বন্ধ করলেন। আর সঙ্গে সঙ্গেই এক ঝটকায় নিধির আত্মা যেন তার শরীর ছেড়ে বেরিয়ে এলো, ব্যাপারটা এতটাই দ্রুত ঘটলো যে, কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না নিধি… শুধু বুঝলো তার মন, চিন্তাধারা ― কিছুই আর তার হাতে নেই। কেউ যেন তাকে ধীরে ধীরে পরিচালিত করছে, আর সেই পরিচালকের ইশারাতেই সে যেন ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়লো।

একটা খচমচ শব্দে চোখ মেলে তাকালো নিধি। চারিপাশ ভালোভাবে লক্ষ্য করতে বুঝতে পারলো, একটা মন্দিরের ভেতরে পাথরের মূর্তি হয়ে একঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। ঘরটা সাধারণ মন্দিরের মতো ঠিক নয়, কিছুটা অন্য ধরণের। চারিদিকে বিভিন্ন রকমের সুন্দর সুন্দর পূজার আসবাব, এরকম আসবাব আগে কোনোদিনও দেখেনি নিধি। সমস্ত ঘর জুড়ে কেবল পূজার সরঞ্জাম। নিধি ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারলো না। হাত-পা নাড়ানোর চেষ্টা করলো সে, কিন্তু বুঝতে পারলো এই মূর্তি অন্যান্য মন্দিরে থাকা মূর্তিগুলোর মতই একইস্থানে স্থায়ী। তাই আর বেশি চেষ্টা করলো না নিধি, জানে কোনো লাভ হবে না, স্থির হয়েই আশপাশটা লক্ষ্য করা শুরু করলো। কয়েক মুহূর্ত এরকম নিস্তব্ধেই কেটে গেল। তারপর একটা প্রচণ্ড জোরে শব্দ করে সামনের দরজাটা খুলে গেল, নিধি সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে চোখ ফেরালো। সে দেখলো, দু’জন মানুষ একে-অপরকে জড়িয়ে ধরে এগিয়ে আসছে তারই দিকে। কিছুটা অবাক হলো নিধি, কারা এরা? কয়েক মুহূর্ত পরে মানুষ দু’জন তার একদম চোখের সামনে এসে দাঁড়ালো। একজন মহিলা আর একজন পুরুষ। দুজনের কাউকেই চেনে না নিধি, দুজনেই তার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা। ধীরে ধীরে পুরুষটি মহিলাটিকে কোলে তুলে নিলো, স্থির পায়ে আরো সামনে এগিয়ে এলো। নিধি মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্থির হয়ে সেটা দেখতেই থাকলো। পুরুষটি মেয়েটাকে মেঝেতে শুইয়ে দিলো, তারপর ধীরে ধীরে মেয়েটার পরনের কাপড় সূক্ষ্মভাবে খুলতে শুরু করলো। পুরুষের মুখে একটা তৃপ্তির হাসি, মেয়েটাও মোহের বশে যেন নিজেকে ডুবিয়ে দিলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মেয়েটার সমস্ত শরীর অনাবৃত হয়ে গেল, পুরুষটাও আস্তে আস্তে নিজের শরীরটাকে অনাবৃত করে দিলো। তারপর দু’জনে মেঝের উপর শুয়ে একে-অপরের সাথে আলিঙ্গনে লিপ্ত হলো। এক ভয়ানক যৌন পিপাসা যেন তাদের সমস্ত শরীরকে কোনো শক্ত দড়ি দিয়ে প্রচণ্ড শক্ত করে বেঁধে দিয়েছে। আর তারাও যেন সেই পিপাসাকেও একটুও অগ্রাহ্য করতে চাইছে না, বরঞ্চ আরও স্বাগ্রহে সেটাকে শরীরে মেখে নিতে চাইছে।

এ দৃশ্য আর সহ্য করতে পারলো না নিধি, তার শরীরটা কেমন যেন করে উঠলো। নিজের মধ্যে নিজের আর কোনো জোর অনুভব করলো না সে, মনে হলো এখন কেউ যেন এখন তার শরীরে বাস করছে। সেই নতুন বাসিন্দাই যেন হঠাৎ করে প্রচণ্ড পরিমাণে রেগে গেল, তার চোখ ভয়ঙ্কর রকম লাল হয়ে উঠলো। এ অনাচার সে কিছুতেই মেনে নেবে না, কিছুতেই না। তাও আবার তার নিজেরই মন্দিরে এরকম অপরাধ! না! কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না সেই নতুন বাসিন্দা। বারবার মনে হচ্ছে, মুহূর্তের মধ্যে এদের দু’জনকে শেষ করে দিতে। কিন্তু নিজের মন্দিরে রক্তপাত! না! এ এক পবিত্র স্থান। এখানে হিংসা, রক্তপাত এগুলোকে কোনোমতেই সে প্রশ্রয় দিতে পারবে না। কিন্তু তা বলে কোনো শাস্তিই পাবে না তারা, এরকম নির্লজ্জতার কাজ করার পরেও পার পেয়ে যাবে! কিছুতেই না, একদম পার পাবে না কেউ। বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকালো নিধি, বলাবাহুল্য নিধির শরীরে বসবাসকারী নতুন বাসিন্দা। এখনো দুজনে সেই নোংরামি চালিয়েই যাচ্ছে। মেয়েটার মুখ চরম সুখে উৎফুল্ল হয়ে উঠছে। না! এ কিছুতেই সহ্য করা যাচ্ছে না। মেয়েটার সুখ একটুও বরদাস্ত করা যাচ্ছে না। মেয়েটার উপর প্রচণ্ড রাগ ঘনীভূত হলো। তার দিকে অসম্ভবরকম বিস্ফারিত বাদামি মণি নিয়ে দাঁড়ালো সে, তারপর চোখের ইশারায় অভিশপ্ত করে তুললো মেয়েটার সমস্ত শরীর। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঝেতে অনাবৃত শরীর নিয়ে যৌন নেশায় মগ্ন মেয়েটির সমস্ত শরীর যেন হঠাৎ করেই ফেটে যাওয়া শুরু করলো, কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে ফটফট শব্দ করে সমস্ত উপরিভাগ ফেটে যেতে থাকলো। মেয়েটা ভয় পেয়ে গেল, নিজের এরকম অবস্থা দেখে সে হতভম্ব হয়ে গেল। তার শরীরের ঠিক উপরে শুয়ে থাকা পুরুষটিও একঝটকায় চমকে উঠলো মেয়েটির এই দশা দেখে। সঙ্গে সঙ্গে মেঝে ছেড়ে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালো পুরুষটা। মেয়েটার সারা শরীর এতক্ষণে সম্পূর্ণরূপে ফেটে গিয়েছে, ধীরে ধীরে সেই মাটির ভারের মতো ফেটে যাওয়া অংশগুলো থেকে কিছু একটা যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে। কয়েকটা নিস্তব্ধ অথচ চঞ্চল মুহূর্ত এইভাবেই কেটে গেল। তারপর একটা অসম্ভব বিকট শব্দ করে সমস্ত ফাটা শরীর ছিটকে গেল চারিদিকে, আর ধীরে ধীরে আবির্ভাব হলো একটা কুৎসিত কদাকার নারী-পিশাচিনীর, যার সমস্ত শরীরে অসংখ্য ক্ষত আর কাটাছেঁড়া দাগ, মুখ বীভৎস রকমের দানবীয়, আর মাথার উপরে চুলের পরিবর্তে অসংখ্য সাপের গোছা, পর পর অনেকগুলো সাপ! ফণা উঁচিয়ে তারা যেন নিধি অর্থাৎ ওই নতুন বাসিন্দার দিকেই চেয়ে রইলো। নিধিও যেন চোখ খুলে সবকিছু দেখতে পেলো, সেও চোখের পাতা একটুও ফেললো না। নিধি হয়ে উঠলো একজন অপূর্ব সুন্দর মহিলার দানবীয় পিশাচিনী হয়ে ওঠার প্রত্যক্ষদর্শী।

আচমকা চোখটা আবার খুলে গেল তার, মনে হলো এতক্ষণ যেন অন্য কোনো জগতে ছিল সে। একটুও যেন নিজের বশে ছিল না, চোখ খুলতেই ফাদারকে দেখতে পেলো সে। নিধির চোখ-মুখ এখন অবাক আকার ধারণা করলো, ফাদারের দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে চেয়ে সে বললো,

"তার মানে… তার মানে আমিই…"

সে কথা শেষ করার আগেই ফাদার তাকে আশ্বস্ত করে ঘাড় নাড়িয়ে ইতিবাচক উত্তর দিলেন। আর তখনই নিধির হাবভাব অল্প হলেও পরিবর্তন হলো, যেন একটা গর্ব আর সবকিছু জয়ের রেশ খেলে গেল তার সমস্ত শরীর জুড়ে। সেই গর্বমিশ্রিত স্বরেই সে ফাদারের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,

"তাহলে আবার কবে দেখা হবে?"

ফাদার একদৃষ্টে নিধির চোখের দিকে চেয়ে রইলেন, তিনি এতটা পরিবর্তন আশা না করলেও কিছুটা আশা করেছিলেন। তাই জন্যই তো আগে থেকে সব ঠিক করা আছে, সেই অনুযায়ীই তিনি নিধির উদ্দেশ্যে বললেন,

"হয়তো আর কোনোদিন নয়… আর দেখা হলেও আমার কথা তোমার আর মনে থাকবে না।"

হঠাৎ এরকম একটা কথা শুনে চমকে উঠলো নিধি। কিছুই বুঝতে পারলো না সে, কৌতূহল দেখিয়ে বললো,

"মানে?"

ফাদার সিডিয়াস কোনো উত্তর না দিয়ে নিধির কপালে আঙ্গুল রাখলেন, তারপর বিড়বিড় করে কী যেন একটা মন্ত্র পড়া শুরু করলেন। মন্ত্র পড়া শেষ হতেই নিধির সারা শরীরটা অবশ হয়ে ভেসে উঠলো, পরক্ষণেই তারা পৌঁছে গেল নিধির শোয়ার ঘরে… ধীরে ধীরে নিধির অবশ দেহটা বিছানার উপর হেলান দিলো। ফাদার ধীরে ধীরে অদৃশ্য হলেন সেখান থেকে।

গোপন চেম্বারে যখন সিডিয়াস পৌঁছালেন, ততক্ষণে সমগ্র পৃথিবী আবার আগের অবস্থায় ফিরে গিয়েছে। ম্যানহোলের নিচে পর্যন্ত শহরের গমগমে আওয়াজ কানে আসছে। এগুলো শুনতে পেয়ে সিডিয়াসের মনটা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। ধীরে ধীরে তিনি নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলেন, এখন ম্যানহোল থেকে বেরোনো যাবেনা , সকালবেলা কাউকে এভাবে ম্যানহোল থেকে বেরোতে দেখলে মানুষ কী না কী ভাববে, রাতের দিকেই বেরোতে হবে… আপাতত এখানেই রাত পর্যন্ত থাকতে হবে। চেয়ারে ভালোভাবে হেলান দিলেন সিডিয়াস, তারপর কপালে হাত দিয়ে একটা মন্ত্র জপ করলেন কিছুক্ষণ, মুহূর্তের মধ্যে সেই আয়না আবার তার সামনে উপস্থিত হলো। আয়নার ওপারে দেখা গেল সেই কুৎসিত কালো মহিলাকে, যার মাথার উপর অসংখ্য সাপ বিরাজমান, যন্ত্রণায় ছটফট করছে যেন। সিডিয়াস মনে মনে বললেন,

"ইউ হ্যাভ টু বি দ্য প্রিশেনার মাই ডিয়ার চাইল্ড, ফর অ্যাটলিস্ট আ ফিউ হান্ড্রেড ইয়ার্স। অ্যান্ড দ্য আর্থ উইল বি সেফ ফ্রম ইউ ইন দিস পিরিয়ড।"

বলেই আবার মন্ত্র বিড়বিড় করা শুরু করলেন, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আয়নার ওপারে থাকা নারীমূর্তির উপর বিকট শব্দ করে বজ্রপাত হলো।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%