(চার)

প্রীতম পুরকাইত

মহারাষ্ট্রা পুরাণে চোখ বুলাচ্ছিল ইন্দিরা, কত কী’ই না আছে এই ছোট্ট চটি বইটাতে। মারাঠাদের বর্গী হয়ে ওঠার কাহিনী, বাংলায় বর্গী আক্রমণ, আলীবর্দী খাঁয়ের অসৎ উপায়ে নবাব হয়ে ওঠা, দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খাঁয়ের প্রতিহিংসা― সব কিছু রয়েছে এই ছোট্ট চটি বইটাতে। এই বইটা এই জন্যই হয়তো ইন্দিরার এত প্রিয়! প্রায় কুড়ি বার পড়েছে সে এই বইটা, কিন্তু একবারের জন্যও বিরক্ত হয়নি, এমনই জাদু আছে এই বইয়েতে। বইটার পাতাতেই মুগ্ধ হয়ে ছিল সে, ঠিক তখনই মাথায় একটা চাটি এসে পড়ল কোত্থেকে। সঙ্গে সঙ্গেই পেছনে মুখ ফেরালো ইন্দিরা, পেছনে ঘুরতেই দেখলো নিধি মিটিমিটি হাসছে। প্রচণ্ড রেগে গেল ইন্দিরা, এমনিতেই পড়ায় ব্যাঘাত ঘটেছে, তারউপর মাথায় ভালোই লেগেছে। মুখটা গম্ভীর করে কিছুক্ষণ নিধির দিকে চেয়ে রইলো সে, তারপর একেবারে ঝাঁঝিয়ে উঠলো,

"সবসময় ইয়ার্কি ভালো লাগে না নিধি, তোকে কিছু বলি না বলে ভাববি না যে, আমি বলতে পারি না, এগুলো আমার একদম ভালো লাগে না।" বলে থামলো সে।

ইন্দিরার হঠাৎ এরকম আচরণে খানিকটা ঘাবড়ে গেল নিধি, সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বলে উঠলো,

"এ ভাই, সরি ভাই। কিছু মনে করিস না, এরকম রেগে যাস না, প্লিজ। আসলে আমি তো তোর সাথে এরকম মজা করেই থাকি! জানতাম না যে, তোর এত খারাপ লাগে, আর করবো না। এরকম লাইব্রেরিতে বকাঝকা করিস না, প্লিজ।" বলে ইন্দিরার মাথার পেছন দিকে হাত বুলাতে শুরু করলো সে, "এখানে লেগেছে ভাই? খুব জোরে লেগেছে না!"

ইন্দিরা নিধির হাতটা নিজের মাথা থেকে সরিয়ে দিলো,

"ছাড় ছাড়, ও ঠিক হয়ে যাবে।"

বলেই ইন্দিরা বসে পড়লো নিজের চেয়ারে। নিধিও আর বেশি কথা বাড়ালো না, গিয়ে বসে পড়লো ইন্দিরার পাশের চেয়ারে, হাতে রাখা বইটা রাখলো ডেস্কে। তারপর ইন্দিরাকে উদ্দেশ্য করে বললো,

―আজ কী ইতিহাস ঘাঁটছিলেন ম্যাডাম!

ইন্দিরা হেসে উঠলো,

―যেটা সবচেয়ে বেশি পছন্দ…

নিধি সঙ্গে সঙ্গে নিজের দৃষ্টি নিয়ে গেল ইন্দিরার হাতে ধরা বইটার দিকে। যা ভেবেছিল ঠিক তাই, মহারাষ্ট্রা পুরাণ। এই বইটা যে ইন্দিরা ঠিক কতবার পড়েছে সেটা মনে মনে একবার ভাবার চেষ্টা করে নিলো সে, মন বললো, অগণিত বার। নিধি মিচকি হেসে উঠলো,

―তুই কতবার পড়েছিস ভাই এটা, তাও পড়তে ভালো লাগে?

ইন্দিরা ব্যঙ্গ করে বললো,

―তুমি যে গ্রিক মিথ গুলে খাও রোজ, তা নিয়ে আমি কি কোনোদিন কিছু বলেছি!

নিধি আবার হেসে উঠলো,

―আমরা বেকার ইংলিশ লিটারেচারে মাস্টার্স করছি। তোর উচিত ছিল হিস্ট্রি নিয়ে করা, আর আমার মাইথোলজি।

বলেই আবার হিহি করে হেসে উঠলো সে।

ইন্দিরাও সঙ্গ দিলো সেই হাসিতে। কিছুক্ষণ চললো সেই হাসাহাসি। তারপর নিধি টেবিলে রাখা বইটার একটা নির্দিষ্ট পাতা খুলে এগিয়ে দিলো ইন্দিরার দিকে। ইন্দিরা খানিকটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো,

―কী করবো আমি? আমার দিকে বইটা এগিয়ে দিলি কেন?

―এই জায়গাটা পড় একটু, এটা জিউস পূর্ববর্তী মিথ…

ইন্দিরা বিরক্তির সুরে বললো,

―এই আমি এসব পড়বো না, আমার ভালো লাগে না।

―আরে ভাই, তুই তো ইন্ডিয়ান দেবতাদের নিয়েও অনেক পড়াশোনা করিস তাই বললাম পড়তে, এটা পড়লে বুঝবি গ্রিক পুরাণ আমাদের ভারতীয় পুরাণ থেকে কতটা ইন্সপায়ার্ড।

ইন্দিরা ভ্রু কোঁচকালো,

―সিরিয়াসলি?

―হ্যাঁ রে। যেমন আমাদের ইন্দ্রদেব দেবতাদের রাজা, সেরকম জিউস গ্রীক গডদের হেড। তারপর জমরাজ আর সাথে গ্রীক গড হেডেস-এর মিল আছে, দুজনেই ওই নরকের দেবতা। আর কিউপিড যেমন গড অফ লাভ, সেরকম আমাদের কামদেব। আরও অনেক সিমিলারিটি আছে, এই বইটা পড়লে জানতে পারবি।

―বাহ! দারুণ তো। এটা তাহলে আমি নিয়ে যাবো।

―হ্যাঁ নিয়ে যাস, আমি এমনিতেও আজ এটা লাইব্রেরিয়ানের কাছে জমা দিতাম। আমি জমা দিলে তুই নিয়ে নিবি।

―ওকে, ডান।

ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে রাস্তা পেরিয়ে সামনের ন্যাশনাল বুক স্টোরের দিকে এগিয়ে গেল নিধি, ইন্দিরাও পিছু নিলো তার। প্রতিদিনই দু’জনে সব ক্লাস শেষ হওয়ার পর একবার করে ঢুঁ মেরে যায় বইপাড়ায়। কোনোদিন বই কেনে, আবার কোনোদিন শুধু বই দেখে, দুজনের’ই বেশ ভালো কাটে এই সময়টা। এই জন্যেই তো প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হওয়া, নইলে জে.এন.ইউ, আর.বি.ইউ তো ছিলই। ইন্দিরা আর নিধি সেই ছোটোবেলার বন্ধু, যাকে বলে চাড্ডি বাড্ডি ফ্রেন্ড। সেই কে.জি স্কুল থেকে শুরু করে হাই স্কুল, কলেজ এমনকি এখন ইউনিভার্সিটিও সেম। দু’জন দু’জনকে ছাড়া একেবারেই থাকতে পারে না, এই জন্যেই তো নিধি যখন জে.এন.ইউ'র চান্স ছেড়ে দিয়ে প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হলো, ইন্দিরাও আর.বি.ইউ'র স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে বন্ধুর পিছু পিছু চলে এলো। অবশ্য দুজন’ই ব্রিলিয়েন্ট স্টুডেন্ট, নইলে পরীক্ষা দিয়েও ওই সামান্য’কটা সিটের মধ্যে চান্স পাওয়া সবার দ্বারা হয় না।

নিধি ন্যাশনাল বুক স্টোরের সামনে এসে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ একঠায় দাঁড়িয়ে কিছু যেন একটা ভেবে নিলো, তারপর ডানদিকে ঘুরে ফুটপাত ধরে এগিয়ে গেল। এতটা দ্রুত এগিয়ে গেল যে পেছনে ইন্দিরাকে প্রায় ছুটে গিয়ে তাকে ধরতে হলো। নিধির পাশে এসে ওর কাঁধে হাত দিয়ে ইশারায় ওকে থামতে বললো ইন্দিরা, তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,

"কোথায় যাচ্ছিস? বই দেখবি না কোনো?"

নিধি হেসে বললো,

"দেখবো মাই ডিয়ার ওয়াটসন, কিন্তু ওখান থেকে নয়। ওখানের মাইথোলজি সেকশনটা খুব লিমিটেড, ওর চেয়ে ওদিকটায় ভালো ভালো কালেকশন পাবো। তবে তার আগে ফুটপাত থেকে একবার আজকের পেপারগুলো চোখ বুলিয়ে নিতে হবে, আজ সকালে একটা পেপারও পড়া হয়নি। দেখি কোনো ইন্টারেস্টিং কিছু পাওয়া যায় কিনা।"

বলেই আবার সামনের দিকে এগিয়ে গেল নিধি, ইন্দিরার হাঁপানিও এতক্ষণে দূর হয়ে গেছে, সেও এগিয়ে গেল সামনের দিকে। কিছুটা যাওয়ার পর ফুটপাতের একটা বই দোকানির ঢেলে বিছানো বইগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো নিধি, দোকানদারকে উদ্দেশ্য করে বললো,

"দাদা, একটা বর্তমান দিন তো…"

দোকানদার এতক্ষণ বইগুলোর উপর জমা ধুলো হাতের কাপড়টা দিয়ে ঝেড়ে উড়িয়ে দিচ্ছিল, নিধির কথায় সেই কাজটা বন্ধ করে তার দিকে অবাক চোখে তাকালো। মেয়েরাও যে খবরের কাগজ পড়ে, এটা তার জানা ছিল না। ডানপাশের খবরের কাগজের বান্ডিল করা একটা ব্যাগ থেকে একটা বর্তমান বের করে নিধির দিকে এগিয়ে দিলো সে। ইতিমধ্যে নিধি ব্যাগ থেকে টাকা বের করে রেখেছিল, পেপারটা হাতে নিয়েই টাকাটা মিটিয়ে আবার সামনের দিকে এগোতে শুরু করলো।

কিছুটা গিয়ে একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লো নিধি, ইন্দিরাও তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। খবরের কাগজটা খুলে ধরলো নিধি, প্রথম পাতাটায় অতটা গুরুত্ব না দিয়ে পাতা ওল্টালো। এমনিতেই প্রথম পাতায় বিজ্ঞাপনের পরিমাণ বেশি থাকে, তাই ওই পাতাটা খুব একটা দেখে না নিধি। দ্বিতীয় পাতাটা খুলে চোখের সামনে মেলে ধরলো পেপারটাকে, আর সঙ্গে সঙ্গেই তার ভ্রু অসম্ভব রকম ভাবে কুঁচকে গেল, চোখদুটো স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা বড়ো হয়ে এলো। তার এরকম অবস্থা দেখে কিছুটা অবাক হয়ে গেল ইন্দিরা, হঠাৎ করে কী এমন হলো যে, নিধির চোখ-মুখ এরকম অস্বাভাবিক হয়ে উঠলো, ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারলো না ইন্দিরা। শুধু দেখলো, নিধির চেহারায় ভ্রূকুটির ছাপ স্পষ্ট, আর যতই সময় যেতে লাগলো সেই ভ্রূকুটির পরিমাণ ততই বাড়তে লাগলো। ইন্দিরা তার কাঁধে হাত দিয়ে একটা ঠেলা দিলো, আর সঙ্গে সঙ্গেই চমকে উঠলো নিধি। ইন্দিরা কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করে উঠলো,

"কী হয়েছে তোর? এরকম করছিস কেন?"

নিধি এখনো যেন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারলো না। ইন্দিরার দিকে মুখ ফিরিয়ে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো তার দিকে। ইন্দিরা আবার তার কাঁধে একটা ঠেলা দিলো,

"কী রে, কী হলো বলবি তো!"

এবারের ডাকে হুঁশটা সম্পূর্ণ ফিরে পেলো সে, কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,

"জা… জানি না কী হয়েছে। কিন্তু শরীরটা কীরকম করে উঠলো এক মুহূর্তের জন্য।"

―কী করে উঠলো!

নিধি আর কোনো প্রশ্নের উত্তর দিলো না, হাতের খবরের কাগজের পাতাটা ইন্দিরার সামনে নিয়ে গিয়ে ধরলো। তারপর সেই পাতার নির্দিষ্ট একটা জায়গায় আঙুল রাখলো। ইন্দিরা এতক্ষণ কৌতুহল দৃষ্টিতে চেয়ে ছিল তার দিকে, এইবার চোখ’দুটো নিয়ে গেল খবরের কাগজের পাতায়। নিধি যেখানে আঙুল রেখেছে সেখানে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা "টালিগঞ্জে ব্যবসায়ীর অস্বাভাবিক খুন"। হেডলাইনটা পড়েই আবার নিধির দিকে মুখ ফেরালো ইন্দিরা,

―হ্যাঁ তো কী হয়েছে? এরকম অস্বাভাবিক মৃত্যু তো হামেশাই লেগে আছে, এতে তুই এত প্যানিক করছিস কেন?

নিধি এতক্ষণ হাঁপাচ্ছিল, এইবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,

―আরে এটা বাকি অস্বাভাবিক মৃত্যুর থেকে একদম আলাদা। লোকটা নাকি কয়েকদিন থেকে নিখোঁজ ছিল, আর কাল সকালে নাকি ওর লাশ পাওয়া যায়। সারা শরীর কালচে সাদা বর্ণের, চোখ-মুখের ভঙ্গিমা অদ্ভুত, আর সম্পূর্ণ গলার প্রতিটা জায়গা অসংখ্য সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ফুটোয় ভর্তি, একটা জায়গাও অক্ষত নেই। আর সবচেয়ে আশ্চর্য হলো, লাশের পাশে এক গোছা রেশমি কালো চুল…

ইন্দিরার চোখ’দুটো স্বাভাবিকের চেয়ে খানিকটা বড়ো হয়ে এলো,

"গলায় অসংখ্য ফুটো মানে? মানেটা কী?"

"মানে পুরো গলাটা একটা তারজালির মতো হয়ে গেছে, যেন কেউ একটা ছুঁচ গলার সমস্ত অংশে খুব মেপে মেপে ফুটিয়ে তুলে নিয়েছে।"

―কী সব বলছিস তুই?

―এটাই লেখা আছে, কী বীভৎস!

―কিন্তু তুই এত প্যানিক করছিস কেন?

নিধি কিছুক্ষণ একঠায় তাকিয়ে রইলো মাটির দিকে, তারপর বললো,

―জানি না, বুঝতে পারছি না। কিন্তু খবরটা পড়ার সময় মনে হচ্ছিল যেন, আমি লাশটাকে সামনে থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম, আর ওই বীভৎস শরীরটাকে দেখেই আমার সমস্ত গা গুলিয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, আমার সামনেই কেউ লোকটার উপর বীভৎস অত্যাচার করছে। যেন লোকটা মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে আমার সামনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো…

ইন্দিরা অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো নিধির দিকে, তারপর আশ্বাস দিয়ে বললো,

―আরে ভয় পাস না, ওগুলো তোর মনের ভুল। আসলে কিছুই হয়নি ওরকম। তুই বেশিই ভাবছিস আজকাল। আসলে এটা ফিকশানাল মিথ পড়ছিস যে, এগুলো অটোমেটিক্যালি মাথায় ঘুরতেই থাকছে, আর ছোটো কোনো ঘটনাকে এইভাবে মনের মধ্যে বড়সড় করে একটা গোটা ভয়ের উপন্যাস তৈরি করছে। তুই চাপ খাস না, চল এখন, গিয়ে দেখি কিছু ভালো বই পাওয়া যায় কিনা…

ইন্দিরার কথাগুলো মনের মধ্যে গেঁথে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করলো নিধি। সত্যিই তো বলেছে ও, আজকাল এতই ফিকশন পড়া শুরু করেছে সে যে, এইসব হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। সারাক্ষণ মনে-প্রাণে শুধু ওইসব আজগুবি জিনিসপত্র ঘুরলে তো ওগুলোই সাবকনসাস মাইন্ডে জমা হবে, আর পরে এসে এরকম বীভৎস কিছুর রূপ নেবে! এই ফিকশন পড়া একটু কমাতে হবে এবার… মনে মনে নিজেকে বললো নিধি। তারপর ইন্দিরার সাথে এগিয়ে গেল সামনের বিপণিগুলোর দিকে।

বাড়িতে ঢুকেই একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লো নিধি, আজ শরীরটা খুব ক্লান্ত লাগছে। ঘাড় আর কোমরটা বেশ ব্যথাও করছে। একটা হাত দিয়ে ঘাড়ের দিকটা একটু চাপ দিলো সে। মা এতক্ষণ রান্নাঘরে ছিল, মেয়েকে হঠাৎ এরকম আচরণ করতে দেখে দ্রুত তার দিকে এগিয়ে এলো,

―কী হয়েছে রে? শরীর খারাপ?

মাকে বেকার বেকার কোনো চিন্তায় ফেলে লাভ হবে না দেখে সে মৃদু হেসে বললো,

―না না, ওই সারাদিন ক্লাস করে একটু ক্লান্ত আর কী…

বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লো নিধি, ব্যাগটা নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল। নিজের ঘরের দরজাটা খুলে বিছানায় শরীরটাকে ছুঁড়ে দিলো। ক্লান্ত শরীর হওয়ায় ঘুমটাও সঙ্গে সঙ্গেই এসে ধরা দিলো তার চোখে।

ঘুমের মধ্যে মনে হলো, কেউ যেন তার সামনে বসে কিছু একটা বিড়বিড় করছে। প্রথমটা স্পষ্ট কিছুই দেখতে পেলো না। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর ধীরে ধীরে সবকিছু পরিষ্কার হলো, একটা মেয়ে সাদা কাপড় জড়িয়ে তার পায়ের কাছে বসে আছে। তার চোখ বন্ধ, হাতদুটো জড়ো করা, জড়ো করা হাতের ভেতর দিয়ে কয়েকটা ফুল উঁকি দিচ্ছে। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তার দিকে চেয়ে রইলো নিধি, ধীরে ধীরে বুঝতে পারলো, মেয়েটা বিড়বিড় করে একটা মন্ত্র জপ করছে আর একমনে কারোর নাম নিচ্ছে। আরও কয়েকটা মুহূর্ত কেটে যেতে সে বুঝলো, মেয়েটা পুজো করছে, কিন্তু কার? কে আছে এখানে? কোন ঠাকুর বা দেবতার পুজো করছে সে! আশপাশটা ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করলো সে, কিন্তু কিছুই চোখে পড়লো না। কেউই তো নেই ঘরটাতে, শুধু তার পদস্থলে বসে থাকা মেয়েটা আর সে। তাহলে কার পুজো করছে মেয়েটা? হঠাৎ খেয়াল হলো, ঘরে শুধু ওরা দুজন রয়েছে, আর মেয়েটা তার দিকে মুখ রেখেই মন্ত্র আউড়ে পুজো দিচ্ছে… অর্থাৎ! ভাবনাটা মনে আসতেই চোখ’দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠলো নিধির। মানে তার পুজো হচ্ছে এখানে! কিন্তু কেন? দেব-দেবীর পরিবর্তে তার পুজো কেন? ব্যাপারটা কিছুতেই বোধগম্য হলো না তার, এরকম আজগুবি ব্যাপার তো হওয়ার কথা নয়। কৌতূহলী চোখ নিয়ে আবার মেয়েটার দিকে তাকালো নিধি। ঠিক তখনই মেয়েটা ধীরে ধীরে তার চোখ খুললো, আর হাতের ফুলগুলো তার পায়ের দিকে ছুঁড়ে দিলো। নিধির প্রচণ্ড অস্বস্তি হওয়া শুরু হলো, এই ঘটনাটা কিছুতেই তার মন সত্যি বলে মানতে চাইছে না। সত্যিই তো এরকমই কিছু হওয়া অসম্ভব। তাকে কেউ পুজো করতে যাবে কেন? এটা নিশ্চয়ই স্বপ্ন, নিশ্চয়ই স্বপ্ন। নিজেকে কিছুটা আশ্বস্ত করে আবার সামনের মেয়েটার দিকে তাকালো সে, কিন্তু এবার মেয়েটার দিকে তাকাতেই চমকে উঠলো নিধি। মেয়েটার সারা শরীরটা যেন ধীরে ধীরে ফেটে যেতে থাকলো, কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই তার সমস্ত শরীরটা একটা মাটির ভাঁড়ের চারিদিক দিয়ে ফেটে গেল। তারপর দেখা গেল সেই ফাটল ঠিকরে যেন কিছু একটা বেরিয়ে আসতে চাইছে। কিছুটা অবাক হলো নিধি। কী এমন বেরিয়ে আসতে চাইছে মেয়েটার ফাটা শরীরটা থেকে? কৌতূহল গাঢ় হলো। সে ভালোভাবে লক্ষ্য করার চেষ্টা করলো। কিন্তু বেশিক্ষণ আর তাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সেদিকে রাখতে হলো না, আচমকা একটা খটখট শব্দ করে মেয়েটার শরীরের ফেটে যাওয়া সমস্ত অংশগুলো ছিটকে গেল এদিক-ওদিক আর একটা কুচকুচে কালো কুৎসিত মূর্তি বেরিয়ে এলো নিধির সম্মুখে। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো নিধি।

ধড়মড়িয়ে উঠে পড়লো নিধি, প্রচণ্ড জোরে হাঁপাচ্ছে। না জানি কোন পাপ জীবনে করেছে সে! বারবার এই স্বপ্নগুলো যে কেন আসে তার স্বপ্নে― একটুও বুঝে উঠতে পারে না সে। আর ভালো লাগে না এগুলো। শুধু মনে হয় এইসব কিছু যেন খুব চেনা তার, যেন এগুলো আগেও সে দেখেছে, বা এই ঘটনাগুলো আগেও তার সাথে হয়েছে… কিন্তু কোথায়, কীভাবে― সেগুলো কিছুই মনে পড়ে না তার। যাই হোক, ওইসব চিন্তা যত করবে ততই আরো বাজে স্বপ্ন আসবে, এই ভেবে সমস্ত বাজে চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টায় একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলো নিধি। তারপর আবার বিছানায় হেলান দিয়ে আলতো করে চোখটা বুজলো।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%