(ছয়)

প্রীতম পুরকাইত

গভীর ঘুমে ঢলে রয়েছে গোটা গ্রাম, কালো নিকষ অন্ধকারে ঢেকে গেছে চারপাশ। নিঝুম রাত যেন গ্রাস করে ফেলেছে সমস্ত ভূ-ভাগকে। শুধু একজনের চোখের পাতায় নিদ্রা দেবী এখনো বিরাজ করতে পারেনি, গোটা ঘরটা অন্ধকারে ডুবে গেলেও তার চোখ’দুটো জ্বলছে, এক অভাবনীয় আনন্দের কথা ভেবে। কাল সমস্ত গ্রাম জুড়ে পুজো হবে দেবীর, দেশ-বিদেশ থেকে নানান ধর্মগুরু আসবে এই মহোৎসবে। আর কাল সমস্ত মন্দিরকে সাজিয়ে তোলার দায়িত্বও তারই কাঁধে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই একটা উচ্ছ্বাসের হাসি খেলে গেল তার ঠোঁটে। কিন্তু হঠাৎ করেই তার গলাটা কীরকম শুকিয়ে গেল, পরক্ষণেই তার মনে পড়লো, আজ অনেকক্ষণ জল পেটে পড়েনি। বিছানা ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে এলো সে, তারপর এগিয়ে গেল ঘরের কোণে রাখা জলের কুঁজোটার দিকে। মাটির গেলাসটা নিয়ে কুঁজোটাকে খানিকটা কাত করে গেলাসে জল ভর্তি করলো সে, তারপর সেই জল ঢাললো কণ্ঠনালীর অভ্যন্তরে। জল দিয়ে গলা ভেজানোর পর গেলাসটা আবার যথাস্থানে রেখে বিছানার দিকে পা বাড়ালো সে। কিন্তু হঠাৎ তার মনে হলো, কিছু একটা যেন তার পেছন দিয়ে খুব দ্রুত চলে গেল। এক ঝটকায় পেছন ফিরলো সে, কিন্তু জানলা তো ফাঁকা! কিচ্ছু নেই তো। তাহলে! তাহলে কীসের অনুভূতি হলো ওটা! ব্যাপারটা ঠিক পরিষ্কার হলো না তার কাছে। হয়তো মনের ভুলই হবে। আবার বিছানার দিকে ফিরে এগিয়ে গেল সেদিকে। কিন্তু আবার মনে হলো, কেউ যেন দ্রুত পায়ে তার পেছন দিয়ে চলে গেল। এবার খানিকটা অস্বস্তি হলো তার, ধীরে ধীরে আবার মুখ ফেরালো জানলার দিকে। না! এবারেও তো কেউ নেই, কিন্তু সে নিশ্চিত কেউ না কেউ ছিল। তবে কি যে ছিল সে লুকিয়ে পড়লো! ভ্রুকুটি স্পষ্ট হলো মেয়েটার সারা মুখে। ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে, অতি ধীরে দরজার পাল্লাটা খুলে ধীর পায়ে বাইরের ঘরের ভেতরে ঢুকে এলো সে। অতি সাবধানে বাড়ি থেকে বেরোতে হবে তাকে, এই ঘরে এখন বাবা-মা ঘুমিয়ে রয়েছে, সামান্য শব্দ হলেই ঘুম ভেঙে যাবে, আর ঘুম ভাঙলেই কেলেঙ্কারি বাঁধাবেন। তাই খুব বুঝে শুনে পা ফেলে এগিয়ে গেল সে, একদম নিঃশব্দে এই ঘরের দরজাটা খুলে বেরিয়ে এলো উঠানে। বেরিয়ে এসেই এদিক-ওদিক ভালোভাবে দেখে নিলো সে, কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলো না। তবে কি তাকে বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখে পালিয়ে গেছে? কৌতূহল আরও গাঢ় হলো তার। আরও কিছুটা সামনের দিকে এগিয়ে গেল সে, তারপর আশেপাশে আবার ভালোভাবে দেখলো। না কেউ নেই! মুখটা কাঁচুমাচু করে বাড়ির দিকে ফিরে আসার জন্য মুখ ফেরালো সে, ঠিক তখনই কিছুটা দূরের বটবৃক্ষের আড়াল থেকে ছুটে কাউকে মন্দিরের দিকে ছুটে যেতে দেখতে পেলো। বুকটা কেঁপে উঠলো তার, একটা অশরীরি শিহরণ খেলে গেল সমস্ত শরীর জুড়ে। এতক্ষণ তাহলে সে ভুল দেখেনি! সত্যিই একজন ছিল এখানে। ভালোভাবে মুখ ঘুরিয়ে সেদিকে আরেকবার তাকালো সে, একটা আবছা ছায়ামূর্তি যেন খুব সন্তর্পণে গাঁয়ের অন্ধকার রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক মন্দিরটার দিকে। কিন্তু কেন? মন্দিরে কী আছে! কেন সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে সে! ব্যাপারটা ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারলো না মেয়েটা। কিন্তু তাও মনটা কু ডাকা শুরু করেছে। অন্ধকার কেটে ভোরের আলো ফুটলেই শুরু হবে পুজোর আয়োজন। সেখানে এত রাত্রে একজন মন্দিরে কী জন্য যাচ্ছে! কোনো খারাপ অভিসন্ধি আছে কি! যদি সত্যিই খারাপ অভিসন্ধি থাকে, তাহলে তো যেভাবেই হোক তাকে আটকাতেই হবে। ধীর পায়ে মন্দিরের দিকে এগিয়ে যাওয়া শুরু করলো মেয়েটা।

অন্ধকারে সমস্ত গ্রাম ঢেকে আছে, সবাই নিদ্রার ঘোরে বুঁদ। এদিকে দু’জন ছায়ামূর্তি এগিয়ে যাচ্ছে জঙ্গলের পথ ধরে। দুজনের একজনের উদ্দেশ্য গ্রামকে রক্ষা করা, আরেকজনের উদ্দেশ্য এখনো স্পষ্ট নয়।

মেয়েটা ছায়ামূর্তির পেছন পেছন অতি সন্তর্পণে মন্দিরের পেছনের উঁচু ঢিপিটার পেছনে এসে দাঁড়ালো। সামনের অজ্ঞাত ছায়ামূর্তি এখনো স্থির পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে মন্দিরের দিকে। ধীরে ধীরে সে মন্দিরের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল, একটা একটা করে সিঁড়ি ভেঙে উঠে যেতে লাগলো মন্দিরের সিংহদুয়ারের একদম সম্মুখে। মেয়েটাও লুকিয়ে তার পিছু পিছু এসে দাঁড়ালো সিঁড়ির কোলভাগে। ছায়ামূর্তি এতক্ষণে সিংহদুয়ার ঠেলে খুলে দিয়েছে সেটা। মেয়েটা চমকে উঠলো! এত রাতে সিংহদুয়ার কেন খুললো এই গোপন ব্যক্তি। মন্দিরের দোর তো রাতে খোলা একদম মানা। তাহলে এর উদ্দেশ্য একদমই সৎ নয়। মনের মধ্যে কু ডাকটা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। আগন্তুক এতক্ষণে মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে। মেয়েটা আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলো না, নিজের গোপনীয়তাকে এক ঝটকায় ভেঙে প্রায় চিতার মতো গতিবেগে ছুটে গেল সিংহদুয়ারের দিকে। খোলা সিংহদুয়ারের ভেতরে প্রবেশ করার জন্য পা বাড়ালো। কিন্তু রাত্রে মন্দিরে ঢোকা যে একদম মানা, বিশেষ করে সেই সব নারীদের তো একদমই মানা, যারা এই মন্দিরের দাসী, আর সেও তো একজন দাসী’ই। কিন্তু এই অনিষ্টকে আটকাতে গেলে তাকে মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করতেই হতো। কোনো উপায় নেই। সমাজবিধির সমস্ত গণ্ডি, সমস্ত বাধা ভেঙে একছুটে মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করলো সে। এগিয়ে গেল দেবীর প্রতিষ্ঠিত মূর্তির দিকে, যেখানে সেই অজ্ঞাত আঁততায়ী তারই অপেক্ষায় রয়েছে। দেবীর মূর্তির সামনে এসে সেই ছায়ামূর্তিকে আবিষ্কার করলো মেয়েটা, নিজের সমস্ত জোর লাগিয়ে সাধ্য মতো গম্ভীর আর জোর গলায় চেঁচিয়ে উঠলো সে,

"কে তুমি! কী করছো এখানে?"

কোনো উত্তর এলো না, কেবল দেহটা খানিকটা ঝুঁকলো, তারপর দেবীর পায়ের সামনে রাখা রাতের আহারের পাত্রটা নিজের হাতে তুলে নিলো। চমকে উঠলো মেয়েটা! ছায়ামূর্তি একটা ফল সেই পাত্র থেকে নিয়ে একটা কামড় বসালো তাতে। চোখ’দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠলো মেয়েটার, দেবীর খাদ্য একজন সাধারণ ব্যক্তি উচ্ছিষ্ট করছে! আর এই ঘোর সর্বনাশ চোখের সামনে সে হতে দিলো! নিজের উপর চরম রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার, এক ছুটে সেই ছায়ামূর্তির দিকে এগিয়ে গিয়ে তার হাত ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিলো সে। ছায়ামূর্তি এক ঝটকায় মুখ ফেরালো মেয়েটার দিকে। আর সঙ্গে সঙ্গেই মেয়েটার সমস্ত শরীরের উষ্ণ রক্ত এক নিমেষে শীতল হয়ে উঠলো। এ কী দেখছে সে! কে… কে এটা! এ যে মানুষ নয়, এ যে সাক্ষাৎ এক শয়তানী। মুখের সমস্ত চামড়া যেন গলে গেছে তার, দানবীয় কুৎসিত সমস্ত দেহ। আর চুল! না, চুল তো নয় সেগুলো, সেগুলো তো চুল নয়। এক-একটা আস্ত সাপ যেন তার মাথা বেয়ে বয়ে চলেছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলো না মেয়েটা, ছিটকে এলো পেছনে। এরকম অস্বাভাবিক কিছু একদমই আশা করেনি সে। তার সমস্ত শরীরটা অনবরত কেঁপে কেঁপে উঠছে, আর আতঙ্কে হৃদযন্ত্রটা যেন চেপে যাচ্ছে। কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না, কিন্তু ভয়, আতঙ্ক, শিহরণ যেন ধীরে ধীরে গ্রাস করছে তাকে। হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো সে, আর তখনই সেই সর্পবেষ্টিত চুলের গোছা এক ঝটকায় তার মুখের সামনে এসে হিস হিস করতে শুরু করলো।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%