প্রীতম পুরকাইত
মোবাইলটা হাতে ধরেই গলা পেড়ে চেঁচিয়ে উঠলেন মৃন্ময়ী দেবী,
"কী গো হলো, আর কতক্ষণ লাগবে বলো দেখি! এদিকে তোমার যে ফোন এসেছে একটা। কী করে যে পুলিশের চাকরি করো বাপু বুঝি না, প্রতিদিন সকালে বাথরুমে দেড় ঘণ্টা সময় কাটানোর পরও যে তোমার চাকরি কীভাবে আছে, সেটা ভেবেই অবাক হয়ে যাই। কী গো! বের হও এবার…"
বাথরুমের ভেতর থেকে একটা গমগম করে মৃদু হালকা কোষ্ঠকাঠিন্যওয়ালা গলা ভেসে এলো,
"হ্যাঁ, আসছি… এই হয়ে গেছে…"
মিনিট খানেক পর কাঁধে একটা গামছা জড়ানো অবস্থায় পেতে হাত রেখে অতি কষ্টে বাথরুম ছেড়ে বেরিয়ে এলেন বিমলবাবু, পেটটা এখনো কীরকম মোচড় দিচ্ছে। চোখ-মুখ খিঁচিয়ে অতি কষ্টে বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি, তারপর গিন্নির দিকে উদ্দেশ্যে মুখটা কাঁচুমাচু করে বললেন,
―হ্যাঁ বলো…
―বলবো আর কী! ফোনটা এসে ধরে আমাকে উদ্ধার করো। এই নাও…
বলেই ফোনটা বিমলবাবুর হাতে দিয়ে গজগজ করতে করতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন মৃন্ময়ী দেবী।
বিমলবাবু ফোনটা হাতে নিয়ে কানে ধরলেন,
“হ্যালো, সিনিয়র ইন্সপেক্টর বিমল মজুমদার স্পিকিং…”
ওপাশ থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো,
"হ্যাঁ বিমলবাবু আমি উজ্জ্বল বলছি।"
"হ্যাঁ উজ্জ্বল বাবু বলুন…"
"পেট পরিষ্কার হলো?"
ঘাড় নেড়ে বিমলবাবু বললেন,
―হ্যাঁ… তারপর কিছুটা অবাক হয়ে বললাম, "অ্যাঁ, মানে?"
―যাই হোক, বাদ দিন। একটা খারাপ খবর আছে।
বিমলবাবুর চোখ কপালে উঠলো,
―সে কী! আবার কী খারাপ খবর!
ওপাশের গলাটা খানিকটা ভারী হয়ে উঠলো,
―আরেকটা বডি পাওয়া গেছে বিমলবাবু, একজন দিনমজুরের বডি। আপনি পারলে এক্ষুনি স্পটে আসুন।
বিমলবাবু খবরটা শুনে এতক্ষণ যেন অন্য কোনো চিন্তায় ডুবে গেছিলেন, শেষের কথাটা শুনে আবার হুঁশ ফিরে পেলেন, তড়িঘড়ি বললেন,
―আ… আমি আসছি, কিন্তু জায়গাটা কোথায়?
―আগের বডিটা যেখানে পাওয়া গিয়েছিল, সেই জায়গাটা থেকে বেশি দূরে নয়।
বিমলবাবু বিরক্তির সুরে বললেন,
―আরে মশাই হেঁয়ালি না করে এক্স্যাক্ট লোকেশনটা বলুন তো!
―তেঘড়িয়া হনুমান মন্দির…
উজ্জ্বল আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বিমলবাবু সেইসব কথায় তোয়াক্কা না দিয়েই ফোনটা কেটে দিলেন, তারপর ছুটে গেলেন নিজের ঘরের দিকে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে তড়িঘড়ি তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লেন গন্তব্যের উদ্দেশে।
বিমলবাবু যখন গন্তব্যে এসে পৌঁছালেন, তখন ঘড়িতে সোয়া ন'টা বেজেছে, আশপাশটা একবার ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে উজ্জ্বলকে দেখতে পেলেন তিনি। তড়িঘড়ি এগিয়ে গেলেন তার দিকে, তার একদম কাছে পৌঁছে তার কাঁধে একটা হাত রাখলেন। উজ্জ্বলও সঙ্গে সঙ্গেই পেছনে ফিরলো। পেছন ফিরে বিমলবাবুকে দেখতে পেয়ে কিঞ্চিৎ হাসলো সে,
―আজও কি বাথরুমে দেড় ঘণ্টা কাটিয়েই এলেন বিমলবাবু?
এতক্ষণ বিমলবাবুর মুখে একটা কৌতূহল আর গভীর চিন্তার রেশ ছিল, হঠাৎ এরকম একটা কথা শুনে সেটা সম্পূর্ণ বদলে ভ্যাবাচ্যাকা ধরণের হয়ে গেল, চোয়াল শক্ত করে বললেন,
―ধুর মশাই, সকাল সকাল আপনিও শুরু করলেন! ওইসব বাদ দিন না, ঘটনাটা একটু খুলে বলুন দেখি…
এইবার উজ্জ্বলের ভঙ্গিমা গম্ভীর হয়ে উঠলো, স্থির কণ্ঠে সে বলা শুরু করলো,
"লোকটার নাম শ্রীকান্ত, এখান থেকে সাত-আট মিনিট দূরেই ওর বাড়ি। পেশায় একজন রাজমিস্ত্রী। প্রায় প্রতিদিনই অল্প নেশা করে বাড়ি ফেরে, কালকেও তার অন্যথা হয়নি। লোকটার দুটো বিয়ে, প্রথম পক্ষের বউ মারা গেছে, আর দ্বিতীয়টার সাথে সেরকম ঘনিষ্ঠতা নেই। মা ছিল, কিন্তু তিনিও গত হয়েছেন কয়েক মাস আগে। কাছের বলতে শুধু প্রথম পক্ষের মেয়ে নীলু। একমাত্র বাপ বেটির’ই জমতো। পাড়ার একজন লোক এসে আইডেন্টিফাই করেছে, কিন্তু মুখ দেখে নয়, তার জামা আর হাতের তাবিজটা দেখে, মেয়েও এসে কান্নাকাটি করতে শিওর হলাম ― এটাই শ্রীকান্ত। লাশটা পাওয়া গেছে এই দীঘির ধারে…"
হাত দিয়ে দীঘির দিকটা নির্দেশ করলো উজ্জ্বল, বিমলবাবুও সঙ্গে সঙ্গেই তাকালেন সেদিকে। উজ্জ্বল আরও বললো,
"এক্ষেত্রেও সেই একই অবস্থা বুঝলেন। সারা শরীর কালচে সাদা পাথরের মতো বর্ণে পরিণত হয়েছে, আর গলা জুড়ে অগণিত সূক্ষ্ম ছিদ্র, আর লাশের পাশে একগোছা রেশমি কালো চুল। বড়ই অদ্ভুত বিমলবাবু, বড়ই অদ্ভুত। এরকম কেস জন্মে দেখিনি।"
বিমলবাবু ঘাড় নাড়লেন,
"সত্যি না সত্যি, এরকম আজগুবি কেস জীবনে কোনোদিন দেখিনি বাপু। আর শালা হলি তো হলি একেবারে আমার থানার এরিয়াতেই হতে হবে!" বিরক্তিসূচক ভঙ্গি করলেন তিনি, "আমরা দুজন বড়ই বেয়াদপ ক্রিমিনালের পাল্লায় পড়েছি উজ্জ্বল বাবু। দেখা যাক, কতদূর কী করতে পারি। যাই হোক, আমাদের ডাক্তার কিছু বললো, বডি পরীক্ষা করে? মানে খুনের সময় বা ধস্তাধস্তির চিহ্নের ব্যাপারে কিছু?"
উজ্জ্বল মাথা নাড়লো,
"ধস্তাধস্তির চিহ্ন তো কিছু নেই, তবে খুনটা ওই শেষ রাতের দিকে হয়েছে, মানে দেড়টা পৌনে দুটো নাগাদ।" কথাগুলো বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো উজ্জ্বল, তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলা শুরু করলো, "ঠিক মিলছে না বিমলবাবু, বড়ই বেকায়দায় পড়া গেছে, দেখা যাক কদ্দূর কী করতে পারি! যাই হোক, পেট পরিষ্কার তো এখন? মানে সমস্যা নেই তো আর কোনো?" বলে মুচকি হাসলো উজ্জ্বল।
এবারের মজাটা বিমলবাবু আর অতটা গায়ে মাখলেন না, স্বাভাবিক গলাতেই বললেন,
―হ্যাঁ, এখন বেশ ভালো।
―তাহলে চলুন কোথাও থেকে ব্রেকফাস্টটা করে নিই। সেই কোন সকাল থেকে না খাওয়া… মাথা ঘুরছে খুব, চলুন।
বলেই উজ্জ্বল মেইনরোডের দিকে এগিয়ে গেল, বিমলবাবুও সেদিকে পা বাড়ালেন। যেতে যেতেই দীঘির ঘাটের মার্ক করা জায়গাটার দিকে চোখ পড়লো বিমলবাবুর, লাশটাকে সবে স্ট্রেচারে তুলছে কয়েকজন কর্মচারী… লাশের মুখভঙ্গি কীরকম অস্বাভাবিক, যেন প্রচণ্ড ভয় পেয়ে কুঁকড়ে গেছে মুখটা। সেদিকে চেয়ে চেয়েই কিছুটা এগিয়ে গেলেন তিনি, তারপর আবার উজ্জ্বলের দিকে মুখ ফিরিয়ে হাঁটা লাগালেন।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে হোটেল থেকে বের হয়ে এলো উজ্জ্বল আর বিমলবাবু। বিমলবাবু লম্বা একটা ঢেকুর তুলে বললেন,
―খাওয়ার সময় অত কী ভাবছিলেন বলুন তো মশাই?
উজ্জ্বল একটা সিগারেট বের করে মুখে দিয়ে সেটা এতক্ষণ জ্বালানোর চেষ্টা করছিল, লাইটারটা একটু সমস্যা করছিল বলে জ্বলছিল না। হঠাৎ বিমলবাবুর কথাটা কানে আসতে খানিক চমকে গেল, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর দিলো,
―আর কী নিয়ে ভাববো বলুন, ওই খুনগুলোর ব্যাপারেই ভাবছিলাম। কীরকম একটা যেন! মানে ঠিক স্বাভাবিক নয়…
বিমলবাবু মাথা দোলালেন,
"হুম, আগে এরকম ঘটনা কোনো শুনেছি বা দেখেছি বলে তো মনে নেই। সাপের ব্যাপার নয় মানা গেল যে এক বা একাধিক সাপ একসাথে গলায় ছোবল দিয়েছে, কিন্তু শরীরের সমস্ত অংশ ওরকম অস্বাভাবিক ভাবে কালচে-সাদা পাথুরে বর্ণের কী করে হয়ে যাচ্ছে! কোনো যুক্তিই তো ওই জায়গায় খাটছে না। চিন্তার বিষয় উজ্জ্বল বাবু, সাংঘাতিক চিন্তার বিষয়।"
উজ্জ্বল আর কিছু বললো না, কঠিন চোয়াল নিয়ে এগিয়ে গেল ঘাটের দিকে। ঘাটের কাছে এখন দু’জন কনস্টেবল দাঁড়িয়ে রয়েছে, লাশ অনেকক্ষণই হলো পোষ্টমর্টেমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। উজ্জ্বল ঘাটের সিঁড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, তারপর স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো দীঘির জলের দিকে। জলের রংটা কীরকম যেন অদ্ভুত লাগছে ওর। কীরকম অন্য ধরণের, ঠিক সাধারণ দীঘির জলের মতো নয়। চোখটা বন্ধ করে নিলো উজ্জ্বল। মনে মনে নিজেকে বোঝালো যে, এইসব কিছু ওর কল্পনা, সব একটা মানসিক ভ্রম। একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিলো উজ্জ্বল, তারপর সেটা আবার ত্যাগ করে মুখ ফেরালো দীঘির ওপর প্রান্তের দিকে। দীঘির ঠিক উল্টোদিকে কয়েকটা দোকান আর দু-তিনটে বাড়ি পর পর দাঁড়িয়ে রয়েছে। সব কটা দোকানই এখন খোলা, তবে খদ্দেরের সংখ্যা কোনো দোকানেই নেই সেরকম, হয়তো পুলিশ এদিকে আছে শুনে আর আজ এদিকের দোকানগুলোতে আসেনি। মনে মনে একবার হাসলো উজ্জ্বল, শালা পুলিশে এত কীসের ভয় এদের সত্যিই বোঝায় দায়। মুখটা এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে বিমলবাবুকে খোঁজার চেষ্টা করলো উজ্জ্বল, কিন্তু একটা জায়গায় এসে তার চোখটা আটকে গেল, আর সরলো না সেখান থেকে। একঠায় কিছুক্ষণ সেইদিকেই চেয়ে রইলো উজ্জ্বল, তারপর একটা উজ্জ্বল রশ্মি খেলে গেল তার চোখে, ঠোঁটদুটো নিজে থেকেই কিছুটা হেসে উঠলো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন