প্রীতম পুরকাইত
চিলেকোঠার দরজাটা খুলে ছাদে পা দিলো নিধি, আস্তে করে বাইরে থেকে শিকলটা তুলে দিলো। ধীরে ধীরে ছাদের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে আশেপাশের বাড়ির ছাদগুলো ভালোভাবে একবার দেখে নিলো। না! কেউ নেই।
ধপাস করে বসে পড়ল সে, তারপর অঝোরে কেঁদে উঠলো। আর পারছে না সে, আর এভাবে এগুলো সহ্য করতে পারছে না। কেন এরকম হচ্ছে তার সাথে, কেন! কেন! কেন! কেন ওই স্বপ্নগুলো বারবার আসছে ঘুমের মধ্যে! এক জিনিস বারবার মাথা ছিঁড়ে খাচ্ছে। না, আর পারছে না সে। আর পারা যায় না। প্রতিদিন ওই স্বপ্নের ভয়ে না ঘুমিয়ে থাকা, সবসময় অচেনা আতঙ্ক, এগুলো আর নেওয়া যাচ্ছে না। মাথার চুলগুলো খামচে ধরলো নিধি, নিজের উপর নিজেই চেঁচিয়ে উঠলো। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলো। যদি কেউ শুনতে পায়, তাহলে তাকে পাগল ভাববে। কিন্তু কিছুতেই নিজের চোখের জলকে ধরে রাখতে পারলো না সে, আবার ডুকরে কেঁদে উঠলো। কয়েক মুহূর্ত বাকি পরিবেশ শান্ত হয়ে যেন তারই কান্নার সাক্ষী হওয়ায় মগ্ন হলো। কিছুক্ষণ পর কান্না থামিয়ে চোখের জল হাত দিয়ে মোছা শুরু করলো নিধি, ঠিক তখনই একটা পায়ের শব্দে চমকে উঠলো। কে? কে আসলো ছাদে? নিধির স্পষ্ট মনে আছে, সে বাইরে থেকে চিলেকোঠার শিকল লাগিয়ে এসেছিল! তাহলে কীভাবে কেউ এল! কৌতূহলী দৃষ্টিতে পেছন ফিরে তাকালো নিধি, আর সঙ্গে সঙ্গেই খানিকটা অবাক হয়ে গেল। কালো পোশাক পরা একজন মানুষ অন্ধকারে তার দিকে তাকিয়েই একঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। কে লোকটা? নিধি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল, কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করলো,
"কে?"
সামনের লোকটা ধীরে ধীরে অন্ধকার ছেড়ে জ্যোৎস্নার চাঁদের আলোর আভায় বেরিয়ে এলেন। লোকটাকে ঠিক চিনতে পারলো না নিধি, আবার প্রশ্ন করলো সে,
"কে আপনি? আর আমার বাড়ির ছাদে কী করছেন?"
সামনের ব্যক্তি শান্ত গলায় বললেন,
"আমি ফাদার সিডিয়াস। তুমি আমাকে চিনবে না, কিন্তু এই কদিন আমিই তোমার পিছু করছিলাম।"
নিধির চোখ’দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠলো, খানিকটা ভয় যেন এসে গ্রাস করলো তার শরীরকে, দু’পা পিছিয়ে আসতে আসতে সে বলল,
"আপনি এখানে কী করছেন? কেন এসেছেন এখানে?"
ফাদার অল্প এগিয়ে আবার শান্ত গলায় বললেন,
"ভয় পেও না, আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবো না। আর তোমার ক্ষতি করার মতো কোনো ক্ষমতাও আমার নেই। আমি এসেছি তোমার সাহায্য পেতে, দয়া করে আমাদের একটু সাহায্য করো, না করো না।"
এইবার বিস্ময়ে মুখটা কী রকম যেন হয়ে গেল নিধির, ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না সে। এতক্ষণে ভয়টা একটু উধাও হয়েছে, তাই এবার ফাদারের দিকে এগিয়ে গেল সে,
"মানে? কী সাহায্য করবো আমি?"
ফাদার একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিলেন, তারপর ধীরে ধীরে সেটাকে ছেড়ে বললেন,
"তুমিই একমাত্র পারবে আমাদের সমগ্র প্রথিবীকে বাঁচাতে, আর কেউ পারবে না।"
নিধির ভ্রু আরও কুঁচকে গেল,
"আমি! পৃথিবীকে বাঁচাবো! কী সব বলছেন আপনি?"
ফাদার দু’হাত দিয়ে নিধির হাতদুটো চেপে ধরলেন,
"হ্যাঁ, হ্যাঁ, শুধু তুমিই পারবে। তুমিই পারবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে ওর হাত থেকে বাঁচাতে।"
"কার হাত থেকে? কীসব বলছেন আপনি?"
"দীর্ঘদিন ধরে যার স্বপ্ন দেখছো, তার হাত থেকে…"
নিধির চোখদুটো আরও খানিকটা বড়ো হয়ে উঠলো,
"আপনি কী করে জানলেন?"
"আমি সব জানি, এই পৃথিবীর অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবের প্রতিটি ঘটনার কথা আমি জানি। এটাও জানি যে, ভবিষ্যতের পৃথিবীকে একমাত্র তুমিই বাঁচাতে পারবে।"
"কোন পৃথিবী! কীসের বাঁচানো! কার থেকে! কীসব বলছেন আপনি?"
ফাদার সিডিয়াস নিধির কাঁধে হাত রাখলেন,
"নিধি মন দিয়ে শোনো, আমি তোমার সময়ের মানুষ নই, কিন্তু আমিই একমাত্র মানুষ যে, কোনো সময়ে নির্দ্বিধায় আসা যাওয়া করতে পারি।"
"যে কোনো সময় মানে?"
"এটা কোন সাল?"
আচমকা এরকম একটা প্রশ্ন শুনে খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল নিধি, কিছুটা সময় নিয়ে নিজেকে সামলে উত্তর দিলো,
"উনিশশো বিরাশি…"
এবার ফাদার চোয়াল শক্ত করে বললেন,
"মন দিয়ে শোনো নিধি, আমি এই সময়ের মানুষ নই, আমি এসেছি দু’হাজার তিপান্ন সাল থেকে…"
নিধি বিস্ময়ে কীরকম যেন একটা হয়ে গেল,
"কী সব যা-তা বলছেন আপনি?"
"আমি জানি, তোমার পক্ষে আমাকে বিশ্বাস করাটা একটু কঠিন হবে, কিন্তু আমি যা বলছি সব সত্যি। আমি ভবিষ্যৎ থেকেই এসেছি।"
"আপনাকে বিশ্বাস করা অসম্ভব, কারণ এটা মানা যায় না, আপনি যে ভবিষ্যৎ মানে ফিউচার থেকে আসছেন তার প্রমাণটা কী?"
ফাদার মাথার নাড়লেন,
"ভবিষ্যতের কোনো কথা তো তোমার জানার কথা নয়, তাই অতীতের কথাই নাহয় বলি। আজ থেকে ঠিক চারবছর আগে তোমার একটা প্রিয় জিনিস হারিয়ে গিয়েছিল, একটা লকেট। যেটা এখনো পর্যন্ত তুমি খুঁজে পাওনি।"
নিধির চোখ কপালে উঠলো,
"আপনি… আপনি কীভাবে জানলেন?"
"বললাম না আমি সব জানি, যা ভবিষ্যতে হবে তাও, আর যা ঘটে গেছে তাও।"
"কিন্তু কী করে?"
"সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয় নিধি, গুরুত্বপূর্ণ হলো তোমার সহযোগিতা, তোমার সাহায্য। তুমি ছাড়া কেউ আমাদের পৃথিবীকে বাঁচাতে পারবে না, কেউ পারবে না। তুমি জানো না নিধি, আমাদের সময়ে পৃথিবীর অবস্থা কী হয়েছে। সজীব মানুষ হাতে গোনা কয়েকটা বেঁচে আছে, বাকি সবাই পরিণত হয়েছে মরা সৈনিকে। তুমি সাহায্য না করলে বাকিরাও শেষ হয়ে যাবে।"
"কিন্তু কে ও?"
"মেডুসা…"
নিধি থতমত খেয়ে গেল,
"কী? এইসব কী বলছেন? আপনি কি পাগল হয়ে গেলেন? মেডুসা কি মিথ থেকে উঠে আসবে? হাসালেন।"
ফাদার চোয়াল শক্ত করে রাগত স্বরে বললেন,
"আমি তোমার মজা করছি না নিধি, মেডুসা সত্যিই ফিরে এসেছে, বদলা নিতে ফিরে এসেছে, সব শেষ করে দেবে ও, কাউকে ছাড়বে না।"
"কিন্তু কীসের বদলা?"
"মেডুসার বদলা। তুমি জানো কী এবং কেন?"
"আমি কীভাবে জানবো?"
"মেডুসার সাথে কী ঘটেছিল তুমি তো জানো নিধি…"
"হ্যাঁ জানি, মেডুসার সৌন্দর্য্যের কথা সমগ্র ভূ-ভাগ এমনকি দেবলোকেও ছড়িয়ে পড়েছিল, তাই অ্যাথেনা ইনসিকিওর ফিল করা শুরু করে, আর ওই সময়কালেই জিউসের ভাই সমুদ্রদেব পোসেইডন মেডুসার প্রতি আকর্ষিত হয়ে পড়ে, আর নিজেকে সামলাতে না পেরে একদিন মেডুসার সাথে অন্তরঙ্গ ভালোবাসায় নির্লিপ্ত হয়, তাও আবার অ্যাথেনার মন্দিরে। তখনই দেবী অ্যাথেনা এই অনাচার সহ্য না করতে পেরে একমাত্র মনুষ্যরূপী জর্জন সিস্টার মেডুসাকে অভিশাপে ভয়ঙ্কর দানবীতে পরিণত করেছিলেন। কিন্তু তারপরেও অ্যাথেনার ক্ষোভ মেটে না, মেডুসার মাথা কেটে আনার হুকুম দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই ব্যক্তি যখন মেডুসার কাছে গিয়ে তার চোখে চোখ রাখে, তখন সে পাথরে পরিণত হয়…"
এই বলে থেমে যায় নিধি। ফাদার তার কথা শেষ হতে নিজেই বাকি ঘটনা বলতে শুরু করেন,
"তারপর মেডুসা নিজের এই সম্পূর্ণ দানবীয় রূপ মেনে নিতে না পেরে প্রতিজ্ঞা নেয়, সমগ্র ভূ-ভাগকে অ্যাথেনা আর বাকি দেবতাদের হাত থেকে কেড়ে নেওয়ার, আর পোসেইডনকেও যোগ্য শাস্তি দেওয়ার, কারণ তারা স্বেচ্ছায় মিলিত হওয়া সত্ত্বেও তার উপর ঘটা এই অন্যায়ের কোনো প্রতিবাদ করেননি পোসেইডন। তাই সে জিউসের প্রার্থনা শুরু করে, আর বরদান স্বরূপ অমরত্ব লাভ করে। অমরত্ব লাভ করেই আক্রমণ করে দেবী অ্যাথেনার উপর, কিন্তু সেইবার দেবী তাকে কোনো রকমে পরাস্ত করে তাকে একটি জঙ্গলে বন্দি করে রাখেন। কিন্তু এই ঘটনার কয়েক কোটি বছর পর আবার ফিরে আসে সে, কিন্তু সেইবারও সে পরাস্ত হয়। কিন্তু এইবার পূর্ব পরিকল্পনা করে এসেছে ও, তাই প্রায় সমগ্র ভূ-ভাগকে নিজের কবলে নিয়ে ফেলেছে। কিন্তু তুমিই একমাত্র যে বাঁচাতে পারবে আমাদের, দয়া করে ‘না’ বলো না। আর ভেবে দেখো তুমি যদি ওকে শেষ করে ফেলো, তাহলে আর ওর স্বপ্ন তোমার ঘুমে আসবে না। সমস্ত স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে, আর সমগ্র পৃথিবীও ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যাবে।"
"কিন্তু কীভাবে? মানে ওকে তো আর হুটহাট চাইলেই আমি ধ্বংস করতে পারবো না, ও সাক্ষাৎ দানবী, আর আমি সামান্য মানুষ।"
"ওর সঙ্গে তো তোমাকে যুদ্ধ করতে হবে না, শুধু ওর প্রাণভোমরাকে ধ্বংস করতে হবে। তাহলেই ও শেষ হয়ে যাবে।"
"কিন্তু কীভাবে?"
"ওর প্রাণ আদিম এথেন্সের অরণ্যে এক মন্দিরের নিকটবর্তী একটা মূর্তিতে আবদ্ধ। যতদিন ওই মূর্তি থাকবে ততদিন ও অমর।"
নিধি তাচ্ছিল্য ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকালো ফাদার সিডিয়াসের দিকে,
"কী? এখন আদিম এথেন্সে কীভাবে যাবো, এ কি সম্ভব কোনোদিন?"
ফাদার হাসলেন,
"তুমি কি ভুলে গেলে আমি কী করতে পারি?"
নিধি ভ্রু কুচকালো,
"আপনি অতীত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান সব দেখতে পারেন।" কথাটা বলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো নিধি, তারপর প্রায় লাফিয়ে উঠে বললো, "আর আপনি সমস্ত কালে যাতায়াতও করতে পারেন। তার মানে আপনি আমার কাছে মূর্তিটা নিয়ে আসবেন, আর আমাকে সেটা ধ্বংস করতে হবে।"
ফাদার তড়িঘড়ি জবাব দিলেন,
"একদমই নয়, তোমাকেই যেতে হবে ওখানে, ওই জঙ্গলের মধ্যেই ধ্বংস করতে হবে মূর্তিটাকে। তোমাকে ওখানে যেতেই হবে নিধি…"
"কিন্তু আপনি নাহয় তিনকালের মধ্যে যাতায়াত করতে পারেন, কিন্তু আমি তো পারি না, তাহলে কীভাবে যাবো ওখানে?"
"আমি সব পারি, তোমাকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।"
নিধির কৌতূহল তখনও কম হতে চাইলো না, একটু ইতস্তত করেই সে বললো,
"তাহলে আমাকে কী করতে হবে?"
ফাদার সিডিয়াস ধীরে ধীরে মাথা তুললেন, তারপর উৎফুল্লের সুরে বললেন,
"প্রস্তুত হতে হবে।"
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন