প্রীতম পুরকাইত
দুলকি চালে এদিক-ওদিক বেঁকে বড়ো দীঘির পাড় ধরে হেঁটে চলেছে শ্রীকান্ত, মাঝে মাঝে দীঘির জলকে একটা বড়ো আতস কাঁচ বলে মনে হচ্ছে ওর। চোখদুটো কয়েক মুহূর্ত ছাড়া ছাড়াই ঘুমে ঢলে পড়ছে, আজ নেশাটা একটু বেশিই হয়ে গেছে মনে হয়। নিজের গালে নিজেই দুটো হালকা জোরে চড় মারলো সে, চোখ’দুটো একটু সজাগ হলো বলে মনে হলো। বেশি দ্রুত না গিয়ে খুব সাবধানে একটা-একটা পা ফেলে এগিয়ে যেতে থাকলো সে। অনেকটা রাত হয়ে এসেছে, ঠিক সময় কত হয়েছে সেটা বুঝতে পারলো না শ্রীকান্ত, কিন্তু মাঝরাত যে হয়ে এসেছে, সেটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে আকাশে চাঁদের দিকে তাকালে। কালো অন্ধকার কুয়াশা রুপালি চাঁদটাকে সম্পূর্ণ ঢেকে দেওয়ার উপক্রম করেছে, অন্ধকারাচ্ছন্ন মায়াময় এক জগতের সৃষ্টি হয়েছে চারপাশ জুড়ে, সমগ্র পরিবেশ যেন এক স্বর্গলোকে পরিণত হয়েছে। নিজের চোখের সামনে যেন রম্ভা, উর্বশী, মেনকাকে নৃত্য করা অবস্থায় দেখতে পেলো শ্রীকান্ত। এক মুহূর্তের জন্য একটা কুটিল হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেওয়ার অগাধ চেষ্টা করলো। না! সে যা দেখছে তা নিছকই তার কল্পনা, আজ নেশাটা প্রচণ্ড হয়ে গেছে বুঝতে পারে সে। মাথাটা প্রচণ্ড জোরে ঘুরছে, পা আর চলছে না যেন এক্ষুনি ধড়াস করে মাটিতে পড়ে যাবে। কিন্তু থামলে চলবে না, যেভাবেই হোক বাড়ি পৌঁছাতেই হবে। বাড়িতে গেলে অন্তত কিছুটা রেহাই পাওয়া যাবে, রাস্তাঘাটে যদি কোনোভাবে ঘুমিয়ে পড়ে তাহলে পকেটে রাখা দশ হাজার টাকাটা আর আস্ত থাকবে না। যে তাকে পড়ে থাকা অবস্থায় প্রথম দেখবে সে’ই টাকা নিয়ে পগার পার হবে। তাই যেভাবেই হোক বাড়ি পৌঁছাতে হবেই। আর বাড়িতে মেয়েটা একা আছে, কখন কী বিপদ-আপদ হয়। শালা দ্বিতীয় বউটাকে একদম সহ্য করতে পারে না শ্রীকান্ত, বাধ্য হয়ে মায়ের জোরাজুরিতে বিয়ে করতে হয়েছিল, নইলে ওই চরিত্রহীন কুলটা মেয়ের সাথে কে থাকবে! প্রতি রাতে ছেলে আসে ওর ঘরে। জানে স্বামী নাইট ওভারটাইম করে বাড়ি ফেরে, তাই পাড়ার লোকেরাও নির্দ্বিধায় বিনা ভয়ে তার বাড়িতে এসে নোংরামি করে। সে ও যা খুশি করুক, তাতে শ্রীকান্তর কিচ্ছু যায় আসে না, কিন্তু তার একটামাত্র মেয়ে নীলু একা থাকে ওই বাড়িতে, আর ওই নোংরা মেয়ে মানুষটা পারে না এমন কোনো কাজ নেই, যদি কোনো লোককে ওর মেয়ের ঘরে ঢুকিয়ে দেয়! না! এ কী ভাবছে সে! এইসব ভুলভাল চিন্তা এক্ষুনি দূর করা উচিত, কিচ্ছু হবে না নীলুর, কিচ্ছু হতে দেবে না সে নিজের মেয়ের। টলতে টলতে আরও কিছুটা এগিয়ে যায় সে, নিজের মনেই যেন কিছু বিড়বিড় করছে,
“চিন্তা করিস না মা, আমি এই তো টাকা নিয়ে যাচ্ছি। কালই তোর স্কুলের টাকা দিয়ে দেবো। আর কেউ তোকে বলবে না যে তুই স্কুলের টাকা দিস না, কেউ বলবে না। আর ওই খানকি-মাগিকে আর বাড়িতে রাখবো না আমি, চুলের মুঠি ধরে মাগিটাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবো। তারপর বাপ-মেয়ে মিলে আনন্দে থাকবো মা। কেউ আর তোর উপর অত্যাচার করতে পারবে না। আসছি মা, আমি আসছি…”
আরও কীসব বিড়বিড় করতে থাকে শ্রীকান্ত, কিন্তু তার কোনো কথায় আর স্পষ্ট শোনা যায় না। শুধু দেখা যায় তার প্রায় ভারসাম্যহীন শরীরটা একটু-একটু করে নিজের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
হাঁটতে হাঁটতে প্রায় অনেকটা এসে পৌঁছালো সে, আশপাশটা একবার ভালো ভাবে দেখে নিলো, দেখলো দীঘির ঘাটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে সে, কিন্তু এতক্ষণ ধরে তো হাঁটছে, তাও এখনো দীঘিটা পার করতে পারছে না কেন? ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য হলো না তার কাছে। খানিক দাঁড়িয়ে চারপাশটা আরেকবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিলয়। না! কোনো ভুল নেই, এখনো দীঘি পার হতে তিন-চার গজ বাকি, কিন্তু কিছুক্ষণ আগেও তো তিন-চার গজই বাকি ছিল। তাহলে এতক্ষণ যে সে হাঁটলো সেটা কি স্বপ্ন ছিল? মাথাটা কীরকম ঘুরতে থাকে তার, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না আজ। শরীরটা আরও টলা শুরু করেছে, মনে হচ্ছে যেন এক্ষুনি আছাড় খেয়ে পড়বে। কোনো রকমে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো সে, ঘাটের কোণের গাছটা ধরে নিজেকে পড়ে যাওয়া থেকে আটকালো। জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছে তার, হাঁপাতে হাঁপাতেই চোখ পড়লো দীঘির জলের দিকে। আর সঙ্গে সঙ্গেই খানিক চমকে উঠলো সে, ঘাটের একদম শেষ সিঁড়িতে তার দিকে পিঠ করে বসে আছে একটা মেয়ে! এত রাতে একটা মেয়ে এই অবস্থায় ঘাটে কেন বসে আছে? প্রশ্নটা তার মনটাকে একবার নাড়া দিলো। কৌতূহলী হয়ে উঠলো শ্রীকান্ত, মেয়েটা কে এবং কেন সে এত রাত্রে এখানে বসে আছে― সেটা যেভাবে হোক জানতেই হবে। কৌতূহলী পদক্ষেপে ধীরে ধীরে ঘাটের সিঁড়ির দিকে কিছুটা এগিয়ে গেল সে। ততক্ষণে মেয়েটা ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়েছে তার দিকে, আলো-আঁধারিতে তার মুখ সামান্য অস্পষ্ট, কিন্তু তাও সেই মুখের দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারলো না শ্রীকান্ত। কিছু একটা যেন আছে মেয়েটার মধ্যে। লম্বা রেশমি কালো চুল হাওয়ার দাপটে উড়ে চলেছে, চোখ’দুটো হালকা আলোয় চকচক করে উঠছে, পরিষ্কার দেখা না গেলেও ঠোঁটদুটো রক্তবর্ণের ন্যায় টানছে তাকে, আর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ওই বক্ষযুগল, ওটা যেন ক্রমশ কোনো অদৃশ্য দড়ি দিয়ে টেনে চলেছে শ্রীকান্তকে। আর সেও যেন সেই অদৃশ্য দড়িকে প্রত্যাখ্যান না করে তার ইশারায় এগিয়ে যাচ্ছে সেদিকে, কোন মোহে সেটা সে নিজেও জানে না। ধীরে ধীরে মেয়েটার উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেল শ্রীকান্ত, তার দৃষ্টি এখনো মেয়েটার বক্ষযুগলে স্থির। মেয়েটার একদম কাছে আসতেই মেয়েটা নিজের দুই বাহু এগিয়ে দিল তার দিকে, শ্রীকান্তও মোহের বশে আরও এগিয়ে গেল তার দিকে, নিজের দু’হাত ছড়িয়ে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরলো, মাথা রাখল তার বুকে। তার সারা শরীরের মধ্যে দিয়ে একটা তরঙ্গ খেলে গেল, যেন কোনো তড়িৎ এসে লাগলো সমস্ত শরীরে। মোহাচ্ছন্ন চোখে ধীরে ধীরে মেয়েটার দিকে তাকালো শ্রীকান্ত, মেয়েটার মুখটা এতটা মায়াময় কেন! যতবার দেখছে ততবার আরও আকৃষ্ট হচ্ছে তার দিকে।
মেয়েটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো, তার শরীরের ঝলসানো রোশনায় সমস্ত পরিবেশটা আলোময় হয়ে উঠলো। শ্রীকান্ত মোহিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো তার শরীরের দিকে। মেয়েটা ধীরে ধীরে নিজের সমস্ত কাপড় খুলে দিলো, নগ্ন শরীরে আরও যেন মায়াময় হয়ে উঠলো সে। শ্রীকান্ত গাল হাঁ করে একদৃষ্টে চেয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। মেয়েটার বক্ষযুগল এখন সম্পূর্ণ অনাবৃত, শুধু একটা লাল পাথর যেন বুকের কাছটা উজ্জ্বল হয়ে চারিদিকটা আলোকিত করে তুলেছে, তীর্যক রশ্মি যেন ঠিকরে আসছে সেখান থেকে। শ্রীকান্ত সেদিকে স্থির লক্ষ্য রেখে এগিয়ে গেল মেয়েটার দিকে। মেয়েটা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকলো জলের গভীরে, শ্রীকান্তও তার পিছু পিছু এগিয়ে গেল দীঘির ঠান্ডা জলের উদ্দেশ্যে। প্রথমে বুক, তারপর পেট, তারপর কোমর অবধি জলে নেমে গেল। নিজের দু’হাত মেলে শ্রীকান্তকে নিজের দিকে আসার আহ্বান জানালো, শ্রীকান্ত শান্ত পায়ে অল্প অল্প জল পেরিয়ে মেয়েটার একদম কাছে কোমর অবধি জলে নেমে গেল। মেয়েটা এখনো বাহু মেলে অপেক্ষায় মগ্ন, শ্রীকান্ত তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে জড়িয়ে ধরলো তাকে, মুখ নিয়ে গেল তার বক্ষযুগলে দিকে। একটা সুন্দর গন্ধ যেন কোত্থেকে এসে নাকে লাগলো তার, কী অপূর্ব সুগন্ধ! চোখ’দুটো জুড়িয়ে এলো শ্রীকান্তর, তাও চোখ মেলে তাকানোর চেষ্টা করলো। চোখ খুলে মেয়েটার মুখের দিকে মুখটা তুললো সে, আর সঙ্গে সঙ্গেই তার বুকের সমস্ত রক্ত হিমশীতল হয়ে উঠলো, দাঁতকপাটি কাঁপতে শুরু করলো, বিস্ফারিত হয়ে উঠলো চোখের মণি। ভয়ে সমস্ত শরীরটা নিথর হয়ে গেল। এটা কে! একে তো সে এতক্ষণ দেখেনি! সেই সুন্দর মায়াময়ী নারী কোথায়? এ তো কুৎসিত কদাকার রাক্ষুসী। সারা শরীর কালো অন্ধকার কুৎসিত পিশাচের মতো। এ কী করে হলো! ভয়ে ছিটকে এলো শ্রীকান্ত। সামনের মেয়েটার মুখটা এখন পিশাচিনীর ন্যায় ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। সারা শরীরটা যেন কোনো কালো পাথরের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। চোখের মণি আর নেই, সেখানে সৃষ্টি হয়েছে একটা অন্ধকার কালো কোটর। রেশমি চুলের গোছা কোথায় কী! এ যে অসংখ্য সব বিষাক্ত সাপেদের আস্তাকুঁড়! সব সাপগুলো ফণা বের করে তাকিয়ে আছে ঠিক তারই দিকে। ভয়টা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায় তার। জলের উপর শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে উপুড় হয়ে সাঁতার কাটার চেষ্টা করতে থাকে সে, কিন্তু জল নেই কেন? গায়ে এক ফোঁটাও জলের স্পর্শ পাচ্ছে না কেন সে! চোখ’দুটো আরও খানিক বড়ো হয়ে উঠলো তার। ধীরে ধীরে নিচের দিকে মুখ ফিরিয়ে দেখলো, তার নিম্নভাগে জলের কোনো চিহ্নই নেই। এখন সে কোনো জলভাগে নয়, বরঞ্চ আকাশের বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে। আরও চমকে উঠলো শ্রীকান্ত, এরকম অবাস্তবিক ঘটনাগুলো কেন ঘটছে তার সাথে, বুঝে উঠতে পারলো না। কিন্তু ভয়ে সমস্ত দেহটা একটা জমাট বাঁধা বরফের স্তূপে পরিণত হওয়া শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে অতি কষ্টে আবার মেয়েটার দিকে মুখ ফেরালো সে। কিন্তু কোথায় কী! মেয়েটা যে নেই। কোথায় গেল? ডানদিকে চোখ মেলে তাকালো সে, না! এখানেও নেই। বাঁদিকেও চোখ ফেরালো, কিন্তু এখানেও নেই। আবার সামনের দিকে মুখটা নিয়ে গেল শ্রীকান্ত, আর সঙ্গে সঙ্গেই আবার চমকে উঠলো। মেয়েটা তার একদম মুখের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার মাথার উপর ফণা তোলা সাপগুলো একদৃষ্টে যেন চেয়ে আছে তারই দিকে। ভয়ের মাত্রা একনিমেষে কয়েকশো গুণ বেড়ে গেল। মেয়েটা ধীরে ধীরে তার গা স্পর্শ করলো, আর মুহূর্তের মধ্যেই শ্রীকান্তর ভয় যেন উবে গেল। ভয়ের পরিবর্তে তার মুখে ফুটে উঠলো একটা প্রাপ্তির হাসি। ধীরে ধীরে মেয়েটা সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে ধরলো তাকে, তার মাথায় আবৃত সাপের দল ধীরে ধীরে নিজেদের প্রসারিত করে ঢেকে ফেললো তার আর শ্রীকান্তর সমস্ত শরীর।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন