প্রীতম পুরকাইত
মলের পাশের গলির ভেতরে ঢুকে এলেন সিডিয়াস, আরেকবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিলেন চারিদিকটা। না! কেউ নেই। একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো তাঁর মুখ দিয়ে। দ্রুত পায়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলেন। কয়েক সেকেণ্ড হাঁটার পর একটা ম্যানহোলের কাছে এসে থেমে গেলেন তিনি, তারপর আবার চারিদিকটা ভালোভাবে দেখে নিলেন। ধীরে ধীরে ম্যানহোলের উপরের ঢাকনার দিকে হাত বাড়ালেন, হালকা ঘুরিয়ে খোলার চেষ্টা করলেন সেটা, কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ঘোরানোর পর খুলে গেল ঢাকনাটা। ঢাকনা খুলে যেতেই তড়িঘড়ি তার ভেতরে ঢুকে গেলেন সিডিয়াস, সন্তর্পণে ঢাকনাটা আবার বন্ধ করে দিলেন। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন নীচে। জায়গাটা ঠিক অন্যান্য ম্যানহোলের মতো নয়, এখানে নোংরা জলের স্রোত আছে বটে, কিন্তু সেটা একটা দেওয়াল দিয়ে পৃথক করা, তবে ফাঁকা জায়গাতেও গন্ধে টেকা দায়। সিডিয়াস ধীরে ধীরে নিজের ডানপাশে এগিয়ে গেলেন, কিছুটা এসে দেওয়ালের দিকে মুখ ফেরালেন। তারপর নিজের জামার পকেট থেকে একটা প্রিজম জাতীয় কিছু বের করে আনলেন, দেওয়ালের দিকে একবার ভালোভাবে তাকালেন, তারপর একটা নির্দিষ্ট জায়গায় প্রিজমটা গুঁজে দিয়ে একবার বাঁপাশে ঘুরিয়ে আবার সেটাকে বের করে পকেটে চালান করলেন। তারপরের কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে কেটে গেল। কিন্তু আচমকা একটা ঘ্যারঘ্যার শব্দ করে সিডিয়াসের সামনের দেওয়ালটা ফাঁক হওয়া শুরু হলো, আর মুহূর্তের মধ্যেই সেটা মাঝখান দিয়ে ফাঁক হয়ে দু’দিকে সরে গিয়ে একটা দরজার মতো খুলে গেল। সিডিয়াস আর একটুও সময় নষ্ট না করে দ্রুত ঢুকে গেলেন তার ভেতরে, তারপর বাঁপাশের দেওয়ালের একটা নির্দিষ্ট স্থানে নিজের হাত দিয়ে চাপ দিলেন, আর সঙ্গে সঙ্গেই স্লাইডিং দরজার মতো দু’দিকে সরে যাওয়া দেওয়াল আবার আগের মতো একে অপরের দিকে এগিয়ে এসে আবার নিজের পূর্ব অবস্থানে ফিরে এলো।
ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেলেন সিডিয়াস। এই সুড়ঙ্গ জাতীয় জায়গাটা একটা পুরোনো কাঠের ঘরের মতো দেখতে। ঠিক ঘর বলাও চলে না, যেন কোনো স্টোররুম টাইপের। সারা জায়গা জুড়ে অসংখ্য বুকশেল্ফ, আর তার মধ্যে সজ্জিত নানান ভাষায় অনুবাদিত বাইবেল আর অসংখ্য ধর্ম পুঁথি। একটা শেল্ফের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন সিডিয়াস, বের করে আনলেন একটা লাল কাপড়ে জড়ানো পুঁথি, ধীরে ধীরে লাল কাপড়টা সরিয়ে বের করে আনলেন পুঁথিটা… ভগ্নপ্রায় পুঁথির চারিদিকে অসংখ্য চিত্র আর কিছু শব্দ― যা কোনো চেনা ভাষায় লেখা নয়। ধীরে ধীরে সেই পুঁথির পাতার উপর হাত বুলাতে থাকলেন সিডিয়াস, আর বিড়বিড় করতে লাগলেন। যেন কোনো মন্ত্র আউড়াচ্ছেন। তাঁর চোখ’দুটো এখন অস্বাভাবিক লাল, ঠোঁট অসম্ভব রকম কাঁপছে, কিন্তু তাও একনাগাড়ে মন্ত্র পড়ে চলেছেন তিনি, যেন কিছুতেই থামবেন না আর। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর সারা দেহ অসম্ভবভাবে কাঁপতে শুরু করলো, যেন এক্ষুনি টলে পড়ে যাবেন। কয়েক সেকেণ্ড এইভাবেই চললো, তারপর হঠাৎ তাঁর চোখের সামনে একটা আগুনের ঝিলিক দেখা দিলো, ধীরে ধীরে সেই আগুনের ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ চক্রাকারে আবর্তন শুরু করলো, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই গোল আয়না জাতীয় কিছু একটা সৃষ্টি হলো। সিডিয়াস ধীরে ধীরে নিজেকে স্বাভাবিক করে তুললেন, তারপর তাকালেন সেই আয়নার দিকে। একটা আবছা প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছে সেই আয়নাতে, যেন কোনো ধ্বংসস্তূপ, ভেঙে পড়া ইমারত, আর লক্ষ লক্ষ মানুষের লাশ। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো সিডিয়াসের, মুখের ভঙ্গিমা অস্পষ্ট। একঠায় একটা পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলেন সিডিয়াস। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। সামনের আয়নার দিকে হাত বাড়ালেন, হালকা ছুঁয়ে আয়নার প্রতিচ্ছবি পরিবর্তন করে ফেললেন।
এবার দেখা গেল একটা ফাঁকা এয়ারপোর্ট, যেখানে দাঁড়িয়ে দু’জন মানুষ, একটা মহিলা আর একজন পুরুষ। তারা ধীরে ধীরে একটা গাড়ির দিকে এগিয়ে গিয়ে উঠে বসলো, তারপর গাড়িটা চলা শুরু করলো। পুরুষটা কীরকম যেন আতঙ্কে কিছু একটা বলছে পাশের মহিলাটিকে, হঠাৎ মেয়েটার সারা শরীর অসম্ভব রকম কালচে সাদা হয়ে গেল, তার চুলগুলো ধীরে ধীরে সর্পের আকার ধারণ করলো। পুরুষটা এখনো চুপ করে তাকিয়েই আছে তার দিকে। ধীরে ধীরে পুরুষটিকে জড়িয়ে ধরলো মহিলা।
পরের ঘটনা ঘটার আগেই সিডিয়াস আবার আয়নার প্রতিচ্ছবি আবার বদলে দিলেন। এবার দেখা গেল, একটা মেয়ে একটা খবরের কাগজ হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে, কিছু একটা যেন পড়ছে। তারপর হঠাৎ করেই তার চোখ-মুখের ভঙ্গি কীরকম অস্বাভাবিক হয়ে উঠলো। যেন কোনো ভয়ঙ্কর ঘটনা এক নিমেষে ঘটে গেছে তার চোখের সামনে। তার পাশে আরেকটা মেয়ে, সে চেষ্টা করছে তাকে সামলানোর। সিডিয়াস সঙ্গে সঙ্গে বিড়বিড় করে আবার কোনো একটা মন্ত্র পড়লেন, আর সেই আয়না নিমেষের মধ্যেই গায়েব হয়ে গেল।
সিডিয়াস একটা চেয়ারের দিকে এগিয়ে গিয়ে বসলেন। কপালে একটা হাত রাখলেন, অসম্ভব রকম কুঁচকে রয়েছে তাঁর কপাল, যেন গভীর চিন্তা গ্রাস করেছে তাঁকে। যেটার ভয় ছিল অবশেষে সেটাই হচ্ছে, সমগ্র পৃথিবীকে শেষ করতে উদ্যত হয়েছে সে, কাউকে ছাড়বে না। নিজের মনেই এগুলো বলে উঠলেন সিডিয়াস। কিন্তু যেভাবেই হোক ওর হাত থেকে বাঁচাতেই হবে গোটা দুনিয়াকে, কিছুতেই সব শেষ হতে দিলে চলবে না। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তাঁর জায়গায় যাঁরা ছিলেন, তাঁরা নিজেদের প্রাণ দিয়ে বারবার আটকে রেখেছে ওকে, তাঁকেও সেই একই কাজ করতে হবে। যেভাবেই হোক ওকে আটকাতেই হবে। নিজের গলার কাছে হাত দিয়ে ক্রসটা বের করে আনলেন ফাদার সিডিয়াস, সেটাকে আঙুল দিয়ে চেপে ধরলেন, তারপর বাইবেলের পবিত্র কয়েকটা মন্ত্র আউড়ে নিলেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন চেয়ার ছেড়ে। চোখ বন্ধ করে একঠায়ে দাঁড়িয়ে বাঁ’হাত দিয়ে ক্রসটাকে চেপে রেখে ডান হাত দিয়ে শূন্যে ক্রসের একটা অদৃশ্য প্রতিচ্ছবি বারবার আঁকতে থাকলেন। কয়েকটা নিস্তব্ধ মুহূর্ত এইভাবেই কেটে গেল, টুঁ শব্দটিও হলো না। আস্তে আস্তে একটা খচমচ শব্দ শুরু হলো সমস্ত ঘর জুড়ে, ফাদারের সামনের দুটো বুকশেল্ফ ধীরে ধীরে সরে গিয়ে একটা দরজা বেরিয়ে এলো, তারপর অতি স্থির গতিতে খুলে গেল সেই দরজা। দরজার বাইরে দেখা গেল একটা ফাঁকা অন্ধকার গলি, বাকি সমস্ত জায়গা রাতের কালো চাদরে ঢাকা, তাই সেরকম কিছুই আর দেখা গেল না। ফাদার সিডিয়াস ধীরে ধীরে পা রাখলেন সেই দরজার বাইরে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন