(বারো)

প্রীতম পুরকাইত

কলিংবেলের শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল শ্রীর, জড়ানো চোখে বিছানায় উঠে বসলো সে। বিছানা হাতড়ে ফোনটা খুঁজে নিয়ে পাওয়ার বাটনটা অন করলো, স্ক্রিনে সময় দেখাচ্ছে সাড়ে সাতটা। কিছুটা চমকে উঠলো সে, এত সন্ধে পর্যন্ত ঘুমাচ্ছিল সে! আগে তো কোনোদিন এরকমভাবে ঘুমায়নি। নিজের উপর কিছুটা অসন্তুষ্ট হলো শ্রী। কিন্তু এতক্ষণে আবার কলিংবেল বেজে উঠেছে। তাই তড়িঘড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো সে, বেসিনের দিকে এগিয়ে গেল দ্রুত। ট্যাপটা চালু করে কিছুটা জল নিজের চোখে দিলো, তারপর কিছুটা মুখে দিয়ে একবার কুলকুঁচি করে নিলো। তারপর এগিয়ে গিয়ে টাওয়ালটা দিয়ে ভালোভাবে মুখটা মুছে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার লকটা ঘুরিয়ে পাল্লা টেনে হাট করে পুরো দরজাটা খুলে ফেললো। দরজা খুলে যেতেই সামনে যাকে দেখতে পেলো, তাতে অবাক না হয়ে থাকতে পারলো না শ্রী। সেই অফিসারটা! যে ওকে সেদিন অত জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল সে! প্রচণ্ড অবাক হওয়া সত্ত্বেও নিজের ভাবভঙ্গিকে যথাসাধ্য সংবরণ করে রাখার চেষ্টায় মগ্ন হলো। তারপর গলাটাকে একটু ভাঙা ভাঙা ধরণের করে নিয়ে বললো,

"আপনি! এখানে!"

সামনের লোকটা কিঞ্চিৎ হাসলো,

"আমাকে চিনতে পেরেছেন তাহলে! আমি ভেবেছিলাম পারবেন না। যাই হোক, চিনতে পেরেছেন যখন ভালো কথা। কিন্তু নামটা মনে হয় মনে নেই, না?"

শ্রী খানিক ইতস্তত করলো,

―হ্যাঁ… ওই আরকি…

সামনের লোক আবার হাসলো,

―আমার নাম উজ্জ্বল, উজ্জ্বল পাল। সিবিআই ইন্সপেক্টর।

―হ্যাঁ, বলুন…

উজ্জ্বল আবার মিচকে হাসলো,

―বলতেই তো এসেছি ম্যাডাম, তো ভেতরে আসতে পারি?

শ্রী খানিকটা ইতস্তত করলো, তারপর বললো,

―হ্যাঁ… আসুন।

দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো শ্রী, উজ্জ্বল ভেতরে প্রবেশ করলো। একবার ভালোভাবে ফ্ল্যাটটাই চোখ বুলিয়ে নিলো। ফ্ল্যাটটা খুব একটা সাজানো-গোছানো নয়, ড্রয়িংরুমে শুধু একটা সোফা, আর একটু বাঁ’পাশে একটা ডাইনিং টেবিল, আর দেওয়ালে লাগানো একখানা টিভি।

উজ্জ্বলের এভাবে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে সমস্ত জিনিস দেখা পছন্দ হলো না শ্রীর, একবার গলা খাঁকারি দিয়ে সে বললো,

"আসুন!"

আকস্মিক গলার স্বরে হুঁশ ফিরে পেলো উজ্জ্বল, খানিক থতমত খেয়ে শ্রীর দিকে তাকালো সে। দেখলো, শ্রী একটা ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছে, উজ্জ্বলও আর কোনো উত্তর না দিয়ে সেদিকেই এগিয়ে গেল।

ঘরের ভেতরে ঢুকে আসতে সে বুঝলো, এটা বেডরুম, বাইরের মতো এটাও খুব সাধারণ। শ্রী হাতের ইশারায় একটা চেয়ারে বসতে বললো তাকে, সেও ধীরে ধীরে চেয়ারে গিয়ে বসলো। সঙ্গে সঙ্গে শ্রীও বিছানায় গিয়ে বসলো, তারপর শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বললো,

―এবার বলুন কী ব্যাপার?

উজ্জ্বল বুক পকেটে থেকে একটা সিগারেট বের করলো, তারপর সেটা মুখে ঠেকিয়ে শ্রীর দিকে তাকিয়ে বললো,

"প্যাসিভ স্মোকিং এ প্রব্লেম হয় না তো?"

শ্রী ডানদিক বাঁদিকে ঘাড় নাড়ালো। উজ্জ্বল সঙ্গে সঙ্গেই লাইটার দিয়ে সিগারেটটা জ্বালিয়ে লম্বা একটা টান দিলো, তারপর একরাশ ধোঁয়া মুখ দিয়ে বের করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো,

"সো মিসেস দাশগুপ্ত, গতকাল রাতে আপনি হনুমান মন্দিরের ওখানে কী জন্য গিয়েছিলেন?"

শ্রীর চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপ স্পষ্ট হলো, অবাক হওয়া কণ্ঠস্বরে সে বললো,

―মানে? আমি ওখানে কী করতে যাবো?

উজ্জ্বল অট্টহাস্যে ফেটে পড়লো,

―দারুণ অভিনয় করেন তো আপনি! অসাধারণ, স্প্লেনডিড।

―কী যা-তা বলছেন বলুন তো? অভিনয় কোত্থেকে আসছে, বলতে চাইছেনটা কী!

উজ্জ্বলের মুখে সেই হাসিই লেগে রইলো,

―আমি বলতে চাইছি, আপনি কাল রাতে ওই লোকটাকে কেন খুন করলেন?

শ্রী যেন আকাশ থেকে পড়লো, এরকম ভাবভঙ্গি নিয়ে উত্তর দিলো,

―কী আলফাল বকছেন! আমি খুন করতে যাবো কেন!

এবার আর উজ্জ্বল নিজের রাগ চাপতে পারলো না, জোরে একটা ধমক দিয়ে বলে উঠলো,

―কিছুই আলফাল কথা বলা হয়নি এখানে, আপনি কাল ওখানে গিয়েছিলেন, এবং একটি লোককে আপনি খুন করেছেন।

বলেই নিজের পকেট থেকে একটা পাথরের দুল বের করে আনলো উজ্জ্বল, "আর এই হলো তার প্রমাণ।"

শ্রীর ঠোঁটগুলো কেঁপে উঠলো, চোখ’দুটো কিঞ্চিৎ অদ্ভুত হয়ে উঠলো, কাঁপা কাঁপা গলায় সে বললো,

"কো… কোথায় পেলেন?"

―দীঘির ঘাটে যখন খুনটা করেছিলেন, তখন বেখেয়ালে কান থেকে খুলে পড়েছিল।

শ্রীর সারা শরীরটা কীরকম যেন অস্বাভাবিক হয়ে উঠলো, জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেওয়া শুরু করলো, হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,

―কী… কী চান আপনি?

বলে নিজের নখ দিয়ে নিজেকেই একটা চিমটি কাটলো, কয়েকবার দ্রুত নিঃশ্বাস নিলো, তারপর নিজেকে অনেকটা স্বাভাবিক করে বললো,

"হ্যাঁ আমিই মেরেছি ওকে। মুখ বন্ধ রাখার জন্য কী চান আপনি? কত টাকা চান?"

উজ্জ্বলের মুখটা এখনো গম্ভীর, সে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ শ্রীর দিকে চেয়ে রইলো, তারপর ধীরে ধীরে কুটিল হাসি হাসলো,

"ইশ! টাকা! না ম্যাডাম টাকা আমি চাই না। আমি অন্য কিছু চাই।" তার কুটিল হাসি আরও কিছুটা শয়তানিতে পরিপূর্ণ হলো।

শ্রী অবাক চোখে তার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো, ধীরে ধীরে বলল,

―মানে?

―মানে আপনি বুঝতে পারছেন ম্যাডাম!

উজ্জ্বলের চোখের দৃষ্টি লোলুপ হয়ে উঠলো।

শ্রী গলা তুলে বললো,

―কী বলছেনটা কী আপনি?

উজ্জ্বল ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসলো,

―এমন করছো যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানো না! কাল কী হয়েছিল জানি না ভেবেছো?

শ্রীর চোখ’দুটো বিস্ফারিত, মুখভঙ্গিতে অবাকের ছাপ স্পষ্ট,

―কিন্তু… কিন্তু আপনি… আপনি কী করে…

পুরো কথা শেষ করতে পারলো না শ্রী, তার কথা জড়িয়ে এলো।

"হয়তো খেয়াল করোনি, ঘাটের ঠিক উল্টোদিকে একটু ভেতরে সবার আড়ালে একটা সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল, যেটা সম্পূর্ণ ঘাটের অংশ না দেখালেও তার একটু আগের জায়গাটা সম্পূর্ণ তুলে ধরেছে। সেখানে সবকিছু স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, তোমার নগ্ন শরীর প্রদর্শন, লোকটার সাথে আলিঙ্গন সব… যদিও তোমার মুখ স্পষ্ট দেখা যায়নি, কিন্তু এই দুলটা যে বাকি সবকিছু পরিষ্কার করে দিয়েছে!" বলেই অট্টহাস্য হেসে উঠলো উজ্জ্বল।

শ্রী এবার সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ হয়ে গেল, যেন ভয়ের একটা শিহরণ খেলে গেল তার শরীরে। উজ্জ্বল ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল তার দিকে, বিছানায় তার পাশে বসলো। তারপর একটা হাত রাখলো তার কাঁধে,

―কী এত ভাবছো? এইটুকুই তো চাইছি। রাজি হয়ে যাও, তাহলে আমি কাউকে এ বিষয়ে কিচ্ছু বলবো না। এমনকি এই কেসে তোমার নামও সামনে আনবো না, আর কেন খুন দুটো করলে জানতেও চাইবো না। নিশ্চয়ই খুন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যাই হোক, ওইসব বাদ দাও।

উজ্জ্বল ধীরে ধীরে শ্রীকে চেপে জড়িয়ে ধরলো, উজ্জ্বলের সারা শরীর জুড়ে একটা তরঙ্গ বয়ে গেল। জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছে তার। শ্রীর মুখে হাত রাখলো সে, ধীরে ধীরে নিজের মুখের সামনে নিয়ে এলো তার মুখ, ঠোঁট ঠেকালো তার ঠোঁটে।

জামার বোতামগুলো লাগিয়ে নিলো উজ্জ্বল। বিছানার দিকে একবার তাকালো, শ্রী চাদরটা গায়ে জড়িয়ে জবুথবু হয়ে বসে আছে। মুচকি হাসলো সে, আর তখনই ফোনের রিংটা বেজে উঠলো। বিছানা থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে রিসিভ করলো উজ্জ্বল, ওপাশ থেকে চেনা গলা ভেসে এলো,

"হ্যাঁ মশাই, সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেছে।"

উজ্জ্বল ক্লান্ত গলায় বললো,

"কেন? আবার কী হলো?"

―লাশদুটো গায়েব হয়ে গেছে মশাই, কোনো চিহ্ন নেই জলজ্যান্ত দুটো লাশের।

উজ্জ্বলের চোখ কপালে উঠলো,

―সে কী! কীভাবে? গার্ড কী করছিল?

―ব্যাটা নির্ঘাত মড়ার মতো ঘুমুচ্ছিল, কিন্তু এখন বলছে, নাকি লাশ আপনা-আপনিই পায়ে হেঁটে গায়েব হয়ে গেছে। বুঝুন মশাই, কীরকম হতচ্ছাড়া। কিন্তু আপনি তাড়াতাড়ি আসুন, ব্যাটাকে থার্ড ডিগ্রি দিয়ে সব কথা বের করতে হবে, নইলে পুলিশ ডিপার্টমেন্টের বদনাম হয়ে যাবে।

―আমি আসছি।

বলেই ফোনটা কেটে দিলো।

তারপর চোখ ফেরালো শ্রীর মুখের দিকে। উজ্জ্বলের চোখের বর্ণ লাল আগুনের ন্যায়, চোয়াল শক্ত। গম্ভীর গলায় সে বললো,

―তুমি কে?

শ্রীর ঠোঁটে বাঁকা হাসি খেলে গেল, চোখ’দুটো চকিতে ঝিলিক দিয়ে উঠলো। উজ্জ্বলের চোখদুটো আরো বিস্ফারিত হয়ে উঠলো, চোয়াল আরও শক্ত। দাঁতে দাঁত চেপে ঝাঁপিয়ে পড়লো শ্রীর উপর, হাতের পাঁচ আঙুল দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরলো শ্রীর গলা,

"কে তুমি? কার সাহায্যে লাশগুলোকে গায়েব করলে? বলো… কীভাবে লাশগুলো গায়েব হলো? কোথায় আছে লাশ দুটো? বলো কোথায় আছে?"

মুখ দিয়ে টুঁ শব্দও করলো না শ্রী, শুধু ঠোঁট বেঁকিয়ে নিঃশব্দে হাসতেই থাকলো।

উজ্জ্বলের মাথা আরও গরম হয়ে উঠলো, চোখদুটো রক্তাভ, নিজেকে আর সামলাতে পারলো না সে, আরও জোরে চেপে ধরলো শ্রীর গলা,

"বল শালা কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস লাশগুলো, নইলে মেরে ফেলবো আজ তোকে। শেষ করে…"

বলতে বলতেই আটকে গেল তার কথা, চোখ’দুটো ভয়ে কাঁপতে শুরু করলো। তার সামনের মহিলা আর কোনো সাধারণ মহিলা নেই, সাক্ষাৎ দানবীতে পরিণত হচ্ছে, তার বুকের উপর চেনের সাথে আটকানো লাল পাথরটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, চোখের মণি গাঢ় বাদামি হয়ে এসেছে তার, সমস্ত শরীরের পেশী বেড়ে যাচ্ছে, ধবধবে ফর্সা চামড়া কালো কুৎসিৎ স্যাঁতস্যাঁতে চামড়ায় পরিণত হয়েছে। ভয়ে ভয়ে তার সমস্ত শরীরের দিকে এতক্ষণ চেয়ে ছিল উজ্জ্বল, এইবার ধীরে ধীরে আবার উপরে মুখের দিকে মাথা তুললো, আর সঙ্গে সঙ্গেই তার শিরদাঁড়া শিউরে উঠলো। শ্রীর চুলগুলো আর রেশমি কালো নেই, সেগুলো এক একটা আস্ত সাপে পরিণত হয়েছে, আর সমগ্র মাথা সাপের ঝাঁকের মতো হয়ে উঠেছে। সেগুলো যেন ফণা উঁচিয়েই তাকিয়ে আছে উজ্জ্বলের দিকে, উজ্জ্বলের চোখজোড়া স্থির হয়ে গেল যেন নিজের নিয়তির অপেক্ষায় মগ্ন সে। শ্রীর মাথার উপরে ফণা উঁচিয়ে থাকা সাপগুলোও যেন একদৃষ্টে চেয়ে আছে উজ্জ্বলের দিকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%