প্রীতম পুরকাইত
পেছন থেকে একটা পায়ের শব্দ ভেসে আসতে সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে মুখ ঘোরালেন বিমলবাবু, একটা বছর তিরিশের ছোকরা গোছের ছেলে এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে। ছেলেটার পরনে সাদা শার্ট আর কালো ট্রাউজার, জামাটা ইন করা, চোখে একটা কালো সানগ্লাস, হাঁটা-চলা খুবই তীক্ষ্ণ প্রকৃতির। ধীরে ধীরে বিমলবাবুর কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো সে, তারপর একটা শান্ত অথচ ভারী গলায় প্রশ্ন করলো,
"আপনি লোকাল থানা থেকে এসেছেন?"
ছেলেটার গলা দিয়ে যেন আত্মবিশ্বাস চুঁইয়ে পড়ছে, এই বয়সের ছেলেদের মধ্যে সচরাচর এতটা কনফিডেন্সের ছোঁয়া খুব একটা দেখা যায় না। তাই ছেলেটাকে দেখে কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকালেন বিমলবাবু। তারপর ঘাড় নেড়ে উত্তর দিলেন,
"হ্যাঁ, আমি সিনিয়র ইন্সপেক্টর বিমল মজুমদার। কিন্তু আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না!"
ছেলেটা আবার তার সেই আত্মবিশ্বাসী গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
"আমি উজ্জ্ব…" বলতে গিয়ে জোরে কেশে উঠলো ছেলেটা, শুকনো কাশি! তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে আবার বলে উঠলো, "আমি উজ্জ্বল পাল, সি.বি.আই ইন্সপেক্টর।"
বিমলবাবু খানিক বিরক্তির স্বরেই বললেন,
"আচ্ছা, আপনিই তাহলে…"
বিমলবাবু কথা শেষ করার আগেই উজ্জ্বল বলে উঠলো,
"হ্যাঁ, আমাকেই পাঠানো হয়েছে এই কেসের ইনভেস্টিগেশনের জন্য।"
―আপনারা আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবেন না মশাই, আমাদের প্রায় সব কেসে আপনারা কোনো না কোনোভাবেই চলে আসেন।
উজ্জ্বল দাঁত বের করে একটা চাপা হাসি হেসে উঠলো,
―আমরাও কি চাই আপনাদের কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে! আমাদেরও তো ইচ্ছা করে সবার পেছনে না পড়ে থেকে একটু বিশ্রাম নিতে, কিন্তু কী জানেন তো বিমলবাবু, কোনো না কোনোভাবে আমাদের উপরে বন্ধুকের নল এসে পড়েই। যাই হোক, কাজের কথায় আসি, এটা নিশ্চয়ই জানেন যে, যাঁর লাশ পাওয়া গেছে, তিনি একজন আই.এস অফিসার। আবার যা-তা আই.এস নয়, একেবারে পরিবহ সচিব। তাই স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্র সরকারের সাথে কথা বলে কেসটা সি.বি.আই-য়ে পাঠিয়েছে। আমাদের দায়িত্ব পালন করতেই হবে স্যার। উই হ্যাভ নো চয়েস।
বিমলবাবু আর কোনো কথা না বলে সামনের ঝোপটার দিকে এগিয়ে গেলেন, উজ্জ্বলও তাকে অনুসরণ করলো। ঝোপটা পার হতেই লাশটা চোখে পড়লো উজ্জ্বলের। একটা সাদা ফ্যাকাশে লাশ, সারা শরীরটা ঠিক পাথরের মতো কালচে সাদা, চোখ-মুখের ভঙ্গি বিকট― যেন ভয়ানক কিছু দেখে ফেলেছে। তবে সবচেয়ে ভয়ানক চিবুকের নিচ আর গলার অংশটা, সেটাতে চোখ পড়তেই শিউরে উঠলো উজ্জ্বল, কী বীভৎস সেই দৃশ্য! কিছু দিয়ে যেন সেখানে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফুটো সৃষ্টি করেছে কেউ, ফুটোর সংখ্যা এতই বেশি যে গলাটা একটা বড়ো তারজালির মতো লাগছে। এরকম ভয়ানক দৃশ্য আগে কোনোদিন দেখেনি উজ্জ্বল। তার সারা শরীরটা গুলিয়ে উঠলো, কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে আরেকবার লাশটার দিকে তাকালো। লাশটার পাশেই পড়ে রয়েছে কয়েক গোছা রেশমি কালো চুল। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে সেই চুলগুলোর দিকে চেয়ে রইলো সে, তারপর বিমলবাবুকে উদ্দেশ্য করে বললো,
"চুলের স্যাম্পেল কিছু নিয়েছেন?"
বিমলবাবু এতক্ষণ ভয়ার্ত দৃষ্টিতে চেয়েছিলেন লাশটার দিকে, আচমকা কথাটা আসায় খানিকটা থতমত খেয়ে যান তিনি, পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন,
"হ্যাঁ! কী… কী বলছিলেন?"
উজ্জ্বল একটু হেসে বললো,
"বলছি, ওই কালো চুলগুলো থেকে স্যাম্পেল কালেক্ট করেছেন?"
―হ্যাঁ, অল্প কয়েকটা চুলের টুকরো ল্যাবে পাঠানো হয়েছে, তবে আপনারা আসবেন শুনে আর বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করা হয়নি।
―এত ভয় পাচ্ছিলেন কেন?
বিমলবাবু ইতস্তত করলেন খানিকক্ষণ, তারপর ধীরে গলায় বললেন,
"আসলে এত বছরের সার্ভিস লাইফে এরকম লাশ দেখিনি মশাই, সারা শরীরটা কীরকম গুলাচ্ছে। লাশের গলার একটা সামান্য স্থানও অক্ষত নেই, ছোটো ছোটো ছিদ্রে ভরে আছে পুরো। উফ! কী বীভৎস!"
―সেটাই তো ভাবার বিষয় বিমলবাবু। এরকম কুৎসিত আর নৃশংসভাবে কে খুন করবে! যাই হোক, আপনারা বুঝলেন কী করে যে ইনিই ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত? মুখ দেখে তো কেউ আইডেন্টিফাই করতে পেরেছে বলে মনে হয় না! মানে এরকম ফ্যাকাসে কালচে সাদা মুখ, চামড়াগুলো কুঁচকে একাকার! আইডেন্টিফাই করা তো অসম্ভব।
বিমলবাবু শান্ত গলায় বললেন,
―ওনার পকেটে মানিপার্স ছিল, ওখানেই ওনার আইডি কার্ড ছিল…
উজ্জ্বল অল্প হেসে বললো,
―আইডি কার্ড না থাকলে আমার উপর চাপও পড়তো না, আর আপনাদের অসুবিধার কারণও হতাম না।
বিমলবাবুও তার হাসিতে সঙ্গ মেলালেন।
মিনিট পনেরো ভালোভাবে জায়গাটা আর লাশটাকে দেখে নিলো উজ্জ্বল। তার সাথে আসা কয়েকজন জুনিয়র স্টাফ আশেপাশে একটু তল্লাশি শুরু করলো, সমস্ত জায়গাটার ছবিও তোলা হলো। বিমলবাবু ও উজ্জ্বল, দুজনে কী যেন আলোচনা করতে করতে মেইন রোডের দিকে এগিয়ে গেলেন।
এদিকে দু’জন কনস্টেবল বডিটার উপর সাদা চাদর ঢাকা দিলো, ইতিমধ্যে বডিটাকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার জন্য তোড়জোড় শুরু হয়েছে। এতক্ষণ সি.বি.আই থেকে কেউ আসেনি বলেই লাশটাকে এখানে একই অবস্থাতে রেখে দেওয়া হয়েছিল, নইলে বহু আগেই পোস্টমর্টেম হয়ে যেত, আর জায়গাটা সিলড্ও করে দেওয়া হতো।
উজ্জ্বলের সহকারী লাশের পাশে পড়ে থাকা চুলের গোছা, আর এদিক-ওদিক থেকে খুঁজে পাওয়া বাকি ছোটো-খাটো সব জিনিসপত্র যত্ন করে এক-একটা এয়ার টাইট পলিব্যাগে ঢুকিয়ে নিলো। তারপর সমস্ত জায়গাটা শিলড্ করে দেওয়া হলো। দু’জন কনস্টেবল আর অ্যাম্বুলেন্সের একজন লোক লাশটাকে খুব সাবধানে একটা লম্বা এয়ার টাইট ব্যাগের মধ্যে এমনভাবে ঢুকিয়ে দিলো, যাতে লাশের দেহে তাদের শরীরের কোনো অংশের কোনো চিহ্ন না পড়ে। তারপর সেই লাশসমেত ব্যাগটাকে খুব সাবধানে তুলে দিলো অ্যাম্বুলেন্সে। একজন পুলিশ কনস্টেবল সেই লাশের সাথেই উঠে পড়লো অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে। অ্যাম্বুলেন্সও সঙ্গে সঙ্গেই সাইরেনের বিকট শব্দ দিয়ে এগিয়ে চললো তার গন্তব্যের উদ্দেশে।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় বিকেল চারটে বেজে গেল। ফ্ল্যাটের দরজার লক খুলেই বাথরুমের দিকে ছুটে গেল উজ্জ্বল। আজ সকাল থেকেই শরীরটা বেজায় গুলাচ্ছে, সকালে বার’দুয়েক হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও সারা দিনটা পেটের ব্যথায় কেটে গেছে। তড়িঘড়ি আলনা থেকে একটা টাওয়াল নিয়ে বাথরুমের দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকে গেল সে, গিয়ে বসলো কমোডে।
নানান চিন্তা আজ যেন মাথা থেকে কিছুতেই যেতে চাইছে না, এমনিতেই আগের দু’খানা ড্রাগসের কেস নিয়ে চিন্তায় মাথাটা ধরে আছে, তার উপর আবার আই.এস অফিসারের খুন। সারাদিনটা এদিক-ওদিক জিজ্ঞাসাবাদ করতেই কেটে গেল। কিন্তু খুনটা বেজায় অস্বাভাবিক! একজনের সারা শরীর কালচে সাদা রঙের কী করে হয়ে যেতে পারে? আর গলাতে অগণিত ছিদ্রগুলোই’বা কীসের? লাশের পাশে এক গোছা রেশমি চুলই’বা কেন পড়ে ছিল? প্রশ্নগুলো চিন্তার ভাঁজ ফেলে উজ্জ্বলের কপালে। চোখ বন্ধ করে সারাদিনের সমস্ত ঘটনাগুলো আরেকবার স্মৃতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে সে।
সকাল ন'টা নাগাদ রেড্ডি স্যারের ফোন আসে; আর সঙ্গে সঙ্গেই তাকে বলা হয়, রাজারহাট হাইওয়েতে যেতে। মিনিট কুড়ির মধ্যেই সে তৈরি হয়ে বেরিয়ে যায়। পৌঁছতে আরো আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগে। আন্দাজ দশটা নাগাদ স্পটে গিয়ে পৌঁছায় সে, দেখা হয় ইন্সপেক্টর বিমল মজুমদারের সাথে। তাঁর কাছ থেকেই ছোটো-ছোটো কিছু ডিটেইলস জানতে পারে সে, তারপর লাশটা দেখতে যায়। লাশের সারা শরীরটা কালচে-সাদা বর্ণের, গলার সমস্ত অংশ জুড়ে অগণিত সূক্ষ্ম ছিদ্র, আর লাশের পাশে পড়ে থাকা রেশমি চুলের গোছা। এদিক-ওদিক ভালোভাবে দেখে নিয়ে অয়নকে সমস্ত জায়গাটার ফটোগ্রাফ তুলে নিতে বলে বিমলবাবুর সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করতে খানিকটা দূরে চলে যায় সে। কিছুক্ষণ আলোচনা চলে, তারপর সে দেখে, অ্যাম্বুলেন্সের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে লাশকে একটা বড়ো এয়ার টাইট পলিব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে। তারপর সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই বাকি সময়টা কেটেছে।
এর চেয়ে বেশি কিছু আর মনে পড়লো না উজ্জ্বলের। সবকিছুই পরিষ্কার, আর অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েনি তার। কমোড থেকে উঠে ফ্লাশটা টিপে দেয় সে। আচমকাই একটা চিন্তা এসে ধাক্কা মারে তার মাথায়, চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে ওঠে। ভালোভাবে দৃশ্যটাকে ভাবার চেষ্টা করে সে। এয়ার টাইট পলিব্যাগে যখন লাশটা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন কি সেটার চোখ খোলা ছিল? বিস্ময়ে নিজেই নিজেকে প্রশ্নটা করে উজ্জ্বল। কিন্তু এটা তো অসম্ভব, পড়ে থাকা অবস্থাতে তো চোখ বন্ধই ছিল। না না, ভুলভাল ভাবছে সে। সবই তার মনের ভুল। নিজেকে আশ্বস্ত করে সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে উজ্জ্বল, তারপর হাত-পা সাবান দিয়ে ধুয়ে বেরিয়ে আসে বাথরুম থেকে। ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় বেডরুমের দিকে। আজ একটুও রেস্ট হয়নি বলেই হয়তো এইসব চিন্তা মাথায় আসছে তার, তাই কোনোরকম রিস্ক না নিয়ে বিছানায় লাফিয়ে পড়ে সে। মিনিট খানেক এপাশ-ওপাশ করতেই একটা গভীর ঘুম এসে ধরা দেয় তার চোখে, মুহূর্তের মধ্যেই ঘুমে অবশ হয়ে আসে তার সমস্ত শরীর।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন