(এক)

প্রীতম পুরকাইত

পাশের কারখানার কোলাহলে ঘুমটা ভেঙে গেল ইন্দ্রর, কাল রাতের পর থেকেই মাথাটা কেমন যেন ধরেছে তার, জানে না কেন রাতের ঘটনাগুলো বারবার সত্যি বলে মনে হচ্ছে! নিজে বুঝতে পারছে যে, সবই তার কল্পনা, সবই স্বপ্ন, কিন্তু তাও বারবার কিছু একটা যেন তাকে বলে যাচ্ছে যে, এটা স্বপ্ন নয়।

অনেক কষ্টে বিছানা ছেড়ে উঠলো সে, মাথাটা এখনো ধরে আছে। কিন্তু বেরোতে তো হবেই! শ্রী আজ প্রায় দশ দিন পর বাড়ি ফিরছে, এয়ারপোর্ট থেকে আনতে না গেলে খুব খারাপ লাগবে ওর। অগত্যা চোখ-মুখে জল দিয়ে, দাঁতটা ভালোভাবে মেজে নিলো ইন্দ্র। কালকের রাখা দুটো পিৎজার স্লাইস মুখে পুরে বেরিয়ে গেল।

এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছতে মিনিট বারো সময় লাগলো। গাড়ি থেকে নেমেই শ্রী’কে দেখে কিছুটা অবাক হলো সে, শ্রী আগে থেকেই লাগেজগুলো নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ফ্লাইট এত তাড়াতাড়ি চলে এলো! ঘড়িতে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো ইন্দ্র, একী! এখনও সাড়ে আট’টাই বাজে… সর্বনাশ! ঘড়িটা তার মানে এতক্ষণ ধরে বন্ধ আছে! তার জন্য যে শ্রী কতক্ষণ অপেক্ষায় আছে, সেটা আন্দাজ করতেই বুকটা কেঁপে উঠলো। কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে গেল ইন্দ্র, লাগেজগুলো নিয়ে তুলে রাখলো গাড়ির ডিগিতে। শ্রী’র চোখ লাল হয়ে আছে, বিশাল রেগে আছে বুঝতে পেরে আর খুব একটা ঘাটানোর চেষ্টা করলো না ইন্দ্র। গাড়ির ভেতরে ঢুকলো দুজনে, চাবি ঘুরিয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিলো ইন্দ্র। হনহনিয়ে গাড়ি রওনা দিলো বাড়ির উদ্দেশে। কিছুটা যাওয়ার পরই একটা জিনিস বীভৎস চোখে লাগলো ইন্দ্রর, রোডটা আজ অস্বাভাবিক ফাঁকা, প্রায় গাড়ি নেই বললেই চলে, কিন্তু কেন! এই সময় তো গাড়ির আস্ত মেলা চলে, আর লোকজনও ভিড় করে থাকে পুরো রাস্তাটায়। আজ এরকম কেন? ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য হলো না তার কাছে। আরও কিছু খেয়াল মাথায় আসছিল তার, কিন্তু আচমকা শ্রী কিছু একটা বলে ওঠায় সেই চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটলো,

"কী করো বলো তো সারা রাত ধরে! কালকেই বলেছিলাম, আজ ন'টায় কলকাতায় পৌঁছে যাবো… তাও এক ঘন্টা দেরি!"

কাঁপা কাঁপা গলায় ইন্দ্র বললো,

—আসলে ঘড়িটা বন্ধ ছিল, অ্যালার্মটাও বাজেনি, তাই….

―তাই জন্যেই তো বলেছিলাম তাড়াতাড়ি ঘুমাতে, যাতে সকালে উঠতে পারো।

―কাল কিন্তু আমি তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে ছিলাম, কিন্তু রাতের ওই স্বপ্নটা!

বলতে বলতে থেমে গেল ইন্দ্র। শ্রী সবে এসেছে, বেকার বেকার ওকে এইসব বলে চিন্তা দেওয়ার কোনো মানে হয় না― এটা ভেবেই বাকি কথাটা চেপে গেল সে।

―কীসের স্বপ্ন?

উত্তেজিত গলায় বলে উঠলো শ্রী, "কী বলছিলে, থেমে গেলে কেন?"

―আরে বাদ দাও না, সেরকম কিছু নয়।

এবার ইন্দ্রকে খানিকটা পাকড়াও করলো শ্রী,

"এই কী ব্যাপার খুলে বলো তো, কী স্বপ্ন দেখেছিলে?"

ইন্দ্র দারুণ ফ্যাসাদে পড়লো এবার, তাও যতটা সম্ভব কথা ঘোরানোর চেষ্টা করলো,

"আরে ওইসব ছাড়ো তো।"

বলে মিষ্টি হেসে শ্রী’র দিকে তাকালো, কিন্তু শ্রী’র গলায় একটা উজ্জ্বল লাল রঙের কী একটা জিনিস দেখে খানিকটা অবাক হলো সে, "ওটা কী গো?"

ইন্দ্রর চোখ অনুসরণ করে নিজের গলার চেনের সাথে ঝুলে থাকা গোল লাল পাথরটার দিকে দেখলো শ্রী, তারপর ইন্দ্রর দিকে চেয়ে অল্প হেসে বললো,

―আরে এটা! এই পাথরটা না আর্গোসের একটা মন্দিরের কাছ থেকে কুড়িয়ে পেয়েছি, খুব সুন্দর না! আমার এত পছন্দ হলো যে, আমি একেবারে গলার চেনের সাথে কায়দা করে একটা ফুটো করে ঝুলিয়ে নিয়েছি।

ইন্দ্র একবার পাথরটার দিকে, তারপর শ্রী’র মুখের দিকে চেয়ে অল্প হাসলো,

"হ্যাঁ, খুব সুন্দর লাগছে তোমার গলায়, বেশ মানাচ্ছে।"

―হ্যাঁ, খুব।

বলেই একটা তৃপ্তির হাসি হাসলো। পরক্ষণেই একটু গম্ভীর হয়ে উঠলো, "এই, তুমি কথা ঘোরাচ্ছ কেন বলো তো! ব্যাপারটা কী সেটা তো বললেই না, বলো দেখি কী ব্যাপার!"

বড়ই যাঁতাকলে পড়লো ইন্দ্র, শ্রী যেভাবে জেদ শুরু করেছে তাতে মনে হয় না, ওর থেকে কিছু লুকিয়ে রাখা যাবে। অগত্যা অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কালকের রাতের সেই দুঃস্বপ্নের কথা ধীরে ধীরে বলা শুরু করলো,

"কাল রাত এগারোটা নাগাদ বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ি আমি। জানি না কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম, যখন চোখ খুললাম দেখলাম, একটা ফাঁকা জঙ্গলে শুয়ে আছি। প্রথমে ভেবেছিলাম, চোখের ভুল, কিন্তু বার’কয়েক চোখ কচলে নেওয়ার পরেও সেই একই জায়গা দেখতে পেলাম। হাঁটা দিলাম, একের পর এক গাছ পেরিয়ে যেতে লাগলাম, জঙ্গলটা ভীষণ সুন্দর, চারিদিকে শুধু গাছ আর গাছ, গাছের কম্বিনেশনটাও কীরকম অদ্ভুত… ইউক্যালিপটাসের সাথে পাইন, সব যেন পাশাপাশি নিপুণ হাতে সাজানো। অনেকদূর হাঁটার পর একটা জলাশয় চোখে পড়লো, কিন্তু তার জল অস্বাভাবিক রকমের নীল, গাঢ় নীল! এরকম নীল রঙের জল মনে হয় না পৃথিবীর কোথাও রয়েছে। জলাশয়কে পেছনে রেখে আবার হাঁটা দিলাম সামনের দিকে। কিছু দূর যাওয়ার পর চোখে পড়লো, আমার থেকে কিছুটা দূরে একটা পাথরের মূর্তি পড়ে আছে মাটিতে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম সেদিকে, একটা নারীমূর্তি! অবিকল মানুষের মতো। তার রঙ, গঠন অবিকল মানুষের আকারে তৈরি, চোখ’দুটো গাঢ় বাদামি। কিছুক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়েই একভাবে দেখলাম মূর্তিটাকে, তারপর আর বেশি মাথা না ঘামিয়ে হাঁটা দিলাম, সেটাকে পেছনে রেখে আবার এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর আবার দেখতে পেলাম, সামনে আরেকটা মূর্তি রয়েছে, এগিয়ে গেলাম সেদিকে, দেখলাম কিছুক্ষণ আগে যে মূর্তিটা দেখেছিলাম অবিকল সেই একই মূর্তি! অবিকল একরকম! কিন্তু সেটা দাঁড় করানো আছে, ভয়টা রীতিমতো বাড়তে শুরু করলো, অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে আবার এগিয়ে যেতে থাকলাম সামনের দিকে, কিছুদূর পর আবার চোখে পড়লো সেই মূর্তি! সেই এক’ই মূর্তি! কাছে গিয়ে দেখলাম অবিকল এক’ই।

কিন্তু এ কী, তার তো চোখ নড়ছে! এটা তো মূর্তি নয়! এটা তো মানুষ! পাশে আরেকটা জলাশয় ছিল, সেটার কাছেই নিয়ে যাই সেই দেহটাকে, তার চোখে জলের ঝাপটা দিই, আস্তে আস্তে চোখ মেলে সে। জানি না কেন, আমাকে দেখে ফ্যাকাসে হয়ে গেল তাঁর মুখটা, তড়িঘড়ি উঠে পড়লো মাটি থেকে। কিছুটা অবাক হলাম, কীরকম অস্বাভাবিক লাগলো। মানে আমি তো তাকে বাঁচালাম, আমাকে দেখে এরকম অস্বাভাবিক আচরণ করছে কেন সে? আর আগের মূর্তি দুটোই’বা অবিকল এর মতো দেখতে কেন? প্রশ্নগুলো দানা বাঁধা শুরু করলো মনের মধ্যে। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করেই ব্যাপারটা নিয়ে একটু তলিয়ে দেখলাম, কিন্তু কিছুই মাথায় এলো না। আবার মুখ তুলে তাকালাম তার দিকে, কিন্তু এ কী! আমার সামনে এখন যে বসে রয়েছে সে তো একটা মূর্তি! কিন্তু মহিলাটি গেল কোথায়? মূর্তিটা অবিকল মানুষের মতো, একটু আগে যেন এই মূর্তিটা’ই আমার সামনে জীবিত অবস্থায় ছিল… ভয়ে আমার সারা দেহ শিহরিত হয়ে উঠলো। পাশ থেকে মিহি সুর ভেসে আসছে। খুব হালকা-ধীর মিষ্টি সুর। সাথে কার একটা গলাও যেন ভেসে আসছে, কী বলছে!… কিছু কি বলছে? কিছুই শোনা যাচ্ছে না স্পষ্টভাবে। সেই শব্দকে অনুসরণ করে এগোতে লাগলাম, কিছুদূর যাওয়ার পর আবার দেখতে পেলাম সেই নারীটিকে, আমার দিকে পেছন করে বসে রয়েছে সেই প্রথম দেখা গাঢ় নীল জলাশয়ের কাছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। তার একদম কাছে এসে পৌঁছালাম, হঠাৎ চোখটা সেই জলাশয়ে পড়তেই শিহরণে কেঁপে উঠলাম, সারা দেহটা একেবার যেন অবশ হয়ে গেল। জলের ওপরে সেই নারীর ছায়া পড়েছে, কিন্তু তার কাঁধের ওপরে একটা নয়, তিন-তিনটে মাথা, সঙ্গে সঙ্গে তাকালাম সেই নারীদেহের দিকে, কিন্তু তার তো একটা’ই মাথা! আবার চোখ ফেরালাম সেই জলাশয়ের জলে… নাহ! এখন একটাই মাথা দেখাচ্ছে, কিছুটা স্বস্তি পেলো মনটা, কিন্তু এ কী! তার মাথাটা সম্পূর্ণ পেছনের দিকে ঘোরানো! সে যেন আমার দিকেই একদৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমশীতল পিচ্ছিল কিছু যেন চলে গেল। ধীরে ধীরে চোখ ফেরালাম তার দিকে, কিন্তু কোথায় গেল সে! আবার ভেসে আসতে থাকলো সেই শব্দ, আর মিহি সুর। সুরটা এত মিষ্টি কেন! কেউ কি গান গাইছে! কার মিহি গলা ভেসে আসছে? হঠাৎ আমার সামনে এসে দাঁড়ালো সে, নাহ! আমি ভুল দেখিনি। তার কাঁধের ওপরে তিনটে মাথা’ই রয়েছে। আতঙ্কে ভরে উঠলো আমার সারা শরীর, নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে এলো। এবার সে তিন ভাগে ভাগ হয়ে তিনটে ভিন্ন রূপ নিয়েছে, যার একটিকেও আমি জীবনে কোনোদিন দেখিনি। ধীরে ধীরে তারা নিজেদেরকে কেন্দ্র করে অস্বাভাবিকভাবে ঘুরতে আরম্ভ করলো, জায়গাটাতে এক গোলাকার স্রোতের সৃষ্টি হলো। যেন কোনো ঘূর্ণিঝড় শুরু হলো, সারা আকাশটা গাঢ় নীল হয়ে উঠলো, অন্ধকারে পরিপূর্ণ হলো চারিপাশ, সুরটা আরও তীব্র হয়ে উঠলো।

হঠাৎ অনুভব করলাম, আমার হাতটা ধরে কে যেন টান দিলো, আমি এসে পৌঁছালাম সেই স্রোতের অন্তর্দেশে। ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, কিন্তু বাইরে থেকে যে স্রোত দেখেছিলাম ভেতরে কিন্তু তার কিছুই অনুভব হলো না, যেন আমি স্থির কোনো ঘরের ভেতরে আবদ্ধ। চারিপাশ দেওয়ালে আবৃত, আর সেই দেওয়ালে আঁকা রয়েছে কিছু চিত্র! ভালোভাবে চিত্রগুলো দেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু অন্ধকার বাধা দিল। কয়েক মুহূর্ত পর অন্ধকারটা একটু গা সওয়া হয়ে যেতে দেখলাম, তিনটে নারীর অস্পষ্ট ছবি― মেডুসা, স্ঠেনো, ইউরেইল; "থ্রি জর্জিয়ান সিস্টার"… গ্রিক পুরানে এদের নাম আগে শুনেছি আমি― তিন বোন এঁরা। এদের প্রত্যেকেরই অস্বাভাবিক কিছু গুণ ছিল, যেমন― যে কোনো কিছুকে পাথরে রূপান্তর করা, বিষাক্ত সাপের বিষ ছোঁড়া, আর নিজের চুলের সাহায্যে কারোর জীবন নির্ধারণ করা, অর্থাৎ তাকে বাঁচিয়ে তোলা বা মেরে ফেলা। কিন্তু এদের সাথে এই জায়গার কী সম্পর্ক! আকাশ-পাতাল ভেবেও কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না আমি, কীরকম যেন অস্বস্তিতে ভরে গেল সারা শরীর। হঠাৎ মনে হলো, যেন পায়ের কাছে কীসের একটা স্পর্শ অনুভব করছি, নিচে তাকাতেই দেখলাম, আমার ডান পা ঘিরে রয়েছে এক বিশালাকৃতির সাপ, কীরকম বিদঘুটে দেখতে সেটা, আমার সারা শরীর ঘিনঘিনিয়ে উঠলো। হঠাৎ সে ফণা তুলে ছোবল মারলো আমার পায়ে। ধীরে ধীরে অবশ হওয়া শুরু করলো আমার সমস্ত শরীর… অস্পষ্ট আবছা দৃষ্টিতে দেখলাম, ধীরে ধীরে পাথরে পরিণত হতে শুরু করেছে আমার শরীরটা, পা পেরিয়ে হাঁটুও পাথরের রূপ নিচ্ছে, কী নিঁখুদভাবে পাথরের একটা মূর্তিতে পরিণত হচ্ছি আমি, যেন এক শিল্পী নিজের কারুকার্যের মানে সর্বশ্রেষ্ঠ মূর্তি তৈরি করছে।

হঠাৎ তখন’ই ঘুমটা ভেঙে গেল…"

ইন্দ্রর কথাগুলোকে নিছকই গল্প ভেবে কোনো গুরুত্ব দিলো না শ্রী। ইন্দ্রর মনে হলো, বেকার বেকার এতক্ষণ ধরে এত কিছু বললো সে। তাকে দিয়ে জোর করে এগুলো যে কেন বলালো শ্রী তার মাথায় এলো না, শুধু শুধু এতটা সময় নষ্ট হলো। ভালোভাবে বাইরেটা দেখে নিলো ইন্দ্র, এতক্ষণে প্রায় অনেকটাই চলে এসেছে। কিন্তু রাস্তাঘাট আজ ভীষণ ফাঁকা কেন, সেটা এখনো বুঝে উঠতে পারলো না সে। এমনকি সামনে পেছনেও কোনো গাড়ি কিংবা মানুষ নেই, খুবই আশ্চর্য হলো ইন্দ্র, ব্যাপারটা খুবই অস্বাভাবিক। মুখ দিয়ে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করলো ইন্দ্র, আর তখনই শ্রী’র কথা ভেসে এলো,

"আচ্ছা, কী বলছিলে! ওই জর্জিয়ান সিস্টারদের মধ্যে কে একজন নাকি চুলের সাহায্যে কারোর জন্ম-মৃত্যু কীসব করে?"

হঠাৎ এরকম প্রশ্ন আসায় কিছুটা অবাক হলো ইন্দ্র, পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় সে বললো,

"ওই জর্জিয়ান সিস্টারদের মধ্যে একজন আছে, যার চুলের মধ্যে সে জীবনকে চালিত করতে পারে, অন্তত গ্রিক পুরাণ তো তাই বলে গেছে। ও নাকি চুলের সাহায্যে কাউকে বাঁচিয়েও তুলতে পারে, আবার মেরেও দিতে পারে।"

"তা তুমি বললে, তোমাকে স্বপ্নে সাপ ছোবলও দিয়েছিল, শরীর পাথরেও পরিণত হওয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু ওই চুলের ব্যাপারটা কিছু হয়নি কেন?"

সকাল থেকে এই একটা প্রশ্ন ইন্দ্রকেও খুব ভাবিয়েছে, সত্যিই তো! চুল নিয়ে তো কোনো ঘটনা ঘটেনি তার সাথে! কিন্তু কেন ঘটেনি! আরেকটু ভেবে দেখতে হবে। শ্রী’র প্রশ্নটা তাঁর কপালে কয়েকটা ভাঁজ ফেললেও ব্যাপারটা নিয়ে বেশি জলঘোলা করার সিদ্ধান্ত ত্যাগ করলো সে, কথাটা অন্য পথে নিয়ে যাওয়ার জন্যই সে বললো,

"হয়তো ঘুম ভেঙে গিয়েছিল বলে… যাই হোক ওসব বাদ দাও তো।"

কথাটা বলে শ্রী’র দিকে তাকালো ইন্দ্র… কতদিন পর একসাথে বসে আছে দু’জনে, এই দশটা দিন যে কী কষ্টে কাটিয়েছে ইন্দ্র, সেটা ঠিক বলে বোঝানো যাবে না। বিয়ের পর এই প্রথমবার শ্রী কোনো অফিস ট্যুরে গেল, তাও আবার এতদিনের জন্য। অবশেষে দুটিতে এক হয়েছে। চোখের গগলসটা খুলে গাড়ির সামনের ডেকে রাখলো শ্রী, ধীরে ধীরে মুখভরা হাসি নিয়ে ইন্দ্রর দিকে তাকালো, ইন্দ্রও মুখ ফেরালো তার দিকে। কিন্তু তার চোখদুটো এরকম অস্বাভাবিক লাগছে কেন! এরকম অস্বাভাবিক রকমের বাদামি হয়ে গেল কী করে তার চোখ দুটো! আর মুখটাও এরকম অদ্ভুত ধরণের কেন! কীরকম লাগছে আজ ওকে। কিন্তু চোখদুটো বেশিই অদ্ভুত লাগছে। আচমকা মাথায় এলো ইন্দ্রর, গতকালের স্বপ্নে সে যাকে দেখেছিল তার চোখও তো এরকম অস্বাভাবিক রকমের বাদামিই ছিল! কথাগুলো ভাবতে গিয়েই ওর সারা শরীরটা একবার দুলে উঠলো, অসম্ভব রূপে কাঁপতে শুরু করলো শরীরটা। শ্রী’র ঠোঁটে খেলে উঠলো একটা শান্ত শব্দহীন পৈশাচিক হাসি। ধীরে ধীরে তার রেশমি চুলের গোছা উড়ে এসে লাগলো ইন্দ্রর মুখে, কী অসম্ভব সুন্দর গন্ধ বেরোচ্ছে, গন্ধের মোহে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে সে। এই কি সেই মৃত্যুবাণ! মনে মনে ভাবলো ইন্দ্র। তার সময় কি তাহলে সত্যিই ফুরিয়ে এসেছে!

শ্রী’র ঘন কালো চুলের গোছা বারবার এসে স্পর্শ করছে ইন্দ্রর মুখটাকে, কালো অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে তার চারপাশে, নিঃশ্বাসটা কীরকম অস্বাভাবিক! অসম্ভব জোরে পড়ছে নিঃশ্বাস, মাথাটা ভারী হয়ে আসছে তার, কোনো একটা শব্দ যেন ভেসে আসছে তার কানে। কল্পনাতে শোনা সেই মিষ্টি সুরটা, সাথে একটা স্থির মিহি গলা। কী বলছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, শুধু সুরটা সম্মোহনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাকে। কল্পনা, স্বপ্ন সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে নিয়ে যাচ্ছে "কল্পনার ঊর্ধ্বে"।

অধ্যায় ১ / ১৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%