প্রীতম পুরকাইত
গাঢ় নীল আকাশটার মাঝে সূর্যটাকে কীরকম যেন গোলাপী মনে হচ্ছে। মেয়েটাও একঠায় কিছুক্ষণ সেই আকাশের দিকেই চেয়ে রইলো। তারপর আবার নাচতে নাচতে এগিয়ে গেল মন্দিরটার দিকে। সেই ছোটো থেকেই এই মন্দিরটা খুব টানে তাকে, কেন টানে সে নিজেও জানে না, কিন্তু বড়ই ভালো লাগে তার এখানে আসতে। সবুজে ভরা গ্রামীণ পথ ধরে এগিয়ে চলতেও খুব ভালো লাগে তার, কী যেন একটা আছে এই সমস্ত কিছুর মধ্যে। বারবার তাকে আরও বেশি করে মাতাল করে তোলে। আর এই মাতাল নেশা হাজার চেষ্টা করেও দূর করতে পারে না সে, কথাই শোনে না তার।
এক’পা-দু’পা ফেলে ধীরে ধীরে মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেল সে। গাঁয়ের রাস্তা এই সময়টা ফাঁকাই থাকে, এই দ্বিপ্রহর বেলায় সবাই যে যার বাড়িতে মধ্যাহ্ন নিদ্রায় মগ্ন হয়। আর মেয়েটিও এই ফাঁকা সময়ে সবাইকে লুকিয়ে চলে আসে মন্দিরের কাছে। পেছনের প্রাঙ্গনে এসে বসে, দূর থেকেই মুগ্ধ নয়নে দেখে চলে শিল্পের এই অপরূপ সৃষ্টিকে, দেবী অ্যাথেনার পবিত্র মন্দিরটিকে। অদ্ভুত সব কারুকার্য্যে আবৃত এই মন্দির, ঠিক যেন স্বর্গ। বাইরের দেওয়াল জুড়ে নানান শিল্পীর হাতের অপূর্ব সব শৈলচিত্র আর মূর্তি খোদাই করা। কী অপরূপ লাগে! মাঝে মাঝে একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকলেই মেয়েটার সারা শরীর বেয়ে কীরকম একটা তরঙ্গ বয়ে যায়। আর ঠিক তখনই সে উপলব্ধি করে যে, এটাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পবিত্র স্থান। দেবীর চরণ যেন সত্যিই এখানে রয়েছে, তাই জন্যেই তো শস্য-শ্যামলা হয়ে উঠেছে এই গ্রাম। শুধু কি গ্রাম! সমস্ত এথেন্স রাজ্যটাই হয়ে উঠেছে সবদিক দিয়ে উন্নত। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকলা, চাষ-আবাদ― সবেতেই এথেন্সই শ্রেষ্ঠ। যেন দেবী নিজে হাতে তৈরি করে দিয়ে গেছেন। হয়তো সেই জন্যেই দেবীর নাম অনুসারে এই রাজ্যের নামকরণ! কথাগুলো ভাবতে গিয়েই একটা মিহি হাসি ফুটে ওঠে মেয়েটার ঠোঁটে। আবার মুগ্ধ নয়নে সে তাকায় মন্দিরের দিকে। খুব ইচ্ছা করে তার সারাক্ষণ ওই মন্দিরের ভেতরেই বসে থাকতে, কিন্তু ভিড়ের চোটে কোনোদিনই সে সুযোগ হয়নি তার। আর এই সময়টা মন্দির পুরোপুরি বন্ধ থাকে, দাসী আর সেবকরা ছাড়া আর কেউই থাকে না প্রায়। মন্দিরের পুরোহিতরাও এই সময় নিজেদের কক্ষে বিশ্রাম নেন। এখন কোনোমতেই মন্দিরের ভেতরে কেউ ঢুকতে পারবে না। মুখটা ভার হয়ে ওঠে তার। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে অজান্তেই, চোখ’দুটো বুজে মাটিতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে সে।
ঝলমলে নীল আকাশটা আচমকাই অসম্ভব কালো হয়ে উঠলো। অসংখ্য ভরাট মেঘ ধীরে ধীরে ছেয়ে গেল সমস্ত গগন জুড়ে। চারপাশ অন্ধকারে প্রায় ঢেকে গেল। পুরো গ্রামটাই যেন একটা কালো চাদরে কেউ ঢেকে দিলো। ধুঁ ধুঁ করা অন্ধকার প্রাঙ্গনে একা গভীর নিদ্রায় মগ্ন হয়ে রয়েছে মেয়েটা। আশেপাশে কী হচ্ছে, কী চলছে তার কোনো ধারণাই নেই তার। ঝলমলে পরিবেশটা যে এরকম বদ্ধ কালো কুটিরে পরিণত হয়েছে, তার বিন্দুমাত্র আঁচও পায়নি সে। ঘুমটা খুব গাঢ়। অন্ধকারে তার মুখটাও ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না, শুধু তার নিঃশ্বাসের শব্দ জানান দিচ্ছে তার উপস্থিতি।
অন্ধকারের পেট চিরে কিছু একটা যেন এগিয়ে আসছে মেয়েটার দিকে, বুকে হেঁটে এগিয়ে আসছে। স্পষ্টভাবে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু কিছু একটা এগিয়ে আসছে তাতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই। জীবটা আরো কিছুটা কাছে আসতে সেটার সম্পূর্ণ চেহারাটা পরিষ্কার হয়ে উঠলো, একটা আস্ত বিষাক্ত সাপ! ধীরে ধীরে সে এগিয়ে আসছে মেয়েটার দিকে। না! ঠিক একটা সাপ নয়। দুটো… না! তিনটে। না! অগণিত কিছু সরীসৃপ এগিয়ে আসছে মেয়েটার দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে। খুব সন্তর্পণে এগিয়ে আসছে সেগুলো, আরও কিছুটা কাছে চলে এসেছে। কিন্তু পেছনে ওটা কী! গোলাকার কিছু একটা ঘষে ঘষে এগিয়ে আসছে ওই সাপগুলোকে সামনে রেখে। কী প্রাণী, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আরও কিছুটা সামনে এগিয়ে এলো সাপগুলো। আর তখনই বোঝা গেল পেছনের গোলাকার জিনিসটা কোনো প্রাণী নয়, একটা মানুষের মুণ্ডু। শুধু মুণ্ডু নয়! সমগ্র একটা মানুষ! একটা নারীদেহ। সরীসৃপের মতো বুকে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছে মেয়েটার দিকে। তার মাথায় চুলের পরিবর্তে রয়েছে অসংখ্য কালো-লাল আর সবুজ বর্ণের পিচ্ছিল লেজ, যেগুলো যুক্ত হয়েছে কয়েকটা বিদঘুটে সরীসৃপ প্রাণীতে। ধীরে ধীরে সেই নারীদেহ বুক ঠেলে ঠেলে এগিয়ে গেল মেয়েটার দিকে। তার একদম কাছে এসে সেই নারীদেহ মাটি থেকে উঠে দাঁড়ালো। ধীরে ধীরে নিজের কুৎসিত মুখটা নিয়ে গেল মেয়েটার মুখের সামনে। তার মাথার সঙ্গে লেগে থাকা সাপগুলোর বিষাক্ত ফণা মেয়েটার দিকে স্থির। কিন্তু মেয়েটা এখনো গভীর নিদ্রায় মগ্ন। নারীদেহের ঠোঁটে ফুটে উঠলো একটা পৈশাচিক নারকীয় হাসি, কিন্তু কোনো শব্দ নেই সেই হাসিতে, তাও সেই নীরব হাসি যেন কাঁপিয়ে তুললো সমস্ত প্রাঙ্গনটাকে। নিজের মুখটা মেয়েটার আরও কাছে নিয়ে গেল সে, সন্তর্পণে মাথা ঝাঁকালো, আর সঙ্গে সঙ্গেই তার মাথার উপরে ঢেউ খেলিয়ে ফণা তুলে রাখা সরীসৃপগুলো ধীরে ধীরে নিদ্রায় মগ্ন মেয়েটার মুখের দিকে ধেয়ে গেল। ফণা উঁচিয়ে একসাথে সমস্ত সরীসৃপগুলো মারণ ছোবল বসাতে গেল, আর তখনই হঠাৎ করেই সমস্ত আকাশটা আবার আলোয় আলো হয়ে গেল, সমস্ত মেঘগুলো একসাথে উধাও হয়ে গেল, ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার নিমেষে ঝলমলে রোদের কাছে হার মেনে নিয়ে যেন পালিয়ে গেল। রোদের উজ্জ্বল তাপে শরীরটা যেন পুড়ে গেল সেই দানবীয় নারীদেহের, সারা শরীর অসম্ভব রকম জ্বালায় জ্বলে উঠলো… নিমেষমাত্র তার সমস্ত দেহ পুড়ে ছাই হয়ে বাতাসে ধূলিকণা হয়ে উবে গেল।
মেয়েটার যখন ঘুম ভাঙলো, তখন দুপুর প্রায় শেষ হয়ে গোধূলি বেলা পড়েছে। সোনালী সূর্য অস্তের পথে পা বাড়িয়েছে। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো মেয়েটা, হাত দিয়ে চোখ’দুটো ভালোভাবে মুছে নিলো। আজ অনেকটা দেরি হয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে, নইলে এখানে কেউ দেখে ফেললে হাজার প্রশ্নের বাণ ধেয়ে আসবে তার দিকে। যদিও এখনো কেউ এসে পৌঁছায়নি এখানে। শান্ত পায়ে মন্দির পেরিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল মেয়েটা, তার দুলকি চালে সমস্ত পরিবেশটা যেন মেতে উঠলো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন