দিগবিজয়ী নেপোলিয়ন

হেমেন্দ্রকুমার রায়

এক। শৈশব ও কৈশোর

মহাভারতের কবি বলেন, অর্জুনের পুত্র অভিমন্যু যুদ্ধবিদ্যা শিখেছিলেন মাতৃজঠরে।

একালের কবি আর-একটি ছেলের সম্বন্ধেও ও কথা বলেননি বটে, কিন্তু তারও পিতা ছিলেন বীরপুরুষ ও মাতা ছিলেন বীরনারী এবং তিনিও যখন মাতৃগর্ভে বাস করতেন তখন তাঁর মাতা বিচরণ করতেন রণক্ষেত্রে— পাশে নিয়ে অস্ত্রধারী স্বামীকে।

শত্রু আক্রমণ করেছে তাঁদের স্বদেশকে এবং শত্রু হয়েছে বিজয়ী। গভীর অরণ্যের অন্ধকার ভেদ করে, নদী, প্রান্তর, পর্বত, উপত্যকা, অধিত্যকা অতিক্রম করে হাজার হাজার পলাতকের সঙ্গে তাঁরাও চলেছেন শ্রান্তপদে কিন্তু দৃপ্তমনে দূরে— দূরে— আরও দূরে— বহু দূরে! পিছন থেকে ভেসে আসছে গুরু গুরু মেঘ গর্জনের মতন ঘন ঘন কামান-তর্জন— মাঝে মাঝে কানের পাশ দিয়ে সশব্দে বাতাস কেটে ছুটে ছুটে যাচ্ছে বন্দুকের প্রতপ্ত গুলি।

১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দ। ফরাসিয়া কর্সিকা দ্বীপ দখল করলে জুলাই মাসে। পরাজিত কর্সিকাবাসীদের দুঃখের সীমা নেই।

কিন্তু ঠিক পরের মাসেই— ১৫ আগস্ট তারিখে কর্সিকার বীরনারী লেটিজিয়ার গর্ভ থেকে যে পুত্র ভূমিষ্ঠ হয়ে পৃথিবীর আলোকে প্রথম চোখ মেললে, পিতা-মাতার পরাজয়-বেদনার প্রতিশোধ নেওয়ার ভার পড়ল তারই উপরে। আজ যারা জয় করে প্রভু হতে এসেছে, তাদেরই জয় করে সর্বশক্তিমান প্রভু হবে এই পুত্র।

ছেলের নাম হল নেপোলিয়ন। আজ তিরিশ লক্ষ ফরাসি সৈনিকের ঘৃণ্য তরবারির রক্তধারার তলায় অজানা গৃহকোণে যার জন্ম, কয়েক বৎসর পরে দেখা গেল— সমগ্র ফরাসি দেশ তারই পদতলে নিশ্চেষ্টভাবে নতশির।

নেপোলিয়ন হচ্ছে ইতালীয় নাম। ইতালির ইতিহাসে এই নামের প্রথম অধিকারী বহু শতাব্দী পূর্বেই বিখ্যাত হয়েছিলেন। ষোলো শতাব্দীতে তাঁর বংশধররা উঠে আসেন কর্সিকায়। এবং তাদের বংশ পরিচিত হয় 'বোনাপার্ট' নামে।

নেপোলিয়নের বাবার নাম কার্লো বোনাপার্ট ও মায়ের নাম লেটিজিয়া র্যামোলিনো। সম্ভ্রান্ত বংশে জন্ম বলে কার্লো যখন ইতালিতে লেখাপড়া শিখতে গিয়েছিলেন, লোকে তখন তাঁকে কাউন্ট বোনাপার্ট বলে ডাকত। কিন্তু তিনি ছিলেন ভারী বেপরোয়া খরুচে— একবার একটিমাত্র ভোজ দিয়েই তিনি তাঁর দুই বছরের আয় খরচ করে ফেলতে কুণ্ঠিত হননি! সুতরাং এমন লোকের দ্বারা ভালোভাবে সংসার চালনা করা সম্ভব নয়।

কার্লোর পেশা ছিল ওকালতি, কিন্তু তাঁর বাড়িতে মক্কেলদের দেখা খুব বেশি পাওয়া যেত না। তিনি সাহিত্যিকও ছিলেন— যদিও বিখ্যাত হতে পারেননি। নেপোলিয়নও প্রথম বয়সে বাপের শেষ গুণের অধিকারী হয়ে কিছু কিছু লেখনীচালনা করেছিলেন। তাঁর লেখা ছোটোগল্প ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। একখানি নভেলেও তিনি হাত দিয়েছিলেন।

কার্লো বোনাপার্টের পাঁচ ছেলে, তিন মেয়ে। জোসেফ (জন্ম ১৭৬৮), নেপোলিয়ন (১৭৬৯), লুসিয়েন (১৭৭৫), লুইস (১৭৭৮), জেরোম (১৭৮৪) এবং ক্যারোলিন, এলাইজ ও পলিন।

অতএব বোঝাই যাচ্ছে, সংসারটি বড়ো সামান্য নয়। বেহিসাবি কর্তার উপরে নির্ভর করলে এ সংসার হত একেবারেই অচল। কিন্তু নেপোলিয়নের এক খুড়ো ছিলেন, তিনি ধর্মযাজক। সংসারের কতক কতক ব্যয়ভার বহন করতেন তিনিও।

নেপোলিয়নের মা লেটিজিয়া কেবল যে বুদ্ধিমতী ছিলেন তা নয়; যথাসম্ভব অল্প ব্যয়ে চারিদিক গুছিয়েগাছিয়ে সংসার চালাবার ক্ষমতাও ছিল তাঁর যথেষ্ট। এবং মেজো নেপোলিয়ন ও সবচেয়ে ছোটো মেয়ে পলিনকে তিনি অন্য সব ছেলে-মেয়ের চেয়ে ভালোবাসতেন বেশি।

শিশুবয়স থেকেই নেপোলিয়ন ছিলেন অত্যন্ত একগুঁয়ে বা একরোখা ছেলে। কিছুতেই ভয় পেতেন না, কাউকেই ভয় করতেন না। বড়ো কম ঝগড়াটেও ছিলেন না। কারোকে ঘুসি মারতেন, কারোকে দিতেন আঁচড়ে বা কামড়ে। তাঁর হাতে পড়ে দাদা জোসেফকেই হতে হত সবচেয়ে বেশি নাকাল। দাদাকে একচোট মেরে-ধরে তিনিই আবার আগে মায়ের কাছে ছুটে গিয়ে করতেন দাদার নামে নালিশ; ফলে জোসেফ বেচারাকে মায়ের হাতেও আর-একদফা লাভ করতে হত উত্তম-মধ্যম।

কিন্তু নেপোলিয়নের প্রকৃতি বন্য হলেও তিনি তাঁর মায়ের একান্ত বশীভূত ছিলেন। এবং সেই ছেলেবয়সে দৃঢ়চরিত্র মায়ের কাছ থেকে যেসব সৎশিক্ষা পেয়েছিলেন তা-ই তাঁর বিচিত্র ও অভাবিত ভবিষ্যৎ জীবনকে গঠন করে তুলেছিল, এ কথা তিনি নিজেই স্বীকার করে গেছেন।

প্রথম থেকেই এই ছোট্ট ছেলেটিকে কর্সিকার সকলেই অসাধারণ বলে মনে করত। তুঙ্গ গিরিশিখর, সুগভীর পার্বত্য খাত বা নির্জন গহন অরণ্য দেখে তিনি একটুও শঙ্কিত হতেন না। দ্বীপের এক প্রান্ত থেকে অন্য পর্যন্ত তাঁর নখদর্পণে।

এবং নিজের জন্মভূমিকে তিনি প্রাণের চেয়ে ভালোবাসতেন। বহুকাল পরে ফ্রান্সের সম্রাট ও ইয়োরোপের সর্বেসর্বা হয়েও তিনি আত্মচরিতে লিখেছিলেন: 'পৃথিবীর সকল জায়গার চেয়ে কর্সিকার যা কিছু সব ভালো— এমনকী তার মাটির গন্ধটুকু পর্যন্ত। আজও চোখ মুদে সে গন্ধ আমি পাই— এমন গন্ধ আর কোথাও নেই। আজও আমি কল্পনায় নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাই সেই সুমধুর শৈশব-দিবসে— সেই খাড়া পর্বতমালার মধ্যে, সেই তুঙ্গ শিখরশ্রেণির উপরে, সেই গভীরতম খাতের অতলে!'

সৈনিক-জীবনের দিকে তাঁর প্রাণের টান ছিল এতটুকু বয়স থেকেই। বাড়ির কাছ দিয়ে যখন ফৌজের সৈনিকরা আসা-যাওয়া করত, তিনি বিপুল আগ্রহে ছুটে তাদের দেখতে যেতেন। তাঁর সবচেয়ে শখের খেলা ছিল পুতুল-সেপাইদের নিয়ে। তিনি যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুরাগী হবেন, সেটাও তাঁর শিশুবয়স থেকেই বোঝা গিয়েছিল। তাঁর আর সব ভাইবোনরা যখন তুচ্ছ খেলাধুলো নিয়ে মেতে থাকত, তখন তিনি একলা বসে ঘরের দেওয়ালে করতেন অঙ্কের রেখাপাত।

নেপোলিয়নের দুষ্টুমির আর-একটি গল্প শোনো।

তাঁর বুড়ি ঠাকুমা যখন বয়সের ভারে ভেঙে দুমড়ে পড়েছেন, তখন নেপোলিয়ন ও তাঁর ছোটোবোন পলিন ঠাকুমাকে ঠাট্টা করে তাঁর চলাফেরার অনুকরণ করতেন। একদিন ঠাকুমা হঠাৎ নাতি-নাতনির কীর্তি দেখে ফেলে তাঁদের মায়ের কাছে নালিশ করে বললেন, 'বউমা, তুমি ছেলে-মেয়েদের মানুষ করতে জানো না, তাদের অসভ্য করে তুলছ! ওরা গুরুজনদের প্রতি সম্মান দেখাতে শেখেনি।'

মা লেটিজিয়া তাঁর এই ডানপিটে ছেলে-মেয়ে দুটিকে যতই ভালোবাসুন, তাদের কোনও অন্যায়কেই ক্ষমা করবার পাত্রী ছিলেন না। পলিনের পিঠে তখনই পড়ল চটাপট চড়চাপড়! কিন্তু চালাক নেপোলিয়ন দূরে দূরে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে লাগলেন, মা কিছুতেই তাঁকে হাতের কাছে পেলেন না। দু-চার দিন গেল। নেপোলিয়ন ভাবলেন, মা ব্যাপারটা ভুলে গিয়েছেন।

তারপর একদিন মা বললেন, 'নেপোলিয়ন, আজ লাটের বাড়িতে তোমার নিমন্ত্রণ। যাও, পোশাক পরে এসো।'

নেপোলিয়ন খুব খুশি হয়ে পোশাক পরবার জন্যে ঘরের ভিতরে গিয়ে ঢুকলেন। খানিক পরেই দেখা গেল, মা সেই ঘরের ভিতর এসে দাঁড়িয়েছেন দরজায় পিঠ রেখে। মায়ের গম্ভীর মুখ দেখেই নেপোলিয়ন বুঝলেন, তিনি ফাঁদে পড়েছেন— পালাবার পথ বন্ধ! তারপর তাঁরা যথাস্থানে পড়ল সপাসপ বেতের ঘা! মা কিছুই ভোলেননি— মনের রাগ মনের মধ্যেই পুষে রেখে দিয়েছিলেন।

কার্লো দেখলেন, তাঁর ছেলে নেপোলিয়নের সৈনিক-জীবনের দিকেই বেশি ঝোঁক। তিনি স্থির করলেন এ ছেলেটিকে সামরিক বিদ্যালয়েই ভরতি করে দেওয়া উচিত। বড়োছেলে জোসেফ নির্বিরোধী ভালোমানুষ, অতএব তাকে পুরুতের কাজেই মানাবে ভালো।

ছেলে দুটিকে নিয়ে কার্লো প্যারি শহরে গিয়ে রাজা লুইয়ের কাছে নিজের আবেদন জানালেন এবং তাঁর আবেদন মঞ্জুরও হল। এই হল নেপোলিয়নের ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি। পিতার তীক্ষ্ন বুদ্ধিই করলে এই ভিত্তি প্রতিষ্ঠা।

সম্ভ্রান্ত বংশজাত বলে নেপোলিয়ন ফরাসি দেশের সম্ভ্রান্তদের ইস্কুলে ঠাঁই পেলেন। কিন্তু তিনি ফরাসি ভাষা জানতেন না। তাই আগে তাঁকে ফরাসি ভাষা শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা হল। তাঁর বয়স তখন এগারোর বেশি নয় (১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দ)।

স্বভাবত মৌন ও নির্জনতাপ্রিয় নেপোলিয়ন ইস্কুল-সংলগ্ন বাগানের একটি প্রান্ত বেড়া দিয়ে ঘিরে নিয়ে সেইখানে বসেই নিজের মনে লেখাপড়া করেন। যে জমিটুকু তিনি ঘিরে নিয়েছিলেন, তার সবটাই তাঁর নিজের নয়। কিন্তু আর কেউ সেই বেড়ার ভিতরে ঢুকলেই আর রক্ষা নেই— নেপোলিয়নের হাতে বেদম মার খেয়ে পালিয়ে আসা ছাড়া তার আর কোনও উপায় ছিল না।

শিক্ষকরা শাস্তির ব্যবস্থা করেও এ বিষয়ে নেপোলিয়নকে রাজি করাতে পারলেন না। 'শিক্ষক হোক, সহপাঠী হোক— আমার বেড়ার ভিতরে সকলেরই প্রবেশ নিষেধ!'

একজন শিক্ষক বললেন, 'ছেলেটি দেখছি গ্রানাইট পাথরে গড়া। এর ভিতরে আছে আগ্নেয়গিরি।'

সে ইস্কুলে পড়ত ফ্রান্সের যতসব উপাধিধারী বড়ো ঘরের ছেলে। তারা গা-টেপাটেপি করে বলাবলি করত, 'এ কোথাকার বিদেশি পাড়াগেঁয়ে ভূত রে! ও কী অদ্ভুত বেঁটে আর ওর নামটাও কী বেয়াড়া! ওর জামাটা কীরকম লম্বা ঝলঝলে দেখেছিস? ছোকরা হাতখরচাও পায় না— অথচ বলতে চায় ও নাকি বনেদি বংশের ছেলে। খুদে দ্বীপ কর্সিকার বনেদি বংশ! ওরে ভাই, বনগাঁয়ের শেয়াল-রাজা!'

কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করত, 'তোমাদের কর্সিকার লোকরা যদি এতই বীর, তাহলে তারা আমাদের ফরাসি সৈন্যদের মারের চোটে নাকাল হয়ে হার মানলে কেন?'

ক্রুদ্ধ নেপোলিয়ন জবাব দিতেন, 'দশজনের বিরুদ্ধে একজন কতদিন দাঁড়াতে পারে? সবুর করো, আমি বড়ো হই, তারপর ফরাসিদের দর্পচূর্ণ করব।'

বালক নেপোলিয়ন দেশে পিতাকে চিঠি লিখে জানালেন, 'আমার দারিদ্র্যের জন্যে জবাবদিহি করতে করতে আমি শ্রান্ত হয়ে পড়েছি। এইসব বিদেশি ছোকরার ঠাট্টা-বিদ্রুপ আমাকে সহ্য করতে হচ্ছে দিনরাত। এদের একমাত্র শ্রেষ্ঠতা হচ্ছে টাকার দেমাকের জন্যে; মনের আভিজাত্যে এরা আমার চেয়ে ঢের নীচে। এই স্বর্ণবাহী গর্দভদের সামনে আর কতকাল আপনি আমাকে মাথা হেঁট করে থাকতে বলেন?'

বালকের মুখে প্রৌঢ়ের উক্তি শুনে পিতা হয়তো বিস্মিত হলেন। কিন্তু উত্তরে লিখলেন: 'আমাদের টাকা নেই, আমরা গরিব। তোমাকে ওখানেই থাকতে হবে।'

নেপোলিয়নকে পাঁচটি বছর ওখানেই থাকতে হল।

কিন্তু তাঁকে নিয়ে তাঁর সহপাঠীরা যতই রঙ্গব্যঙ্গ ও ঘৃণা জাহির করুক, তাঁর সুদূঢ় চরিত্র ও মানসিক শক্তির প্রভাবে তারা সকলেই অভিভূত না হয়ে পারলে না। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই নেপোলিয়ন হতেন দলের সর্দার এবং তারা করত তাঁর হুকুম তামিল। এমনকী, শিক্ষকরা পর্যন্ত তাঁকে বশ মানাতে পারতেন না।

একবার সামান্য কী একটা দোষের জন্যে জনৈক শিক্ষক বললেন, 'বোনাপার্ট, নতজানু হয়ে বোসো। নতজানু হয়েই আজ তোমাকে ডিনার খেতে হবে।'

নেপোলিয়ন উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, 'মাস্টারমশাই, যদি দরকার হয় আমি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ডিনার খাব। কিন্তু আমি নতজানু হব না! কারণ আমাদের পরিবারের কেউ ঈশ্বর ছাড়া আর কারো সামনে নতজানু হয় না।'

শিক্ষক গায়ের জোরে তাঁকে নতজানু করতে গেলেন। বিষম ক্রোধে নেপোলিয়ন চিৎকার করে উঠলেন, তারপর অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়লেন মাটির উপরে। বলা বাহুল্য, এরপরে আর কেউ তাঁকে নতজানু করবার চেষ্টা করলেন না।

নেপোলিয়নের প্রথম যুদ্ধে হাতেখড়ি হয় এইখানেই। যদিও এ যুদ্ধ আসল নয়, নকল। একবার শীতকালে বরফে চারিদিক আচ্ছন্ন। ইস্কুলের ছেলেরা স্থির করলে, বরফ দিয়ে কেল্লা ও গড়খাই প্রভৃতি গড়ে কৃত্রিম যুদ্ধের অনুষ্ঠান করতে হবে। এক পক্ষ করবে কেল্লা রক্ষা, আর-এক পক্ষ করবে আক্রমণ। নেপোলিয়ন কখনো এ দলের, কখনো ও দলের হয়ে লড়তেন; বলা বাহুল্য, নেতা রূপেই। এবং যে দলে তিনি থাকতেন, বরাবরই জয়ী হত সেই দল। কিন্তু এ যুদ্ধক্রীড়া বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কারণ ছেলেরা প্রথম প্রথম বরফের নরম গোলা ছুড়েই খুশি হত, তারপর বরফের গোলার ভিতরে পাথর ভরে দিতে শুরু করলে। মিথ্যা যুদ্ধে ছেলেরা যখন সত্য সত্যই আহত হতে লাগল, বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ তখন এই বিপজ্জনক খেলা বন্ধ করে দিলেন।

একবার মা লেটিজিয়া নেপোলিয়নকে দেখতে এসে চিনতে পারলেন না। ভাবলেন, ভুল করে তাঁর ছেলে বলে অন্য কাউকে ডেকে আনা হয়েছে। কেবল নির্দিষ্ট পাঠের সময়ে নয়, ছুটির সময়েও নেপোলিয়ন লেখাপড়া নিয়ে এমনভাবে নিযুক্ত হয়ে থাকতেন যে, নিজের স্বাস্থ্যের দিকে একেবারেই নজর দিতে পারতেন না। দিনে যা পড়তেন, সারারাত জেগে তা-ই নিয়ে চিন্তা করতেন। ফলে ক্লাসে সর্বদাই তিনি প্রথম হতেন বটে, কিন্তু তাঁর চেহারা হয়ে গিয়েছিল একেবারে শীর্ণ-বিশীর্ণ।

দুই। প্রথম রক্তের স্বাদ

পনেরো কি ষোলো বছর বয়সে নেপোলিয়ন পেলেন দ্বিতীয় লেফটেন্যান্টের পদ। অর্থাৎ সামরিক জীবনের প্রথম ধাপে পা দিয়েই তিনি হলেন একটি ছোটোখাটো কর্তা।

এই পদলাভের জন্যে পরীক্ষায় তিনি সুখ্যাতির সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এবং পরীক্ষকরা তাঁর সম্বন্ধে যে মতপ্রকাশ করেছিলেন তা হচ্ছে এই: 'সংযতবাক, উদ্যমশীল। গল্পগুজবের চেয়ে বই পড়তে ভালোবাসে। নির্জনতাপ্রিয়, উদ্ধত, অত্যন্ত অহংকারী। কথাবার্তা কম কয় বটে, কিন্তু অল্প যে কথা বলে তা খুব চোখা চোখা ও অতিশয় যুক্তিপূর্ণ। যথেষ্ট আত্মানুরাগ ও প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা।'

ভ্যালেন্স শহরে গিয়ে নেপোলিয়ন নিজের পলটনে যোগদান করলেন।

তাঁর ধনী সতীর্থরা এখানে এসে নাচে-গানে ও আমোদ-প্রমোদে কাল কাটাতে লাগল। কিন্তু দারিদ্র্যের জন্যে নেপোলিয়নের পক্ষে তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়া সম্ভবপর ছিল না এবং তিনিও ছিলেন বাজে আমোদ-আহ্লাদের অত্যন্ত বিরোধী।

এখানেও তাঁর প্রধান বন্ধু হল পুস্তক। কোন কোন শ্রেণির বই তিনি পড়তেন? গ্রিস, পারস্য, রোম, চীন, ভারতবর্ষ, মিশর ও প্রাচীন আমেরিকা প্রভৃতি দেশের ইতিহাস ও শাসনপদ্ধতির বিবরণ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, আবহবিদ্যা ও যুদ্ধবিদ্যা। বড়ো বড়ো বীরের জীবনচরিত। শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিকদের রচনা প্রভৃতি।

এ সময়েও ফরাসি জাতির উপরে ছিল তাঁর বিজাতীয় ঘৃণা। কর্সিকাকেই তিনি স্বদেশ মনে করতেন এবং ভালোবাসতেন কেবল কর্সিকাকেই। এবং সর্বদাই ভাবতেন, ফরাসিদের অধীনতা-শৃঙ্খল ছিঁড়ে কেমন করে কর্সিকাকে স্বাধীন করা যায়!

নেপোলিয়ন যখন পড়তে বসতেন, তখন কেতাবের পাতার উপরে কেবল চোখ বুলিয়ে যেতেন না। যা পড়তেন তার ভিতর থেকে দরকারি অংশগুলি 'কপি-বুকে' টুকে রাখতেন। এইসব 'কপি-বুক' সযত্নে ছাপিয়ে রক্ষা করা হয়েছে। তাদের মোট মুদ্রিত পত্রসংখ্যা চারিশত। সর্বশেষ 'কপি-বুক'-এর সর্বশেষে তরুণ যুবক নেপোলিয়ন স্বহস্তে এই কথাগুলি লিখে রেখেছিলেন। 'সেন্ট হেলেনা, আটলান্টিক মহাসাগরের একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ। ইংরেজদের উপনিবেশ।'

নিজের শেষ-জীবনের শোচনীয় পরিণামের নিষ্ঠুর ইঙ্গিত সেই বয়সেই কি নেপোলিয়নের মনে জেগে উঠেছিল? না নেপোলিয়নের অজ্ঞাতসারে, তাঁরই হাত দিয়ে, নিয়তি নিজে লিখে রেখেছিল ওই কথাগুলি?

নেপোলিয়নের উপার্জন এত সামান্য ছিল যে, ভালো করে খাওয়া-পরাও তাঁর ভাগ্যে জুটত না। মনের মধ্যে দুর্দমনীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা— দিবাস্বপ্নে সর্বদাই নিজেকে মনে করেন মানবদের মধ্যে প্রধান এবং এটাও অনুভব করেন যে, সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার শক্তিও তাঁর আছে— অথচ সামনে দেখেন নীরন্ধ্র অন্ধকার! মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে তাঁর আত্মহত্যা করবার ইচ্ছা হয়!

এমনি দুঃসময়ে তাঁর পিতার মৃত্যু হল (১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি ছুটি নিয়ে দেশে গেলেন। এক বৎসর দেশে থেকে আবার যখন কার্যক্ষেত্রে ফিরে এলেন, তখন তাঁর মন আরও ভেঙে পড়েছে। দরিদ্র পরিবার, পোষ্য অনেক— সকলেরই মুখে অভাবের হাহাকার। দাদা জোসেফ বয়সেই বড়ো, নেপোলিয়নকেই কর্তা বলে মনে করেন। অথচ তাঁর মাহিনা এত কম যে, নিজেরই হাতখরচ পোষায় না। আত্মহত্যার ইচ্ছা আবার প্রবল হয়ে ওঠে।

এমনি নিরবচ্ছিন্ন দুঃখ নয় দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে আরও কিছুকাল কেটে যায়। তারপরেই এল ভাগ্য-পরিবর্তনের যুগ! ফ্রান্সে বেজে উঠল বিপ্লবের তূর্য! জনতার কবলে পড়ে ধুলায় গড়াগড়ি দিলে বাস্তিলের দুর্গ-কারাগার, প্যারির রাজপথ দিয়ে রক্তাক্ত অস্ত্র হাতে করে ছুটতে লাগল উন্মত্ত নর-নারী, রাজা ও রানি তখনও বন্দি হলেন না বটে, কিন্তু লুপ্ত হল তাঁদের রাজমর্যাদা!

নেপোলিয়ন ভাবলেন কর্সিকাকে স্বাধীন করবার মস্ত সুযোগ এসেছে। আবার তিনি ছুটি না নিয়েই স্বদেশে গিয়ে হাজির। একদল বিদ্রোহী তাঁর চারিপাশে এসে জড়ো হল। যৌবনের উত্তেজনায় চিন্তাশীল ব্যক্তিও আপনাকে ভুলে যায়। ফ্রান্সের বিপুল রাজশক্তির বিরুদ্ধে একদল বিদ্রোহী যে মাতঙ্গের সামনে পতঙ্গের মতোই তুচ্ছ, নেপোলিয়ন সেটা বোঝবারও চেষ্টা করলেন না। বিদ্রোহীদের সঙ্গে তিনি একটি দুর্গ আক্রমণ করতে গিয়ে খুব সহজেই পরাজিত হলেন।

ফ্রান্সে রাজবিদ্রোহী বলে নেপোলিয়নের নামে অভিযোগ এল। তাঁর চারিদিকে অন্ধকার আরও নিবিড় হয়ে উঠল। এখন তাঁর টাকাও নেই, পদমর্যাদাও নেই। যে-কোনও মুহূর্তে তিনি কারাগারে বন্ধ হতে পারেন। তিনি ফ্রান্সের বিপ্লববাদী রবেসপিয়েরের দলে গিয়ে ভিড়লেন। রাজশক্তির পতন না হলে আর তাঁর রক্ষা নেই।

মাহিনা বন্ধ, পেট চলে না। ঘড়ি বাঁধা পড়ল। গরিব হলেও এতদিন তিনি ধার করেননি, প্রাণ বাঁচাবার জন্যে এইবার তাঁকে ধার করতেও হল।

তারপর রাজশক্তির পতন। রাজা ও রানি বন্দি, ফ্রান্সের হর্তাকর্তাবিধাতা হলেন বিপ্লববাদীরা। সঙ্গে সঙ্গে নেপোলিয়নের পদোন্নতি। তিনি এখন কাপ্তেন।

কিন্তু তখনও ফরাসি ফৌজের জন্যে নেপোলিয়নের এতটুকু মাথাব্যথা ছিল না। ইয়োরোপের রাজরাজড়ারা ফরাসি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছেন, সেজন্যে তিনি বিচলিত হলেন না। ফরাসিরা আমার কে? আমার স্বদেশ কর্সিকা।

কর্সিকাবাসীদের প্রধান নেতা তখন পাওলি। তিনি ফরাসিদের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে ইংরেজদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবার চেষ্টা করলেন। ফরাসি প্রজাতন্ত্রের পক্ষ থেকে কাপ্তেন নেপোলিয়ন গেলেন পাওলিকে বাধা দিতে। কিন্তু রণক্ষেত্রে তাঁর দ্বিতীয় অভিযানও সফল হল না।

কর্সিকার সমস্ত বাসিন্দা নেপোলিয়ন ও তাঁর পরিবারবর্গের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়ে উঠল। স্বদেশে দেশদ্রোহী নাম কিনে মা-ভাই-বোনকে নিয়ে নেপোলিয়নকে পালিয়ে আসতে হল ফ্রান্সে। তাঁর বয়স তখন পঁচিশ বৎসর।

ফরাসিরা তাঁকে ভাবে বিদেশি। কর্সিকার লোকরা তাঁকে ঘৃণা করে ফরাসি বলে। তিনি মনে করেন, আমার স্বদেশ নেই। দুই-দুইবার রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর ভবিষ্যৎ এখনও অন্ধকার।

কেবল তাঁর ভবিষ্যৎ অন্ধকার নয়, ফ্রান্সের ভাগ্যাকাশেও তখন পুঞ্জীভূত হয়ে উঠেছিল অন্ধকার। বেলজিয়ামে ফ্রান্সের প্রভুত্ব বিলুপ্ত; স্প্যানিয়ার্ডরা ফ্রান্সকে আক্রমণ করতে আসছে; রাজতন্ত্রের পক্ষপাতীরা ধীরে ধীরে আবার প্রবল হয়ে উঠছে— এমনকী তারা ফ্রান্সের বিখ্যাত নগর ও বন্দর টুলনকেও ইংরেজ ও স্প্যানিয়ার্ডদের হাতে তুলে দিয়েছে!

প্রজাতন্ত্রের পক্ষ থেকে টুলনকে পুনরুদ্ধার করবার জন্যে প্রথমে একজন শৌখিন সেনাপতিকে নিযুক্ত করা হল— আগে ছিলেন তিনি চিত্রকর। যুদ্ধবিদ্যার কোনোই ধার ধারতেন না, এমন জায়গায় কামান বসান, যার গোলা টুলন শহর পর্যন্ত পৌঁছোয় না।

কাপ্তেন নেপোলিয়ন সেনাপতিকে তাঁর ভুল দেখিয়ে দিলেন এবং এক্ষেত্রে কোন পদ্ধতিতে আক্রমণ করা উচিত, তাও বোঝাবার চেষ্টা করলেন। তবু সেনাপতির টনক নড়ল না।

নেপোলিয়ন প্যারিতে প্রজাতন্ত্রের কর্ণধারদের কাছে অভিযোগ করলেন। তখন ফ্রান্সের উপরে ম্যাক্সিমিলিয়েন রবেসপিয়েরের অবাধ প্রভুত্ব এবং তাঁর ছোটোভাই ছিলেন নেপোলিয়নের বন্ধু। কাজেই নেপোলিয়নের অভিযোগ ব্যর্থ হল না।

নতুন এক সেনাপতি এলেন। ইনিও শৌখিন যোদ্ধা, আগে করতেন ডাক্তারি। এঁকে পেয়েও নেপোলিয়নের সুবিধা হল না। যথাস্থানে আবার অভিযোগ গেল এবং আবার হল সেনাপতি বদল। এবারে যিনি বড়োকর্তা হয়ে এলেন তাঁর নাম দুগোমিয়ার, তিনি হচ্ছেন সত্যিকার যুদ্ধ ব্যবসায়ী। তিনি নেপোলিয়নের যুক্তি শুনে তাঁর গুণ বুঝলেন এবং সায় দিলেন তাঁর মতেই।

কার্যক্ষেত্রে স্বাধীনতা পেয়ে নেপোলিয়ন নিজের ইচ্ছা অনুসারেই কামান সাজাতে লাগলেন এবং সর্বপ্রথমে বন্দি করলেন একজন ইংরেজ জেনারেলকে। সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর পদোন্নতি। তিনি এখন কর্নেল।

নেপোলিয়ন বুঝলেন, এতদিন পরে তাঁর যুদ্ধপ্রতিভার পরিচয় দেওয়ার মস্ত সুযোগ এসেছে। এই সুযোগের সদব্যবহার করতে পারলে ভবিষ্যতের সমস্ত অনিশ্চয়তা দূর হয়ে যাবে। রীতিমতো মাথা খাটিয়ে তিনি আক্রমণের ফন্দি আঁটতে লাগলেন।

টুলন নগর অবরুদ্ধ হয়েও বিশেষ বিপদে পড়েনি— কারণ টুলনের অনতিদূরে সমুদ্রে নোঙর ফেলেছিল ইংরেজ নৌবহর, সেখান থেকে শহরের মধ্যে এসে থানা পেতেছিল ইংরেজ ও স্প্যানিয়ার্ডরা। ফরাসিরা গোলাবৃষ্টি করেও তাদের ক্ষতিসাধন করতে পারেনি।

নেপোলিয়ন বুঝলেন সরাসরি হানা দিয়ে নগর দখল করা সহজ কাজ নয়। তিনি তখন এমন একটি জায়গা বেছে নিলেন, যেখান থেকে ইংরেজ নৌবহরের উপরে সহজেই গোলাবৃষ্টি করা যায়। সাধারণ 'প্ল্যান', কিন্তু তার কার্যকারিতা অসাধারণ। কারণ ইংরেজ নৌবহর স্থল থেকে আক্রান্ত হলে পলায়ন করবেই এবং তাহলেই দুর্গ থেকে কেবল ইংরেজ ও স্প্যানিয়ার্ড সৈন্যদের পলায়নের পথই রুদ্ধ হবে না, বাহির থেকেও দুর্গে সৈন্য সাহায্য এবং রসদ প্রভৃতির জোগান দেওয়ার পথ বন্ধ হবে। তখন নগর দখল করা হবে অত্যন্ত সহজসাধ্য।

আটঘাট বেঁধে নেপোলিয়ন কার্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলেন। তিনি যে জায়গাটি বেছে নিলেন, তা আক্রমণ ও দখল করা হল। তারপর ইংরেজ নৌবহরের উপরে ক্রমাগত পড়তে লাগল ফরাসি কামানের আগুন-রাঙা গোলা!

ব্যাপার দেখে টুলনে অবরুদ্ধ ইংরেজ ও স্প্যানিয়ার্ডদের চক্ষুস্থির আর কী! নগর থেকে বেরোবার পথ বন্ধ হলেই তো সর্বনাশ! ফরাসিরা তারপর কলে-পড়া ইঁদুরের মতন তাঁদের ধরবে আর টিপে মারবে! তাড়াতাড়ি পাততাড়ি গুটিয়ে তাঁরা দিলেন শহর ছেড়ে লম্বা। ইংরেজ জাহাজগুলোও পাল খাটিয়ে সরে পড়তে দেরি করলে না! টুলনের পতন হল! নেপোলিয়ন যা ভেবেছিলেন, তা-ই (১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দ)!

এই যুদ্ধে ইংরেজ-নিক্ষিপ্ত বর্শায় নেপোলিয়ন প্রথম আহত হলেন।

আঘাত গুরুতর নয়। চিরজীবন যুদ্ধক্ষেত্রবাসী হয়েও তিনি কোনওদিন গুরুতর আঘাত পাননি। এরপরে তিনি আর-একবারমাত্র সামান্যভাবে আহত হয়েছিলেন।

ডিসেম্বর মাসের কনকনে রাত্রির হিমেল অন্ধকার, নগর থেকে পলায়নপর ইংরেজ, স্প্যানিয়ার্ড ও ফরাসি রাজপক্ষীয়দের ভীত কোলাহল, চতুর্দিকে রক্তরাঙা মৃতের স্তূপ, আহতদের কাতর আর্তনাদে বিদীর্ণ আকাশ-বাতাস, কামানের পর কামানের গুরু গুরু গর্জন এবং লুণ্ঠনরত বিজয়ী ফরাসিদের ঘন ঘন হুংকার! মৃত্যু, অগ্নিকাণ্ড ও আগ্নেয়াস্ত্রের পুঞ্জ পুঞ্জ ধূম্ররাশির মধ্য দিয়ে ইয়োরোপের ভাগ্যগগনে আজ প্রথম আত্মপ্রকাশ করলে নতুন ও বিচিত্র এক ধূমকেতু!

নেপোলিয়ন যদিও এ যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি ছিলেন না তবু আসল জয়গৌরব তাঁরই প্রাপ্য। সকলের মুখে মুখে ফিরতে লাগল তাঁর নাম। তিনি হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং পেলেন ইতালি অভিযানের গোলন্দাজ সৈন্যদের ভার।

এই সময়ে নেপোলিয়নের যশোগৌরবে আকৃষ্ট হয়ে মার্মন্ট ও জুনট নামে দুজন যুবক সেনানী এসে তাঁর সঙ্গে থাকতে চাইলেন। তিনিও তাদের সাদরে গ্রহণ করলেন সহকারী সেনানী রূপে।

কিন্তু হঠাৎ আবার ভাগ্যচক্রের গতি হল নিম্নমুখী। নেপোলিয়ন এর জন্যে প্রস্তুত ছিলেন না, এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত!

বিপ্লবী নেতা বড়ো রবেসপিয়ের তখন ফ্রান্সের প্রজাতন্ত্রের সর্বেসর্বা ছিলেন। দেশের রাজা, রানি, রাজবংশীয় অধিকাংশের এবং বড়ো বড়ো অভিজাতদের দেহ হয়েছে মুণ্ডহীন। কারণে-অকারণে হাজার হাজার সাধারণ লোকেরও প্রাণদণ্ড হয়েছে। এমন দিন যায় না যেদিন ফ্রান্সের মুণ্ডপাতযন্ত্র বা 'গিলোটিন' অলস হয়ে থাকে। খেতাবি অভিজাতদের হত্যা করে বা দেশ থেকে তাড়িয়ে বিপ্লবীরা সিংহাসন লুপ্ত করে নিজেদের হাতে নিয়েছিল দেশশাসনের ভার। কিন্তু রক্তসাগরে যে প্রজাশক্তির জন্ম বিনা রক্তে সে তৃপ্ত হতে পারেনি। বিপ্লবীদের বড়ো বড়ো কর্তাদেরও সেই রক্তসাগরে ডুবে তলিয়ে যেতে হল। বাকি ছিলেন রবেসপিয়ের, হঠাৎ 'গিলোটিন' তাঁকেও গ্রহণ করলে।

প্রজাতন্ত্রের ভারগ্রহণ করলেন নতুন একদল লোক। রবেসপিয়েরের দলের লোকদের তাঁরা হত্যা বা গ্রেপ্তার বা বিতাড়িত করলেন। নেপোলিয়নও বন্দি হলেন।

তাঁর বয়স তখন পঁচিশ বৎসর মাত্র। সৌভাগ্যের প্রথম আস্বাদ ভালো করে ভোগ করতে-না করতেই তাঁর মাথার উপরে এসে পড়ল কল্পনাতীত দুর্ভাগ্যের বোঝা। তাঁর স্বদেশ নেই। ফ্রান্সও তাঁকে শত্রু বলে মনে করে। আগামী সপ্তাহের যে-কোনওদিন হয়তো সামরিক বিচারের ফলে তাঁকে গুলি করে মেরে ফেলা হবে।

বন্ধুরা বললেন, 'পালিয়ে প্রাণ বাঁচাও। আমরা সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।'

নেপোলিয়ন ঘাড় নেড়ে বললেন, 'না। আমি নির্দোষ। যদি ওরা আমার মৃতদেহ দেখতে চায়, আমি প্রস্তুত। সৈনিক হয়ে মরণকে ভয় করব না।'

পরের সপ্তাহে নেপোলিয়ন পেলেন মুক্তি।

কারণ? ফ্রান্সের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে সারা ইয়োরোপ। ফ্রান্সকে এখন আত্মরক্ষা করতে হবে রণক্ষেত্রে গিয়ে কিন্তু ফরাসি ফৌজে নেপোলিয়নের মতন ভালো সেনাপতির অভাব। অতএব তাঁর বাঁচা দরকার!

নিরবচ্ছিন্ন সৌভাগ্যকে নেপোলিয়ন কখনো লাভ করেননি। চিরজীবনই পরম সৌভাগ্যের সময়ে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে চরম দুর্ভাগ্য!

তিন। ফ্রান্সের সন্তান

কেবল ইংরেজ ও স্প্যানিয়ার্ডদের সঙ্গে নয়, জার্মান ও অস্ট্রিয়ানদেরও সঙ্গে ফ্রান্সের বিবাদ চলছে।

কিছুকাল কর্মচ্যুত হয়ে অলস জীবনযাপন করবার পর নেপোলিয়ন হঠাৎ একদিন শাসনসভা থেকে আহ্বানপত্র পেলেন।

ব্যাপারটা হচ্ছে এই। একবার রক্তের স্বাদ পেলে বাঘ তা কখনো ভোলে না। জনসাধারণ আবার খেপে উঠেছে— তারা রক্ত চায়! শাসনসভার মাতব্বররা ভীত হয়ে ডাক দিলেন নেপোলিয়নকে।

নেপোলিয়ন বললেন, 'আমি রাজি। কিন্তু আমাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে।'

মাতব্বররা বললেন, 'তুমি যা খুশি করো।'

আজ সাত বছর ধরে ফ্রান্সের জনসাধারণ যখনই বিদ্রোহী হয়েছে, কর্তৃপক্ষ তাদের উচিতমতো বাধা দিতে পারেননি। বরং তাদের মন রাখবার চেষ্টা করেছেন। আশকারা পেয়ে পেয়ে তাদের সাহস বেড়ে উঠেছে।

নেপোলিয়ন তাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্যে ব্যবস্থা করতে লাগলেন। রাতারাতি শাসনসভা হয়ে উঠল রীতিমতো কেল্লার মতো। ভীত সভ্যরা তার ভিতরে এসে আশ্রয় নিলেন— নেপোলিয়ন তাঁদেরও হাতে দিলেন অস্ত্র।

তিনি বললেন, 'এইবারে কয়েকটা কামান চাই।'

সভ্যরা চমকে অধিকতর ভীত হয়ে ভাবলেন— ওরে বাবা, কামান? ব্যাপারটা কি এতই সাংঘাতিক হয়ে উঠবে?

মুরাট হচ্ছেন একজন যুবক, গোলন্দাজ সেনানী। তিনি নগরপ্রান্ত থেকে চল্লিশটা বড়ো বড়ো কামান টেনে নিয়ে এলেন। আজ থেকে নেপোলিয়নের ভাগ্যসূত্রের সঙ্গে তাঁরও ভাগ্য গ্রথিত হল।

জনসাধারণ হরেকরকম অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বিকট চিৎকার করতে করতে এগিয়ে আসছে। তাদের গর্জনরব ভেসে এল শাসনসভার মধ্যে। সভ্যরা ঠকঠক করে কেঁপে সারা!

অনেকেই বললেন, দরকার নেই বাপু এত দাঙ্গাহাঙ্গামায়! কী হতে কী হয় বলা তো যায় না। ওদের সঙ্গে একটা মিটমাট করে ফেলাই ভালো!

নেপোলিয়ন কিন্তু অটল। জনসাধারণকে তিনি আজ এমন শিক্ষা দিতে চান, যেন তারা ভবিষ্যতে আর কোনওদিন আবদার করতে না আসে!

ব্যূহবদ্ধ শিক্ষিত সৈনিকদের আক্রমণ করা যে কতখানি মারাত্মক ব্যাপার, নির্বোধ জনতা তা বুঝলে না। তারা বন্দুক ছুড়তে আরম্ভ করলে।

নেপোলিয়ন হুকুম দিলেন, 'কামান দাগো!'

দেখতে দেখতে প্যারিসের রাজপথ দিয়ে বইতে লাগল রক্তের ঢেউ! দুই ঘণ্টার মধ্যে পথ সাফ! বিপুল জনতা দারুণ ভয়ে অদৃশ্য হল, পিছনে হতাহতকে ফেলে। সৈনিকদের মধ্যে মারা পড়ল তিরিশজন, আহত হল ষাটজন।

শাসনসভার সদস্যরা 'রক্ষাকর্তা' বলে নেপোলিয়নকে দুই হাত বাড়িয়ে অভ্যর্থনা করলেন।

জনসাধারণের কাছে তিনি এখন ঘৃণ্য। কিন্তু তাদের ঘৃণা তিনি গ্রাহ্যও করেন না। তিনি আজ ফ্রান্সের মধ্যে প্রধান সেনাপতিরূপে নির্বাচিত হয়েছেন। যশ, মান, অর্থ, শক্তি— সবই আজ তাঁর! দুর্বলের ঘৃণা নগণ্য!

তাঁর ভাইরা ও আত্মীয়রা বড়ো বড়ো কাজে নিযুক্ত হলেন। এতদিন পরে মা লেটিজিয়ার আর কোনও অভাব রইল না।

দাদা জোসেফ ইতিমধ্যে বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। নেপোলিয়নও তাঁর দাদার শালি দেসিরিকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর প্রার্থনা নামঞ্জুর হয়। দেসিরি তখন বুঝতে পারেনি, নেপোলিয়নকে প্রত্যাখ্যান করে সে অর্ধ ইয়োরোপের সিংহাসন থেকে বঞ্চিত হল! যদিও পরে নেপোলিয়নেরই অনুগ্রহে সে হয়েছিল সুইডেনের মহারানি। কিন্তু তারপরেও সে স্বামীর সঙ্গে দাঁড়িয়েছিল নেপোলিয়নেরই বিরুদ্ধে।

ভাই কাউন্ট বাহার্নেস এখন মৃত, তাঁর বিধবা জোসেফাইন এক ছেলে, এক মেয়ের মা। তিনি খেতাবওয়ালা বড়ো ঘরের বউ, শাসনসভার বড়ো কর্তারাও তাঁকে খাতির করে চলেন।

নিজের সৌভাগ্য সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হয়ে নেপোলিয়ন স্থির করলেন, এইবারে সংসার পাতবেন।

কিন্তু মনের মতন বউ কই? দেসিরি? হ্যাঁ, সে হয়তো এখন জেনারেল নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে বিয়ে করতে রাজি হবে, কিন্তু এখন তাঁর সে পদমর্যাদা হয়েছে, অমন সাধারণ গৃহস্থ ঘরের মেয়ে আনলে তো চলবে না!

তখন নেপোলিয়নের দৃষ্টি পড়ল জোসেফাইনের দিকে। যদিও তিনি বয়সে নেপোলিয়নের চেয়ে বড়ো, তবু তাঁর উপাধি আছে এবং রূপেরও অভাব নেই।

নেপোলিয়নের সঙ্গে জোসেফাইনের বিবাহ হয়ে গেল (১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দ)। বিয়ের আংটির উপরে এই কথাটি খোদাই ছিল— 'অদৃষ্ট-পথে'। তাঁদের অদৃষ্ট-পথ কোথায় গিয়ে শেষ হবে, সেদিন কেউ তাঁরা দেখতে পাননি!

বিবাহের দুই দিন পরে নেপোলিয়ন ইতালির দিকে যাত্রা করলেন।

ইতালির উপরে তখন অস্ট্রিয়ানদের প্রভুত্ব এবং অস্ট্রিয়ানদের সঙ্গে বেধেছে ফরাসিদের লড়াই। নেপোলিয়ন গেলেন প্রধান সেনাপতি রূপে।

তখন সেনাপতি মোরো ও জোর্দান যথাক্রমে সত্তর ও আশি হাজার সৈন্য নিয়ে জার্মানিকে আক্রমণ করতে গিয়েছেন। নেপোলিয়ন পেলেন মাত্র আটত্রিশ হাজার সৈন্যের ভার।

নেপোলিয়নের বয়স তখন সাতাশ বৎসর। এবং আজ থেকে তিনি নিজেকে ফ্রান্সের সন্তান বলে মনে করতে লাগলেন।

চার। দিগবিজয়ের পথে

সৈন্যদলকে সম্বোধন করে নেপোলিয়ন প্রথমেই উদ্দীপনাপূর্ণ ভাষায় এই বক্তৃতা দিলেন:

সৈন্যগণ,

অর্ধনগ্ন হয়ে তোমরা অর্ধাহারে আছ। গভর্নমেন্ট তোমাদের অনেক দোষ দিচ্ছেন, কিন্তু তোমাদের জন্যে কিছু করতে অক্ষম। ধৈর্য ও সাহস তোমাদের মান বাড়িয়েছে বটে, কিন্তু দিতে পারছে না তোমাদের কোনও পুরস্কার, কোনও গৌরব। আমি তোমাদের নিয়ে যাব পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সুজল সুফল শস্যশ্যামল ক্ষেত্রে। সেখানে গেলে দেখতে পাবে তোমরা শ্রীসম্পন্ন নগরের পর নগর, জনবহুল ও ধন-ধান্যে পরিপূর্ণ প্রদেশের পর প্রদেশ। সেখানে গেলে তোমরা লাভ করবে মান, যশ ও ঐশ্বর্য। ইতালি যাত্রী সৈন্যগণ, তোমাদের কি সাহস ও দৃঢ়তার অভাব হবে?

কোনও সেনাপতির মুখে সৈন্যরা এরকম আশ্চর্য ভাষা শোনেনি। তারা উৎসাহিত হয়ে তাঁর নামে জয়ধ্বনি দিলে।

কিন্তু আসলে উৎসাহিত হওয়ার বিশেষ কিছুই ছিল না। শত্রুদের সৈন্যসংখ্যা ষাট হাজার, ফরাসিদের সংখ্যা মাত্র আটত্রিশ হাজার। নেপোলিয়নের সংগতির মধ্যে চব্বিশটি শৈল-কামান, চার হাজার অল্পভোজনে কৃশ ঘোড়া, তিন লক্ষ রৌপ্যমুদ্রা এবং সৈন্যদের জন্যে পনেরো দিনের পূর্ণাহার! এই নিয়ে তিনি চলেছেন মহাশক্তিমান অস্ট্রিয়ার সম্রাট ও সার্দিনিয়ার রাজাকে হারিয়ে ইতালি দখল করতে। ফ্রান্সের শাসনসভার ডিরেক্টররা তাঁকে অসাধ্য সাধন করতে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তিনি দমলেন না, অসাধ্যসাধন করাই প্রতিভার ধর্ম।

আজ আমরা ইতালির যে রূপ দেখছি তখন তার কিছুই ছিল না। সমগ্র ইতালি তখন খণ্ড খণ্ড রাজ্যে বিভক্ত ছিল; তার কোনও দেশ পোপের দখলে, কোনও দেশে প্রভুত্ব করেন সার্দিনিয়ার রাজা, কোনও দেশ ছিল অস্ট্রিয়ার অধীন এবং কোনও দেশ বুৰ্বো বা ফ্রান্সের সিংহাসনচ্যুত রাজার আত্মীয়রা শাসন করেন। ইংরেজ নৌবীর নেলসন তাই বলেছিলেন: 'ইতালি হচ্ছে সোনার খনি। একবার এ দেশে ঢুকতে পারলে কেউ বাধা দিতে পারবে না।' নেলসন এই সোনার খনিতে ছোঁ মারবার চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু ফরাসিদের কাছে হেরে পালিয়ে যান।

নেপোলিয়ন দ্রুতগতিতে ইতালির উপরে গিয়ে পড়লেন। আত্মশক্তির উপরে তাঁর অটল বিশ্বাস। তিনি জানতেন কেউ তাঁকে হারাতে পারবে না— প্রবল যৌবন ও অটুট স্বাস্থ্য তাঁর সহায়। দিনরাত ঘোড়ায় চড়ে থেকেও তাঁর শ্রান্তি আসে না। যে-কোনও মুহূর্তে তিনি পারেন ঘুমোতে ও জাগতে (বড়ো বড়ো রণক্ষেত্রে যখন বিষম লড়াই চলছে, শ্রান্ত নেপোলিয়ন তারই মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তে পারতেন)! এবং যে-কোনও তুচ্ছ খাবারও তাঁর পক্ষে যথেষ্ট। তাঁর তীক্ষ্ন দৃষ্টি কোনও কিছুই দেখতে ভোলে না। ফৌজের সর্বত্রই তিনি সশরীরে আবির্ভূত হন।

নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যেসব সেনাপতি দাঁড়ালেন, তাঁর সঙ্গে তাঁদের তুলনাই হয় না। অস্ট্রিয়ার রাজবংশীয় আর্কডিউক চার্লস— অভিজ্ঞতায় ও সহ্যক্ষমতায় কেমন করে তিনি নেপোলিয়নদের উপরে যাবেন? বিউলিউ— সত্তর বছর তাঁর বয়স। জেনারেল কোল্যি— বাতে পঙ্গু, কেউ তাঁকে বহন করে নিয়ে না গেলে তিনি চলতেই পারেন না! আলভিনটজি ও সার্দিনিয়ার রাজাও বুড়ো। জেনারেল উর্মজারও তা-ই, তার উপরে কালাও দীর্ঘসূত্রী।

নেপোলিয়ন যখন প্রধান হয়ে এলেন, ফৌজের মধ্যে তখন মেসেনা, অগেরু, লাহার্প, সেরুরিয়ার ও বার্দিয়ার প্রভৃতি প্রবীণ ও বিখ্যাত সেনাপতি ছিলেন। তাঁরা এই অতি-খুদে, ছোকরা ও রণক্ষেত্রে নবাগত কর্তাটিকে ভালো চোখে দেখলেন না, কারণ তাঁরা নেপোলিয়নের চেয়ে অনেক বড়ো বড়ো যুদ্ধ জয় করেছেন।

নেপোলিয়ন তাঁদের পরামর্শসভায় আহ্বান করলেন। তারপর তাঁদের কাছে প্রকাশ করলেন, কোন কৌশলে তিনি শত্রুদের আক্রমণ করতে চান।

নবীন সেনাপতির 'প্ল্যান' অপূর্ব! রণপ্রবীণ সেনানীরা বিস্ময়চকিত। পরামর্শসভা থেকে বেরিয়ে অগেরুকে ডেকে মেসেনা বললেন, 'এতদিন পরে আমাদের গুরুর দেখা পেলুম!'

মিত্রপক্ষের প্রাচীন সেনাপতি বিউলিউ সার্দিনিয়ার রাজাকে বললেন, 'এই আমি যুদ্ধে চললুম। ফরাসিদের এইবার দেখে নেব। রাজা, আমি প্রতিজ্ঞা করছি, শত্রুদের একেবারে ফ্রান্স পর্যন্ত তাড়িয়ে না দিয়ে আমি পায়ের জুতো খুলব না!'

ষাট হাজার শত্রুর বিরুদ্ধে আটত্রিশ হাজার ফরাসি সৈন্য!

তবু নেপোলিয়ন বললেন, 'শত্রুদের আগে আক্রমণ করব আমিই!'

তাঁর মূলমন্ত্র: সময় ও দ্রুতগতিই হচ্ছে সব!

শত্রুদের সব দল এক জায়গায় এসে মিলেমিশে বলবান ও সাবধান হওয়ার আগেই একে একে তাদের আক্রমণ ও পরাস্ত করো!

তিন জায়গায় তিনজন শত্রু-সেনাপতি ফৌজ নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছিলেন।

নেপোলিয়ন তাঁদের এক জায়গায় মিলতে দিলেন না। প্রথমে ঝড়ের বেগে আল্পস পর্বত প্রদক্ষিণ করে মন্টিনোট নামক স্থানে গিয়ে মধ্যবর্তী শত্রু-ফৌজের উপরে পড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিলেন। তারপরেই তিনি টিউরিন নগরে সার্দিনিয়ার রাজার কাছে গিয়ে হাজির! সার্দিনিয়ার ভীত হতভম্ব রাজা নেপোলিয়নের হাতে কেল্লা ছেড়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি তাঁর সঙ্গে সন্ধি করে ফেললেন। তারপর অস্ট্রিয়ান সেনাপতি বিউলিউয়ের পালা।

বিউলিউ তখন সমস্ত সৈন্য নিয়ে মিলান শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন্তু লোদি সেতুর কাছে নেপোলিয়ন এমন অদ্ভুত কৌশলে তাঁকে আক্রমণ করলেন যে তিনি পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেন মান্টুয়া নগরে। এই লোদি-সেতুর যুদ্ধ আজও বিখ্যাত হয়ে আছে। তারপর নেপোলিয়ন ব্রেসকিয়া, লেগহর্ন ও বোলোগ্না প্রভৃতি দখল করে বসলেন।

ওদিকে জার্মানিতে ফরাসি সেনাপতি জোর্দান, অস্ট্রিয়ার রাজকুমার আর্কডিউক চার্লসের কাছে হেরে পালিয়ে গেলেন। চার্লস তখন হাত খালি পেয়ে তাড়াতাড়ি মান্টুয়া নগরে অবরুদ্ধ বিউলিউকে সাহায্য করবার জন্যে অগ্রসর হলেন। শুনেই নেপোলিয়ন নিজের কতক সৈন্য নিয়ে আর্কোলা ও রাইভলি ক্ষেত্রের দুই যুদ্ধে আর্কডিউককে শোচনীয় রূপে হারিয়ে দিলেন। মান্টুয়ার পতন হল। পোপ তাড়াতাড়ি নেপোলিয়নের সঙ্গে সন্ধি করে তাঁর হাতে বোলোগ্না ও ফেরারা দেশ ছেড়ে দিলেন। সমস্ত উত্তর ইতালি হল নেপোলিয়নের হস্তগত!

নেপোলিয়নের এই আশ্চর্য সাফল্যের মূলে ছিল তাঁর বিদ্যুৎ-গতি! অস্ট্রিয়ার একজন সেনানী বন্দি হয়ে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, 'নেপোলিয়নকে কখনো দেখি আমাদের পিছনে, কখনো পাশে, আবার হঠাৎ কখনো সামনের দিকে! আরে ছোঃ, লোকটা যুদ্ধরীতির কিছুই জানে না!'

ফ্রান্সের শাসনসভার ডিরেক্টররা লিখে পাঠালেন, সার্দিনিয়ার রাজার সঙ্গে কোন শর্তে সন্ধি করতে হবে।

নেপোলিয়নের কাছ থেকে জবাব এল: 'আপনাদের সন্ধি-শর্ত আমার হস্তগত হয়েছে। সেনাদল তা মঞ্জুর করেছে।'

নেপোলিয়ন হচ্ছেন শাসনসভার দ্বারা নিযুক্ত ভৃত্যমাত্র। তাঁর মুখে এমন গর্বিত উক্তি শুনে ডিরেক্টররা বিস্মিত হলেন। কেউ কেউ বললেন, এমন উদ্ধত উক্তির জন্যে তাঁর প্রাণদণ্ড হওয়া উচিত।

কিন্তু তিনি এখন সমস্ত ফ্রান্সের আদরের দুলাল— বিজয়ী ফ্রান্সের জনসাধারণ আজ নেপোলিয়নের পক্ষে। তাঁকে শাস্তি দেওয়ার সাধ্য কারো নেই। বুদ্ধিমান নেপোলিয়নও তা জানতেন।

ডিরেক্টররা তখন নেপোলিয়নকে বাগে রাখবার জন্যে ভিন্ন উপায় অবলম্বন করলেন। তাঁর যশের উপরে ভাগ বসাবার জন্যে জেনারেল কেলারম্যানকে তাঁর সহযোগী রূপে পাঠানো হল।

নেপোলিয়ন এ চালাকি বুঝতে পারলেন। ক্রুদ্ধ হয়ে বলে পাঠালেন, 'না!'

ডিরেক্টররা আরও ভয় পেয়ে গেলেন। ভাবলেন, সৈন্যরা হচ্ছে নেপোলিয়নের পক্ষে। তিনি যদি খেপে গিয়ে বিদ্রোহী হয়ে ফ্রান্সে ছুটে আসেন, তখন তাঁকে ঠেকাবে কে? কাজ নেই বাপু, লোকটাকে ঘাঁটিয়ে! তাঁরা তাড়াতাড়ি নিজেদের প্রস্তাব প্রত্যাহার করলেন!

এদিকে বিজিত উত্তর ইতালি থেকে নেপোলিয়ন কোটি কোটি টাকা ও অন্যান্য অসংখ্য ঐশ্বর্য ভারে ভারে স্বদেশে পাঠাতে ত্রুটি করলেন না। বিদ্রোহ ও ধারাবাহিক যুদ্ধের ফলে ফ্রান্সের অর্থভাণ্ডার একেবারে খালি হয়ে গিয়েছিল। ঐশ্বর্যের স্তূপ দেখে ডিরেক্টরদেরও মুখ বন্ধ হল। নেপোলিয়ন আরও সৈন্য চেয়ে পাঠালেন। আরও বেশি লাভের আশায় ডিরেক্টররাও তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন।

ডিরেক্টরদের মতামতের অপেক্ষা না রেখেই নেপোলিয়ন নিজের ইচ্ছানুসারে অস্ট্রিয়ার দিকে অগ্রসর হলেন। আর্কডিউক চার্লস আবার তাঁকে বাধা দিতে এলেন, কিন্তু আবার তিনি হলেন পরাজিত। তারপর নেপোলিয়ন যখন অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার অনতিদূরে এসে পড়েছেন, তখন ভীত সম্রাটের দূত নিয়ে এল সন্ধির প্রস্তাব।

নেপোলিয়নের নিজের শর্তানুসারেই সন্ধি হল। অস্ট্রিয়া বাধ্য হয়ে হল্যান্ড, মিলান ও আংশিকভাবে ভেনিস ছেড়ে দিলে ফ্রান্সের হাতে। অস্ট্রিয়ার সঙ্গে ছয় বৎসরব্যাপী যুদ্ধ শেষ হল (১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দ)।

ইতিমধ্যে নেপোলিয়নের জীবনের আর-এক বাসনা সফল হয়েছে। ইতালির উপরে তাঁর প্রভুত্ব দেখে ভীত হয়ে অদূরবর্তী কর্সিকা থেকে ইংরেজরা নিজেদের দেশে সরে পড়ল।

বিজয়ী বীর নেপোলিয়ন স্বদেশে ফিরে এলেন অপূর্ব গৌরবের মুকুট পরে। বিপ্লবের পর ফ্রান্স নেমে গিয়েছিল অধঃপতনের অন্ধকারে, চারিদিক থেকে আক্রমণ করে বিদেশি শত্রুরা তার অস্তিত্ব প্রায় লোপ করতে বসেছিল, নেপোলিয়নের অসাধারণ যুদ্ধপ্রতিভার মহিমায় আজ সে আবার হয়েছে ইয়োরোপের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ! তার শত্রুরা পলাতক, পরাজিত! যারা এখনও তার মিত্র নয়, নির্বিষ সর্পের মতন তারাও আজ নত করেছে মাথা!

সমস্ত ফরাসি জাতি বিপুল আনন্দে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে! পুষ্পে পত্রে পতাকায় দীপমালায় রাজধানী সুসজ্জিত করে বিজয়ী বীরকে তারা অভিনন্দন দান করলে।

এ সময়ে নেপোলিয়নের মনে কোন ভাবের উদয় হচ্ছিল, আমরা হয়তো সেটা কল্পনা করতে পারি। ইতালির যুদ্ধক্ষেত্রেই যে নেপোলিয়নের মনের ভিতরে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার একটা ইঙ্গিত জাগ্রত হয়েছিল, তাঁর নিজের মুখেই সে কথা প্রকাশ পেয়েছে।

লোদি-সেতুর যুদ্ধের পর নেপোলিয়ন তাঁরা বন্ধু মার্মন্টকে বলেছিলেন: 'আমি অনুভব করছি, আমার জন্যে এমন সব কীর্তি অপেক্ষা করছে, বর্তমানকালের লোকেরা যার কোনও ইঙ্গিতই পায়নি।'

বহুকাল পরে নিজের জীবনস্মৃতির প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন: 'লোদি-সেতুর যুদ্ধের পরে সেই সন্ধ্যায় সর্বপ্রথমে জানতে পেরেছিলুম যে, আমি হচ্ছি একজন অসাধারণ মানুষ! সেইদিন থেকেই অপূর্ব সব কীর্তিকলাপের জন্যে আমার মনে জাগ্রত হয়ে উঠেছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষা! তার আগে সেসব ছিল আমার স্বপ্নজগতের উদ্ভট কল্পনা।'

আজ লোদি-সেতুর যুদ্ধের পরে খ্যাতির পথে তিনি আরও অনেক দূর অগ্রসর হয়েছেন এবং নিজের প্রতিভা ও বিপুল শক্তির সম্বন্ধে তাঁর মনে আর কোনোই সন্দেহ নেই। আজ নেপোলিয়ন নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেছেন যে ইচ্ছা করলে অনায়াসেই তিনি হতে পারেন দেশের সর্বেসর্বা!

কিন্তু জনসাধারণের কাছে দেবতার মতন পূজা পেয়েও নেপোলিয়ন তেমন কোনও ইচ্ছা প্রকাশ করলেন না। এখনও সময় হয়নি— মাহেন্দ্রক্ষণ আসেনি। তিনি বুদ্ধিমানের মতন অতি বিনীতভাবে জনসাধারণের অভিনন্দন গ্রহণ করলেন!

ফরাসি জাতি বুঝেছিল, নেপোলিয়নই হচ্ছেন এখন দেশের মাথা! তাঁর চেষ্টাতেই আজ ফরাসি রাজ্য পরিণত হয়েছে সাম্রাজ্যে। পুরাতন শত্রু অস্ট্রিয়া লাঞ্ছিত ও পরাজিত। স্পেন আজ ফরাসিদের হাতে কলের পুতুলমাত্র। একমাত্র শত্রু হচ্ছে ইংল্যান্ড— কিন্তু সে-ও হয়েছে অসহায় ও কোণঠাসা।

নেপোলিয়নের মাথার ভিতরে ঘুরছে তখন কতরকম আকাশ-ছোঁয়া কল্পনা। কিন্তু সেসব কল্পনা কার্যে পরিণত করবার আগে তিনি স্থির করলেন, সর্বপ্রথমে ফরাসিদের মহাশত্রু ইংল্যান্ডের বিষদাঁত ভাঙতে হবে। ভারত-সাম্রাজ্য নিয়েই ইংরেজদের যত জারিজুরি ও বড়ো মানুষি। ইংল্যান্ডের হাত ছিনিয়ে ভারতবর্ষ কেড়ে নিলে কেমন হয়? ভালোই হয়, কিন্তু ওদিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে আগে দখল করতে হবে মিশর ও সিরিয়া।

এদিকে ডিরেক্টররা নেপোলিয়নের অতিবাড় দেখে ভয়ে সারা হচ্ছেন। নেপোলিয়ন এখন খালি সামরিক ব্যাপারে নয়, রাজনৈতিক ব্যাপারেও হাত দিতে আরম্ভ করেছেন! অথচ তাঁকে আর কর্মচ্যুত করবারও উপায় নেই, কারণ নামে ভৃত্য হয়েও আসলে তিনি এখন প্রভুর মতো। তাঁকে অপদস্থ বা নির্বাসিত করতে গেলে সমস্ত ফরাসি জাতি মারমুখো হয়ে উঠবে! নেপোলিয়নকে নিয়ে কী করা যায়— কী করা যায়?

ঠিক এই সময়ে নেপোলিয়ন নিজেই প্রস্তাব করে বসলেন, 'আমি মিশর অধিকার করতে যাব।'

ডিরেক্টররা হাতে যেন স্বর্গ পেলেন! মিশর হচ্ছে বহু দূরে। দেশ থেকে নেপোলিয়ন যত দূরে থাকেন ততই ভালো। তারপর মিশরের রণক্ষেত্রেই হতে পারে নেপোলিয়নের সমাধি। সেটা হচ্ছে আরও ভালো!

ডিরেক্টররা রাজি হয়ে গেলেন সাগ্রহে। তাঁদের অতি আগ্রহ দেখে নেপোলিয়ন মনে মনে হেসেছিলেন কি না জানি না।

পাঁচ। সিংহাসনের ছায়ায়

খুব গোপনে চারশোখানা ছোটো-বড়ো-মাঝারি জাহাজ সাজিয়ে নেপোলিয়ন যাত্রা করলেন সমুদ্রপথে। জাহাজে আছে আটত্রিশ হাজার সৈন্য।

এবং জাহাজে আছেন একদল মহাপণ্ডিত। তাঁদের কেউ কেউ বৈজ্ঞানিক, কেউ দার্শনিক, কেউ প্রত্নতাত্ত্বিক, কেউ রাসায়নিক, কেউ জ্যোতির্বিদ, কেউ জ্যামিতিবিদ বা চিত্রকর বা কবি বা স্থাপত্যবিদ প্রভৃতি। মোটা একশো পঁচাত্তরজন। সৈনিকরা অবহেলাভরে এদের ডাকাত 'গাধার দল' বলে।

সৈন্যরা লড়াই করবে আর পণ্ডিতরা করবেন প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার অনুসন্ধান ও অনুশীলন।... এই অনুসন্ধানের ফলেই আজকের বিশ্ববিখ্যাত রোসেটা শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং সকলেই জানেন, এই অমূল্য শিলালিপিখানি পাওয়া গেছে বলেই আজ আমরা প্রাচীন মিশরের সভ্যতা, সাহিত্য, সমাজ ও ধর্ম সম্বন্ধে সমস্ত তথ্যই পুনরুদ্ধার করতে পেরেছি।

এইখানেই নেপোলিয়নের মহামানবতা। তিনি কাঠগোঁয়ার এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতিহীন দিগবিজয়ী ছিলেন না। রাজনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষা, সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞান— প্রত্যেক বিভাগেই তিনি তাঁর অসাধারণ মস্তিষ্কের পরিচয় রেখে গিয়েছেন।

ইংরেজরা খবর পেলেন, নেপোলিয়ন মস্ত একদল সৈন্য ও অনেক জাহাজ নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন ভূমধ্যসাগরের কোথায়। তাঁরা বিস্মিত হলেন, ভয় পেলেন। নৌসেনাপতি নেলসন নৌবহর নিয়ে তখনই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু কোথাও নেপোলিয়নকে পাওয়া গেল না।

নেলসন হতাশভাবে বললেন, 'শয়তান লাভ করেছে শয়তানের সৌভাগ্য!'

ইতিমধ্যে নেপোলিয়ন খুব সহজে মাল্টা দ্বীপ দখল করে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া শহরে গিয়ে জাহাজ থেকে নেমে পড়েছেন।

...উত্তপ্ত, আরক্ত মরুজগৎ! হু হু বাতাস আগুন-পাগল ধু ধু মরুভূমির উপর দিয়ে ছোট চারিদিকে গরম বালি ছড়াতে ছড়াতে। মূর্তিমান অতীতের মতন গগনস্পর্শীর পিরামিড অটল মহিমায় তাকিয়ে থাকে বর্তমান শূন্যতার দিকে; স্ফিংক্স বা নরসিংহী আকাশে মাথা তুলে চিরস্তব্ধ মুখে গম্ভীরভাবে দেখে বহু যুগের ভুলে-যাওয়া স্বপ্ন। শতাব্দীর পর শতাব্দীর পুঞ্জ পুঞ্জ ধুলা ঝরে পড়েছে তাদের পাষাণ পদতলে— তারা ভ্রূক্ষেপ করেনি, ফিরে তাকায়নি!

ঘোড়ার খুরে খুরে বালির মেঘ সৃষ্টি করে মিশরের ম্যামেলিউক সওয়াররা দলে দলে ধেয়ে আসছে ফরাসিদের আক্রমণ করবার জন্যে।

সেনাদলের সামনে ঘোড়ার পিঠে বসে পিরামিডের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে নেপোলিয়ন বললেন, 'সৈন্যগণ, চল্লিশ শতাব্দী তোমাদের পানে তাকিয়ে আছে চোখ নামিয়ে।'

যুদ্ধে ম্যামেলিউকরা পরাজিত হয়ে পালিয়ে গেল। নেপোলিয়ন কায়রো শহর দখল করলেন (১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে)।

কিন্তু আবার সৌভাগ্যের সঙ্গে সঙ্গে এল দুর্ভাগ্য। নেলসন খুঁজতে খুঁজতে আবুকির উপসাগরে এসে ফরাসি নৌবহরকে আবিষ্কার করে ফেলেছেন। জলযুদ্ধে ফরাসিদের চারখানা ছাড়া সমস্ত জাহাজ ডুবে গেল (১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে)।

যদিও এই শোচনীয় পরাজয়ের জন্যে নেপোলিয়নকে কেউ দায়ী করবে না, তবু খবর শুনে তাঁর মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল।

কিন্তু তারপরেই নিজেকে সামলে নিয়ে সবাইকে তিনি বললেন, 'দেখছি দেশে ফেরবার বা সেখান থেকে সাহায্য পাওয়ার পথ বন্ধ হল। উত্তম! আমাদের মাথা তুলে রাখতে হবে ঝড়-দোলানো জলের উপরে; ভয় নেই, সমুদ্র আবার হবে প্রশান্ত! প্রাচ্যের রূপ বদলে দেব আমরা— এই হয়তো বিধাতার বিধান! এইখানেই আমাদের থাকতে হবে, তারপর অতীতের বীরপুরুষদের মতন আমরাও হয়ে উঠব মহিমময়!'

তাঁর দৃষ্টি ছুটল ভারতবর্ষের দিকে। সেখানে তরবারি আস্ফালন করছেন ইংরেজদের মহাশত্রু টিপু সুলতান। তাঁর সঙ্গে চলতে লাগল নেপোলিয়নের কথাবার্তা। পারস্যের শায়ের সঙ্গেও ষড়যন্ত্র হতে লাগল। নেপোলিয়ন বললেন, 'এখানে যদি কেবল পনেরো হাজার সৈন্য রেখে যেতে পারি, আর আমি যদি তিরিশ হাজার সৈন্য পাই, তাহলে ভারতবর্ষে যাত্রা করা অসম্ভব হবে না।'

ওদিকে ফরাসি নৌবহরের পরাজয়ে উৎসাহিত হয়ে তুর্কি ও মিশরীয়রা আবার শত্রু হয়ে দাঁড়াল। কামানের অভাবে একটি যুদ্ধে বিফল হয়ে বাকি যুদ্ধে ফরাসিরা জয়লাভ করলে।

হঠাৎ নেপোলিয়নের হাতে এসে পড়ল খানকয় পুরোনো ফরাসি সংবাদপত্র। দুঃসংবাদ! সমস্ত ইতালি আবার ফ্রান্সের হাতছাড়া হয়েছে।

সেনাপতি ক্লেবারকে মিশরের যুদ্ধ চালাবার জন্যে রেখে, পনেরো মাস পরে নেপোলিয়ন কয়েকজনমাত্র সঙ্গীর সঙ্গে গোপনে আবার স্বদেশের দিকে যাত্রা করলেন।...

আবার ফ্রান্স!... দিকে দিকে উঠল আনন্দ-কোলাহল! 'নেপোলিয়ন আবার ফিরে এসেছেন! ফ্রান্সের মহাবীর আবার ফিরে এসেছেন! জয় নেপোলিয়নের জয়!'

জয়ধ্বনি শুনে শাসনসভার ডিরেক্টরদের বুক দুরুদুরু কেঁপে উঠল। তাঁদের বুক অকারণে কাঁপেনি।

নেপোলিয়ন বজ্রকঠিন কণ্ঠে বললেন, 'তোমাদের হাতে আমি যে শ্রীসমৃদ্ধিশালী ফ্রান্সকে সমর্পণ করে গিয়েছিলুম, তোমরা তার কী দশা করেছ? আমি শান্তি প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলুম, এসে দেখছি যুদ্ধ! আমি তোমাদের জয়গৌরবের অধিকারী করে গিয়েছিলুম, এসে দেখছি তোমরা পরাজিত! আমি তোমাদের কাছে কোটি কোটি টাকা রেখে গিয়েছিলুম, এসে দেখছি তোমরা ভিক্ষুক! তোমাদের নিয়ে আর চলবে না!'

ডিরেক্টরদের বুক অকারণে কাঁপেনি।

ফরাসি সাধারণতন্ত্রের দ্বারা গৃহীত দ্বিতীয় মাসের নাম Brumaire। ওই মাসের ৯ তারিখ। সেইদিনই সব হিসাবনিকাশ হয়ে গেল। নেপোলিয়ন সৈন্যদের সাহায্যে অকর্মণ্য ডিরেক্টরদের শাসনসভা থেকে দূর করে দিলেন (২৪ ডিসেম্বর, ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে)।

গত কয়েক বৎসরের ধারাবাহিক দুর্ভাগ্য, বিপ্লব ও অরাজকতার ফলে ফ্রান্স এমন শ্রান্ত হয়ে পড়েছিল যে, নেপোলিয়নের কাছে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করতে কিছুমাত্র ইতস্তত করলে না। নতুন শাসনসভার নিয়মতন্ত্র যখন জনসাধারণের সামনে দাখিল করা হল, তখন তার সপক্ষে ভোট পাওয়া গেল ৩০,১১,০০৭ এবং বিপক্ষে ভোটের সংখ্যা ১,৫৬২ মাত্র!

নেপোলিয়ন হলেন প্রধান এবং আর দুজন হলেন তাঁর সহকারী শাসনকর্তা— তাঁদের নাম হল যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শাসনকর্তা। প্রজাতন্ত্র এগিয়ে গেল অনেকটা রাজতন্ত্রের কাছাকাছি। এইবারে নেপোলিয়ন নিশ্চয়ই দূর থেকে পথের শেষ দেখতে পেলেন— কিন্তু, সবটা নয়! কোনও মানুষ— এমনকী মহামানুষও জীবনপথের শেষটা সম্পূর্ণ দেখতে পায় না, কারণ মাঝে দোলে নিয়তির রহস্যময় কুহেলিকা।

...টুইলারিস রাজপ্রাসাদ! ফ্রান্সের রাজাদের নিবাস। নেপোলিয়ন আজ সেখানে বসে মন্ত্রণাসভা আহ্বান করেন। তাঁর সঙ্গে আরও দুজন কনসাল আছেন বটে, কিন্তু তাঁরা হচ্ছেন নেপোলিয়নেরই প্রতিধ্বনি!

নেপোলিয়ন সর্বপ্রথমে রচনা করলেন নতুন আইনের খসড়া, কারণ বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সের আইনকানুন একরকম নষ্ট হয়ে গিয়েছিল বললেই হয়। প্রায় দেড়শত বৎসর হতে চলল, আজও ফ্রান্সে Code Napoleon বা নেপোলিয়ন-সংহিতা অনুসারে আদালতের বিচারকার্য নির্বাহিত হয়। এবং আজও মধ্য ও দক্ষিণ জার্মানি, প্রুশিয়া, সুইটজারল্যান্ড, স্পেন— এমনকী মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা প্রভৃতি দেশের উপরেও নেপোলিয়ন-সংহিতার প্রভাব বিদ্যমান আছে!

ঘরের ব্যাপার ভালো করে গুছিয়ে নিয়ে নেপোলিয়ন বাইরের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন।

সশস্ত্র ইংল্যান্ড তাঁর বিরুদ্ধে। প্রুশিয়ার রাজাও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। অস্ট্রিয়া আবার ইতালি কেড়ে নিয়েছে। ফ্রান্স একা এবং তার চারিদিকে বলবান শত্রু। অন্য কোনও লোক হলে ভয়ে ভেঙে পড়ত। কিন্তু নেপোলিয়ন একটুও বিচলিত হলেন না।

ফ্রান্সে তখন আর-একজন বড়ো সেনাপতি ছিলেন। তাঁর নাম জেনারেল মোরো। অনেকেই তাঁকে নেপোলিয়নের সমকক্ষ বলে মনে করতেন এবং অনেকের মতে তাঁর সঙ্গে নেপোলিয়নের রেষারেষি ছিল।

কিন্তু এক্ষেত্রে নেপোলিয়ন যথেষ্ট উদারতা প্রকাশ করলেন। দেড় লক্ষ সৈন্যদের সঙ্গে মোরোকে তিনি জার্মানির বিরুদ্ধে পাঠিয়ে দিলেন, ফ্রান্সের যত রণপ্রবীণ যোদ্ধা ছিল সেই বিপুল বাহিনীর মধ্যে। সেখানে মোরো, সেনাপতি নে ও গ্রাউচির সাহায্যে অস্ট্রিয়ানদের বিরুদ্ধে বিখ্যাত হোহেনলিন্ডেন যুদ্ধে (১৮০০ খ্রিস্টাব্দে) জয়লাভ করেন।

জেনারেল মেসেনাকে পাঠানো হল ইতালিতে। কিন্তু সেখানে ফরাসিরা বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারলে না। মেসেনা পিছু হটে জেনোয়া নগরে গিয়ে আশ্রয় নিলেন— নগর হল অবরুদ্ধ। সুচেট নামে আর-একজন ফরাসি সেনাপতিও অস্ট্রিয়ানদের সামনে দাঁড়াতে পারলেন না। অস্ট্রিয়ার প্রধান সেনাপতি কাউন্ট মেলাস সানন্দে দেখলেন, তাঁর সামনে ফ্রান্সের দ্বার খোলা। অস্ট্রিয়ানরা সগর্বে বলতে লাগল, আমরা ইতালি জয় করেছি, এইবারে ফ্রান্সের উপরে হানা দেব।

নেপোলিয়ন বুঝলেন, অবিলম্বে সসৈন্যে ইতালিতে যেতে না পারলে সর্বনাশের সম্ভাবনা। কিন্তু সৈন্য কোথায়? আসল ফৌজ তো জেনারেল মোরের সঙ্গে!

তিনি তাড়াতাড়ি সৈন্য সংগ্রহ করতে লাগলেন। কিছুদিন পরে অর্ধশিক্ষিত নতুন লোক নিয়ে যে ফৌজ গঠন করা হল, গুপ্তচরের মুখে তার খবর পেয়ে অস্ট্রিয়ানরা বেজায় ঠাট্টা করতে আরম্ভ করলে— তাদের খবরের কাগজে বেরোতে লাগল হরেকরকম ব্যঙ্গচিত্র!

নেপোলিয়ন স্থির করলেন, অপ্রত্যাশিতভাবে তিনি অস্ট্রিয়ানদের আক্রমণ করবেন।

একচক্ষু হরিণের মতন অস্ট্রিয়ান সেনাপতি মেলাসের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল ইতালিতে আবদ্ধ অর্ধপরাজিত ফরাসিদের দিকে। এবং তিনি জানতেন, নেপোলিয়নকে আসতে হবে সমতলক্ষেত্র দিয়ে।

নেপোলিয়ন ও মেলাসের মাঝখানে আছে ইয়োরোপের হিমালয়, মহাপর্বত আল্পস। এই মেঘচুম্বী হিমারণ্য পার হয়ে বিপুল এক বাহিনী যে আত্মপ্রকাশ করতে পারে, এ কথা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

কিন্তু নেপোলিয়ন বললেন, 'দু-হাজার বৎসর আগে কার্থেজের মহাবীর হানিবল যা করতে পেরেছিলেন, আমরাই বা তা করতে পারব না কেন?'

এই অপূর্ব প্রস্তাব শুনে সৈনিকরাও পরম উৎসাহিত হয়ে উঠল।

তুষার, তুষার, তুষার! ডাইনে-বামে তুষারের প্রাচীরের পর তুষারের প্রাচীর, পায়ের তলায় তুষার-কর্দম, মাথার উপরে ঝরছে তুষারবৃষ্টি। সংকীর্ণ পথের পাশে বিরাট অতল খাদ— ভীষণ মৃত্যুগহ্বর! কোথাও কোথাও পথের রেখা পর্যন্ত বিলুপ্ত। একটু শব্দ হলেই পাহাড়ের মতন বৃহৎ বরফের স্তূপ সেই নিরবচ্ছিন্ন নীরবতার রাজ্যকে বজ্ররবে প্রকম্পিত করে হুড়মুড়িয়ে নেমে আসে এবং শত শত লোককে নিয়ে অতল পাতালের দিকে অদৃশ্য হয়। এরই ভিতর দিয়ে হাজার হাজার ফরাসি সৈন্য অগ্রসর হচ্ছে ধীরে ধীরে, ভয়ে নিশ্বাস বন্ধ করে। পদাতিক, অশ্বারোহী, মালবাহী সৈনিক! ভারী ভারী কামানের গাড়ি, রসদের গাড়ি! এক-একটি কামান টানতে দরকার হয় একশো লোক। নেপোলিয়ন নিজে সঙ্গে সঙ্গে থেকে তদবির করেন— সাধারণ সৈনিকের মতন তিনিও করেন সমান কষ্টভোগ।

কাউন্ট মেলাস ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে পারেননি। পাভিয়া শহরের এক মহিলা-বন্ধুকে তিনি লিখেছিলেন, 'তোমাকে পাভিয়া ত্যাগ করতে হবে না। ওখানে কোনও বিপদের ভয় নেই।' ঠিক তার বারো ঘণ্টা পরে নেপোলিয়ন সেখানে গিয়ে হাজির হলেন।

ইতিমধ্যে জেনোয়ার পতন হল, ফরাসি সেনাপতি মেসেনা আত্মসমর্পণ করলেন।

ওদিকে নেপোলিয়নের সঙ্গী সেনাপতি লেনস মন্টিবেলো ক্ষেত্রে ভীষণ এক যুদ্ধে অস্ট্রিয়ানদের হারিয়ে দিলেন।

এই সু ও কু খবর একসঙ্গে নেপোলিয়নের কানে গিয়ে পৌঁছাল। তিনি ধাবিত হলেন মেলাসের অধীনস্থ প্রধান শত্রুবাহিনীর দিকে। দুই পক্ষে মিলন হল বিখ্যাত মারেঙ্গো ক্ষেত্রে (১৪ জুন, ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে)।

মেলাসের সৈন্যসংখ্যা চল্লিশ হাজার। নেপোলিয়নের অধীনে বিশ হাজারের বেশি সৈন্য ছিল না। তবু তিনি বীরবিক্রমে শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করলেন। তিনি সেনাপতি দেসেক্সের সঙ্গে পাঁচ হাজার সৈন্য রেখে এগিয়ে এসেছিলেন এবং কথা ছিল সংরক্ষিত সেনাদল যথাসময়ে রণক্ষেত্রে আগমন করবে।

দুই পক্ষে যুদ্ধ হল বহুক্ষণ ধরে। কিন্তু চল্লিশ হাজার শত্রুর সঙ্গে বিশ হাজার ফরাসি শেষ পর্যন্ত যুঝতে পারলে না, তারা পশ্চাৎপদ হতে লাগল।

মেলাস বিপুল আনন্দে তাঁর সহকারী জাককে ডেকে বললেন, 'আমরা জয়লাভ করেছি। শত্রুরা পালাচ্ছে, তুমি অশ্বারোহীদের নিয়ে ওদের পশ্চাদ্ধাবন করো।' এই বলে নিশ্চিন্তভাবে রণক্ষেত্র ছেড়ে চলে গেলেন। 'লড়াই তো শেষ হয়ে এল, আর এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পা ব্যথা করি কেন?'— তাঁর ভাবটা ছিল অনেকটা এইরকম আর কী!

নেপোলিয়ন যখন ভাবছেন ভাগ্যদেবী আমার উপরে আবার বিমুখ হয়েছেন, তখন প্রান্তরের প্রান্তে আবির্ভূত হল দেসেক্সের সংরক্ষিত সেনাদল।

দেসেক্স ঘোড়া ছুটিয়ে নেপোলিয়নের কাছে এসে বললেন, 'আমার মনে হচ্ছে যুদ্ধে আমরা পরাজিত হয়েছি।'

নেপোলিয়ন বললেন, 'আমার মনে হচ্ছে যুদ্ধে আমরা জয়লাভ করেছি। তুমি আক্রমণ করো, আমি পলাতকদের ফিরিয়ে আনি।'

তাজা পাঁচ হাজার সৈনিক নিয়ে দেসেক্স শত্রুদলের উপরে বাঘের মতন ঝাঁপিয়ে পড়লেন। যারা পালাচ্ছিল, নেপোলিয়নের উৎসাহবাণী শুনে তারাও আবার ফিরে দাঁড়াল। খানিক পরেই মারেঙ্গোর ক্ষেত্রে দশ হাজার হতাহত অস্ট্রিয়ান সৈন্যের উপরে উড়তে লাগল ফরাসিদের বিজয়পতাকা। বন্দিও হল কয়েক হাজার শত্রু!

নেপোলিয়নের জীবনে মারেঙ্গো হচ্ছে একটি অদ্ভুত ও স্মরণীয় যুদ্ধ। এই যুদ্ধে তিনি হেরেও জিতে গেলেন। এবং এই একটিমাত্র যুদ্ধের ফলে অস্ট্রিয়ার সমস্ত লম্ফঝম্প বন্ধ হয়ে গেল, সন্ধি করে সে ইতালিকে আবার ফিরিয়ে দিলে নেপোলিয়নের হাতে! কিন্তু যাঁর জন্যে মারেঙ্গো হল ফরাসিদের গৌরব-স্মৃতি, সেই সেনাপতি দেসেক্স রণক্ষেত্রেই বরণ করে নিলেন বীরের মৃত্যুকে।

ফরাসিরা যখন মারেঙ্গোর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাচ্ছিল, তখন একজন পর্যটক ফ্রান্সের দিকে আসছিলেন সেইখান দিয়ে। তিনি সদলবলে দেসেক্সের আগমন দেখেননি। ফ্রান্সে পৌঁছে তিনি দিলেন ফরাসিদের পরাজয়-সংবাদ! নেপোলিয়নের শত্রুরা জো পেয়ে অমনি ষড়যন্ত্র আরম্ভ করলে— প্রথম কনসালকে তাড়াবার জন্যে! কিন্তু তাদের বড়ো আশায় পড়ল ছাই, কারণ তারপরেই এল এই অপূর্ব জয়লাভের সমস্ত সংবাদ— সঙ্গে সঙ্গে শত্রুদের মাথা হেঁট, মুখ বন্ধ!

মারেঙ্গোর যুদ্ধের পরে ফরাসি দেশে নেপোলিয়নের প্রভুত্ব হল সুপ্রতিষ্ঠিত। এবং ফরাসিরা বেশ বুঝলে, তাদের রক্ষা করতে পারেন একমাত্র নেপোলিয়নই।

নেপোলিয়নের ক্রমোন্নতি দেখে রাজপক্ষভুক্ত ব্যক্তিরা অত্যন্ত ভীত হল। তারা ফ্রান্সের সিংহাসনে বিতাড়িত ও নির্বাসিত রাজবংশের কাউকে বসাবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তারা যখন বুঝলে যে নেপোলিয়ন বেঁচে থাকতে তাদের বাসনা পূর্ণ হওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই, তখন তাঁকে হত্যা করবার ঘৃণ্য চেষ্টা হল।

নেপোলিয়ন একদিন সস্ত্রীক রঙ্গালয়ে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ গাড়ির অনতিদূরেই ফাটল একটা মস্ত বোমা। আশপাশের বাড়িগুলোর ছাদ ভেঙে পড়ল এবং নেপোলিয়নের গাড়িরও জানালাগুলো চুরমার হয়ে গেল— কিন্তু তিনি ও তাঁর স্ত্রী বেঁচে গেলেন আশ্চর্যভাবে।

অধিকাংশ ইয়োরোপ হল নেপোলিয়নের বশীভূত। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, স্পেন, ইতালি, রুশিয়া ও হল্যান্ড— সকলেই নেপোলিয়নের দলে। তাঁকে স্বীকার করতে নারাজ কেবল ইংল্যান্ড। নেপোলিয়ন স্থির করলেন এইবার তাঁর শেষ শত্রু নিপাত করবেন।

ডানকার্ক ও বুলোন বন্দরে ইংল্যান্ড আক্রমণের বন্দোবস্ত হতে লাগল। নেপোলিয়ন নানা আকারের অনেক জাহাজ ও এক লক্ষ সৈন্য এনে সেখানে জড়ো করলেন।

এই বন্দোবস্ত পণ্ড করবার জন্যে ইংল্যান্ড থেকে প্রেরিত হলেন নেলসন। ফরাসিদের সঙ্গে ইংরেজদের জলযুদ্ধ হল। যুদ্ধে হেরে ইংরেজরা পলায়ন করলেন। তাঁদের অনেক লোকও মারা পড়ল। নেপোলিয়নের সৈনিকদের কাছে নেলসনের এই প্রথম পরাজয়।

নেলসনের অসাফল্যে ইংল্যান্ডের ভাবনার আর সীমা রইল না। ইংরেজরা ভাবলেন, ইয়োরোপে কেউ আমাদের বন্ধু নেই। নেপোলিয়ন যদি ইংল্যান্ড আক্রমণ করেন তাহলে হয়তো আমরা তাঁকে ঠেকাতে পারব না। তখন তাঁরা বাধ্য হয়ে নেপোলিয়নের সঙ্গে সন্ধি করে ফেললেন (১৮০২ খ্রিস্টাব্দে)। এই সন্ধি আমেন্সের সন্ধি নামে বিখ্যাত। দীর্ঘ দশ বৎসর পরে ইয়োরোপের সর্বত্র শান্তির প্রতিষ্ঠা হল। কেবল রণক্ষেত্রে নয়, রাজনীতির ক্ষেত্রেও নেপোলিয়নের যশ হল ষোলোকলায় পরিপূর্ণ।

ফ্রান্সের কৃতজ্ঞ জনসাধারণ নেপোলিয়নকে তখন আজীবনের জন্যে কনসাল বলে স্বীকার করে নিলে।

নেপোলিয়ন শ্রেষ্ঠাসন লাভ করলেন। আর এক পদ অগ্রসর হলেই রাজমুকুট।

ছয়। মখমল-ঢাকা কাষ্ঠখণ্ড

রাজমুকুটের জন্যে নেপোলিয়ন অপেক্ষা করতে পারেন। তাঁর বয়স মোটে তেত্রিশ বৎসর! তিনি বেশ বুঝেছেন, মুকুট আছে তাঁর হাতের কাছেই।

কিন্তু তাঁর মনের কথা কী, জানে না তা কেউই।

একজন বললেন, 'রাজপক্ষের লোকেরা কী বলছে জানেন? নেপোলিয়নের উত্তরাধিকারী হবে কে? কাল যদি আপনি মারা যান, আমাদের কী দশা হবে? আপনি উত্তরাধিকারী নির্বাচন করুন।'

'সেটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।'

'আপনার পদে কে বসবে জানতে পারলে ফ্রান্স হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে।'

'আমার সন্তান নেই।'

'তাহলে দত্তকপুত্র গ্রহণ করুন।'

'আমার স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী হচ্ছে ফ্রান্সের জনসাধারণ।'

নেপোলিয়ন বাইরে আত্মপ্রকাশ করলেন না বটে, কিন্তু মনে মনে তখনই তিনি পুত্র বা উত্তরাধিকারীর জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন।

আরও এক বছর কয়েক মাস কেটে গেল। অখণ্ড শান্তির মধ্যে নেপোলিয়ন ফ্রান্সকে সকল দিক দিয়ে মহান করে তোলবার চেষ্টায় নিযুক্ত হলেন। ধনে-ধান্যে ব্যাবসাবাণিজ্যে খ্যাতি-প্রতিপত্তিতে ফ্রান্স এমন উন্নত হয়ে উঠল যে, ঘরে ঘরে তাঁর নামে জয়জয়কার পড়ে গেল। রাজ্যের এমন কোনও বিভাগ নেই যেদিকে পড়ল না তাঁর চোখ। নেপোলিয়ন বুঝিয়ে দিলেন, তিনি কেবল যোদ্ধা নন, রাজোচিত সমস্ত গুণ তাঁর মধ্যে বিদ্যমান আছে।

এই সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে আবার এক ষড়যন্ত্র হল। কিন্তু ষড়যন্ত্র প্রকাশ হয়ে গেল, ধরা পড়ল অনেক লোক। বন্দিদের মধ্যে ছিলেন ফ্রান্সের দুইজন বিখ্যাত জেনারেল— পিচেগ্রু ও মোরো। বিচারে তেরোজনের হল মৃত্যুদণ্ড। একদিন দেখা গেল, পিচেগ্রু কারাগারেই গলায় দড়ি দিয়ে মারা পড়েছেন। কিন্তু হোহেনলিন্ডেন-বিজয়ী মোরোকে অপরাধী জেনেও নেপোলিয়ন ক্ষমা করে নির্বাসন-দণ্ড দিলেন।

(যাঁরা বলেন নেপোলিয়ন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জেনারেল মোরোকে বরাবরই পথ থেকে সরাতে চেয়েছেন, তাঁরা মিথ্যুক ও নিন্দুক। কারণ মোরোর এই গুরুতর অপরাধ প্রমাণিত হয়েছিল। তাঁর নিশ্চয়ই প্রাণদণ্ড হত। হল না খালি নেপোলিয়নের উদারতার জন্যে।

কিন্তু মোরো এ উদারতার সম্মান রাখেননি। কারণ পরে তিনি প্রকাশ্যভাবেই নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে করেছিলেন অস্ত্রধারণ)।

আর-একজনও ধরা পড়লেন— তিনি হচ্ছেন ফ্রান্সের বিগত রাজবংশজাত ডিউক অফ ইংহিয়েন। তিনি জার্মান রাজ্যের বাসিন্দা, রাষ্ট্রীয় আইন অনুসারে নেপোলিয়নের নাগালের বাইরে। তবু তাঁকে ধরে আনা হল। কাজটা বেআইনি হলেও বিচারে ডিউকেরও অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেল। তাঁরও হল প্রাণদণ্ড।

হয়তো ডিউক বেঁচে যেতেন, কিন্তু নেপোলিয়নের পররাষ্ট্রসচিব কূটরাজনীতিবিদ টালিরান্ড ডিউকের বিরুদ্ধে নেপোলিয়নকে উত্তেজিত করলেন। এই টালিরান্ড ছিলেন মুখে নেপোলিয়নের বন্ধু, মনে মনে বিষম শত্রু। ডিউকের বেআইনি গ্রেপ্তার ও রাজরক্তপাতের জন্যে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ইয়োরোপে যে তুমুল আন্দোলন উঠবে, এটা তাঁর অজানা ছিল না।

ডিউকের প্রাণদণ্ড হয়ে গেলে টালিরান্ড নিজেই মত প্রকাশ করেছিলেন, 'এ হল অপরাধের চেয়ে খারাপ— এ হল বিষম ভ্রম।'

ডিউকের মৃত্যুর জন্যে ইয়োরোপ কী মতামত প্রকাশ করছে তা জানবার আগেই নেপোলিয়ন গিয়ে পড়লেন তাঁর জীবনের চরম উন্নতির স্রোতের মধ্যে!

ব্যবস্থাপক সভার কয়েকজন প্রবীণ সভ্য এলেন এই প্রস্তাব নিয়ে: ফ্রান্সে আবার রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করা হোক।

নেপোলিয়ন মুখে বলতেন, 'সিংহাসন কী? একখানা কাঠ, মখমলে ঢাকা।' কিন্তু কাজে এই একখানা কাঠের লোভ সামলাবার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। ওই একখণ্ডমাত্র কাষ্ঠ পৃথিবীকে চিরদিন অভিভূত করে এসেছে— বিপ্লবের ও জনসাধারণের মানসপুত্র নেপোলিয়নও অভিভূত হলেন।

কিন্তু কোন উপাধি গ্রহণ করা যায়? ফ্রান্সের সিংহাসনে তাঁর আগে যাঁরা বসেছেন তাঁরা সবাই ছিলেন 'রাজা'। ও নামের কোনও মর্যাদাই আর নেই। নেপোলিয়ন উপাধি বেছে নিলেন 'সম্রাট'! কর্সিকার বিদেশি গৃহস্থের ও উকিলের গরিব ছেলে হলেন ইয়োরোপের সর্বশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের সম্রাট প্রথম নেপোলিয়ন (১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে)। উচ্চাকাঙ্ক্ষার কী সফলতা! মানুষের কল্পনাও স্তম্ভিত হয়ে যায়!

কিন্তু এর মধ্যে প্রহসনেরও অভাব ছিল না। প্রথম চার বৎসর মুদ্রার উপরে নেপোলিয়ন পরিচিত হতেন 'প্রজাতন্ত্রের সম্রাট' বলে। 'রাজা' উপাধি লুপ্ত ও প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করবার জন্যে হাজার হাজার ফরাসি আত্মদান করেছে। বিপ্লবের বা বিদ্রোহের ধর্ম ফরাসিরা এখনও ভোলেনি। অতএব 'শনৈঃ পর্বতলঙ্ঘনম'! প্রথম ধাপ 'প্রথম কনসাল'। দ্বিতীয় ধাপ 'আজীবনের জন্যে কনসাল'। তৃতীয় ধাপ 'সম্রাট'। চতুর্থ ধাপ 'প্রজাতন্ত্রের সম্রাট'। পঞ্চম ধাপে প্রজাতন্ত্রের নামও লুপ্ত হল। নেপোলিয়ন ফরাসিদের চিনেছেন। তাদের মন তৈরি করবার কৌশল তিনি জানেন!

সম্রাট নেপোলিয়নের পতাকার তলায় এসে দাঁড়াতে লাগল দলে দলে লোক। মাত্র বারো বৎসর আগে যারা ফ্রান্সের রাজার মৃত্যুদণ্ডের জন্যে 'ভোট' দিয়েছিল, তাদেরও একশো তিরিশজন সম্রাটের অধীনে চাকরি নিতে আপত্তি করলে না! মাত্র বারো বৎসর পরে! মানুষ কী জীব!

সম্রাটের রাজসভা দরকার। এখানকার আইনকানুন বা আদবকায়দা নেপোলিয়নের জানা ছিল না। তার জন্যে ডেকে আনা হল পুরোনো রাজসভার বিশেষজ্ঞগণকে! রাজসভায় উপাধিধারীদের দরকার! নেপোলিয়নের সঙ্গে সঙ্গে যাঁরা 'বড়ো' হয়েছেন, তাঁদের উপরে উপাধি বৃষ্টি হতে লাগল। বার্দিয়ার, মুরাট, লেনস, নে ও দাভউস্ট প্রভৃতি জেনারেলরা আর সাধারণ লোক রইলেন না— যদিও প্রথম জীবনে অনেকেই আস্তাবল, হোটেল বা জাহাজ কেবিনের চাকর ছিলেন।

নেপোলিয়নের নখদর্পণে নরচরিত্র! তিনি বললেন, 'ওদের আমি উপাধি দিচ্ছি কেন জানো? নিজেদের উপাধির মান রাখবার জন্যে ওরা আমার সম্রাট উপাধিকে অমান্য করতে পারবে না!'

মা লেটিজিয়া, মা লেটিজিয়া! তিনি আজ সম্রাটজননী! মাতৃত্বের এর চেয়ে গর্ব ও সৌভাগ্য আর কী হতে পারে? নেপোলিয়ন সাদরে তাঁকে প্যারিসে আহ্বান করলেন। কিন্তু তিনি আসতে নারাজ! ছেলের মাথায় রাজমুকুট দেখে তিনি সুখী হননি, ভীত হয়েছেন। অনেক কষ্টে তাঁকে রাজধানীতে আনা হল।

সেকালকার ইয়োরোপিয়ান সম্রাটরা অভিষেকের জন্যে যেতেন রোমে, পোপের কাছে। কিন্তু নেপোলিয়নের অভিষেকের জন্যে রোম থেকে এলেন স্বয়ং পোপ। রাজধানী হাসছে— ফুলের মালায় আর আলোর মালায়। চারিদিকে গানবাজনা, উৎসব-আনন্দের সাড়া।

পোপ নেপোলিয়নের মাথায় রাজমুকুট পরিয়ে দিতে উদ্যত হলেন।

নিয়ম হচ্ছে, পুরোহিত যখন মুকুট পরাবেন, রাজা ও রানিকে তখন নতজানু হয়ে থাকতে হবে।

জীবনে কখনো যিনি কারো কাছে নতজানু হননি, এখন তিনি কী করেন দেখবার জন্যে সকলেই উদগ্রীব হয়ে রইল।

নেপোলিয়ন নতজানুও হলেন না, পোপকে মুকুট পরাতেও দিলেন না।

সকলে সবিস্ময়ে দেখলে, নেপোলিয়ন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পোপের হাত থেকে টেনে নিয়ে মুকুট পরলেন স্বহস্তেই! তারপর তিনিই মুকুট পরালেন নতজানু জোসেফাইনকে! কেন? হয়তো এই ভেবেই যে, এ মুকুট তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেননি, অর্জন করেছেন স্বহস্তেই (১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে)!

পোপ এ অপমান ভুললেন না।

রাজদণ্ড হস্তে নেপোলিয়ন সিংহাসনে গিয়ে বসলেন। তাঁর তখনকার মনের ভাব একটি কথায় প্রকাশ পায়। সিংহাসনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর বড়োভাই জোসেফ। নেপোলিয়ন জনান্তিকে বললেন, 'দাদা, বাবা যদি এ দৃশ্য দেখতে পেতেন!'

নেপোলিয়নের বয়স চৌত্রিশ বৎসর কয়েক মাস।

রুশিয়া এতদিন নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি। তার প্রধান কারণ, পূর্ববর্তী জার পল ছিলেন নেপোলিয়নের প্রতিভার ভক্ত। পল এখন নিহত। সিংহাসনে বসেছেন তাঁর ছেলে। কিন্তু ডিউক অফ ইংহিয়েনের প্রাণদণ্ডের জন্যে নতুন জার আলেকজান্ডার হলেন ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ। সুইডেনের রাজাও গেলেন তাঁর দলে।

ইয়োরোপে আর কোনও মিত্রশক্তির সাহায্যপ্রাপ্তির আশা ছিল না বলে ইংল্যান্ড এতদিন ইচ্ছার বিরুদ্ধেও চুপচাপ ছিল। এইবারে রুশিয়াকে দলে পেয়ে ইংরেজরাও বেঁকে দাঁড়ালেন এবং রুশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি করে ফেললেন।

অস্ট্রিয়া নিজের শোচনীয় পরাজয়ের অপমান ভুলতে পারেনি। ভিতরে ভিতরে সে প্রাণপণে সৈন্য সংগ্রহ করে যুদ্ধের আয়োজন করছিল। এখন সে-ও দলে যোগ দিলে। সুইডেনও।

নেপোলিয়নের অভিষেকের এক বৎসর পরেই ইয়োরোপের দিকে দিকে বেজে উঠল রণদেবতার ভেরি! চার বৎসর ধরে নেপোলিয়ন শান্তিরক্ষার জন্যে যতদূর সম্ভব চেষ্টা করেছেন, কিন্তু আর সে চেষ্টার ফল ফলল না।

মারেঙ্গোর পাঁচ বৎসর পরে নেপোলিয়নকে আবার তরবারি ধরতে হল। এটা হল তাঁর যোদ্ধাজীবনের দ্বিতীয় স্তর এবং এই স্তরেই যোদ্ধা নেপোলিয়নের গৌরবোজ্জ্বল স্বরূপ যথার্থভাবে প্রকাশ পায়।

অস্ট্রিয়া ভেবেছিল, নেপোলিয়নের রণকৌশল সে আয়ত্ত করে ফেলেছে, তাঁকে হারানো আর কঠিন হবে না। কিন্তু অস্ট্রিয়া বোঝেনি, প্রতিভা চলে নতুন নতুন পথ ধরে। তার সঙ্গে যুদ্ধে নিযুক্ত হওয়ার দুই মাস আগে, ঘটনাস্থল থেকে ছয়-সাতশো মাইল দূরে স্বদেশে বসে নেপোলিয়ন এবারকার যুদ্ধে যা-যা করতে হবে, সমস্তই ঠিক করে ফেলেছিলেন।

তাঁর বিরুদ্ধে ইয়োরোপের তিন শ্রেষ্ঠ শক্তি একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে দেখে তিনি একটুও ভীত হলেন না। প্রথমে তিনি ইংল্যান্ড আক্রমণের জন্যে সমুদ্রতটে সৈন্য সাজাচ্ছিলেন; কিন্তু অস্ট্রিয়ানরা অগ্রসর হচ্ছে শুনে তাকেই আগে জব্দ করতে ছুটে চললেন।

এবারকার অস্ট্রিয়ান সেনাপতির নাম ম্যাক। নেপোলিয়ন তাঁর সেনাদলকে সাত ভাগে বিভক্ত করলেন। কয়েক দলকে পাঠিয়ে দিলেন দানিয়ুব নদী পার হয়ে অস্ট্রিয়ানদের পিছনে গিয়ে পড়বার জন্যে। আরও দু-দিক থেকে সেনাপতি দুপনত ও নে-র অধীনস্থ দুই দল সৈন্য অস্ট্রিয়ানদের বাধা দিতে লাগল। কিছু বোঝবার আগেই ম্যাক সবিস্ময়ে দেখলেন, তাঁর পিছনে শত্রু, ডাইনে শত্রু, বাঁয়ে শত্রু! নিরুপায় হয়ে তিনি উলম নগরের দিকে এসে সৈন্য সমাবেশ করলেন।

নেপোলিয়নের দূত গিয়ে বললেন, 'সেনাপতি, আত্মসমর্পণ করুন।'

ম্যাক সগর্বে বললেন, 'আট দিনের জন্যে যুদ্ধ স্থগিত থাকুক। নইলে মৃত্যুই শ্রেয়।'

দূত বললেন, 'যুদ্ধ বন্ধ হবে না।'

ম্যাক বললেন, 'তবে আত্মসমর্পণই করছি।' হাস্যকর ব্যাপার! তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী যে নেপোলিয়ন, দূত আসবার আগে পর্যন্ত ম্যাক সেকথাও জানতেন না! উলমের যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ট্রিয়ানরা একটা বন্দুক ছোড়বারও সুযোগ পায়নি! এমন আশ্চর্য যুদ্ধজয়ের কাহিনি ইতিহাসে আর দ্বিতীয় নেই (১৮০৫ খ্রিস্টাব্দে)।

নেপোলিয়ন বললেন, 'সৈন্যগণ, পনেরো দিনের মধ্যে আমরা অস্ট্রিয়ানদের ব্যাভেরিয়া থেকে তাড়িয়ে দিয়েছি; এক লক্ষ শত্রুর ভিতরে বন্দি হয়েছে ষাট হাজার নব্বইজন। আমাদের জয়চিহ্ন হচ্ছে দুইশত কামান আর আশিটা পতাকা। কিন্তু এখনও আমাদের সামনে রয়েছে আর-একটা যুদ্ধ। ইংরেজরা পৃথিবীর শেষ প্রান্ত থেকে ডেকে এনেছে রুশিয়ানদের। এবারে আমাদের লড়তে হবে তাদের সঙ্গেই। এই যুদ্ধই বলে দেবে, ফরাসি সৈন্যেরা ইয়োরোপে অধিকার করবে প্রথম কি দ্বিতীয় স্থান!'

ওদিকে ঠিক পরের দিনেই নেলসন ট্রাফালগারের জলযুদ্ধে ফ্রান্স ও স্পেনের সম্মিলিত নৌবাহিনীকে হারিয়ে দিয়ে নিজে মারা পড়লেন।

নেপোলিয়ন এবার আর কোথাও থামলেন না। শত্রু তাড়াতে তাড়াতে প্রথমে তিনি অস্ট্রিয়ার সীমান্ত পার হলেন। তারপর একেবারে প্রবেশ করলেন তার রাজধানী ভিয়েনা নগরে।

কিন্তু অস্ট্রিয়ার সম্রাট একটুও দমলেন না, সসৈন্যে পিছিয়ে গিয়ে রুশিয়ার সম্রাটের সঙ্গে মিলিত হলেন। তাঁদের দলে রুশ ও অস্ট্রিয়ান সৈন্য ছিল আশি হাজার।

নেপোলিয়নের সৈন্যসংখ্যা মাত্র ষাট হাজার। কিন্তু পুরো ষাট হাজার সৈন্যও তিনি কাজে লাগাতে পারলেন না। অধিকৃত অস্ট্রিয়ার রাজধানীতে ও নানা স্থানে অনেক সৈন্য রক্ষীরূপে রেখে তাঁকে এগিয়ে আসতে হল। ইয়োরোপের সকলেরই দৃঢ় ধারণা হল, আর নেপোলিয়নের রক্ষা নেই, নেপোলিয়নও বুঝলেন, এবারের যুদ্ধে হারলে তাঁর মুকুট তো ধুলোয় লুটোবেই, উপরন্তু তাঁর সমস্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা পরিণত হবে নিষ্ফল স্বপ্নে। কারণ, গত মাসের একুশ তারিখে ট্রাফালগারের জলযুদ্ধে ইংরেজরা তাঁর সমস্ত নৌবাহিনী ধ্বংস করে দিয়েছে। যদিও সে পরাজয়ের জন্যে তিনি দায়ী নন, কিন্তু জলপথ তাঁর হাতছাড়া হয়েছে। এর উপরে স্থলে হারলে কেউ তাঁকে বাঁচাতে পারবে না। কাজেই তিনি যুদ্ধের ফন্দি স্থির করতে লাগলেন খুব সাবধানে।

অতঃপর আমরা যে যুদ্ধের কথা বলব, নেপোলিয়নের জীবনে সেইটিই হচ্ছে সবচেয়ে গৌরবজনক যুদ্ধ! সুতরাং তার আলোচনা করব বিস্তৃতভাবেই।

ব্রান নামক স্থানে নেপোলিয়ন নিজের সৈন্য সমাবেশ করেছিলেন। রুশ ও অস্ট্রিয়ান সৈন্যরা সেইখানে তাঁকে আক্রমণ করতে এল।

কিন্তু নেপোলিয়নের পরিকল্পনা তখন সম্পূর্ণ। তিনি সসৈন্যে পিছিয়ে আসতে লাগলেন, এবং ফরাসিদের দক্ষিণ পার্শ্বটাকে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে দিলেন এই মতলবে, শত্রুরা তাঁকে ঘিরে ফেলবার জন্যে উৎসাহিত হয়ে উঠুক! শত্রুদের সংখ্যাধিক্যের জন্যে যদিও তাঁর এই পদ্ধতিটা অত্যন্ত বিপজ্জনক, তবু তিনি ভয় পেলেন না।

শত্রুরা নেপোলিয়নের কৌশল বুঝলে না, ভাবলে চমৎকার সুযোগ উপস্থিত! তারা মহোৎসাহে অগ্রসর হল। যেন ভয় পেয়েছে এমনি ভাব দেখিয়ে ফরাসিরা আরও পিছিয়ে পড়তে লাগল। এমনকী দু-একটা ছোটোখাটো সংঘর্ষে তারা পলায়নেরও অভিনয় করলে! নেপোলিয়ন নিজেও রুশ সম্রাট আলেকজান্ডারের কাছে চব্বিশ ঘণ্টার যুদ্ধনিবৃত্তির জন্যে আবেদন করলেন। তিনি জানতেন, সে আবেদন গ্রাহ্য হবে না এবং রুশ সম্রাট ভাববেন যে, তিনি সমস্ত দলবল নিয়ে নিরাপদে পালাবার জন্যেই যুদ্ধ থামাবার অনুরোধ করছেন। ফলে শত্রুরা অধিকতর উৎসাহিত হয়ে আরও তাড়াতাড়ি তাঁকে আক্রমণ করতে আসবে!

নেপোলিয়নের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল। শত্রুরা বোকার মতন ফাঁদে পা দিলে। পয়লা ডিসেম্বর তারিখে ফরাসিদের পশ্চাৎপদ দক্ষিণ পার্শ্বের সৈন্যদের বেষ্টন করবার জন্যে অধিকাংশ শত্রু সৈন্য তাদের ব্যূহের বামদিকে গিয়ে সমবেত হল। নেপোলিয়নের ফন্দি ছিল এই, শত্রুব্যূহের মধ্যভাগ রীতিমতো দুর্বল হয়ে পড়ল।

যুদ্ধের ফল যে কী হবে, সে সম্বন্ধে নেপোলিয়নের আর কোনোই সন্দেহ রইল না। তিনি সানন্দে দৃঢ়স্বরে বললেন, 'কালকের সূর্যাস্তের আগেই শত্রুরা আসবে আমাদের হাতের মুঠোর ভিতরে!'

এ বিষয়ে তিনি এতটা নিশ্চিত হলেন যে, তখনই একখানা প্রচারপত্র ছাপিয়ে নিজের সৈন্যদের জানিয়ে দিলেন, 'শত্রুরা আমাদের ডান পাশ পেরিয়ে পিছন থেকে আক্রমণ করতে এসে নিজেদের পার্শ্বদেশ অরক্ষিত করে ফেলছে!'

ফরাসিরা তখন অস্টারলিটজ ক্ষেত্রে এসে তাঁবু ফেলেছে। রাত হল। নেপোলিয়ন খুশি মনে বিশ্রাম করতে গেলেন। পরের দিন দোসরা তাঁর সিংহাসন আরোহণের প্রথম বাৎসরিক উৎসব।

রাত্রি প্রভাত। সেদিনকার সূর্যের অসাধারণ ঔজ্জ্বল্য দেখে ফরাসি সৈন্যরা বিপুল আনন্দে তার জয়গান করে উঠল। এ সূর্য তারপর তাদের কাছে 'অস্টারলিটজের সূর্য' বলে বিখ্যাত হয়েছিল। অস্টারলটিজ একটি ছোটো গ্রামের নাম। ইয়োরোপের অন্য কোনও দেশ তার নাম পর্যন্ত জানত না। কিন্তু আজ থেকে সে কেবল পৃথিবীবিখ্যাত নয়, ইতিহাসেও অমর হয়ে রইল।

যুদ্ধ আরম্ভ হল ফরাসিদের দক্ষিণ পার্শ্বেই। এদিকে ছিলেন দুজন ফরাসি নায়ক— সোল্ট ও ডাভোট। এখানকার জমিটা ছিল জলাভূমি ও তার উপরে ভাসছে এমন পাতলা বরফের আচ্ছাদন যে, পায়ের চাপেই ভেঙে যায়! কাজেই ফরাসিদের পক্ষে শত্রুদের বাধা দেওয়ার সুবিধা হল যথেষ্ট। সোল্ট ও ডাভোটের উপরে হুকুম ছিল, একটা নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত যেমন করেই হোক, শত্রুদের নিযুক্ত করে রাখবার জন্যে।

নেপোলিয়নের অভিপ্রায় হচ্ছে এই: অধিকাংশ শত্রু যখন ফরাসিদের ডান পাশে গিয়ে রীতিমতো ব্যস্ত হয়ে থাকবে, তখন তিনি নিজের বাম পাশের ও মধ্যভাগের সমস্ত সৈন্য নিয়ে প্রচণ্ড বেগে শত্রুদের দক্ষিণ পার্শ্ব ও মধ্যভাগ আক্রমণ করবেন। শত্রুব্যূহের ওই দুই অংশের সৈন্যরা দলে হালকা, সুতরাং ফরাসিদের আক্রমণ সইতে পারবে না, ফলে তাদের বাম পাশের সৈন্যরা ব্যূহ থেকে বিচ্ছিন্ন ও অসহায় হয়ে পড়বে।

শত্রুদের বাম পার্শ্বের সঙ্গে ফরাসিদের দক্ষিণ পার্শ্বের বিষম সংঘর্ষ উপস্থিত হল। শত্রুরা এখানে দলে ভারী, কিন্তু জলাভূমির সাহায্য পেয়ে ফরাসিরা দলে হালকা হয়েও শত্রুদের প্রাণপণে বাধা দিতে লাগল। উচ্চভূমির উপর থেকে দলে দলে আরও বেশি শত্রু-সৈন্য ক্রমাগত এইদিকেই নেমে আসতে লাগল ফরাসিদের একেবারে চেপে মেরে ফেলবার জন্যে! আসন্ন জয়লাভের উত্তেজনায় শত্রু-সেনাপতিদের এ খেয়াল একবারও হল না যে, নিজেদের বাম পার্শ্বে তাঁরা যত বেশি সৈন্য সরবরাহ করছেন, তাঁদের দক্ষিণ পার্শ্ব ও মধ্যভাগ তত দুর্বল হয়ে পড়ছে!

বেশ খানিকক্ষণ কেটে গেল। ডান পাশের ফরাসিরা সংখ্যাতীত শত্রুদের আর বুঝি বাধা দিতে পারে না! নিজের সাদা ঘোড়ার পিঠে স্থির পাথরের মূর্তির মতন বসে নেপোলিয়ন তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে উভয় পক্ষের গতিবিধি নিরীক্ষণ করছেন।

অনেকে এসে বারংবার বলতে লাগল, 'সম্রাট, হুকুম দিন! আমাদের দক্ষিণ পার্শ্বের সৈন্যেরা আর আত্মরক্ষা করতে পারছে না— আমরা গিয়ে ওদের সাহায্য করি।'

নেপোলিয়ন গম্ভীর স্বরে বলেন, 'না! এখনও সময় হয়নি।'

তারপর বন্দুক ও কামানের গর্জন, আহতদের আর্তরব ও যোদ্ধাদের সিংহনাদ যখন চরমে উঠেছে, নেপোলিয়ন তখন বুঝলেন তাঁর মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত!

এতক্ষণ শত্রুদের বাম পার্শ্ব আক্রমণের পর আক্রমণ করছিল এবং ডান পাশের অল্পসংখ্যক ফরাসিরা করছিল কেবল আত্মরক্ষা। কিন্তু অধিকাংশ ফরাসি সৈন্য এখনও পর্যন্ত চিত্রলিখিতের মতন স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে প্রধান সেনাপতির বা সম্রাটের আদেশের অপেক্ষা করছিল। এইবারে নেপোলিয়ন আদেশ দিলেন, 'অগ্রসর হও! আক্রমণ করো!'

নেপোলিয়নের বিভিন্ন বিভাগের সেনানায়করা— লেনস, বার্নাডোটে, লেগরান্ড ও সেন্ট হিলেয়ার প্রভৃতি হুকুম পেয়েই আপন আপন পলটনের পুরোভাগে গিয়ে দাঁড়ালেন। ফরাসিদের আক্রমণ আরম্ভ হল।

রুশ সৈন্যরা তখন উচ্চভূমি বা পাহাড়ের উপর থেকে নেমে তির্যক বা তেরচাভাবে ফরাসিদের দক্ষিণ পার্শ্বের দিকে ছুটে যাচ্ছিল। আচম্বিতে ফরাসিদের বাম পার্শ্ব থেকে এই প্রবল আক্রমণের জন্যে তারা প্রস্তুত ছিল না। বিস্ময়ের ধাক্কা সামলাবার আগেই তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পশ্চাৎপদ হতে লাগল। ফরাসিরা তাদের ঠেলে নিয়ে গিয়ে পাহাড়ের আশপাশে ছড়িয়ে দিলে এবং নিজেরা উচ্চভূমি দখল করলে। শত্রুদের এ অংশে ছিল Reserve বা সংরক্ষিত সৈন্য এবং এর মধ্যে ছিলেন স্বয়ং রুশ সম্রাট।

রুশ ফৌজের সর্বশ্রেষ্ঠ অংশ— অর্থাৎ রক্ষী সৈন্যরা তখন অস্টারলিটজের ক্ষেত্র দিয়ে ফরাসিদের ডানদিকে অগ্রসর হচ্ছিল। তারাও ফরাসিদের মধ্যভাগ থেকে এই অভাবিত আক্রমণে প্রথমটা হতভম্ব হয়ে গেল। ইতিমধ্যে রুশ সম্রাট ও অন্যান্য সেনাপতিরা এসে পড়ে তাদের আবার উৎসাহিত করে তুললেন। রুশ রক্ষী সৈন্যরা প্রতি-আক্রমণ করলে এবং দেখতে দেখতে ফরাসিরাই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। অনেকে পালাতেও লাগল।

যুদ্ধক্ষেত্রের এ অংশটা ছিল নেপোলিয়নের চোখের আড়ালে। কিন্তু কোলাহল শুনেই তিনি আন্দাজ করলেন, গতিক সুবিধার নয়, তাড়াতাড়ি সেনাপতি র্যাপকে ডেকে বললেন, 'যাও, যাও! ব্যাপার কী দেখে এসো!'

কয়েক দল রক্ষী-সৈন্য নিয়ে র্যাপ ছুটে গেলেন। পথিমধ্যে তাঁকে দেখে ও তাঁর উৎসাহবাণী শুনে পলাতক ফরাসিরা আবার ফিরে দাঁড়াল। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে র্যাপ দেখলেন, বিজয়ী রুসীয়রা তরবারি চালিয়ে ছত্রভঙ্গ ফরাসিদের খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলছে! র্যাপের নতুন সৈন্যদের দেখে শত্রুরা কামান সাজাতে আরম্ভ করলে।

কিন্তু র্যাপ তাদের কামান ছোড়বার সময় দিলেন না। চিৎকার করে বললেন, 'সৈন্যগণ, তোমাদের বন্ধুদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নাও!' ফরাসি রক্ষীরা রুশ রক্ষীদের আক্রমণ করলে।

দুই পক্ষের রক্ষীদের মধ্যে যখন বিষম যুদ্ধ চলছে, সেই অবসরে ছত্রভঙ্গ ফরাসিরা আবার শ্রেণিবদ্ধ হয়ে ফিরে দাঁড়াল। আধ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধের গতি আবার ফিরে গেল। রুশিয়া ও অস্ট্রিয়ার দুই সম্রাটের চোখের সামনে তাদের সৈন্যদের মৃতদেহের স্তূপ ক্রমেই উচ্চ হয়ে উঠতে লাগল! রুশরা পালাতে আরম্ভ করলে।

রক্তাক্ত দেহে ভগ্ন তরবারি হস্তে র্যাপ ফিরে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে নেপোলিয়নকে বললেন, 'সম্রাট, শত্রুরা পলায়ন করছে!'

শত্রুদের বাম পার্শ্ব তখন প্রধান দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফরাসিদের ঘিরে ফেলতে এসে শত্রুরা সভয়ে দেখলে, এখন তাদেরই তিনদিকে ফরাসি সৈন্য। দলে দলে তারা মারা পড়তে লাগল। বেড়াজাল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে শত্রুরা বরফে ঢাকা এক হ্রদের উপর দিয়ে পালাতে শুরু করলে। অত সৈন্যের পদভার সইতে না পেরে হুড়মুড় করে ভেঙে গেল তুষারের আচ্ছাদন। কনকনে ঠান্ডা হ্রদ যেন হাঁ করে গিলে ফেললে হাজার হাজার মানুষকে। সে ভীষণ দৃশ্য দেখে বিজয়ী ফরাসিরাও ভয়ে শিউরে উঠল।

এই হল চিরস্মরণীয় অস্টারলিটজ যুদ্ধ (২ ডিসেম্বর, ১৮০৫ খ্রিস্টাব্দে)।

তিরাশি হাজার রুশ ও অস্ট্রিয়ান সৈন্যদের মধ্যে প্রায় অর্ধাংশ হত, আহত বা বন্দি হল। রুশ সম্রাট নিজের দেশে পালিয়ে গেলেন। অস্ট্রিয়ার সম্রাট সেইদিন সন্ধ্যাতেই নেপোলিয়নের কাছে সন্ধি প্রার্থনা করতে এলেন। প্রুশিয়ার অধিপতি ফরাসিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করতে উদ্যত হয়েছিলেন, কিন্তু ব্যাপার দেখে মুষড়ে পড়ে নেপোলিয়নের অদ্ভুত বিজয়লাভের জন্যে অভিনন্দন জ্ঞাপন করলেন। ট্রাফালগারের জলযুদ্ধে জিতে ইংল্যান্ড আশায় উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল, কিন্তু অস্টারলিটজের আশ্চর্য খবর সে আশাকে পরিণত করলে গভীর নিরাশায়! অস্টারলিটজে নেপোলিয়নের আশ্চর্য যুদ্ধকৌশল নেলসনের বিজয়গৌরবকে করে দিলে পরিম্লান। ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী উইলিয়ন পিট ভগ্নহৃদয়ে প্রাণত্যাগ করলেন। নেপোলিয়নের শত্রুদের সমস্ত ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে গেল।

অস্টারলিটজের যুদ্ধ নেপোলিয়নের অপূর্ব রণপ্রতিভার অতুলনীয় নিদর্শন। যুদ্ধের শেষে তিনি সৈন্যদের সম্বোধন করে এই কথাগুলি বলেছিলেন:

'সৈন্যগণ, শাবাশ! তোমাদের সাহসের কাছ থেকে আমি যা যা প্রত্যাশা করেছিলুম, অস্টারলিটজের যুদ্ধে তোমরা সে সমস্তই সফল করেছ; তোমাদের ইগল-চিহ্নিত পতাকাকে তোমরা অমর যশোগৌরবে মণ্ডিত করে তুলেছ। রুশিয়া ও অস্ট্রিয়ার সম্রাটদ্বয়ের দ্বারা পরিচালিত এক লক্ষ সৈন্যকে তোমরা চার ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে বিতাড়িত বা বন্দি করেছ। যারা তোমাদের হাত ছাড়িয়ে পালাতে গিয়েছিল, তারা হ্রদের জলে ডুবে মরেছে। এই চিরন্তন মহিমায় সমুজ্জ্বল যুদ্ধের ফল হচ্ছে চল্লিশটি শত্রু-পতাকা, একশো কুড়ি কামান, কুড়িজন সেনাপতি ও তিরিশ হাজারেরও বেশি বন্দি। সংখ্যায় প্রবল হয়েও শত্রুরা তোমাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারেনি, এরপরে তোমাদের আর কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভয় করতে হবে না।... ভবিষ্যতে তোমাদের দলের কেউ যদি বলে যে— আমি অস্টারলিটজের যুদ্ধে হাজির ছিলুম, তাহলে উত্তরে সে এই কথাই শুনবে— তাহলে তুমি হচ্ছ মহাবীরদেরই একজন।'

সাত। অধঃপতনের পূর্বাভাস

নেপোলিয়নের সূর্য এখন মধ্যগগনে। ইয়োরোপে শত্রুর অভাব নেই, কিন্তু কেউ আর তাঁর সম্মুখে দাঁড়াতে ভরসা করে না। অস্টারলিটজের ফলাফল দেখে সকলে স্তম্ভিত।

নেপোলিয়ন তাঁর দাদা জোসেফকে বসিয়ে দিলেন নেপলসের সিংহাসনে। আর-এক ভাই লুইকে পরালেন হল্যান্ডের রাজমুকুট।

ফ্রান্সের সীমান্তে তখন একমাত্র যথার্থ স্বাধীন রাজ্য ছিল প্রুশিয়া। তার নিয়মিত সৈন্যসংখ্যা দেড় লক্ষ। গত বৎসরে সে সম্মিলিত শক্তিদের সঙ্গে যোগদান করেনি বটে, কিন্তু এখন তার মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা গেল।

প্রুশিয়ার আশপাশের ক্ষুদ্রতর জার্মান রাজ্যগুলি প্রুশিয়ার সম্রাটকে নিজেদের মধ্যে প্রধান বলে মেনে চলত। কিন্তু নেপোলিয়ন তাদের এক নতুন মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ করলেন— যার ফলে এবার থেকে তাঁকেই তারা অধিরাজ বলে স্বীকার করবে।

প্রুশিয়ার রাজা তৃতীয় ফ্রেডারিক উইলিয়ম অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন, তার উপরে রুশিয়ার জার আলেকজান্ডার তাঁকে আরও উত্তেজিত করে বললেন, 'আপনি যুদ্ধ ঘোষণা করুন, আমিও আপনাকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করব।'

প্রুশিয়া যুদ্ধ ঘোষণা করলে। প্রুশিয়া তখনও নেপোলিয়নকে চেনেনি। তার সৈন্যরা সগর্বে ফ্রান্সের দিকে অগ্রসর হল।

তারা কিছু জানতে পারবার আগেই নেপোলিয়ন সসৈন্যে বিদ্যুদবেগে এগিয়ে তাদের পিছনে গিয়ে পড়লেন— ফলে দেশ থেকে প্রুশিয়ানদের নতুন সৈন্য ও রসদ আসবার পথ বন্ধ হয়ে গেল। তাদের একদিকে ফরাসি দেশ, আর-একদিকে ফরাসি সৈন্য!

প্রুশিয়ানদের তখন প্রধান লক্ষ্য হল, স্বদেশে ফেরবার পথ সাফ করা। তারপর একদিনেই জেনা ও অয়েরস্টাউট নামক দুই যুদ্ধক্ষেত্রে প্রুশিয়ার দুই বাহিনীর সঙ্গে নেপোলিয়নের দুই ফৌজের শক্তি পরীক্ষা হল (১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে)।

পরীক্ষার ফল? চমকপ্রদ! সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়ে প্রুশিয়ানরা পলায়ন করলে। এবং তার তেরো দিন পরে বিজয়ী নেপোলিয়ন প্রবেশ করলেন প্রুশিয়ার রাজধানী বার্লিন শহরে। সমস্ত প্রুশিয়া রাজ্য ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মতন।

বার্লিন শহরে বসে নেপোলিয়ন দিকে দিকে আদেশবাণী পাঠালেন, 'আজ থেকে ইয়োরোপের আর কোনও দেশ ইংল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য বা অন্য কোনও কিছুর সম্পর্ক রাখতে পারবে না। যে-কোনও দেশে ইংরেজ নামলেই বন্দি হবে। যে-কোনও বন্দরে ইংরেজ জাহাজ এলেই বাজেয়াপ্ত হবে।'

এইবার রুশিয়া এল নেপোলিয়নকে আক্রমণ করতে। ইলাউ প্রান্তরে সম্মিলিত রুশ ও প্রুশিয়ান সৈন্যদের সঙ্গে ফরাসিদের এক ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে রুশ আর প্রুশিয়ানদের আঠারো হাজার ও ফরাসিদের পনেরো হাজার লোকক্ষয় হয়। সারাদিন মরিয়ার মতন লড়ে দুই পক্ষই শেষটা হাঁপিয়ে পড়ে যুদ্ধে ক্ষান্তি দেয় এবং দুই পক্ষই বলে, 'জয়লাভ করেছি আমরা' (১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে)!

তারপরেই ফ্রেডল্যান্ড ক্ষেত্রে দুই পক্ষের আবার দেখা হল। সকাল দশটা থেকে বিকাল চার-পাঁচটা পর্যন্ত সমানে লড়াই চলল। অবশেষে নেপোলিয়ন নিজে সমস্ত সৈন্য নিয়ে শত্রুদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, রুশ ও প্রুশিয়ানরা সে আক্রমণ সহ্য করতে পারলে না। যুদ্ধক্ষেত্রে পূর্ণ বারো হাজার মৃতদেহ ফেলে বাকি সৈন্য নিয়ে রুশ জেনারেল বেনিগসেন বেগে পলায়ন করলেন।

রুশিয়ার জার ও প্রুশিয়ার রাজা তখন সন্ধি করা ছাড়া আর কোনও উপায় দেখলেন না, এই সন্ধির নাম টিলসিটের সন্ধি (১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে)। এই বছরেই নেপোলিয়ন তাঁর ছোটোভাই জেরোম বোনাপার্টকে প্রুশিয়ার অন্যতম প্রদেশ ওয়েস্টফালিয়ার সিংহাসনে বসিয়ে দিলেন।

বিজয়পতাকা উড়িয়ে নেপোলিয়ন ফিরে এলেন আবার স্বদেশে। ইয়োরোপে তিনি হলেন সকল রাজার মাথার মণি— মহারাজাধিরাজ!

তারপর নেপোলিয়নের প্রধান কর্তব্য হল, ইয়োরোপের সমুদ্রতীরবর্তী সকল দেশ থেকে ইংল্যান্ডের প্রভুত্ব লুপ্ত করা। তাঁর শক্তি তখন অসীম, তাঁর মুখের একটিমাত্র কথায় ইয়োরোপের সর্বত্র রাজ্যের নাম বদলে যায়, রাজার মুকুট খসে পড়ে। তিনি ভয় দেখিয়ে সুইডেন ও পোর্তুগালকে বাধ্য করলেন এবং গোপনে স্পেনের সম্মতি নিয়ে করলেন পোর্তুগালের অঙ্গচ্ছেদ। তারপর ফরাসি সৈন্যরা একে একে স্পেনের দরকারি জায়গাগুলি দখল করে সর্বশেষে তার রাজধানী মাদ্রিদও অধিকার করলে। অন্যায় ও চতুর কৌশলের দ্বারা স্পেনের বুৰ্বো-বংশীয় রাজাদের তাড়িয়ে সিংহাসনে বসানো হল জোসেফ বোনাপার্টকে (১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে)। এবং জোসেফের পরিত্যক্ত নেপলসের সিংহাসন লাভ করলেন তাঁর ভগ্নীপতি মুরাট। ওদিকে রোমের পোপের অধিকৃত প্রদেশের উপরেও ভাগ বসানো হল। পোপ ক্রুদ্ধ হয়ে নেপোলিয়নকে ধর্মসমাজচ্যুত করলেন (১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে)।

সমস্ত ইয়োরোপকে স্ববশে আনবার চেষ্টা করার মধ্যে নেপোলিয়নের মহত্ত্ব প্রকাশ পায়নি। তাঁর পক্ষে খুব একটা বড়ো যুক্তি ছিল নিশ্চয়ই এবং সে যুক্তি হচ্ছে, ইংল্যান্ডের গর্ব খর্ব করা। আটঘাট বেঁধে বাণিজ্যজীবী ইংল্যান্ডকে জব্দ করতে পারলে নেপোলিয়নের আর কোনও ভাবনা থাকবে না। আজকের হিটলারও এই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন।

কিন্তু স্পেনের স্বাধীনতাপ্রিয় জনসাধারণ ফরাসিদের প্রভুত্ব মাথা পেতে গ্রহণ করলে না। তারা বিদ্রোহী হল এবং সুযোগ বুঝে ইংল্যান্ডও তাদের সাহায্যের জন্যে সৈন্য পাঠিয়ে দিলে। তার ফলে, ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে সুদীর্ঘ পাঁচ বৎসর পর্যন্ত নেপোলিয়নকে স্পেন দেশে প্রায় আড়াই লক্ষ সৈন্য মোতায়েন রাখতে হল। এইখানেই ইংরেজ সেনাপতি ডিউক অফ ওয়েলিংটন প্রথম নাম কেনেন। ফরাসি সেনাপতিরা ছোটো ছোটো যুদ্ধে তাঁর কাছে হেরেও যান। ব্যাপার দেখে শেষটা নেপোলিয়নও স্পেনে গিয়ে হাজির হন। অল্প দিনের ভিতরেই তিনি স্পেনের উত্তর থেকে দক্ষিণদিক পর্যন্ত সমস্ত জায়গায় আবার ফরাসিদের বিজয়পতাকা উড়িয়ে স্বদেশে ফিরে গেলেন, অন্যান্য সেনাপতিদের হাতে কর্তব্যভার অর্পণ করে। কিন্তু নেপোলিয়নের অবর্তমানে ফরাসিরা আবার কাহিল হয়ে পড়ে। ক্রমাগত যুদ্ধ চলতে থাকে— কিন্তু কোনওটাই খুব বড়ো যুদ্ধ নয়। কখনো জেতে ফরাসিরা, কখনো ইংরেজরা।

নেপোলিয়ন স্পেনের যুদ্ধ ও বিদ্রোহ নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাতে পারেননি, কারণ তার চেয়েও ঢের বড়ো বড়ো হাঙ্গামা নিয়ে তাঁকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল।

টিলসিটের যুদ্ধের পর কিছুকাল কাটল বেশ ভালোয় ভালোয়। কিন্তু ধীরে ধীরে আকাশে আবার মেঘ হতে লাগল পুঞ্জীভূত। অস্ট্রিয়া আবার শান্তিভঙ্গের চেষ্টা আরম্ভ করলে। কিন্তু জাতে এক হলেও প্রুশিয়া আপাতত অস্ট্রিয়ার দলে ভিড়তে রাজি হল না, তাঁর যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে।

নেপোলিয়ন স্পেন নিয়ে জড়িয়ে পড়েছেন দেখে অস্ট্রিয়ার সাহস বাড়ল এবং সে যুদ্ধ না করে ছাড়বে না দেখে নেপোলিয়ন তাড়াতাড়ি স্পেন থেকে চলে এলেন; কারণ আর্কডিউক চার্লস প্রায় দুই লক্ষ সৈন্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন।

এবারে নেপোলিয়নের সঙ্গে ফরাসি সৈন্য ছিল না বললেই চলে। তাঁকে যুদ্ধযাত্রা করতে হল মিত্র জার্মান রাজাদের সেনাদল নিয়ে। এবারকার অভিযানে তিনি প্রমাণিত করলেন, যুদ্ধজয়ের প্রধান কারণ হচ্ছে, সেনাপতির নিজস্ব প্রতিভা!

এক হপ্তার মধ্যে কয়েকটি ছোটো ছোটো যুদ্ধের পরই খবর পাওয়া গেল যে, নেপোলিয়ন শত্রুদের কাছ থেকে আদায় করেছেন একশোটা কামান ও চল্লিশটা পতাকা ও বন্দি করেছেন পঞ্চাশ হাজার সৈন্য! ফ্রান্সের যুদ্ধ জিতছে জার্মানরা! এই সময়ে নেপোলিয়ন জীবনে দ্বিতীয় ও শেষবার শত্রুর গুলিতে সামান্যভাবে আহত হন।

তারপর এসলিং ক্ষেত্রে নেপোলিয়ন বহুকাল পরে প্রথমবার পরাজিত হলেন। অস্ট্রিয়ানরা জিতেছিল সংখ্যাধিক্যের জন্যে। এই যুদ্ধে তাঁর মহাবীর ও বিশ্বস্ত সেনাপতি লেনস সাংঘাতিকরূপে আহত হয়ে মারা পড়লেন। তাঁর মৃত্যুভয় ছিল না, কিন্তু নেপোলিয়নের সঙ্গে থেকে আর সে গৌরব অর্জন করতে পারবেন না তা-ই নিয়েই বারংবার হাহাকার করতে লাগলেন।

অন্যান্য সেনাপতিরা নেপোলিয়নকে পলায়ন করবার পরামর্শ দিলেন।

নেপোলিয়ন দৃঢ়স্বরে বললেন, 'না! এখন থেকে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাই হবে আমার রাজধানী— আমার আশ্রয়স্থল। আমি তাকে ছাড়বও না, নিজেও পিছু হটব না!'

দেখতে দেখতে সাম্রাজ্যের চারিদিক থেকে দলে দলে ফরাসি সৈন্য ছুটে এল নেপোলিয়নকে সাহায্য করতে। প্রায় দেড় লক্ষ সৈন্য নিয়ে অগ্রসর হয়ে তিনি বিখ্যাত ওয়াগ্রাম যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ট্রিয়ানদের এমনভাবে পরাজিত করলেন যে, শত্রুরা আর সেখানে দাঁড়াল না (১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে)।

নেপোলিয়ন আবার ভিয়েনায়! সন্ধি হয়ে গেল।

নেপোলিয়ন ফ্রান্সে ফিরে এলেন। তার পরের প্রধান ঘটনা হচ্ছে জোসেফাইনের সঙ্গে তাঁর বিবাহবন্ধনচ্ছেদ।

সবাই বলতে লাগল এবং তিনি নিজেও বুঝলেন যে, উত্তরাধিকারী না থাকলে তাঁর মৃত্যুর পরে ফ্রান্সের সিংহাসন নিয়ে অনেক বিভ্রাট ঘটবার সম্ভাবনা। রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করবার জন্যে অস্ট্রিয়ার সম্রাট-দুহিতা মেরিয়া লুইসাকে তিনি দ্বিতীয় পত্নীরূপে গ্রহণ করলেন (১৮১০ খ্রিস্টাব্দে)। এবং পরের বছরেই তিনি লাভ করলেন একটি পুত্রসন্তান। সারা দেশে পড়ে গেল সমারোহের সাড়া! আপাতত নবপুত্রের উপাধি হল 'রোমের রাজা'। রোমে তখন পোপ ছিলেন না। কারণ ইতিমধ্যেই তাঁকে ধর্মসমাজচ্যুত করেছিলেন বলে নেপোলিয়নের হুকুমে পোপ হয়েছেন নির্বাসিত ও সিংহাসনচ্যুত!

কিছুকাল সুখ-শান্তিতে কাল কাটাবার পর নেপোলিয়ন আবার শুনতে পেলেন রুশ ভল্লুকের গর্জন!

সত্য সত্যই নেপোলিয়নের আর অস্ত্র ধরবার সাধ ছিল না। মানবজীবনের যা-কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে, সমস্তই সফল হয়েছে তাঁর জীবনে— এমন সফলতা পৃথিবী আর কখনো দেখেনি। এমনকী প্রৌঢ় বয়সে তাঁর পুত্রকামনাও বিফল হয়নি। সমস্ত ইয়োরোপ তাঁর পদতলে— একমাত্র ইংল্যান্ড ছাড়া। এবং ইংল্যান্ডের সঙ্গেও তিনি সন্ধিস্থাপনের জন্যে চেষ্টা করছিলেন। ভেবেছিলেন বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবেন শান্তির স্বপ্ন দেখে।

কিন্তু বিধাতার লিখন অন্যরকম। পৃথিবীকে তিনি বোধহয় দেখাতে চান, মানুষ কত উঁচুতে উঠতে ও কত নিচুতে পড়তে পারে।

অতি-সৌভাগ্যে মহামানবরাও হয়তো অন্ধ হন। নেপোলিয়নের প্রথম ভ্রম হয়েছিল, স্পেন নিয়ে অনর্থক গোলমাল করা। তাঁর দ্বিতীয় এবং প্রধান ভ্রম, রুশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযান। রুশিয়াকে হারালে তাঁর গৌরববৃদ্ধির কোনও সম্ভাবনাই নেই, কিন্তু রুশিয়ার কাছে হারলে তাঁরই সর্বনাশ!

রুশিয়ায় যুদ্ধযাত্রা করবার আগে নেপোলিয়ন ড্রেসডেন শহরে রাজারাজড়াদের নিয়ে এক দরবারের আয়োজন করলেন। এমন অপূর্ব রাজসম্মিলন দেখবার সুযোগ ইয়োরোপের আর কখনো হয়নি। সম্রাট নেপোলিয়নের সামনে এসে দাঁড়ালেন অস্ট্রিয়ার সম্রাট ও প্রুশিয়ার অধিপতি— অনুগ্রহপ্রার্থী সামন্তরাজের মতন। ছোটো-বড়ো-মাঝারি আরও কত অভিজাতবংশীয় রাজা, গ্র্যান্ড ডিউক ও ডিউকের দল এলেন কালকের ভুঁইফোঁড় সম্রাট প্রথম নেপোলিয়নকে অভিনন্দিত করতে ও তাঁর মুখের দুটো মিষ্টি কথা শুনতে! সেদিন নেপোলিয়নের মনে ভাব হয়েছিল কেমন, সে কথা কেউ জানে না— আমরা অনুমান করতে পারি মাত্র! নেপোলিয়নের ভাগ্যলক্ষ্মীই বিদায় নেওয়ার আগে বোধহয় এই শেষ মেলা বসিয়ে গেলেন!

১৮১২ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে নেপোলিয়ন প্রবেশ করলেন রুশিয়ার মধ্যে— সঙ্গে ছিল তাঁর পাঁচ লক্ষ সৈন্য।

কিন্তু তারপর যে ব্যাপার আরম্ভ হল সেটা আর বিস্তৃতভাবে বলবার দরকার নেই, স্থানও নেই।

নেপোলিয়ন যত অগ্রসর হন, রুশরা তত পিছিয়ে যায়! তারা সামনাসামনি লড়াই করে না, কেবল পিছিয়ে যায়! পথে যেসব গ্রাম পড়ে সেগুলো মরুভূমির মতন জনশূন্য, খাদ্যশূন্য। মাঝে মাঝে আশপাশে পিছনে শত্রুদল হঠাৎ যেন আকাশ থেকে সদ্য পতিতের মতন আবির্ভূত হয়, খানিক হানাহানি লুঠতরাজ করে অদৃশ্য হয় আবার স্বপ্নের মতন! এই মরুপ্রদেশে, দেশ থেকে এতদূরে এসে এমন বৃহৎ বাহিনীর খোরাক জোগান দেওয়া অসম্ভব হয়ে ওঠে, ফরাসিরা অনাহারে মারা পড়তে লাগল!

স্মোলেনসক শহরে ফরাসিরা বাধা পেলে রুশ সৈনিকদের কাছে। ফরাসিদের মতন রণচতুর না হলেও রুশরা মরিয়া হয়ে লড়তে লাগল। কিছুতেই তারা হটতে চায় না! প্রায় ছয় হাজার ফরাসি সৈন্য বধ করে রাত্রে সারা শহরে আগুন লাগিয়ে দিয়ে রুশরা আবার কোথায় চলে গেল।

তারপর বোরোডিনো গ্রামের কাছে হল এক বড়ো যুদ্ধের আয়োজন। নেপোলিয়নের সৈন্যসংখ্যা এক লক্ষ বিশ হাজার, রুশদের সংখ্যা আরও বেশি। দীর্ঘকালব্যাপী ভয়াবহ যুদ্ধের পর রুশরা হেরে পালিয়ে গেল। এই যুদ্ধে পঞ্চাশ হাজার রুশ ও তিরিশ হাজার ফরাসি সৈন্য মারা পড়ল। একটিমাত্র যুদ্ধে নেপোলিয়ন আর কখনো এত লোক হারাননি। বোরোডিনোয় অসীম বীরত্ব ও রণকৌশল দেখিয়ে সেনাপতি নে 'প্রিন্স' উপাধি লাভ করেছিলেন (১৮১২ খ্রিস্টাব্দে)।

ফরাসিদের সামনে দাঁড়িয়ে সত্যিকার যুদ্ধ করা যে কী মারাত্মক ব্যাপার, বোরোডিনোর ক্ষেত্রেই রুশরা তা বুঝে আর সম্মুখযুদ্ধে প্রবৃত্ত হল না। নেপোলিয়ন বিনা বাধায় জনশূন্য মস্কো নগরে প্রবেশ করে আশ্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ভাবলেন, এতদিন পরে আশ্রয় পাওয়া গেল। কিন্তু দু-দিন যেতে-না যেতেই রুশরা আগুন লাগিয়ে সারা শহর পুড়িয়ে দিলে!

এমন অসম্ভব শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করাও অসম্ভব! নেপোলিয়ন আবার স্বদেশের দিকে প্রত্যাগমন করতে লাগলেন। কিন্তু প্রত্যাগমনের পথ হল আরও ভয়ানক! রুশিয়ার বিখ্যাত শীত এসে আক্রমণ করলে ফরাসিদের! পথ, প্রান্তর, অরণ্য— তুষারে তুষারে সব সাদা ধপাধপ করছে, নদীর জল জমে বরফ! শূন্য থেকে ঝরঝর করে ঝরছে তুষারের ঝরনা! এবং ঝোড়ো বাতাস সর্বাঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ছে তুষারেরও চেয়ে কনকনে হয়ে! প্রতিদিন নিয়মিতভাবে হাজার হাজার তুষারার্ত সৈনিক মারা পড়তে লাগল। তার উপরে যখন-তখন এপাশে-ওপাশে শত্রু-সৈন্যেরা এসে আক্রমণ করতে ছাড়ে না।

এই ভীষণ অভিযান শেষ হলে পর জানা গেল, রুশিয়ার কবলগত হয়ে মারা পড়েছে বা বন্দি হয়েছে তিন লক্ষ ফরাসি সৈন্য! অথচ সমগ্র অভিযানে নেপোলিয়নের বাহিনী একবারও পরাজয়ের গ্লানি মাখেনি। তাদের মৃত্যুর কারণ— শীত ও অনাহার!

আট। ভাগ্যলক্ষ্মীর ত্যাজ্যপুত্র

ইয়োরোপের শ্রেষ্ঠ শক্তিরা পাঁচ-পাঁচবার নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে সম্মিলিত হয়েছিল, কিন্তু পাঁচবারই তাদের আর্তনাদ করতে হয়েছে একজনমাত্র মানুষের পায়ের তলায় পড়ে!

এইবারে ষষ্ঠবারের জন্যে তারা আবার সম্মিলিত হল। এবারে দলে আছে রুশিয়া, প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়া, ইংল্যান্ড ও সুইডেন।

নেপোলিয়ন রুশিয়ায় নিজের সর্বনাশ করে এসেছেন। যে শিক্ষিত সেনাদলের জন্যে ইয়োরোপে তিনি অপরাজেয় হয়েছিলেন, তাদের কঙ্কাল পড়ে আছে এখন রুশিয়ার তুষার-মরুর মধ্যে।

কিন্তু নেপোলিয়ন নামের এমনই মোহিনী শক্তি, আবার তাঁর আহ্বানে প্রাণ দিতে ছুটে এল দলে দলে নতুন বীর! যদিও এই নতুন বাহিনীর মধ্যে আগেকার মতন শিক্ষিত ও রণপ্রবীণ সেপাই নেই, তবু তাদের নিয়েই আবার তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হতে কিছুমাত্র দ্বিধাবোধ করলেন না।

প্রথমে লড়াই হল প্রুশিয়া ও রুশিয়ার সঙ্গে (১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে)।

একেবারে কাঁচা সেপাই, তার উপরে কামানের অভাব— কামানও খোয়া গেছে রুশিয়ায়। তবু লুটজেন ও বউটজেন ক্ষেত্রে মায়াবী নেপোলিয়নকে সঙ্গে পেয়ে নবীন ফরাসি সৈনিকরা এমন উন্মাদনা ও বীরত্ব প্রকাশ করলে যে, শত্রুরা দুইবারই পলায়ন করতে বাধ্য হল।

নেপোলিয়ন উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন, 'আমি আজ বিশ বৎসর ধরে ফরাসি সৈন্য চালনা করছি, কিন্তু এর চেয়ে সাহস আর ঐকান্তিকতা আর কখনো দেখিনি! আমার সাহসী, নবীন সৈন্য এরা। গৌরব আর বীরত্বের ধারা এদের শিরায় শিরায়।'

নেপোলিয়ন আবার বার্লিনের কাছে! রুশ ও প্রুশিয়ানরা পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে অস্ট্রিয়ায় এবং অস্ট্রিয়াও ভিড়ে গেল তাদের দলে। সংখ্যায় তারা দুই লক্ষ। রুশ ও প্রুশিয়ানদেরও ফৌজে হাজার হাজার নতুন সেপাই এসে যোগ দিয়েছে। সুইডেনও পাঠিয়েছে কয়েক হাজার সৈন্য। দাদা জোসেফের ভায়রাভাই বার্নাদেটকে নেপোলিয়ন দয়া করে সুইডেনের সিংহাসন দান করেছিলেন, এখন সে তারই প্রতি দিন দিতে এসেছে উপকারীর মাথার উপরে খাঁড়া তুলে।

অন্যান্য সেনাপতিদের সসৈন্যে দিকে দিকে রেখে মূল ফৌজ নিয়ে নেপোলিয়ন শত্রুদের আক্রমণ করলেন। কিন্তু শত্রুরা যুদ্ধ করতে লাগল নতুন পদ্ধতিতে। নেপোলিয়নকে দেখলেই তারা পশ্চাৎপদ হয়, আর লড়াই করে হারায় অন্যান্য ফরাসি সেনাপতিদের। তবু নেপোলিয়ন ড্রেসডেন শহরের কাছে আবার তাদের যুদ্ধে নামতে বাধ্য করলেন। এখানে শত্রুদের সঙ্গে ছিলেন ভূতপূর্ব ফরাসি সেনাপতি জেনারেল মোরো— যাঁর মুন্ডু কাটা যায়নি নেপোলিয়নেরই উদারতায়!

ড্রেসডেনের যুদ্ধই হচ্ছে বিজয়ী নেপোলিয়নের শেষ বড়ো যুদ্ধ (১৮১৩, জুলাই)। এই যুদ্ধে জয়ী হয়ে তিনি বিশ হাজার শত্রু বন্দি করেন। এবং এইখানেই মারা পড়েন জেনারেল মোরো।

কিন্তু যুদ্ধে জিতলে কী হবে, এবারে শত্রুসংখ্যা যেন অনন্ত! তাদের কাবু করা অসম্ভব। উপরন্তু তারা নেপোলিয়নের সঙ্গে শক্তিপরীক্ষা করে না, যেখানে নেপোলিয়ন নেই, সেইখানেই তাদের আবির্ভাব! এমনি করে দিনে দিনে ফরাসিরা যত দুর্বল হয়ে পড়ছে, শত্রুরা হয়ে উঠছে ততই প্রবল!

তারপরে আরম্ভ হল লিপজিকের তিন দিনব্যাপী ভয়াবহ যুদ্ধ। আসলে এটি হচ্ছে ধারাবাহিক ভিন্ন ভিন্ন যুদ্ধের সমষ্টি (১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে, ১৬ থেকে ১৮ পর্যন্ত)। মিত্রপক্ষে ছিল তিন লক্ষ সৈন্য এবং নেপোলিয়নের সৈন্যসংখ্যা মাত্র এক লক্ষ বিশ হাজার। তার উপরে যুদ্ধের সময়ে তাঁর সামন্ত রাজাদের বহু সৈন্য শত্রুপক্ষে গিয়ে যোগদান করেছিল। তবু নেপোলিয়ন প্রাণপণে লড়লেন, কিন্তু প্রায় ষাট হাজার শত্রু বধ করেও অসম্ভবকে আর সম্ভব করতে পারলেন না। অবশেষে তাঁর কামানের গোলাও ফুরিয়ে গেল। কেবল গোলা নয়, ফরাসিদেরও লোকক্ষয় হল পঞ্চাশ হাজার। তাঁর পক্ষে তখন পশ্চাৎপদ হওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় রইল না।

এই পরাজয়ের পর সমগ্র ইয়োরোপের দিকে দিকে নতুন নতুন শত্রু নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে লাগল। এমনকী, তাঁর দয়ায় আজ যারা মাথায় পরছে রাজমুকুট, তারাও শত্রুরূপে আত্মপ্রকাশ করতে লজ্জিত হল না— এমনকী তাঁর ভগ্নীপতি ও হাতে গড়া নেপলসের রাজা মুরাট পর্যন্ত! ইতালিতে আবার ফরাসি প্রভুত্ব বিলুপ্ত হল, স্পেনেও তা-ই!

নেপোলিয়ন তখন সন্ধি প্রার্থনা করলেন! মিত্রপক্ষ সন্ধির যে শর্ত দিলেন তা অন্যায় নয়। নেপোলিয়নকে তাঁরা কেবল ফ্রান্স রাজ্য ছেড়ে দিতে রাজি হলেন, কিন্তু সে শর্ত বাতিল করে নেপোলিয়ন নিজের দুর্ভাগ্যকে ডেকে আনলেন নিজেই!

আবার যুদ্ধ আরম্ভ হল, নেপোলিয়ন লড়তে লাগলেন সপ্তরথীর দ্বারা বেষ্টিত একা অভিমন্যুর মতন! মিত্রপক্ষের অসংখ্য সৈন্যের তুলনায় তাঁর সৈন্যবল নগণ্য! সাধারণ সৈনিকের মতন তিনি যুদ্ধসাগরে ঝাঁপ দিয়ে পড়েন, তাঁর চারিদিক দিয়ে ছুটতে থাকে মৃত্যু-ঝটিকা!

মন্টরিউ যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই যেখানে ঘোরতর হয়ে উঠেছে, নেপোলিয়ন সেইখানে গিয়ে হাজির! অশ্বপৃষ্ঠে নয়, পদব্রজে!

বুড়ো গোলন্দাজরা তাদের প্রিয় সম্রাটকে এই বিপদের মধ্যে এসে দাঁড়াতে দেখে একেবারে মারমুখো হয়ে উঠল।

তারা আজন্ম সৈনিক, কেউ আদবকায়দা ও মার্জিত ভাষার ধার ধারে না। ছেলেকে স্নেহশীল বাপ যেমনভাবে ধমক দেয়, তেমনিভাবেই একজন কঠোর স্বরে বললে, 'সম্রাট! এ তোমার জায়গা নয়!'

নেপোলিয়ন হেসে বললেন, 'বীর, যে বুলেটে আমি মরব, এখনও তা তৈরি হয়নি!'

দুর্বল হয়েও একে একে নেপোলিয়ন আরও কয়েকটি যুদ্ধে জয়লাভ করলেন— কিন্তু বৃথা! শত্রুরা বেড়ে উঠছে রক্তবীজের ঝাড়ের মতন! নেপোলিয়নের সৈন্যসংখ্যা কমছে বই বাড়ছে না! প্রুশিয়ান জেনারেল ব্লুচার এ পর্যন্ত যে কতবার তাঁর কাছ থেকে হেরে পালালেন তার আর সংখ্যা হয় না! তবু যতবারই তিনি পালান, ততবারই নতুন পলটন নিয়ে আবার ফিরে আসেন। প্রত্যেক পরাজয়ের পর ব্লুচার যেন অধিকতর বলবান হয়ে ওঠেন!

নতুন সৈন্যদলের উপায় নেই, নতুন শক্তিলাভের সম্ভাবনা নেই, তবু নেপোলিয়ন লড়ছেন, লড়ছেন, লড়ছেন! কিন্তু বৃথা! লক্ষ লক্ষ শত্রু চারিদিক দিয়ে প্যারির দিকে ধেয়ে আসছে মহাবন্যার মতন! এই দুর্বল অবস্থায় কোনদিক সামলাবেন তিনি? অবশেষে অসম্ভবকে লাভ করবার জন্যে ফরাসি সৈন্যদেরও আর কোনও আগ্রহ রইল না, নতুন যুদ্ধের কথা শুনলে ফরাসি সেনাপতিরাও বিরক্ত হয়ে ওঠেন। ফ্রান্সের জনসাধারণও অবিশ্রান্ত যুদ্ধপ্রবাহে পড়ে হাঁপিয়ে উঠেছে। দেশের অধিকাংশ পরিবারই সন্তান বা পিতা বা স্বামী বা আর কাউকে হারিয়েছে— তাদের আর সৈনিক জোগান দেওয়ারও শক্তি নেই। তারাও একবাক্যে বলে উঠল, 'যুদ্ধ নয়, আর যুদ্ধ নয়!'

নেপোলিয়ন তখনও সত্তর হাজার সৈন্য জোগাড় করতে পারতেন এবং শত্রুপক্ষ সংখ্যায় অগণ্য হলেও তখনও তাঁকে এমন যমের মতন ভয় করে যে, আটঘাট বেঁধে প্যারির চারিদিক ঘিরে দূরে বসে থাকলেও, কেউ আর তাঁর কাছাকাছি আসতে রাজি নয়!

ঘরে-বাইরে বাধা পেয়ে নেপোলিয়ন সিংহাসন ত্যাগ করলেন (১৪ এপ্রিল, ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে)।

মিত্রপক্ষ বললেন, ভূমধ্যসাগরের ক্ষুদ্র দ্বীপ এলবা, অতঃপর নেপোলিয়নকে সেইখানেই বাস করতে হবে। নিজের দ্বীপের ভিতরে তিনি স্বাধীনই থাকবেন, তাঁর সম্রাট উপাধিও বজায় রইল।

সমগ্র ইয়োরোপে যাঁর ছায়া ধরত না, তাঁর রাজ্য হবে এলবা দ্বীপ— চওড়ায় ছয় ও লম্বায় উনিশ মাইল!

নেপোলিয়ন আর সইতে পারলেন না, চেষ্টা করলেন সকল জ্বালা জুড়োতে। তিনি বিষপান করলেন। কিন্তু মৃত্যুও তাঁকে সাহায্য করলে না, বিষের তাড়নায় কেবল কষ্ট পেলেন মাত্র। নিয়তি তাঁকে বাঁচিয়ে রাখলে, অধিকতর দুর্ভাগ্যের জন্যে। (কিন্তু অনেক ঐতিহাসিকই এই আত্মহত্যার চেষ্টার কথা বিশ্বাস করেন না এবং তার যুক্তিসংগত কারণও আছে।)

নেপোলিয়নের ছেলেকে নিয়ে স্ত্রী চলে গেলেন বাপের বাড়িতে, অস্ট্রিয়ার রাজপ্রাসাদে। নেপোলিয়ন জীবনে আর স্ত্রী-পুত্রের মুখ দেখেননি।

ফ্রান্স থেকে বিদায় নেওয়ার দিন এল। রাজপ্রাসাদের সোপানশ্রেণির উপরে নেপোলিয়ন, প্রাঙ্গণে অপেক্ষা করছে প্রাচীন রক্ষী ফৌজের রণপ্রবীণ সৈনিকগণ— তাঁর সঙ্গে যারা শত শত যুদ্ধ জয় করেছে।

নেপোলিয়ন সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে লাগলেন, সৈনিকরা আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে সমস্বরে বলে উঠল, 'সম্রাট দীর্ঘজীবী হোন!'

নেপোলিয়ন সৈন্যদের কাছে এসে দাঁড়ালেন। অভিভূত কণ্ঠে বললেন, 'আমার প্রাচীন রক্ষীবাহিনীর সৈনিকগণ! আজ বিশ বৎসর ধরে দেখছি, সর্বদাই তোমরা বিচরণ করেছ যশ ও গৌরবের পথে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তোমরা হয়েছ নির্ভীকতা ও বিশ্বস্ততার আদর্শ— আমার সৌভাগ্যের দিনেও তোমরা যা ছিলে।... ফ্রান্সে ঘরোয়া যুদ্ধের সম্ভাবনা হয়েছিল। সেইজন্যেই দেশের মুখ চেয়ে আমি নিজের সমস্ত স্বার্থকে বলি দিলুম। আমি বিদায় নিচ্ছি।... বন্ধুগণ, তোমরা ফ্রান্সের সেবা কোরো। তোমাদের সঙ্গে রইল আমার শুভ-ইচ্ছা। আমার অদৃষ্টের জন্যে অশ্রু ফেলো না। তোমাদের যশোগৌরব বাড়াবার জন্যেই আমি বেঁচে রইলুম। আমরা সকলে মিলে যে মহান কীর্তি স্থাপনা করেছি, তারই কাহিনি রচনা করব আমি। সন্তানগণ, বিদায়! তোমাদের সকলকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারলে আমি খুশি হতুম। অন্তত তোমাদের পতাকা দাও— আমি চুম্বন করব।'

পতাকাবাহী পতাকা নামালে। নেপোলিয়ন তাকে আলিঙ্গন ও পতাকাকে চুম্বন করলেন এবং বললেন, 'সঙ্গীগণ, বিদায়।'

তিনি দ্রুতপদে শকটের ভিতরে গিয়ে ঢুকলেন। আবার উচ্চরব উঠল— 'সম্রাট দীর্ঘজীবী হোন!' শকট চলে গেল।

যুদ্ধকঠিন প্রাচীন সৈনিকরা সেইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শিশুর মতন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। যেন তারা আজ পিতৃহারা!

দৃশ্যপট বদলে গেল।... পল্লিপথ দিয়ে নির্বাসিতের শকট ছুটছে। এখান দিয়ে যেতে যেতে নেপোলিয়ন আর-এক নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করলেন। এখানে সৈনিকদের অশ্রুজল নেই, শিক্ষিত নাগরিকদের মৌখিক সভ্যতার মুখোশও নেই। এখানে পথের দু-ধারে গ্রাম্য ইতরের জনতা! উলঙ্গ হৃদয়! যাদের ভাই-ছেলে-বাপ-স্বামী যুদ্ধক্ষেত্রের রক্তসাগরে অতলে তলিয়ে গেছে, তারা অপেক্ষা করছে আজ নেপোলিয়নকে অভ্যর্থনা করতে! নেপোলিয়নের গাড়ি দেখা যায় আর গগনভেদী চিৎকার ওঠে— 'অত্যাচারীকে উচ্ছন্নে দাও!' 'হত্যাকারীকে হত্যা করো!' নর-নারীরা পাগলের মতন গাড়ির উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ইট ছোড়ে, গালাগালি দেয় অকথ্য ভাষায়!

ফ্রান্সের মানসপুত্র নেপোলিয়ন! আজ তাঁকে ছদ্মবেশ ধারণ করতে হল! কী উত্থান! কী পতন!

নয়। ভিসুভিয়াসের জাগরণ

এলবা! ছোট্ট একটি পাহাড়ে-দ্বীপ। লোকসংখ্যা আঙুলে গুনে বলা যায়।

কর্সিকাও ছোটো দ্বীপ। কিন্তু এলবার চেয়ে চল্লিশগুণ বড়ো, তার লোকসংখ্যাও দশগুণ বেশি।

'এর চেয়ে ওরা যদি আমাকে কর্সিকায় পাঠিয়ে দিত!' নেপোলিয়ন মনে মনে নিশ্চয়ই এই কথা ভেবেছিলেন।

এখনও তিনি সম্রাট, আর এই এলবা তাঁর সাম্রাজ্য— এই উইঢিপি!

তবু বাইরে তিনি কোনও প্রতিবাদ করলেন না। অস্ট্রিয়া ও ইংল্যান্ডের প্রতিনিধি তাঁর উপরে নজর রাখবার জন্যে এলবাতেই বাসা বেঁধেছিলেন— তাঁরা দেখলেন তাঁর হাসিখুশি-মাখা মুখ! আহারে-বিহারে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে থাকবার জন্যে নেপোলিয়ন তাঁদের সাদর আমন্ত্রণ করতেও ভুললেন না!

এই একবিন্দু 'সাম্রাজ্য'কে নিজের নামের যোগ্য করে তোলবার জন্যে তিনি বিপুল উৎসাহের সঙ্গে এলবার সর্বাঙ্গীণ উন্নতিসাধনে নিযুক্ত হলেন।

অস্ট্রিয়া ও ইংল্যান্ডের প্রতিনিধিরা ভাবলেন, কী অস্বাভাবিক মানুষ এই নেপোলিয়ন! একখণ্ড জমি পেয়ে অমন বিরাট সাম্রাজ্যের কথা ভুলে গেলেন!

কিন্তু নেপোলিয়ন ভোলেননি। তাঁর হৃদয় এখন ভিসুভিয়াসের মতন। বাইরে পরম প্রশান্ত, কিন্তু যে-কোনও মুহূর্তে সর্বগ্রাসী অগ্নি উদগিরণ করতে পারে।

মা লেটিজিয়া এলেন। সম্পদের দিনে লেটিজিয়া সহজে ছেলের কাছে আসতে রাজি হতেন না, কিন্তু বিপদের দিনে মা এসে বুক দিয়ে পড়লেন। আজ ছেলের কাছে থাকতে পেয়ে মায়ের মুখে হাসি ধরে না।

নেপোলিয়নের সবচেয়ে প্রিয় বোন সুন্দরী পলিনও এলেন। পলিন প্রজাপতির মতন চঞ্চল, পলিন শরীরিণী আনন্দঝরনা! তাকে পেয়ে নেপোলিয়নের গোপন দুঃখ অনেকটা হালকা হয়ে পড়ল।

আর-এক বোন ক্যারোলিন— নেপলসের বিশ্বাসঘাতক রাজা মুরাটের স্ত্রী। মায়ের হুকুমে এ দ্বীপে তাঁর প্রবেশ নিষেধ! আর এলেন না ভাইয়েরা— যাঁদের জন্যে নেপোলিয়ন এত করেছেন!...

ফ্রান্সের নতুন রাজা অষ্টাদশ লুই। তিনি 'গিলোটিনে' মৃত ষোড়শ লুইয়ের ছোটোভাই। যে বুৰ্বো বংশের জন্যে ফরাসি বিপ্লবের রক্তগঙ্গার উৎপত্তি, সেই ঘৃণ্য বংশের আবার এক রাজাকে ঘাড়ে করে ফরাসি জনসাধারণ ভিতরে ভিতরে জ্বলতে লাগল যেন তুষানলে! তার উপরে এ রাজা ফ্রান্সের সিংহাসন দখল করেছেন বিদেশি শত্রুদের সাহায্যে! প্রজারা তাঁকে ভালোবাসবে কেন?

পুরাতন বংশের সঙ্গে এল আবার পুরাতন ব্যভিচার। রাজা নিজে লোক মন্দ নন, কিন্তু কাজ করেন স্বার্থান্ধ সাঙ্গোপাঙ্গদের পরামর্শে। যেসব রীতিনীতিকে তাড়াবার জন্যে লক্ষ লক্ষ ফরাসি বুকের রক্ত ঢেলেছে, আবার হল সেইসব রীতিনীতির পুনরাবির্ভাব! আবার সাধারণ লোকেদের মাথার উপরে উঠে দাঁড়াল অভিজাতরা, আবার আরম্ভ হল পুরোহিতদের অত্যাচার! পথে পথে দু-একটা দাঙ্গাহাঙ্গামাও হল।

লোকে আবার চুপি চুপি বলতে লাগল, 'নেপোলিয়ন ছিলেন রাজার মতন রাজা!'

ফ্রান্সে নেপোলিয়নের চরের অভাব ছিল না। সব খবর যথাস্থানে গিয়ে হাজির হল।

নির্বাসনের পর দশ মাস কেটে গিয়েছে।

মা লেটিজিয়া একদিন গিয়ে দেখলেন, নেপোলিয়ন একটি ডুমুর গাছের তলায় একলা দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

'মা, তোমাকে একটা কথা বলব, আর কাউকে বোলো না। পলিনকেও না।'

মা চুপ।

'কাল সন্ধ্যার সময়ে আমি চলে যাব।'

'কোথায়, বাবা?'

'প্যারিতে।'— অল্পক্ষণের নীরবতা।— 'আমি তোমার পরামর্শ চাই।'

মায়ের বুক যেন পাথর হয়ে গেল। কিন্তু এ মা হচ্ছেন নেপোলিয়নের মা! যেমন তাঁর গর্ব, তেমনি বুদ্ধি! তাঁর ছেলে যা ধরেছে তা করবেই, বাধা দেওয়া বাহুল্য!

মা বললেন, 'বাবা, তোমার নিয়তিকে অনুসরণ করো। বিষ খেয়ে বা অথর্ব বুড়ো হয়ে তুমি মরবে, নিশ্চয়ই ভগবানের সে ইচ্ছা নেই। হয়তো তোমার মৃত্যু হবে তরবারি হাতে করেই। আমাদের ভরসা, মা মেরি।'

নেপোলিয়ন আবার ফ্রান্সে! সম্রাট প্রথম নেপোলিয়ন!

দিকে দিকে ছুটে গেল এই সুসংবাদ, হৃদয়ে হৃদয়ে বিদ্যুৎপ্রবাহ!

নেপোলিয়ন আসছেন রাজধানীতে! যে পথ দিয়ে আসছেন, দু-ধারে তার কাতারে কাতারে লোক ভেঙে পড়ছে আর ঘন ঘন জয়ধ্বনি উঠছে— 'সম্রাট দীর্ঘজীবী হোন!'

কিন্তু ইতর জনতার জয়ধ্বনি নিয়ে সম্রাট তখন মাথা ঘামাচ্ছেন না— এলবার পথে তাদের জয়ধ্বনির গুপ্তকথা তিনি জেনেছেন।

সম্রাট খালি ভাবছেন, আমাকে দেখে সৈন্যরা কী বলবে? কী করবে?

বেশিক্ষণ ভাবতে হল না, পথিমধ্যেই রাজার সৈন্যদের সঙ্গে দেখা হল। সৈন্যদের নেতারা প্রতিজ্ঞা করে এসেছে, নেপোলিয়নকে তারা বধ করবেই!

রাজসৈন্যেরা নেপোলিয়নের সামনে এসে উপস্থিত। হাতে তাদের বন্দুক, মুখ তাদের মৌন, ভাব তাদের পাথরের পুতুলের মতন।

নেপোলিয়ন একাকী পায়ে পায়ে এগিয়ে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। অবিচলিত দৃঢ়স্বরে বললেন, 'সৈন্যগণ, তোমরা কি আমাকে চেনো না! তোমাদের দলে এমন কেউ যদি থাকে, যে তার সম্রাটকে বধ করতে চায়, তাহলে সে এগিয়ে আসুক, আমাকে বধ করুক। আমি এখানে হাজির!' বলেই তিনি জামা খুলে নিজের বুক অনাবৃত করে ফেললেন।

অখণ্ড স্তব্ধতা, ভয়াবহ! এখনই কী ঘটবে?

হঠাৎ বাঁধভাঙা ধ্বনি বন্যার মতন শোনা গেল, 'সম্রাট দীর্ঘজীবী হোন!' তারপরেই বিপুল আনন্দের উচ্ছ্বাস, 'রাজসৈন্য হল নেপোলিয়নের সৈন্য!'

সর্বত্রই এই দৃশ্যের পুনরভিনয়! নতুন রাজা সদলবলে রাজ্য ছেড়ে দৌড় মারলেন সমুদ্রের দিকে এবং সেখান থেকে ইংল্যান্ডে। নেপোলিয়ন আবার ফ্রান্সের সর্বেসর্বা! এমন পুনরুত্থানের আশ্চর্য কাহিনি উপন্যাসেও আর কখনো কল্পিত হয়নি (১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে)।

ফরাসিরা নেপোলিয়নকে গ্রহণ করলে বটে, কিন্তু সমগ্র ইয়োরোপ হয়ে উঠল খড়্গহস্ত! তারা তাঁকে মানবজাতির শত্রু বলে প্রচার করলে। সারা ইয়োরোপে 'সাজ সাজ' রব উঠল।

সিংহাসনে ভালো করে বসতে-না বসতেই নেপোলিয়ন খবর পেলেন, তাঁকে পদদলিত করবার জন্যে চারিদিক থেকে সমগ্র ইয়োরোপের দশ লক্ষ এগারো হাজার সৈন্য ছুটে আসছে! তাদের বাধা দেওয়ার জন্যে তিনিও তাড়াতাড়ি সৈন্য সংগ্রহ করতে লাগলেন; কিন্তু সময়াভাবের জন্যে তিন লক্ষ পঁচাত্তর হাজারের বেশি লোক জোগাড় করতে পারলেন না। তবু তিনি অটল। স্থির করলেন, শত্রুরা একসঙ্গে সম্মিলিত হওয়ার আগেই একে একে তাদের বাহিনী ধ্বংস করবেন। এটা তাঁর বহু পরীক্ষিত পুরাতন যুদ্ধরীতি।

সবচেয়ে কাছে আছে ইংরেজ ও প্রুশিয়ানরা। বেলজিয়ামে ইংরেজ সেনাপতি ওয়েলিংটন কতক ইংরেজ, কতক জার্মান, কতক বেলজিয়ান ও কতক ওলন্দাজ সৈন্য নিয়ে প্রুশিয়ান সেনাপতি ব্লুচারের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন।

নেপোলিয়ন প্যারিস থেকে বেরিয়ে ওয়েলিংটনের সঙ্গে মেলবার আগেই প্রুশিয়ানদের উপরে গিয়ে পড়লেন বেলজিয়ামের চার্লেরই নগরের কাছে। প্রুশিয়ানরা লিগনি শহরের দিকে পশ্চাৎপদ হল। নেপোলিয়ন তাদের পিছনে পিছনে ছুটে গিয়ে আবার ব্লুচারকে আক্রমণ করলেন। সারাদিন ধরে চলল কামানের বজ্রগর্জন ও অস্ত্রে অস্ত্রে ঝনৎকার। ফরাসি ও জার্মানরা হচ্ছে পরস্পরের চিরশত্রু, সুতরাং যুদ্ধের ভীষণতা উঠল চরমে! রণক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ল বিশ হাজার জার্মান ও পনেরো হাজার ফরাসির মৃতদেহ। তারপর ব্লুচার আর সহ্য করতে না পেরে সসৈন্যে পলায়ন করলেন। প্রথম যুদ্ধে জয়ী নেপোলিয়ন (১৫ জুন, ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে)।

আবার ব্লুচার পালালেন— কিন্তু নেপোলিয়ন চেয়েছিলেন তাঁকে একেবারে সসৈন্যে ধ্বংস করতে। ঐতিহাসিকরা বলেন, ফরাসিদের বাম পার্শ্বের সৈন্যদল যদি নেপোলিয়নের আদেশ পালন করতে পারত, তাহলে লিগনি-ক্ষেত্রেই হত ব্লুচারের পতন এবং ওয়েলিংটন একলা কখনোই নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস করতেন না। ফলে ওয়াটার্লু যুদ্ধের ইতিহাস লেখবারও দরকার হত না।

ব্লুচারও মরতে মরতে কোনওগতিকে বেঁচে গিয়েছিলেন। অশ্বারোহী সৈন্যদের পুরোভাগে থেকে তিনি ফরাসিদের আক্রমণ করতে আসছিলেন; হঠাৎ তাঁর ঘোড়া গুলি খেয়ে তাঁকে নিয়ে ভূতলশায়ী হয় এবং তাঁর উপর দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে যায় জার্মান ও ফরাসিরা— কিন্তু যুদ্ধের গোলমালে কোনও পক্ষই তাঁকে চিনতে পারেনি!

ব্লুচার পালিয়ে ওয়াটার্লুর পথ ধরলেন এবং নেপোলিয়নও তাঁর পিছনে পিছনে অনুসরণ করতে পাঠালেন সসৈন্যে সেনাপতি গ্রাউচিকে।

ওয়াটার্লুর যুদ্ধ হচ্ছে একটি বিচিত্র নাটকীয় দৃশ্যের মতো। পরের পরিচ্ছেদে তাই ওই যুদ্ধের একটি বিস্তৃত বর্ণনা দেওয়া হল।

দশ। ওয়াটার্লু (১৮ জুন, ১৮১৫)

ওয়াটার্লু হচ্ছে দিগবিজয়ী নেপোলিয়নের শেষ যুদ্ধ। এই যুদ্ধের পরেই তাঁর মহাপতন। অস্টারলিটজের পরিপূর্ণ সূর্য ওয়াটার্লু ক্ষেত্রে এসে শেষ কিরণ বিকিরণ করে অস্তমিত হয়।

কেউ কেউ মত প্রকাশ করেছেন, ওয়াটার্লু যুদ্ধের সময়ে নেপোলিয়নের যুদ্ধপ্রতিভা দুর্বল হয়ে এসেছিল। কিন্তু গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত বিচার করে দেখলে, এ মত সম্পূর্ণ ভ্রান্ত বলেই প্রমাণিত হয়।

কারণ, বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করেছেন, নেপোলিয়নের পরিকল্পনা ছিল নিখুঁত ও অপূর্ব। কিন্তু তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা হয়নি। দৈবের মহিমায় তাঁর 'প্ল্যান' ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল।

ওয়াটার্লু যুদ্ধে জয়ী হয়ে ডিউক অফ ওয়েলিংটন অমর নাম কিনেছেন। কিন্তু তিনি প্রথম শ্রেণির সেনাপতি ছিলেন না। আজ পর্যন্ত ইংল্যান্ড এমন কোনও রণবীর প্রসব করেনি, চেঙ্গিজ, আলেকজান্ডার, সিজার, হানিবল, তৈমুর, নাদির বা নেপোলিয়নের সঙ্গে যাঁর তুলনা করা চলে। ওয়াটার্লু যুদ্ধে ওয়েলিংটন উল্লেখযোগ্য কোনও রণকৌশলই দেখাতে পারেননি। তাঁর সম্বন্ধে কেবল এইটুকুই বলা যায় যে, তিনি ছিলেন দস্তুরমতো নাছোড়বান্দা। এই যুদ্ধে তাঁর চেয়ে বেশি সুখ্যাতি করা যায় ইংরেজ সৈন্যদের— তাদের অসাধারণ সাহস ও সহ্যক্ষমতার জন্যে।

এই যুদ্ধে নেপোলিয়নের পরাজয়ের প্রধান দুটি কারণ হচ্ছে, চৌত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে তাঁর সেনাপতি গ্রাউচির অনুপস্থিতি ও জার্মান সেনাপতি ব্লুচারের যথাসময়ে আবির্ভাব। এমনকী গ্রাউচির অভাবও পূরণ হতে পারত, ব্লুচার যদি না আসতেন। ব্লুচার না এলে ইংরেজদের রক্ষা পাওয়ার কোনও উপায়ই ছিল না। ব্লুচারও ভালো সেনাপতি নন। নেপোলিয়নের সামনে কোনওদিনই তিনি দাঁড়াতে পারেননি। কিন্তু আগেই বলা হয়েছে তাঁর একটা মস্ত গুণ ছিল এই যে, যতবারই তিনি হেরেছেন, ততবারই পালিয়ে গিয়ে আবার 'যুদ্ধং দেহি' বলে ফিরে এসেছেন। এই ব্লুচারই হয়েছিলেন নেপোলিয়নের কাল।

পলাতক ব্লুচারের পিছনে চৌত্রিশ হাজার সৈন্যসুদ্ধ সেনাপতি গ্রাউচিকে পাঠিয়ে, নেপোলিয়ন সসৈন্যে এলেন ওয়েলিংটনকে ধ্বংস করতে। ওয়েলিংটন তখন ওয়াটার্লু ক্ষেত্রে সৈন্য সমাবেশ করেছেন। তাঁর অধীনে ছিল সত্তর হাজার ইংরেজ ও নানা জাতীয় সৈন্য।

এতক্ষণ যেসব লড়াই হচ্ছিল, তাদের ওয়াটার্লু যুদ্ধেরই প্রস্তাবনা বলে গ্রহণ করা যায়।

ওয়াটার্লু ক্ষেত্রে নেপোলিয়নের অধীনে সৈন্য ছিল বাহাত্তর হাজার— অর্থাৎ প্রায় ওয়েলিংটনেরই সমান। কিন্তু ফরাসিদের কামান ছিল ইংরেজদের চেয়ে অনেক বেশি।

ব্লুচারের সঙ্গে ওয়েলিংটনের আগেই বোঝাপড়া হয়ে গিয়েছিল, তাঁদের একজন ফরাসিদের দ্বারা আক্রান্ত হলে অন্যজন আসবেন সাহায্য করতে। এই আশায় বুক বেঁধে ওয়েলিংটন নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হলেন। কিন্তু ভিক্টর হুগো দেখিয়েছেন, যুদ্ধের কিছুই তিনি উপলব্ধি করতে পারেননি। তাঁর 'বুলেটিন'গুলো পড়লে মনে হয়, তিনি যেন ধাঁধায় পড়ে গিয়েছিলেন! তিনি কেবল এইটুকু স্থির করেছিলেন, যতক্ষণ না ব্লুচার আসবেন ততক্ষণ যেমন করে হোক আত্মরক্ষা করবেন। কিন্তু দৈব সহায় না হলে তিনি যে আত্মরক্ষাও করতে পারতেন না, হুগো সেটাও দেখিয়েছেন।

ওয়াটার্লু ক্ষেত্রে ইংরেজদের উপরে ফরাসিরা পাঁচবার আক্রমণ করেছিল। (১) ইংরেজদের বাম পার্শ্বের উপরে আক্রমণ। (২) ইংরেজদের দক্ষিণ পার্শ্বের উপরে আক্রমণ। (৩) ফরাসি অশ্বারোহী সৈন্যদের প্রবল আক্রমণ— ইংরেজরা যা সহ্য করতে পেরেছিল। (৪) মার্শাল নে-র সফল আক্রমণ— যা ফরাসিদের জয়লাভের সম্ভাবনা আনে। (৫) ফরাসি রক্ষী সৈন্যের আক্রমণ— এইখানেই ইংরেজদের পতন হত, কিন্তু ঠিক এই সময়েই ব্লুচারের অধীনস্থ প্রুশিয়ানদের আবির্ভাবে ও গ্রাউচির অনুপস্থিতিতে যুদ্ধের গতি ফিরে যায়।

অমর ফরাসি লেখক ভিক্টর হুগো ওয়াটার্লু যুদ্ধের যে অপূর্ব শব্দ-ছবি এঁকেছেন, বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে তা অতুলনীয় হয়ে আছে। আমরা এখানে তার কয়েকটি অংশ উদ্ধার করলুম:

১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের সতেরোই এবং আঠারোই তারিখের মাঝখানে যদি বৃষ্টি না হত, তাহলে ইয়োরোপের ভবিষ্যৎ ভিন্ন আকার ধারণ করত। মাত্র কয়েক ফোঁটা জলের জন্যে হল নেপোলিয়নের পতন। ওয়াটার্লুকে অস্টারলিটজের উপসংহারে পরিণত করবার জন্যে বিধাতার দরকার হল একপশলা বৃষ্টি! বেলা সাড়ে এগারোটার আগে ওয়াটার্লু যুদ্ধ শুরু করা সম্ভবপর হল না। কেন? বৃষ্টিতে মাটি ভিজে ছিল বলে! এই যুদ্ধে নেপোলিয়ন তাঁর কামানসংখ্যার উপরে অত্যন্ত নির্ভর করেছিলেন। ওয়েলিংটনের মাত্র ১৫৯টা কামান ছিল এবং তিনি ছিলেন ২৪০ কামানের অধিকারী। মাটি খানিকটা না শুকোলে কামান ব্যবহার করা চলে না।

মাটি যদি শুকনো থাকত, ওয়াটার্লু যুদ্ধ আরম্ভ হত ভোর ছ-টার সময়ে এবং নেপোলিয়ন জয়ী হয়ে যুদ্ধ শেষ করে ফেলতেন বেলা দুটোর সময়— অর্থাৎ প্রুশিয়ানদের আগমনের তিন ঘণ্টা কাল আগে।

ইংরেজরা ছিল উচ্চভূমির উপরে, ফরাসিরা নিম্নভূমিতে। এজন্যে ইংরেজদের খুব সুবিধা হয়েছিল।

যুদ্ধ আরম্ভ হল বিষম তেজে। এতটা নেপোলিয়নও আশা করতে পারেননি। ফরাসিদের বাম পার্শ্ব আক্রমণ করলে ইংরেজরা, নেপোলিয়ন আক্রমণ করলেন ইংরেজদের মধ্যভাগ। সেনাপতি নে ফরাসিদের দক্ষিণ পার্শ্ব নিয়ে ইংরেজদের বাম পার্শ্বকে আক্রমণ করলেন। প্রথম আক্রমণ সফল হল। ফরাসিরা কয়েকটা স্থান দখল করলে। তারপর যুদ্ধের গতি ফিরতে লাগল একবার এদিকে, একবার ওদিকে।

অপরাহ্ণকালে যুদ্ধের অবস্থা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে এল। বেলা প্রায় চারটের সময়ে ইংরেজদের অবস্থা হয়ে উঠল শোচনীয়। ইংরেজদের পক্ষে হল্যান্ড-বেলজিয়ামের সৈন্যচালনা করছিলেন প্রিন্স অফ অরেঞ্জ; দক্ষিণ পার্শ্বের নায়ক ছিলেন হিল; বাম পার্শ্বের নায়ক পিক্টন।

প্রিন্স অফ অরেঞ্জ নিজের সৈন্যদের ডেকে মরিয়ার মতন চেঁচাতে লাগলেন, 'পালিয়ো না— পিছনে পালিয়ো না!'

হিল এমন ভেঙে পড়লেন যে, ওয়েলিংটনের গায়ে না ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারলেন না।

পিক্টনের মৃতদেহ রণশয্যাশায়ী!

ওয়েলিংটনের মূল স্থান ছিল দুটি— হোউগোমন্ট ও লা-হে-সেইন্ট। হোউগোমন্ট তখনও ফরাসিদের হস্তগত হয়নি বটে, কিন্তু দাউদাউ করে জ্বলছিল। লা-হে-সেইন্ট ইংরেজদের হাতছাড়া হয়েছে। সেখানে দাঁড়িয়ে যে তিন হাজার জার্মান সৈন্য লড়াই করছিল, তাদের মধ্যে প্রাণ নিয়ে ফিরেছে মাত্র বিয়াল্লিশজন। পাঁচজন ছাড়া নায়কদের সবাই মৃত বা বন্দি। ইংরেজ রক্ষী সৈন্যের এক সার্জেন্ট, সে ছিল বিলাতের 'চ্যাম্পিয়ন' মুষ্টিযোদ্ধা। সবাই জানত, কেউ তার কিছু করতে পারবে না। কিন্তু ছোট্ট এক ফরাসি ছোকরা— সে দামামা বাজাত— সে-ই বিপুলবপু মুষ্টিযোদ্ধাকে বধ করলে! বহু ইংরেজ পতাকা ফরাসিদের হস্তগত। বিখ্যাত স্কটস গ্রে ফৌজ বিলুপ্ত। নায়ক পন্সনবির অশ্বারোহী দলকে ফরাসিরা কুচি কুচি করে কেটে ফেলেছে— পন্সনবি দেহের সাত জায়গায় আহত হয়ে মাটির উপরে পড়ে। পাঁচ ও ছয় নম্বর ফৌজও (ডিভিশন) আর নেই। মেটার, মার্শাল ও গর্ডন নায়করা মৃত।

অটুট আছে কেবল ইংরেজদের মধ্যভাগ। ওয়েলিংটন চারিদিক থেকে সৈনিক ও সেনানী আনিয়ে মধ্যভাগকে দৃঢ়তর করে তুলতে লাগলেন। এখানে ঝোপঝাপের ভিতরে তিনি এমন সুকৌশলে কামান ও বন্দুকধারী সৈন্য লুকিয়ে রাখলেন যে, ফরাসিরা তাদের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে পারলে না।

চিন্তিত, কিন্তু প্রশান্ত মুখে ওয়েলিংটন ঘোড়ার উপরে বসে আছেন সারাদিন। চারিদিকে হচ্ছে বুলেট বৃষ্টি। তাঁর এ-ডি-কং গর্ডন তাঁর পাশেই মারা পড়লেন।

সামনেই একটা গোলা পড়ে ফেটে গেল। লর্ড হিল বললেন, 'মাই লর্ড, আপনি যদি নিহত হন, তাহলে আমাদের কর্তব্য কী? আপনার কোন হুকুম আমরা তামিল করব?'

ওয়েলিংটন সংক্ষেপে জবাব দিলেন, 'আমি যা করছি তা-ই করবেন। যতক্ষণ একজনেরও জীবন থাকবে, এ জায়গাটা রক্ষা করবেন।'

গতিক আরও খারাপ হয়ে এল।

ওয়েলিংটন চিৎকার করে বললেন, 'শোনো তোমরা! আমরা কি পালাবার কথা স্বপ্নেও মনে আনতে পারি? তাহলে ইংল্যান্ডের লোক আমাদের কী বলবে?'

বেলা চারটের সময়ে ইংরেজদের পঙক্তি ভেঙে গেল। ওয়েলিংটনও পিছু হটে গেলেন।

নেপোলিয়ন বলে উঠলেন, 'এইবারে ওদের পলায়ন শুরু হল।' এতক্ষণ পরে তাঁর মুখে আনন্দের হাসি ফুটল। রাজধানীতে তখনই তিনি খবর পাঠিয়ে দিলেন, যুদ্ধে তাঁর জিত হয়েছে।

এইবারে ইংরেজদের ধ্বংস করবার সময় এসেছে! নেপোলিয়ন তাঁর অশ্বারোহী সৈন্যদের আহ্বান করলেন। আধ মাইল জায়গা জুড়ে তারা এগিয়ে এল। মস্ত মস্ত ঘোড়ার উপরে প্রকাণ্ড সব সৈনিক! তরবারি খুলে নে তাদের পুরোভাগে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারা অগ্রসর হল। সে এক দারুণ দৃশ্য!

ছুটেছে অশ্বারোহীর দল, তরবারি সব ঊর্ধ্বে উৎক্ষিপ্ত, পতাকা ও ভেরিগুলোও শূন্যে উত্থিত —সমতলে সমভঙ্গিতে অগ্রসর হচ্ছে যেন একটিমাত্র বিরাট জীব। এক উপত্যকার গভীর ও ভয়াবহ গহ্বরে ঘোড়াসুদ্ধ লাফিয়ে পড়ে পুঞ্জীভূত ধোঁয়ার ভিতরে তারা অদৃশ্য হয়ে গেল এবং তারপর উপত্যকার অপর পারে গিয়ে ছায়ার ভিতর থেকে আবার তারা আবির্ভূত হল! তখনও তারা বিশৃঙ্খল নয়— মাথার উপর দিয়ে ছুটছে গোলাগুলির ঝড়, তবু তারা আগেকার মতোই শ্রেণিবদ্ধ! দ্রুত কদমে ছুটে চলেছে গম্ভীর, নির্বিকার ভৈরব অশ্বারোহীর দল! কামান-বন্দুকের ঘন ঘন গর্জনের মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে বিরাট অশ্বপদশব্দ! পুঞ্জ পুঞ্জ ধোঁয়ার ফাঁকে ফাঁকে দেখা যাচ্ছে সেই তীব্র গতির ঝটিকা!

লুকোনো কামান-সারের পিছনে দাঁড়িয়ে ইংরেজ পদাতিকরা অপেক্ষা করছে, যারা আসছে তাদের দিকে বন্দুকের লক্ষ্য স্থির করে— শান্ত, বোবা, স্থির! তারাও অশ্বারোহীদের দেখতে পাচ্ছে না, অশ্বারোহীরাও দেখতে পাচ্ছে না তাদের। তারা শুনছে কেবল নরবন্যা-প্রবাহের ধ্বনি, তিন হাজার ঘোড়ার খুরের শব্দ! আর শোনা যাচ্ছে অসি-ঝঞ্ঝনা আর বন্য শ্বাসপ্রশ্বাসের মতন কী একটা প্রচণ্ড ধ্বনি! তারপর হল এক গম্ভীর স্তব্ধতার সঞ্চার, তারপর জাগল তরবারির তাণ্ডব, সমুজ্জ্বল শিরস্ত্রাণ, মুখর ভেরি, পতাকার পর পতাকা এবং তিন হাজার সম্মিলিত কণ্ঠের উন্মত্ত জয়নাদ— 'সম্রাট দীর্ঘায়ু হোন!' এসে পড়ল যেন এক মূর্তিমান ভূমিকম্প!

আচম্বিতে এক ট্র্যাজেডি! ফরাসি ঘোড়সওয়ারের দক্ষিণ পার্শ্ব হঠাৎ স্তম্ভিত হয়ে পড়ল। ইংরেজদের ধ্বংস করবার উদ্দেশ্যে উত্তেজনায় উন্মত্ত হয়ে ঝড়ের তোড়ে অশ্বারোহীরা সভয়ে দেখলে, সামনেই এক সুদীর্ঘ খাত! এটা ছিল একেবারেই অভাবিত! খাতটি চওড়ায় তেরো ফুট! কিন্তু তখন আর সাবধান হওয়ার কোনও উপায়ই নেই। ধাবমান দ্বিতীয় সারের ধাক্কায় প্রথম সার এবং তৃতীয় সারের ধাক্কায় দ্বিতীয় সারের ঘোড়ারা সওয়ারদের নিয়ে হুড়মুড় করে পড়ল সেই ভয়াবহ খাতের ভিতরে গিয়ে! মুক্তিলাভ অসম্ভব! নীচে পড়ে ঘোড়াগুলো চার পা তুলে ছটফট করতে ও গড়াগড়ি দিতে লাগল— যেন জীবন্ত পেষণযন্ত্রে ধরা পড়ে সওয়ারদের হাড়গোড়গুলো গুঁড়ো হয়ে গেল— সমস্ত খাতটাই হয়ে উঠল রক্তাক্ত! যে উত্তেজনায় ফরাসিরা ছুটে আসছিল ইংরেজদের হত্যা করতে, সেই উত্তেজনার ঝোঁকেই তারা করলে আত্মহত্যা! যতক্ষণ না সেই নির্দয় খাত অশ্বদেহে ও নরদেহে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে, ততক্ষণ মিটবে না তার ক্ষুধা!... তা-ই হল। খাত কানায় কানায় ভরে উঠল— জলে নয়, জীবন্ত জীবের দেহে! তখন তাদের উপর দিয়ে, তখনও জ্যান্ত দেহগুলো মাড়িয়ে ধেয়ে চলল বাকি অশ্বারোহীর দল! একটা সমগ্র ব্রিগেডের অধিকাংশ সৈন্যকে গ্রাস করে ফেললে সেই ভীষণ খাত!

এদিকে এই মারাত্মক অভিনয় চলছে, ওদিকে ইংরেজদের লুকোনো কামানগুলো আরম্ভ করলে অগ্নিবর্ষণ। কিন্তু অশ্বারোহীরা থামল না, খাতের ক্ষুধার্ত উদর তাদের অনেককে গ্রাস করেছে বটে, কিন্তু তবু তারা ভগ্নোৎসাহ হয়নি। পূর্ণগতিতে ইংরেজ ফৌজের দিকে তারা ছুটিয়ে দিলে ঘোড়া! তারা ঘোড়ার লাগাম ছেড়ে দিলে, তরবারি দাঁতে কামড়ে ধরলে এবং প্রত্যেকেই দু-হাতে নিলে দুটো পিস্তল। এইভাবে করলে তারা আক্রমণ!

চতুষ্কোণ ব্যূহের মধ্যে ফরাসি সৈন্যরা পাথরের মূর্তির মতন স্থির হয়ে রইল। চারিদিক থেকে তারা আক্রান্ত হল। ভয়াবহ! সে যেন ঘূর্ণাবর্তের আক্রমণ! ইংরেজদের প্রথম সার মাটির উপরে হাঁটু গেড়ে বসে বন্দুকের বেয়নেট তুলে অশ্বারোহীদের করলে সাংঘাতিক অভ্যর্থনা! দ্বিতীয় সার দণ্ডায়মান হয়ে বন্দুক ছুড়লে। দ্বিতীয় সারের পিছন থেকে গোলন্দাজরা কামান দাগতে লাগল। কামানের গোলার পথ খুলে দেওয়ার জন্যে চতুষ্কোণ ব্যূহের সমুখটা ফাঁক হয়ে একবার দু-দিকে সরে গেল, তারপর পথ আবার বন্ধ!

অশ্বারোহীরাও আনলে মৃত্যুর বিরুদ্ধে মৃত্যু— ধ্বংসের বিরুদ্ধে ধ্বংস! তাদের ঘোড়াগুলো লাফ মেরে সেই চতুষ্কোণ ব্যূহের জীবন্ত প্রাচীর ডিঙিয়ে বেয়নেটের উপর দিয়ে ভিতরে এসে পড়ল! চতুষ্কোণ ব্যূহগুলো যেন ভলকানো, আক্রান্ত হয়েছে মেঘের দ্বারা; যেন আগ্নেয়োদগার লড়ছে বজ্রবিদ্যুতের সঙ্গে। প্রথম ধাক্কাতেই ব্যূহের চতুষ্কোণ প্রায় ধ্বংস হয়ে গেল। সেখানে ছিল হাইল্যান্ডাররা। চতুর্দিকে যখন মৃত্যুর তাণ্ডবলীলা, সেই সময়ে ফৌজের ব্যাগপাইপ বাদক যেন গভীর বিস্মৃতির মধ্যে একটা দামামার উপরে বসে যুদ্ধ সংগীতের সুর সৃষ্টি করতে লাগল— তার দুই চোখে নৃত্য করছিল যেন স্কটল্যান্ডের শ্যামল বন ও নীল হ্রদের প্রতিচ্ছায়া! তার হাতের তলায় থেকে ব্যাগপাইপের রাগিণী শোনাচ্ছিল যেন সুদূর পর্বতের ভাষা! এই গান শুনতে শুনতে হাইল্যান্ডাররা অন্তিম শ্বাসত্যাগ করলে। একজন অশ্বারোহী এসে বাদকের হাত তরবারি চালিয়ে কেটে দুখানা করে দিলে— সঙ্গে সঙ্গে সংগীতের অবসান!

মৃত্যু-খাত অশ্বারোহীদের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে বটে এবং ইংরেজরাও সংখ্যায় তাদের চেয়ে ঢের বেশি! তবু তারা এক-একজন দশজন হয়ে লড়তে লাগল। ইংরেজ পক্ষের হ্যানোভার-দেশীয় সৈন্যদের দল ভেঙে গেল। তা-ই দেখে ওয়েলিংটন তখনই সমারসেট সাদি-সৈন্যদের ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে দিলেন। সেই মুহূর্তে নেপোলিয়নও যদি তাঁর পদাতিকদের স্মরণ করতেন, তাহলে জয়লাভ করতেন তিনিই। তাঁর এই ভুল হল মারাত্মক ভুল! ফরাসি অশ্বারোহীরা দেখলে, তাদের সামনে রয়েছে ইংরেজদের চতুষ্কোণ-ব্যূহ এবং পিছনে এসে দাঁড়াল সমারসেট ড্রাগনের দল— সংখ্যায় ১,৪০০। সামনে, পিছনে, ডাইনে, বামে আক্রান্ত হয়েও তারা লড়তে লাগল অদম্য উৎসাহে! সে যেন সশস্ত্র বিদ্যুতের সাইক্লোন। মুহূর্ত মধ্যে দেখা গেল ১,৪০০ শত্রু সাদিদের মধ্যে বেঁচে আছে ৮০০ জন! কিন্তু চতুষ্কোণ-ব্যূহ তখনও অটল! উপরি-উপরি বারোবার আক্রমণ হল! চার-চারবার সেনাপতি নে-র ঘোড়া মারা পড়ল। ফরাসি অশ্বারোহীদের অর্ধেক মৃত। এই সংঘর্ষ চলল দুই ঘণ্টা ধরে।

ইংরেজ বাহিনীর তখন অত্যন্ত দুর্দশা। পথিমধ্যে মৃত্যু-খাতের দুর্ঘটনা না ঘটলে ফরাসি অশ্বারোহীরা এতক্ষণে ইংরেজদের মধ্যভাগ নিশ্চয়ই ভেঙে দিতে পারত। কিন্তু তবু তারা তেরোটি চতুষ্কোণ-ব্যূহের মধ্যে সাতটিকে ধ্বংস করে ফেলেছে এবং ছয়টি পতাকা দখল করে নেপোলিয়নের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে!

ওয়েলিংটনের অবস্থা টলোমলো! ইংরেজদের রক্তে ভেসে যাচ্ছে রণক্ষেত্র। চরমকাল নিকটস্থ!

বাম পার্শ্ব থেকে ইংরেজ সেনাপতি কেম্পট আরও সৈন্য চেয়ে পাঠালেন।

ওয়েলিংটন জানালেন, 'আর সৈন্য নেই। কেম্পটকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মরতে বলো।'

ফরাসিদেরও যাই-যাই অবস্থা! নে পদাতিকদের সাহায্য চাইলেন।

নেপোলিয়ন বললেন, 'পদাতিক? কোথায় পাব? আমি কি পদাতিক তৈরি করব?'

কিন্তু ইংরেজদের অবস্থাই অধিকতর শোচনীয়। দলে দলে সৈন্য মারা পড়েছে। বড়ো বড়ো জেনারেলরা মৃত— তাদের স্থানে দাঁড়িয়ে কাজ চালাচ্ছে ক্যাপ্টেন বা লেফটেন্যান্টরা। হানোভার হুসারের দল প্রাণপণে পলায়ন করছে! অন্য যেদিকে তাকানো যায়, সেদিকেও ওই দৃশ্য! পলাতকের পর পলাতকের দল ছুটেছে!

ওয়েলিংটনের মুখ প্রশান্ত, কিন্তু তাঁর ঠোঁট সংকুচিত। বেলা পাঁচটার সময়ে তিনি ঘড়ি বার করে বললেন, 'হয় ব্লুচার, নয় রাত্রি আসুক।'

ঠিক এই মুহূর্তেই বহু দূরে দেখা গেল জ্বলন্ত বেয়নেটের দীর্ঘ রেখা! এইখানেই হল এই বৃহৎ নাটকের দৃশ্য-পরিবর্তন!

নেপোলিয়ন আশা করেছিলেন চৌত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে তাঁর সেনাপতি গ্রাউচি এইবারে এসে উপস্থিত হবেন। কিন্তু তাঁর বদলে এলেন প্রুশিয়ান সেনাপতি ব্লুচার! জীবনের বদলে মৃত্যু! ব্লুচার আর এক ঘণ্টা পরে এলে রণক্ষেত্রে ইংরেজদের দেখা পেতেন না, সেখানে শুনতেন কেবল ফরাসিদের জয়ধ্বনি।

পাঁচটার সময়ে রণক্ষেত্রে এসে দাঁড়িয়ে ব্লুচার দেখলেন ওয়েলিংটনের অবস্থা বিষম সঙ্গিন! নিজের সেনাপতিকে ডেকে তিনি বললেন, 'বুলো, ফরাসিদের আক্রমণ করো— ইংরেজদের একটু হাঁপ ছাড়বার সময় দাও!'

আক্রমণ করলে প্রুশিয়ানরা— তাদের ছিয়াশিটা নতুন কামান অগ্নি উদগার করতে লাগল! নতুন পদাতিক দল, নতুন অশ্বারোহী দল! ফরাসিরা হটে আসতে লাগল। আসন্ন সন্ধ্যার অন্ধকারে বিশৃঙ্খল, শ্রান্ত ফরাসিরা আবার এক নতুন যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য হল। সমগ্র ইংরেজ বাহিনী আবার আক্রমণ করতে অগ্রসর হল। সামনে ধ্বংস, পাশে ধ্বংস। ফরাসিদের এই চরম কালে নেপোলিয়ন আহ্বান করলেন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত 'ইম্পিরিয়াল গার্ড' দলকে।

গার্ডরা যখন শুনলে তাদের নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঝাঁপ দেওয়ার জন্যে আহ্বান করা হয়েছে, তখন তারা দৃপ্ত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল, 'সম্রাট দীর্ঘায়ু হোন!'

সারাদিন আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। হঠাৎ এখন মেঘ সরে গেল। দিকচক্রবাল রেখা রঞ্জিত হয়ে উঠল অস্তগামী সূর্যের রক্তরাগ মহিমায়! গার্ডরা এমনি আরক্ত সূর্য দেখেছিল একদিন অস্টারলিটজের উদয়াচলে! বহু যুদ্ধে বারংবার পরীক্ষিত এই প্রাচীন ও দুর্ধর্ষ রক্ষী-সৈনিকরা সন্ধ্যা-রাগরক্ত আকাশের দিকে তাদের ইগল-চিহ্নিত পতাকা আন্দোলিত করে চোখে-মুখে দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ইঙ্গিত জাগিয়ে তালে তালে পা ফেলে অগ্রসর হল, তখন প্রত্যেক শত্রুর হৃদয় অভিভূত হল ফ্রান্সের প্রতি গভীর শ্রদ্ধায়। তাদের মনে হল যেন দলে দলে শরীরী বিজয় রণাঙ্গনে আবির্ভূত হয়েছে! এখন যারা জয়ী, তারাও পরাজিতের মতন সংকুচিত হয়ে পিছিয়ে পড়তে লাগল পায়ে পায়ে!

ওয়েলিংটন প্রমাদ গুনে চেঁচিয়ে উঠলেন, 'এগিয়ে এসো রক্ষীগণ! আক্রমণ করো!'

ঝোপের ভিতরে আত্মপ্রচ্ছন্ন করে ইংরেজদের লাল পলটন এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল, এইবারে তারা এগিয়ে এল— বিষম গুলিবৃষ্টিতে ফরাসিদের ত্রিবর্ণ পতাকা শতচ্ছিন্ন হয়ে গেল। দুই পক্ষই ঝাঁপিয়ে পড়ল পরস্পরের উপরে— আরম্ভ হল প্রচণ্ড হত্যাকাণ্ড! ইম্পিরিয়াল গার্ডের সৈনিকরা অন্ধকারে অনুভব করলে, তাদের চারিদিক দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে ফরাসি সৈন্যেরা! তাদের প্রাণে প্রাণে জাগল পরাজয়ের নিরাশা! সম্রাটের নামে জয়ধ্বনির পরিবর্তে শুনতে পেলে 'পালাও পালাও' রব! কিন্তু এ শব্দের বিভীষিকা উপলব্ধি করেও ইম্পিরিয়াল গার্ড অটল পদে অগ্রসর হতে লাগল! পদে পদে মৃত্যু, তবু তারা এগিয়ে যাচ্ছে পদে পদে! কেউ ইতস্তত করলে না, কেউ কাপুরুষতা দেখালে না! আত্মহত্যা করবার ভয়েও জনপ্রাণী হল না পশ্চাৎপদ!

নে-র দেহের তলায় পঞ্চম ঘোড়া মারা পড়ল! মৃত্যুপণ করে তিনি ষষ্ঠ ঘোড়ায় চেপে আবার ঝাঁপ দিলেন রক্তসাগরে! তখন তাঁর দুই চক্ষু আসন্ন আত্মবিসর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় জ্বলজ্বল করে জ্বলছে, মুখ দিয়ে ফেনা বেরোচ্ছে, বোতাম-ছেঁড়া জামা ঝলঝল করে ঝুলছে। তাঁর পোশাকের উপরে কোথাও তরবারির এবং কোথাও বুলেটের দাগ— কর্দমাক্ত, রক্তাক্ত, তবু অপূর্ব সেই বীর ভাঙা তরবারি তুলে ছুটে এসে বললেন, 'তোমরা দেখো, ফরাসিদের সেনাপতি কেমন করে সম্মুখযুদ্ধে প্রাণ দেয়!' কিন্তু বৃথা! বৃথা! নে-র মৃত্যু হল না!

অসংখ্য শত্রু মুষ্টিমেয় ফরাসিদের উপরে অশ্রান্ত গোলাগুলি বৃষ্টি করছে দেখে নে চিৎকার করে উঠলেন, 'এখানে কি আমার জন্যে কিছুই নেই? হায়! আমার ইচ্ছা ইংরেজদের সমস্ত বুলেট আমারই দেহে প্রবেশ করুক!' হা হতভাগ্য, ইংরেজ বুলেট নয়, তোমার জন্যে তোলা আছে ফরাসি বুলেট! (নেপোলিয়নের পতনের পর নতুন ফরাসি সম্রাটের হুকুমে মহাবীর নে কে গুলি করে মেরে ফেলা হয়!)

গার্ডরা যখন প্রাণ বিলিয়ে দিচ্ছে, অন্যান্য দিকে ফরাসি বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল আচম্বিতে! 'পালাও পালাও' রবের সঙ্গে শোনা গেল 'বিশ্বাসঘাতকতা, বিশ্বাসঘাতকতা!' সেনাদলের ধ্বংস হচ্ছে তুষার গলে যাওয়ার মতন। তখন সমস্তই ব্যর্থ হয়, ছিঁড়ে যায়, ভেঙে যায়, ভেসে যায়, গড়িয়ে যায়, ডুবে যায়, ধাক্কা খায়, পালায়, পতিত হয়। নে তাড়াতাড়ি একটা ঘোড়ায় চড়ে টুপিহীন, গলাবন্ধহীন, অস্ত্রহীন অবস্থায় পলাতকদের ফিরিয়ে আনতে ছুটলেন— কিন্তু সে যেন হল বন্যার মুখে বালির বাঁধ দেওয়ার দুশ্চেষ্টার মতন! পলাতকরা সসম্ভ্রমে চিৎকার করে উঠল, 'সেনাপতি নে দীর্ঘায়ু হোন!' কিন্তু তারপরেই বেগে পলায়ন করতে লাগল! আতঙ্কের সময়েই হয় বেশি হাঙ্গামা, অন্ধের মতন পালাতে গিয়ে বন্ধু করে বন্ধুহত্যা! ইম্পিরিয়াল গার্ডের অবশিষ্ট অংশ নিয়ে নেপোলিয়ন স্বয়ং পলাতকদের বাধা দিতে গেলেন— কিন্তু বৃথা! তিনি তাদের মিনতি করতে, ভয় দেখাতে, উৎসাহ দিতে চেষ্টা করলেন— কিন্তু বৃথা! সকালে যারা চেঁচিয়েছিল 'সম্রাট দীর্ঘায়ু হোন' বলে, এখন তারা যেন তাঁকে চিনতেই পারলে না!

একেবারে তাজা প্রুশিয়ান অশ্বারোহীর দল মৃত্যুর খেলা শুরু করলে। কামান নিয়ে ফরাসি গোলন্দাজরা পালাতে লাগল, অনেকে গোলার বাক্স-গাড়ির ঘোড়া খুলে নিলে— তাড়াতাড়ি পালাবার জন্যে। চারিদিকে ভিড়ের ঠেলাঠেলি— জীবন্ত ও মৃতদেহকে পদদলিত করে। রাস্তা, মেঠোপথ, সাঁকো, ময়দান, পাহাড়, উপত্যকা, অরণ্য আচ্ছন্ন করে চল্লিশ হাজার পলাতক পালিয়ে যাচ্ছে। যারা ছিল সিংহ, তারা হল হরিণ!

সেনানী লোজে বহু চেষ্টায় তিনশত লোককে ফিরিয়ে দাঁড় করালেন। কিন্তু প্রুশিয়ানদের প্রথম ঝাঁক গুলি ছুটে আসামাত্র তারা দিগবিদিক জ্ঞান হারিয়ে আবার পালাতে লাগল— লোজে হলেন বন্দি! ব্লুচার নিষ্ঠুর ভাষায় হুকুম দিলেন, 'ফরাসিদের একেবারে ধ্বংস করে ফেলো!' প্রুশিয়ানরা প্রাণপণে সেই চেষ্টাই করলে!

দুজন ফরাসি সেনানী একটি ছন্নছাড়া লোককে দীর্ঘ কোটের প্রান্ত ধরে টেনে ফেরাবার চেষ্টা করছেন! পলাতকদের বন্য ঠেলায় তিনি এত পিছনে হটে আসতে বাধ্য হয়েছেন, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই। কিন্তু এখন তিনি ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে লাগাম ধরে উদ্ভ্রান্তের মতন আবার ওয়াটার্লু ক্ষেত্রের দিকে ফিরে যেতে চান। ইনি হচ্ছেন নেপোলিয়ন, স্বপ্ন তাঁর ভেঙে গেছে!

কিন্তু তখনও ইম্পিরিয়াল গার্ডের বিভিন্ন দল বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে লড়াই করছে। চতুর্দিকব্যাপী আতঙ্কের বিপুল বন্যার মাঝে মাঝে তাদের দেখাচ্ছে অটল শৈলের মতন। রাত্রি আসন্ন, মৃত্যুও আসন্ন, এই দুই আসন্ন অন্ধকার কখন তাদের আবৃত করে ফেলবে, তারা তারই প্রতীক্ষায় আছে। কোনও দলের সঙ্গে কোনও দলেরই যোগ নেই, কিন্তু প্রত্যেক দলই মৃত্যুর জন্যে বদ্ধপরিকর।

সন্ধ্যার পর এক জায়গায় এমনই একটি দলকে দেখা গেল। তাদের চারিদিকে অসংখ্য শত্রু এবং ঝরে পড়ছে গোলাগুলির ভীষণ ধারা! কিন্তু তবু তারা লড়ছে! এ দলের নায়ক হচ্ছেন একজন অজানা সেনানী, নাম তাঁর ক্যামব্রোন। যখন দলের লোক মুষ্টিমেয়, যখন তাদের পতাকা পরিণত ছেঁড়া ন্যাকড়ার টুকরোয়, যখন তাদের গুলিশূন্য বন্দুক যষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়, যখন মৃতের স্তূপ জীবন্তদের চেয়ে বৃহৎ, তখন আক্রমণকারী বিজয়ী শত্রু-সৈন্যরাও মানুষদের এমন মহানভাবে মরতে দেখে পবিত্র এক ভয়ে আচ্ছন্ন হয়ে গেল— তারা গোলাগুলি ছোড়া বন্ধ করলে! কিছুক্ষণ সব শান্ত। তারপর আবার কামান-বন্দুকের গভীর গর্জনে কেঁপে উঠল চারিদিকের পাহাড়েরা। উঠন্ত চাঁদের আলোয় রাশীকৃত ধোঁয়া যখন মিলিয়ে গেল, তখন সেখানে আর একজনও মানুষ দাঁড়িয়ে নেই। গার্ডের দল নিঃশেষ! তাদের বুকের ভিতরে চিরনিদ্রিত হল কত যুদ্ধের গৌরবময় স্মৃতি!

ওয়াটার্লু হচ্ছে একটি প্রথম শ্রেণির যুদ্ধ, কিন্তু তার বিজয়ী হচ্ছেন দ্বিতীয় শ্রেণির সেনাপতি। সেনাপতি ওয়েলিংটনের চেয়ে উল্লেখ্য হচ্ছে ইংল্যান্ডের সৈন্যদল! কিন্তু তার মধ্যে সবচেয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে দৈবের খেলা! যুদ্ধের পূর্বরাত্রে সেই অসাময়িক বৃষ্টি, সেই অভাবিত মৃত্যু-খাত, কামানধ্বনি শোনবার পরেও ফরাসি নায়ক গ্রাউচির সেই অনুপস্থিতি, যথাসময়ে ব্লুচারের সেই আবির্ভাব— এইসব দৈব-দুর্ঘটনা বিচিত্রভাবে নিয়মিত হয়েছে!

এগারো। সূর্যাস্ত

এলবা থেকে ফিরে এসে নেপোলিয়নের একশো দিনের রাজত্ব শেষ হল। নেপোলিয়ন আবার বাধ্য হলেন সিংহাসন ত্যাগ করতে (২৩ জুন, ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে)।

কিন্তু মিত্রপক্ষ এবারে আর তাঁর সঙ্গে কোনওরকম সদয় ব্যবহার করতে রাজি হলেন না। এজন্যে মিত্রপক্ষের দোষ নেই। ইয়োরোপের রাজারা তাঁর কাছে বহুবার নির্যাতিত হয়েছেন, তাঁর অসীম উচ্চাকাঙ্ক্ষা ইয়োরোপকে বারে বারে করে তুলেছে রক্তপিচ্ছিল। রাজাদের কাছে তিনি ছিলেন বাস্তব দুঃস্বপ্নের মতন। গতবারে তাঁকে স্বাধীনভাবে এলবা দ্বীপে বাস করবার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু তিনি আবার এসে সব ওলটপালট করে দিলেন।

নেপোলিয়ন বললেন, আমাকে আমেরিকায় যেতে দাও।

ইয়োরোপ বললে, না। তুমি আবার ফিরে আসতে পারো।

নেপোলিয়ন ইংল্যান্ডগামী জাহাজে চড়ে বললেন, আমি ইংরেজদের আতিথ্য স্বীকার করলুম।

ইংল্যান্ড বললে, না, তুমি যুদ্ধে বন্দি। তোমার নিজের মতামতের মূল্য নেই। তোমাকে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বন্দির মতন থাকতে হবে। আজ থেকে তুমি আর সম্রাট নও, জেনারেল বোনাপার্ট মাত্র।

ছেলেবেলায় 'কপি-বুক'-এর শেষ পাতায় তিনি লিখে রেখেছিলেন— 'সেন্ট হেলেনা, আটলান্টিক মহাসাগরের একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ। ইংরেজদের উপনিবেশ।'

আজ সেইখানেই তাঁকে যেতে হল, জীবনের শেষ অঙ্কের উপরে যবনিকাপাত করতে (১৭ অক্টোবর, ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে)।

দ্বীপ-কারাগারের পর্বত। নেপোলিয়ন বসে আছেন একখানি পাথরের উপরে। সুমুখ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অশান্ত মহাসাগর।... মানুষ-নেপোলিয়নকে সমুদ্রের সামনে দেখাচ্ছে কত ছোটো! কিন্তু মানুষ-নেপোলিয়নের হৃদয়-সাগরে যে অনন্তের প্রকাশ, আটলান্টিক কি তার চেয়েও বৃহৎ?

স্বাধীন হলে মানুষ-নেপোলিয়ন যে আরও কত বড়ো হতে পারতেন, তা আমরা কল্পনা করতে পারি না। কিন্তু তিনি যতটা বৃহৎ হতে পেরেছেন, তাও ছিল কল্পনার অতীত। জার্মান কবি গ্যেটে বলেছেন—

যাহা কিছু তুচ্ছ হেথা, দৃষ্টি হতে যায় যে মিলায়ে,

গণনীয় হয় শুধু মহাদেশ, বিপুল সাগর!

মানুষ হলেও নেপোলিয়নের সঙ্গে মহাদেশ বা মহাসাগরেরই তুলনা করা চলে।

সেন্ট হেলেনায় বড়ো কষ্টে যে নেপোলিয়নের দিন কাটতে লাগল, সে কথা বলাই বাহুল্য। তিনি ছিলেন মুক্ত পৃথিবীর স্বাধীন জীব। দুই মহাদেশ— ইয়োরোপ ও আফ্রিকা ছিল তাঁর বিচরণ-ক্ষেত্র, কর্মের প্রচণ্ড স্রোতে অশ্রান্তভাবে সাঁতার দেওয়াই তাঁর একমাত্র আনন্দ ছিল। শিলাময় ক্ষুদ্র সেন্ট হেলেনার সংকীর্ণতার মধ্যে অলসভাবে বসে বসে কেবল অতীত-গৌরবের স্বপ্ন দেখা তাঁর সহ্য হবে কেন? তার উপরে এ দ্বীপটি ছিল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। তাঁকে এখানে বন্দি রেখে ইংরেজরা মানবতার পরিচয় দেননি। দেখতে দেখতে তাঁর শরীর ভেঙে পড়ল।

প্রথম প্রথম তিনি বাড়ির বাইরে বহু দূর পর্যন্ত ভ্রমণ করে আসতেন। কিন্তু সর্বদাই তাঁর সঙ্গে সঙ্গে থাকত ইংরেজ সেপাই— পাছে তিনি আবার ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যান।

এই নির্দয় বাড়াবাড়ি দেখে তিনি যারপরনাই অপমান জ্ঞান করলেন এবং বাইরে বেড়ানো একেবারেই ছেড়ে দিলেন। ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে কাটাতে লাগলেন দিনরাত। ফলে স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হল। এমনকী অঙ্গসঞ্চালনের অভাবে তাঁর দুই পা ফুলে উঠল।

দ্বীপের গভর্নর স্যার হাডসন লো যে তাঁর উপরে অত্যাচার ও তাঁকে অপমান করে আনন্দলাভ করতেন, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। অকারণেই তিনি বন্দিকে অন্বেষণ করতে আসতেন। একদিন নেপোলিয়ন কফির পেয়ালা হাতে করেছেন, এমন সময় লো এসে হাজির। তিনি বিদায় হলে পর নেপোলিয়ন বললেন, 'কফির পেয়ালা ছুড়ে ফেলে দাও। ওই নোংরা লোকটা এর কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল।'

নেপোলিয়নের মুখের উপরে তাঁকে 'জেনারেল' বলে ডেকে গভর্নর তাঁকে আহত করবার চেষ্টা করতেন। সম্রাট নেপোলিয়নের পক্ষে এ সম্বোধন ছিল অসহনীয়!

একদিন লো এসে অভিযোগ করলেন, 'আপনার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। খরচ কমাবার চেষ্টা করুন।'

নেপোলিয়নের দুই চক্ষে জ্বলে উঠল অগ্নিশিখা। মহাক্রোধে বললেন, 'এসব বিষয় নিয়ে তুমি কোন সাহসে আমার সঙ্গে কথা কইতে আসো? তুমি সামান্য জেল-দারোগা ছাড়া আর কিছুই নও!'

গভর্নর বিনা বাক্যব্যয়ে সরে পড়লেন।

তারপর থেকে গভর্নর আর কোনওদিন নেপোলিয়নের দেখা পাননি। তিনি এলেই শুনতেন, 'দেখা হবে না।' তবু একদিন তিনি জোর করে দেখা করবার চেষ্টা করলেন।

ঘরের ভিতর থেকে চাকরকে সম্বোধন করে নেপোলিয়ন চেঁচিয়ে বললেন, 'ওকে বলে দাও ঘাতকের কুঠার আনতে। ও লোকটাকে এ ঘরে ঢুকতে হবে আমার মৃতদেহ মাড়িয়ে। শীঘ্র আমার পিস্তল নিয়ে এসো!'

গভর্নর আর ভিতরে ঢুকতে ভরসা করলেন না। তারপর তিনি আর একদিন মাত্র বন্দির দেখা পেয়েছিলেন— নেপোলিয়ন যখন মৃত।

সেন্ট হেলেনায় নেপোলিয়নের সঙ্গে কয়েকজন ফরাসি সঙ্গী ছিলেন, একজন সস্ত্রীক। তাঁদের নিয়েই অতীত ও বর্তমানের গল্প করে তাঁর দিন কোনওরকমে কাটত। কিন্তু এভাবে দিন কাটানো যে অত্যন্ত কষ্টকর, এটা তাঁর হাবভাব-ব্যবহারে বোঝা যেত সর্বদাই। নির্বাসিত জীবনে প্রতিদিন খুব বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে তিনি ঘরের বাইরে আসতেন— জাগ্রত অবস্থায় দিনের দীর্ঘতা কমে যাবে বলে। কোনও কোনওদিন রাত্রে ঘুমোতে যাওয়ার সময়ে বলতেন, 'আঃ, জীবনের আর-একটা দিন কমে গেল!'

এলবা যাত্রার সময়ে ইম্পিরিয়াল গার্ডদের কাছে তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন, তাদের কীর্তিকাহিনি রচনা করবেন। কিন্তু এতদিন সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেননি। সেন্ট হেলেনায় হাতে প্রচুর সময় পেয়ে নেপোলিয়ন নিজের জীবনস্মৃতি রচনায় প্রবৃত্ত হলেন। ঘরের ভিতর পায়চারি করতে করতে তিনি বলে যেতেন, অন্য কেউ লিখে নিত। কিছুমাত্র বিশ্রাম না নিয়ে পুরো চোদ্দো ঘণ্টা তিনি নানা বর্ণনা করে যাচ্ছেন, যে লিখছে একেবারে অবসন্ন হয়ে পড়ছে এবং তার স্থান গ্রহণ করছে নতুন কোনও লোক, এই সামান্য পরিশ্রমে শ্রান্তি দেখে নেপোলিয়নের মুখে ফুটে ওঠে অবজ্ঞার হাসি!

কোনও কোনওদিন অতীতের কথা স্মরণ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, 'আমার মরা উচিত ছিল মস্কো শহরে গিয়ে। তখনও পর্যন্ত আমার যশোগৌরব ম্লান হয়নি।... ভগবান তখন যদি একটি বুলেট পাঠিয়ে দিতেন! তাহলে ফ্রান্সের সিংহাসনে বিরাজ করত আমার বংশই; আলেকজান্ডার আর সিজারের সঙ্গে ইতিহাস আমার তুলনা করত। ব্যাপার যা দাঁড়িয়েছে, এখন আমি প্রায় কিছুই নই।'

আর-একদিন বলেন, 'বোরোডিনো যুদ্ধক্ষেত্রে মরলে আমার মৃত্যু হত আলেকজান্ডারের মতন। ওয়াটার্লুতে মরাও ছিল ভালো। বোধহয় ড্রেসডেনের যুদ্ধে মরলে ভালো হত আরও। না, না, ওয়াটার্লুর মৃত্যুই ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ। লোকের ভালোবাসা পেতুম, তারা আমার জন্যে কাঁদত।'

এমনিভাবে ভেবে ভেবে দিন যায়। দেহের ভিতরে ব্যাধির অত্যাচার ক্রমেই বেড়ে উঠতে লাগল। তিনি বলেন, 'আমার পেটের ভিতরটা জ্বলছে যেন আগুনের মতন।' কখনো কখনো দারুণ যন্ত্রণায় মেঝের উপরে পড়ে ছটফট করতে থাকেন।

তাঁর জীবনের শেষ বৎসর এসে উপস্থিত হয়েছে। প্রথম সাত মাস ধরে তিনি নিজের বাড়ি-সংলগ্ন জমির উপরে করলেন চমৎকার বাগান রচনা। যাঁরা সে বাগান দেখলেন, বললেন, 'বিস্ময়কর কীর্তি!' এটি হচ্ছে নেপোলিয়নের নিজের হাতের শেষ দান। যুদ্ধ নয়, রাজনীতি নয়, শেষের কবিতা!

জন্মদিন। নেপোলিয়ন সকলকে খাওয়ালেন, শিশুদের উপহার দিলেন। বললেন, 'এই আমার শেষ জন্মদিন।'

শরৎকাল। চার বৎসর পরে নেপোলিয়ন প্রথম বাড়ির বাইরে গেলেন। ঘোড়ায় চড়ে অনেকটা পথ বেড়িয়ে এলেন। এই তাঁর শেষ ভ্রমণ।

ভক্তরা গোপনে তাঁকে দ্বীপ থেকে উদ্ধার করে আমেরিকায় নিয়ে যেতে চাইলেন! এমন প্রস্তাব দুই-দুইবার হয়। নেপোলিয়ন নারাজ হয়ে বললেন, 'নিয়তির লিখন হচ্ছে, আমি এইখানেই মরব। আমেরিকায় গেলে হয় আমাকে হত্যা করা হবে, নয় লোকে আমাকে ভুলে যাবে। আমি আত্মোৎসর্গ না করলে ফ্রান্সের সিংহাসনে আমার বংশের প্রতিষ্ঠা হবে না। তাই আমি থাকতে চাই সেন্ট হেলেনায়।'

রোগের লক্ষণ অধিকতর প্রকট। নেপোলিয়ন দুঃখিত স্বরে বলেন, 'বিছানা আজ আমার এত প্রিয় হয়ে উঠেছে যে, এর বদলে আমি আর সিংহাসনও গ্রহণ করব না। আমি কি করুণাপাত্র জীব হয়ে উঠেছি! আমি— যার কখনো ঘুমোবার প্রায় দরকারই হত না— এখন কিনা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েই দিনের পর দিন কাটাই। আগে আমি বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে বলে যেতুম, আর তা লিখে নেওয়ার জন্যে আবশ্যক হত একসঙ্গে চার-চারজন সেক্রেটারির! সেদিন গিয়েছে, যেদিন আমি ছিলুম নেপোলিয়ন।'

নেপোলিয়নের এই উক্তির মধ্যে নেই অত্যুক্তি। কার্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হওয়ার পর তিনি জীবনে একদিনের জন্যেও ছুটি নেননি। কাজ, কাজ, কাজ! তিনি স্ফূর্তিলাভ করতেন কর্মস্রোতে ঝম্প দিয়েই। এতবড়ো কর্মবীর পৃথিবীতে আর কখনো জন্মেছেন কি না সন্দেহ!

মৃত্যুর তিন সপ্তাহ আগে তাঁর অবশিষ্ট শক্তির শেষ বিকাশ দেখা গেল। একাসনে একটানা পুরো পাঁচ ঘণ্টা ধরে বসে তিনি নিজের উইল রচনা করলেন। সে উইল এক অপূর্ব জিনিস এবং প্রমাণিত করে যে, শেষ পর্যন্ত তাঁর মস্তিষ্কের তীক্ষ্নতা কিছুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয়নি।

নেপোলিয়নের নিজের মত হচ্ছে, 'আমার মৃত্যুর কারণ, এই অস্বাস্থ্যকর দ্বীপ। তার উপরে এক বৎসরকাল আমাকে চিকিৎসকের সাহায্য থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছিল।... ইংরেজ রাজমন্ত্রীদের চক্রান্তে ওই নগণ্য পাহারাওয়ালা হাডসন লো আমাকে তিলে তিলে হত্যা করবার চেষ্টা করছে।... ইংল্যান্ডেরও ধ্বংস হবে ভেনিসের গর্বিত প্রজাতন্ত্রের মতন। আমার মৃত্যুর জন্যে যা-কিছু লজ্জা আর নৃশংসতা, ইংল্যান্ডের রাজপরিবারকে আমি দান করে গেলুম।'

বন্দিদশায় যে কয়েকজন সহচর বা অনুচর নেপোলিয়নের সেবা-পরিচর্যায় নিযুক্ত ছিলেন, তাঁদের সম্বোধন করে তিনি বললেন, 'আমার মৃত্যুর পর তোমরা লাভ করবে স্বদেশ প্রত্যাগমনের মিষ্ট শান্তি। তোমরা আবার দেখতে পাবে তোমাদের আত্মীয়-বন্ধুগণকে। আর আমি? স্বর্গধামে গিয়ে আবার দেখতে পাব আমার নির্ভীক যোদ্ধৃবৃন্দকে।'— বলতে বলতে কণ্ঠস্বর উচ্চতর হয়ে উঠল— 'হ্যাঁ, ক্লেবার, দেসেক্স বিসিয়ার্স, দুরক, নে, মুরাট, মেসেনা, বার্দিয়ার— তারা সবাই আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে, আমরা সবাই মিলে যে কীর্তি স্থাপন করেছি, তারা সেই গল্পই করবে। আমিও তাদের কাছে বলব আমার শেষজীবন-কাহিনি। যখন তারা আমাকে দেখবে, তারা আবার সেই পুরোনো উৎসাহে, যশোগৌরবের জন্যে সেই পুরোনো আবেগে অনুপ্রাণিত হয়ে উঠবে। মহাবীর স্কিপিয়ো, হানিবল, সিজার আর ফ্রেডারিকের সঙ্গে আমরা আমাদের যুদ্ধ নিয়ে কথাবার্তা কইব! সে কী আনন্দ!'

মৃত্যুর দিনকয় আগে তিনি এই পত্রখানি নিজেই রচনা করলেন এবং বললেন, তাঁর মৃত্যুর পরে পত্রখানি যেন যথাস্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়:

মিঃ গভর্নর,

গত — তারিখে, দীর্ঘকালব্যাপী যন্ত্রণাদায়ক রোগে ভুগে সম্রাট নেপোলিয়ন পরলোকগমন করেছেন। মহাশয়কে এই সংবাদ জানানো হল। আপনাদের গভর্নমেন্ট তাঁর দেহকে ইয়োরোপে পাঠাবার কী ব্যবস্থা করেছেন, অনুগ্রহ করে তা জানাবেন।

যথাসময়ে সব দিক গুছিয়েগাছিয়ে তিনি আসন্ন মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হয়ে রইলেন।

মৃত্যুর পদশব্দ শুনতে পেয়ে আর-এক বিষয়ের জন্যে সকলকে সাবধান করলেন: 'যখন আমি জ্ঞান হারাব, তখন তোমরা কিছুতেই কোনও ইংরেজ ডাক্তারকে আমার ছায়া মাড়াতে দিয়ো না।'

তিনি জ্ঞান হারালেন— জ্ঞানোদয়ের পর এই প্রথম এবং শেষবার!

ঘোর বিকার! মাঝে মাঝে উচ্চৈচঃস্বরে প্রলাপ বকছেন: 'দেসেক্স! মেসেনা! আমরাই বিজয়লাভ করব! জলদি! অগ্রসর হও! ওরা আমাদের পাল্লায় এসে পড়েছে...'

ভয়াবহ শেষরাত্রি। ভোরের কিছু আগে তাঁর মুখে শোনা গেল, 'ফ্রান্স!... সৈন্যদল!... জোসেফাইন!'

পৃথিবীতে এই তাঁর শেষ উক্তি।

সারাদিন চুপ করে শান্তভাবে শুয়ে রইলেন— অন্তিম শ্বাস আরম্ভ হয়েছে। অস্টারলিটজের যুদ্ধক্ষেত্রে যে খাট ব্যবহার করেছিলেন, তাঁর শেষ-শয্যা বিছানো হয়েছে সেই খাটেই।

বাড়ির বাইরে আকাশ ফুঁড়ে পড়ছে ঝমঝম বৃষ্টি— ঝোড়ো বাতাসে ছটফট করছে কুয়াশা।

বিকাল পাঁচটা। ঝড়বৃষ্টির হুংকার বেড়ে উঠল— বাগানের দুটো গাছ শিকড়সুদ্ধ উপড়ে পড়ল!

মৃত্যু আক্রান্ত নেপোলিয়ন! দেহের কোথাও যাতনার কোনও চিহ্ন নেই। দুই চক্ষু বিস্ফারিত— শূন্য দৃষ্টি। কণ্ঠে ঘড়ঘড় শব্দ।

সমুদ্রে মগ্ন হল সূর্য। সঙ্গে সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে গেল নেপোলিয়নের হৃৎপিণ্ড! (৫ মে, ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে)।

শবদেহ ব্যবচ্ছেদ করে জানা গেল, নেপোলিয়নের মৃত্যুর কারণ উদরের ক্যান্সার।

মৃত্যু এসে নেপোলিয়নকে দিয়ে গিয়েছে তরুণ সৌন্দর্য! সিংহাসনে আরোহণ করবার পর থেকেই তাঁর মুখ ও দেহ অত্যন্ত স্থূল হয়ে উঠেছিল, কিন্তু এখন তাঁকে দেখাচ্ছে এক সুন্দর যুবকের মতন!

ইংরেজরা বললেন, মৃতদেহ ইয়োরোপে পাঠানো হতে পারে না।

মরা নেপোলিয়নও বিপজ্জনক! দেহ দেখে ফরাসিরা যদি শোকে ও ক্রোধে খেপে উঠে আবার অস্ত্র ধারণ করে!

পাহাড়ের এক নির্জন উপত্যকা। সেইখানেই মহাবীরের শেষ শয়ন পাতা হল। সমাধির উপরে নত হয়ে ছায়া ছড়িয়ে দিলে দুটি উইলো গাছ। যুদ্ধক্ষেত্রে বারংবার যিনি মহাকাব্য রচনা করেছিলেন, তাঁর জন্যে গীতিকবিতার সুরসৃষ্টি করতে লাগল ছোটো একটি নির্ঝর।

ইংল্যান্ড মৃতের জন্যে একটি সম্মানের ব্যবস্থা করলেন। তাঁর সমাধিকে সর্বদাই পাহারা দিয়েছিল একজন করে সৈনিক। একে একে কেটে গেল উনিশ বৎসর। তারপরে আর পাহারার দরকার হল না, কারণ ফ্রান্স দাবি করলে মৃতদেহ ফিরে পাওয়ার জন্যে। নেপোলিয়ন আবার প্রত্যাগমন করলেন বিজয়ীর মতন।

সম্রাটের মৃত্যুর পরেও ফ্রান্সের নতুন বুৰ্বো রাজা নেপোলিয়নের নাম শুনলেই ভয়ে চমকে উঠতেন। রাজধানীতে নেপোলিয়নের এক অশ্বারোহী মূর্তি ছিল, রাজার হুকুমে তা স্থানান্তরিত হয়েছিল।

ফরাসিরা আবার বুৰ্বো রাজাকে তাড়িয়ে দিলে। ভিন্ন বংশের নতুন রাজা সিংহাসনে বসে জনসাধারণের অনুরোধে নেপোলিয়নের প্রস্তরমূর্তি আবার ফিরিয়ে আনলেন— পনেরো বৎসর পর।

ছোটোছেলে জেরোম এসে মা লেটিজিয়াকে এই খবর দিলেন।

জরায় ও রোগে মা তখন বিছানা আশ্রয় করেছেন। চলতে পারেন না, চোখ অন্ধ। কিন্তু খবর শুনেই মায়ের দেহে এল নতুন শক্তি।

বহুকাল পরে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। বৈঠকখানায় নেমে এলেন।

নেপোলিয়নের একটি প্রস্তরমূর্তির দিকে অন্ধ চোখ দুটি ফিরিয়ে মা লেটিজিয়া বললেন, 'সম্রাট আবার প্যারিতে এসেছেন!'

সকল অধ্যায়
১.
ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতে
২.
ভগবানের চাবুক
৩.
মহাভারতের শেষ মহাবীর
৪.
হন্তারক নরদানব
৫.
রক্ত বাদল ঝরে
৬.
আলেকজান্ডার দি গ্রেট
৭.
দিগবিজয়ী নেপোলিয়ন
৮.
পঞ্চনদের তীরে
৯.
উপন্যাসের চেয়ে আশ্চর্য
১০.
সত্যিকার অ্যাডভেঞ্চার
১১.
সাত হাজারের আত্মদান
১২.
মরা মানিক আর জ্যান্ত মানিক
১৩.
ভারতের একমাত্র সুলতানা
১৪.
সূর্য দেবী, পর্মল দেবী
১৫.
মারাঠার লিওনিডাস
১৬.
মুসলমানের জহরব্রত
১৭.
মৃগনয়না মহিষমর্দিনী
১৮.
ব্যাঘ্রভূমির বঙ্গবীর
১৯.
অনামা বীরাঙ্গনা
২০.
ভারতের থার্মোপলি
২১.
সিরাজের বিজয় অভিযান
২২.
ছত্রপতির অ্যাডভেঞ্চার
২৩.
ইতিহাসের রক্তাক্ত দৃশ্য
২৪.
মহাভারতের মহারথ
২৫.
'বীরাঙ্গনা, পরাক্রমে ভীমা-সমা'
২৬.
রক্ত পাথারের সাঁতারু
২৭.
ছত্রপতির ছত্রভঙ্গ
২৮.
তিন সম্রাটের ত্র্যহস্পর্শ-যোগ
২৯.
আলেকজান্ডারের পলায়ন
৩০.
ওষ্ঠাধরে রাজদণ্ড
৩১.
ইতিহাস আশ্রিত রচনা
৩২.
এ যুগের সবচেয়ে বড়ো ডাকাত
৩৩.
আধুনিক রবিনহুড
৩৪.
ইয়াঙ্কি খোকা-গুণ্ডা
৩৫.
গুপ্ত কবির কদলী-কবিতা
৩৬.
ভাঙা অমিত্রাক্ষরের স্রষ্টা কে?
৩৭.
নূতন বাংলার প্রথম কবি
৩৮.
বুদ্ধদেব
৩৯.
বাংলাদেশে বোম্বেটেরাজ
৪০.
ঋষি টলষ্টয়
৪১.
দুই ঠাকুরের কাহিনি
৪২.
আশ্চর্য মূর্খ পণ্ডিত
৪৩.
অতুল্য শ্রুতিধর
৪৪.
বর্গি এল দেশে
৪৫.
প্রথম বাঙালি সম্রাট
৪৬.
জগন্নাথদেবের গুপ্তকথা
৪৭.
মরণ বিজয়ীর দল
৪৮.
সত্যিকার দানব-দানবী
৪৯.
প্যারিসের কুব্জ-রাজা
৫০.
ফরাসি বিপ্লবে বাঙালির ছেলে
৫১.
বিখ্যাত চোরের অ্যাডভেঞ্চার
৫২.
টেলিফোনে গোয়েন্দাগিরি
৫৩.
প্যারির বালক-বিভীষিকা
৫৪.
পৃথিবীর প্রথম গোয়েন্দা কাহিনি
৫৫.
শিবদাস ভাদুড়ি
৫৬.
সেকালের সপ্ত আশ্চর্য

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%