হেমেন্দ্রকুমার রায়

প্রথম অধ্যায়। গ্রিস ও ভারত
আলেকজান্ডার হচ্ছেন পৃথিবীর প্রথম দিগবিজয়ী।
তাঁর আগে আর কোনও বীর দিগবিজয়ে যাত্রা করেননি এমন কথা বলছি না। প্রাচীন মিশর, ব্যাবিলন, আসিরিয়া, ভারত ও পারস্য প্রভৃতি দেশের ইতিহাস পড়লে আরও কয়েকজন দিগবিজয়ীর নাম জানা যায়। কিন্তু তাঁদের দৃষ্টিশক্তি ও দিগবিজয়ের ক্ষেত্র ছিল সংকীর্ণ। তাঁদের আদর্শবাদও তেমন উচ্চ ছিল না। এবং তাঁদের দিগবিজয়ের ফলে সমগ্র পৃথিবীতে যুগান্তরও উপস্থিত হয়নি।
তিন বা একাধিক মহাদেশের উপরে যাঁরা ধূমকেতুর মতন ছুটে গিয়েছেন এবং যাঁরা আজ পর্যন্ত মানুষের চিন্তার রাজ্যে প্রভাব বিস্তার করে আছেন— যেমন আলেকজান্ডার, হানিবল, সিজার, চেঙ্গিজ খাঁ, তৈমুর লং ও নেপোলিয়ন— যথার্থ দিগবিজয়ী বলি তাঁদের। কারণ, এঁদের দিগবিজয়ের পিছনে ছিল এক-একশ্রেণির আদর্শবাদ। এঁদের মধ্যেই সর্বপ্রথমে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন আলেকজান্ডার।
ইয়োরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা। আলেকজান্ডারের যুগে মানুষ এই তিনটির বেশি মহাদেশের নাম জানত না। এবং তিন মহাদেশেই এমন অনেক জায়গা ছিল, যা তখনও পৃথিবীর সভ্য দেশগুলির অন্তর্গত ছিল না। আজ ইংরেজ, জাপান, আমেরিকান, রোমান, জার্মান, ফরাসি ও স্পেনীয় প্রভৃতি কত জাতির কথাই শুনতে পাই। কিন্তু তখন তাদের নামকরণ পর্যন্ত হয়নি। তাদের দেশ ছিল ঘৃণ্য বর্বরদের দেশ। অনেক দেশ তখনও সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। তখনকার মানচিত্রে সেসব দেশের স্থান পর্যন্ত ছিল না।
কিন্তু যেসব দেশ তখন সভ্যতার উচ্চতম শিখরে আরোহণ করেছিল, আলেকজান্ডারের কবল থেকে তারা কেউই মুক্তি পায়নি। এমনকী তখনকার দিনে গ্রিকদের পক্ষে অতি দুর্গম ও দূর দেশ ভারতবর্ষেও তিনি ছুটে গিয়েছিলেন। যদিও তখনকার দিনের সর্বশ্রেষ্ঠ ভারতীয় রাজার (ধননন্দ) সঙ্গে তাঁর শক্তিপরীক্ষা হয়নি এবং ভীত সৈনিক ও সেনাপতিদের বিদ্রোহিতায় অধিকাংশ ভারতবর্ষকে নাগালের বাইরে রেখেই তাঁকে প্রত্যাগমন করতে হয়েছিল, তবু তিনি বিজয়পতাকা তুলে যেটুকু অগ্রসর হতে পেরেছিলেন, সে যুগের পক্ষে তা-ই ছিল কল্পনাতীত, অসম্ভব ব্যাপার!
আলেকজান্ডারের কাছে একটি কারণে আমরা চিরকৃতজ্ঞ থাকব। তাঁর ভারত অভিযানের ফলেই ভারতবর্ষের সত্যিকার ঐতিহাসিক যুগ আরম্ভ হয়েছে।
আলেকজান্ডারের আগমনের অনেক আগেই ভারতবর্ষ যে সভ্যতার শীর্ষস্থানে উঠেছিল, সে বিষয়ে কোনোই সন্দেহ থাকতে পারে না। কিন্তু প্রাচীন ভারতবাসীরা এক বিষয়ে রীতিমতো পশ্চাৎপদ ছিলেন। লিখিত ইতিহাস বলতে আজ আমরা যা বুঝি, প্রাচীন ভারতবর্ষে কেউ তা রচনা করেনি। কাব্য, পুরাণ, নাটক বা অন্যান্য গ্রন্থে আমরা ভারতীয় ইতিহাসের অনেক মালমশলা পাই বটে, কিন্তু সেগুলি অত্যন্ত অগোছালো অবস্থায় এমন নানা বিষয়ের সঙ্গে মিশিয়ে আছে যে, তাদের ভিতর থেকে সত্যিকার মানুষকে আবিষ্কার করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের কবির কল্পনা ও অবাস্তব প্রলাপ বলে মেনে নিলে আর কোনও গোলমালই থাকে না; কিন্তু তাদের ঐতিহাসিক সত্য রূপে দেখাতে গেলেই আমাদের সহজ-বুদ্ধি বিদ্রোহী হয়ে দাঁড়ায়। রাম, রাবণ, কুম্ভকর্ণ, শ্রীকৃষ্ণ, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, ভীম ও অর্জুন প্রভৃতি নামধারী ঐতিহাসিক ব্যক্তি যে ছিলেন না, এ কথা কে জোর করে বলতে পারে? কিন্তু কবির আকাশচারী কল্পনা ও অবাস্তব অত্যুক্তি তাঁদের মনুষ্যত্বকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, ওঁদের আর সত্যিকার মানুষ বলে মনে হয় না এবং সকলেই জানেন, ইতিহাস হচ্ছে সত্যিকার মানুষদেরই কীর্তিকাহিনি।
উপরন্তু প্রাচীন ভারতীয় লেখকরা ধরতে গেলে সাল-তারিখের কোনও ধারই ধারতেন না। সাল-তারিখ ভুললে ইতিহাস হয়ে দাঁড়ায় উপহাস। বেশি দিনের কথা নয়, স্বর্গীয় দুর্গাদাস লাহিড়ি বহু খণ্ডে বিভক্ত প্রকাণ্ড একখানি 'পৃথিবীর ইতিহাস' রচনা করেছিলেন। সেই গ্রন্থে প্রাচীন ভারতবর্ষের কথা বলতে গিয়ে তিনি গুপ্তবংশীয় চন্দ্রগুপ্তকে ধরে নিয়েছিলেন মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত বলে। অথচ ভারতের প্রথম সম্রাট, গ্রিক বিজয়ী মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত ও গুপ্তবংশীয় চন্দ্রগুপ্তের মধ্যে ছিল সুদীর্ঘ কয়েক শতাব্দীর ব্যবধান! এই দুই সম্রাটের মাঝখানে হয়েছে কত বংশের উত্থান ও পতন এবং ভারতবর্ষের উপরে পড়েছে একাধিকবার অন্ধ যুগের কালো যবনিকা।
আজকাল ভারতের নানা প্রদেশে হাজার হাজার শিলা বা তাম্রলিপি ও প্রাচীন মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে বা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা তাদের পাঠ উদ্ধার করে এতকাল পরে ইতিহাসপূর্ব যুগের অনেক সাল-তারিখ ও গুপ্তরহস্য আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ওসব লিপি বা মুদ্রা প্রভৃতি ইতিহাস রচনার জন্যে প্রস্তুত হয়নি।
আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের ফলেই ভারতবর্ষে আরম্ভ হয়েছে সত্যিকারের ঐতিহাসিক যুগ। আলেকজান্ডারের আগেও গ্রিসের সঙ্গে যে ভারতবর্ষের সম্পর্ক একেবারেই ছিল না, তা নয়; তাঁরও অনেক আগে (খ্রিঃপূঃ ৫১০) স্কাইল্যাক্স নামে এক গ্রিক ভ্রমণকারী ভারতে বেড়িয়ে গিয়েছিলেন। ভারতীয় সৈনিকরাও পারস্য সম্রাট দরায়ুসের পক্ষাবলম্বন করে গ্রিসে গিয়ে যুদ্ধ করে এসেছে। এমনিভাবে আরও কোনও কোনও দিক দিয়ে ভারতের সঙ্গে গ্রিসের অল্পস্বল্প পরিচয় সাধন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এটুকু পরিচয়ের দাম খুব বেশি ছিল না। গ্রিকরা তখনও ভারতকে নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাত না।
কিন্তু আলেকজান্ডারের অভিযানের পরেই গ্রিকরা ভারতবর্ষকে সর্বপ্রথমে ভালো করে চিনতে পারলে। তার ফলে নানা গ্রিক লেখক ও ভ্রমণকারী স্বচক্ষে ভারতবর্ষকে দেখে তখনকার কথা নিয়ে আলোচনা করে গিয়েছেন। এরপরে ভারতের দৃষ্টি হয়ে পড়ে সুদূরপ্রসারিত। তারপর নানা যুগে নানা দেশি ভ্রমণকারী এসে ভারতের অনেক উজ্জ্বল ছবি এঁকে গিয়েছেন। এইসব ছবির ভিতর থেকেই প্রাচীন আর্যাবর্তের অখণ্ড না হোক— কতকটা সম্পূর্ণ ইতিহাস ও সাল-তারিখ উদ্ধার করা সম্ভবপর হয়েছে। মাঝে মাঝে ফাঁক থেকে গিয়েছে বটে, কিন্তু বহু স্থলেই ফাঁকগুলি পূর্ণ করতে পারা গিয়েছে প্রাচীন শিলালিপি ও মুদ্রা প্রভৃতির দ্বারা। আলেকজান্ডার এ দেশে না এলে ভারতবর্ষের ইতিহাসকে এমনভাবে পুনরুদ্ধার করতে পারা যেত না।
আলেকজান্ডার ভারত ত্যাগ করবার পরেই সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত গ্রিকদের আর্যাবর্ত থেকে বিতাড়িত করলেন বটে, কিন্তু ভারতের সঙ্গে গ্রিসের সম্পর্ক বিলুপ্ত হয়নি। আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলিউকাসের মেয়েকে চন্দ্রগুপ্ত নিজে বিবাহ করেন। তাঁর সভায় বর্তমান থাকেন গ্রিকরাজদূত মেগাস্থিনিস। তাঁর দেহরক্ষীরূপে নিযুক্ত থাকে অনেক গ্রিক নারী! এবং বিজয়ী রূপে না হোক, বিভিন্ন কাজ নিয়ে শত শত গ্রিক যে মৌর্য যুগের ভারতবর্ষে বাস করত, এটুকু আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি। চন্দ্রগুপ্তের পৌত্র সম্রাট অশোক অনেক ভারতবাসীকেও গ্রিসে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করবার জন্যে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এর কী ফল হয়েছিল জানি না, তবে এটা দেখতে পাই যে, মৌর্যরাজশক্তির পতনেরও বহুকাল পরে (খ্রিঃপূঃ ২১) গ্রিসের প্রধান নগর এথেন্সে একজন ভারতীয় বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বৌদ্ধধর্মের মহিমা দেখাবার জন্যে জ্বলন্ত চিতায় স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি দিচ্ছেন!
ভারতের নাট্যশালা থেকে মৌর্য নৃপতিরা চিরবিদায় নেবার পরে ভারতবর্ষের উপরে আবার গ্রিক প্রভাব বাড়তে থাকে। ভারতের প্রান্তদেশে এবং উত্তর ভারতে একাধিক গ্রিক নরপতি রাজত্ব করেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছেন মেনান্ডার— এঁর জয়পতাকা প্রায় পাটলিপুত্রের (বর্তমান পাটনা) কাছ পর্যন্ত এসে পড়েছিল এবং ইনি ও এঁর সমস্ত গ্রিক সভাসদ বৌদ্ধধর্ম পর্যন্ত অবলম্বন করেছিলেন (খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে)। এরই কয়েক বৎসর পরে দেখি, তক্ষশিলার (বর্তমান পেশোয়ার অঞ্চল) অধিবাসী গ্রিক রাজদূত হেলিয়োডোরাস হিন্দুধর্ম অবলম্বন করে বাসুদেবের নামে একটি স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করছেন! 'বেসনগর স্তম্ভ' নাম নিয়ে সেটি আজও বিদ্যমান আছে। এইসব দৃষ্টান্ত দেখেই বোঝা যায়, আলেকজান্ডারের পরবর্তীকালে গ্রিকরা নিজেদের কেবল ভারতবাসী বলেই মনে করতেন না, তাঁরা ভারতীয় ধর্ম পর্যন্ত গ্রহণ করতে ছাড়েননি।
বহু ঐতিহাসিকের মত হচ্ছে, গ্রিকদের আগমনের আগে ভারতবর্ষে মূর্তিপূজা ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করবার পদ্ধতি প্রচলিত ছিল না। হিন্দু ও বৌদ্ধরা নাকি মূর্তি গড়তে ও মন্দির তৈরি করতে শেখেন গ্রিকদের কাছ থেকেই। অথচ এখনকার ইয়োরোপীয় গ্রিকদের মাথায় করে রাখলেও পৌত্তলিক বর্বর বলে ঘৃণা করেন হিন্দুদেরই!
ভারতীয় ভাস্কর্যশিল্পও একসময়ে আশ্রয় নিয়েছিল গ্রিক শিল্পীদের কাছে। তার ফলে উত্তর ভারতের বিখ্যাত গান্ধার ভাস্কর্যের আবির্ভাব। পরবর্তী যুগে এই ভাস্কর্য কেমন করে ভারতের নিজস্ব শিল্প হয়ে উঠেছিল, এখানে সবিস্তারে তা দেখাবার দরকার নেই।
সংস্কৃত ভাষায় আজও কিছু কিছু গ্রিক শব্দ বর্তমান আছে। সংস্কৃত নাট্যসাহিত্যেরও উপরে অল্পস্বল্প গ্রিক প্রভাব থাকতে পারে। কেউ কেউ বলেন, নেই।
কিন্তু যাঁরা প্রথম হিন্দু-জ্যোতির্বিজ্ঞান রচনা করে গেছেন তাঁরা যে গ্রিকদেরই শিষ্য, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কারণ গার্গী-সংহিতায় স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে: 'যবনরা (গ্রিকরা) বর্বর বটে, কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রথম প্রকাশ হয়েছে তাদের মধ্যেই। এবং এই কারণে তাদের দেবতা বলে ভক্তি করা উচিত।'
আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের ফলেই আর্যাবর্তের জ্ঞান ও চিন্তার রাজ্যে এসেছে এমনি উন্নতিমূলক নানা পরিবর্তন। /তিনি সাহস করে অগ্রবর্তী না হলে আর কোনও গ্রিক যে এই বিপদসংকুল পথে পদার্পণ করতেন না, সে কথা নিশ্চিতরূপেই বলা যায়।
ভারতবর্ষের উপরে রক্তাক্ত খড়্গ তুলে এসে দাঁড়িয়েছেন আরও কত দিগবিজয়ী! তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হচ্ছেন তাতার তৈমুর লং, গজনির মামুদ, পারসি নাদির শাহ ও আফগান আহম্মদ শাহ আবদালি! কিন্তু তাঁদের অভিযানের ফলে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে শুধু রক্ত-সাগরের তরঙ্গ। বারংবার ভারতের সোনার ভাণ্ডার লুণ্ঠন করে তাঁরা দস্যুর মতন অদৃশ্য হয়েছেন, কিন্তু তাঁদের কাছ থেকে ভারত পায়নি কোনও দান। তাঁরা ডাকাতি করেছেন মাত্র, মানবতার পরিচয় দেননি।
আলেকজান্ডার রক্তলোভী দিগবিজয়ী ছিলেন না, তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নিষ্ঠুর হলেও আদর্শবাদী ছিলেন। পরে দেখাব, প্রাচ্যের সঙ্গে প্রতীচ্যের মধুর মিলন সাধন করবার জন্যে তাঁর প্রাণের আকাঙ্ক্ষা ছিল কতখানি প্রবল!
দ্বিতীয় অধ্যায়। যবনিকার অন্তরালে
হঠাৎ পৃথিবী জয় করবার বাসনা হল, অমনি সৈন্যসামন্ত জোগাড় করে যুদ্ধসাজ পরে 'মার মার' রবে পথে বেরিয়ে পড়লুম— আলেকজান্ডারের দিগবিজয়ের মূলে এ নীতি কাজ করেনি কোনওদিন।
আলেকজান্ডারের ঠিক পরেই পৃথিবী যে দিগবিজয়ীকে প্রসব করেছিল তাঁর নাম হচ্ছে হানিবল। তিনি আফ্রিকার অধুনালুপ্ত কার্থেজের (বর্তমান টিউনিসের নিকটবর্তী) বাসিন্দা। তাঁর পিতার নাম হামিলকার।
খ্রিস্টপূর্ব ২৩৮ বৎসরের কথা। ভারতে তখন সম্রাট অশোক রাজত্ব করছেন। গ্রিসের বদলে, ইয়োরোপের কর্তা তখন রোম। এবং রোম হচ্ছে কার্থেজের মহাশত্রু।
কার্থেজের বিখ্যাত সেনাপতি হামিলকার বাআলদেবতার মন্দিরে পূজা দিতে গিয়েছেন— সঙ্গে ছেলে হানিবল, বয়স তাঁর মোটে নয় বৎসর।
পূজা শেষ করে পিতা ডাকলেন, 'হানিবল!'
হানিবল এগিয়ে এলেন।
'হানিবল! তুমি আমার সঙ্গে অভিযানে যাত্রা করতে চাও?'
'হ্যাঁ বাবা!'
'তাহলে দেবতার সামনে দাঁড়িয়ে শপথ করো।'
'কী শপথ বাবা?'
'শপথ করো, যতদিন বাঁচবে ততদিন রোমকে শত্রু বলে মনে করবে?'
'শপথ করছি, বাবা, রোম হবে আমার চিরশত্রু।'
নয় বছর বয়সে হানিবল যে প্রতিজ্ঞা করলেন, আজীবন তার মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে বারংবার দর্পী রোমের গর্ব চূর্ণ করে বৃদ্ধ বয়সে তিনি বাধ্য হয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন, তবু প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করেননি।
আলেকজান্ডারের মূলেও আছে অনেকটা এইরকম ব্যাপার। কিন্তু সেটা বুঝতে গেলে আমাদের আরও কিছুকাল পিছিয়ে যেতে হবে।
খ্রিস্ট জন্মাবার প্রায় পাঁচশত বৎসর আগেকার কথা। তার কিছুকাল আগে ভারতবর্ষে ধর্মপ্রচার করে বুদ্ধদেব নির্বাণলাভ করেছেন। অজাতশত্রুর পৌত্র উদয় তখন হিন্দুস্থানের রাজধানী পাটলিপুত্রের সিংহাসনে।
পারস্যের সম্রাট প্রথম দরায়ুস তখন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট— তিনি এশিয়া ও আফ্রিকার অধীশ্বর। কেবলমাত্র এশিয়ার চীন ও আফ্রিকার কার্থেজ ছিল তাঁর নাগালের বাইরে। উত্তর ভারতের সিন্ধুনদ পর্যন্ত বিস্তৃত অংশও তাঁর অধিকারভুক্ত।
গ্রিস বলতে বোঝাত তখন কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র এবং তাদের মধ্যে প্রধান ছিল এথেন্স।
দরায়ুসের অধীনস্থ গ্রিক রাজ্য ও প্রজারও অভাব ছিল না। হঠাৎ তারা বিদ্রোহী হল এবং এথেন্স করলে সেই বিদ্রোহে সাহায্য।
কোথায় 'সর্বশক্তিমান ঈশ্বর' বা 'রাজার রাজা' দরায়ুস, আর কোথায় তুচ্ছ, নগণ্য এথেন্স! গ্রিকদের বিরুদ্ধে দরায়ুস পাঠিয়ে দিলেন এক বিপুল বাহিনী। ঐতিহাসিক কালের মধ্যে এশিয়ার সঙ্গে ইয়োরোপের এই প্রথম শক্তিপরীক্ষা।
কিন্তু প্রথম পরীক্ষায় দরায়ুস শোচনীয় রূপে হেরে গেলেন, বিখ্যাত ম্যারাথন প্রান্তরে।
কিছুকাল যায়। পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার জন্যে এক অধিকতর বিপুল বাহিনী গঠন করতে করতে দরায়ুস মারা পড়লেন। সম্রাট হলেন তাঁর ছেলে ক্সের্ক্সেস (Xerxes)।
পিতার কর্তব্য পালন করবার জন্যে পুত্র অগ্রসর হলেন। ক্সের্ক্সেস গ্রিস আক্রমণ করলেন— তাঁর সঙ্গে ভারতীয় ধনুকধারী সৈন্যরাও ছিল। এই সময়ে বা কিছু পরে ভারতে মগধের সিংহাসন লাভ করেন নন্দ বংশের প্রথম রাজা।
গ্রিসের নানা রাষ্ট্র একজোট হয়ে বাধা দিতে এল। প্রথম যুদ্ধ হল থার্মোপলির গিরিসংকটে— যার নাম যুগে যুগে গ্রিক-বীরত্বকে অমর করে রেখেছে। কিন্তু বীরত্ব ফলপ্রদ হল না। নায়ক লিওনিডাস ও তাঁর দলভুক্ত গ্রিকদের মৃত্যুশয্যার উপর দিয়ে গ্রিসের উপরে ভেঙে পড়ল পারস্য বাহিনী, বাঁধভাঙা সমুদ্র-তরঙ্গের মতো।
জলপথে গ্রিকরা জয়লাভ করেও বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারলে না। কারণ স্থলপথে অগ্রসর হয়ে পারস্য বাহিনী বেশ কিছুকাল ধরে অধিকাংশ গ্রিস দখল করে রইল।
কিন্তু তারপর প্লাতায়ার যুদ্ধে আবার হল পারস্যের পরাজয়। এই যুদ্ধে বিশেষরূপে প্রমাণিত হল, পারসিরা সংখ্যায় অগণ্য হলেও রণকৌশলে, অস্ত্রশস্ত্রে ও সৈন্যচালনায় গ্রিকদের সমকক্ষ নয়।
পারসিরা ইয়োরোপ ছেড়ে আবার এশিয়ায় নিজেদের স্বদেশে ফিরে গেল বটে, কিন্তু তারা যে এতকাল ধরে গ্রিসের অধিকাংশ গ্রাস করে বসেছিল, গ্রিকরা এ অপমান ভুলতে পারলে না।
তবু উপায় নেই। ক্ষুদ্র গ্রিস যে আত্মরক্ষা করতে পেরেছে, এইটুকুই হচ্ছে আশ্চর্য ও যথেষ্ট; এশিয়ায় গিয়ে পারস্য আক্রমণ করবার শক্তি তাদের নেই। কাজেই গ্রিকরা মনের রাগ মনেই পুষতে লাগল।
আবার কিছুকাল যায়। তারপর এল খ্রিস্টপূর্ব ৩৫৯। গ্রিসের উত্তরে ম্যাসিডনিয়া রাজ্য। এ দেশটি নিজ গ্রিসের যে-কোনও রাষ্ট্রের চেয়ে ঢের বড়ো হলেও এবং এর বাসিন্দারা গ্রিক জাতিভুক্ত হলেও সামাজিক সম্মানে ছিল যথেষ্ট নিচু। এথেন্স ও স্পার্টা প্রভৃতি দেশের গ্রিকরা ম্যাসিডনিয়ার লোকদের কুলীন বলে গ্রাহ্য করত না, বরং তাদের অর্ধগ্রিক ও অর্ধবর্বর বলে মনে মনে, এমনকী প্রকাশ্যেও, ঘৃণা করতে ছাড়ত না।
ম্যাসিডনিয়ার রাজা পার্ডিকাস যুদ্ধে মারা পড়লেন। তাঁর একমাত্র ছেলে আমিনটাস হচ্ছেন শিশু। নাবালক রাজাকে সিংহাসনে বসিয়ে প্রতিনিধিনৃপরূপে রাজ্যশাসন করতে লাগলেন মৃত রাজার ছোটোভাই ফিলিপ। তিনি যুবক, বয়স তেইশ বৎসর মাত্র। তাঁর নিজের ছেলের নাম আলেকজান্ডার— বয়স বছর তিনেক।
ফিলিপ বয়সে তরুণ হলেও, তাঁর মনের ভিতরে ছিল প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তীক্ষ্ন রাজনৈতিক বুদ্ধি এবং প্রথম শ্রেণির সামরিক জ্ঞান। তিনি গ্রিসের সর্বশ্রেষ্ঠ সেনাধ্যক্ষ এপামিননডাসের কাছ থেকে যুদ্ধনীতিতে শিক্ষালাভ করেছিলেন।
এতদিন ম্যাসিডন কুলীন গ্রিক রাষ্ট্রগুলির স্বার্থের সঙ্গে নিজের স্বার্থ এক বলে মনে করবার অবসর পায়নি, সে তার উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত পেয়োনিয়া ও ইল্লিরিয়ার পার্বত্য জাতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহ নিয়েই ব্যতিব্যস্ত হয়েছিল।
রাজ্যচালনার ক্ষমতা হাতে পেয়েই ফিলিপ নিজের কর্তব্য স্থির করে ফেললেন। তা হচ্ছে প্রথমত, একদল সৈন্যকে নূতন রণকৌশলে শিক্ষিত করে তোলা। দ্বিতীয়ত, পেয়োনিয়া ও ইল্লিরিয়াকে সম্পূর্ণরূপে দমন। তৃতীয়ত, ম্যাসিডনকে কুলীন শ্রেণিতে উন্নত করা। চতুর্থত, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রিক রাষ্ট্রগুলিকে একতা বন্ধনে বেঁধে, তাদের মধ্যে মাসিডনকে প্রধান করে তোলা। পঞ্চমত, গ্রিসের সবচেয়ে বড়ো শত্রু পারস্যকে পদদলিত করা।
অপাঙক্তেয় ম্যাসিডনের নবীন এক প্রতিনিধিনৃপের পক্ষে এত বড়ো উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করা হয়তো হাস্যকর। কিন্তু ফিলিপ ছিলেন ভাগ্যদেবীর বরপুত্র। তাঁর কাছে কিছুই অসম্ভব ছিল না।
সারা শীতকাল ধরে সৈন্যদের যুদ্ধশিক্ষা নিয়ে তিনি নিযুক্ত হয়ে রইলেন। যে-সে শিক্ষা নয়— নূতন ধরনের শিক্ষা।
এতদিন যেসব গ্রিক পদাতিক গুরুভার অস্ত্রধারণ করত, তারা পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকত। কিন্তু ফিলিপ রচনা করলেন নূতন এক 'ঘনব্যূহ' বা 'ফেল্যাঙ্কস' (Phalanx)। এক-একটি ঘনব্যূহ রচিত হল ষোলো সার সৈন্য নিয়ে। রণক্ষেত্রে তারা দাঁড়াবে একেবারে পরস্পরের সঙ্গে গা মিশিয়ে এবং তাদের প্রত্যেকের হাতে থাকবে আঠারো ফুট লম্বা বর্শা।
তারপর তিনি সেনাদলের দুইপার্শ্বে ঘনসন্নিবিষ্ট গুরুভার অস্ত্রধারী অশ্বারোহীদের রাখবার ব্যবস্থা করলেন। তারা প্রকাণ্ড এক-এক খণ্ড নিরেট পর্বতচূড়ার মতন শত্রুদের দুইদিকে ভেঙে পড়বে।
অর্থাৎ মাঝখানকার ঘনব্যূহের পদাতিকরা যখন অখণ্ড প্রস্তর প্রাচীরের মতন শত্রু আক্রমণ সহ্য করবে, তাদের দুইপাশের ঘনসন্নিবিষ্ট অশ্বারোহী দল তখন প্রবল পরাক্রমে করবে শত্রুদের আক্রমণ। তখনকার যুগে এ শ্রেণির রণকৌশল ছিল সম্পূর্ণ নতুন ও কল্পনাতীত।
সৈন্যদল প্রস্তুত হল। ফিলিপ তাদের নিয়ে পেয়োনিয়া ও ইল্লিরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলেন। পার্বত্য জাতিরা উড়ে গেল ঝড়ের মুখে কুটোর মতো! ফিলিপের নূতন সৈন্যদল অদম্য!
এথেন্স, স্পার্টা ও থিবস প্রভৃতি গ্রিকরাষ্ট্র ম্যাসিডনকে ঘৃণা করে। খালি ঘৃণা নয়, সুবিধা পেলে তারা শত্রুতা করতেও ছাড়ে না। এইবারে তাদের মন ফেরাতে হবে। কিন্তু তার আগে চাই টাকা। ম্যাসিডন হচ্ছে গরিব। আকারে বড়ো হলেও তার দারিদ্র্যের জন্যে কেউ তাকে শ্রদ্ধা করবে না।
ম্যাসিডনের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত থ্রেস। এখন ও দেশটি গ্রিসের অন্তর্গত বটে, কিন্তু তখন প্রাচীন গ্রিকদের মতে ওটি ছিল বর্বরদের দেশ।
থ্রেসের প্রান্তদেশে পতিত অবস্থায় অনেক মূল্যবান খনি ছিল। ফিলিপ থ্রেসিয়ানদের মিষ্ট কথায় ভুলিয়ে সেসব খনি হস্তগত করলেন। তারপর কিছুকাল যেতে-না যেতেই ম্যাসিডনের ভাণ্ডারে ঐশ্বর্য আর ধরে না। ম্যাসিডন এখন সমগ্র গ্রিসের মধ্যে ধনগৌরবে শ্রেষ্ঠ।
ভ্রাতুষ্পুত্র আমিনটাস ক্রমেই বড়ো হচ্ছে। সে সাবালক হলে ফিলিপের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সফল হবে না। কোনওরকম গোলমাল না করে তাকে সিংহাসন থেকে নামিয়ে ফিলিপ নিজের মাথায় পরলেন রাজমুকুট। তাঁর যোগ্যতায় প্রজারা সন্তুষ্ট ছিল, কেউ আপত্তি তুললে না। পরে ফিলিপ নিজের মেয়ের সঙ্গে আমিনটাসের বিবাহ দিলেন। দুইদিক রক্ষা করা হল।
এইবার ফিলিপ গ্রিক রাষ্ট্রগুলির ঘরোয়া ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে আরম্ভ করলেন। আমরা ফিলিপের জীবনচরিত লিখতে বসিনি, সুতরাং সবিস্তারে ওসব কথা নিয়ে আলোচনার দরকার নেই। সংক্ষেপে বললেই চলবে।
নিজেদের ঘরোয়া ব্যাপারে ফিলিপের মুরুব্বিয়ানা কুলীন গ্রিকদের ভালো লাগল না। কয়েকটি রাষ্ট্র মারমুখো হয়ে উঠল— তাদের মধ্যে প্রধান হচ্ছে এথেন্স। তারা দল বেঁধে সৈন্য সংগ্রহ করে ফিলিপের সঙ্গে যুদ্ধ করতে উদ্যত হল।
এখনও সময় হয়নি বুঝে ফিলিপ পিছিয়ে এলেন। তাঁর সৈন্যবল প্রচুর নয়। তিনি চুপি চুপি শক্তি সঞ্চয় করতে লাগলেন।
এথেন্সের গুপ্তচররা সে খবর যথাস্থানে পৌঁছে দিতে দেরি করলে না। সেখানে ভয়ের সাড়া পড়ে গেল। এথেন্সের অমর বাগ্মী ডিমোসথেনেস চারিদিকে প্রচার করে বেড়াতে লাগলেন, 'ফিলিপ সারা গ্রিসকে গোলাম করে রাখতে চান। অর্ধবর্বর ফিলিপ গ্রিসের শত্রু— পারস্যের চেয়ে বড়ো শত্রু!
কিন্তু ফিলিপের ইচ্ছা ছিল একেবারে উলটো। তিনি গ্রিক অভিজাতদের মধ্যে সমকক্ষের মতন আদর পেতে চান। তিনি তাঁর দেশকে গ্রিসের মধ্যে অদ্বিতীয় করে তুলতে চান বটে, কিন্তু এথেন্সকে ভক্তি শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। তিনি চান সমস্ত গ্রিককে একগোষ্ঠীভুক্ত করে চিরশত্রু পারস্যের গর্ব খর্ব করতে। অবশ্য এই অভিযানে নায়ক হতে চান তিনিই নিজে, কারণ নায়ক হবার যোগ্যতা তখন আর কোনও গ্রিকের ছিল না। মাথার উপরে পারস্যের মতন বলবান ও বৃহৎ শত্রু নিয়ে ছোটো ছোটো গ্রিক রাষ্ট্রগুলি তুচ্ছ ঝগড়াঝাঁটি নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে মারামারি কাটাকাটি করে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে— এ দৃশ্য ফিলিপের পক্ষে অসহনীয়।
কিন্তু ফিলিপের এই স্বদেশপ্রীতি ও আদর্শবাদের মহিমা অন্যান্য গ্রিক রাষ্ট্রপতিরা উপলব্ধি করতে পারলে না। ডিমোসথেনেসের বক্তৃতা ক্রমেই বেশি বিষোদগার করতে লাগল। কোনও কোনও রাষ্ট্র ফিলিপের দলভুক্ত হতে চাইলেই এথেন্স দিতে লাগল বাধার পর বাধা।
ফিলিপ তখন বাধ্য হয়ে কৌলীন্যগর্বিত গ্রিক রাষ্ট্রগুলির বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করলেন। ইতিমধ্যে তিনি রীতিমতো প্রস্তুত হয়ে উঠেছেন।
থিবজ ও এথেন্স সম্মিলিত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নেমেও সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হল। ফিলিপ জয়লাভ করেই তুষ্ট হলেন, পরাজিত শত্রুর উপরে কোনও অত্যাচার করলেন না। তাঁর সন্ধির শর্তও হল উদার।
তখন সমগ্র গ্রিস ফিলিপকে একমাত্র নায়ক বলে স্বীকার করতে বাধ্য হল। ফিলিপের মনের বাসনা পূর্ণ। আজ তিনি কুলীন— আজ তিনি সর্বেসর্বা!
তৃতীয় অধ্যায়। মানুষ তৈরির কারখানায়
আমাদের নায়ক আলেকজান্ডারের কথা বলবার সময় এসেছে। এতক্ষণ ফিলিপের কথা বললুম, আলেকজান্ডার কেমন বাপের ছেলে তা-ই দেখাবার জন্যে। ফিলিপের মতন বাপ না পেলে আলেকজান্ডার কোনওদিনই পৃথিবীজয়ী হতে পারতেন না। ছেলের জন্যে ফিলিপ সমস্ত জমিই তৈরি করে রেখে গিয়েছিলেন।
এইবারে দেখা যাক, তাঁর মা কেমনধারা? পৃথিবীতে যাঁরা মহাপ্রতিভার অবতার ও মহামানুষ বলে অমর হয়ে আছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, তাঁদের জননীরা ছিলেন অসাধারণ নারী।
আলেকজান্ডারের জননীও ছিলেন এই শ্রেণির। তাঁর নাম ওলিম্পিয়াস। তিনি উত্তর গ্রিসের এপিরাসের রাজার মেয়ে।
ওলিম্পিয়াসের মন ছিল স্বপ্নসুষমাময় ও ভাবরসে স্নিগ্ধ। মাঝে মাঝে ধর্মোন্মাদে তিনি উদ্দাম হয়ে উঠতেন। মাঝে মাঝে রাগে পাগলের মতন হয়ে যেতেন। মায়ের চরিত্রের এইসব দোষগুণ ছেলের চরিত্রেও দেখা গিয়েছিল।
ওলিম্পিয়াস ছিলেন ধর্মের ক্ষেত্রে ধ্যানরহস্যের অনুগামী। একশ্রেণির তান্ত্রিকদের প্রভাব ছিল তাঁর উপরে প্রবল। আলেকজান্ডারের সম্বন্ধেও ওই কথা বলা যায়। ওলিম্পিয়াস কারো প্রতিদ্বন্দ্বিতা সহ্য করতে পারতেন না। আলেকজান্ডারও তা-ই।
এ শ্রেণির স্ত্রী নিয়ে ঘর করা কঠিন। ফিলিপও পারলেন না। তিনি ম্যাসিডনের আর-এক রাজকন্যাকে প্রাসাদে এনে রাখলেন। সেকালে গ্রিসে বহুবিবাহ প্রচলিত ছিল।
আলেকজান্ডার মা-কে ভক্তি করতেন দেবীর মতো। বাবা তাঁর মা-কে অবহেলা করবেন, এটা তিনি সইতে পারলেন না। তিনি বাবার সঙ্গে করলেন ঝগড়া। তারপর মা-কে নিয়ে অন্য জায়গায় চলে গেলেন।
এর কিছুকাল পরে তিনি যখন রাজা হয়ে এশিয়ায় যাত্রা করেন, তখন নিজের প্রতিনিধিরূপে ম্যাসিডনে রেখে যান আন্টিপেটার নামে এক রাজকর্মচারীকে।
একদিন আন্টিপেটারের কাছ থেকে অভিযোগপত্র এল: 'রাজা, আপনার মা রাজ্য সংক্রান্ত নানা বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে বাধা দিচ্ছেন।'
পত্র পাঠ করে আলেকজান্ডার ক্রুদ্ধস্বরে বললেন, 'কী, আমার মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ! আন্টিপেটারের মতন নির্বোধ জানে না যে, কোনও জননীর একফোঁটা চোখের জলে এমন দশ হাজার পত্র কোথায় ভেসে যেতে পারে!'
মায়ের সঙ্গে আলেকজান্ডারের সম্পর্কের কথা বলা হল। এইবারে তাঁর বাল্যবয়সের কথা কিছু কিছু বলি।
ফিলিপ কর্মসাগরে ঝাঁপ দিয়েও পুত্রের প্রতি পিতার কর্তব্যের কথা ভোলেননি।
তাঁর দৃষ্টি ও বুদ্ধি দুইই ছিল সমান তীক্ষ্ন। বালক-পুত্রের কথাবার্তা ও ধরনধারণ দেখেই তিনি বুঝলেন, এ কাঁচা বাঁশ নয়— একে নোয়ানো কঠিন। এর মন তেজে পরিপূর্ণ হলেও উচিতমতো শিক্ষার ব্যবস্থা করলে একে দিয়ে বড়ো কাজ করানো যাবে।
অ্যারিস্টটলের নাম তখন গ্রিসের দেশে দেশে বিখ্যাত। প্লেটো তাঁর গুরু এবং গ্রিসে প্লেটোর পরেই তাঁর আসন। দর্শনশাস্ত্র ও জীববিজ্ঞানে তাঁর তুলনা মেলে না। ফিলিপ তাঁকেই নির্বাচন করলেন পুত্রের শিক্ষকরূপে। আলেকজান্ডারের বয়স তখন চৌদ্দ বৎসর। ফিলিপ যে ভুল নির্বাচন করেননি এবং আলেকজান্ডার যে গুরুর মানরক্ষায় অক্ষম হননি, পৃথিবী চিরদিন মুক্তকণ্ঠে সে কথা স্বীকার করবে।
পিতার কাছ থেকে পুত্র লাভ করতে লাগলেন সামরিক শিক্ষা। বলা বাহুল্য, এ বিভাগে ফিলিপের চেয়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক গ্রিসে আর দ্বিতীয় ছিল না। পিতার কাছ থেকে তিনি আর-একটি মস্ত গুণ পেয়েছিলেন। তা হচ্ছে দৃঢ়ব্রত।
তখন গ্রিসে ওলিম্পিক ক্রীড়ার বড়ো ধুম। ওই খেলায় একটি প্রধান দ্রষ্টব্য ছিল, রথের দৌড়।
ফিলিপের নিজের রথ এই দৌড় প্রতিযোগিতায় যোগ দিত। একদিন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'আলেকজান্ডার, তুমিও কি এই খেলায় যোগ দিতে চাও?'
আলেকজান্ডার সগর্বে উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ, যদি রাজা রাজড়াদের প্রতিযোগীরূপে পাই!'
আর-একদিন বালক আলেকজান্ডার নিজের দুঃসাহস ও পর্যবেক্ষণশক্তির পরিচয় দিলেন।
জনৈক অশ্ব ব্যবসায়ী রাজসভায় একটি ঘোড়া বিক্রি করতে এসেছে। সেকালে যোদ্ধাদের কাছে ভালো ঘোড়ার দাম ছিল সোনাদানা ও মণিমুক্তার চেয়েও বেশি। ব্যবসায়ী ঘোড়ার খুব চড়া দাম হাঁকলে।
ফিলিপ ঘোড়ায় চড়তে পটু এমন কয়েকজন লোককে ঘোড়াটিকে পরীক্ষা করতে বললেন।
কিন্তু সে হচ্ছে বিষম তেজি ঘোড়া! অনেক চেষ্টার পরেও তার পিঠে চড়ে কেউ তাকে বাগ মানাতে পারলে না। আরোহী পিঠে উঠলেই সে চার পা তুলে লাফালাফি করতে থাকে।
ফিলিপ বললেন, 'দূর করে দাও এই দস্যি ঘোড়াকে!'
বালক আলেকজান্ডারও সেখানে হাজির ছিলেন। তিনি বললেন, 'আমি এ ঘোড়াকে বাগে আনতে পারি। এমন ঘোড়াকে হারানো উচিত নয়। রাজসভায় ভালো সওয়ার নেই।'
ফিলিপ ক্রুদ্ধস্বরে বললেন, 'এ তোমার আস্পর্ধার কথা! আমার সভার পাকা যোদ্ধারা যা পারলে না, তুমি তা করতে পারবে?'
আলেকজান্ডার বললেন, 'হ্যাঁ বাবা! ঘোড়ার যা দাম সেই টাকা আমি বাজি রাখতে রাজি আছি।'
ফিলিপ বললেন, 'তা-ই নাকি? বেশ, দেখা যাক!'
রাজসভার বড়ো বড়ো যোদ্ধারা বালকের বাচালতা দেখে উপহাসের হাসি হাসতে লাগল।
কিন্তু আলেকজান্ডার একটুও দমলেন না। কারণ এতক্ষণ ধরে তিনি লক্ষ করছিলেন, ঘোড়াটা রয়েছে সূর্যের দিকে পিছন ফিরে এবং তার সামনের দিকে মাটির উপরে পড়েছে তার চঞ্চল ছায়া। সেই ছায়া দেখেই ঘোড়ার মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
আলেকজান্ডার এগিয়ে গিয়ে ঘোড়ার মুখ ফিরিয়ে দিলেন সূর্যের দিকে। ফলে সে আর নিজের ছায়া দেখতে পেলে না।
ঘোড়ার পিঠে চড়ে তিনি রাশ ধরলেন— কিন্তু জোরে টেনে নয়। তারপর তাঁর নির্দেশমতো ঘোড়া পরম শান্তভাবে ছুটোছুটি করতে লাগল।
বালক-পুত্রের কীর্তি দেখে ফিলিপের আনন্দ আর ধরে না। বললেন, 'বৎস, তোমার যোগ্য কোনও বৃহৎ রাজ্য হস্তগত করো। এই ক্ষুদ্র ম্যাসিডনে তোমাকে ধরবে না!'
এ কি কথার কথা? না, বিচক্ষণ পিতার ভবিষ্যদবাণী?
সেইদিন থেকে ঘোড়াটি হল আলেকজান্ডারের নিজস্ব। তিনি তার নাম রাখলেন 'বুকোফেলাস' বা 'ষণ্ডমুণ্ড'। তাঁর প্রত্যেক অভিযানে ঘোড়াটি সঙ্গী হত। সে ছিল তাঁর প্রিয় বন্ধু— এমনকী আত্মীয়ের মতো!
অ্যারিস্টটল মানসিক চর্চায় আলেকজান্ডারকে উৎসাহিত করে তুলতে লাগলেন। বুঝিয়ে দিলেন কেমন করে প্রকৃতিকে দেখতে ও জানতে হয়। ভেষজ সম্বন্ধেও শিক্ষা দিতে ত্রুটি করলেন না। গুরুর কাছে শিক্ষা পেয়ে আলেকজান্ডার অত্যন্ত পুস্তকপ্রেমিক হয়ে উঠলেন। হোমারের কাব্য তাঁকে মাতিয়ে তুলত। আশ্চর্য নয়, কারণ ভবিষ্যতে যে পৃথিবীজয়ী হবে, হোমারের বীররস না হলে তার মনের ক্ষুধা মিটবে কেন?
তাঁর জীবনে এই পুস্তক-অনুরাগ বরাবরই লক্ষ করা গিয়েছে। তিনি যখন সুদূর এশিয়ার অন্তঃপুরে, যখন চারিদিকে তাঁর যুদ্ধ-কোলাহল, নব নব উত্তেজনা এবং দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তা, তখনও তাঁর দুর্লভ অবসর মুহূর্তগুলি কেটে যেত গভীর অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে। সেই দূর প্রবাসেও তিনি স্বদেশ থেকে নিয়মিতভাবে আনাতেন অন্যান্য বহু গ্রন্থের সঙ্গে ইস্কিলাস (Aeschylus), সোফোক্লেস (Sophocles) ও এইরিপিদেসের (Euripides) নাট্যকাব্যগুলি। এই পুস্তকানুরাগই প্রমাণিত করে, আলেকজান্ডারের মন সাধারণ সংস্কৃতিহীন যোদ্ধার মতো ছিল না।
বন্ধুদের সঙ্গে খাবারের টেবিলের ধারে বসে কাটিয়ে দিতেন তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা! এটা তাঁর ভোজনবিলাসিতার লক্ষণ নয়। আহারে বসে তিনি অনেকক্ষণ ধরে নানা শ্রেণির গুণী ও রসিকদের সঙ্গে ধর্ম, ইতিহাস ও কাব্য নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে ভালোবাসতেন।
আগেই বলেছি, তিনি রণবিদ্যা শিখেছিলেন পিতার কাছ থেকে। ধরতে গেলে, আবাল্য তিনি মানুষ হয়েছেন যুদ্ধক্ষেত্রেই এবং সৈনিকেরাই ছিল তাঁর সহচর। শিক্ষা পেয়েছেন তিনি হাতেনাতে।
খ্রিস্টপূর্ব ৩৪০ অব্দে তাঁর বয়স ষোলো বৎসর। ফিলিপ স্থির করলেন, আলেকজান্ডার নাবালক হলেও রাজার ছেলে, অতএব রাজ্যচালনা সম্বন্ধেও তাঁকে কিছু শিক্ষা দিতে হবে।
বাইজানটিয়ান (এখনকার কনস্ট্যান্টিনোপল) হচ্ছে থ্রেসের একটি বড়ো শহর, ফিলিপ তা অধিকার করার জন্যে যাত্রা করলেন এবং যাবার সময়ে আলেকজান্ডারের হাতে দিয়ে গেলেন রাজ্যচালনার ভার।
আলেকজান্ডার স্থির করলেন, বাবাকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে, তাঁর ছেলেও লড়াই করতে শিখেছে।
দেশের কাছাকাছি এক জায়গায় একটি জাতি বিদ্রোহী হয়েছিল। আলেকজান্ডার তাদের বিরুদ্ধে সদলবলে করলেন যুদ্ধযাত্রা। বিদ্রোহীরা পরাজিত হল। তিনি তাদের শহর কেড়ে নিলেন। তারপর আত্মগর্বে স্ফীত হয়ে নিজের নামে সেই শহরের নামকরণ করলেন। এই আত্মগর্ব থেকে তিনি কোনওদিনই মুক্তিলাভ করেননি। এর পরেও আফ্রিকায় ও এশিয়ায় আরও অনেক শহর পরিচিত হয়েছে তাঁর নিজের নামে।
যে যুদ্ধের ফলে ফিলিপ সমস্ত গ্রিসের একমাত্র নায়করূপে গণ্য হন, হাতিয়ার হাতে করে আলেকজান্ডার সে যুদ্ধেও যোগ দিয়েছিলেন। এইভাবে পিতার চোখের সামনে তিনি যুদ্ধবিদ্যায় ক্রমেই পরিপক্ব হয়ে উঠতে লাগলেন।
ফিলিপের মুখেই তিনি যে তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা শুনেছিলেন, এটুকু অনুমান করা যেতে পারে। 'পারস্য হচ্ছে গ্রিসের চিরশত্রু। সে আবার গ্রিসকে আক্রমণ করবে। তার সঙ্গে গ্রিসের যুদ্ধ অনিবার্য। এবং এবারের যুদ্ধে হয় গ্রিস, নয় পারস্যকে একেবারে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যেতে হবে। অতএব সমস্ত শক্তি একত্র করে আগেই আমাদের করতে হবে শত্রুকে আক্রমণ।'
ছেলেবেলা থেকেই আলেকজান্ডার শুনে এসেছেন, পারস্যের কবলে পড়ে গ্রিসকে কত দুর্দশা ভোগ করতে হয়েছে। কাজেই শিশুবয়স থেকেই রোমের বিরুদ্ধে হানিবলের মতন তাঁরও মনের ভিতরে এই চিরশত্রুর বিরুদ্ধে একটা বিজাতীয় ক্রোধ ক্রমেই পুঞ্জীভূত হয়ে উঠতে লাগল। এবং হামিলকারের মতন ফিলিপও ছেলের হৃদয়ে জ্বালিয়ে তুললেন এই দারুণ হিংসার আগুন!
চতুর্থ অধ্যায়। সাপ আর সাপের ডিম
রাজা ফিলিপ গায়ের জোরে গ্রিসের রাষ্ট্রগুলিকে মাথা নত করতে বাধ্য করলেন। তাঁকে স্বীকার করলে না কেবল স্পার্টা।
কিন্তু মনে মনে কুলীন গ্রিকরা তাঁর শত্রু হয়েই রইলেন। ডিমোসথেনেস তো স্পষ্ট ভাষাতেই বলে বেড়াতে লাগলেন, 'ফিলিপকে গ্রিক বলাই যেতে পারে না। সে হচ্ছে ষোলোআনা বর্বর।'
ডিমোসথেনেসের এ উক্তি হচ্ছে ভিত্তিহীন। ম্যাসিডনের বাসিন্দারা গ্রিক ছাড়া আর কিছুই নয়। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতেও আলেকজান্ডার নামে ম্যাসিডনের আর-এক রাজা গ্রিকদের সঙ্গে গ্রিকের মতোই পারস্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।
ডিমোসথেনেস চাইতেন, গ্রিসের মধ্যে সর্বপ্রধান হোক এথেন্স। এই স্বপ্নকে সফল হতে দিলেন না বলেই ফিলিপ পড়লেন তাঁর বিষদৃষ্টিতে।
ফিলিপ কিন্তু এইসব বিরুদ্ধতাকে তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দিলেন। স্পষ্ট কথা সহ্য করবার শক্তি তাঁর ছিল। এ সম্বন্ধে একটি গল্প আছে।
সেকালকার গ্রিকরা অত্যন্ত মদ্যপান করতেন। ফিলিপও মাঝে মাঝে মদের মাত্রা বাড়িয়ে মত্ত হয়ে পড়তেন।
একদিন ফিলিপ মাতাল হয়ে বসে আছেন, এমন সময়ে একজন স্ত্রীলোক কোনও বিষয় নিয়ে কী অভিযোগ করতে এল।
ফিলিপ তাকে ধমক দিয়ে বিদায় করতে চাইলেন।
স্ত্রীলোকটি বললে, 'আমি আপনার বিরুদ্ধে নালিশ করব।'
ফিলিপ রাগে গর্জন করে বললেন, 'আমার বিরুদ্ধে তুই কার কাছে নালিশ করবি?'
স্ত্রীলোকটি বললে, 'অমাতাল ফিলিপের কাছে।'
ফিলিপ একেবারে চুপ।
ফিলিপ শত্রুকেও মিত্র করতে জানতেন। আর-একটি গল্প শোনো।
একদিন ফিলিপের কাছে খবর এল, একজন সেনানী তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছেন।
পরামর্শদাতারা বললেন, 'লোকটাকে হয় প্রাণদণ্ড দেওয়া, নয় কারাগারে নিক্ষেপ করা হোক।'
ফিলিপ বললেন, 'না। দেহের কোনও অংশে রোগ হলেই কি সেই অংশ কেটে ফেলা উচিত? আগে কি দেখা উচিত নয়, ওষুধ দিয়ে তা সারানো যায় কি না?'
ফিলিপ সেই চক্রান্তকারী সেনানীকে ডেকে আনলেন, তাকে আদরযত্ন করলেন, উপহার দিলেন।
লজ্জিত সেনানী চলে গেল। সেইদিন থেকে সে হল ফিলিপের পরম ভক্ত। বাপের এ গুণও ছেলে পেয়েছিলেন আংশিকভাবে।
গ্রিসের নায়ক হয়ে ফিলিপ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড়ো উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে মেটাবার জন্যে উদ্যোগ আয়োজনে নিযুক্ত হলেন। একটি মহাসভায় গ্রিসের সমস্ত রাষ্ট্রকে আমন্ত্রণ করা হল। সবাই প্রতিনিধি পাঠালে— কেবল স্পার্টা ছাড়া (খ্রিঃপূঃ ৩৩৭)।
সেই সভায় ফিলিপ সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন যে, চিরশত্রু পারস্যের বিরুদ্ধে সমগ্র গ্রিস যদি না এক হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তার সর্বনাশের সম্ভাবনা। পারস্যকে আগে আক্রমণ না করলে সে-ই আমাদের আক্রমণ করবে।
রাষ্ট্র প্রতিনিধিরা প্রস্তাবটাকে মনে মনে পছন্দ না করলেও মুখে সায় দিতে বাধ্য হলেন। এবং কী কী উপায়ে প্রস্তাবটাকে কার্যে পরিণত করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হল— যদিও এ আলোচনায় কারোই বিশেষ আগ্রহ দেখা গেল না।
ফিলিপের পক্ষে প্রতিনিধিদের সম্মতিই হল যথেষ্ট। তাঁদের আগ্রহ থাক আর না থাক, ফিলিপের আগ্রহ জ্বলন্ত!
কোমর বেঁধে ফিলিপ কাজে লেগে গেলেন। সামরিক ব্যবস্থাপক ও রণকৌশলী ও সৈন্যচালক হিসাবে গ্রিসের মধ্যে তিনি তখন ছিলেন অদ্বিতীয়। তার উপরে গত মহাসভায় তিনি পেয়েছেন সম্পূর্ণ কর্তৃত্বের ভার— কারো নেই তাঁকে বাধা দেবার অধিকার।
পুরো বারোমাস ধরে চলল উদ্যোগপর্ব।
আলেকজান্ডারেরও চিত্তে তখন জাগ্রত হয়েছে উচ্চাকাঙ্ক্ষা! তিনি বিষণ্ণ স্বরে বললেন, 'পৃথিবীর সমস্ত দেশ বাবাই নিজে দখল করবেন, আমাদের জন্যে আর কিছুই রেখে যাবেন না।'
ফিলিপের নির্দেশে এথেন্সের সমস্ত যুদ্ধজাহাজ সমুদ্রের বুকে ভাসল। এশিয়া মাইনরের উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত অধিকার করবার জন্যে ম্যাসিডনের সেনাপতি পার্মেনিয়োকে সসৈন্যে প্রেরণ করা হল।
ফিলিপ তাঁর চিরপ্রার্থিত অভিযানের জন্যে প্রস্তুত! এমন সময়ে ঘটল বিষম দুর্ঘটনা।
পারিবারিক এক বিবাদে হত্যাকারীর হস্তে ফিলিপ হঠাৎ মারা পড়লেন। তাঁর বয়স তখন ছেচল্লিশ বৎসর (খ্রিঃপূঃ ৩৩৬)।
সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যময় বিপ্লবের সূত্রপাত।
এথেন্সে আনন্দ উৎসবের সাড়া পড়ে গেল। সে ম্যাসিডনের কাছে নত হয়েছিল কেবল ভয়ে, পারস্যের সঙ্গে শক্তিপরীক্ষার ইচ্ছা তার কিছুমাত্র ছিল না।
বক্তা ডিমোসথেনেস অভিনয়ের সুরে বললেন, 'ফিলিপ মরেছে, এ কথা আমি বিশ্বাস করি না। ফিলিপ মরলে তার দেহের দুর্গন্ধে এতক্ষণে সারা গ্রিস পূর্ণ হয়ে যেত!'
অন্যান্য গ্রিক রাষ্ট্রও হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। চারিদিকেই ম্যাসিডনের শত্রু! ফিলিপ মৃত, বজ্রমুষ্টির ভয় আর নেই। থ্রেস ও ইল্লিরিয়াও আবার বিদ্রোহের জন্যে তৈরি হতে লাগল। ফিলিপের ছেলে আলেকজান্ডার, সে তো একফোঁটা বালক! মাত্র কুড়ি বৎসর বয়স তার! তাকে আবার ভয় কী? সর্বত্রই এই মনোভাব।
এখন কালবিলম্ব করলেই সর্বনাশ! কিন্তু বিলম্ব হল না।
শত্রুরা নির্বোধ। তারা আলেকজান্ডারকে এখনও চিনতে পারেনি। তারা কিছু সন্দেহ করবার আগেই আলেকজান্ডার বিপদের গুরুত্ব বুঝে সচেতন হয়ে উঠলেন। সর্বপ্রথমে তিনি করলেন পিতৃহত্যাকারীকে বধ। তারপর বিভিন্ন শত্রুরা সম্মিলিত হবার আগেই সসৈন্যে ঝড়ের মতন তাদের উপরে গিয়ে পড়লেন। শত্রুরা স্তম্ভিত! একে একে আবার তারা করলে মাথা নত।
এথেন্সে গুজব রটল, পার্বত্য প্রদেশের ভিতরে গিয়ে আলেকজান্ডার যুদ্ধে মারা পড়েছেন। পথ একেবারে নিষ্কণ্টক ভেবে এথেন্সের বিদ্রোহীরা মুখোশ খুলে ফেলল— এমন সময় তাদের সামনে এসে ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হলেন অত্যন্ত জীবন্ত, বিজয়ী বীর আলেকজান্ডার!
তাড়াতাড়ি আবার মাথা নত করে এথেন্স হাসিমুখে বললে, 'এসো বীর, অভিনন্দন নাও।'
আলেকজান্ডার সব বুঝেও মুখে কিছু বললেন না।
সমগ্র গ্রিস বললে, 'রাজা ফিলিপ পরলোকে। আজ থেকে তুমিই আমাদের নেতা।'
থিবস প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। তার ফলও হল ভয়ানক। আলেকজান্ডারের সঙ্গে লড়তে গিয়ে সে হেরে গেল। তারপর গোটা থিবস পরিণত হল ধ্বংসস্তূপে। আলেকজান্ডার চিরদিনই কাব্যপ্রিয়। তাঁর হুকুমে ভাঙা হল না খালি গ্রিসের গীতিকবি পিন্ডারের বাড়ি। যদিও পিন্ডার তখন পরলোকে, তবু তাঁর স্মৃতি-মাখা ওই বাড়িখানি আলেকজান্ডার পবিত্র বলেই মনে করলেন।
থিবসের পরিণাম দেখে গ্রিসের অন্যান্য নগর সভয়ে উপলব্ধি করতে পারলে, প্রৌঢ় ফিলিপের চেয়ে প্রায় বালক আলেকজান্ডার কম সাংঘাতিক নন। প্রভু হবার যোগ্যতা তাঁর আছে। তাঁর কাছে বশ মানা ছাড়া উপায় নেই।
গ্রিসে 'সিনিক' নামে এক সম্প্রদায়ের দার্শনিক ছিলেন। তাঁদের মোটামুটি মত হচ্ছে এই: বেশির ভাগ মানুষ অসুখী, কারণ তারা হরেকরকম সামাজিক বন্ধনে বন্দি এবং তারা যা চায় তা পায় না— অর্থাৎ ভালো খাবার, ভালো পোশাক ও বিলাসী জীবন। যদি সত্যিকার সুখী হতে চাও, তবে ওইসব তুচ্ছ জিনিসের কথা ভুলে যাও এবং পথচারী কুকুরের মতন সরলভাবে জীবনযাত্রা নির্বাহ করো। এইরকম মতের জন্যে গ্রিসের লোকরা 'সিনিক'-দার্শনিকদের নাম রেখেছিল 'কুকুর'।
গ্রিসে তখন ডায়োজেনেস নামে একজন বিখ্যাত 'সিনিক' ছিলেন। আজও তাঁর নাম অমর। তিনি কেবল ল্যাঙট পরে বাস করতেন মস্ত বড়ো একটা মাটির জালার ভিতরে। সরল জীবনযাত্রার চূড়ান্ত!
আলেকজান্ডার একদিন কৌতূহলী হয়ে তাঁকে দেখতে গেলেন। ডায়োজেনেস তখন প্রায় নগ্ন অবস্থায় জালার ভিতরে বসে ছিলেন।
আলেকজান্ডার জিজ্ঞাসা করলেন, 'পণ্ডিত, আপনাকে সুখী করবার জন্যে আমি কী করতে পারি?'
জালার ভিতর থেকে ডায়োজেনেস বললেন, 'আমার সুমুখ থেকে বিদায় হতে পারো।'
এই কবুল জবাবে আলেকজান্ডার খুশি হলেন। আসবার সময়ে বললেন, 'আমি যদি আলেকজান্ডার না হতুম, তাহলে আমি ডায়োজেনেস হতে চাইতুম!'
পঞ্চম অধ্যায়। বিশ্বনাট্যশালায় প্রথম আবির্ভাব
বিশ বছর বয়সের এক ছোকরা এই আলেকজান্ডার!
এ বয়সে গরিবের ছেলেও বিদ্যালয় ও নিজের বাড়ির বাইরেকার কোনও খবর রাখতে পারে না। বিপুল পৃথিবীতে ছেড়ে দিলে সে হবে একান্ত অসহায়।
গরিবের ছেলে তবু নানা কারণে বাস্তব জগতের কিছু কিছু শেখবার সুযোগ ও সময় পায়, কিন্তু জন্মসুখী রাজার ছেলের কাছে তেমন অবসর বড়ো একটা আসে না।
তবু আলেকজান্ডার সমগ্র গ্রিসের অসংখ্য বিচক্ষণ ও বলবান শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, চারিদিকে সামলে কেমন করে আত্মরক্ষায় সক্ষম হলেন? অসাধারণ বহুদর্শিতা না থাকলে এতটা সম্ভবপর হয় না। এই বহুদর্শিতার জন্ম কোথায়?
উত্তরে বলা যায়, তাঁর প্রতিভার মধ্যে। প্রতিভার ভিতরে থাকে ইন্দ্রজাল, সম্ভব করে সে অসম্ভবকে। কেবল শিক্ষায় ও অভিজ্ঞতায় প্রতিভা তৈরি হয় না।
কিছুদিন পরে ভারতে গিয়ে আলেকজান্ডারের সঙ্গে আর-একটি যুবকের আলাপ হয়েছিল, তাঁর নাম চন্দ্রগুপ্ত। তিনিও ছিলেন প্রায় আলেকজান্ডারেরই সমবয়সি। এবং তিনিও প্রথম যৌবন গত হবার আগেই সমগ্র ভারতকে গ্রিক-নাগপাশ ও অরাজকতা থেকে মুক্ত করে বিরাট এক সাম্রাজ্য গঠন করেছিলেন। সে-ও প্রতিভার মহিমায়। একই যুগে এমন দুই অসাধারণ প্রতিভা পৃথিবী আর কখনো দেখেছে কি না জানি না!
ইয়োরোপের ইতালিতে মিকেলাঞ্জেলো বলে একজন প্রতিভাবান শিল্পী জন্মেছিলেন। তাঁর প্রায় শিশুবয়সে আঁকা দু-একখানি রেখাছবি পাওয়া যায়। সমালোচকেরা বলেছেন, সেসব ছবির তলায় যদি কোনও প্রবীণ ও পৃথিবীবিখ্যাত চিত্রকরও নাম সই করেন, তাহলেও তাঁর অমর্যাদা হবে না।
প্রথম যৌবনেই কোনও কোনও কবি মারা পড়ে সারা জগতে অমর হয়ে আছেন। তাঁদের বাল্যরচনাও পৃথিবীর প্রথম শ্রেণির কবিদের কবিতার সঙ্গে সমান ঠাঁই পায়।
এসব হচ্ছে, প্রতিভার খেলা। প্রতিভার মধ্যে আছে কী যে রহস্য, কেউ তা জানে না, কিন্তু নবীনকে সে করে তোলে প্রবীণ।
বিশ বছর বয়সে আলেকজান্ডার হলেন গ্রিসের হর্তাকর্তাবিধাতা।
কিন্তু গ্রিসের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রিক হয়েও আলেকজান্ডার নিজের কর্তব্য ভুললেন না। হানিবলের মতন তিনিও পিতৃকৃত্য পালন করবার জন্যে বদ্ধপরিকর হলেন।
একদিন তিনি দুঃখিতভাবে বলেছিলেন, তাঁর জন্যে পিতা কোনও গৌরবজনক কার্য অসমাপ্ত রেখে যাবেন না। এখন দেখলেন, সামনে তাঁর গৌরবের অনেক পথই খোলা। কিন্তু সর্বাগ্রে আবশ্যক, পিতার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কার্যে পরিণত করা। গ্রিসের চিরশত্রু পারস্যের বিষদাঁত ভাঙতে হবে।
এ কাজে যা যা দরকার, ফিলিপ নিজের হাতেই সমস্ত ব্যবস্থা করে গিয়েছেন। তাঁর পরিকল্পনা নিখুঁত। সবচেয়ে বড়ো কথা, সম্পূর্ণ নতুনভাবে শিক্ষিত ফিলিপের দুর্ধর্ষ সৈন্যদল আলেকজান্ডারের আদেশ মানবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছে। ইতিহাস তা-ই বলে, আলেকজান্ডারের অসামান্য সাফল্যের জন্যে ফিলিপের প্রতিভার দাবি আছে যথেষ্ট। হয়তো ফিলিপের মতন পিতা না থাকলে আজ আলেকজান্ডারের মতো দিগবিজয়ীর নাম কেউ জানত না।
পারস্যের সাম্রাজ্য তখন পৃথিবীতে অদ্বিতীয়। অর্থবল ও সৈন্যবল তার অফুরন্ত। গ্রিসের পক্ষে তাকে আক্রমণ করতে যাওয়া হচ্ছে হাতির সঙ্গে পিঁপড়ের যুদ্ধের মতো। খ্রিস্টপূর্ব ৩৪৪ অব্দে আলেকজান্ডার যখন সদলবলে দার্দানেলেসের দিকে অগ্রসর হলেন, গ্রিসের বুদ্ধিমানরা স্থির করলেন, আলেকজান্ডার কেবল গোঁয়ার নন, পাগলও।
কতখানি বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে আলেকজান্ডার গ্রিসের বাইরে পা বাড়াতে উদ্যত হলেন, সেটাও ভাববার কথা।
ম্যাসিডন ছাড়া গ্রিসের আর সব রাষ্ট্রই অবাধ্য, মুখে তারা বাধ্যতার অভিনয় করছে মাত্র। আসলে তারা আলেকজান্ডারকে ভয় করে। সে ভয় ভাঙলে, অর্থাৎ তিনি দেশত্যাগ করে সুদূরে গেলেই যে-কোনও মুহূর্তে আবার তারা অস্ত্রধারণ করতে পারে। এথেন্সের জনপ্রিয় বক্তা ডিমোসথেনেস আজ পর্যন্ত ম্যাসিডন ও আলেকজান্ডারের বিষম শত্রু হয়েই আছেন। এমনকী, তিনি আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে সমস্ত গ্রিসকে উত্তেজিত করবার জন্যে পারস্যের কাছ থেকে নিয়মিতরূপে প্রচুর ঘুসের টাকাও গ্রহণ করেন। গ্রিস বিদ্রোহী হলে আলেকজান্ডারের সর্বনাশ।
আলেকজান্ডার যে এসব কথা ভেবে দেখেননি, তা বলা যায় না। কিন্তু উদ্দাম যৌবন চিরদিনই অগ্রগামী, যুক্তিকে ভক্তি করে না, এবং এই কারণেই চিরদিন অসম্ভবকে সম্ভব করে এসেছে।
গ্রিকরা যে আক্রমণ করতে আসছে, পারস্যের তা জানতে বাকি ছিল না। কিন্তু তৃতীয় দরায়ুস নামে পারস্যের যে নূতন সম্রাট সিংহাসনে আরোহণ করেছেন, রাজদণ্ডধারণের যোগ্যতা তাঁর ছিল না। তাঁর চরিত্রমাধুর্য থাকলেও সম্রাট হিসাবে তিনি ছিলেন নগণ্য। যদি পূর্বপুরুষদের মতন থাকত তাঁর বুদ্ধি ও পুরুষত্ব, কখনোই সফল হত না আলেকজান্ডারের দিগবিজয়ের স্বপ্ন।
তৃতীয় দরায়ুসের অধীনে অনেক বেতনভোগী গ্রিক সৈন্য ও সেনানী ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন মেমনন। পারস্য সম্রাটের উচিত ছিল, মেমননের হাতে কর্তৃত্ব ভার দেওয়া। কারণ, সৈন্যচালনায় ও সামরিক বুদ্ধি-বিবেচনার জন্যে মেমননের খ্যাতি ছিল যথেষ্ট। কিন্তু মেমননকে অগ্রাহ্য করে দরায়ুস যুদ্ধচালনার ভার দিলেন তাঁর প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের উপরে।
সমুদ্র পার হয়ে আলেকজান্ডার পদার্পণ করলেন এশিয়ার মাটিতে। তারপর প্রথমেই ছুটলেন তীর্থদর্শন করতে! সে তীর্থ হচ্ছে তাঁর প্রাণের কবি হোমারের অমর কাব্যে উল্লিখিত ট্রয় নগরের ধ্বংসাবশেষ। মহাভারতে উল্লিখিত কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে গিয়ে দাঁড়ালে হিন্দুর চিত্ত যেমন অতীত স্মৃতির প্রভাবে অভিভূত হয়, প্রাচীন ট্রয়ের মাটির উপরে দাঁড়িয়ে আলেকজান্ডারেরও মনের অবস্থা হয়েছিল যে সেইরকম, এটুকু আমরা অনায়াসেই অনুমান করতে পারি। কারণ, বীরধর্মী গ্রিকদের কাছে হোমারের বীররসাত্মক অমর কাব্যের চেয়ে পবিত্র আর কিছুই নেই।
সেখানে ছিল মহাবীর অ্যাকিলিজের সমাধি— আলেকজান্ডার যাঁকে নিজের পূর্বপুরুষ বলে দাবি করেন এবং যাঁর অপূর্ব বীরত্বগাথা হোমার বিচিত্র ভাষায় বর্ণনা করেছেন। ভক্তিনত প্রাণে আলেকজান্ডার আগে করলেন বীরপূজা। তারপর নিজের পথে অগ্রসর হলেন।
খুব সম্ভব এই সময়েরই একটি গল্প আছে।
ফ্রাইগিয়া নামে এক প্রাচীন দেশ ছিল এশিয়া মাইনরে। তার বাসিন্দারা নানা কারণে অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। এমন সময়ে দৈববাণী হয়, জুপিটার দেবের মন্দিরের পথে প্রথম যে পথিকের দেখা পাবে, বাসিন্দারা তাকেই যদি রাজা করে তাহলে দূর হয়ে যাবে দেশের সব দুঃখ কষ্ট।
বাসিন্দারা পথের ধারে অপেক্ষা করতে লাগল।
সে পথে সর্বপ্রথমে গাড়ি চালিয়ে এল এক চাষা, নাম তার গর্ডিয়াস। বাসিন্দারা সেই অবাক চাষার মাথাতেই পরিয়ে দিলে রাজার মুকুট।
কৃতজ্ঞ চাষা তখন নিজের গাড়িখানিকে জুপিটার দেবের নামে উৎসর্গ করে মন্দিরের গায়ে বেঁধে রাখলে।
কিন্তু রাজা হয়েছিল বলেই গর্ডিয়াস আজ পর্যন্ত বিখ্যাত হয়ে নেই। মন্দিরের গায়ে গাড়ির রজ্জু এমন সুকৌশলে সে গ্রন্থি দিয়ে বেঁধে রেখেছিল যে, দড়ির প্রান্ত কেউ খুঁজে পেত না, গ্রন্থিও কেউ খুলতে পারত না।
দৈববাণী শোনা গেল, এ গ্রন্থি যে খুলতে পারবে, সমগ্র এশিয়া হবে তার হস্তগত।
আলেকজান্ডারের যুগেও এ গল্পটি ছিল প্রাচীন। লোকের মুখে গল্পটি শুনে তিনিও গেলেন জুপিটারের মন্দিরে। কিন্তু গ্রন্থি এমন জটিল যে, তা খোলবার কৌশল মাথায় আনতে পারলেন না।
তখন খাপ থেকে তরোয়াল খুলে তিনি গ্রন্থির উপরে বসিয়ে দিলেন এক কোপ! গ্রন্থি কেটে দু-টুকরো।
গ্রন্থি খোলবার এই অতি সহজ উপায় দেখে সকলেই চমৎকৃত। চারিদিকে রটে গেল— আলেকজান্ডার গর্ডিয়াসের গ্রন্থি খুলেছেন, নিশ্চয়ই তিনি হবেন এশিয়া-বিজয়ী!
ইংরেজি অভিধান খুললে আজও দেখা যাবে Gordian Knot নামে কথাটি।
গ্রানিকাস একটি নদীর নাম, সে গিয়ে পড়েছে মর্মরসাগরে। আলেকজান্ডার নদীর এক পারে সসৈন্যে গিয়ে দাঁড়ালেন। এই হচ্ছে এশিয়ায় প্রবেশ করার প্রথম ও প্রধান পথ।
নদীর ওপারে পারস্য-সৈনিকদের নিয়ে শিবির স্থাপন করেছেন প্রাদেশিক শাসনকর্তারা।
গ্রানিকাসের স্রোতের বেগ দেখে আলেকজান্ডারের সৈন্যাধ্যক্ষরা রীতিমতো হতাশ হয়ে পড়লেন। এ নদী পার হওয়া সহজ কথা নয়।
ফিলিপের মতন আলেকজান্ডারেরও প্রধান সেনাপতি ছিলেন প্রবীণ পার্মেনিয়ো। তিনিও বললেন, 'রাজা, এখন নদী পার হবার চেষ্টা করবেন না। ওপারে তাকিয়ে দেখুন, বেতনভোগী গ্রিক সৈনিকদের সঙ্গে পারসিকরা কীরকম সুরক্ষিত জায়গায় ব্যূহ রচনা করেছে। এখন ওদের আক্রমণ করা নিরাপদ নয়।'
কিন্তু কোথায় রাজা? তিনি তখন তেরোজনমাত্র অশ্বারোহী সৈনিক সঙ্গে নিয়ে নদীর মধ্যে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন!
তিনি জানতেন, নদীর খরস্রোতও তাঁর প্রবল ইচ্ছাশক্তির কাছে তুচ্ছ— চিরশত্রু পারস্যের সঙ্গে এই প্রথম শক্তি-পরীক্ষার সুযোগ পেয়ে আলেকজান্ডার আর-এক মুহূর্ত অপেক্ষা করতে রাজি নন। সাবধানতা? সাবধান হোক বুড়োরা— 'যৌবন জলতরঙ্গ রোধিবে কে?'
তিনি জানতেন, তাঁর সুশিক্ষিত গ্রিক সৈনিকদের ঘনব্যূহের ধাক্কা সামলাতে পারে, পারসিদের এমন শক্তি নেই।
রাজাকে অগ্রসর হতে দেখে সমস্ত গ্রিক সৈন্য মরিয়ার মতন জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
আলেকজান্ডার সর্বাগ্রে ওপারে গিয়ে উঠলেন, সঙ্গে সঙ্গে পারসিরাও আক্রমণ করলে। আরম্ভ হয়ে গেল লড়াই— দুই পক্ষেরই কতক সৈন্য জলে এবং কতক সৈন্য স্থলে।
ভাগ্যে আলেকজান্ডার সেদিন প্রিয় ঘোড়া ষণ্ডমুণ্ডকে এই বিপদের মধ্যে টেনে আনেননি! কারণ, শত্রুদের আক্রমণে তাঁর ঘোড়া মারা পড়ল। দুইজন পারসি সেনাপতি একসঙ্গে তাঁর উপরে অস্ত্রচালনা করলেন, তাঁর মৃত্যু অনিবার্য!
ক্লিটাস ছিলেন আলেকজান্ডারের বন্ধু, কোথা থেকে তিনি বেগে ছুটে এসে পারসি সেনাপতিদের কবল থেকে তাঁকে উদ্ধার করলেন।
ওদিকে দেখতে দেখতে গ্রিক সাদি-সৈনিকদের প্রচণ্ড আক্রমণে পারসিদের প্রথম দল ভেঙে গেল। তখন এল ফিলিপের হাতে তৈরি ঘনব্যূহের কৃতিত্ব দেখাবার সময়!
উচ্চভূমিতে যে সুশিক্ষিত বেতনভোগী গ্রিক রক্ষী সৈন্যদল অপেক্ষা করছিল, পারসিরা তখনও তাদের কাজে লাগায়নি।
আলেকজান্ডার প্রবীণ সৈন্যচালকের মতন আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন যে, শত্রুরা তাদের সাদি-সৈন্যদের, আক্রমণের জন্যে নয়— আত্মরক্ষার জন্যে সজ্জিত করে রেখেছে। প্রথমেই তিনি শত্রুদের এই ভ্রমের সুযোগ গ্রহণ করলেন।
আলেকজান্ডারের হুকুমে তাঁর সৈন্যরা শত্রুদের বাম পার্শ্বভাগ আক্রমণের ভান করলে এবং শত্রুরাও সেই ছলনায় ভুলে সেইদিকে রক্ষা করার জন্যে অগ্রসর হতেই মধ্যভাগ দুর্বল হয়ে পড়ল।
আলেকজান্ডার চিৎকার করে বললেন, 'ঘনব্যূহের সৈনিকগণ, আক্রমণ করো— আক্রমণ করো! সর্বাগ্রে আক্রমণ করো শত্রুপক্ষের পেশাদার গ্রিকদের! তারা দেশদ্রোহী! তাদের একজনকেও ক্ষমা কোরো না!'
ভয়াবহ ঘনব্যূহ! এরকম আক্রমণ ছিল পারসিদের ধারণাতীত! তারা চারিদিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। এতক্ষণ পরে বিপদ বুঝে পারসি সাদি-সৈন্যরা ঘোড়া ছুটিয়ে বাধা দিতে এল বটে, কিন্তু সুসময় উতরে গিয়েছে— তাদের সমস্ত বাধা দেবার চেষ্টা ব্যর্থ হল।
দশ হাজার পদাতিক ও দুই হাজার সাদি-সৈন্যের মৃতদেহ রণক্ষেত্রে ফেলে পারসিরা পালিয়ে গেল। হাজার হাজার লোক বন্দি হল। বেতনভোগী গ্রিক সৈন্যদের প্রায় সকলেই মারা পড়ল। আলেকজান্ডারের জয়!
এই যুদ্ধের ফলে আলেকজান্ডার এশিয়া মাইনরের অনেকখানি জায়গা দখল করে ফেললেন।
পারসি সৈনিকদের তিনশোখানা ঢাল আর বহু সামগ্রী উপহারস্বরূপ স্বদেশে পাঠিয়ে আলেকজান্ডার সগর্বে এই পত্রখানি লিখলেন— 'স্পার্টা ছাড়া গ্রিসের আর সকলের কাছেই এইসব ভেট পাঠাচ্ছি— এগুলি হচ্ছে, এশিয়াবাসী বর্বরদের সম্পত্তি। আমি ফিলিপের ছেলে আলেকজান্ডার!'
এই ছোট্ট চিঠিখানির ভিতরে তীক্ষ্নবুদ্ধি আলেকজান্ডার যথেষ্ট রাজনৈতিক জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন। প্রথমত, এথেন্সের বক্তা ডিমোসথেনেস যে ফিলিপকে হেয় প্রমাণিত করার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টার ত্রুটি করেননি, আলেকজান্ডার সদর্পে নিজেকে পরিচিত করতে চেয়েছেন তাঁর পুত্ররূপে। দ্বিতীয়ত, কৌলীন্যগর্বিত স্পার্টা ম্যাসিডনের প্রাধান্য স্বীকার করতে নারাজ, তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে এই বিজয়গৌরব থেকে। তৃতীয়ত, যে 'বর্বর' (যে-কোনও বিদেশিকে গ্রিকরা এই নামে ডাকত) শব্দ গ্রিকরা ম্যাসিডনের বাসিন্দাদের উপরে প্রয়োগ করত, তা-ই প্রয়োগ করা হয়েছে পারসিদের উপরে। অর্থাৎ গ্রিকদের চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ম্যাসিডনবাসীরা বর্বর বা বিদেশি নয়, তারাও সত্যিকার গ্রিক এবং আসল বর্বর হচ্ছে গ্রিকদের শত্রু পারসিরাই।
একসঙ্গে যুদ্ধ ও রাজনীতি ব্যবসায়ীরূপে আলেকজান্ডার আরও নানাভাবে আত্মপ্রকাশ করলেন। যেসব শহর ও দেশ তাঁর অধীনতা স্বীকার করেছিল, সেখানে প্রজাদের হিতকর অনেক নব নব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন। পারসিদের অত্যাচার থেকে মুক্ত হয়ে ওই সমস্ত জায়গায় বাসিন্দারা হয়ে পড়ল তাঁর পরম বন্ধু।
জলপথে পারসিরা ছিল গ্রিকদের চেয়ে ঢের বেশি প্রবল। আলেকজান্ডার তাই জলযুদ্ধে কোনওরকম শক্তি পরীক্ষার চেষ্টা না করে স্থলপথেই পারস্য সাম্রাজ্যের ভিতরদিকে অগ্রসর হতে লাগলেন।
তাঁকে খুব বেশি দূর এগোতে হল না। কারণ, পারসিরা এইবার বিপদের গুরুত্ব বুঝতে পারলে।
ষষ্ঠ অধ্যায়। ইসাস প্রান্তরের যুদ্ধ (খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৩)
পারস্য সম্রাট তৃতীয় দরায়ুস প্রথমটা আলেকজান্ডারকে গ্রাহ্য করেননি। তারপর তিনি বুঝলেন, এই গ্রিক শত্রু বড়ো সামান্য নয়। তখন তিনি নিজের সাম্রাজ্যের চারিদিক থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে আলেকজান্ডারকে একেবারে পিষে মেরে ফেলতে এলেন।
পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকেরা ইয়োরোপের গৌরব বাড়াবার জন্যে বারংবার অনেক সত্য গোপন করেছেন। তাঁদের মত হচ্ছে, সংখ্যায় গ্রিস ছিল নগণ্য এবং পারস্য ছিল ছয় লক্ষ সৈন্যের অধিকারী। দুই দলের মধ্যে এতটা পার্থক্য হয়তো ছিল না। তবে পারসিরা সংখ্যায় যে বেশি ছিল, এ কথা মানা যেতে পারে। কারণ, জনসংখ্যায় পারস্য সাম্রাজ্য ছিল অতুলনীয়। সুদূর উত্তর ভারত থেকে হাজার হাজার ভারতীয় সৈনিকও এসেছিল পারসিদের সাহায্য করতে। এমনকী, দরায়ুসের অধীনে যে ত্রিশ হাজার বেতনভুক গ্রিক সৈন্য ছিল, এটাও জানতে পারা গিয়েছে।
আলেকজান্ডারের গতি রোধ করবার জন্যে দরায়ুস যে স্থানে সৈন্য সমাবেশ করলেন তার নাম হচ্ছে ইসাস প্রান্তর।
এইটেই হল তাঁর পক্ষে মারাত্মক ভুল। এই প্রান্তর ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ— এক ক্রোশেরও কম। পারস্য রাজসভায় একজন গ্রিক এসে আশ্রয় নিয়েছিল, দরায়ুসকে বিশেষরূপে মানা করে দিয়েছিল এখানে ছাউনি ফেলতে। কারণ, দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ গিরিবর্ত্মের মধ্যে লক্ষ লক্ষ পারসি সৈন্য চালনা করবার কোনও উপায়ই ছিল না।
সে বলেছিল, 'সম্রাট খুব প্রশস্ত ক্ষেত্রে গিয়ে আপনার বাহিনী নিয়ে অপেক্ষা করুন। তাহলে আলেকজান্ডার এলে আপনি তাঁকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলতে পারবেন।'
এত বড়ো সৎপরামর্শ দরায়ুস কানে তুললেন না। ফল হল এই যে, পারসিদের সংখ্যাধিক্য কোনও কাজেই লাগল না। ৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে লিওনিডাসের অধীন মাত্র এক হাজার গ্রিক সৈন্য থার্মোপলির সংকীর্ণ গিরিবর্ত্মে দাঁড়িয়ে বিপুল পারসি বাহিনীকে কী আশ্চর্য বাধা দিয়েছিল, দরায়ুস সে কথাও ভুলে গেলেন। এই ভুলই তাঁর কাল।
পারসিদের সামনে ছিল সমুদ্র, পিছনে ছিল গিরিবর্ত্ম। এখানে পরাজিত হলে গ্রিকদের সর্বনাশ হত, কারণ ইয়োরোপে পালাবার পথ গিয়েছিল বন্ধ হয়ে। হয়তো এই লোভেই দরায়ুস তাঁর গ্রিক পরামর্শদাতার কথা কানে তোলেননি, কিন্তু প্রবাদে লোভকে বলে পাপ— যে পাপের ফলে হয় মৃত্যু!
ভয়ের কারণ যথেষ্ট ছিল বটে, তবু আলেকজান্ডার স্থির করলেন, এইখানে দাঁড়িয়েই তিনি দরায়ুসের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন। কারণ, পারসিরা সংখ্যায় অগণ্য হলেও এই সংকীর্ণ স্থানে স্বল্পসংখ্যক গ্রিকরা তাদের সঙ্গে সমানভাবে লড়াই করতে পারবে।
গ্রিক সৈন্যদের ডানদিকে রইল পাহাড়, বাঁদিকে সমুদ্র। তাদের সামনে পিনেরাস নদী এবং নদীর ওপারে পারসিরা।
ডানদিক পাহাড়ের দ্বারা সুরক্ষিত বলে আলেকজান্ডার সেদিক সম্বন্ধে হলেন নিশ্চিন্ত। কিন্তু পাছে সমুদ্রতীর দিয়ে অগ্রসর হয়ে পারসিরা গ্রিকদের ঘিরে ফেলে, সেই ভয়ে তিনি তাঁর সেনাপতি পার্মেনিয়োকে বাম পার্শ্ব রক্ষা করার জন্যে পাঠিয়ে দিলেন। দরায়ুস জানতেন, পার্মেনিয়ো হচ্ছেন আলেকজান্ডারের চেয়ে কম সাহসী। কাজেই তিনি তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী দলকে সর্বাগ্রে পাঠিয়ে দিলেন গ্রিকদের বাম পার্শ্ব আক্রমণ করার জন্যে। শত্রুদের ফন্দি বুঝে আলেকজান্ডারও তাঁর অশ্বারোহী সৈন্যদলকে পার্মেনিয়োর সাহায্যের জন্যে প্রেরণ করলেন। এতক্ষণ পরে দরায়ুস নিজের ভ্রম বুঝতে পারলেন। এই সংকীর্ণ স্থানে না এলে তিনি অনায়াসেই দুইদিক থেকেই গ্রিকদের উপরে হানা দিতে পারতেন এবং দুইদিকেই অসংখ্য পারসিদের আক্রমণে বাধা দেবার মতো সৈন্য আলেকজান্ডারের ছিল না। সরু গিরিপথ দিয়ে এখন আর পিছু হটবারও সময় নেই, কারণ, ইতিমধ্যেই গ্রিকরা আক্রমণ করবার জন্যে অগ্রসর হচ্ছে। এখন তাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করবার জন্যে দরায়ুস নিজের ত্রিশ হাজার পেশাদার গ্রিক সৈন্যদের পাঠিয়ে দিলেন। গ্রিকের বিরুদ্ধে গ্রিক! ভারতবর্ষেও এমনি অনেকবার অন্য জাতির হয়ে লড়েছে মুসলমানের বিরুদ্ধে মুসলমান এবং হিন্দুর বিরুদ্ধে হিন্দু!
আলেকজান্ডারের বাহিনীর মধ্যভাগ রক্ষা করছিল তাঁর বিখ্যাত 'ফেলাঙ্কস' বা 'ঘনব্যূহ'। আগেই বলা হয়েছে, এই ঘনব্যূহের মধ্যে সাধারণত ষোলো সারে একেবারে পরস্পরের গা ঘেঁষাঘেঁষি করে গুরুভার অস্ত্রাদি নিয়ে সৈন্যেরা দাঁড়িয়ে থাকত এবং তাদের প্রত্যেকের হাতে থাকত আঠারো ফুট লম্বা বর্শা! এইভাবে ঘনব্যূহের পদাতিকরা যখন বর্শা সামনের দিকে উঁচিয়ে অগ্রসর হত, তখন তাদের বাধা দেওয়া বা দল ভাঙা প্রায়ই অসম্ভব হয়ে উঠত। আলেকজান্ডার অধিকাংশ যুদ্ধ জিতেছিলেন এই ঘনব্যূহেরই মহিমায়। ইসাসের যুদ্ধেও গ্রিকদের বিরুদ্ধে এই ঘনব্যূহ প্রমাণিত করলে তার সার্থকতা।
আলেকজান্ডার নিজের সৈন্যদের উৎসাহিত করে বললেন, 'অগ্রসর হও গ্রিক বীরগণ! পারসিদের আগেও তোমরা হারিয়েছ, এবারেও অনায়াসে হারাতে পারবে। মনে রেখো, এই যুদ্ধে জিততে পারলে প্রাচ্যের সমস্ত ঐশ্বর্য হবে তোমাদের হস্তগত!'
আলেকজান্ডার নিজে পুরোভাগে থেকে অশ্বারোহী সৈন্যদল নিয়ে পেশাদার গ্রিক শত্রুদের বাম পার্শ্ব আক্রমণ করলেন বিষম তেজে। এবং ঘনব্যূহের সৈন্যদলকে পারসিদের মধ্যভাগ আক্রমণ করবার জন্যে পাঠিয়ে দিলেন।
দুই দলের মাঝখানে তখন আর নদীর ব্যবধান নেই। পারসি অশ্বারোহী দল আক্রমণের পর আক্রমণ করতে লাগল, তাদের সংখ্যাধিক্যের জন্যে গ্রিকদের বাম পার্শ্বের অবস্থা হয়ে উঠল সংকটজনক। কিন্তু দেখতে দেখতে আলেকজান্ডারের চালিত সাদি-সৈন্য ও তাঁর প্রচণ্ড ঘনব্যূহের আক্রমণে পারসিদের মধ্যভাগ একেবারে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। পারসিরা সংখ্যায় বেশি বটে, কিন্তু সেই সংকীর্ণ ক্ষেত্রে আবদ্ধ ও আড়ষ্ট হয়ে থাকার দরুন দু-দিকে ছড়িয়ে পড়ে তারা গ্রিকদের ঘিরে ফেলতে পারলে না। রাস্তায় মারামারি বা দাঙ্গা দেখেছেন কি? একপক্ষে একশোজন ও একপক্ষে দশজন লোক যদি কোনও বড়ো চওড়া রাজপথে দাঁড়িয়ে মারামারি করে, তাহলে দশজন লোক চোখের নিমেষেই হেরে যায়। কিন্তু ওই দশজন লোক যদি কোনও খুব সরু গলির ভিতরে গিয়ে আশ্রয় নেয়, তাহলে দলে ভারী হয়েও একশোজন লোকও তাদের কাবু করতে পারবে না। ইসাস প্রান্তরে ঠিক এই কারণেই পারসিদের বিপুল বাহিনী পরাজিত হল।
সন্ধ্যার অন্ধকারে পারসিরা পলায়ন করতে লাগল— গ্রিকরা ছুটল তাদের পিছনে পিছনে। হতভাগ্য দরায়ুসও রথ থেকে নেমে ধরা পড়বার ভয়ে ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে গেলেন। গ্রিকদের ক্ষতি হল সামান্য। কিন্তু সংখ্যাতীত পারসি বীরের মৃতদেহে রণক্ষেত্র আচ্ছন্ন হয়ে রইল।
ধরতে গেলে এই যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গেই প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্য লুপ্ত হয়ে গেল। আজ পর্যন্ত পারসিরা আর তাদের পূর্বগৌরবের শিখরে গিয়ে উঠতে পারেনি।
সপ্তম অধ্যায়। অসম্পূর্ণ মহাকাব্য
ইসাস প্রান্তরের যুদ্ধে বোঝা গেল, গ্রিসকে গোলাম করবার ক্ষমতা পারস্যের আর কোনওদিন হবে না।
দরায়ুস পালিয়ে গেলেন বটে, কিন্তু তাঁর পরিবারবর্গ হল আলেকজান্ডারের হাতে বন্দি। কিন্তু আলেকজান্ডার তাঁদের সঙ্গে এমন ভদ্র ব্যবহার করলেন যে, তাঁরা সবাই মুগ্ধ হয়ে গেলেন। সেকালে বিজেতার কাছে বিজিত এমন শিষ্ট ব্যবহার প্রত্যাশা করত না।
ঐশ্বর্যে পারস্য ছিল অতুলনীয়, গ্রিস স্বাধীন হলেও তার কাছে এ হিসাবে একান্ত নগণ্য ছিল। চাষার ছেলে রাজার প্রাসাদে ঢুকলে যেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়, দরায়ুসের বিচিত্র পটমণ্ডপে প্রবেশ করে তার সোনার থালাবাটি ও অন্যান্য পাত্রের স্তূপ, বহুমূল্য আসবাব ও কারুকার্য করা কার্পেট প্রভৃতি দেখে আলেকজান্ডার হতভম্ব হয়ে গেলেন। অভিভূত কণ্ঠে বললেন, 'রাজা বলতে কী বোঝায়, এইবারে বুঝতে পারছি!'
জয়লাভ করেও আলেকজান্ডার কিন্তু দরায়ুসের অনুসরণ করতে পারলেন না। তাঁর পিছনে ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের বিপুল আর-এক অংশ— সিরিয়া ও মিশর প্রভৃতি নিয়ে যা গঠিত। পিছনদিকে এত বড়ো শত্রু-সাম্রাজ্য রেখে তিনি পারস্যের দিকে অগ্রসর হতে সাহস করলেন না— এবং রণনীতিতে অভিজ্ঞ অন্য কেউই যা করতেন না। প্রাচ্যভূমির দিকে অগ্রসর হতে গেলে যে সিরিয়া প্রভৃতি দেশ নিজের অধিকারভুক্ত রাখা উচিত, সেই প্রাচীনকালেই তরুণ আলেকজান্ডার তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। বহুকাল পরে আঠারো শতাব্দীতে ফরাসি দিগবিজয়ী নেপোলিয়নও এই সত্য বুঝে ভারতবর্ষ বিজয়ের বাসনা নিয়ে আলেকজান্ডারেরই পায়ে-চলা পথে পথিক হয়েছিলেন— যদিও তিনি সিরিয়া পার হবার সুযোগ পাননি।
অল্পবিস্তর চেষ্টার পর সিরিয়া আলেকজান্ডারের হস্তগত হল। প্রাচীন সভ্যতার লীলাক্ষেত্র মিশর, পারসিদের শাসনযন্ত্রের চাপে আর্তনাদ করছিল, তার জন্যে আলেকজান্ডারকে আর লড়াই করতে হল না। নবীন গ্রিক দিগবিজয়ীকে সে মুক্তিদাতা বলে অভ্যর্থনা করে সিংহদ্বার খুলে দিলে। আলেকজান্ডার নিজের নামে এখানে যে নগর প্রতিষ্ঠা করলেন, সেই আলেকজান্দ্রিয়া আজও পৃথিবীর অন্যতম প্রধান নগরী রূপে বিখ্যাত হয়ে আছে। গ্রিসের অধঃপতনের পরে শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে এথেন্সের স্থান গ্রহণ করেছিল আলেকজান্দ্রিয়াই।
আলেকজান্ডারের কল্পনাতীত সাফল্য দেখে এতদিন পরে গ্রিসের প্রধান সম্ভ্রান্ত রাষ্ট্র এথেন্সেরও চোখ ফুটল। এথেন্সও দূত প্রেরণ করে অভিনন্দন জানালে যে— আলেকজান্ডারই হচ্ছেন এশিয়ার বিরুদ্ধে গ্রিসের সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধা!
এরপর এই পৃথিবীতে আলেকজান্ডারের পরমায়ু ছিল মাত্র সাত বৎসর! কিন্তু কী বিচিত্র, কী অদ্ভুত ও কী অসাধারণ ঘটনার ধারার সঙ্গে প্রবাহিত হয়ে গিয়েছে এই সাতটি বৎসরের প্রত্যেকটি দিন! সাত বৎসরের মধ্যে পৃথিবীর আর কোনও মানুষ সভ্যতার ইতিহাসে এমন চিরস্মরণীয় পরিবর্তন আনতে পারেনি।
এইবারে আলেকজান্ডার নিশ্চিন্ত হয়ে আবার পারস্যের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। পারস্যের খ্যাতি, প্রতিপত্তি ও অদ্বিতীয়তার মূলে তিনি প্রচণ্ড আঘাত করেছেন বটে, কিন্তু এখনও সে ধূলিসাৎ হয়নি, এখনও সে মৃত নয়।
এদিকে দরায়ুসও বুঝতে পেরেছেন, আলেকজান্ডার হচ্ছেন অপরাজেয়। অন্তত তাঁকে দমন করতে পারে পারস্যের এমন শক্তি নেই। তাড়াতাড়ি তিনি সন্ধির প্রস্তাব করে পাঠালেন। ইউফ্রেটিস নদীর পশ্চিম তীর পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে আলেকজান্ডারের হাতে তিনি নিজের কন্যা ও প্রচুর অর্থ সমর্পণ করতে চাইলেন। অন্য যে-কোনও লোক এ শর্তে রাজি হয়ে যেত— কিন্তু আলেকজান্ডার সে লোক নন।
প্রধান সেনাপতি পার্মেনিয়ো বললেন, 'রাজা, আমি যদি আলেকজান্ডার হতুম, তাহলে এই প্রস্তাবেই সায় দিতুম।'
আলেকজান্ডার বললেন, 'ঠিক। আমি যদি পার্মেনিয়ো হতুম, এ প্রস্তাবে নিশ্চয়ই নারাজ হতুম না!'
দরায়ুস তখন আবার যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হবার জন্যে বিপুল আয়োজন করলেন। তখনও তাঁর সাম্রাজ্য ছিল বহুজনপূর্ণ ও বহু দূর বিস্তৃত। সাম্রাজ্যের নানা প্রদেশ থেকে নানাজাতীয় সৈনিক এসে দরায়ুসের পতাকার তলায় সমবেত হল— এমনকী, ভারত থেকে কয়েক হাজার ভারতীয় ধনুকধারী সৈনিক পর্যন্ত। এবারে যুদ্ধের আয়োজন হল আর-এক বিখ্যাত প্রাচীন সভ্যতার ক্ষেত্রে— অর্থাৎ ব্যাবিলনে। টাইগ্রিস নদীর নিকটে গৌগামালা নামক স্থানে দরায়ুস তাঁর শিবির স্থাপন করলেন।
আলেকজান্ডারের সৈন্যসংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজার। কিন্তু পারসিদের সংখ্যা তার চেয়ে এত বেশি ছিল যে, রণপ্রবীণ সেনাপতি পার্মেনিয়ো পর্যন্ত ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি বললেন, 'রাজা, দিনের আলোয় শত্রুদের সংখ্যা দেখলে গ্রিকরা হতাশ হতে পারে। তার চেয়ে রাতের অন্ধকারে আমরা আক্রমণ করব, আমাদের সৈন্যরা কিছু বুঝতে না।'
আলেকজান্ডার বললেন, 'তা হয় না। আমি বিজয়গৌরব চুরি করতে চাই না।'
রাত্রির তিমিরাবগুণ্ঠন ভেদ করে ফুটে উঠল পারস্য শিবিরের হাজার হাজার আলোকমালা এবং সেখান থেকে বায়ুতরঙ্গে ভেসে আসতে লাগল সাগর গর্জনের মতন গম্ভীর কোলাহল। সেখানে দাঁড়ালে চোখ আর কান দুইই অভিভূত হয়।
এই যুদ্ধের উপরে গ্রিসের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। আলেকজান্ডার ছিলেন অদৃষ্টবাদী। জ্যোতিষীদের আনিয়ে নিজের ভাগ্য গণনা করলেন। ফল হল সন্তাোষজনক। তখন দেবতার উদ্দেশে পূজা নিবেদন করে ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি নিশ্চিন্ত শিশুর মতো।
পরদিন যুদ্ধ আরম্ভ হলে দেখা গেল, ঘনব্যূহ ভেদ করবার জন্যে পারসিরা একরকম অস্ত্র-কণ্টকিত রথ আবিষ্কার করেছে। একে পারসিদের সংখ্যা এত বেশি যে, গ্রিক সৈন্যসীমার দুইপাশ ছাড়িয়ে তাদের ব্যূহ অনেক দূরে ছড়িয়ে পড়েছে, তার উপরে আবার এই নূতন আবিষ্কারের বিভীষিকা! গ্রিকরা রীতিমতো চাঞ্চল্য প্রকাশ করতে লাগল।
কিন্তু আলেকজান্ডার অচঞ্চল। রথ ছুটতে পারে সমতলক্ষেত্রে। তাঁর ডান পাশে ছিল অসমোচ্চ পাহাড়ে জমি, অস্ত্র-কণ্টকিত রথের গতিরোধ করবার জন্যে তিনি সৈন্য সমাবেশ করলেন সেইখানে। এবং পারসিরাও তাঁর অভিপ্রায় বুঝে গ্রিকদের বাম পার্শ্বস্থ সমতলক্ষেত্রে সরে এল।
দরায়ুস আলেকজান্ডারের কৌশল ধরে ফেলে গ্রিকদের ডান পাশ আক্রমণ করবার জন্যে পাঠিয়ে দিলেন অশ্বারোহী সৈন্যদের। বর্শা ও তরবারি নিয়ে পারসি অশ্বারোহীরা আকাশে-বাতাসে ধুলোর মেঘ উড়িয়ে এসে পড়ল গ্রিকদের উপরে, হইহই রবে! খড়্গে খড়্গে ঝনঝন সংগীত— সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চমক! হাজার হাজার বর্শা ফলক উঠল এবং নামল— শত শত গ্রিক দেহ ফুঁড়ে বেরিয়ে এল রক্ত ফোয়ারা! গ্রিক দল পশ্চাৎপদ— পারসিদের বিজয় হুংকার।
আলেকজান্ডার চিৎকার করে বললেন, 'গ্রিসের ছেলে তোমরা, পিছিয়ে এসো না— এগিয়ে যাও! ভুলো না, এই পারসি বর্বররা একদিন গ্রিক দেবতাদের মন্দির কলঙ্কিত করেছিল— আজ তার প্রতিশোধ নাও!'
গ্রিকরা আবার ফিরে দাঁড়াল— এবারে পারসিরা হল পশ্চাৎপদ!
অস্ত্র-কণ্টকিত রথ ছুটে আসতে লাগল গ্রিকদের বাম পাশের সমতলক্ষেত্রের উপর দিয়ে। রথ আর রথ আর রথ— কত রথ! তাদের গাত্র-সংলগ্ন ধারালো অস্ত্রগুলো মুখ বাড়িয়ে আছে যেন ঘনব্যূহের নরদেহগুলোকে ছিঁড়ে ফালা ফালা করে দেবার জন্যে! কিন্তু গ্রিক ধনুক থেকে ছুটতে লাগল শোঁ শোঁ শব্দে ঝাঁকে ঝাঁকে বাণ এবং আঠারো ফুট লম্বা বর্শাগুলো আন্দোলিত হতে লাগল ঘন ঘন! কত রথ অচল! তবু ছুটে আসে অন্য রথ! তখন ঘনব্যূহের সৈন্যরা হঠাৎ দুইপাশে সরে গেল এবং সামনে গলিপথ বেয়ে ভিতরে গিয়ে ঢুকল রথগুলো! অমনি ঘনব্যূহের দুইপাশ আবার এক হয়ে বন্ধ করে দিলে পথ এবং চারিপাশ থেকে আক্রান্ত রথগুলো হল চূর্ণবিচূর্ণ।
আগেই বলা হয়েছে, পারসি ফৌজের অধিকাংশ সরে এসেছিল গ্রিকদের বাম পার্শ্বে। ফলে তাদের মধ্যভাগ দুর্বল হয়ে পড়ল।
তীক্ষ্নচক্ষু আলেকজান্ডার তা লক্ষ করেই তাঁর প্রধান সৈন্যদল দিয়ে প্রচণ্ড বেগে পারসিদের মধ্যভাগ আক্রমণ করলেন।
ফল হল সাংঘাতিক। পারসিদের অশ্বারোহী দল পশ্চাৎপদ, পারসিদের অস্ত্র-কণ্টকিত রথগুলো অচল বা চূর্ণবিচূর্ণ এবং পারসিদের দুর্বল মধ্যভাগ বিধ্বস্ত! এরপর তাদের আর কোনও আশা রইল না।
ওই দেখা যায় সম্রাট দরায়ুসের সমুজ্জ্বল রথ! কিন্তু কী দুর্গতি তার! চারিদিকে তাঁর হত বা আহত নরদেহের স্তূপ— সামনে, পিছনে, দক্ষিণে, বামে কোনওদিকে তাঁর নড়বার উপায় নেই। অচল-রথের অসহায় সম্রাট, আর তাঁর রক্ষা নেই!
আলেকজান্ডার নিজের অশ্বারোহীদের ডেকে সম্রাটকে বন্দি করবার হুকুম দিতে যাবেন, সেই সময় বাম পার্শ্ব থেকে পার্মেনিয়োর জরুরি আবেদন এল— 'আমি আর শত্রুদের রুখতে পারছি না— সৈন্য পাঠান, সৈন্য পাঠান!'
যে পারসি সৈন্যরা গ্রিকদের বাম পাশে ছিল, তারা তখনও ভয়াবহ বিক্রমে যুদ্ধ করছিল, তাদের ঠেকাতে পারছিল না গ্রিকরা।
যে গ্রিক অশ্বারোহীরা বিশৃঙ্খল পারসি ব্যূহের মধ্যভাগে গিয়ে দরায়ুসকে বন্দি করতে পারত, তখন তাদের ছুটে যেতে হল পার্মেনিয়োকে সাহায্য করতে।
সেই ফাঁকে সচল-রথ থেকে লাফিয়ে পড়ে একটা ঘোড়ায় চড়ে দরায়ুস তাড়াতাড়ি পালিয়ে গেলেন। আলেকজান্ডার মহা আক্রোশে পার্মেনিয়োকে দিতে লাগলেন অভিশাপ! তাঁর অভিযোগ হচ্ছে, পারসিদের মধ্য ও বাম ভাগ যখন বিধ্বস্ত হয়েছে তখন তারা তো শক্তিহীন! দরায়ুসকে বন্দি করতে পারলে তাদের বাকি সৈন্যরা কতক্ষণ আর লড়াই করতে পারত? পার্মেনিয়ো আমার মুখের গ্রাস কেড়ে নিলেন!
সম্রাট পলাতক শুনে যেসব পারসি সৈন্য তখনও লড়াই করছিল তারাও অদৃশ্য হল কে কোথায়!
নেমে এল অন্ধ রাত্রির তিমির যবনিকা, ঢেকে গেল পৃথিবীর বীভৎস রক্তচিত্র, জেগে রইল কেবল আসন্ন মৃত্যুর কাতর ক্রন্দন।
দরায়ুসের সঙ্গে সঙ্গে সেই কালো রাত্রির অন্ধকারে পালিয়ে গেলেন পারস্যের সৌভাগ্যলক্ষ্মী।
ব্যাবিলন আলেকজান্ডারের হস্তগত। কিন্তু এখনও অক্ষত আছে নিজ পারস্য ও মিডিয়া— যেখান থেকে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে পারসি সাম্রাজ্য! তার উপরে দরায়ুস এখনও নাগালের বাইরে! সুতরাং কর্তব্য এখনও অসমাপ্ত।
আলেকজান্ডার আবার অগ্রসর হলেন। আবার এখানে-ওখানে দুই-একটা ছোটোখাটো যুদ্ধের পর পারস্যের বৃহৎ নগর সুসা এবং তার রাজধানী পার্সেপোলিস তাঁর হস্তগত হল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি পেলেন যুগে যুগে সঞ্চিত পারসি রাজভাণ্ডারের অতুল ঐশ্বর্য। আরও পেলেন সেইসব লুণ্ঠিত দ্রব্য, সম্রাট ক্সের্ক্সেস গত যুগে বা এথেন্স থেকে কেড়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।
তারপর দরায়ুসকে অধীনতা স্বীকার করবার জন্যে তিনি কিছুদিন সময় দিলেন। কিন্তু দরায়ুস এতখানি মাথা নোয়াতে রাজি হলেন না, একবেতানার (বর্তমান হামাদান) প্রাসাদে অচলের মতন বসে বসে ফেলতে লাগলেন দীর্ঘশ্বাস। এরপর এখানেও আর-একবার যুদ্ধের চেষ্টা হল। কিন্তু আলেকজান্ডারের আগমন সংবাদ পেয়েই দরায়ুসের সমস্ত সাহস উবে গেল, আবার তিনি পলায়ন করলেন।
আলেকজান্ডার আজ পারস্যে অদ্বিতীয়। পারস্যের রাজসিংহাসন এখন তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছে। পারস্য আর কোনওদিন গ্রিসের প্রভু হবার জন্যে স্পর্ধা প্রকাশ করবে না। তিনি পিতৃকৃত্য পালন করেছেন।
পারিষদবর্গ বললে, 'রাজা, এখনও পূর্ণ প্রতিশোধ নেওয়া হয়নি।'
'আরও কী প্রতিশোধ নিতে চাও?'
'রাজা, ভুলে যাবেন না, তৃতীয় দরায়ুসের পূর্বপুরুষ ক্সের্ক্সেস আমাদের পবিত্র এথেন্স নগরীকে সমর্পণ করেছিল অগ্নিশিখার মধ্যে। তারই প্রতিশোধ চাই! আমরাও পুড়িয়ে ছাই করব ক্সের্ক্সেসের প্রাসাদকে!'
'উত্তম! তার আয়োজন করো।'
দলে দলে লোক ছুটে এল জ্বলন্ত মশাল হাতে করে। তাদের পুরোভাগে গিয়ে দাঁড়ালেন আলেকজান্ডার— তাঁরও হাতে নৃত্যশীল অগ্নিশিখা এবং মাথায় জড়ানো ফুলের মালা।
ধু ধু করে জ্বলে উঠল সেই জগতে অতুলনীয় বিরাট প্রাসাদ— হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে লাগল তা বর্ণবিচিত্র। কারুকার্যে কমনীয় উচ্চ ভিত্তি, ফেটে চৌচির হয়ে যেতে লাগল। তার দর্পণের মতন মসৃণ শিলাস্তম্ভগুলো, অগ্নিবেত্রাঘাতে বিদীর্ণ হয়ে যেন আর্তরব করতে লাগল ওস্তাদ শিল্পীদের হাতে গড়া প্রস্তরমূর্তিরা! একটা বৃহৎ সভ্যতার বহু যুগব্যাপী শিল্পসাধনার আদর্শ গড়াগড়ি দেয় বুঝি ধুলায়!
আলেকজান্ডার তরুণ যুবক ছাড়া কিছুই নন, বন্ধুদের প্ররোচনায় হঠাৎ তিনি আত্মবিস্মৃত হয়েছিলেন। এখন হঠাৎ আবার কী ভেবে অনুতপ্ত কণ্ঠে চিৎকার করে হুকুম দিলেন, 'না, না! নিভিয়ে ফেলো, নিভিয়ে ফেলো— আগুন নিভিয়ে ফেলো!'
আগুন নিভল বটে— কিন্তু প্রাসাদের অনেকখানি গ্রাস করে। আজ প্রত্নতাত্ত্বিকরা আবার আবিষ্কার করেছেন প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ।
কিন্তু কী ভেবে আলেকজান্ডার আগুন নেভাবার আদেশ দিয়েছিলেন? পারস্যের প্রভু হয়ে কি তাঁর মনে হঠাৎ নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত জেগেছিল? না, দিগবিজয়ে বেরোবার আগেই মানসনেত্রের সামনে তিনি নিজের সে অপূর্ব পরিকল্পনা দেখতে পেয়েছিলেন, আবার তারই ছবি আচম্বিতে তাঁর মনে পড়ে গেল?
জোর করে কিছু বলা যায় না। কারণ, আলেকজান্ডারের নিজের মুখের কথা সেদিন কেউ শোনেনি।
কিন্তু আর-একদিনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করলে যেন এই রহস্যের ভিতরটা অস্পষ্টভাবে দেখা যায়!
একদিন আলেকজান্ডার পথে যেতে যেতে দেখলেন, মস্ত একটি পাথরের মূর্তি গড়াগড়ি যাচ্ছে।
শুনলেন, এ হচ্ছে ক্সের্ক্সেসের প্রস্তরমূর্তি।
আলেকজান্ডার সেই ভূপতিত মূর্তির উপরে উঠে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।
তারপর বললেন, 'আমার কী করা উচিত? তুমি গ্রিসকে আক্রমণ করেছিলে বলে তোমাকে কি এই পথের ধুলোতেই শুইয়ে রাখব? না, তোমার অসীম সাহস আর শক্তিকে মর্যাদা দেবার জন্যে আবার তোমাকে তুলে দাঁড় করিয়ে দেব?'
মনে মনে যেন এই সমস্যাপূরণের জন্যেই তিনি মৌন হয়ে রইলেন। তারপর আর কিছু না বলে প্রস্থান করলেন।
পারস্য বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গেই আলেকজান্ডার দেখতে হয়তো পেয়েছিলেন নিজের জন্যে একটি বিশেষ পথ। এখনও এ নতুন পথে চলেনি আর পথিক। সে পথের শেষে ছিল এমন একটি মিলনক্ষেত্র, প্রতীচ্য যেখানে দাঁড়াতে পারে প্রাচ্যের হাত ধরে।
এই হচ্ছে আধুনিক ঐতিহাসিকদের অনুমান। এমন অনুমানের কোনও সংগত কারণ আছে কি না, পরে আমরা তাও দেখবার চেষ্টা করব। তবে জোর করে কিছু বলা যায় না। কারণ, আলেকজান্ডারের স্বল্পস্থায়ী জীবন হচ্ছে অসম্পূর্ণ মহাকাব্য।
অষ্টম অধ্যায়। পথের নেশা
এখনও দরায়ুস পলাতক! তাঁকে বন্দি ও বশীভূত করতে না পারলে আলেকজান্ডারের শান্তি নেই। বিষধর পালিয়ে গেলেই নির্বিষ হয় না।
কিন্তু দরায়ুস যাবেন কোথায়? তিনি যত এগিয়ে যান, আলেকজান্ডার তাঁর পিছনে লেগে থাকেন কায়ার পিছনে ছায়ার মতো।
এই অনুসরণ করতে করতে আলেকজান্ডারকে অস্ত্র ধরতে হয়েছিল বারংবার। তিনি এক প্রদেশ পার হয়ে অন্য প্রদেশে গিয়ে পড়লেই তাঁর পশ্চাতে বিদ্রোহ ঘোষণা করে নব নব শত্রু। তাঁকে ফিরে এসে শত্রু দমন করে তবেই আবার অগ্রসর হতে হয়। এইসব কারণে দরায়ুসের পলায়নের সুবিধা হতে লাগল যথেষ্ট।
আলেকজান্ডার ও তাঁর যুগে আর কেউ সন্দেহ করেনি, যে গ্রিক ও পারসিরা আজ মৃত্যু সংগ্রামে নিযুক্ত, মূলত তারা একই জাতি। আলেকজান্ডার পরে পাঞ্জাবে গিয়েও বুঝতে পারেননি যে, ওখানকার ভারতীয়রাও তাঁর জাতভাই। স্মরণাতীতকাল আগে মধ্য এশিয়া থেকে যে মূল আর্য জাতি দক্ষিণদিকে অভিযান আরম্ভ করে, উত্তর ভারতীয় হিন্দু, ইরানের পারসি ও গ্রিসের গ্রিকগণ হচ্ছে তারই তিনটি শাখা। বহু যুগের এপারে এসে পড়ে তারা নিজেদের পূর্বকাহিনি ভুলে গিয়েছে, তাই পরস্পরকে 'বর্বর' বা 'যবন' বা অন্য কিছু বলে গালাগালি দেয় এবং ভাইয়ে ভাইয়ে হানাহানি করে।
দরায়ুসের মন্দ ভাগ্য! আলেকজান্ডারের হাতে আত্মসমর্পণ করলেই ভালো করতেন, কিন্তু তা না করে তিনি পালিয়ে বেড়াতে লাগলেন অভিশপ্ত ভবঘুরের মতো। শেষটা তিনি গিয়ে পড়লেন তপ্ত তৈল থেকে জ্বলন্ত আগুনে।
দরায়ুস পালালেন ইরানের উত্তরদিকে, আলেকজান্ডারও ছুটলেন উত্তরদিকে। এগোতে এগোতে হঠাৎ একদিন দেখা গেল, পথের উপরে পড়ে রয়েছে 'সর্বশক্তিমান ঈশ্বর' উপাধিধারী পারসি সম্রাট তৃতীয় দরায়ুসের মৃতদেহ! তাঁর দেহের সর্বত্র ছোরার আঘাত (খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ অব্দ)! সাম্রাজ্য স্থাপক, মহামহিমময় দিগবিজয়ী কুরুষ (Cyrus) থেকে যে রাজবংশের আরম্ভ, দরায়ুস তার শেষ বংশধর। আজকের পারস্যের রাজাও 'সর্বশক্তিমান ঈশ্বর' উপাধিটির উপরে দাবি করেন বটে, কিন্তু সে যেন বিষম ঠাট্টার মতন শোনায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, দরায়ুসকে হত্যা করেছেন তাঁরই এক জ্ঞাতি, নাম— বেসাস। লোকটি ছিল ব্যাকট্রিয়ার ক্ষত্রপ বা শাসনকর্তা।
আলেকজান্ডার রাগে জ্বলে উঠে বললেন, 'সম্রাট হত্যা! ছুটে চলো হত্যাকারীর পিছনে! যেখানে থাক, খুঁজে বার করো তাকে!'
বেসাস প্রমাদ গুনে ব্যাকট্রিয়ায় চম্পট দিলে। ব্যাকট্রিয়া হচ্ছে আফগানিস্তানের উত্তরে। বেসাস ভেবেছিল, আলেকজান্ডার দেশ ছেড়ে কখনোই এত উত্তরে আসতে সাহস করবেন না।
আলেকজান্ডার খবর পেলেন। আরও শুনলেন যে, পারস্য সাম্রাজ্যের উত্তরে যেসব শাসনকর্তা দরায়ুসকে হত্যা করবার জন্যে ষড়যন্ত্র করেছিল, তারা বেসাসকেই বসাতে চায় 'সর্বশক্তিমান'-এর সিংহাসনে। বেসাস নিজেও রাজনাম গ্রহণ করেছে।
আলেকজান্ডার ঝড়ের মতন ছুটলেন এই নতুন 'সর্বশক্তিমান'-এর সর্বশক্তি খর্ব করতে। বেসাস রক্ষা পেলে না, সে ধরা পড়ল এবং রাজহত্যার শাস্তিস্বরূপ তাকে প্রাণদণ্ড দিয়ে ক্রুশবিদ্ধ করা হল।
তারপর নানা খণ্ডযুদ্ধ, কষ্টস্বীকার ও গিরি-নদী-প্রান্তর অতিক্রম করবার পর আলেকজান্ডার তুর্কিস্থান পর্যন্ত দখল করে ফেললেন। এখানে সেসব কথা না বললেও চলবে। কারণ, আলেকজান্ডারকে বাধা দিতে পারে, এ অঞ্চলে এমন কোনও শত্রু ছিল না।
কিন্তু একদিনের কাহিনি উল্লেখযোগ্য।
তপনতপ্ত এশিয়ার এক মরুপ্রান্তর। আকাশের দিকে তাকানো যায় না, বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে গায়ে এসে লাগে যেন প্রখর অগ্নিবাণ, শুকনো ধু ধু প্রান্তরে কোথাও নেই জলবিন্দু। গ্রিক সৈন্যরা ধুঁকতে ধুঁকতে পথ চলতে গিয়ে এলিয়ে পড়ছে— দারুণ তৃষ্ণায় তাদের জিভ গেছে শুকিয়ে, প্রাণ করছে টা টা। নেই লোকালয়, নেই যেন পথের শেষ।
জনাকয় সৈনিক অপূর্ব ও অভাবিত এক আবিষ্কার করলে। মাটির ভিতরে একটি গর্ত, তার ভিতরে একটুখানি জল!
একজন সৈনিক লোহার শিরস্ত্রাণ খুলে জলটুকু সংগ্রহ করলে। হাজার হাজার সৈনিক সেই জলের কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলে। কারণ, সেটুকু জলে তৃষ্ণানিবারণ হতে পারে মাত্র একজনের!
সৈনিক ভাবলে, রাজার দাবি সকলের আগে। সে জলটুকু এনে ধরলে আলেকজান্ডারের সামনে।
রাজাও কম তৃষিত নন। তাঁরও ছাতি তখন যেন ফেটে যেতে চাইছে। তিনি বিপুল আগ্রহে সেই জলপূর্ণ শিরস্ত্রাণ টেনে নিয়ে নিজের ঠোঁটের কাছে তুললেন। তারপরেই দেখতে পেলেন, তৃষ্ণাকাতর শত শত চোখের আকুল দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে রয়েছে শিরস্ত্রাণের দিকেই।
শিরস্ত্রাণসুদ্ধ দুই হাত ঠোঁটের কাছ থেকে নামিয়ে আলেকজান্ডার বললেন, 'একজনের মতো জল, অথচ সবাই চায় তেষ্টা মেটাতে! সকলের আগে রাজার দাবি বলে আমি তো এ জল পান করতে পারি না।'
তিনি শিরস্ত্রাণ উপুড় করে ধরলেন— তৃষিত মাটির খানিকটা স্নিগ্ধ হল, ক্ষণিকের জন্যে।
কী স্বার্থত্যাগ, কী মহত্ত্ব! হাজার হাজার সৈনিক তৃষ্ণার জ্বালা ভুলে আলেকজান্ডারের নামে করলে জয়ধ্বনি!
ইতিহাসে যেসব সেনাপতি নাম কিনেছেন, তাঁদের অনেকেই এমনিভাবে সাধারণ সৈনিকদের সুখ-দুঃখ নিজের বলে মনে করে সেনাদলের কাছে হয়েছেন আদরের দেবতার মতন।
এই অঞ্চলে আলেকজান্ডার সৈনিকদের নিয়ে বৎসরখানেক ধরে বিশ্রাম করেন। (খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০-২৯ অব্দ) এবং এর মধ্যে কতকগুলি ছোটো-বড়ো এমন ঘটনা ঘটে, যার দ্বারা ধরা পড়ে তাঁর চরিত্রের বিশেষত্ব।
তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার মতন নিজের নামে অনেকগুলি নতুন নগর প্রতিষ্ঠা করেন। এইরকম নিজের নামে নূতন নগর প্রতিষ্ঠার ঝোঁক শেষটা তাঁকে নেশার মতো পেয়ে বসেছিল। আর কোনও দিগবিজয়ী এমন অহমিকা প্রকাশ করেননি।
শকরাজ অক্সিয়ার্তেজকে পরাজিত করে তিনি তাঁর কন্যা রোক্সানাকে বিবাহ করেন। আলেকজান্ডারের ভাবপ্রবণ চিত্ত কি এখানেও তাঁর পরবর্তী পরিকল্পনার প্রথম প্রকাশ দেখাবার চেষ্টা করেছিল? এই ঘটনায় তাঁর সঙ্গী গ্রিকগণ বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল, কারণ, তাদের পক্ষে এটা ছিল ধারণাতীত! সাম্রাজ্যস্রষ্টা অভিজাত গ্রিক বীর হয়ে বর্বর ও অসভ্য রাজার মেয়েকে বিবাহ! কিন্তু তারা জানত না, এরপর এমন কত ঘটনা তাদের জন্যে অপেক্ষা করে আছে!
আলেকজান্ডার যখন ভারতে জয়পতাকা উড়িয়ে পারস্যের সুসা শহরে প্রত্যাগত, তখন তিনি দরায়ুসের মেয়ে স্তাতিরাকেও করেছিলেন নিজের অঙ্কলক্ষ্মী। সেই সময়ে সেখানে এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখা যায়।
আলেকজান্ডারের দেখাদেখি তাঁর কয়েকশত সেনাধ্যক্ষও এক-একটি ইরানি সুন্দরীর পাণিপীড়ন করেন। আবার এইসব দেখে সাধারণ গ্রিক সৈনিকের সঙ্গে হয় দশ হাজারেরও বেশি পারসি কন্যার বিবাহ! ইয়োরোপের সঙ্গে এশিয়ার এমন বিবাহবন্ধনের কথা ইতিহাসে আর কখনো লেখা হয়নি!
আলেকজান্ডার নিজেই তাঁর সৈনিকগণকে উৎসাহ দিতে ছাড়েননি। বহু সৈনিক পারস্যে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। আলেকজান্ডার নিজের তহবিল থেকে টাকা দিয়ে তাদের ঋণ পরিশোধ করে বলেন, 'এইবারে তোমাদের প্রত্যেককে পারসি মেয়ে বিয়ে করতে হবে!'
সেইখানেই আলেকজান্ডার বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি চান, ইয়োরোপের সঙ্গে এশিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক— দুই মহাদেশের সর্বজাতি সম্মেলন! পিতৃকৃত্য পালনের জন্যে প্রথমে তিনি এশিয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেন বটে, কিন্তু তারপরেই তাঁর শত্রুভাব লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তিনি বুঝেছিলেন, এশিয়ার সঙ্গে ইয়োরোপের মিলন ঘটাতে পারলে তার ফল হবে অত্যন্ত শুভ। তিনি যে কেবল এশিয়ার কন্যাদের গ্রহণ করেই এই মিলনস্বপ্নকে সফল করতে চেয়েছিলেন, তা নয়; পরে আমরা দেখাব, রাজনীতির ক্ষেত্রেও তিনি অবলম্বন করেছিলেন ওই এক পন্থাই।
বর্বর ও অসভ্য রাজকন্যা হলেও রোক্সানা হচ্ছে প্রাচ্যেরই মেয়ে এবং প্রাচ্য দেশ বলতে আলেকজান্ডার কেবল পারস্য দেশই বোঝেননি।
আলেকজান্ডার যখন সমরখন্দে, তখন বিশেষ একটি অন্যায় কাজ করেছিলেন।
ছয় বছর আগে গ্রানিকাস ক্ষেত্রে ক্লিটাস তাঁর প্রাণরক্ষা করেছিলেন, এ কথা বলা হয়েছে যথাসময়েই।
সমরখন্দের এক ভোজসভায় একদিন আলেকজান্ডারের সঙ্গে তাঁর বন্ধু ক্লিটাসের ঝগড়া হল। দুজনেই সমান ক্রুদ্ধ!
ক্লিটাস রাজা বলে আলেকজান্ডারকে সমীহ করলেন না। মুখে যা আসে তা-ই বলে গালাগালি দিতে লাগলেন।
শেষটা আলেকজান্ডার আর সহ্য করতে পারলেন না। রাগে অজ্ঞান হয়ে বন্ধুর দেহে বসিয়ে দিলেন তীক্ষ্ন বর্শা! তৎক্ষণাৎ ক্লিটাসের মৃতদেহ মাটির উপরে লুটিয়ে পড়ল।
রাগের মাথায় এই অসম্ভব কাণ্ড করে ফেলে আলেকজান্ডার কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে তাঁর সহজ অবস্থা ফিরে এল। তারপরেই তিনি দুঃখে পাগলের মতন হয়ে উঠলেন।
বিষম অনুতাপে হঠাৎ তিনি বন্ধুর মৃতদেহে বিদ্ধ বর্শাটা একটানে খুলে নিয়ে আত্মহত্যা করতে উদ্যত হলেন।
ভাগ্যে সেখানে তাঁর দেহরক্ষী ছিল উপস্থিত। সে তাড়াতাড়ি তাঁর হাত থেকে বর্শাটা কেড়ে নিলে।
এই হচ্ছে আলেকজান্ডারের আর-এক স্বরূপ। একদিকে তিনি ধীর, স্থির, ভাবুক, কাব্যপ্রিয়, নির্ভীক, উদার ও দয়ালু 'জনগণমন অধিনায়ক'; আর-একদিকে গোঁয়ার, ক্রোধে উন্মত্ত, অধীর, অহংকারী, নিষ্ঠুর ও হিংস্র।
এমনকী, তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছেন এই সন্দেহে পরে তিনি তাঁর পিতৃবন্ধু ও প্রবীণ সেনাপতি বৃদ্ধ পার্মেনিয়ো এবং তাঁর পুত্র ফিলোটাস এবং আরও অনেক বিখ্যাত সেনারক্ষীকে পর্যন্ত প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করতে কুণ্ঠিত হননি! এবং পরে আমরা দেখব, ভারতবর্ষে গিয়েও তিনি তৈমুর লং ও নাদির শাহের মতোই নৃশংস হয়ে করেছিলেন কী দারুণ হত্যাকাণ্ডের অনুষ্ঠান।
আবার এই লোকই পরম শত্রুকেও ক্ষমা করতে পেরেছিল হাসিমুখে। প্রমাণ, মহারাজ পুরু।
এক জলদস্যু-সম্পর্কীয় বিখ্যাত গল্পেও আলেকজান্ডারের চরিত্রের এমনি মাধুর্যের প্রমাণ পাওয়া যায়।
ডায়োমেডেস— নামজাদা বোম্বেটে। সমুদ্রের দিকে দিকে জাহাজ ভাসিয়ে নিজের সাংঘাতিক ব্যাবসা চালাত। সে কত বাণিজ্য-জাহাজ ডুবিয়েছে, কত পণ্য ও অর্থ হরণ করেছে, কত লোককে প্রাণে মেরেছে তার আর সংখ্যা নেই। শেষটা সে ধরা পড়ল। তাকে আলেকজান্ডারের সম্মুখে এনে হাজির করা হল।
আলেকজান্ডার ক্রুদ্ধস্বরে বললেন, 'ওরে ডাকাত, সমুদ্রে সমুদ্রে কোন সাহসে তুই এমন অত্যাচার করে বেড়াস?'
ডায়োমেডেস মৃত্যু নিশ্চিত জেনে নির্ভীকভাবে বললে, 'রাজা, তার চেয়ে নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, দেশে দেশে কোন সাহসে আপনি এমন অত্যাচার করে বেড়ান? আমি তো একখানি মাত্র বোম্বেটে জাহাজের মালিক, আমি আর কতটুকু অত্যাচার করতে পারি? আর আপনি হচ্ছেন অগণ্য জাহাজের ফৌজের মালিক, জলে-স্থলে দেশে দেশে নিয়ে যান ধ্বংস আর যুদ্ধ! তবু আমার উপাধি ডাকাত, আর আপনার উপাধি রাজা ও দিগবিজয়ী! অদৃষ্টের গতি যদি ফেরে, আমি যদি বেশি সফল হই আর আপনি হন কম সফল, তাহলে আমাদের উপাধি আর অবস্থাও বদলে যেতে কতক্ষণ!'
যুক্তি শুনে আলেকজান্ডার রাগ করলেন না। ডাকাতকে বহু অর্থদান করে বললেন, 'কিন্তু সাবধান, ভবিষ্যতে আর যেন ডাকাতি কোরো না।'
পারস্য সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল ভারতবর্ষের সিন্ধু নদ পর্যন্ত। আলেকজান্ডার এইবারে স্থির করলেন, তিনি সাম্রাজ্যের বাকি অংশটুকুকেও রেহাই দেবেন না। উত্তর ভারতে যদি পারস্যের দাবি না থাকত, তাহলে আলেকজান্ডার ভারতের মাটি মাড়াতেন কি না, সে বিষয়ে আমাদের গভীর সন্দেহ আছে।
কিন্তু রণক্ষেত্রে গ্রিকরা যুদ্ধ-ব্যবসায়ী ভারতীয় সৈন্যদের সঙ্গে একাধিকবার পরিচিত হবার সুযোগ পেলেও ভারতবর্ষ ছিল তাদের কাছে এক অজানা রহস্যময় অতি দুর্গম দেশ। কোথায় গ্রিস, আর কোথায় ভারতবর্ষ! মাঝে হাজার হাজার মাইলের ব্যবধান! আজকাল ট্রেন, বাষ্পীয় জাহাজ ও এরোপ্লেনের যুগে, গ্রিস থেকে ভারতবর্ষে যেতে কোনও দুশ্চিন্তা হয় না, কিন্তু সে যুগে পায়ে হাঁটা পথে এই দুই দেশে আনাগোনা করার কথা স্বপ্নেও কেউ মনে আনতে পারত না। তার উপরে গ্রিকদের যেতে হবে শত্রু রূপে, পথে কোনও সাহায্য পাবার আশা নেই— আছে পদে পদে শুধু বিপদ ও মৃত্যুর সম্ভাবনা!
এবং কত বৎসর আগে গ্রিকরা স্বদেশ, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের পিছনে ফেলে এসেছে! চিরশত্রু পারস্যের পতন হল, এখনও আবার নূতন অভিযানের প্রস্তাব!
গ্রিকরা ভারতবর্ষে যেতে ভয় পেলে এবং তাদের মনও কাঁদতে লাগল দেশের জন্যে।
আলেকজান্ডার নিজের সৈনিকদের মন জানতেন। তারা যে তাঁকে পিতার মতো, দেবতার মতো ভালোবাসে, এ সত্যও তাঁর অজানা ছিল না। তাদের মন ফেরাবার গুপ্ত অস্ত্র তাঁর কাছেই ছিল। অবশেষে তিনি সেই অস্ত্রই প্রয়োগ করলেন।
বললেন, 'বেশ, তা-ই হোক। যদিও আমি জানি এত তাড়াতাড়ি দেশে ফিরতে গেলে আমরা পালিয়ে যাচ্ছি ভেবে শত্রুরা আমাদের পিছন থেকে বারংবার আক্রমণ করবে, তবু তোমাদের ইচ্ছায় আমি বাধা দেব না। বেশ, দেশেই যাও! তোমাদের আমি ত্যাগ করলুম!'
আলেকজান্ডার তাদের ত্যাগ করবেন! তাদের বন্ধুর মতো, পিতার মতো, দেবতার মতো আলেকজান্ডার তাদের ত্যাগ করবেন! এত বড়ো দুর্ভাগ্য তারা ধারণাতেই আনতে পারলে না। না, না, এ হতেই পারে না— অসম্ভব!
সৈনিকরা সমস্বরে বলে উঠল, 'রাজা, রাজা! আমরা দেশে যেতে চাই না, আমরা তোমার সঙ্গে থাকতে চাই! তোমার সঙ্গে আমরা পৃথিবীর শেষ প্রান্তেও যেতে রাজি!'
ভারতবর্ষেই যাওয়া স্থির হল।
এক দেশ থেকে আর-এক দেশ, এক সভ্যতা থেকে সভ্যতার অন্তঃপুরে বিজয়ী বীরের মতন প্রবেশ করবার জন্যে আর-একবার অগ্রসর হলেন আলেকজান্ডার! ছিলেন ম্যাসিডনের ক্ষুদ্র নরপতি, আজ হয়েছেন বিশ্ববিজয়ী সম্রাট! কিন্তু ঐতিহাসিকরা বলেন, ভাগ্যলক্ষ্মীর প্রসাদ পেয়েও এবং শক্তির মদিরা পান করেও কোনওদিন তিনি আত্মহারা হননি। মানুষের তুচ্ছতা অসহায়তা কতখানি সেটা তাঁর অজ্ঞাত ছিল না।
পারস্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা কুরুষের সমাধিভবন। একদিন আলেকজান্ডার সেখানে গিয়ে উপস্থিত।
তিনি সমাধি প্রস্তরের উপরে লেখা এই কথাগুলি পড়লেন:
'হে মানুষ, তুমি যেই হও এবং যেখান থেকেই তোমার আগমন হোক— কারণ আমি জানি তুমি আসবেই— আমার এই কথাগুলি শুনে রাখো: আমি হচ্ছি সেই কুরুষ— পারসিদের জন্যে যে বিপুল সাম্রাজ্য জয় করেছিল: আজ এই যে একমুঠো মাটি হয়েছে আমার আবরণ, এর জন্যে তুমি আমাকে হিংসা কোরো না।'
শোনা যায়, এই লিপি পাঠ করবার পর আলেকজান্ডার মনুষ্যজীবনের নশ্বরতা ও অনিশ্চয়তার কথা স্মরণ করে ভাবের আবেগে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন।
নবম অধ্যায়। ভারতের অযাচিত অতিথি
আলেকজান্ডার যে সময়ে ভারতবর্ষে আগমন করেন, তখন উত্তর ভারতে বাস করতেন প্রধানত হিন্দুরাই। প্রধানত বললুম এইজন্যে, ভারতে তখন বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে বটে, কিন্তু তাদের বিশেষ প্রতিষ্ঠা হয়নি। হিন্দুদের তুলনায় বৌদ্ধ ও জৈনরা ছিল মুষ্টিমেয়। বলা বাহুল্য, পৃথিবীতে তখন খ্রিস্ট ও মুসলমান ধর্ম আত্মপ্রকাশই করেনি। আর-একটি কথা। তখন ভারতে প্রচলিত ছিল বৈদিক হিন্দুধর্ম— যার মধ্যে পৌত্তলিকতা নেই। পৌত্তলিক ছিলেন ইয়োরোপীয় গ্রিকরাই।
উত্তর ভারতের সীমান্ত প্রদেশে তখন হিন্দু ছাড়া অ-ভারতীয় আরও নানা জাতি বাস বা আনাগোনা করত। ও অঞ্চলে তখন একটি প্রসিদ্ধ শহর ছিল, তার নাম তক্ষশিলা (বর্তমান রাওয়ালপিণ্ডির অদূরে)। তক্ষশিলা গান্ধার রাজ্যের অন্তর্গত— মহাভারতের গান্ধারী এখানকারই রাজকন্যা। প্রাচীন ভারতে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিদ্যাচর্চার জন্যে তক্ষশিলা ছিল অদ্বিতীয়। কোনও কোনও বিভাগে তখনকার বারাণসীও তার কাছে দাঁড়াতে পারত না।
উত্তর ভারতে তখন বিশেষ কোনও বড়ো রাজা ছিলেন না। তবে ওরই মধ্যে পুরু ও তক্ষশিলার ও অভিসারের রাজারা শ্রেষ্ঠতার দাবি করতে পারতেন বটে। খুব বড়ো না হোক, পুরু নিতান্ত তুচ্ছ রাজাও ছিলেন না, কারণ তাঁর রাজ্যে তিনশত নগর ছিল বলে শোনা যায়। ঝিলাম ও চিনাব নদের মাঝখানে ছিল রাজা পুরুর রাজ্য।
হিন্দুস্থানে তখন সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও ক্ষমতাশালী নরপতি ছিলেন পাটলিপুত্রের নন্দ— আলেকজান্ডারের সঙ্গে যাঁর শক্তিপরীক্ষা হয়নি।
সীমান্ত প্রদেশ এখনকার মতন তখনও বহু খণ্ড খণ্ড রাজ্যে বিভক্ত ছিল। সেসব জায়গার রাজা ও রাজ্যের নাম ভারতীয় পুঁথিপত্রে পাওয়া যায় না। গ্রিক ঐতিহাসিকরা অনেক জাতির ও রাজ্যের নাম করেছেন বটে, কিন্তু অধিকাংশ নাম পড়েই আজ তার কিছু বোঝবার জো নেই। এর কারণ, গ্রিকরা ভারতীয় নাম শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করতে পারতেন না। এমন বিকৃত করে ফেলতেন যে, প্রায়ই আসল নামের সঙ্গে কিছুই মিলত না। যেমন ঝিলামকে তাঁরা ডাকতেন Hydaspes বলে এবং তাঁদের কাছে চিনাব ছিল Akesines! আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকরা বহু চেষ্টার পর কোনও কোনও দেশ বা জাতির অবস্থান অনুমান করতে পেরেছেন বটে, কিন্তু নানা ক্ষেত্রে তা অনুমানমাত্র, কারণ, তা নিয়ে নেই তর্কবিতর্কের অভাব। তখনকার ওইসব খণ্ডরাজ্যের কোনওটিই আজ বর্তমান নেই।
ওখানকার বাসিন্দারাও আজ ধর্মান্তর গ্রহণ করে নিজেদের সমস্ত প্রাচীন অবদান হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু তারা একটি বিশেষত্ব হারায়নি। সে যুগেও সীমান্তের বাসিন্দারা ছিল যুদ্ধপাগল। তারা কারো অধীনতা স্বীকার করতে রাজি ছিল না। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও যে-কোনও বৃহৎ ও পরাক্রান্ত শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করত। আজও তাদের প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়নি।
আর-একটি ছোটো রাজ্যের কথা চিরস্মরণীয় হবার যোগ্য। এ রাজ্যের নাম আজ কেউ জানে না, কিন্তু রাজার নাম ছিল হস্তী। এটুকুও জানা গিয়েছে, রাজা হস্তীর দেশ ছিল তক্ষশিলারই অদূরে।
খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দের বসন্তকাল। পর্বতমালার তুষার আবরণ গলে পড়ছে সূর্যের তপ্ত ছোঁয়ায়।
এই পর্বতমালার নাম হিন্দুকুশ। ইয়োরোপীয়রা একে ভারতীয় ককেশাস বলেও ডাকে। ভারতের বিপুল সিংহদ্বারে চিরদিন সে দাঁড়িয়ে আছে দিগবিদিক পূর্ণ করে আকাশ-ঢাকা বিরাট প্রহরীর মতো।
আলেকজান্ডার সসৈন্যে হিন্দুকুশ পার হলেন। তারপর প্রবেশ করলেন ভারতবর্ষে। বলা বাহুল্য, তখন আফগানিস্তানের নাম কেউ শোনেনি। ও জায়গাটি ভারতবর্ষেরই অন্তর্গত ছিল।
আলেকজান্ডার কত সৈন্য নিয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছিলেন? আধুনিক ইয়োরোপীয় ঐতিহাসিকরা হয়তো গ্রিকদের— অর্থাৎ ইয়োরোপীয়দের গৌরব বাড়াবার জন্যেই বলেছেন, তাঁর সৈন্যসংখ্যা পঞ্চাশ-ষাট হাজারের বেশি ছিল না। কিন্তু আমাদের মতে এ বিষয়ে প্রাচীন গ্রিক ঐতিহাসিক বা লেখকদের কথাই অধিকতর প্রামাণিক। প্লুটার্ক পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, ভারতীয় অভিযানে আলেকজান্ডারের সঙ্গে ছিল পনেরো হাজার অশ্বারোহী ও এক লক্ষ বিশ হাজার পদাতিক সৈন্য। এ হিসাব অস্বীকার করবার প্রমাণ নেই।
এর উপরেও পথে আসতে আসতে আলেকজান্ডার যে পেশাদার সৈন্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন তার প্রমাণ আছে। অভিসারের রাজা ও তক্ষশিলার রাজা অম্ভি এবং আরও কোনও কোনও নরপতি আলেকজান্ডারের পক্ষ অবলম্বন না করে পারেননি। গ্রিক লেখকরা বলেছেন, তাঁরাও গ্রিক দিগবিজয়ীকে বহু সৈন্য, হস্তী ও অশ্ব প্রভৃতি দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। সুতরাং কম করে ধরলেও আমরা বলতে পারি, আলেকজান্ডার যখন পাঞ্জাবে আসেন তখন তাঁর সৈন্যসংখ্যা নিশ্চয়ই দুই লক্ষের কম ছিল না।
আধুনিক জালালাবাদের কাছে এসে আলেকজান্ডার তাঁর সৈন্যগণকে দুই দলে বিভক্ত করলেন। জেনারেল হিফেসান ও পার্ডিকামের উপরে হুকুম দেওয়া হল, তাঁরা যেন কাবুল নদীর ধার ধরে সিন্ধু নদের তটে গিয়ে হাজির হন।
সীমান্ত প্রদেশের অধিকাংশ রাজাই বন্ধুতা স্বীকার করলেন। কিন্তু রুখে দাঁড়ালেন একজন, নাম তাঁর হস্তী। তিনি যে খুব বড়ো বা বিখ্যাত রাজা ছিলেন, তা নয়। খ্যাতি-প্রতিপত্তিতে তক্ষশিলার রাজা তাঁর চেয়ে ঢের বেশি শ্রেষ্ঠ ছিলেন। কেবল শ্রেষ্ঠ নন, বেশি বুদ্ধিমানও ছিলেন নিশ্চয়! কারণ, আলেকজান্ডারকে বাধা দেওয়া অসম্ভব বুঝে তিনি তাড়াতাড়ি তাঁর বন্ধু হয়ে পড়েছিলেন! এমনকী, নিজের সৈন্যসামন্ত নিয়ে গ্রিকদের সঙ্গে মহারাজা হস্তীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও আপত্তি করেননি।
কিন্তু মহারাজা হস্তীর কাছে প্রাণের চেয়ে মানের গৌরবই ছিল বড়ো। তিনিও জানতেন, গ্রিকদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করার মানেই হচ্ছে বালির বাঁধ দিয়ে সমুদ্রের গতিরোধ করবার দুশ্চেষ্টা। তবু তিনি বললেন, প্রাণ দেব কিন্তু স্বাধীনতা দেব না! তারপর যেমন অসমসাহসে ইয়োরোপীয় মহাযুদ্ধে জার্মানির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল ক্ষুদ্র বেলজিয়াম, তিনিও তেমনি পথরোধ করে দাঁড়ালেন গ্রিক বন্যার সুমুখে।
ছোট্ট রাজ্য, অল্প শক্তি। তবু দীর্ঘ এক মাসকাল ধরে মহারাজা হস্তী গ্রিকদের বাধা দিয়েছিলেন, আর্যাবর্তে প্রবেশ করতে দেননি। তারপর অসম্ভব আর সম্ভবপর হল না। ইংরেজ ও ফরাসিরা সাহায্য করেও বেলজিয়ামকে রক্ষা করতে পারেনি, কিন্তু হস্তীকে সাহায্য করবার জন্যে আর কোনও ভারতীয় রাজা অগ্রসর হলেন না। বিশ্ববিজয়ী গ্রিক সৈন্যদের বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র এক প্রাদেশিক শাসনকর্তা কতদিন আর দাঁড়াতে পারেন? মহারাজা হস্তীর পরিণাম কী হল তা জানি না, কিন্তু তাঁর রাজ্য ধ্বংস হয়ে গেল। খুব সম্ভব হস্তীও করেছিলেন আত্মদান।
আশ্চর্য কথা যে, ভীমার্জুনের যোগ্য বংশধর এমন এক হিন্দু বীরের কাহিনি ভারতের কোনও পুরাণে বা গ্রন্থে স্থান লাভ করেনি, তাঁর কথা আমরা জানতে পারি গ্রিক লেখকদের কাছ থেকেই।
আলেকজান্ডারের সমগ্র ভারতীয় অভিযানের কথা বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে একখানি স্বতন্ত্র গ্রন্থ লিখতে হয়। আমাদের এখানে অত জায়গা নেই, কারণ, আমাদের বলতে হবে সংক্ষেপে আলেকজান্ডারের গোটা জীবনের কথা। অতএব এখানে ভারতীয় অভিযানের কেবল বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলিই বলব।
একদল গ্রিক ভারতবর্ষের ভিতরে প্রবেশ করলে, কিন্তু আলেকজান্ডার তখন তাদের সঙ্গী হলেন না। সীমান্তের পার্বত্য জাতিদের কিছু কিছু বীরত্বের পরিচয় পেয়েই তিনি বুঝলেন, এদের পিছনে রেখে ভারতের ভিতরে গেলে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা।
বাকি সৈন্য নিয়ে তিনি পার্বত্য জাতিদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলেন। চারিদিকে কেবল শত্রু পরিপূর্ণ পাহাড়ের পর পাহাড়; গ্রীষ্ম এল সূর্যের অগ্নিবৃষ্টি নিয়ে; শীত এল ভয়াবহ তুষার নিয়ে; তার উপরে নির্ভীক ভারতসন্তানদের অস্ত্র প্রতিপদে বর্ষণ করতে লাগল মৃত্যুর অভিশাপ। পার্বত্য জাতিদের দমন করবার জন্যে আলেকজান্ডারের দরকার হল দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধ। পারস্যেও তাঁকে এত বাধা পেতে হয়নি।
চিত্রল নদীর কাছে একটি নামহীন গিরি নগর। কোনও অনামা ভারতীয় বীরের বাণে আলেকজান্ডার এখানে সর্বপ্রথমে আহত হন। এই ব্যাপারে গ্রিক সৈন্যরা এমন খাপ্পা হয়ে উঠল যে, তারা নগরটিকে একেবারে ভূমিসাৎ করে সমস্ত বাসিন্দাকে হত্যা করলে।
বাজর প্রদেশে 'আস্পাসিয়ান' নামক জাতিকে মস্ত একটি যুদ্ধে পরাজিত করে আলেকজান্ডার বন্দি করলেন প্রায় চল্লিশ হাজার লোক। তারপর তিনি অগ্রসর হলেন 'আস্যাকেনই'দের বিরুদ্ধে। এই জাতি বাস করত মালাকান্দ গিরিসংটের অদূরে। ওখানে তাদের একটি বিখ্যাত ও বৃহৎ নগর ছিল, নাম— মাগাসা। এখানে একটি বিষম লড়াই হয় এবং আলেকজান্ডার আহত হন দ্বিতীয়বার। যুদ্ধে মাসাগার রাজা মারা পড়লেন এবং তার ফলে দুর্গ ও নগর হল গ্রিকদের হস্তগত।
তারপর যা হল, আলেকজান্ডারের পক্ষে বড়ো কলঙ্কের কথা। গ্রিক ঐতিহাসিকরাও তাকে নিন্দা করতে বাধ্য হয়েছেন।
মাসাগার দুর্গে সাত হাজার ভারতীয় পেশাদার সৈন্য ছিল। তারাও বন্দি হয়েছিল।
আলেকজান্ডার বললেন, 'তোমাদের আমি মুক্তি দিলুম। কিন্তু এই শর্তে যে, তোমরা আমার ফৌজে ভরতি হবে।'
ভারতীয় সৈনিকেরা খানিক দূর গিয়ে ছাউনি ফেললে। সঙ্গে তাদের স্ত্রী ও সন্তানরাও ছিল।
কিন্তু তাদেরও মধ্যে ছিল রাজা হস্তীর মতন জ্বলন্ত বীরত্ব ও প্রবল স্বদেশানুরাগ। তারা পেশাদার হলেও ভারতের শত্রুর অধীনে চাকরি করে স্বজাতির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে রাজি হল না। তারা স্থির করলে, সেইরাত্রেই এ জায়গা ছেড়ে চলে যাবে।
আলেকজান্ডার এই কথা শুনেই রাগে আগুন হয়ে উঠলেন। তারপর গোপনে রাত্রের অন্ধকারে করলেন তাদের চারিধার থেকে অতর্কিতে আক্রমণ।
ভারতীয় বীরেরা নিশ্চিন্ত হয়েছিল— কারণ তারা জানত, যুদ্ধের কোনোই সম্ভাবনা নেই।
এখন বিস্মিত হয়ে দেখলে, চতুর্দিকেই অস্ত্রধারী শত্রু! বিস্ময়ের প্রথম ধাক্কা সামলে নিয়েই তারা স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের মাঝখানে রেখে মণ্ডলাকারে দাঁড়িয়ে অস্ত্রধারণ করলে।
সাত হাজার মাত্র ভারতসন্তান, কিন্তু গ্রিকদের সংখ্যা হয় না। তবু ভারতীয়রা অস্ত্রত্যাগও করলে না, আলেকজান্ডারের চাকর হয়ে মাতৃভূমির কুসন্তান হতেও রাজি হল না। এমনকী, দলের ভারত-নারীরাও দেশের শত্রুর বিরুদ্ধে স্বহস্তে অস্ত্রচালনা করতে ভয় পেলে না! এসব ঐতিহাসিক সত্য।
অবশেষে তারা সকলেই একে একে ভারতের মাটি নিজেদের বুকের রক্তে রাঙা করে— গ্রিক ঐতিহাসিকেরই ভাষায়— 'অপমানকর জীবনের পরিবর্তে গৌরবজনক মৃত্যুকে' বরণ করে নিলে।
পেশাদার গ্রিক সৈন্যরা পারস্য সম্রাটের চাকরি নিয়ে গ্রিকদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তাই আলেকজান্ডার ঘৃণাভরে তাদের দেশদ্রোহী বলে প্রত্যেককে বধ করতে হুকুম দিয়েছিলেন। অথচ এখানে দেশদ্রোহী হতে চাইলে না বলেই সাত হাজার মহাবীর ভারতসন্তানকে রীতিমতো কাপুরুষের মতন হত্যা করা হল! তারপর দুই হাজার বৎসরেরও বেশি কাল চলে গিয়েছে, কিন্তু ইতিহাস আজও আলেকজান্ডারের কলঙ্ককাহিনি ভোলেনি।
ভারতের বীরত্বকাহিনির সঙ্গেও জড়িত আছে ভারতের লজ্জা। সেকালে শশীগুপ্ত নামে এক হিন্দু ছিল, সে-ও যুদ্ধ ব্যবসায়ী। আগে সে দরায়ুসের হত্যাকারী ও ব্যাকট্রিয়ার রাজা বেসাসের সেনাদলে ভরতি হয়েছিল, তারপর আলেকজান্ডারের দলে গিয়ে সেনাধ্যক্ষের কাজ পায়। ভারত আক্রমণ করবার সময়ে এই শশীগুপ্ত নানা দিক দিয়ে আলেকজান্ডারকে সাহায্য করেছিল।
এই সময়ে বা এর কিছু পরে আলেকজান্ডারের সঙ্গে ভবিষ্যতের ভারত সম্রাট ও গ্রিকদের দর্পচূর্ণকারী, কিন্তু তখন নির্বাসিত চন্দ্রগুপ্তের আলাপ-পরিচয় হয়েছিল।
এরপর আরও কয়েকটি দেশ দখল করে গ্রিকরা অগ্রসর হল ঝিলাম নদের দিকে।
গ্রিকরা এতদূর অগ্রসর হতে পেরেছিল তার প্রধান দুটি কারণ হচ্ছে, উত্তর ভারত ছিল ছোটো ছোটো রাজ্যে বিভক্ত এবং সেখানকার কোনও রাজাই ব্যক্তিগত স্বার্থ ও বিবাদ ভুলে দেশরক্ষার জন্যে পরস্পরের সঙ্গে সম্মিলিত হতে পারতেন না। কাজেই নিজের বিপুল বাহিনী নিয়ে আলেকজান্ডার একে একে সকলকেই পরাজিত করলেন।
এইবারে মহারাজা পুরুর পালা। মহারাজ হস্তীর মতন তিনিও ভারতের শত্রুকে পথ ছেড়ে দিতে রাজি হলেন না, সৈন্য সংগ্রহ করতে লাগলেন। যদিও তাঁর সৈন্যসংখ্যা পঞ্চাশ হাজারের বেশি হল না। তবু তা-ই নিয়েই তিনি বৃহত্তর গ্রিক বাহিনীকে বাধা দিতে ছুটলেন।
খবর পেয়ে আলেকজান্ডারও যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হলেন! আগে তিনি পুরুকে পত্রে জানিয়েছিলেন, 'রাজা, অন্যান্য সকলের মতন তুমিও আমার বশ্যতা স্বীকার করো।'
পুরু সগর্বে উত্তর দেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আমি আপনার কাছে যাব। কিন্তু সসৈন্যে। আমাদের দেখা হবে রণক্ষেত্রে।'
এরপর যুদ্ধ ছাড়া আর উপায় রইল না।
দশম অধ্যায়। ঝিলামের যুদ্ধ এবং তারপর
শিয়ালকোটের মাইল পঞ্চাশ উত্তর-পশ্চিমে ঝিলাম শহর। তার পাশে কারি প্রান্তর। সেইখানে খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে জুনের শেষে কিংবা জুলাইয়ের প্রথমদিকে আলেকজান্ডারের সঙ্গে পুরুর ইতিহাসপ্রসিদ্ধ যুদ্ধ হয়। যুদ্ধটি ইতিহাসপ্রসিদ্ধ বটে, কিন্তু বিশেষ বড়ো যুদ্ধ নয়। গ্রিক ও অন্যান্য পাশ্চাত্য লেখকরা আলেকজান্ডারের মহিমাকীর্তনের জন্যেই একটি সাধারণ যুদ্ধকে অসাধারণ বলে প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন। এর চেয়ে ঢের বড়ো যুদ্ধ হয় সেলিউকাসের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্তের। কিন্তু সেখানে গ্রিকরা পরাজিত হয়েছিল, তাই গ্রিক লেখকরা তার কোনও বর্ণনাই দেননি।
পাহাড়ের বরফ-গলা জল নদীতে এসে পড়েছে, ফুলে উঠেছে তাই ঝিলামের বুক।
নদীর এক পারে গ্রিক ফৌজ, আর-এক পারে ভারতীয় শিবির।
গ্রিকদের ভাবভঙ্গি দেখে পুরু ভাবলেন, নদীর জল না কমলে আলেকজান্ডার পার হবার চেষ্টা করবেন না। পুরুকে ঠকাবার জন্যেই আলেকজান্ডার এই কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।
এক দুর্যোগের রাত। বৃষ্টি পড়ছে মুষলধারে। আলেকজান্ডার গোপনে একদল সৈন্য নিয়ে খানিকটা দূরে সরে গিয়ে নদী পার হলেন।
পুরু কিছুই জানতে পারলেন না। তিনি নদীর পরপারের গ্রিক সৈন্যদের সামনাসামনি জায়গা বেছে ব্যূহ রচনা করেছিলেন। হঠাৎ অন্যদিক থেকে গ্রিকরা আক্রমণ করতে আসছে দেখে তাড়াতাড়ি ব্যূহের মুখ ফেরাতে গেলেন, এমন সময়ে ওপার থেকেও গ্রিকরা নদী পার হতে লাগল। তিনি কোন দিক সামলাবেন বুঝতে-না বুঝতেই প্রায় চারিদিক থেকেই আক্রান্ত হলেন। তাঁর সামনে আলেকজান্ডার, পিছনে ওপারের গ্রিক ফৌজ।
আলেকজান্ডারের চমৎকার রণকৌশলে পুরুকে পরাজিত হতে হল।
পুরু নিজে বীরের মতন শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করেছিলেন। তারপর দেহের নয় জায়গায় আহত হয়ে যখন প্রায় অচেতন হয়ে পড়েছেন, তখন গ্রিকরা তাঁকে বন্দি করতে পারলে।
পুরুকে নিয়ে যাওয়া হল গ্রিক দিগবিজয়ীর শিবিরে।
আলেকজান্ডার মুগ্ধ বিস্ফারিত নেত্রে দেখলেন, সাড়ে ছয় ফুট দীর্ঘ, বলিষ্ঠ ও গৌরবর্ণ দেহ। সর্বাঙ্গে রক্ত ঝরছে, যুদ্ধশ্রমে ও রক্তপাতে ক্লান্ত শরীর— মাথা তবু উঁচু, দৃষ্টি তবু তেজে পরিপূর্ণ! মূর্তিমান বীরত্ব!
আলেকজান্ডার জিজ্ঞাসা করলেন, 'বীর, তোমার সঙ্গে কীরকম ব্যবহার করব?'
পুরু সগর্বে উত্তর দিলেন, 'রাজার সঙ্গে রাজার মতো!'
আলেকজান্ডার তা-ই করেছিলেন— বীর হয়ে তিনি বীরের মর্যাদা ভুললেন না। পুরুর রাজ্যই কেবল পুরুকে ফিরিয়ে দেওয়া হল না— সেই সঙ্গে তিনি তাঁর নিজের দেশের চেয়ে বড়ো দেশের শাসনভার লাভ করলেন।
এই যুদ্ধকে স্মরণীয় করবার জন্যে আলেকজান্ডার ভারতে দুইটি নতুন নগর স্থাপন করলেন এবং তার একটির নাম বুকোফেলাস। তাঁর আদরের ঘোড়া ষণ্ডমুণ্ড এতদিন পরে ভারতে এসে বুড়ো হয়ে মারা পড়েছে— তার নামেই এই নগরটির নামকরণ! সে নাম আর নেই, কারণ, নগরটি আজ ঝিলাম নামে প্রসিদ্ধ।
ঝিলামের যুদ্ধ চরম যুদ্ধও নয়। কারণ, তখনও আলেকজান্ডারের চারিদিকেই শত্রু! কাজেই তাঁকে ক্রমাগত যুদ্ধে নিযুক্ত থাকতে হল। এসব যুদ্ধের বর্ণনা অনাবশ্যক।
তারপর আলেকজান্ডার স্থির করলেন, তিনি মগধের দিকে অগ্রসর হবেন! তিনি বুঝেছিলেন, আসল ভারত এখনও তাঁর নাগালের বাইরে পড়ে আছে।
সত্যই তা-ই। আর্যাবর্তের প্রধান সাম্রাজ্য তখন মগধ। ভারতে এসে এতদিন পর্যন্ত আলেকজান্ডার যেসব রাজ্য অধিকার করেছেন, আকারে ও ক্ষমতায় মগধের কাছে তারা নগণ্য বললেও চলে।
কিন্তু মগধের ফৌজে ছিল আশি হাজার অশ্বারোহী, দুই লক্ষ পদাতিক, আট হাজার যুদ্ধরথ ও ছয় হাজার হস্তী। মগধরাজ ইচ্ছা করলে তাঁর বাহিনীকে আরও ঢের বড়ো করে তুলতে পারতেন, কারণ, তাঁর জনবল ও অর্থবল ছিল অফুরন্ত।
গ্রিক সৈন্যদের কানেও এসব খবর গিয়েছিল। তারা আলেকজান্ডারের ইচ্ছার কথা শুনে প্রমাদ গুনলে।
সৈন্যদের ভাবভঙ্গি দেখে আলেকজান্ডার তাদের উৎসাহিত করবার জন্যে বললেন, 'গ্রিক বীরগণ! স্মরণ করে দেখো, গ্রিসের প্রান্ত থেকে ভারতের এই সিন্ধু নদের প্রান্ত পর্যন্ত তোমরা কী অতুল বীরত্বের ও কী অক্ষয় গৌরবের প্রতিষ্ঠা করেছ! আমার সঙ্গে অগ্রসর হও— সমস্ত এশিয়া ও তার সমস্ত ধনসম্পত্তি আমি তোমাদেরই হাতে তুলে দেব!'
কিন্তু সৈন্যরা আর এসব কথা শুনতে নারাজ, তারা স্তব্ধ হয়ে রইল।
অবশেষে সেনাপতি কইনস সাহস সঞ্চয় করে বললেন, 'রাজা, আট বছর আমরা স্বদেশ ত্যাগ করে এসেছি। আমাদের অনেকেই মারা পড়েছে। যারা বেঁচে আছে তাদেরও অবস্থা ভালো নয়। এখন আমাদের দেশেই ফেরা উচিত।'
সৈনিকরা চারিধারে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। কইনসের কথা শেষ হতেই তারা সানন্দে চিৎকার করে সেনাপতির মত সমর্থন করলে। তাইতেই বোঝা গেল সৈনিকদের মনের গতিক।
আলেকজান্ডার অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। কিন্তু তিনি যে মত পরিবর্তন করেছেন, এমন কোনও ভাব প্রকাশ করলেন না। জবাব না দিয়ে নিজের তাঁবুর ভিতরে গিয়ে ঢুকলেন।
একদিন গেল, দুই দিন গেল, তাঁবুর বাইরে কেউ আলেকজান্ডারের দেখা পেলে না। সেখানে তিনি কী করছেন? ভাবছেন আর ভাবছেন। মনের ভিতরে তিনি ভবিষ্যতের জন্যে হয়তো একখানি বিশ্ব-বিস্তৃত নতুন মানচিত্র এঁকে রেখেছিলেন। হয়তো তার অনেকখানিই এখন তাঁকে গুটিয়ে ফেলতে হল। সৈনিক না পেলে দিগবিজয় অসম্ভব। কিন্তু তাঁর বিশ্বস্ত সৈনিকরাই আজ বিদ্রোহী। এদের মন তাঁর মতো বিশ্বগ্রাসী নয়। তাঁর কোনও কথাতেই ওরা আর বশ মানবে বলে বোধ হয় না।
তৃতীয় দিনে আলেকজান্ডার আবার বাইরে এসে দাঁড়ালেন। জ্যোতিষীরা এসে বললে, 'রাজা, গুনে দেখলুম, লক্ষণ মন্দ। গ্রহদেবতারা আপনার প্রতি এখন বিমুখ।'
জ্যোতিষীদের আর মাথা না ঘামালেও চলত। আলেকজান্ডার এর আগেই মনস্থির করে ফেলেছেন। নীরস বিষণ্ণকণ্ঠে বললেন, 'সৈন্যগণ, আমরা স্বদেশে যাত্রা করব।' (খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬)
কিন্তু এ হচ্ছে প্রত্যাবর্তন, না পলায়ন? আলেকজান্ডার মগধের ভয়ে ভারত ছেড়ে সরে পড়েছিলেন, এমন কথা বললে আধুনিক ইয়োরোপীয়রা আমাদের তেড়ে মারতে আসবেন। কিন্তু মেগাস্থিনিসের ভারতভ্রমণ নিয়ে আলোচনা করবার সময়ে প্রাচীন গ্রিক ঐতিহাসিক দায়াদরাস কী বলছেন শুনুন:
'ম্যাসিডনপতি আলেকজান্ডার সকলকেই পরাজিত করেছিলেন। কিন্তু তিনি মগধের সঙ্গে লড়াই করতে সাহসী হননি। তিনি ভারত অধিকারের ইচ্ছা দমন করেন মগধের সৈন্যবলের কথা শ্রবণ করে।'
এর উপরে আমাদের টীকা অনাবশ্যক।
ইতিমধ্যে গ্রিস থেকে পঁচিশ হাজার— কেউ কেউ বলেন, ছত্রিশ হাজার নতুন সৈনিক এসে পড়ল। তারা এসেছিল দিগবিজয়ে অংশগ্রহণ করতে, কিন্তু ধুলো পায়েই তাদের আবার দেশের দিকে মুখ ফেরাতে হল। তবে তাদের পেয়ে সুবিধাই হল আলেকজান্ডারের। কারণ, প্রত্যাবর্তনের পথ কেবল সুদীর্ঘই নয়, আলেকজান্ডারের পক্ষে যথেষ্ট বিপদসংকুলও হয়েছিল। সৈন্যবল অল্প হলে তাঁর অবস্থা কী হত বলা যায় না।
আলেকজান্ডার স্থির করলেন, প্রত্যাবর্তন করবেন নতুন পথ দিয়ে। কেবল স্থলপথ নয়, অবলম্বন করবেন জলপথও। তাঁর মন ছিল নব নব পথের নেশায় পাগল। তিনি নূতন নূতন দেশ দেখে নতুন নতুন আবিষ্কার করে নিজের এবং পৃথিবীর জ্ঞানের সীমা বাড়িয়ে তুলতে চান। এ কেবল দিগবিজয়ীর নয়, বৈজ্ঞানিকের মন।
আলেকজান্ডার প্রায় দুই হাজার জাহাজ সংগ্রহ করলেন। খ্রিঃপূঃ ৩২৬ অব্দের অক্টোবর মাসের শেষাশেষি সমস্ত আয়োজন সমাপ্ত হল। যাবার সময়ে তিনি মহারাজা পুরুর রাজ্যসীমা বাড়িয়ে তাকে উত্তর ভারতের সর্বপ্রধান রাজ্যে পরিণত করে গেলেন। এইতেই বোঝা যায়, পুরুকে তাঁর ভালো লেগেছিল কতখানি! শত্রু আলেকজান্ডার যেমন ভয়াবহ, মিত্র আলেকজান্ডার তেমনি মিষ্টচরিত্র!
ভারতের জলপথ গ্রিক নৌবাহিনী নিয়ে সমুদ্রের দিকে অগ্রসর হল। মাঝে মাঝে আলেকজান্ডারকে ডাঙায় নেমে যুদ্ধ করতে হয়। ফেরবার পথেও তিনি ছোটো-বড়ো কয়েকটি যুদ্ধজয় করেছিলেন। এ পথে তাঁর সবচেয়ে বড়ো ও বিখ্যাত যুদ্ধ হয় মালব দেশে। এখানে আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে কয়েকটি জাতি একসঙ্গে সম্মিলিত হয়েছিল। এবং অস্ত্র ধরে দাঁড়িয়েছিল নাকি প্রায় এক লক্ষ লোক। শত্রুদের সংখ্যা দেখে গ্রিকরা প্রথমে ভয়ে পালাতে চেয়েছিল, পরে আলেকজান্ডারের উৎসাহবাণী শুনে ফিরে দাঁড়ায় ও যুদ্ধে জয়লাভ করে।
এই অঞ্চলেই মুলতান নগর আক্রমণ করতে গিয়ে আলেকজান্ডার এমন আহত হয়েছিলেন যে, তাঁর বাঁচবার আশা ছিল না। মালব দেশে গ্রিক সৈন্যরা একাধিকবার বিষম হত্যাকাণ্ডের অনুষ্ঠান করেছিল। এমনকী, আত্মরক্ষায় অক্ষম নারী ও শিশুদেরও ক্ষমা করেনি।
আলেকজান্ডার তাঁর নৌসেনাপতিকে বললেন, সিন্ধু নদের মুখ থেকে বেরিয়ে নৌবহর নিয়ে পারস্য উপসাগর দিয়ে দেশের দিকে অগ্রসর হতে। এবং তিনি নিজে যাত্রা করলেন বেলুচিস্তানের ভিতর দিয়ে। ভীষণ সে যাত্রা। মরুপ্রদেশের মধ্যে গ্রীষ্মাধিক্যে, অনাহারে ও জলাভাবে দলে দলে লোক প্রত্যহ মারা পড়তে লাগল। তিন মাস কালব্যাপী নরকযন্ত্রণা ভোগ করে আলেকজান্ডার যখন পারস্যের সুসা শহরে গিয়ে পৌঁছোলেন, তখন তাঁর ফৌজের অর্ধেক সৈন্য মৃত (খ্রিস্টপূর্ব ৩২৪)! ঘটনা অনেকটা নেপোলিয়নের মস্কো থেকে প্রত্যাবর্তনের মতো।
আলেকজান্ডারের জীবনের আর-এক বৎসর মাত্র বাকি আছে।
একাদশ অধ্যায়। যবনিকা
পারস্যে উপস্থিত হয়েই আলেকজান্ডার খবর পেলেন, ভারতের গ্রিকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ আরম্ভ হয়েছে এবং তাঁর নিযুক্ত শাসনকর্তা ফিলিপস নিহত! কিন্তু যে সাংঘাতিক অগ্নিপরীক্ষার ভিতর দিয়ে তাঁকে ভারত ত্যাগ করতে হয়েছে, তার ফলে তিনি এখন শক্তিহীন, সৈন্য পাঠিয়ে বিদ্রোহ দমন করবার কোনোই উপায় নাই। এর পরেও আর তিনি ভারতের দিকে দৃষ্টি ফেরাবার অবসর পাননি। এর অল্প দিন পরেই চন্দ্রগুপ্তের শৌর্যবীর্যের মহিমায় ভারত আবার গ্রিকদের হাতছাড়া হয়। আলেকজান্ডার জীবিত থাকলে খুব সম্ভব চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে তাঁর একবার শক্তিপরীক্ষা হত এবং পৃথিবীর ইতিহাসে সেটা হত একটা চিরস্মরণীয় ঘটনা! দুই প্রতিভার সংঘর্ষ!
পারস্যে ফিরে আলেকজান্ডার আবার তাঁর পরিকল্পনাকে মূর্তি দেবার চেষ্টা করলেন। কতক কথা আগে বলা হয়েছে।
ভারতে তিনি যেমন মহারাজা পুরুর হস্তে নিজের জয় করা রাজ্যগুলি সমর্পণ করতে দ্বিধাবোধ করেননি, পারস্যের অভিজাত ব্যক্তিগণকেও তেমনি নানা দেশের কর্তৃত্বভার দান করলেন— এমনকী, গ্রিক শাসনকর্তাদেরও পদচ্যুত করে!
এবং যে নতুন ও উন্নত যুদ্ধবিদ্যার জন্যে আজ তিনি পৃথিবীতে অজেয়, প্রায় তিরিশ হাজার পারসি যুবককে নির্বাচন করে অসংকোচে নিয়মিতভাবে সেই সামরিক শিক্ষা প্রদান করতে লাগলেন। নিজের দেহরক্ষী অশ্বারোহী সৈন্যদলের মধ্যেও তিনি পারসি রাজকুমারদের গ্রহণ করতে ভীত হলেন না।
চিরশত্রু পারসিদের সম্বন্ধে আলেকজান্ডারের এই আশ্চর্য মত পরিবর্তন দেখে গ্রিক সেনাপতি ও তাঁর পুরাতন বন্ধুগণ বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেলেন। বলা বাহুল্য, তাঁরা খুশিও হলেন না। এমনকী, তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত হল।
গ্রিকরা আলেকজান্ডারের উদার আদর্শের মর্ম গ্রহণ করতে পারলে না। তিনি সেই প্রাচীন যুগেই চেয়েছিলেন প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের পার্থক্য ঘুচিয়ে দিতে— আজকের এই মৌখিক সাম্যবাদের যুগেও ইয়োরোপ যা করতে পারছে না। তাঁর এই চেষ্টার জন্ম নিশ্চয়ই বহু চিন্তার ফলে। তাঁর স্বল্পস্থায়ী জীবন শেষের দিকে যত এগিয়ে গিয়েছিল, এদিকে তাঁর ঝোঁক উঠেছিল ততই স্পষ্টতর হয়ে। তিনি আরও কিছুকাল বেঁচে থাকলে তাঁর চেষ্টার শেষ ফল কোন আকার ধারণ করত, আজও আমরা তা অনুমান করতে পারি না। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র বুদ্ধি যেখানে পঙ্গু, প্রতিভা সেখানে কী না করতে পারে!
খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দের বসন্তকালে আলেকজান্ডার পারস্য থেকে গেলেন ব্যাবিলনে। সেখানে বসেও তাঁর চিত্ত ব্যস্ত হয়ে রইল আবার স্থলপথে ও জলপথে নব নব অভিযানের স্বপ্ন নিয়ে। তখনকার অন্যতম প্রধান সভ্য দেশ ছিল কার্থেজ, হয়তো সেখানে যাবার ইচ্ছাও তাঁর ছিল। আপাতত— অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দে— তাঁর দৃষ্টি পড়ল আরব দেশের উপরে।
কিন্তু পৃথিবীর কোনও দিগবিজয়ীই যাকে জয় করতে পারেনি, সেই মৃত্যুর দৃষ্টি পড়ল তাঁর উপরে। আরব অভিযানের আয়োজন যখন প্রায় শেষ হয়েছে, আলেকজান্ডার হঠাৎ জ্বরে শয্যাগ্রহণ করলেন। এই শয্যাই তাঁর শেষশয্যা।
একটি ভোজসভায় যোগ দেবার পরই তিনি শয্যাশায়ী হন। সেকালে এমন আচম্বিতে কেউ পীড়িত হয়ে পড়লেই লোকে সন্দেহ করত, বিষপানের ফল। তাই আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পরেও গুজব রটেছিল, বিষের দ্বারা তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। এমনকী, পুত্রভক্ত জননী ওলিম্পিয়াসও শোকে পাগলের মতো হয়ে কল্পিত হত্যাকারীদের উপরে নিয়েছিলেন ভীষণ প্রতিশোধ। কিন্তু আসলে তাঁর মৃত্যু হয় ম্যালেরিয়া বা ওই জাতীয় কোনও জ্বরে।
মৃত্যুর আগেকার একটি দৃশ্যে দেখি, আলেকজান্ডার জ্বরের ঘোরে বিছানায় শুয়ে ছটফট করছেন। নৌসেনাপতি নিয়ার্চাস শয্যার পাশে বসে প্রভুর মনকে প্রফুল্ল করবার জন্যে নানা সমুদ্রের ও দেশ-বিদেশের গল্প শোনাচ্ছেন— কিন্তু বৃথা! আলেকজান্ডার প্রলাপ বকতে আরম্ভ করলেন।
মাঝে মাঝে প্রলাপ থামে। রোগীর জ্ঞান হয়।
এমনি একসময়ে জিজ্ঞাসা করা হল, 'আপনার সন্তান নেই। সাম্রাজ্যের ভার কাকে দিয়ে যাবেন?'
আলেকজান্ডার উত্তর দিলেন, 'সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে।'
তারপর দেখি, দিগবিজয়ী বীর শয্যায় স্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছেন। তাঁর বাঁচবার আশা নেই, কথা কইবারও শক্তি নেই। তাঁর বহু অভিযানের সেনাপতিরা ঘরের ভিতরে ঢুকছেন একে একে। আবেগ ভরে একবার করে তাঁর হাত চেপে ধরছেন, একবার তাঁর চোখে চোখ রেখে দৃষ্টিবিনিময় করছেন, তারপর আবার যাচ্ছেন বিষণ্ণ মুখে বাইরে বেরিয়ে।
...প্রাচীন ব্যাবিলনের প্রান্তরে সূর্য নামল অস্তাচলে— সঙ্গে সঙ্গে আলেকজান্ডারেরও জীবন-সূর্য হল অস্তমিত (খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দের ১৩ জুন তারিখে)। তেরো বৎসর আগে তিনি ম্যাসিডন ত্যাগ করে বেরিয়েছিলেন পৃথিবী জয়ের অভিযানে। তারপর তিনি আর স্বদেশে ফেরেননি এবং দেশে ফেরবার জন্যে কখনো যে কাতর হয়েছিলেন এমন কোনও প্রমাণও নেই। হয়তো তাঁর মতন মহামানুষের পক্ষে সমস্ত পৃথিবীই ছিল স্বদেশ।
মাত্র তেত্রিশ বৎসর বয়সে আলেকজান্ডারের মৃত্যু হয়।
অনেকদিন পরেকার কথা। গ্রিস তখন পতিত; রোম তখন উন্নতির উচ্চশিখরে। রোমের জুলিয়াস সিজারের বয়স তখন তেত্রিশ!
একদিন সিজার বসে বসে একখানি বই পড়ছেন। বইখানি হচ্ছে দিগবিজয়ী আলেকজান্ডারের জীবনচরিত।
হঠাৎ দেখা গেল, সিজার বইখানি মুড়ে দেখে কাতরভাবে কেঁদে ফেললেন।
জিজ্ঞাসা করা হল, 'আপনি কাঁদছেন কেন?'
সিজার বললেন, 'তেত্রিশ বৎসর বয়সে আলেকজান্ডার যা কিছু করবার, সব করে ফেলেছেন। আমি কিন্তু আজ পর্যন্ত কিছুই করতে পারিনি। তেত্রিশ বৎসর নয়, তেরো বৎসর। আলেকজান্ডার যা কিছু করবার, তেরো বছরের ভিতরেই করেছিলেন।'
আমরা মাঝে মাঝে আলেকজান্ডারের চরিত্রের রহস্য ব্যাখ্যা করে বোঝবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ব্যাখ্যার দ্বারা এমন মানুষকে ঠিকভাবে বোঝানো অসম্ভব।
অমর দার্শনিক অ্যারিস্টটল, শিষ্য আলেকজান্ডারকে দিয়েছিলেন দর্শনশাস্ত্রের শিক্ষা। কিন্তু দার্শনিক শিক্ষার পরিণাম কি যুদ্ধক্ষেত্রে দিগবিজয়? আলেকজান্ডারের কীর্তির কথা শুনে সে যুগে অ্যারিস্টটলের চেয়ে অবাক বোধহয় আর কেউ হননি। তিনি বুঝতে পারেননি নিজের শিষ্যকেও।
আলেকজান্ডার যখন বালক, তখন ফিলিপের রাজসভায় এসেছিলেন এক পারসি রাজদূত।
কী দেখে জানি না, সেই সময়ে তিনি ভবিষ্যদবাণী করেছিলেন, 'রাজা ফিলিপের চাতুর্যের কথা সকলেই জানে। কিন্তু আলেকজান্ডারের প্রতিভা তাঁর পিতার চাতুর্যকেও নিষ্প্রভ করে দেবে।'
কিন্তু ওই পারসি রাজদূতও কি আলেকজান্ডারকে বুঝতে পেরেছিলেন?
এবং আলেকজান্ডার নিজেও কি নিজেকে বুঝতে পেরেছিলেন?
এইটেই হচ্ছে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন