অতুল্য শ্রুতিধর

হেমেন্দ্রকুমার রায়

তেরোশো বাষট্টি সালের ফাল্গুন মাসের 'মৌচাক'-এ 'অদ্ভুত স্মৃতিশক্তি'র কয়েকটি বিচিত্র কাহিনি প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আমি এখানে এমন একজন অসাধারণ লোকের কথা বলব, যাকে স্মৃতির অতুলনীয় বরপুত্র বলে বর্ণনা করা চলে।

এবং তিনি কেবল মনীষী ও স্মৃতিধরই ছিলেন না, কূট চালেও ছিলেন অদ্বিতীয়। আবার একাধারে জ্ঞানী ও ফুর্তিবাজ। তাঁর মতন লোকের কথা গল্পেও শোনা যায় না। সাধারণ লোকে তাঁকে বাজিকর বলে মনে করত এবং তাঁর মজার বাজি উপভোগ করবার জন্যে দরাজ হাতে ঢেলে দিত কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগেকার কথা।

তাঁর নাম পিয়ের লিউটেক জাতে তিনি ফরাসি। দুনিয়ার যাবতীয় জ্ঞান ছিল তাঁর নখদর্পণে,তিনি ছিলেন মূর্তিমান, জীবন্ত 'এনসাইক্লোপিডিয়া' বা বিদ্যাকল্পদ্রুম।

দর্শন, বিজ্ঞান, রসায়ন, ভূগোল, গণিত, ভৈষজ্য, ইতিহাস, সাহিত্য, সংগীত ও পরিসংখ্যান প্রভৃতি সংক্রান্ত যে-কোনও প্রশ্ন করলেই সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারতেন তিনি মুখে মুখে! এমনকী গুপ্ত তথ্যও তাঁর কাছে ছিল না অজানা!

কিন্তু বিদ্যাধন বিতরণ করতেন না তিনি বিনা দক্ষিণায়। এদিকেও তাঁর জ্ঞান ছিল দস্তুরমতো টনটনে। 'ফেলো কড়ি, মাখো তেল!' এই ছিল তাঁর মূল্যমন্ত্র। তিনি এক-একটি থিয়েটার ভাড়া নিতেন। যারা তাঁকে প্রশ্ন করতে চাইত, তাদের টিকিট কিনে থিয়েটারে প্রবেশ করতে হত। তারপর প্রেক্ষাগৃহ থেকে তাঁর ওপরে প্রশ্নবৃষ্টি হলেই মঞ্চের ওপরে দাঁড়িয়ে তিনি করতে উত্তরবৃষ্টি!

ঘটনাস্থলে স্বয়ং বা সদলবলে উপস্থিত হয়ে লিউটেককে পরীক্ষা করবার জন্যে অসংখ্য লোক সাগ্রহে টিকিট ক্রয় করত। প্রেক্ষাগৃহে প্রায়ই তিলধারণের ঠাঁই থাকত না। এইভাবে নিজের অর্জিত বিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে লিউটেকের পকেট বিলক্ষণ ভারী হয়ে উঠত।

কিন্তু নিন্দুক ও সন্দিগ্ধ লোকেরও অভাব হল না। তারা চারিদিকে রটাতে লাগল, লিউটেক হচ্ছেন ঠগ ও ধাপ্পাবাজ। তিনি সাধারণ 'ম্যাজিশিয়ান'দের পদ্ধতি অবলম্বন করেন। অর্থাৎ তাঁর দুষ্কর্মের সহকারীরা প্রেক্ষাগৃহে বসে পূর্ব হতে স্থিরীকৃত প্রশ্ন করে এবং তাদের আরও অনেকে গোপনে জনসাধারণের সঙ্গে মিশে প্রশ্নকর্তাদের মনের কথা জেনে নিয়ে কোনও উপায়ে লিউটেককে আগে থাকতে জানিয়ে দেয়।

লিউটেক বললেন, মিথ্যা কথা, রাবিশ! আমি যে জাদুকর নই, পণ্ডিতরা আমাকে পরীক্ষা করলেই জানতে পারবেন। যে-কোনওদিন আমি পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত।

পণ্ডিতদেরও টনক নড়ল। তাঁরা বললেন, 'তথাস্তু!'

নানা শ্রেণির বড়ো বড়ো মাথাওয়ালা ডাকসাইটে মহাপণ্ডিতদের নিয়ে এক সম্মিলনের আয়োজন করা হল। নম্বর-মারা আমন্ত্রণপত্র না দেখালে সেখানে অন্য কারোর উপস্থিতি অসম্ভব। তার উপরে চারিদিকের কড়া পাহারা ভেদ করে সেখানে বাইরের একটা মাছি পর্যন্ত ঢুকতে পারবে না।

লিউটেক গিয়ে পড়লেন রীতিমতো শত্রুব্যূহের মধ্যে। কিন্তু নির্ভীক তাঁর হাবভাব। এক-এক বিভাগে বিশেষজ্ঞ নামজাদা পণ্ডিতরা চারিদিক থেকে তাঁর উপরে অভ্রান্তভাবে প্রশ্নবাণ বর্ষণ করতে লাগলেন, কিন্তু কেউই লিউটেককে কাবু করতে পারলেন না, তিনি দিতে লাগলেন প্রত্যেক প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর! এইভাবে কেটে গেল সুদীর্ঘ তিন ঘণ্টাকাল এবং পরিণামে জয়ী হলেন লিউটেকই! পণ্ডিতমহলে একবাক্যে স্বীকৃত হল—লিউটেক যে সত্যিকার পণ্ডিতাগ্রগণ্য ও অসাধারণ মানুষ সে সম্বন্ধে কোনোই সন্দেহ নেই।

খবরের কাগজে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল এই খবর। অধিকতর বেড়ে উঠল লিউটেকের খ্যাতি ও প্রতিপত্তি। অধিকতর জনসমাগম হতে লাগল লিউটেকের ভাড়া-নেওয়া থিয়েটারে। এবং অধিকতর ধনাগম হতে লাগল লিউটেকের লোহার সিন্দুকে।

কিন্তু লিউটেকের লোহার সিন্দুক ঘন ঘন পূর্ণ হয়েও ঘন ঘন খালি হয়ে যায়। ব্যাপারটা আর কিছুই নয়, লিউটেক লোকটা ছিলেন আবুহোসেনের মতো—আজ বাদশা, কাল ফকির! তাঁর আয়-ব্যয় দুইই ছিল বিস্ময়কর।

তিনি থাকতে চাইতেন রাজার হালে। বাড়িতে তাঁর আমোদ-প্রমোদ, হইহুল্লোড়, পান-ভোজন, অতিথিঅ্যাপায়ন, নাচগান আর যতরকম বিলাসব্যসন লেগেই আছে। এত যে রোজগার, তবু ডান হাতে এনে বাম হাতে কুলোয় না। আসে এক হাজার তো খরচ হয় দুই হাজার। বন্ধুবান্ধবীরা পায় হিরা-মুক্তার ভেট! অর্থাভাব হলে ধারে চলে কারবার। আসলে লিউটেককে পণ্ডিতমূর্খ বললেও অন্যায় হবে না।

দিনে দিনে ঋণের পরিমাণ অসামান্য হয়ে ওঠে। বাড়ির দরজায় পাওনাদারদের জনতা। থিয়েটারে চিৎকারে এমন প্রশ্নও উঠতে লাগল—'ওহে লিউটেক, কোন তারিখে তুমি দরজির দেনা শোধ করবে?'

মহা জ্বালাতন হয়ে লিউটেক অবশেষে তাঁর পাওনাদারদের ডেকে বললেন, 'তোমরা আর কিছুদিন অপেক্ষা করো। টাকা রোজগারের জন্য আমি ইয়োরোপ সফরে বেরুব। তারপর ফিরে এসে প্রত্যেকের পাওয়া চুকিয়ে দেব।'

লিউটেকের বিস্ময়কর জ্ঞানের পরিধির কাহিনি তখন ইয়োরোপের দেশে দেশে রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল। দেশে দেশে যে শহরে তিনি যান, তাঁকে দেখবার জন্যে থিয়েটারের টিকিটঘরে বিপুল জনতা ভেঙে পড়ে। এবং প্রত্যেক দেশের অগ্রগণ্য পণ্ডিতসভায় হাজিরা দিয়ে তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আসেন।

এবং তাঁর পাওনাদাররা দেশে বসেই, কানাঘুষায় খবর পায়, প্রবাসে গিয়েও লিউটেক নিজের নবাবি চাল বজায় রেখেছেন—অর্থাৎ তাঁর যত্র আয় তত্র ব্যয়! প্রাপ্য টাকা ফিরে পাবার আশায় তারা জলাঞ্জলি দিলে!

কিন্তু কী আশ্চর্য! সুদীর্ঘ দুই বৎসর পরে দেশে এসে লিউটেক প্রত্যেকের পাওনা দিলেন কড়ায়-গন্ডায় চুকিয়ে!

পাওনাদাররা অবাক বিস্ময়ে ভাবতে লাগল, এমন অসম্ভব কেমন করে সম্ভবপর হল?

আবার দিন যায়। আবার লিউটেক টাকা পান এবং টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলেন, দামি দামি পোশাক-পরিচ্ছদ পরেন, বড়ো বড়ো হোটেলে গিয়ে বন্ধুবান্ধবীদের ভোজ দেন এবং অভাব হলে ধার করে শখ মেটান!

বলা বাহুল্য, আবার অসহনীয় হয়ে উঠল পাওনাদারদের তাগাদা। লিউটেক আবার বিদেশে সফর করতে বেরিয়ে পড়লেন এবং দুই বৎসর ধরে নানা দেশে টাকার সঙ্গে মজা লুঠে আবার দেশে এসে মহাজনদের দেনা মিটিয়ে দিলেন।

আবার বিস্মিত উত্তমর্ণরা ভাবতে লাগল, কেমন করে সম্ভবপর হয় এমন অসম্ভব? বিদেশেও দুই হাতে টাকা উড়িয়ে কেমন করে তিনি শোধ করেন তাদের টাকা?

তারপর বুকের অসুখে লিউটেক মারা পড়লেন অকস্মাৎ। তখন জানা গেল, কেমন করে তিনি অসম্ভবকেও করেছিলেন সম্ভবপর! সে-ও এক অদ্ভুত রহস্য!

লিউটেকের মৃত্যুর পর বিভিন্ন পাশ্চাত্য দেশের পঁচাত্তরটি বিজ্ঞানসভার প্রতিনিধিরা প্যারিসে এসে সমবেত হলেন।

ও দেশে একটি প্রথা আছে। যেসব গুণী অনন্যসাধারণ শক্তি বা প্রতিভার অধিকারী, বৈজ্ঞানিকরা উচ্চমূল্যে তাঁদের মস্তিষ্ক ক্রয় করতে নারাজ হন না। গুণীর মৃত্যুর পর বৈজ্ঞানিকরা তাঁর মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে দেখতে চান, তাঁর অসাধারণতার কারণ কী?

পঁচাত্তরটি বিজ্ঞানসভার প্রতিনিধি প্যারিসে এসে লিউটেকের মস্তিষ্কের উপরে দাবি জানিয়ে বসলেন। তখন প্রকাশ পেলে, লিউটেক সকলের অজ্ঞাতসারে বিভিন্ন সময়ে পঁচাত্তর জায়গায় প্রচুর অর্থের বিনিময়ে নিজের মস্তিষ্ক বারংবার বিক্রয় করে গিয়েছেন!

অতএব বোঝা যাচ্ছে, লিউটেক যত বড়ো জ্ঞানী ও গুণী হোন, সাধারণ মানুষ হিসাবে তিনি ঠিক সাচ্চা ছিলেন না।

মৌচাক জুন ১৯৫৬

সকল অধ্যায়
১.
ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতে
২.
ভগবানের চাবুক
৩.
মহাভারতের শেষ মহাবীর
৪.
হন্তারক নরদানব
৫.
রক্ত বাদল ঝরে
৬.
আলেকজান্ডার দি গ্রেট
৭.
দিগবিজয়ী নেপোলিয়ন
৮.
পঞ্চনদের তীরে
৯.
উপন্যাসের চেয়ে আশ্চর্য
১০.
সত্যিকার অ্যাডভেঞ্চার
১১.
সাত হাজারের আত্মদান
১২.
মরা মানিক আর জ্যান্ত মানিক
১৩.
ভারতের একমাত্র সুলতানা
১৪.
সূর্য দেবী, পর্মল দেবী
১৫.
মারাঠার লিওনিডাস
১৬.
মুসলমানের জহরব্রত
১৭.
মৃগনয়না মহিষমর্দিনী
১৮.
ব্যাঘ্রভূমির বঙ্গবীর
১৯.
অনামা বীরাঙ্গনা
২০.
ভারতের থার্মোপলি
২১.
সিরাজের বিজয় অভিযান
২২.
ছত্রপতির অ্যাডভেঞ্চার
২৩.
ইতিহাসের রক্তাক্ত দৃশ্য
২৪.
মহাভারতের মহারথ
২৫.
'বীরাঙ্গনা, পরাক্রমে ভীমা-সমা'
২৬.
রক্ত পাথারের সাঁতারু
২৭.
ছত্রপতির ছত্রভঙ্গ
২৮.
তিন সম্রাটের ত্র্যহস্পর্শ-যোগ
২৯.
আলেকজান্ডারের পলায়ন
৩০.
ওষ্ঠাধরে রাজদণ্ড
৩১.
ইতিহাস আশ্রিত রচনা
৩২.
এ যুগের সবচেয়ে বড়ো ডাকাত
৩৩.
আধুনিক রবিনহুড
৩৪.
ইয়াঙ্কি খোকা-গুণ্ডা
৩৫.
গুপ্ত কবির কদলী-কবিতা
৩৬.
ভাঙা অমিত্রাক্ষরের স্রষ্টা কে?
৩৭.
নূতন বাংলার প্রথম কবি
৩৮.
বুদ্ধদেব
৩৯.
বাংলাদেশে বোম্বেটেরাজ
৪০.
ঋষি টলষ্টয়
৪১.
দুই ঠাকুরের কাহিনি
৪২.
আশ্চর্য মূর্খ পণ্ডিত
৪৩.
অতুল্য শ্রুতিধর
৪৪.
বর্গি এল দেশে
৪৫.
প্রথম বাঙালি সম্রাট
৪৬.
জগন্নাথদেবের গুপ্তকথা
৪৭.
মরণ বিজয়ীর দল
৪৮.
সত্যিকার দানব-দানবী
৪৯.
প্যারিসের কুব্জ-রাজা
৫০.
ফরাসি বিপ্লবে বাঙালির ছেলে
৫১.
বিখ্যাত চোরের অ্যাডভেঞ্চার
৫২.
টেলিফোনে গোয়েন্দাগিরি
৫৩.
প্যারির বালক-বিভীষিকা
৫৪.
পৃথিবীর প্রথম গোয়েন্দা কাহিনি
৫৫.
শিবদাস ভাদুড়ি
৫৬.
সেকালের সপ্ত আশ্চর্য

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%