হেমেন্দ্রকুমার রায়

তখনও শিবাজি হননি ছত্রপতি। কিন্তু মহারাষ্ট্রের জাতীয় জীবনে এনেছেন তিনি নবজাগরণ, শুনিয়েছেন তিনি শাক্তের দীপক রাগ, দেখিয়েছেন তিনি স্বরাজের সফল স্বপ্ন!
বিপুল বিজাপুরি-বাহিনী সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত, প্রবীণ সেনাপতি আফজল খাঁ 'বাঘনখে' নিহত, শত্রুদের পঁয়ষট্টিটি হস্তী, চার হাজার অশ্ব, এক হাজার দুইশত উষ্ট্র, দুই হাজার বস্তা সাজপোশাক ও নগদ দশ লক্ষ টাকা মারাঠিদের হস্তগত।
পাঁচশত বৎসরের মধ্যে পরাধীন ভারতে হিন্দু-বীরের কণ্ঠে শোনা যায়নি স্বাধীনতার এমন উদাত্ত সংগীত। তাই দিকে দিকে হচ্ছে শিবাজির নামে গৌরবময় মহাপুরুষার্চনা।
পল্লিতে পল্লিতে ভাট-কবিরা রচনা করেছেন গাথার পর গাথা, বাদ্যের সঙ্গে সংগত করে সেইসব বীরসংগীত শুনিয়ে বেড়ান তাঁরা আবালবৃদ্ধবনিতাকে। কবিরা সাদর আমন্ত্রণ লাভ করেন— শিবিরবাসী সশস্ত্র সৈনিকদের এবং গৃহবাসী গৃহস্থদের এবং হলধারী কৃষাণদের কাছ থেকে।
যারা যুদ্ধ করে এবং যারা যুদ্ধ করে না, তাদের সকলেরই মুখে এক বাণী: এসো কবি, গান গাও। শোনাও আমাদের সেইসব হিন্দু-বীরের দুঃসাহসিক অভিযানকাহিনি, যারা প্রাণ দেয়, কিন্তু মান দেয় না, যারা মাথা দেয়, কিন্তু ধর্ম দেয় না, যারা ছাতি দেয়, কিন্তু জাতি দেয় না।
শিবাজি তখন ছত্রপতি উপাধি ধারণ না করেও হিন্দু-ভারতের মানসপুত্র।
কিন্তু, জীবনপ্রভাতেই হয় বুঝি জীবনসন্ধ্যার সূচনা।
আকাশে দেখা দিয়েছে কালো মেঘ— একখানা নয়, দুইখানা। দুইদিক থেকে দুইখানা কালো মেঘ— ঝঞ্ঝাবর্তের অগ্রদূত।
দক্ষিণের রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত হয়েছেন— শায়েস্তা খাঁ। বৃহতী-বাহিনী নিয়ে তিনি ঔরঙ্গজেবের আদেশে, শিবাজিকে দমন করতে এসেছেন।
আফজল খাঁ-র শোচনীয় পরাজয় ও মৃত্যুর পরেও বিজাপুরের সুলতান দ্বিতীয় আদিল শাহ, অস্ত্র কোষবদ্ধ করলেন না। শিবাজির গর্ব খর্ব করবার জন্যে তিনি প্রেরণ করলেন নূতন সৈন্য ও নূতন সেনাপতি।
এই নূতন সেনাপতি ফজল খাঁ হচ্ছেন নিহত আফজল খাঁয়ের পুত্র। তাঁর মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেবার জন্যে।
দুইদিক থেকে দুই প্রবল পরাক্রান্ত ও সংখ্যাগরিষ্ঠ শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ করবার জন্যে, শিবাজিকে নিজের নাতিবৃহৎ সেনাদলকে দুই ভাগে বিভক্ত করতে হবে। সুতরাং মারাঠিদের শক্তি হয়ে পড়বে যথেষ্ট দুর্বল। সকলেই একথা বুঝলে এবং শিবাজিও বুঝলেন। কিন্তু উপায় নেই, শত্রুকে প্রাণপণে বাধা দিতে হবেই। জীবন থাকতে, পরাজয় বরণ করা নয়।
আফজল খাঁ-কে পরলোকে প্রেরণ করে, শিবাজি বিজাপুরিদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন সুবৃহৎ পানহালা দুর্গ। পনেরো হাজার সৈন্য নিয়ে ফজল খাঁ ও সিদ্দি জহর সেই দুর্গ অবরোধ করে বসলেন।
শিবাজির অধীনে ছিল মাত্র পাঁচ কি ছয় হাজার সৈন্য। তা-ই নিয়েই মাঝে মাঝে তিনি অতর্কিতে দুর্গ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে এমন প্রচণ্ডভাবে বিজাপুরিদের আক্রমণ করতে লাগলেন যে, ফৌজদার ফজল খাঁ, দুর্গাবরোধ ত্যাগ করলেন না বটে, কিন্তু দুর্গ থেকে খানিক তফাতে, নিরাপদ ব্যবধানে ফৌজ সরিয়ে নিয়ে গিয়ে শিবির সন্নিবেশ করলেন।
কাছেই শিবাজির আর-একটি দুর্গ— পবনগড়। ফজল খাঁ-র নজর পড়ল তার উপরে। নিকটস্থ একটি পাহাড়ের টঙে কয়েকটা কামান তুলে নিয়ে তিনি পবনগড়ের মধ্যে মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ করতে লাগলেন।
পবনগড়ের দুর্গরক্ষক অতিষ্ঠ হয়ে শিবাজিকে জানালেন, অবিলম্বে সৈন্যসাহায্য না পেলে তিনি আর দুর্গরক্ষা করতে পারবেন না।
শিবাজি বুঝলেন, অবস্থা বড়ো সঙ্গিন। পবনগড়ের পতন হলে, পানহালা দুর্গের দুর্গতির সীমা থাকবে না। দীর্ঘকাল সেখানে অবরুদ্ধ থাকলে, মারাঠি সৈন্যরা অনাহারের কবলে পড়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে।
কৃষ্ণপক্ষের এক অন্ধ রাত্রি।
কতক সৈন্য নিয়ে শিবাজি দুর্গের ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। যাবার সময়ে বলে গেলেন, 'ফজল খাঁ, ফাঁদ পাতছে, সেই ফাঁদে আমি ইঁদুরের মতো ধরা পড়তে চাই না। তোমরা কেল্লার ভিতরে রইলে, যতদিন পারো, প্রাণপণে শত্রুদের বাধা দিয়ো।'
আবার অতর্কিতে আক্রমণ! পবনগড়ের পরিখার মধ্যে শুরু হল বিজাপুরিদের সঙ্গে মারাঠিদের হাতাহাতি লড়াই। বিজাপুরিরা, শিবাজির আসল উদ্দেশ্য আন্দাজ করতে পারলে না এবং সেই ফাঁকে শিবাজি কতক সৈন্য নিয়ে গোপনে সরে পড়লেন।
তিনি যাত্রা করলেন বিশালগড়ের দিকে। বিশালগড় সেখান থেকে, সাতাশ মাইল দূরে।
খানিক পরেই ফজল খাঁ-র কানে উঠল শিবাজির পলায়নের কথা। চারিদিকে ঘন বনজঙ্গল, পাহাড়, নদীনালা, বন্ধুর প্রান্তর— তারই উপরে কৃষ্ণপক্ষের নিশীথিনী বিছিয়ে দিয়েছে তার তিমির-শাড়ির কালো অঞ্চল।
কিন্তু ফজল খাঁ, রাত্রির অন্ধকার ও দুর্গম পথকে ধর্তব্যের মধ্যেই গণ্য করলেন না। যেমন করেই হোক দুষ্ট শিবাজি—শিবাকে বন্দি বা হত্যা করতেই হবে। সেনাপতির আদেশে দলে দলে বিজাপুরি ছুটে চলল পলাতক মারাঠিদের পিছনে পিছনে— তাদের এক হাতে শানিত কৃপাণ, আর-এক হাতে জ্বলন্ত মশাল।
মাইলের পর মাইল যায়, তবু বিজাপুরিরা নাছোড়বান্দা ছিনেজোঁকের মতো। পিছনে তাকালেই চোখে পড়ে— বনে বনে, মাঠে-বাটে অসংখ্য অগ্নিশিখা নাচিয়ে, কাতারে কাতারে শত্রু-সৈন্য ধেয়ে আসছে, উল্কামুখী দুর্বার বন্যাধারার মতো।
পূর্বাচলে হল সমুজ্জ্বল অরুণোদয়। অন্ধকার ভেসে গেল আলোকের প্রপাতে। মারাঠিরা এসে পড়েছে গজপুর নামক স্থানে। তখনও আট মাইল দূরে বিশালগড়।
এখনও বিজাপুরিরা পিছু ছাড়েনি, আর তাদের ঠেকিয়ে রাখা অসম্ভব। কিন্তু শিবাজি যেন দেখতে পেলেন তাঁর আরাধ্য দেবী ভবানীর প্রসন্ন দৃষ্টি।
সেইখানে একমাত্র পথ পরিণত হয়েছে, অতি সংকীর্ণ গিরিবর্ত্মে। সেখানে মরিয়া হয়ে ফিরে দাঁড়ালে, কয়েকশত লোক বাধা দিতে পারে কয়েক হাজার শত্রুকে, অনেকক্ষণ ধরে।
শিবাজি শুধোলেন, 'আমাদের মধ্যে কে আছ এমন সাহসী, জনাকয় লোক নিয়ে এইখানে দাঁড়িয়ে যে অগণ্য শত্রু-সৈন্যকে বাধা দিতে পারবে কিছুক্ষণের জন্যে?'
বাজি প্রভু এগিয়ে এসে বললেন, 'আমি আপনার আজ্ঞা পালন করব।'
শিবাজি বললেন, 'উত্তম। আমার অর্ধেক সৈন্য নিয়ে শত্রুদের বাধা দাও। বাকি লোকদের নিয়ে আমি চললুম বিশালগড়ের দিকে। সেখানে গিয়ে, তোপ দেগে আমি সংকেতধ্বনি করলেই তোমরা বুঝে নেবে, আমরা নিরাপদ হয়েছি।'
এ হচ্ছে ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা।
খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ শতকে পারসিরা যখন গ্রিস আক্রমণ করেছিল, তখন থার্মোপলি গিরিসংকটের মুখে এক-হাজার সৈন্য নিয়ে দাঁড়িয়ে রাজা লিওনিডাস, বিপুল পারসি বাহিনীকে বহুক্ষণ বাধা দিয়ে, একেএকে করেছিলেন মৃত্যুবরণ। আজ পর্যন্ত অমর হয়ে আছে তাঁর বীরত্বের অবদান।
বাজি প্রভুর সঙ্গে কত সৈন্য ছিল? অনুমানে বলা যায়, এক হাজারের বেশি নয়। সংখ্যায় বিজাপুরিদের তুলনায় তারা নগণ্য ছিল বললেও অত্যুক্তি হবে না। তা সত্ত্বেও বাজি প্রভু অটল-পদে দাঁড়িয়ে যেভাবে নিজের কর্তব্য পালন করেছিলেন, সে কাহিনি চিরস্মরণীয় হওয়া উচিত। একই পর্যায়ে পড়ে থার্মোপলি ও গজপুরের যুদ্ধ।
সেই অতি সংকীর্ণ গিরিবর্ত্মের মধ্যে বিজাপুরি সৈন্যদল ভেঙে পড়তে লাগল, ভৈরব হুংকারে বারংবার। যেন ক্রুদ্ধ তরঙ্গের পর তরঙ্গ, বেগে ছুটে আসে সামনের দিকে, গিরিবর্ত্মের মুখে আছড়ে পড়ে প্রচণ্ড আক্রোশে, তারপর আর অগ্রসর হতে না পেরে, বিফল হয়ে আবার ফিরে যায় পিছনদিকে।
তারপর আবার ছুটে আসে, আবার হটে যায়, আবার এগোয়, আবার পিছোয়। সুচের ক্ষুদ্র ছিদ্রের মধ্যে, জাহাজের কাছি প্রবেশ করবার পথ পায় না। এক বাধা, ছিদ্রের সংকীর্ণতা; আর- এক বাধা, মারাঠি বীরদের তীক্ষ্ন তরবারি।
বর্ত্মের মুখে ক্রমেই পুঞ্জীভূত হয়ে উঠতে লাগল বিজাপুরিদের মৃতদেহ। মুণ্ডহীন দেহ, দেহহীন মুণ্ড, কর্তিত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।
কেবল বিজাপুরিরা নয়, মারাঠি বীররাও প্রাণ দিতে লাগল একে একে। গিরিবর্ত্মের মধ্য দিয়ে হিন্দু-মুসলমানের শোণিত একসঙ্গে মিশে সৃষ্টি করলে এক বিভীষণা রক্তনদী। যোদ্ধাদের তীব্র হুংকার, আহতদের আর্ত-চিৎকার, খড়্গে খড়্গে অশ্রান্ত ঝনৎকার।
উদয়াচলে— প্রভাতসূর্যের দীপ্ত দৃষ্টি দেখেছিল এই যুদ্ধের আরম্ভ। মধ্যগগনে বিরাজ করে সূর্য এখনও দেখছে, প্রতপ্ত রণক্ষেত্রে যুযুধানদের হাজার হাজার চঞ্চল তরবারির ফলকে ফলকে ঝকমকিয়ে উঠছে চোখ-ধাঁধানো কিরণবিদ্যুন্মালা।
উভয় পক্ষই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ফজল খাঁ পিতৃহত্যাকারীকে পলায়ন করতে দেবেন না এবং বাজি প্রভুও দেবেন না, জাতির অগ্রনেতার মান ও প্রাণ রক্ষার জন্যে, কোনও শত্রুকেই পদার্পণ করতে এই গিরিবর্ত্মে।
একে একে কেটে গেল পাঁচ ঘণ্টা।
কিন্তু বীরত্ব ও সহ্যশক্তিরও একটা সীমানা আছে। এর মধ্যেই শত্রুসংহার করতে করতে সাতশত মারাঠি বীর আপন আপন জীবন দান করেছে। মারাঠিরা মুষ্টিমেয়, কিন্তু বিজাপুরিরা এখনও গণনাতীত।
বাজি প্রভু রক্তাক্ত দেহে অস্ত্রচালনা করতে করতে উৎকর্ণ হয়ে আছেন— কখনও শোনা যাবে শিবাজির সংকেতধ্বনি?
অবশেষে সাংঘাতিক রূপে আহত হয়ে বীর বাজি প্রভুও শয়ন করলেন ধরাতলে— বুঝি কর্তব্য পালন করবার আগেই তাঁকে ত্যাগ করতে হবে চরম নিশ্বাস। এ, বীরের মৃত্যু বটে, কিন্তু হায়, এ মরণে সুখ কোথায়?
বাজি প্রভুর স্তিমিত দৃষ্টির সামনে ঘনিয়ে উঠছে যখন মৃত্যুকালীন অন্ধকার, তখন আচম্বিতে তাঁর শ্রবণে জাগল বিশালগড়ের সাংকেতিক কামাননির্ঘোষ।
উদযাপিত ব্রত। শিবাজি নিরাপদ! অন্তিম আনন্দে পুলকিত হয়ে উঠল বাজি প্রভুর সর্বাঙ্গ।
তপোবন, শরৎ সাহিত্য ভবন, ১৯৫২

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন