হেমেন্দ্রকুমার রায়

প্রথম পরিচ্ছেদ। বোম্বেটে না বর্বর
বোম্বেটে কাকে বলে সবাই তা জানে। বোম্বেটে বা জলদস্যু পৃথিবীর সব দেশেই সব সময়ে ছিল। এখনও আছে।
তবে বোম্বেটে-জীবনের গৌরবময় যুগ আর নেই। আগেকার বোম্বেটের ক্ষমতা ছিল অবাধ ও খ্যাতি ছিল আশ্চর্য, এখনকার বোম্বেটেরা তাদের কাছে হচ্ছে তিমি মাছের কাছে পুঁটি মাছের মতো।
উড়োজাহাজ, বাষ্পীয় পোত ও বেতার টেলিগ্রাফের মহিমায় আজ আর কোনও বোম্বেটেই বেশি মাথা তুলতে বা বেশি দিন কোথাও গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে পারে না। চীনে বোম্বেটেরা আজও মাঝে মাঝে মাথা চাগাড় দেয় বটে, কিন্তু তাদের জারিজুরি ওই চীনা সমুদ্রের ভিতরেই। চীন দেশের ভিতরকার অবস্থা ভালো নয়, রাজ্য বিপ্লব নিয়েই সেখানকার গভর্নমেন্ট ব্যতিব্যস্ত, সেইজন্যেই চীনে বোম্বেটেরা মাঝে মাঝে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করবার সুযোগ পায়।
অন্যান্য দেশের আধুনিক বোম্বেটেরা উল্লেখযোগ্য জীব নয়। তারা আছে— এইমাত্র। বাংলা দেশে 'বোম্বেটে' কথাটি বেশি দিনের নয়। বারোভুঁইয়ার সময়ে বাংলা দেশে পোর্তুগিজ জলদস্যুদের বিষম উপদ্রব হয়েছিল। তখনকার রডা, গঞ্জালিস ও কার্ভালো প্রভৃতি জলদস্যুর নাম বাঙালি এখনও ভুলতে পারেনি, কারণ বর্গির অত্যাচার ও মগের অত্যাচারের মতো পোর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচারও ছিল তখনকার বাংলা দেশের নিত্যনৈমিত্তিক বিভীষিকা। ওই সময়েই 'বোম্বেটে' কথাটি বাংলাদেশে চলতে শুরু হয়। ইংরেজি Bombasdies-এর বাংলা হচ্ছে 'গোলন্দাজ সৈন্য'। পোর্তুগিজ জলদস্যুরা গোলন্দাজিতে অর্থাৎ কামান-বন্দুকের ব্যবহারে দক্ষ ছিল। তাই বোধহয়, ওই ইংরেজি কথাটা থেকে বাংলা 'বোম্বেটিয়া' বা 'বোম্বেটে' কথাটির সৃষ্টি হয়, আর সাধারণভাবে জলদস্যুদেরই প্রতি ব্যবহৃত হতে থাকে।
'বোম্বেটে' কথাটি খাঁটি বাংলা কথা না হলেও খাঁটি বাঙালি বোম্বেটের অভাব বাংলা দেশে ছিল না। তবে এখানে তো সমুদ্রতীরবর্তী নগর বেশি নেই, কাজেই বোম্বেটেদের ছোটো ছোটো নৌকা করে নদ-নদীর ভিতরে এসেই ব্যাবসা চালাতে হত। বড়ো বড়ো জাহাজে চড়ে পৃথিবীর নামজাদা বোম্বেটেদের মতো সমুদ্রের উপর বড়ো রকমের ডাকাতি করার সুযোগ তাদের বেশি ছিল না।
সেকেলে বাংলার জল-ডাকাতদের সাধারণ নিয়ম ছিল এইরকম : কোনও যাত্রী নৌকা দেখলেই তারা নিজেদের নৌকা নিয়ে তার কাছে গিয়ে বলত, 'আমাদের আগুন নিভে গেছে। একটু আগুন দেবে ভায়া?' যাত্রী নৌকার লোকেরা কোনওরকম সন্দেহ না করে আগুন দেওয়ার জন্যে বোম্বেটে নৌকার পাশে গিয়ে হাজির হত এবং অমনি সেই সুযোগে বোম্বেটেরা যাত্রী নৌকার ভিতরে লাফিয়ে পড়ে সর্বনাশের সৃষ্টি করত। বারে বারে এমনি ঠকে শেষটা অচেনা নৌকা আগুন চাইলেই তারা তাড়াতাড়ি আরও তফাতে সরে পড়ে পলায়ন করত।
বাংলা দেশে জল-ডাকাতরা প্রায়ই ছিপনৌকা ব্যবহার করত। এখানকার ডাঙার ডাকাতরা তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্যে ব্যবহার করত 'রনপা'। রনপা হচ্ছে দুটো লম্বা বাঁশের ডান্ডা— মানুষের মাথার চেয়ে অনেক উঁচু। সেই ডান্ডার মাঝখানে পা রাখবার জায়গা থাকে। (ইয়োরোপেরও অনেক দেশের চাষিরা শস্যখেতে চলাফেরা করবার সময়ে এমনই রনপা ব্যবহার করে থাকে।) কিন্তু বাংলার ডাঙার ডাকাতরাও জলপথে তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্যে বোম্বেটেদেরই মতো ছিপ ব্যবহার করত।
আইনের চোখে অপরাধী হলেও সামাজিক হিসাবে, আগেকার বোম্বেটেরা বোধহয় সাধারণ খুনি বা ডাকাতের চেয়ে উচ্চশ্রেণির জীব ছিল। কারণ, দেখা যায়, আগেকার এমন কয়েকজন লোক নৌযোদ্ধারূপে বিখ্যাত হয়ে প্রভূত যশ ও রাজসম্মান অর্জন করে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় অমর হয়ে রয়েছেন, যাঁদের বোম্বেটে বললে খুব ভুল করা হয় না।
যেমন ভাস্কো ডা গামা। পোর্তুগালের এই নামজাদা যোদ্ধা-নাবিক পোর্তুগিজ অধিকৃত 'ভারতবর্ষ'-এর বড়োলাটরূপে কোচিতে প্রাণত্যাগ করেন (১৫২৪)। কিন্তু আফ্রিকার স্থানে স্থানে ও ভারতের কালিকটে তিনি যেসব কাজ করে গেছেন, তা বোম্বেটের পক্ষেই সাজে। পোর্তুগালের আর-এক নাবিক নেতা ফার্নান্দ ম্যাগেল্যানও স্বদেশে যথেষ্ট শ্রদ্ধা-প্রীতি লাভ করেছেন, কিন্তু তিনি সাধারণ ইতর বোম্বেটের চেয়ে ভালো লোক ছিলেন না।
ইংল্যান্ডকে স্পেনের 'আর্মাডা'র কবল থেকে বাঁচিয়ে এবং অনেক নতুন নতুন দেশ আবিষ্কার ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করে স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক আজ স্বদেশভক্ত বীর বলে সুপরিচিত। সে হিসাবে সত্য সত্যই তিনি এই সম্মানের অধিকারী। কিন্তু জলদস্যুরা যে কাজ করলে নিন্দিত হয়, তাঁর অনেক অ্যাডভেঞ্চারের মধ্যেই তা লক্ষ করা যায়। ড্রেক একালে জন্মালে, পৃথিবী বোধহয় তাঁকে ক্ষমা করত না। ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে তিনি যথেচ্ছভাবে লুঠতরাজ করেছেন, হাজার হাজার অসহায় মানুষকে হত্যা করেছেন, বড়ো বড়ো শহরকে আগুনের মুখে সমর্পণ করেছেন। সে দেশের লোকের কাছে তিনি নিশ্চয়ই বীর নামে পরিচিত হননি। যুদ্ধের নামগন্ধ নেই, নগর লুণ্ঠনও শেষ হয়ে গেছে, তবু হাইতি দ্বীপের রাজধানী স্যান্টো ডোমিঙ্গো শহরের নিরীহ বাসিন্দাদের উপর ড্রেক অনবরত গুলিগোলা বৃষ্টি করেছেন। নগরের চতুর্দিকে যখন ভীষণ অগ্নির তাণ্ডবলীলা, নিরপরাধ নর-নারী ও শিশুর আর্তনাদে যখন আকাশ-বাতাস পরিপূর্ণ এবং ড্রেকের সৈন্যরা যখন ক্রমাগত গুলিগোলা বৃষ্টি করে একেবারে নেতিয়ে কাবু হয়ে পড়েছে, তখনও লক্ষাধিক মুদ্রা ঘুস না-পাওয়া পর্যন্ত ইংল্যান্ডের এই মহাবীর তুষ্ট হতে পারেননি।
পনেরো, ষোলো ও সতেরো শতাব্দীতে ইংল্যান্ডবাসীরা নৌযোদ্ধা ও বোম্বেটেকে যে প্রায় অভিন্ন বলে মনে করত, তার অসংখ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে। তখন সমুদ্রে ও সাগরতীরবর্তী স্থানে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করবার সময়ে, ইংরেজরা অধিকাংশ সময়েই সাধারণ বোম্বেটেদের সাহায্য গ্রহণ করত। ইংল্যান্ডের রাজা, রানি ও শাসনকর্তারা পর্যন্ত বেতনভুক্ত নিয়মিত নৌসৈন্যদের সঙ্গে বোম্বেটেদের পালন করতে লজ্জিত হতেন না— যেমন হতেন না বাংলা দেশের বারোভুঁইয়ারাও। রাজার সাহায্য পেয়ে বোম্বেটেদেরও বুক দশ হাত হয়ে উঠত, তারা রাজশত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করবার অজুহাতে নিরীহ প্রজাদের ধন-প্রাণ নির্ভয়ে লুণ্ঠন করত।
এই শ্রেণির বোম্বেটেদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে হেনরি মর্গ্যান। এই ভীষণ বোম্বেটেকে ইংল্যান্ডের রাজসরকার টাকা, জাহাজ ও লোকজন দিয়ে সাহায্য করেন। তার ফলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছাকাছি দ্বীপপুঞ্জে এবং দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলে কারো পক্ষে ধন-প্রাণ বজায় রেখে বাস করাই অসম্ভব হয়ে ওঠে। পানামার মতো শহরেও হেনরি মর্গ্যান হানা দিতে ভয় পায়নি, তার কবলগত হয়ে পানামার অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হয়ে যায় এবং যথাসর্বস্ব হারিয়েও এখানকার কত হাজার বাসিন্দা যে মৃত্যুমুখে পড়তে বাধ্য হয়, তার কোনও হিসাব নেই। ওই ওঁচা বোম্বেটেকে জলদস্যুরা পর্যন্ত ঘৃণা করত। কারণ সে কাক হয়েও কাকের মাংস খেত— অর্থাৎ মর্গ্যান কেবল পরিচিত নির্দোষ ব্যক্তিরই ধন-প্রাণ কেড়ে নিত না, নিজের দলের লোকদেরও টাকা দু-হাতে চুরি করত। জলপথে ও স্থলপথে অসংখ্য অত্যাচার, নরহত্যা, লুণ্ঠন ও পাপকাজ এবং বোম্বেটেদেরও তহবিল তছরুপ করে, শেষটা সে সকলকে ফাঁকি দিয়ে হঠাৎ একদিন লুকিয়ে সরে পড়ে। তখন ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের ধর্মভাব হঠাৎ জেগে উঠল। তাঁর হুকুমে মর্গ্যানকে ধরে দেশে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু বোম্বেটে সর্দারকে স্বচক্ষে দেখে রাজার মন এত খুশি হয়ে উঠল যে, শাস্তি দেওয়া দূরে থাক, 'স্যার' উপাধি ও 'কর্নেল' পদ দিয়ে তিনি তাঁকে আবার জামাইকা দ্বীপের ছোটোলাট করে পাঠালেন।
রেমব্রান্টের মতো বিশ্ববিখ্যাত ও সর্বজনমান্য চিত্রকর আঁকলেন কর্নেল স্যার হেনরি মর্গ্যানের ছবি এবং যার মরা উচিত ছিল ফাঁসিকাঠে, ছোটোলাটের উঁচু, পুরু ও নরম গদিতে বসে সে সাধু-অসাধুর শাসনভার অর্থাৎ মুণ্ডপাতের ভার পেয়ে চোদ্দো বছর সুখে-সম্মানে কাটিয়ে তিয়াত্তর বৎসর বয়সে পরম নিশ্চিন্তভাবে ইহলোক ত্যাগ করলে! পাপের এমন জয়ের দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্য কোনও দেশের ইতিহাসে দেখা যায় না! এমনকী আজও দেখি, অনেক নামজাদা ইংরেজ লিখিয়ে এই বোম্বেটের কলঙ্ক ক্ষালনের জন্যে প্রাণপণে ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। আশ্চর্য!
অথচ ওই সময়কার ইয়োরোপীয় ঐতিহাসিকরা কানহোজি আংগ্রেকে জলদস্যুরূপে বর্ণনা করতে লজ্জিত হননি। ভারতে যখন ঔরঙ্গজেবের রাজত্ব, মারাঠি নৌবীর কানহোজি আংগ্রের নামে তখন আরব সাগরগামী সমস্ত জাহাজ ভয়ে থরহরি কম্পমান হত। স্থলপথে ছত্রপতি শিবাজির মতন জলপথে কানহোজি আংগ্রেও ছিলেন সমান অজেয়। ইংল্যান্ডে জন্মালে তিনি ড্রেক বা নেলসনেরই মতো পৃথিবীজোড়া অমর নাম অর্জন করবার সুযোগ পেতেন। মোগল, ইংরেজ, ওলন্দাজ ও পোর্তুগিজদের কোনও জাহাজই তাঁর কবল থেকে সহজে নিস্তার পেত না। ইংরেজ ও অন্যান্য ইয়োরোপীয় জাতিরা একসঙ্গে অনেক যুদ্ধজাহাজ নিয়ে বার বার তাঁকে আমন্ত্রণ করেছে, কিন্তু প্রতিবারই একাকী লড়েও জলযুদ্ধে জয়ী হয়েছেন মহাবীর কানহোজি আংগ্রেই! অথচ তখন ইয়োরোপের পূর্বোক্ত জাতিরা স্থলযুদ্ধের চেয়ে জলযুদ্ধেই বেশি বিখ্যাত ছিলেন। বার বার পরাজিত শত্রুদের কলমে 'বোম্বেটে' বলে নিন্দিত এই অসাধারণ ভারতীয় নৌবীরের বীরত্বকাহিনি যে আজও এখানে ঘরে ঘরে পরিচিত হয়নি, আমাদের ঐতিহাসিকদের পক্ষে এটা অল্প কলঙ্কের কথা নয়। বাংলা ভাষায় প্রায় তিন যুগ আগে পুরাতন 'ভারতী'তে একবার কানহোজি আংগ্রে সম্বন্ধে একটি ছোটো প্রবন্ধ দেখেছিলুম, তারপর আর কারো তাঁকে মনে পড়েনি!
সাধারণ হত্যা বা দস্যুতার মধ্যে লুকোচুরি ও কাপুরুষতা আছে যতটা, বোম্বেটের কাজে যে ততটা নেই, সত্যের অনুরোধে এ কথা স্বীকার করা চলে অনায়াসেই। সে যুগে বোম্বেটেদের প্রাধান্য ছিল খুব বেশি, তখন সমুদ্রযাত্রার সময়ে প্রত্যেক জাহাজের আরোহীরাই তাদের দেখা পাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যেতেন ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র রাখা হত। অনন্ত সমুদ্র— সাধারণ খুনে বা ডাকাতের মতো বোম্বেটেরা অতর্কিতে হঠাৎ এসে আক্রমণ করতে পারত না, তাদের অনেক দূর থেকেই স্পষ্ট দেখা যেত এবং আক্রান্তরাও আত্মরক্ষা করবার সুযোগ পেত যথেষ্ট। কিন্তু তবু যে তারা বাঁচতে পারত না, তার প্রধান কারণ হচ্ছে বোম্বেটেদের সাহস ও বীরত্ব।
তবে জলদস্যুদের এত নিন্দা কেন? তাদের মূলমন্ত্র হচ্ছে, জোর যার মুল্লুক তার। এ মূলমন্ত্র সমাজের শান্তিরক্ষার পক্ষে অচল। তার উপরে সেকালকার বোম্বেটেদের নিষ্ঠুরতা ও হিংসুকতা ছিল অসম্ভব— দয়ামায়ার অস্তিত্ব পর্যন্ত তারা মানত না। অধিকাংশ সময়েই তারা কোনও জাহাজ দখল ও লুট করে সমস্ত আরোহীকেই নির্বিচারে সমুদ্রের জলে নিক্ষেপ করত। প্রাণে মারবার আগে অনেক লোককে তারা অমানুষিক যন্ত্রণা দিতেও ছাড়ত না। তারা নরপশু ছিল বলেই তাদের সমস্ত সাহস ও বীরত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভস্মে ঘৃতাহুতির মতো। যে বীরত্বে ক্ষমা নেই, দয়া নেই, মনুষ্যত্ব নেই, তা একেবারেই উল্লেখযোগ্য নয়।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জের ফরাসি জলদস্যু লোলোনজের পাশবিক বীরত্বের কাহিনি আমরা পরে বিবৃত করব। ব্রেজিলিয়ানো নামে আর-এক বোম্বেটের গল্পও আমরা পরে বলব, যা পড়তে পড়তে পাঠককে শিউরে উঠতে হবে। এ শ্রেণির লোকের সাহস ও বীরত্ব না থাকলেই ভালো ছিল।
জলদস্যু হচ্ছে প্রাচীন যুগেরই জীব। গ্রিকদের সময়েও জলদস্যুদের প্রভাব ছিল যথেষ্ট। সে সময়ে সমুদ্রে বেরিয়ে এক জাহাজ যদি আর-এক জাহাজকে দেখতে পেত, তাহলে সর্বাগ্রে প্রশ্ন করত, 'তোমরা বোম্বেটে, না সওদাগর?' রোমানদের সময়েও গ্রিক বোম্বেটেরা দলে এত ভারী ছিল যে, ভূমধ্যসাগর দিয়ে সাধারণ জাহাজ প্রায় চলাফেরা করতে পারত না বললেই চলে।
ভূমধ্যসাগরে বোম্বেটে জাহাজের সংখ্যা তখন এক হাজারের কম ছিল না। রোমানরা শেষটা বাধ্য হয়ে বিপুল এক রণতরির বাহিনী পাঠিয়ে এই দস্যুতা দমন করেছিল। কিন্তু এর পরেও অনেকবার জলদস্যুদের অত্যাচারে রোমকে যারপরনাই কষ্টভোগ করতে হয়েছিল। সেকালকার ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, পোর্তুগাল ও স্পেনের সমুদ্রতীরবর্তী নগরগুলি নানাদেশি বোম্বেটেদের অত্যাচারে যখন তখন ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়ত।
পঞ্চদশ শতাব্দীর আরম্ভে চীনারা সিংহল দেশের উপরে কী বিষম ডাকাতি করেছিল এইবারে সেই কথাই বলি। চেং হো নামে এক চীনা-খোজা একবার জাহাজে চড়ে সিংহল দেশে গিয়েছিল। সেখানে বুদ্ধদেবের পবিত্র দাঁত আছে শুনে সে আবদার ধরে বসল, তাকে ওই দাঁত উপহার দিতে হবে। বলা বাহুল্য, সিংহলের তখনকার রাজা অলগাক্ষোনারা (?) তার সে অন্যায় আবদার গ্রাহ্য করলেন না। চেং হো সেবারের মতো মুখ চুন করে খালি হাতেই চীন দেশে ফিরে গেল।
কিন্তু ১৪০৯ খ্রিস্টাব্দে বাষট্টিখানা জাহাজ নিয়ে সে আবার সিংহল দেশে আবির্ভূত হল। সিংহলের রাজার সৈন্যদের সঙ্গে চীনাদের তুমুল লড়াই লেগে গেল। সেই ফাঁকে চেং হো একদল সৈন্য নিয়ে সিংহলি সৈন্যদের চোখে ধুলো দিয়ে হঠাৎ রাজধানীতে এসে কৌশলে নগর দখল করল এবং রাজা ও রাজপরিবারের ছেলে-মেয়ে ও রাজ্যের প্রধান প্রধান লোকদের বন্দি করে সটান আবার চীন দেশে গিয়ে হাজির হল। পরে রাজ্যচ্যুত রাজাকে চীনারা আবার সিংহল দেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল বটে, কিন্তু তারপর, কিছুকাল পর্যন্ত সিংহল দেশকে চীন সম্রাটের অধীনতা স্বীকার করে কর পাঠাতে হত! এই বোম্বেটেগিরির পরে, ভারত সাগরে চীনাদের প্রভাব দুর্দমনীয় হয়ে উঠেছিল।
চীন দেশেরও সমুদ্রতীরবর্তী স্থানগুলি নিরাপদ ছিল না— সেসব জায়গায় জাপানি বোম্বেটেরা সকলকে নাস্তানাবুদ করে তুলেছিল। ষোড়শ শতাব্দীর পর ইংরেজ ও ওলন্দাজ বোম্বেটেদের দৌরাত্ম্যেও চীনাদের বড়ো কম নাকাল হতে হয়নি।
আগেই বলেছি, ইংরেজরাও সেকালে বোম্বেটের ব্যবসায়ে যথেষ্ট বদনাম কিনেছিল। রানি এলিজাবেথ অনেক ইংরেজ বোম্বেটেকে নিজের নৌসেনাদলে ভরতি করে নিয়েছিলেন। সে সময়ে জন স্মিথ নামে এক মহাধড়িবাজ বোম্বেটের জ্বালায় ইংরেজরা পর্যন্ত অস্থির হয়ে উঠেছিল এবং তাকে বন্দি করে ফাঁসিকাঠে লটকে দেওয়ার জন্যে চারিদিকে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু কেউ তাকে ধরতে পারেনি।
এমন যে শয়তান, তারও মনে ছিল প্রচুর দেশভক্তি। হঠাৎ সে একদিন নিজেই কর্তৃপক্ষের কাছে এসে হাজির— ধরা দিলে মুক্তি নেই জেনেও। সকলেই অবাক হয়ে গেল! কিন্তু বোম্বেটে জন স্মিথ বললে, 'দেশের বিপদ দেখেই আমি ধরা দিচ্ছি। সবাই প্রস্তুত হও। আমি স্বচক্ষে দেখে এসেছি, ইংল্যান্ড ধ্বংস করবার জন্যে স্প্যানিশ আর্মাডা আসছে।' এ খবর তখনও দেশের কেউ পায়নি— শুনেই সারা ইংল্যান্ডে 'সাজো সাজো' রব উঠল, সকলে যথাসময়ে সাবধান হওয়ার সুযোগ লাভ করলে। বলা বাহুল্য, বোম্বেটে জন স্মিথের নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণ ব্যর্থ হল না। কেবল শাস্তি থেকে মুক্তি নয়— সেই সঙ্গে সে যথেষ্ট পুরস্কারও লাভ করল।
স্পেন থেকে মরোক্কোয় বিতাড়িত হওয়ার পর ষোড়শ শতাব্দীর মুররা ভয়ংকর বোম্বেটে রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তাদের ভয়ে ভূমধ্যসাগরের ব্যবসাবাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো হয়েছিল। সারা ইয়োরোপের শক্তি তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারেনি। প্রথমে উর্জ ও পরে তার ভাই খয়েরুদ্দিনের নামে তখনকার খ্রিস্টান নাবিকদের বুক ভয়ে ঠান্ডা হয়ে যেত। কারণ মুর বোম্বেটেরা কেবল জাহাজ লুট করত না, উপরন্তু খ্রিস্টানদেরও ধরে নিয়ে গিয়ে আফ্রিকায় গোলাম করে রাখত এবং তাদের পথের কুকুরের মতো কষ্ট দিত। একবার আন্দ্রিয়া ডোরিয়া নামে এক নৌবীর বহু জাহাজ ও সৈন্য নিয়ে জলযুদ্ধে মুর বোম্বেটেদের হারিয়ে দেন এবং তাদের কবল থেকে বিশ হাজার খ্রিস্টান স্ত্রী-পুরুষকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন— তাদের মধ্যে ইয়োরোপের অনেক বড়োঘরের ছেলে-মেয়েও ছিল। কিন্তু তবু মুর বোম্বেটেরা কাবু হয়ে পড়ল না। অবশেষে কয়েকশত বৎসরের প্রাণপণ চেষ্টার পরে, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে, মুর জলদস্যুদের প্রতাপ দূর হয়। ইংরেজ নৌসেনাপতি লর্ড এক্সমাউথ ওলন্দাজদের সঙ্গে মিলে মুর বোম্বেটেদের আস্তানা ভেঙে দেন এবং তারপর ফরাসিরা আলজিয়ার্স দেশ অধিকার করলে মুররা আর মাথা তুলতে পারলে না। ইয়োরোপে এমন বোম্বেটের বিভীষিকা আর কখনো হয়নি।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। এরা কারা— কবেকার— কোথাকার?
আমরা পৃথিবীর বোম্বেটেদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়েছি। কিন্তু এখন আমরা কেবল ইয়োরোপীয় বোম্বেটেদেরই গল্প বলব। প্রথমেই বলে রাখি, এই গল্পগুলির ঘটনাস্থল ইয়োরোপ নয়— আমেরিকা। ঘটনাগুলি পড়বার আগে দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকার মানচিত্রের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করুন।
উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার ঠিক মধ্যবর্তী স্থানে পানামা। তার বামে প্রশান্ত মহাসাগর ও ডাইনে আটলান্টিক মহাসাগর। এখন পানামায় খাল কেটে এই দুই মহাসাগরকে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু যখনকার কথা বলছি (সপ্তদশ শতাব্দী) তখন এই খাল ছিল না। (পানামা খাল ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে কাটা হয়।)
আটলান্টিক মহাসাগরের এক অংশকে বলে ক্যারিবিয়ান সমুদ্র। তারই ভিতরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জ— হাইতি, জামাইকা, কিউবা প্রভৃতি। কিউবার বামদিকে হচ্ছে মেক্সিকো উপসাগর।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণে ক্যারিবিয়ান সমুদ্র দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলা প্রদেশকে স্পর্শ করেছে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জে, তার চারিপাশের সমুদ্রবক্ষে ও নিকটবর্তী ভূভাগে ষোড়শ থেকে সপ্তদশ খিস্টাব্দ পর্যন্ত যে রোমাঞ্চকর রক্তাক্ত নাটকের একটানা অভিনয় হয়েছিল, কাল্পনিক উপন্যাসও তার কাছে হার মানে। কিন্তু সকলের কাছে আর-একটু ধৈর্য প্রার্থনা করি, কারণ মূল গল্প শুরু করবার আগে স্থান-কাল-পাত্রের কথা আরও কিছু না বললে আসল ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে না।
সর্বপ্রথমে কলম্বাস এই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কার করেন। কলম্বাস নিজে স্প্যানিয়ার্ড ছিলেন না, কিন্তু স্পেন দেশের রানি ইসাবেলার আনুকূল্য লাভ করে এই অসমসাহসিক নাবিক নতুন দেশ আবিষ্কারের জন্যে সমুদ্রযাত্রা করবার সুযোগ পেয়েছিলেন। অজানা সমুদ্রের উপর ক্ষুদ্র পোতে ভাসমান হয়ে, শত বাধাবিপত্তির মধ্য দিয়ে, নিদারুণ কষ্ট সহ্য করে, তিনি ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত কোনও এক অজ্ঞাতনামা দ্বীপে (কলম্বাস এই দ্বীপটির নাম রেখেছিলেন 'স্যান স্যালভেডর', সম্ভবত আধুনিক 'ওয়াটলিং দ্বীপ'।) উপস্থিত হয়েছিলেন; আর স্পেন দেশের রাজা ও রানির নামে দ্বীপটি দখল করে, সেখানে স্পেনের রাজপতাকা প্রোথিত করেছিলেন। কাজেই স্প্যানিয়ার্ডরাই সর্বপ্রথম ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জে দলে দলে এসে উপনিবেশ স্থাপন করবার সুবিধা পেয়েছিল। তারা কিন্তু অধিকৃত দ্বীপগুলি সবসময়ে শাসনে বা দখলে রাখতে পারত না। ফরাসি, ইংরেজ, ওলন্দাজ, পোর্তুগিজ প্রভৃতি জাতির দুঃসাহসিক লোকেরা মাঝে মাঝে দল বেঁধে জাহাজে চড়ে এসে ওই সকল দ্বীপে উৎপাত করত, আর এক-একটা দ্বীপ বা তার খানিকটা, স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে দখল করে বসত। এইসব কাজে বোম্বেটেদের সাহায্য নিতে তারা কিছুমাত্র সংকোচবোধ করত না।
১৬২৫ খ্রিস্টাব্দে একদল দুঃসাহসিক ইংরেজ ও ফরাসি জল-ডাকাতি করে টাকা রোজগার করবার জন্যে সেন্ট ক্রিস্টোফার দ্বীপে এসে আড্ডা গাড়ে। তারা স্প্যানিয়ার্ডদের অধিকৃত হিস্পানিওলা বা হাইতি দ্বীপে (পূর্বে সমগ্র দ্বীপের নাম ছিল হাইতি বা হিস্পানিওলা। পরবর্তীকালে হাইতি দ্বীপের রাজধানী স্যান্টো ডোমিঙ্গোর নাম অনুসারে ওই দ্বীপের পূর্বখণ্ডের নামকরণ হয় 'স্যান্টো ডোমিঙ্গো' আর পশ্চিমখণ্ডের নাম 'হাইতি' থেকে যায়)। লুঠতরাজ করত, আর লুট করা শূকরের মাংস শুকিয়ে চলতি সওদাগরি জাহাজে বিক্রি করত। ১৬৩০ খ্রিস্টাব্দে তারা টর্টুগা দ্বীপে চলে যায়। মেক্সিকোর উপসাগরের মুখে দশটি ছোটো ছোটো দ্বীপ আছে। সেগুলিকে টর্টুগা দ্বীপপুঞ্জ বলে। টর্টুগা দ্বীপ ও টর্টুগা দ্বীপপুঞ্জ যে এক নয়, তা মনে রাখা দরকার।
বোম্বেটেরা টর্টুগা দ্বীপে নতুন করে আড্ডা গাড়লে, ইয়োরোপের নানা দেশ থেকে ভিন্ন ভিন্ন জাতির দুঃসাহসিক দুর্বৃত্তেরা এসে তাদের দলে ভিড়ে যেতে লাগল। এইরূপে বোম্বেটেরা দলে বেশ ভারী হয়ে উঠল। স্প্যানিয়ার্ডদের জাহাজ লুট করা বা তাদের দখলি দ্বীপে বা ভূভাগে এসে হানা দেওয়া তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়াল। স্প্যানিয়ার্ডরা অস্থির হয়ে উঠল।
সমুদ্রে ডাকাতি করে ফিরে তারা টর্টুগা দ্বীপে অথবা জামাইকা বা অন্য কোনও দ্বীপে এসে আশ্রয় গ্রহণ করত। তারপর দু-এক মাসের মধ্যেই মদ খেয়ে, জুয়া খেলে ও অন্যান্য বদখেয়ালিতে সব টাকা ফুঁকে দিয়ে তারা আবার নতুন শিকারের খোঁজে জাহাজে চড়ে বেরিয়ে পড়ত। এইসব দ্বীপের শাসনকর্তারা প্রায়ই ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের মতো হতেন না। বোম্বেটেরা তাঁদের সঙ্গে একটা পাকা বন্দোবস্ত করে ফেলত, নিজেদের পাপের টাকার খানিক অংশ ঘুস দিয়ে তাঁদের মুখ বন্ধ করে রাখত। দু-একজন কড়া শাসনকর্তা তাদের যদি শাসনে রাখবার চেষ্টা করতেন, তাহলে হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়াত। কারণ বোম্বেটের দল এতটা প্রবল ছিল যে, সকলে একসঙ্গে বিদ্রোহ প্রকাশ করে যেনতেনপ্রকারেণ সাধু শাসনকর্তাকে সেখান থেকে না তাড়িয়ে ছাড়ত না। সময়ে সময়ে, শাসনকর্তা যেখানে শাসন করছেন, সেই দ্বীপ পর্যন্ত তারা কেড়ে নিত। কাজেই সাধুতা ছিল সেখানে ব্যর্থ।
ওসব দ্বীপে স্প্যানিয়ার্ডরাই সংখ্যায় ছিল বেশি। তাদের শূকরের ব্যাবসাই ছিল প্রধান। তারা পাল পাল শূকর পুষত এবং এইসব শূকরের রক্ষিত মাংস তারা জাহাজে করে নানা দেশে চালান দিত। ওসব জায়গায় ফরাসি, ইংরেজ বা ওলন্দাজেরও অভাব ছিল না। তারা এখানে-সেখানে আড্ডা গেড়ে বসবাস করত, অনেকে তামাক বা আখের চাষ করত, আবার অনেকের শিকারই ছিল পেশা। স্প্যানিয়ার্ডরা ছিল ঘোর অত্যাচারী, তারা সুযোগ পেলে এদের উপরও অত্যাচার করতে ছাড়ত না; এরাও তাদের দু-চক্ষে দেখতে পারত না, অত্যাচারের নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নিত। স্প্যানিয়ার্ড, ফরাসি, ইংরেজ, ওলন্দাজ— সবাই ওই সকল দ্বীপের আদিম অধিবাসী লাল মানুষদের বা আফ্রিকা থেকে চালানি নিগ্রোদের ক্রীতদাস করে রাখত।
অনেক শ্বেতাঙ্গকেও ইয়োরোপ থেকে লোভ দেখিয়ে, চুরি করে বা জোরজবরদস্তি করে ধরে এনে ওসব দ্বীপে বিক্রি করা হত। শ্বেতাঙ্গরাই তাদের কিনত। কিন্তু মনিবদের অত্যাচার ছিল এত অমানুষিক যে, গোলামরা পালিয়ে গিয়ে বোম্বেটের দলে মিশে নিষ্ঠুর জঘন্য জীবনযাপন করাও বাঞ্ছনীয় বোধ করত।
তাহলেই অবস্থাটা কেমন দাঁড়িয়েছিল, দেখুন। স্প্যানিয়ার্ডরা অধিকাংশ দ্বীপের মালিক— তারা ঘোরতর অত্যাচারী; খেতবাড়ির শ্বেতাঙ্গ মালিকরা অত্যাচারী, শিকারিরা অত্যাচারী; বোম্বেটেরা জলে অত্যাচারী, স্থলে অত্যাচারী; শ্বেতাঙ্গ ক্রীতদাসেরা প্রভুদের হুকুমে বা ব্যবহারে অত্যাচারী; লাল মানুষ বা নিগ্রো ক্রীতদাসেরা মনিবদের অত্যাচারে বা তাঁদের নিষ্ঠুর আদেশপালনে অভ্যস্ত হয়ে অত্যাচারী। সর্বত্র অত্যাচার। শুধু অত্যাচার নয়, পাপের বীভৎস লীলা। সুরাপান, ব্যভিচার, জুয়াখেলা, লুঠতরাজ, মারামারি, কাটাকাটি, খুন, জখম, অগ্নিকাণ্ড— পাপ যত মূর্তিতে প্রকাশ পেতে পারে তা-ই। সপ্তদশ শতাব্দীর সভ্যতার চমৎকার এক পৃষ্ঠা!
বোম্বেটেদের রীতিনীতি সম্বন্ধেও দু-চার কথা বলে নিই, কারণ পরে আর বলবার সময় হবে না।
বোম্বেটেদের কোনও নতুন দল গঠিত হলে, সমুদ্রযাত্রা করবার আগে দলের সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হত, কবে তাদের জাহাজ ছাড়বে এবং কাকে কত বারুদ ও বন্দুকের গুলি আনতে হবে। তারপর যাত্রাকালের খাবার জোগাড় করবার ব্যবস্থা হত। তাদের প্রধান খোরাক ছিল শূকর ও কচ্ছপের মাংস। বোম্বেটেরা প্রায়ই জাহাজ ছাড়বার আগে ছলে-বলে-কৌশলে শূকর সংগ্রহ করত— যথামূল্যে শূকর কেনবার জন্যে কোনওদিনই তারা আগ্রহ প্রকাশ করত না।
তারপর পরামর্শসভায় স্থির হত, শিকার জুটলে কার ভাগে কত অংশ পড়বে। অবশ্য সবচেয়ে বেশি অংশ পেত কাপ্তেন, তারপর জাহাজের ডাক্তার। ছুতার মিস্ত্রিও অন্য লোকের চেয়ে বেশি অংশ লাভ করত। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও স্থির থাকত যে শিকার না জুটলে কারো ভাগ্যে কিছুই জুটবে না।
যুদ্ধবিগ্রহে কেউ মারা পড়লে বা কারো অঙ্গহানি হলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকত। সবচেয়ে বেশি দাম ছিল ডান হাতের। তারপর যথাক্রমে বাম হাত, ডান পা ও বাম পায়ের দাম। সর্বশেষে, একটা চোখ বা হাতের বা একটা আঙুলের দাম ছিল সমান!
নিজেদের ভিতরে তাদের রীতিমতো একটা বোঝাপড়া ছিল। তাদের প্রত্যেককেই শপথ করতে হত যে, দল ছেড়ে সে পালাবে না বা লুঠতরাজের কোনও জিনিসও দলের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখবে না। কেউ অবিশ্বাসী হলে তখনই তাকে দল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হত।
এমন যে অমানুষ ও হিংস্র পশুর দল, কিন্তু দলের ভিতরে তাদেরও পরস্পরের সঙ্গে স্নেহ, প্রেম ও সদ্ভাব ছিল যথেষ্ট। একের দুঃখকষ্টে অন্যে যথেষ্ট সহানুভূতি প্রকাশ করত তো বটেই, উপরন্তু সেই দুঃখকষ্ট দূর করবার জন্যে টাকা দিয়ে, দেহ দিয়ে যে-কোনওরকম সাহায্য করতেও নারাজ হত না।
আমরা অতঃপর গল্প শুরু করব। কিন্তু এই গল্প প্রধানত যাঁর বই থেকে নেওয়া হয়েছে তাঁরও পরিচয় দেওয়া দরকার। তাঁর নাম হচ্ছে আলেক্স অলিভিয়ার এক্সকুইমেলিন, জাতে তিনি ওলন্দাজ। তিনি ১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। এক্সকুইমেলিন সাহেব আগে নিজেও একজন বোম্বেটে ছিলেন এবং এই পুস্তকে বর্ণিত অধিকাংশ ঘটনাই তাঁর চোখের সামনেই ঘটেছিল। কোনও কোনও ঘটনা, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল এমন সব বোম্বেটের মুখে তিনি নিজের কানে শ্রবণ করেছিলেন। তিনি যা দেখেছেন ও যা শুনেছেন সমস্তই হুবহু লিখে ১৬৪৮-৮৫ খ্রিস্টাব্দে পুস্তকাকারে প্রকাশ করেন। সে পুস্তকের এত আদর হয়েছিল যে, ইয়োরোপের অধিকাংশ ভাষাতেই তার অনুবাদ দেখা যায় এবং এতকাল পরেও তাঁর পুস্তকের নতুন সংস্করণ হচ্ছে। বোম্বেটের নিজের মুখেই বোম্বেটের কাহিনি শুনতে কার না আগ্রহ হয়? আর এক্সকুইমেলিন সাহেবের পক্ষে বিশেষ প্রশংসার কথা হচ্ছে এই যে, কোনও অন্যায়কেই কোথাও তিনি গোপন করেননি বা ফেনানো ভাষার আড়ালে অস্পষ্ট করে তোলবার চেষ্টা করেননি। তাঁর ভাষা সহজ ও সরল। এইজন্যেই তাঁর কথিত কাহিনিগুলির ঐতিহাসিক মূল্য সামান্য নয়।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ। 'পিটার দি গ্রেট'— বোম্বেটের আদিপুরুষ
টর্টুগা দ্বীপে সর্বপ্রথমে যে জলদস্যু বিশেষ নামজাদা হয়, জাতে সে ফরাসি। তার নাম ছিল ইংরেজিতে 'পিটার দি গ্রেট'। সে একলা নিজের বুদ্ধিতে জনাকয় লোকের সাহায্যে যে অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল, তাইতেই তার ডাকনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
একদিন সে একখানা বড়ো নৌকায় চড়ে হাইতি দ্বীপের কাছে সমুদ্রে শিকারের সন্ধানে ফিরছিল এবং তার সঙ্গে ছিল আটাশজন বোম্বেটে।
কয়েকদিন ধরে শিকারের অভাব, নৌকায় খাবার ফুরিয়ে এল বলে। সকলকার মন বড়ো খারাপ, পেট চলবে কেমন করে?
এমন সময়ে সমুদ্রের বুকে দেখা গেল স্পেনের এক 'ফ্লোটা'। ফ্লোটা হচ্ছে অনেকগুলো বড়ো বড়ো জাহাজের সমষ্টি এবং তাদের কাজ হচ্ছে ইয়োরোপের জিনিস আমেরিকার বন্দরে আনা ও আমেরিকার মাল ইয়োরোপে নিয়ে যাওয়া।
দেখা গেল, মস্ত একখানা জাহাজ 'ফ্লোটা'র দলছাড়া হয়ে অনেক দূরে এগিয়ে পড়েছে।
পিটার তখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। সে বলল, 'ভাই সব! যা থাকে কপালে! ওই দলছাড়া জাহাজখানাকে আমরা আজ দখল করবই করব!'
পিটার অসম্ভব কথা বললে। একখানা নৌকা, উনত্রিশজন মাত্র তার আরোহী! এরই জোরে শত শত লোকের সঙ্গে লড়াই করে অত বড়ো জাহাজ দখল করা আর লতা দিয়ে হাতি বাঁধবার চেষ্টা করা একই কথা।
কিন্তু পিটারের দলের লোকেরাও আসন্ন অনাহারের সম্ভাবনায় তারই মতন মরিয়া। তারাও পিটারের কথায় সায় দিয়ে বলল, 'তা-ই সই, সর্দার!'
নৌকা বেয়ে জাহাজের কাছে এসে বোম্বেটেরা বুঝল, দিনের আলোয় এমন অসাধ্যসাধন করা একেবারেই অসম্ভব। জাহাজের লোকরা একবার দেখতে পেলে মরণের মুখ থেকে তাদের কেউ বাঁচাতে পারবে না। অতএব তারা বুদ্ধিমানের মতো সন্ধ্যার অন্ধকারের অপেক্ষা করতে লাগল।
সন্ধ্যা এল।
পিটার বললে, 'আমাদের নৌকার তলায় ছ্যাঁদা করে দিই এসো! সেই ছ্যাঁদা দিয়ে জল ঢুকে আমাদের নৌকাখানাকে ডুবিয়ে দিক। এই অকূল সমুদ্রে নৌকা ডুবে গেলে আমাদের আর বাঁচবার কি পালাবার কোনও উপায়ই থাকবে না। তাহলে আমরা আরও বেশি মরিয়া হয়ে লড়তে পারব আর আরও তাড়াতাড়ি জাহাজে ওঠবার জন্যে চেষ্টা করব। অত বড়ো জাহাজ আমাদের পক্ষে এখন ভয়ের কারণ বটে। কিন্তু তখন ওই জাহাজকেই মনে করব আমাদের একমাত্র আশ্রয়!'
তখনই এই অদ্ভুত প্রস্তাব অনুসারে কাজ করা হল, ছ্যাঁদা-করা নৌকা ধীরে ধীরে অতলে তলিয়ে যেতে আরম্ভ করল।
কিন্তু তার আগেই সাঁঝের আবছায়ায় গা ঢেকে বোম্বেটেরা চুপি চুপি একে একে জাহাজের উপর উঠতে লাগল— ছায়ামূর্তির সারির মতো। তাদের প্রত্যেকেরই কাছে একটি করে পিস্তল ও একখানা করে তরবারি ছাড়া আর কোনও অস্ত্র নেই!
জাহাজের এক কামরায় বসে কাপ্তেন ও আরও কয়েকজন লোক নিশ্চিন্ত আরামে তাস খেলছিলেন।
আচম্বিতে একটা লোক কামরায় ঢুকে কাপ্তেনের বুকের উপরে পিস্তল ধরে বললে, 'একটু নড়েছ কী গুলি করেছি!'
কাপ্তেন একেবার থ। এ যে বিনা মেঘে বজ্রাঘাত!
কাপ্তেনের অন্যান্য সঙ্গীরা সচকিত কণ্ঠে বলে উঠল, 'যিশু আমাদের রক্ষা করুন! কে এরা? কোত্থেকে এল? এরা কি সাক্ষাৎ শয়তান!'
ততক্ষণে পিস্তল বাগিয়ে ও তরবারি উঁচিয়ে আরও কয়েকজন বোম্বেটে কামরায় এসে হাজির হয়েছে এবং দলের বাকি কয়েকজন লোক সর্বাগ্রে গিয়ে জাহাজের অস্ত্রশালা দখল করে বসেছে! কেউই এই অতর্কিত আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত ছিল না, যারা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাদের প্রত্যেককেই মরতে হল!
তখন জাহাজের বাকি সকলেই ভয়ে ভয়ে বোম্বেটেদের কাছে আত্মসমর্পণ করল!
পরে শোনা গেল, সন্ধ্যার আগে কেউ কেউ নৌকাখানাকে দেখতে পেয়ে নাকি বলেছিল, 'ওখানা বোম্বেটে-নৌকো!'
জবাবে কাপ্তেন বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন, 'বয়ে গেল! আমার এত বড়ো জাহাজ, এত লোকবল, আমি কি ওই খুদে পিঁপড়ের মতো নৌকাখানাকে দেখে ভয় পাব? আমার জাহাজের সমান জাহাজ এলেও আমি থোড়াই কেয়ার করি।'
জাহাজের জনাকয় মাহিনা-করা নাবিককে দলে রেখে, পিটার বাকি সবাইকে ডাঙায় নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দিলে। তারপর সেই মূল্যবান মালে বোঝাই সুবৃহৎ জাহাজ নিয়ে ফ্রান্সের দিকে যাত্রা করলে! পিটার আর কখনো আমেরিকায় ফিরে আসেনি।
টর্টুগার যেসব লোক স্প্যানিয়ার্ডদের অত্যাচার-অবিচারে কাবু হয়ে হাহাকার করছিল, তারা যখন পিটারের এই অদ্ভুত বিজয়কাহিনি ও অপূর্ব সম্পদলাভের কথা শুনলে, তখন একবাক্যে বিপুল উৎসাহে বলে উঠল, 'আমরাও তবে বোম্বেটে হব— স্প্যানিয়ার্ডদের উপরে প্রতিশোধ নেব!'
কিন্তু জল-ডাকাত হতে গেলে আগে দরকার অন্তত একখানা করে ছোটো জাহাজ বা একখানা করে বড়ো নৌকা। তার মূল্য কে দেয়? ভেবেচিন্তে তারা উপায় আবিষ্কার করল।
বন্দরে বন্দরে স্প্যানিয়ার্ডরা ছোটো ছোটো নৌকা করে চামড়া ও তামাক প্রভৃতি সংগ্রহ করত। তারপর তারা সেইসব মাল নিয়ে হাভানা শহরে গিয়ে হাজির হত। কারণ ইয়োরোপ থেকে স্প্যানিয়ার্ডরা সেইখানেই ব্যাবসা করতে আসত।
নতুন বোম্বেটেরা দল পাকিয়ে সেইসব মাল-বোঝাই জাহাজ স্প্যানিয়ার্ডদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে আরম্ভ করল। তারপর সেই লুটের মাল বেচে তারা বড়ো বোম্বেটে হওয়ার মূলধন সংগ্রহ করে ফেলল। ব্যাপারটা শুনতে খুব সোজা বটে, কিন্তু এর জন্যে বড়ো কম মারামারি, রক্তপাত ও নরহত্যা হল না।
তার মাসখানেক পরেই স্পেন দেশীয় ব্যবসায়ীদের বড়ো বড়ো দুখানা জাহাজ বোম্বেটেদের হাতে ধরা পড়ল— সে জাহাজ দুখানার ভিতরে ছিল প্রচুর সোনা ও রুপো।
টর্টুগার যেসব লোক তখনও নতমাথায় অত্যাচার সহ্য করছিল, তারাও আর লোভ সামলাতে পারল না, তারাও বোম্বেটেদের দলে যোগ দিল! বছর দুইয়ের মধ্যেই লুটের ঐশ্বর্যে টর্টুগারও যেমন শ্রীবৃদ্ধি হল, ব্যাঙের ছাতার মতো বোম্বেটের দলও তেমনই বাড়তে লাগল! তখন এই দ্বীপটি একরকম বোম্বেটেদেরই স্বর্গ হয়ে দাঁড়াল— স্প্যানিয়ার্ডরা সেখান থেকে একেবারেই পিঠটান দিতে বাধ্য হল!
দেখতে দেখতে টর্টুগা দ্বীপে বোম্বেটে জাহাজের সংখ্যা হয়ে দাঁড়াল কুড়িখানারও বেশি।
বুকে বসে এই দাড়ি ওপড়ানো স্প্যানিয়ার্ডরা আর সইতে পারল না। দেশে— অর্থাৎ স্পেনে খবর পাঠিয়ে আত্মরক্ষা ও বোম্বেটে দমন করবার জন্যে প্রকাণ্ড দুখানা যুদ্ধজাহাজ আনাবার বন্দোবস্ত করল।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ। পোর্তুগিজ ও ব্রেজিলিয়ানো
এ অঞ্চলে এক বোম্বেটে ছিল, তার নাম বার্থোলোমিউ পোর্তুগিজ। নাম শুনেই বোঝা যায় তার জন্ম পোর্তুগালে। সবাই তাকে পোর্তুগিজ বলে ডাকত। এর কাহিনি 'পিটার দি গ্রেট'-এর চেয়েও বিচিত্র।
জামাইকা দ্বীপের কাছে সে একখানা বজরা নিয়ে শিকার অন্বেষণ করছিল। তার সঙ্গে ছিল চারটে ছোটো কামান ও তিরিশজন লোক।
সমুদ্রের মাঝখানে একখানা প্রকাণ্ড জাহাজ দেখতে পেয়ে পোর্তুগিজ তার কাছে বজরা নিয়ে গেল।
সে বড়ো যে-সে জাহাজ নয়। তার উপরে আছে কুড়িটা মস্ত মস্ত কামান ও সত্তরজন যোদ্ধা। আর আছে অনেক যাত্রী ও নাবিক।
কিন্তু পোর্তুগিজ জানত না ভয় কাকে বলে। চারটে পুঁচকে কামান, তিরিশজন মাত্র লোক ও বজরা নিয়েই সে সেই জাহাজখানাকে আক্রমণ করলে। প্রথম আক্রমণ সফল হল না। পোর্তুগিজকে পিছনে হটে আসতে হল।
তারপর খানিক বিশ্রাম করে সে আবার সতেজে আক্রমণ করলে। আবার বড়ো বড়ো কামানের গোলা হজম করতে না পেরে সে পিছিয়ে এল। তার খানিক পরে আবার আক্রমণ! এমনই বার বার আক্রমণ ও সুকৌশলে অথচ সতেজে যুদ্ধ করে অনেকক্ষণ পরে পোর্তুগিজ সত্য সত্যই সেই প্রকাণ্ড জাহাজখানাকে দখল করে ফেললে!
কিন্তু তার এত বীরত্বও ব্যর্থ হল। কারণ সেই বিজিত জাহাজখানাকে নিয়ে খানিক দূর এগোতে-না এগোতেই, আচম্বিতে দৈবগতিকে স্প্যানিয়ার্ডদের আরও তিনখানা প্রকাণ্ড জাহাজের আবির্ভাব হল। পোর্তুগিজ এদের সঙ্গে আর পাল্লা দিতে পারলে না— জয়ের আনন্দ ভালো করে ভোগ করতে না করতেই সদলবলে তাঁকে বন্দি হতে হল!
একটু পরেই উঠল বেজায় ঝড়। যে বিরাট জাহাজে বোম্বেটেরা বন্দি হয়ে ছিল, সেখানা অন্য জাহাজগুলোর সঙ্গ হারিয়ে অনেক কষ্টে একটা বন্দরে গিয়ে আশ্রয় নিল।
বন্দরের কয়েকজন বড়ো ব্যবসায়ী জাহাজের কাপ্তেনের সঙ্গে দেখা করতে এসে বন্দি পোর্তুগিজকে দেখেই ত্রস্তস্বরে বলে উঠল, 'এ বদমায়েশ বোম্বেটেকে আমরা চিনি! এ যে পোর্তুগিজ। এ যে আমাদের অনেক সর্বনাশ করেছে, অনেক লোক খুন করেছে!'
যে শহরের বন্দরে জাহাজ থেমেছিল, সেখানকার ম্যাজিস্ট্রেট বোম্বেটেদের ডাঙায় পাঠাতে হুকুম দিলেন। কেবল পোর্তুগিজকে পাঠাতে নিষেধ করলেন— পাছে সেই ফাঁকে কোনওগতিকে সে পালিয়ে যায়, কারণ কিছুদিন আগে এই শহরেরই জেল ভেঙে সে লম্বা দিয়েছিল। তার জন্যে জাহাজের উপরেই ফাঁসিকাঠ খাড়া করা হল। পরদিন সকালেই তাকে লটকে দেওয়া হবে।
এই চমৎকার সুখবরটি পোর্তুগিজকে ঘটা করে শোনানো হল। শুনে সে যে খুশি হয়ে হাসেনি, সেটা আর না বললেও চলে।
জাহাজে তাকে যেখানে রাখা হয়েছিল, সেখানে বড়ো বড়ো দুটো মাটির খালি জালা ছিল— এই জালায় স্প্যানিয়ার্ডরা মদ রাখত। পোর্তুগিজ একটুও সাঁতার জানত না, কাজেই জলে লাফিয়ে পড়ে সে যে সাঁতরে পালাবে, তারও উপায় নেই। অথচ কাল পৃথিবীর সূর্যোদয়ের সঙ্গেই তার জীবনের সূর্যাস্ত! ফাঁসিকাঠে দোল খাওয়ার শখ তার মোটেই ছিল না। কোনওরকমে সে মাটির জালা দুটোর মুখ এঁটে বন্ধ করলে। তারপর চুপ করে হাত গুটিয়ে বসে রইল নেহাত ভালোমানুষটির মতো। তার আচরণের কারণ কেউ বুঝতে পারলে না।
রাত হল। সেপাই বন্দুক ঘাড়ে করে বসে বসে ঢুলছে।
হঠাৎ পোর্তুগিজ বাঘের মতো তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কেউ কিছু টের পাওয়ার আগেই সেপাই ইহলোক থেকে বিদায় নিলে।
পোর্তুগিজ জালা দুটো জলে নামিয়ে দিয়ে নিজেও জাহাজ ত্যাগ করলে। মুখ বন্ধ করা জালা জলে ভাসতে লাগল। পোর্তুগিজ তাদের উপরে ভর দিয়ে ভাসতে ভাসতে ডাঙায় গিয়ে উঠল। তারপর গভীর অরণ্যে ঢুকে একটা গাছের কোটরে লুকিয়ে বসে রইল— কারণ সকাল হতে দেরি ছিল না।
সকাল। কর্তৃপক্ষ জাহাজে এলেন— একটা জাঁহাবাজ বোম্বেটেকে নিশ্চিন্তপুরে পাঠাবার জন্যে। কিন্তু দেখা গেল, ফাঁসিকাঠে যে ঝুলবে সে অদৃশ্য!
চারিদিকে খোঁজ খোঁজ রব উঠল। দলে দলে লোক পেতো তোলপাড় করে খুঁজে দেখলে, কিন্তু পোর্তুগিজের দেখা না পেয়ে হতাশভাবে ফিরে এল।
পর্তুগিজ তখন জঙ্গল ভেঙে চলতে শুরু করেছে। সমুদ্রের ধারে পাথর উলটে 'সেল' মাছ কুড়িয়ে এনে কোনওরকমে পেটের জ্বালা নিবারণ করে। কাছে ছিল শুকনো লাউয়ের খোল, আর তাতে একটুখানি জল— তাতেই তেষ্টা মেটায়। এইভাবে একশো কুড়ি মাইল পথ পার হল!
পথের মাঝে মাঝে নদী পড়েছে— অথচ সে সাঁতার জানে না। কেমন করে সে বাধা দূর করলে, তাও বড়ো কম আশ্চর্য কথা নয়!
সমুদ্রের ধারে জাহাজ-ভাঙা একখানা তক্তা পাওয়া গেল, তার গায়ে বেঁধানো ছিল গোটাকয়েক মস্ত বড় পেরেক বা হুক। সে বসে বসে পাথরের উপরে ঘষে ঘষে পেরেকের গায়ে অনেকটা ছুরির মতো ধার করলে। তারপর সেই অদ্ভুত ছুরির সাহায্যে গাছের ডালপালা কেটে ছোটোখাটো ভেলার মতো একটা কিছু বানিয়ে গভীর নদী পার হল। আপনারা অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন, এ রূপকথা? না, এ সম্পূর্ণ সত্য কথা!
একশো কুড়ি মাইল পথ পেরিয়ে পোর্তুগিজ একদল চেনা বোম্বেটের দেখা পেলে। ইতিমধ্যে চোদ্দো দিন কেটে গেছে।
বন্ধুদের কাছে নিজের বিপদের গল্প বলল। শুনে তারা যে তাকে খুব বাহাদুরি দিয়েছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
পোর্তুগিজ বলল, 'ভাই, আমাকে একখানা নৌকা আর কুড়িজন লোক দাও। আমি প্রতিশোধ নেব।'
তারা আপত্তি করল না।
আট দিন পরে সেই আশ্চর্য সাহসী পোর্তুগিজ কুড়িজন সঙ্গীর সঙ্গে যে জাহাজে বন্দি হয়েছিল, যার উপরে এখনও তার জন্যে আনা ফাঁসিকাঠ দাঁড়িয়ে আছে, আবার তার কাছেই বুক ফুলিয়ে ফিরে এল এবং অতর্কিতে আক্রমণ করে সেই প্রকাণ্ড জাহাজখানাকে আবার বন্দি করে ফেলল! উপন্যাসেও এমন বিচিত্র কাহিনি পড়া যায় না!
কিন্তু নিয়তি আবার তাকে নিষ্ঠুর পরিহাস করল! প্রাণের ভয় থেকে এখন সে মুক্ত এবং মাল-বোঝাই জাহাজ পেয়ে এখন সে ধনবান। কিন্তু তার আনন্দ বেশি দিন স্থায়ী হল না। ভবিষ্যতের অনেক সুখ-সৌভাগ্যের কল্পনা করতে করতে দিনকয় মস্ত জাহাজ নিয়ে সমুদ্রে সে ঘুরে বেড়ালে— কিন্তু তারপরেই দুর্ভাগ্য আবার ঝড়ের মূর্তিতে এসে পোর্তুগিজের এই নতুন-পাওয়া ঐশ্বর্যকে পাতালের অতল তলে তলিয়ে দিল! সঙ্গীদের নিয়ে একখানা ডিঙিতে চড়ে সে প্রাণে বাঁচল বটে, কিন্তু আবার সে গরিব— নিছক গরিব!
সে জামাইকা দ্বীপে এসে উঠল। কিন্তু ভাগ্যলক্ষ্মী তার উপরে আর কোনওদিন প্রসন্ন হননি। তার এত বুদ্ধি, সাহস ও বীরত্বও আর কোনও কাজে লাগল না। অবশ্য এসব দুষ্প্রাপ্য গুণ আজীবনই তার কাজে লাগত, যদি সে অসৎ পথ অবলম্বন না করত। পোর্তুগিজ যদি সত্যিকার মানুষ হত, তাহলে মরণের পরেও সে আজ মরত না, হয়তো পৃথিবীতে দেশে দেশে চিরস্মরণীয় হয়েই থাকতে পারত।
আর-একজন বোম্বেটেও ওই সময়ে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। অনেককাল ব্রেজিলে বাস করেছিল বলে তার নাম হয়েছিল ব্রেজিলিয়ানো।
জলদস্যুর দলে ঢুকে প্রথমে সে সাধারণ বোম্বেটেরই মতন নিম্নশ্রেণিতে কাজ করত। কিন্তু নিজের প্রকৃতি ও বুদ্ধির গুণে সে শীঘ্রই সকলের স্নেহের ও শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠল।
যে দলে সে ছিল তার কাপ্তেনের সঙ্গে একবার সেই দলের অনেকের মনোমালিন্য হয়। তারা তখন দল ছেড়ে চলে এল এবং সকলের সম্মতি অনুসারে ব্রেজিলিয়ানোই দলপতি বা কাপ্তেনের পদ লাভ করল।
নতুন কাপ্তেন দিনকয়েক পরেই নিজের বুদ্ধি ও শক্তির পরিচয় দিল। আমেরিকায় তখন অনেক সোনা, রুপো ও অন্যান্য দামি ধাতু পাওয়া যেত। স্প্যানিয়ার্ডরা সেইসব ধাতুর 'বার' বা তাল জাহাজে চাপিয়ে স্পেনে চালান দিত। এমনই সোনা-রুপোর তাল নিয়ে একখানা মস্ত জাহাজ স্পেনে বা অন্য কোথাও যাচ্ছিল, ব্রেজিলিয়ানো হঠাৎ তাকে ধরে ফেললে। স্প্যানিয়ার্ডরা যথাসাধ্য বাধা দিয়েও কিছু করে উঠতে পারল না। ব্রেজিলিয়ানো বমাল সেই জাহাজখানাকে গ্রেপ্তার করে জামাইকা দ্বীপে এসে উঠল। তার নামে চারিদিকে 'ধন্য ধন্য' পড়ে গেল!
কিন্তু ব্রেজিলিয়ানো ছিল যেমন মাতাল, তেমনই গোঁয়ার ও নির্দয়। যখন সে ছুটি নিয়ে ডাঙায় এসে ফুর্তি করত, তখন কেউ তার সামনে দাঁড়াতে ভরসা করত না। মদ খেয়ে রাজপথে হুল্লোড় করে বেড়াবার সময়ে যাকে সম্মুখে পেত তাকেই মেরে-ধরে হাড় গুঁড়িয়ে দিত। তার গায়েও ছিল অসুরের মতো ক্ষমতা, তাই কেউ বাধা দিতে বা প্রতিবাদ করতেও সাহস করত না।
সময়ে সময়ে এক পিপে মদ নিয়ে রাস্তার উপরে বসে থাকত। সামনে দিয়ে কোনও পথিক গেলেই ডেকে বলত, 'এসো ভায়া, আমার সঙ্গে মদ খেয়ে ফুর্তি করে যাও!' পথিক যদি বলত, 'না, আমি মদ খাব না!'— তাহলেই আর রক্ষে নেই, ব্রেজিলিয়ানো অমনই পিস্তল বার করে বলত, 'মদ খাবে, না খাবি খাবে?'
কখনো কখনো তার আর-এক খেয়াল হত। রাস্তা দিয়ে স্ত্রী-পুরুষ কেউ গেলেই সে তাদের জামাকাপড়ে সর্বাঙ্গে হুড়হুড় করে মদ ঢেলে দিত!
স্প্যানিয়ার্ডদের উপরে ছিল তার বিষম আক্রোশ। একবার সে শূকর চুরি করতে যায়। কিন্তু চুরি করতে না পেরে কয়েকজন স্প্যানিয়ার্ডকে ধরে শুধোলে, 'তোমরা কোথায় শুয়োর লুকিয়ে রেখেছ বলো।'
তারা বললে, 'শুয়োরের সন্ধান আমরা জানি না।'
ব্রেজিলিয়ানো দু-চোখ পাকিয়ে বললে, 'কী জানো না? রোসো, দেখো তবে মজাটা! ওরে, এদের ধরে রোস্ট বানিয়ে ফেল তো! শুয়োর যখন পেলুম না তখন মানুষেরই রোস্ট হোক!'
সাহেবরা মাংসের মধ্যে কাঠের শলাকা বিঁধিয়ে আগুনের আঁচে রেখে রোস্ট তৈরি করে। ব্রেজিলিয়ানোর চ্যালারা তখনই সেই হতভাগ্য স্প্যানিয়ার্ডদের জীবন্ত দেহের ভিতরে পড় পড় করে কাঠের শলাকা চালিয়ে দিল এবং জীবন্ত অবস্থাতেই তাদের দেহগুলোকে আগুনের উপর ঝুলিয়ে রাখলে। ধীরে ধীরে তাদের জ্যান্ত দেহগুলো আগুনের আঁচে সিদ্ধ হতে লাগল।
অভাগাদের পরিত্রাহি চিৎকারে আকাশ পর্যন্ত কেঁপে উঠল, কিন্তু ব্রেজিলিয়ানোর মন তাতে একটুও গলল না— সে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই আর্তনাদ শুনতে লাগল, যেন খুব মিষ্টি গানই শুনছে!
একদিন ঝড়ে তার জাহাজ ডুবে গেল— ঝড়ে জাহাজ ডুবে যাওয়া ছিল তখনকার কালে খুব সহজ ব্যাপার। ব্রেজিলিয়ানো সঙ্গীদের নিয়ে একখানা নৌকায় চড়ে কোনওরকমে ডাঙায় এসে উঠল। কিন্তু সেখানেও আবার নতুন বিপদ! দেখা গেল, একশোজন বন্দুকধারী ঘোড়সওয়ার স্প্যানিয়ার্ড তাদের দিকে আবার এক নতুন ঝড়ের মতন বেগে তেড়ে আসছে! বোম্বেটেদের সংখ্যা তিরিশজনের বেশি নয়! তিনগুণেরও বেশি লোকের সঙ্গে কেউ কখনো যুঝতে পারে? এবারে ব্রেজিলিয়ানোর লীলাখেলা বুঝি সাঙ্গ হয়!
অন্য কেউ হলে তখনই বিনা বাধায় আত্মসমর্পণ করত। কিন্তু ব্রেজিলিয়ানো দমবার পাত্র নয়। সে দলের লোকদের ডেকে নির্ভয়ে বলল, 'ভাই সব! স্প্যানিয়ার্ড কুকুররা তেড়ে আসছে— আসুক! ওরা বাগে পেলে আমাদের ভীষণ যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করবে! আমরা হচ্ছি বীর সৈনিক— এসো আমরা লড়াই করতে করতে বীরের মতন মরি!'
লড়াই শুরু হল— বোম্বেটেরা সবাই মরতে প্রস্তুত! এখন মরবার আগে যে যত শত্রু নিপাত করতে পারে, তারই তত বাহাদুরি! বোম্বেটেরা এমন আশ্চর্যভাবে লক্ষ্য স্থির করে বন্দুক ছুড়তে লাগল যে, প্রায় প্রত্যেক গুলিতেই এক-একজন ঘোড়সওয়ারের পতন হয়। স্প্যানিয়ার্ডরা আর কাছে আসতে সাহস পেলে না, দূর থেকেই যুদ্ধ করতে লাগল।
এক ঘণ্টা লড়াই চলল। শেষটা বোম্বেটেদের গরমাগরম গুলি আর হজম করতে না পেরে স্প্যানিয়ার্ডরা ভয়ে পিঠটান দিলে। তাদের প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশজন লোক হত বা আহত হয়ে মাটির উপরে ছড়িয়ে পড়ে রইল। যারা তখনও বেঁচে ছিল, বোম্বেটেরা বন্দুকের কুঁদো দিয়ে মাথার খুলি ফাটিয়ে তাদেরও ভবযন্ত্রণা শেষ করে দিল। বোম্বেটেদের দলে হত হয়েছিল দুজন ও আহত হয়েছিল দুজন মাত্র লোক!
বোম্বেটেরা তখন স্প্যানিয়ার্ডদের সওয়ারহীন ঘোড়াগুলোর পিঠে চেপে জয় জয় নাদে নতুন শিকারের খোঁজে যাত্রা করল।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ। মারি তো গন্ডার
এইবারে আমরা যে ভয়ংকর ও অতুলনীয় বোম্বেটের কথা আরম্ভ করব, তার নাম হচ্ছে ফ্রান্সিস লোলোনেজ। জাতে ফরাসি। রোমাঞ্চকর তার কাহিনি।
ফ্রান্স থেকে নির্বাসিত হয়ে সে ওয়েস্ট ইন্ডিজে আসে। মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে পর ছাড়া পায়। কিন্তু তারপর সে আর স্বদেশে ফিরে না গিয়ে হাইতি দ্বীপে এসে সাশ্রয় নেয়। প্রথমে হয় শিকারি, তারপর বোম্বেটে। তার ভবিষ্যৎ জীবন কী ভয়াবহ হবে এবং সে যে কত প্রলয়কাণ্ডের অনুষ্ঠান করবে, কর্তৃপক্ষ যদি তা কল্পনাও করতে পারতেন, তাহলে কখনোই তাকে মুক্তি ও স্বাধীনতা দিতেন না। বোম্বেটে রূপে সে হয়ে উঠেছিল মূর্তিমান নরপিশাচ! অথচ তার সাহস, বুদ্ধি, বীরত্ব, উৎসাহ ও উদ্যম ছিল অসাধারণ। মানুষ এইসব দুর্লভ গুণের জন্যে আজন্ম সাধনা করে। কিন্তু অপাত্রে এইসব গুণ যে কতটা সাংঘাতিক হতে পারে, লোলোনেজ হচ্ছে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
টর্টুগা দ্বীপ তখন ফরাসিদের অধিকারে এসেছে। সেখানকার লাটও ফরাসি। তখন স্প্যানিয়ার্ডদের সঙ্গে ফরাসিদের সম্পর্ক ছিল সাপ আর নেউলের সম্পর্ক।
আগেই বলেছি, এখানকার লাটেরা প্রায়ই সাধু মানুষ হতেন না, তাঁরা নিজেরাই বোম্বেটে পুষতেন। টর্টুগার ফরাসি লাট লোলোনেজকে বুদ্ধিমান ও সাহসী দেখে তার উপরে দয়া করলেন। অর্থাৎ তাকে একখানা জাহাজ ও লোকজন দিয়ে কাপ্তেন করে দিলেন। তারপর কাপ্তেন লোলোনেজ সমুদ্রের নীল জলে নিজের অদৃষ্ট পরীক্ষা করতে বেরোল। কিন্তু সে-ও যদি তখন নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারত, তাহলে সভয়ে এ পথ ছেড়ে ফিরে আসত। অদৃষ্টকে আগে থাকতে দেখা গেলে পৃথিবীর অনেক দুঃখই ঘুচে যেত— মানুষ এমন অন্ধের মতো বিপথে ঘুরে মরত না।
প্রথম কিছুকাল বেশ সুখেই কাটল। লোলোনেজ উপর-উপরি স্প্যানিয়ার্ডদের কয়েকখানা ধনরত্নে ও বাণিজ্যদ্রব্যে পরিপূর্ণ জাহাজ দখল করে ডাকসাইটে নাম কিনে ফেললে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে স্প্যানিয়ার্ডদের উপরে তার ভীষণ নিষ্ঠুরতার কাহিনিও চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল— তারা বুঝল, আবার এক মারাত্মক আপদের আবির্ভাব হয়েছে। তখন তারাও মরিয়া হয়ে উঠল! লোলোনেজ তাদের আক্রমণ করলে তারা আর সহজে আত্মসমর্পণ করতে চাইত না— কারণ তারা বুঝে নিয়েছিল যে লোলোনেজের কাছে তাদের ক্ষমা নেই, সে তাদের কয়েদ করতে পারলে বিষম যন্ত্রণা দিয়ে প্রাণবধ না করে ছাড়বে না। তার চেয়ে লড়াই করে বা জলে ডুবে মরা ঢের ভালো!
তারপরই লোলোনেজ অদৃষ্টের কাছ থেকে প্রথম ধমক খেলে। আচম্বিতে একদিন নাবিকদের সবচেয়ে বড়ো শত্রু ঝড় এসে তার জাহাজ ডুবিয়ে দিলে। সে আর তার সঙ্গীরা সমুদ্রের কবল থেকে কোনওগতিকে বাঁচল বটে, কিন্তু ব্রেজিলিয়ানোর মতো সে-ও তীরে উঠে স্তম্ভিত নেত্রে দেখলে, দলে দলে স্প্যানিয়ার্ড অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তেড়ে আসছে দলবদ্ধ যমের মতো!
যুদ্ধ হল। কিন্তু শত্রুরা দলে এত ভারী ছিল যে, লোলোনেজের সঙ্গীরা অধিকাংশই প্রাণ হারালে— যারা বাঁচল, বন্দি হল।
লোলোনেজও আহত হল, কিন্তু চালাকির জোরে শত্রুদের চোখে ধুলো দিলে। নিজের ক্ষতের রক্তের সঙ্গে তাড়াতাড়ি সমুদ্র তীরের বালি মিশিয়ে সে তার মুখে ও দেহের নানা জায়গায় মাখিয়ে ফেলল এবং বোম্বেটেদের মৃতদেহের সঙ্গে মিশিয়ে মড়ার মতো মাটিতে পড়ে রইল। শত্রুরা তাকে মৃত মনে করে চলে গেল।
লোলোনেজ তখন উঠে বনের ভিতর গিয়ে ঢুকল। আগে নিজের দেহের ক্ষতস্থানগুলো যেমন- তেমন করে ব্যান্ডেজ করে ফেললে। তারপর এক শহরে গিয়ে স্প্যানিয়ার্ডের ছদ্মবেশ গ্রহণ করলে।
স্প্যানিয়ার্ডরা অনেক ক্রীতদাস রাখত। কয়েকজন ক্রীতদাসের সঙ্গে তার আলাপ হল এবং দিনকয়েকের ভিতরেই সে আলাপ জমিয়ে তুলল রীতিমতো।
সে তাদের বললে, 'তোমরা যদি আমার কথা শোনো, তাহলে আমি তোমাদের স্বাধীন করে দেব। তোমাদের মনিবের একখানা নৌকা চুরি করে আমার সঙ্গে চলো— আমি তোমাদের রক্ষা করব।'
অবশেষে তারা রাজি হয়ে গেল। এবং একখানা নৌকা চুরি করে লোলোনেজের সঙ্গে জলপথে বেরিয়ে পড়ল।
ওদিকে স্প্যানিয়ার্ডরা লোলোনেজের সঙ্গীদের খুব সাবধানে বন্দি করে রাখলে। এবং যখন শুনলে যে লোলোনেজ আর বেঁচে নেই, তখন তাদের আনন্দের আর সীমা-পরিসীমা রইল না। এত বড়ো শত্রু নিপাত হয়েছে শুনে চারিদিকে আলোকমালা সাজিয়ে তারা উৎসবে মত্ত হয়ে উঠল।
লোলোনেজ ফিরে এসে সব দেখলে— সব শুনলে। তারপর সেখান থেকে সরে পড়ে একেবারে টর্টুগা দ্বীপে এসে হাজির!
ওয়েস্ট ইন্ডিজে যত শয়তান আছে, এই দ্বীপ হচ্ছে তাদের নিরাপদ স্বদেশ। তার উপরে লোলোনেজ হচ্ছে তখন একজন নামজাদা ব্যক্তি— তার কীর্তিকাহিনি লোকের মুখে মুখে। সুতরাং এখানে এসে একখানা ছোটোখাটো জাহাজ ও লোকজন জোগাড় করতে তার বেশি দিন লাগল না। একুশজন লোক ও দরকারমতো হাতিয়ার জোগাড় করে এবারে সে কিউবা দ্বীপের দিকে বেরিয়ে পড়ল। এই দ্বীপের দক্ষিণে এক শহর তখন তামাক, চিনি ও চামড়ার ব্যাবসার জন্যে বিখ্যাত। লোলোনেজ আন্দাজ করলে যে, সেখানে নিশ্চয়ই কোনও বড়ো গোছের শিকার পাওয়া যাবে।
নিজেদের সৌভাগ্যক্রমে কয়েকজন জেলে মাছ ধরতে ধরতে তাকে দেখেই চিনে ফেললে এবং তখনই চটপট দ্বীপের লাটসাহেবের কাছে গিয়ে ধরনা দিয়ে পড়ে বললে, 'হুজুর, রক্ষা করুন! লোলোনেজ আমাদের সর্বনাশ করতে এসেছে!'
লাটসাহেবের কাছে তখন খবর গিয়ে পৌঁছেছে যে, লোলোনেজ আর বেঁচে নেই। তাই তিনি জেলেদের কথায় নির্ভর করতে পারলেন না। তবু সাবধানের মার নেই ভেবে তিনি জেলেদের সঙ্গে একখানা বড়ো জাহাজ, নব্বইজন সৈনিক ও দশটা কামান পাঠিয়ে দিলেন। জাহাজের সেনাপতির উপরে হুকুম রইল— 'বোম্বেটে বিনাশ না করে তিনি যেন ফিরে না আসেন। প্রত্যেক বোম্বেটেকে ফাঁসিকাঠে লটকে আসতে হবে— কেবল দলের সর্দার লোলোনেজ ছাড়া। তাকে জ্যান্ত বন্দি করে হাভানা শহরে ধরে আনতে হবে।' জাহাজের সঙ্গে একজন জল্লাদও চলল।
জাহাজখানা ঘটনাস্থলে এল। বোম্বেটেদের গুপ্তচর সর্দারকে এসে খবর দিলে,— 'লাটসাহেবের জাহাজ তাদের ধরবার জন্যে বন্দরে গিয়ে হাজির হয়েছে।'
কিন্তু লোলোনেজ এত সহজে ভড়কে যাওয়ার ছেলে নয়। সে বলল, 'আমি পালাব না। ওই জাহাজখানাকেই আমরা বন্দি করব। আমাদের একখানা ভালো জাহাজ দরকার!'
বোম্বেটেরা জনাকয় জেলেকে ধরে ফেলল। লোলোনেজ তাদের বললে, 'আজ রাত্রে বন্দরে ঢোকবার পথ আমাকে দেখিয়ে দিতে হবে। নইলে তোদের খুন করব।'
জেলেরা বাধ্য হয়ে সেইরাত্রে তাদের নিয়ে বন্দরে গিয়ে ঢুকল।
লাটের জাহাজের প্রহরী জিজ্ঞাসা করলে, 'কে তোমরা?'
প্রাণের দায়ে জেলেরা বললে, 'আমরা জেলে।'
'বোম্বেটেরা এখন কোথায়?'
'আমরা কোনও বোম্বেটে দেখিনি।'
জাহাজের লোকরা ভাবলে, তাদের দেখে কাপুরুষ বোম্বেটেরা নিশ্চয়ই ভয়ে লম্বা দিয়েছে।
ভোর যখন হয়-হয় তাদের ভুল ভাঙল তখন। বোম্বেটের দল দুইপাশ থেকে জাহাজ আক্রমণ করেছে!
স্প্যানিয়ার্ডরা বীরের মতো লড়াই করলে, কিন্তু তবু হেরে গেল। এরা দুর্জয় শত্রু, আত্মসমর্পণ করা ছাড়া উপায় নেই।
জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে বিজয়ী লোলোনেজ বলল, 'স্প্যানিয়ার্ডগুলোকে একে একে আমার সামনে নিয়ে এসো।'
বন্দিদের একে একে সর্দারের সামনে আনা হতে লাগল।
লোলোনেজ বলল, 'একে একে এদের মাথা কেটে ফেলো।'
একে একে তাদের মাথা উড়ে গেল।
সব শেষে নিয়ে আসা হল সেই জল্লাদকে। জাতে সে কাফ্রি।
জল্লাদ সর্দারের হাতে-পায়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললে, 'আমাকে মারবেন না হুজুর! আপনি যা জানতে চান সব কথা খুলে বলব— কিছু লুকোব না।'
লোলোনেজ তাকে গোটাকয়েক গুপ্তকথা জিজ্ঞাসা করলে। প্রাণরক্ষার আশায় সে সব কথার সঠিক জবাব দিল।
লোলোনেজ বলল, 'আর কিছু জানিস না?'
'না হুজুর!'
লোলোনেজ বললে, 'এ কালামানিককে নিয়ে আর আমার দরকার নেই। এর মাথাটা কেটে ফেলো!'
জল্লাদেরও মাথা উড়ে গেল।
কেবল একজন লোককে বোম্বেটেরা বধ করল না।
তাকে ডেকে লোলোনেজ বললে, 'যা, প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যা! তোদের লাটসাহেবকে আমার এই কথাগুলো জানিয়ে দিস: আজ থেকে কোনও স্প্যানিয়ার্ডকে আমি আর একফোঁটাও দয়া করব না। লাটসাহেব আমাদের উপরে যে অসীম দয়া প্রকাশের চেষ্টা করেছিলেন তাও আমি কখনো ভুলব না। আমি খুব শীঘ্রই তাঁর উপরেও ঠিক সেইরকম দয়া দেখাবার জন্যে ফিরে আসব।'
লাটসাহেব সব শুনে রাগে তিনটে হয়ে বললেন, 'আচ্ছা, আমিও প্রতিজ্ঞা করছি, এবার থেকে কোনও বোম্বেটেকে হাতে পেলে আমিও ছেড়ে কথা কইব না— তার একমাত্র দণ্ড হবে প্রাণদণ্ড!'
হাভানার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বললেন, 'কখনো অমন প্রতিজ্ঞা করা উচিত নয়! তাহলে বোম্বেটে ধরা পড়ুক আর না পড়ুক— আমাদেরই মারা পড়বার সম্ভাবনা বেশি!'
লাটসাহেব তখন মনের রাগ মনেই পুষে নিজের প্রতিজ্ঞাকে বাতিল করতে বাধ্য হলেন।
লোলোনেজ কিছুদিন ধরে সমুদ্রের এ বন্দর থেকে ও বন্দরে জাহাজ নিয়ে ঘুরে বেড়াল এবং একখানা খুব মূল্যবান জাহাজকেও বন্দি করল— তার ভিতরে অনেক সোনা-রুপোর তাল ছিল। তারপর রীতিমতো ধনীর মতো সে আবার বোম্বেটে দ্বীপে— অর্থাৎ টর্টুগায় ফিরে এল। সেখানকার বাসিন্দারা মহাসমারোহে তাকে সংবর্ধনা করল!
লোলোনেজের মাথার ভিতরে তখন এমন এক বিরাট ফন্দির উদয় হয়েছে, এতদিন বোম্বেটে জগতে যা কল্পনাতীত ছিল। বোম্বেটে বলতে বোঝায়, জলপথে যারা ছোটোখাটো নৌকা বজরা বা বড়োজোর জাহাজ লুট করে। সেই লুটের মাল নিয়েই তারা খুশি হয়ে গা-ঢাকা দেয়।
কিন্তু লোলোনেজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এইটুকুতেই তৃপ্ত হয়ে থাকতে পারলে না। সে দেখাতে চায়, ইচ্ছা করলে বোম্বেটেরাও কত অসামান্য কাজ করতে পারে!
তার ফন্দি হচ্ছে এই, লুটের মাল বেচে এবারে সে অনেকগুলো জাহাজ কিনে প্রকাণ্ড এক নৌবাহিনী গঠন করবে। তার অধীনে বোম্বেটে সৈন্যের সংখ্যা হবে অন্তত পাঁচশত! তারপর সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের নানা স্পেনীয় রাজ্যে হানা দিয়ে গ্রাম ও ছোটো-বড়ো নগর লুণ্ঠন করবে!
তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত উচ্চ! স্পেন রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা! স্পেন সাম্রাজ্য সে সময়ে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিল— ইয়োরোপের কোনও শক্তিই তার কাছে পাত্তা পেত না!
বোম্বেটে দ্বীপও লোলোনেজের এ অসম্ভব প্রস্তাব শুনে আনন্দে ও উৎসাহে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল! মারি তো গন্ডার— লুটি তো ভাণ্ডার!
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। কালাপাহাড়ি কাণ্ড
বোম্বেটে দ্বীপের সমস্ত বোম্বেটের কাছে খবর গেল— স্পেন রাজ্য লুণ্ঠনে মহাবীর লোলোনেজ তোমাদের আহ্বান করছেন!
মড়ার খোঁজ পেলে দলে দলে শকুনি যেমন আকাশ ছেয়ে উড়ে আসে, অ্যাডমিরাল লোলোনেজের কালো পতাকার তলায় চারিদিক থেকে তেমনই করে ডাকাত, বোম্বেটে ও হত্যাকারীর দল ছুটে আসতে লাগল।
এখন, বোম্বেটে দ্বীপে আর-একজন মস্ত মাতব্বর ব্যক্তি বাস করে, তার নাম মাইকেল ডি বাস্কো, আপাতত মেজরের পদে অধিষ্ঠিত। ইয়োরোপের সমুদ্রেও আগে সে বড়ো একজন বোম্বেটে বলে নাম কিনেছিল। আজকাল অনেক টাকা রোজগার করে বকধার্মিক সেজে পায়ের উপরে পা দিয়ে পরম আরামে বসে বসে খাচ্ছে।
কিন্তু লোলোনেজের বিপুল আয়োজনে প্রচুর লাভের সম্ভাবনা দেখে সে আবার ভালোমানুষের মুখোশ খুলে রাখলে। লোলোনেজের কাছে গিয়ে বাস্কো বললে, 'অ্যাডমিরাল, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সমস্ত পথঘাট আমার নখদর্পণে। তুমি যদি আমাকে প্রধান কাপ্তেনের পদ দাও, আমি তাহলে তোমাকে সাহায্য করতে পারি।'
লোলোনেজ এত বড়ো একজন জাঁদরেল ও শক্তিশালী লোককে পেয়ে তখনই রাজি হয়ে গেল। বাস্কোকে সে কেবল প্রধান কাপ্তেন নয়, স্থলপথেও নিজের ফৌজের সেনাপতির পদে নিযুক্ত করলে।
এবারে আটখানা জাহাজ ও প্রায় সাতশোজন লোক নিয়ে লোলোনেজ স্প্যানিয়ার্ডদের সর্বনাশ করতে বেরোল। সবচেয়ে বড়ো জাহাজখানা নিলে নিজে, তার উপরে ছিল দশটা কামান।
হাইতি দ্বীপের উত্তরদিক দিয়ে যেতে যেতে প্রথমেই তাদের নজরে পড়ল একখানা প্রকাণ্ড জাহাজ। লোলোনেজের নিজের জাহাজেরও চেয়ে সে জাহাজখানা বড়ো।
সে ইচ্ছা করলেই আটখানা জাহাজ নিয়ে আক্রমণ করে খুব সহজেই জয়লাভ করতে পারত। কিন্তু এখানে সে যথেষ্ট বীরত্ব ও আত্মশক্তির উপরে নির্ভরতার দৃষ্টান্ত দেখালে। সে কেবল নিজের জাহাজখানাকে রেখে বাকি সাতখানা জাহাজকে সাভোনা দ্বীপের কাছে গিয়ে অপেক্ষা করতে বললে, তারপর শত্রুর তরির দিকে অগ্রসর হল।
স্প্যানিয়ার্ডরা বোম্বেটে জাহাজকে আসতে দেখেও ভয় পেলে না। কারণ তাদের জাহাজে ষোলোটা কামান ও পঞ্চাশজন সৈনিক ছিল। এই দুঃসাহসই হল তাদের কাল।
যুদ্ধ হল তিন ঘণ্টা ধরে। তারপর স্প্যানিয়ার্ডদের সমস্ত শক্তি উবে গেল। জাহাজ, ধনরত্ন ও মালপত্তর বোম্বেটেদের হস্তগত হল। বন্দিদের কী দশা হল, প্রকাশ পায়নি। খুব সম্ভব তাদের কারো কাঁধের উপরে কেউ আর মাথা বলে কোনও জিনিস দেখতে পায়নি।
অধিকৃত জাহাজখানা নিয়ে লোলোনেজ সানন্দে সাভোনা দ্বীপের দিকে নিজের নৌবাহিনীর খোঁজ করতে গেল। আনন্দের উপরে আনন্দ! সেখানে গিয়ে শোনে, তারাও একখানা ধনরত্নে পরিপূর্ণ জাহাজ হস্তগত করছে! লোলোনেজ বললে, 'আমাদের যাত্রা শুভ দেখছি! গাছে না উঠতেই এক কাঁদি!'
সে আবার বোম্বেটে দ্বীপে ফিরে এল। আগে তাড়াতাড়ি ধনরত্ন, মালপত্তর বিলি করবার ও দ্বীপের লাটকে ঘুস দেওয়ার ব্যবস্থা করলে। আরও নতুন লোকজন নিলে। তারপর যে শত্রু-জাহাজ দখল করেছিল সেখানাকে নিজে নিয়ে আবার সদলবলে যাত্রা শুরু করলে। এবারে তার দৃষ্টি বিখ্যাত মারাকেবো নগরের দিকে।
মারাকোবা হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলা প্রদেশের একটি বন্দর নগর। এখান থেকে এখন কফি, চিনি, রবার, কাঠ, চামড়া, নানা ধাতু ও কুইনিন প্রভৃতি চালান দেওয়া হয়। তখনও এ শহরটির প্রসিদ্ধ ব্যবসায় প্রধান স্থান ছিল। এর উত্তরে আছে পঁচাত্তর মাইল বিস্তৃত ভেনেজুয়েলা উপসাগর ও দক্ষিণে আছে বৃহৎ মারাকেবো হ্রদ। এর বর্তমান লোকসংখ্যা চুয়াত্তর হাজার, কিন্তু যখনকার কথা বলছি, তখন এই শহরের লোকসংখ্যা এত বেশি ছিল না।
লোলোনেজ এই শহরের কাছে এসে নোঙর ফেলল। তারপর সদলবলে ডাঙায় গিয়ে নামল। শহরে যাওয়ার পথেই পড়ে এক কেল্লা। তাকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয় জেনে সে যুদ্ধ করবার জন্যে প্রস্তুত হতে লাগল।
কিন্তু দ্বীপের লোকরাও অপ্রস্তুত ছিল না, লোলোনেজের শনির দৃষ্টি যে তাদের উপরে পড়েছে এ খবর তারা আগেই পেয়েছিল।
বোম্বেটের দল কেল্লার দিকে আসছে শুনে সেখানকার লাট একদল সৈন্যকে জঙ্গলের ভিতরে লুকিয়ে থাকবার জন্যে পাঠিয়ে দিলেন। তাদের উপরে হুকুম রইল, কেল্লার সৈন্যেরা যখন বোম্বেটেদের সম্মুখ থেকে আক্রমণ করবে, তখন তারা তাদের আক্রমণ করবে পিছনদিক থেকে। দু-দিক থেকে আক্রান্ত হলে পর বোম্বেটেদের জনপ্রাণীও আর প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে পারবে না।
বন্দোবস্ত খুব ভালো। কিন্তু দুঃখের বিষয়, লোলোনেজও ঘুমিয়ে ছিল না, সব খবরই সে জানতে পেরেছিল যথাসময়ে। সে-ও নিজের একদল লোককে জঙ্গলের ভিতরে পাঠিয়ে দিল এবং তারা এমন বিক্রমে ও সবেগে শত্রুদের আক্রমণ করল যে, একজন স্প্যানিয়ার্ডও আর কেল্লার ভিতরে ফিরে যেতে পারল না!
তারপর তারা কেল্লার দিকে অগ্রসর হল। কেল্লার সৈন্যেরা পাঁচিলের উপর বড়ো বড়ো ষোলোটা কামান বসিয়ে তাদের অভ্যর্থনা করবার জন্যে প্রস্তুত হয়েছিল।
বোম্বেটেরা বার বার কেল্লার দিকে এগিয়ে যায়, কিন্তু ষোলোটা তোপের প্রতাপে বার বার ফিরে আসে। তাদের সঙ্গে তোপও ছিল না, বন্দুকও ছিল না— তাদের সম্বল খালি পিস্তল ও তরবারি!
কিন্তু অনেকবার ফিরে আসার পর তারা এমন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে দুর্গ আক্রমণ করলে যে, কামানের গোলা ও বন্দুকের অগ্নিবৃষ্টিও আর তাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারল না, প্রাণের সব মায়া ছেড়ে পাঁচিল টপকে তারা কেল্লার ভিতরে লাফিয়ে পড়ল। তিন ঘণ্টা যুদ্ধের পর দুর্গ এল তাদের দখলে।
ইতিমধ্যে ভগ্নদূত গিয়ে শহরে খবর রটিয়ে দিয়েছে যে, হাজার হাজার বোম্বেটে কেল্লা ফতে করে শহর লুটতে ছুটে আসছে! ভয়ে সে কিছু বাড়িয়েই বলল!
এই মারাকেবো শহর এর আগেও আরও তিন-চারবার শত্রুদের হাতে পড়েছে। সে যে কী বিপদ, কী যন্ত্রণা, কী বিভীষিকা, বাসিন্দারা আজও তা ভুলতে পারেনি। তখনই চারিদিকে রব উঠল— ওই এল রে, ওই এল! পালা! পালা! পালা! টাকাকড়ি ও মালপত্তর নিয়ে সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে শহর ছেড়ে লম্বা দিল— কেউ গেল বনের ভিতরে, কেউ গেল জিব্রালটারের দিকে! বলা বাহুল্য, এই জিব্রালটার হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার নতুন শহর। কিন্তু এই নতুন শহরের নামও আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
ওদিকে দুর্গপ্রাকারের উপর থেকে লোলোনেজ সংকেত করে নিজের নৌবাহিনীকে জানিয়ে দিল— পথ পরিষ্কার, তারা ভিতরে ঢুকে অনায়াসেই শহরের দিকে যাত্রা করতে পারে!
জলপথে মারাকেবো শহর সেখান থেকে আঠারো মাইল। বোম্বেটেরা আগে দুর্গটাকে সমূলে ধ্বংস করলে এবং সেই কাজেই গেল পুরো একটি দিন। তারপর তারা নৌবাহিনী নিয়ে একেবারে শহরের কাছে গিয়ে নোঙর ফেলল।
একদল বোম্বেটে সমুদ্র থেকে শহরের উপরে গোলাবর্ষণ করতে লাগল, আর-একদল নৌকা বেয়ে তীরে উঠে শহরের ভিতরে সার বেঁধে প্রবেশ করলে। কেউ বাধা দিল না।
বাধা দেবে কে? সব লোক সে মুলুক ছেড়ে পিঠটান দিয়েছে! বোম্বেটেরা শহরে ঢুকে দেখলে, চারিদিকে খাঁ খাঁ করছে! তখন তারা সেখানকার বড়ো বড়ো ও ভালো ভালো বাড়িগুলো দখল করে বসল— তেমন সব বাড়িতে তারা জীবনে কোনওদিন বাস করেনি। বাড়িগুলোর ভিতরে ময়দা, রুটি, শূকর ও মদ প্রভৃতি প্রচুর পরিমাণে পেলে, কিন্তু ধনরত্ন সব যেন অদৃশ্য হয়েছে ফুসমন্ত্রে! যা পেলে তা-ই নিয়েই তারা আপাতত আমোদ-আহ্লাদ করতে বসল বটে, তবে তাদের বড়ো আশায় ছাই পড়ল!
কিন্তু লোলোনেজ হাল ছাড়লে না। সে জনাকয়েক বোম্বেটেকে পাঠিয়ে দিলে বনের ভিতরটা আঁতিপাতি করে খুঁজে দেখতে।
সেইরাত্রেই বোম্বেটেরা বনের ভিতর থেকে বিশজন স্ত্রী-পুরুষ, গাধার পিঠে চাপানো নানারকম মাল ও প্রায় নগদ লক্ষ টাকা নিয়ে ফিরে এল। কিন্তু একটা এত বড়ো শহরের পক্ষে লক্ষ টাকা তো তুচ্ছ জিনিস!
লোলোনেজ স্প্যানিয়ার্ডদের ডেকে জিজ্ঞাসা করল, 'টাকাকড়ি কোথায় লুকিয়ে ফেলেছিস?'
তারা কোনও সন্ধান দিল না।
তখন তাদের ভীষণ যন্ত্রণা দেওয়া হতে লাগল। তার ফলে কেবল জানা গেল যে টাকাকড়ি সব বনের ভিতরে লুকোনো আছে। কিন্তু কোথায় আছে, সে ঠিকানা পাওয়া গেল না।
লোলোনেজ রাগে অগ্নিমূর্তি হয়ে উঠল। সে হঠাৎ খাপ থেকে তলোয়ার খুলে একজন স্প্যানিয়ার্ডকে তখনই কেটে কুচি কুচি করে ফেলল। তারপর চোখ পাকিয়ে বললে, 'কী! বলবিনি! তাহলে একে একে সকলকেই আমি মোরগের মতো জবাই করব!'
এই নরপশুর ভয়ংকর স্বভাব দেখে বন্দিরা স্তম্ভিত হয়ে গেল! একজন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললে, 'বনে যারা লুকিয়ে আছে, চলুন তাদের দেখিয়ে দিচ্ছি!'
কিন্তু ডাকাতরা তাদের খুঁজতে আসছে, বনবাসী নাগরিকরা সে খবর পেয়েই ঊর্ধ্বশ্বাসে আবার নতুন এক জায়গায় গিয়ে গা-ঢাকা দিল! বোম্বেটেরা কারো টিকি পর্যন্ত দেখতে পেল না।
নিরুপায় হয়ে বোম্বেটেরা দিন পনেরো সেই শহরেই বাস করল।
তারপর লোলোনেজ বলল, 'বন্ধুগণ, এই শহরের ধড়িবাজ লোকগুলো আমাদের কলা দেখাতে চায়! এখানে অনেক খাবারদাবার আছে বটে, কিন্তু খাবার খেতে আমরা এখানে আসিনি। এখানকার ধনরত্ন ওরা সব জিব্রালটারে নিয়ে গেছে— চলো, আমরা জিব্রালটার আক্রমণ করি গে!'
তার অভিপ্রায় হাওয়ার আগেই জিব্রালটারে গিয়ে পৌঁছোল! সবাই আবার সে শহর ছেড়ে অন্য জায়গায় পালাবার জোগাড় করল।
কিন্তু সেখানকার শাসনকর্তা বললেন, 'তোমাদের কোনও ভয় নেই! আসুক-না বোম্বেটেরা— এখানে এলে বাছারা মজাটা টের পাবেন! আমি তাদের সমূলে বিনাশ করব!'
শাসনকর্তা ছিলেন একজন পাকা যোদ্ধা, তিনি ইয়োরোপে অনেক লড়াই করেছেন। তিনি তখনই অসংখ্য কামান ও আটশোজন সৈন্য নিয়ে বোম্বেটেদের অভ্যর্থনার আয়োজন করতে লাগলেন। সমুদ্রের দিকে কুড়িটি কামান বসানো হল। আর-একদিকে বসানো হল আটটা বড়ো বড়ো কামান। শহরে যাওয়ার একটি রাস্তা খুব শক্ত বেড়া দিয়ে বন্ধ করা হল। আর-একটা রাস্তা খুলে রাখা হল— তাতে এমন পুরু পাঁক ও কাদা ছিল যে, সেখান দিয়ে পথ চলাচল করা প্রায় অসম্ভব। সে পথে যারা আসবে সৈন্যদের অগ্নিবৃষ্টিতে তাদের অবস্থা হবে শোচনীয়।
বোম্বেটেরা যথাসময়ে নগর থেকে খানিক তফাতে এসে দেখল, শহরের উপরে স্পেন রাজের পতাকা উড়ছে সগর্বে এবং স্প্যানিয়ার্ডরা শ্রেণিবদ্ধ হয়ে তাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। এরা যে যুদ্ধের জন্যে এমন বিপুল আয়োজন করবে, লোলোনেজ তা কল্পনাও করতে পারেনি। কিন্তু এজন্যে সে ভীত হল না, দলের মাথাওয়ালা লোকদের ডেকে পরামর্শ করতে বসল। পরামর্শ হচ্ছে এই যে, স্প্যানিয়ার্ডরা যখন উচিতমতো আত্মরক্ষা করবার জন্যে এত বেশি সময় পেয়েছে এবং তাদের সৈন্যসংখ্যাও যখন এমন অসামান্য, তখন তাদের আর আক্রমণ করা উচিত কি না!
লোলোনেজ বললে, 'কিন্তু তবু আমি হতাশ হওয়ার কারণ দেখি না। তোমরা অনায়াসেই বুক বেঁধে দাঁড়াতে পারো! বীরপুরুষের মতো আত্মরক্ষা করবার শক্তি আমাদের আছে। আমি তোমাদের সর্দার, আমি যা বলি তা-ই করো! এর আগেও আজকের চেয়ে কম লোক নিয়ে আমরা এর চেয়েও বড়ো বিপদকে এড়াতে পেরেছি। শত্রুরা দলে যত ভারী হবে, আমাদের গৌরবও তত বাড়বে!'
বোম্বেটেদের ধারণা ছিল যে মারাকেবোর সমস্ত ধনরত্নই এইখানে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অতএব তারা একবাক্যে বললে, 'সর্দার, তুমি যা বলবে আমরা তা-ই করব! তুমি যেখানে যাবে আমরা সেইখানেই যাব!'
লোলোনেজ বজ্রগম্ভীর স্বরে বললে, 'শাবাশ! কিন্তু শুনে রাখো, তোমাদের মধ্যে যে-কেউ একটু ভয় পাবে, আমি তাকেই নিজের হাতে গুলি করে মেরে ফেলব!'
প্রায় চারশো বোম্বেটে যুদ্ধের আগে পরস্পরের সঙ্গে করমর্দন করে বিদায় নিলে— সেদিন যে কার জীবনের শেষদিন, তা কে জানে?
লোলোনেজ সকলকার আগে গিয়ে দাঁড়িয়ে নেতার স্থান অধিকার করলে। তারপর শূন্যে তরবারি তুলে দৃপ্তকণ্ঠে বললে, 'ভাই সব! এসো আমার সঙ্গে— মা ভৈঃ!' সকলে তার অনুসরণ করল।
প্রথম পথে গিয়ে তারা দেখলে, তা এমনভাবে বন্ধ যে এগোবার কোনও উপায় নেই।
দ্বিতীয় পথ হচ্ছে পাঁক ও কাদাভরা পথ— সেটা স্প্যানিয়ার্ডদের ফাঁদ!
তারা বনজঙ্গল থেকে ডালপালা-পাতা কেটে এনে পথের উপরে পুরু করে ছড়িয়ে দিতে লাগল— যাতে করে পাঁকে-কাদায় পা বসে যাবে না। ইতিমধ্যে স্প্যানিয়ার্ডদের কামান ও বন্দুক এমন ভীষণ গর্জন করতে লাগল যে, বোম্বেটেরা পরস্পরের গলার আওয়াজ পর্যন্ত শুনতে পেলে না! কিন্তু সেই ভয়াবহ গুলিগোলা-বৃষ্টির ভিতর দিয়েও তারা নির্ভয়ে ও অটল পদে সমান অগ্রসর হতে লাগল।
অবশেষে তারা শুকনো মাঠের উপরে এসে পড়ল। এখানে আরও ছয়টা বড়ো বড়ো নতুন কামান অগ্নি উদগার করতে আরম্ভ করল! ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় চারিদিক অমাবস্যার চেয়ে অন্ধকার! তার উপরে শত্রুরা আবার দুর্গ ছেড়ে বেরিয়ে এসে সবেগে তাদের আক্রমণ করল! সে এমন প্রবল আক্রমণ যে, বোম্বেটেরা পিছু না হটে পারল না! তাদের দলের অনেক লোক হত ও আহত হয়ে রক্তাক্ত মাটির উপরে লুটোতে লাগল।
বোম্বেটেরা বনের ভিতরে অন্য কোনও নতুন রাস্তা আবিষ্কারের চেষ্টা করলে— কিন্তু রাস্তা কোথাও নেই! শত্রুরা আর কেল্লা ছেড়ে বেরোবার নামও করল না— কিন্তু আড়াল থেকে সমান গোলাগুলি চালাতে লাগল।
লোলোনেজ তখন ভেবেচিন্তে পৃথিবীতে সব দেশেই সুপরিচিত একটি পুরোনো উপায় অবলম্বন করল— সকলকেই দিল হঠাৎ একসঙ্গে পালিয়ে যেতে হুকুম!
তাদের ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে দেখে স্প্যানিয়ার্ডরা মহা উৎসাহে বলে উঠল, 'ওরা পালাচ্ছে! ওরা পালাচ্ছে! এসো, পিছনে পিছনে গিয়ে ওদের আমরা বধ করি!'— তারা সার ভেঙে বিশৃঙ্খল হয়ে বোম্বেটেদের পিছনে পিছনে তেড়ে এল।
স্প্যানিয়ার্ডরা যখন অতিরিক্ত উৎসাহের ঝোঁকে কামানের গোলার সীমানা ছাড়িয়ে এগিয়ে এসেছে— বোম্বেটেরা তখন সর্দারের হুকুমে আচম্বিতে আবার ফিরে দাঁড়াল এবং প্রচণ্ড বিক্রমে শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল! বিষম হাতাহাতি লড়াই শুরু হল।
খানিক পরে দেখা গেল, দুশো স্প্যানিয়ার্ডের দেহ পৃথিবীকে বুকের রক্তে রাঙা করে ছেয়ে আছে এবং বাকি সবাই কেল্লার দিকে আসতে না পেরে বনের দিকে প্রাণের ভয়ে পলায়ন করছে!
কেল্লার স্প্যানিয়ার্ডরা তা-ই দেখে হতাশভাবে কামান ছোড়া বন্ধ করে বলে উঠল,— 'আমরা আত্মসমর্পণ করছি। আমাদের বধ কোরো না।'
কেল্লার উপর থেকে তখনই স্পেনের রাজপতাকা নামিয়ে ফেলা হল— সেখানে উড়তে থাকল বোম্বেটেদের পতাকা! কেল্লা ফতে! শহর তাদের হাতের মুঠোয়!
কিন্তু সাবধানের মার নেই— বলা তো যায় না, বনের পলাতক শত্রুরা আবার যদি সাহস সঞ্চয় করে ফিরে আসে! বোম্বেটেরা কেল্লার কামানগুলো আবার নিজেদের সুবিধামতো সাজিয়ে রাখলে!
মিথ্যা ভয়! রাত্রি প্রভাত, যারা পালিয়েছে তারা আর ফিরল না।
তখন হিসাবনিকাশ করে দেখা গেল, শত্রুদের মৃতদেহের সংখ্যা পাঁচশত! শহরের ভিতরে আহত লোকও অসংখ্য এবং তাদের ভিতরেও অনেকে মারা পড়ছে ও মারা পড়বে। বন্দি শত্রুর সংখ্যা একশো পঞ্চাশ ও ক্রীতদাসেরা গুনতিতে পাঁচশত।
বোম্বেটেদের লোক মরেছে মাত্র চল্লিশজন এবং জখম হয়েছে চল্লিশজন— যদিও ক্ষত বিষিয়ে আহতদেরও অধিকাংশই মারা পড়ল।
বোম্বেটেরা শত্রুদের মৃতদেহ নিয়ে দুখানা নৌকা বোঝাই করলে, তারপর সমুদ্রের ভিতরে গিয়ে নৌকা দুখানা ডুবিয়ে দিল।
তারপর আরম্ভ হল লুট! সোনার তাল, রুপোর তাল, হিরে-মুক্তো, ভালো ভালো দামি আসবাব ও নানারকম মাল— শহরের কোথাও আর কিছু বাকি রইল না! কিন্তু লোভ এমনই জিনিস, সারা শহর লুটেও বোম্বেটেদের আশ মিটল না, তাদের সন্দেহ হল আরও অনেক ধনরত্ন লুকিয়ে ফেলা হয়েছে! সুদীর্ঘ আঠারো দিন ধরে চলল অবাধে এই পরস্বাপহরণের বীভৎস পালা!
এরই মধ্যে বন্দি স্প্যানিয়ার্ডদের অধিকাংশই ইহলোক ত্যাগ করলে— অনাহারে! শহরে খাবার জিনিস— বিশেষ করে তাদের প্রধান আহার্য মাংসের যারপরনাই অভাব! যা ছিল তা বোম্বেটেদেরই পক্ষে অপ্রচুর। তা থেকে বন্দিদের ভাগ কেউ দিলে না। বন্দিদের খেতে দেওয়া হত খচ্চর ও গাধার মাংস। অনেকে তা মুখেই তুলতে পারত না, খিদের চোটে যারা তাও খেতে বাধ্য হত, অনভ্যাসের দরুন তারা পেটের অসুখে ভুগে ভবলীলা সাঙ্গ করল। অনেক বন্দিকে গুপ্তধন দেখিয়ে দেওয়ার জন্যে এমন দুঃসহ ও পাশবিক যন্ত্রণা দেওয়া হল যে, সইতে না পেরে তারাও পরলোকে প্রস্থান করল।
অল্প যে কয়েকজন বেঁচে ছিল, লোলোনেজ তাদের ডেকে বলল, 'তোমাদের ছেড়ে দিচ্ছি। তোমরা বনের ভিতর গিয়ে তোমাদের সঙ্গীদের বলো গে যাও যে, আমাকে আরও অনেক টাকা না দিলে আমি এই শহরে আগুন ধরিয়ে দেব। যাও, দু-দিন সময় দিলুম।'
দু-দিন কেটে গেল। বোম্বেটেরা তখন শহরে আগুন ধরাতে আরম্ভ করল।
স্প্যানিয়ার্ডরা দূর থেকে তা-ই দেখতে পেয়ে তখনই দূত পাঠিয়ে দিল। সে এসে জানাল, 'টাকা এখনই নিয়ে আসা হবে, দয়া করে আপনারা আগুন নিভিয়ে দিন!'
বোম্বেটেরা রাজি হল বটে, কিন্তু ততক্ষণে শহরের এক অংশ পুড়ে একেবারে ছাই হয়ে গেছে!
তারপর তাদের টাকা এল। তবু চার হপ্তা সেই শহরে দৈত্যলীলা করে সমস্ত ধনরত্ন নিয়ে তারা আবার জাহাজে গিয়ে উঠল।
আবার তারা মারাকেবো শহরে এসে হাজির! পাপ বিদায় হয়েছে ভেবে যারা ভরসা করে শহরে ফিরে এসেছিল, তারা ফের পালাতে লাগল!
বোম্বেটেরা তাদের খবর পাঠিয়ে দিলে যে, হয় আমাদের ধনরত্ন দিয়ে খুশি করো, নয় আমরা সারা শহর আবার লুট করে আগুন ধরিয়ে দেব!
অনেক টাকা পাঠিয়ে মারাকেবোর অধিবাসীরা এই আসন্ন বিপদ থেকে উদ্ধারলাভ করলে।
বিজয়গর্বে ফুলে উঠে লোলোনেজ আবার বোম্বেটে দ্বীপে ফিরে এল। তাদের অপূর্ব সৌভাগ্যের কাহিনি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ল— যারা তার সঙ্গী হয়নি তারা অনুতাপে হাহাকার করতে লাগল।
লোলোনেজ দলের প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অংশ কড়ায়-গন্ডায় বুঝিয়ে দিলে— প্রত্যেকেরই রোগা পকেট মোটা হয়ে ফুলে উঠল। কিন্তু তারা এমনই লক্ষ্মীছাড়া যে, জুয়া খেলে আর মদ খেয়ে দু-হাতে টাকা ওড়াতে লাগল। সে পাপের ধন আর বেশি দিন রইল না— অল্প দিন পরেই তারা যে গরিব ছিল সেই গরিবই হয়ে পড়ল। তখন তারা আবার নতুন শিকারের খোঁজে বেরিয়ে পড়বার জন্যে আগ্রহ প্রকাশ করতে লাগল!
সবাই বলে, 'সর্দার! আবার সাগরে জাহাজ ভাসাও!'
সর্দার বলে, 'তথাস্তু!'
সপ্তম পরিচ্ছেদ। মহাবিচারকের বিচার
বোম্বেটে দ্বীপে যদি ভালো গনৎকার থাকত তাহলে নিশ্চয়ই সে বলত, 'লোলোনেজ, সাবধান! এবারের যাত্রা শুভ নয়!'
কিন্তু সে কথা সে কানে তুলত কি না সন্দেহ! নিয়তির সূত্র তাকে বাইরে টানছে! সে অনেক পাপ করেছে, এবারে প্রতিক্রিয়ার সময় এসেছে!
ভবিষ্যৎ ভাববার সময় তার ছিল না, বর্তমানের ঔজ্জ্বল্যে সে অন্ধ! বোম্বেটে দ্বীপে তার চেয়ে বড়ো নাম আজ আর কারো নেই— সবাই তাকে ভয় করে সম্মান করে শ্রদ্ধা করে, যেন সে নরদেবতা! যেমন তার শক্তি, তেমনই ঐশ্বর্য!
কিন্তু তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাকে স্থির থাকতে দিলে না। তাই আবার সে যেদিন সমুদ্রযাত্রা করবে বললে, সেদিন সারা দেশে আনন্দ ও উৎসাহের বন্যা বইল! এবারে আর লোকজনের জন্যে তাকে একটুও মাথা ঘামাতে হল না, লোলোনেজের সঙ্গী হয়ে বিপদে পড়তেও লোকের এত আগ্রহ যে, তার দরজার সামনে উমেদার আর ধরে না। যত লোক সে চায়, তার চেয়ে ঢের বেশি লোক এসে তার কাছে ধরনা দিয়ে পড়ল।
লোলোনেজ নতুন করে ছয়খানা জাহাজ সাজালে। এবারে তার সঙ্গীর সংখ্যা হল সাতশত, এর মধ্যে তিনশোজন আগের বারেও তার সঙ্গে গিয়েছিল।
লোলোনেজ বললে, 'এবারে আমি নিকারাগুয়া জয় করতে যাব।'
আবার সমুদ্র! বাংলায় সমুদ্রের আর-এক নাম 'রত্নাকর' এবং এই বোম্বেটেদের পক্ষে সমুদ্র রত্নাকরই বটে!
কিন্তু এবারে রত্নের এখনও দেখা নেই! তার উপরে অনুকূল বায়ুর অভাব, বোম্বেটেদের জাহাজগুলো যেন অগ্রসর হতেই নারাজ! এইভাবে কিছুদিন কাটাবার পরেই খাদ্যাভাব উপস্থিত হল। তখন বাধ্য হয়েই বোম্বেটেরা প্রথম যে বন্দর দেখতে পেলে সেইখানেই জাহাজ নোঙর করল।
সমুদ্র থেকে একটা নদী ডাঙার মধ্যে গিয়ে ঢুকেছে, নাম তার জাগুয়া। তার তীরে তীরে অসভ্য ও দরিদ্র লাল মানুষ বা রেড ইন্ডিয়ানের বাস। বোম্বেটেরা নৌকায় চড়ে সেই নদীর ভিতরে গেল এবং রেড ইন্ডিয়ান বেচারাদের পালিত পশু ও অন্যান্য মালপত্তর নিঃশেষে কেড়ে নিলে— নিজেদের খাদ্যাভাব দূর করবার জন্যে।
কেবল তাইতেই খুশি হল না। তারা স্থির করলে, যতদিন না অনুকূল বাতাস বয় ততদিন তারা আর বাহির সমুদ্রে যাবে না, এই দেশের যত শহর আর গ্রাম লুট করে সময় কাটাবে আর পকেট পূর্ণ করবে।
তারা গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর লুট করতে করতে পুয়ের্টো কাভাল্যো মূল গ্রন্থের এই নামটি সম্ভবত ভুল। মধ্য আমেরিকার সমুদ্র উপকূলে পুয়ের্টো কাভাল্যো নামে কোনও বন্দরের সন্ধান পাওয়া যায়নি। দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলা প্রদেশের সমুদ্র উপকূলে ওই নামের একটা সমৃদ্ধিশালী বন্দর আছে। কিন্তু লোলোনেজ এবার এ অঞ্চলে আসেনি। খুব সম্ভব, সে হন্ডুরাস উপসাগরের মুখে পুয়ের্টো কর্টেজ বন্দরে বাহিনী রেখে ভিতরে প্রবেশ করেছিল। কর্টেজ বন্দর থেকে প্রায় ৩৬ মাইল ভিতরদিকে সান পেড্রো বা সেন্ট পিটার শহর এখনও বিদ্যমান রয়েছে। আমাদের পুস্তকের মানচিত্রে অনবধানবশত কর্টেজ বন্দর ও সেন্ট পিটার শহর দেখানো হয়নি। নামে এক বন্দরে এসে হাজির হল। সেখানে স্প্যানিয়ার্ডদের একটা আস্তানা ও একখানা বড়ো জাহাজ ছিল। তারা তৎক্ষণাৎ জাহাজখানা দখল করে স্প্যানিয়ার্ডদের আস্তানা লুটে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
এর মধ্যে তারা কত লোককে বন্দি করেছে, কত বন্দিকে অকথ্য যন্ত্রণা দিয়েছে ও কত বন্দিকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে, তার আর সংখ্যা হয় না। লোলোনেজের প্রকৃতি অতি ভয়ংকর! কারো জিভ সে নিজের হাতে টেনে বার করে ফেলে, কারোকে বা স্বহস্তে কেটে খণ্ড খণ্ড করে! যেখান দিয়ে তার দল পথ চলে সেখানটাই যেন ধু ধু শ্মশান হয়ে যায়! যেন সে নরদেহে প্রলয়কর্তা, যথেচ্ছভাবে ধ্বংস করাই তার একমাত্র কর্তব্য! স্প্যানিয়ার্ডদের কাছে সে যেন সাক্ষাৎ যম!
লোলোনেজের সঙ্গে আছে এখন তিনশো বোম্বেটে— বাকি লোকজন ও জাহাজগুলি সে তার সহকারী মোসেস ফ্যান ফিন নামে এক ওলন্দাজের তত্ত্বাবধানে সমুদ্র উপকূলে রেখে এসেছে। প্রায় ছত্রিশ মাইল পথ হেঁটে লোলোনেজ সান পেড্রো বা সেন্ট পিটার শহরের কাছাকাছি একটা বনের ধারে এসে পড়ল।
তার অত্যাচারে পাগলের মতো হয়ে স্প্যানিয়ার্ডরা বনের মধ্যে অপেক্ষা করছিল। বোম্বেটেদের দেখেই তারা গুলিবৃষ্টি আরম্ভ করলে। এখানে রীতিমতো একটা লড়াই হয়ে গেল এবং দুই পক্ষেই অনেক লোক হত ও আহত হল। তারপর স্প্যানিয়ার্ডরা পৃষ্ঠভঙ্গ দিলে। শত্রুদের যারা জখম হয়েছিল তাদের কারো উপরেই বোম্বেটেরা দয়া করলে না— একে একে সবাইকে পরলোকের পথে পাঠিয়ে দেয়।
যারা বন্দি হল তাদের ডেকে লোলোনেজ বললে, 'এই বনের ভিতর দিয়ে শহরে যাওয়ার আর কোনও ভালো রাস্তা আছে?'
তারা বললে, 'না।'
লোলোনেজ আবার গর্জন করে বললে, 'ভালো চাস তো এখনও বল!'
তারা বললে, 'আর রাস্তা নেই।'
লোলোনেজের মগজে শয়তান জেগে উঠল। সামনেই যে স্প্যানিয়ার্ড দাঁড়িয়েছিল, ঘাড় ধরে তাকে কাছে টেনে আনলে— যেন সে তারই মতো মানুষ নয়, তুচ্ছ একটা বলির পশুমাত্র! ফস করে খাপ থেকে চকচকে তলোয়ারখানা বার করে ফেললে এবং সেই হতভাগ্য স্প্যানিয়ার্ডের বুকের ভিতরে তরোয়ালের ডগা ঢুকিয়ে দিয়ে মস্ত একটা ছিদ্রের সৃষ্টি করলে— তার মর্মভেদী আর্তনাদে কিছুমাত্র কান না পেতেই! তারপর সেই তখনও জীবন্ত দেহের ছ্যাঁদা করা বুকের মধ্যে নিজের হাত ঢুকিয়ে দিলে এবং তার নৃত্যশীল, তপ্ত ও রক্তাক্ত হৃৎপিণ্ডটা সজোরে ছিনিয়ে নিয়ে নিজের মুখে পুরে পরম উপাদেয় খাদ্যের মতো কচমচ করে চিবোতে চিবোতে বললে, 'বল কোথায় রাস্তা আছে? নইলে তোদের হৃৎপিণ্ডও আমার খাবার হবে!'—
গল্পের রাক্ষস কি আজ মানুষমূর্তিতে সম্মুখে দেখা দিয়েছে? না এ ভূতপ্রেত, পিশাচ? বন্দিদের হৃৎপিণ্ডও যেন মহা আতঙ্কে বুকের ভিতরেই মূর্ছিত হয়ে পড়ল। শিউরোতে শিউরোতে তারা প্রায় রুদ্ধস্বরে বললে, 'আমরা পথ দেখিয়ে দিচ্ছি, আমরা পথ দেখিয়ে দিচ্ছি!'
রক্ত-মাখা ওষ্ঠাধর ফাঁক করে হা হা হা হা করে অট্টহাসি হাসতে হাসতে লোলোনেজ বললে, 'পথে এসো বাবা, পথে এসো! কোথায় পথ?'
কিন্তু কোথায় পথ? গভীর অরণ্য, গাছের পর গাছ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের পায়ের তলায় কাঁটাঝোপ আর জঙ্গল— অজগর সাপ ও জাগুয়ার বাঘ ছাড়া সেখান দিয়ে আর কেউ আনাগোনা করে না। বন্দিরা ভয়েই পথের নাম মুখে এনেছিল, আসলে সেখানে কোনও পথ ছিল না!
দাঁতে দাঁত ঘষতে ঘষতে লোলোনেজ বললে, 'পথ নেই? আচ্ছা, স্প্যানিয়ার্ড কুত্তারাই এজন্যে শাস্তিভোগ করবে!' লোলোনেজের শাস্তি— না জানি সে কী ভয়ানক!
এদিকে ও অঞ্চলের স্প্যানিয়ার্ডরা বুঝলে, এই দুর্ধর্ষ ও পাপিষ্ঠ বোম্বেটেদের জব্দ ও কাহিল করবার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে, বনের ভিতর অতর্কিতে বার বার আক্রমণ করা! এমনই বারংবার আক্রমণের ফলে বোম্বেটেরা সত্য সত্যই মহা জ্বালাতন হয়ে উঠল এবং তাদের সংখ্যাও ক্রমেই কমে আসতে লাগল! কিন্তু বাধা পেয়েও শেষ পর্যন্ত তারা সেন্ট পিটার শহরের কাছাকাছি এসে পড়ল।
এবার বিষম যুদ্ধ আরম্ভ হল। এ যুদ্ধে স্প্যানিয়ার্ডরা বড়ো বড়ো কামানও ব্যবহার করতে ছাড়লে না। কিন্তু যেই তারা কামান ছোড়ে, লোলোনেজের আদেশে বোম্বেটেরা অমনি মাটির উপরে শুয়ে পড়ে, তারপর গোলাগুলো তাদের পার হয়ে শূন্য দিয়ে চলে গেলেই, তারা চোখের নিমেষে উঠে পড়ে শহরের দিকে এগিয়ে যায় এবং হইহই রবে বোমার পর বোমা ছুড়তে থাকে! বোমা ছুড়ে বহু শত্রু নিপাত করেও একবার স্প্যানিয়ার্ডদের প্রবল আক্রমণে চোখে সরষে ফুল দেখতে দেখতে বোম্বেটেরা ঊর্ধ্বশ্বাসে পালিয়ে এল। কিন্তু লোলোনেজের দৃপ্তবাক্যে উত্তেজিত হয়ে আবার তারা ফিরে দাঁড়িয়ে তেড়ে গেল।
তখন স্প্যানিয়ার্ডদের সব সাহস ও শক্তি ফুরিয়ে গিয়েছে!
সাদা নিশান হাতে করে শত্রুদূত এসে জানালে, 'আমরা শহরের ফটক খুলে দিচ্ছি— কিন্তু এই শর্তে যে, দু-ঘণ্টার ভিতরে আমাদের উপরে কেউ কোনও অত্যাচার করতে পারবে না।'
আর বেশি লোকক্ষয় করতে না চেয়ে লোলোনেজ এই শর্তেই রাজি হয়ে গেল। শহরের ফটক খুলল। বোম্বেটেরা সার বেঁধে ভিতরে গিয়ে ঢুকল।
লোলোনেজ আজ একটু ভদ্রতার পরিচয় দিলে। ঠিক দুটি ঘণ্টা সে লক্ষ্মী ছেলের মতো হাত গুটিয়ে চুপটি করে বসে রইল। শত্রুরা দামি জিনিসপত্তর নিয়ে দলে দলে সরে পড়ছে দেখেও নিজের শয়তানিকে সে চেপে রাখলে! হঠাৎ তার এ সাধুতা, এ দুর্বলতা কেন? এ অনুতাপ কি অন্তিমকালের হরিনামের মতো?
ঠিক দু-ঘণ্টার জন্যে সৎপ্রবৃত্তির আনন্দ উপভোগ করে কুম্ভকর্ণ আবার ভীম হংকারে জেগে উঠল, 'লুট করো! বন্দি করো! হত্যা করো! দু-ঘণ্টা কাবার!' যারা তখনও পালাতে পারেনি তারা এবং শহরে তখনও যা অবশিষ্ট ছিল সমস্তই বোম্বেটেদের হস্তগত হল। কিন্তু সে এমন বেশি কিছু নয়! স্প্যানিয়ার্ডরা সন্ধির দু-ঘণ্টার রীতিমতো সদব্যবহার করেছে!
বোম্বেটেরা দিনকয় নগরেই বাস করলে, এবং এ কয়দিন তাদের স্বভাবগত নিষ্ঠুরতার, কদর্যতার ও ভীষণতার পরিচয় দিতে কিছুমাত্র ত্রুটি করলে না। এখান থেকে যাত্রা করবার দিনে তারা শহরেও আগুন লাগিয়ে দিয়ে গেল। সেই সাংঘাতিক দেওয়ালি উৎসব শেষ হলে পর দেখা গেল, আগে যেখানে শহর ছিল এখন সেখানে পড়ে রয়েছে শুধু বিরাট একটা ভস্মের পাহাড়!
সেন্ট পিটার শহর ধ্বংস করে লোলোনেজ খোশমেজাজে সমুদ্রতীরে ফিরে এল। তার দলের যেসব লোক জাহাজ ও নৌকা নিয়ে সেখানে তার জন্যে অপেক্ষা করছিল, তাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে সে আবার নতুন শিকারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল।
দু-একদিন পরে গুয়াটেমালা নদীর মোহনায় এসে বোম্বেটেরা খবর পেলে যে, স্প্যানিয়ার্ডদের একখানা জাহাজ সেখানে এসে উপস্থিত হবে। তারা সেই জাহাজের অপেক্ষায় দলে দলে সেখানে পাহারা দিতে লাগল। কোনও দল সাগরের বুকে ছোটো ছোটো দ্বীপে কাছিম ধরতে গেল। কোনও দল গেল সেখানকার রেড ইন্ডিয়ান ধীবরদের উপরে অত্যাচার করতে।
সেখানকার রেড ইন্ডিয়ানরা তখন একশো বছর ধরে স্প্যানিয়ার্ডদের অধীনে বাস করে আসছে। স্প্যানিয়ার্ডদের চাকরবাকর দরকার হলে তারাই এসে কাজকর্ম করে দিয়ে যায়। স্প্যানিয়ার্ডরা তাদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা দিয়েছিল।
কিছুকাল তারা খ্রিস্টধর্মের নিয়ম পালন করে। কিন্তু স্প্যানিয়ার্ড প্রভুদের অধার্মিকের মতো ব্যবহার ও হিংস্র আর পশু-প্রকৃতি দেখে খ্রিস্টধর্মে বোধহয় তাদের ভক্তি চটে যায়। তখন আবার তারা পিতৃ-পিতামহের ধর্মকে ফিরে ফিরতি গ্রহণ করে।
হিন্দুদের নাকি তেত্রিশ কোটি দেবতা আছে। কিন্তু তাদের দেবতাদের 'সেনসাস' কখনো নেওয়া হয়েছিল কি না জানি না। তবে রেড ইন্ডিয়ান দেবতারাও দলে খুব হালকা হবেন বলে মনে হয় না। কেননা তাদের ঘরে ঘরে নতুন নতুন দেবতার রকম-বেরকম লীলাখেলা দেখা যায়।
তাদের দেবতা নির্বাচনের একটা পদ্ধতির কথা বলি।
পরিবারের মধ্যে যে মুহূর্তে একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে, তারা তখনই তাকে নিয়ে বনের ভিতরে মন্দিরে গিয়ে উপস্থিত হয়।
মেঝের উপরে মণ্ডলাকারে খানিকটা জায়গা খুঁড়ে তার মধ্যে পুরু করে ছাই বিছিয়ে দেয়। তারপরে সেই ছাইয়ের উপরে নবজাত শিশুকে শুইয়ে রেখে চলে আসে। মন্দিরের চারিদিকের সব দরজা খোলা থাকে। তার কাছে আর জনপ্রাণীও যায় না। যে-কোনও হিংস্র জন্তু মন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে, কিন্তু কোনও মানুষ আসবার হুকুম নেই। সারারাত এইভাবে কেটে যায়।
সকালে শিশুর পিতা ও অন্যান্য আত্মীয়েরা আবার মন্দিরের ভিতরে আসে। অনেক সময়ে দেখা যায়, হিংস্র জন্তুর আক্রমণে বা অন্য কারণে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অনেক সময়ে দেখা যায় জীবন্ত ও অক্ষত শিশুকে। তখন সকলে ছাইয়ের উপরে কোনও জন্তুর পদচিহ্ন আছে কি না পরীক্ষা করে। পদচিহ্ন যদি না থাকে, তবে সেই শিশুকে আবার সেখানে একলা রাত্রিবাস করতে হয়। আর পদচিহ্ন যদি থাকে তবে পরখ করে দেখা হয়, সেগুলো কোনো জন্তুর পদচিহ্ন।
যে জন্তুর পদচিহ্ন সেখানে থাকবে, সেই জন্তুই হবে শিশুর দেবতা— তার সারাজীবনের উপাস্য!
এখন আবার বোম্বেটেরা কী করছে দেখা যাক।
প্রায় তিন মাস পরে খবর এসেছে, স্প্যানিয়ার্ডদের জাহাজ বন্দরে দেখা দিয়েছে। সবাই সেইদিকে ছুটল।
বড়ো যে-সে জাহাজ নয়, প্রকাণ্ড আকার, উপরে অনেক সৈন্যসামন্ত, বিয়াল্লিশটা কামান!
কিন্তু এসবের দিকে লোলোনেজ একটুও ভ্রূক্ষেপ করলে না, সে ভয়ের ধার ধারে না।
বোম্বেটেরা একজোট হয়ে জাহাজখানাকে আক্রমণ করলে এবং জাহাজের একশো তিরিশজন সৈন্যও তাদের বাধা দেওয়ার জন্যে কম চেষ্টা করলে না, তবু শেষকালে জিত হল বোম্বেটেদেরই। কিন্তু এত পরিশ্রম ও লোকক্ষয়ের পরে জাহাজ দখল করেও বোম্বেটেরা হতাশ হয়ে পড়ল। তার ভিতরে লুট করবার মতো বিশেষ কিছুই নেই।
লোলোনেজ তখন পরামর্শসভা আহ্বান করলে। সে বললে, 'এইবারে আমি গুয়াতেমালার দিকে যেতে চাই। তোমাদের মত কী?'
অনেকেই বললে, 'আমরা এইবার এ দেশ ছেড়ে ফিরে যেতে চাই।'
লোলোনেজ বললে, 'কিন্তু আমি ফিরব না।'
তারা বললে, 'কিন্তু আমরা ফিরব।'
যারা এ কথা বললে তাদের অধিকাংশই হচ্ছে নতুন লোক— লোলোনেজের পূর্ব অভিযানে তারা তার সঙ্গে ছিল না। গত অভিযানের ফল দেখে তারা ভেবেছিল বোম্বেটের জীবন হচ্ছে অত্যন্ত রঙিন, গাছ নাড়া দিলে যেমন ফল ঝরে, রাশি রাশি মোহর ঝরাও বুঝি তেমনই সহজ! কিন্তু তাদের লাখ টাকার স্বপ্নঘোর আজ ছুটে গেছে।
তারা দলে রইল না। লোলোনেজের দলকে একেবারে হালকা করে দিয়ে বেশির ভাগ বোম্বেটেই কয়েকখানা জাহাজ নিয়ে সরে পড়ল। বনে বনে কাঁটাঝোপে ঘুরে, অনাহারে অল্পাহারে অনিদ্রায় কষ্ট পেয়ে ও স্প্যানিয়ার্ডদের গরম গরম গুলি খেয়ে খেয়ে তাদের শখ ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে এসেছিল!
দল খুব ছোটো হয়ে গেল, অন্য কেউ হলে এখানে আর থাকত না, কিন্তু একগুঁয়ে লোলোনেজ গ্রাহ্যও করলে না। সিংহের মতন তার মেজাজ— নিষ্ঠুর, গর্বিত, অদম্য! সমুদ্রের কিনারে কিনারে বনের ভিতর দিয়ে বোম্বেটের দল চলেছে। খাদ্যাভাব হওয়াতে তারা বানর মেরে তারই মাংস ভক্ষণ করতে লাগল— তবু অজানার নেশায় পথ চলা তাদের থামল না। কিন্তু তখনও লোলোনেজ আন্দাজ করতে পারেনি, তার পাপের পেয়ালা কানায় কানায় ভরে উঠেছে!
যেখান দিয়ে তারা যাচ্ছে সেখানকার রেড ইন্ডিয়ানরাও যে শান্ত ছেলে নয়, একদিন তার প্রমাণ পাওয়া গেল। আগেই বলেছি, বোম্বেটেরা রেড ইন্ডিয়ানদেরও উপরে কম নিষ্ঠুর ব্যবহার করেনি, সুতরাং তারাও তাদের বাগে পেলে ছেড়ে কথা কয় না।
বোম্বেটেদের দলে একজন ফরাসি ও একজন স্প্যানিয়ার্ড ছিল।
একদিন তারা দলছাড়া হয়ে খাদ্য বা অন্য কিছুর খোঁজে বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন সময়ে দেখতে পেলে, একদল সশস্ত্র রেড ইন্ডিয়ান তাদের দিকে ছুটে আসছে!
ছুটে কাছে এসে তারা যে আদর করে তাদের কোলে টেনে নেবে না, বোম্বেটেরা এটুকু বুঝতে পারলে। তারাও তরোয়াল বার করলে, কিন্তু দুখানা তরবারি দ্বারা এত লোককে ঠেকানো সোজা কথা নয়। তখন তারা পদযুগলের উপরে নির্ভর করাই উচিত মনে করলে।
ফরাসি বোম্বেটের পদযুগল এমন সুপটু ছিল যে, তিরের মতন সে অদৃশ্য হয়ে গেল। কিন্তু স্প্যানিয়ার্ড ভায়া পায়ের কাজ ভালো করে শেখেনি, রেড ইন্ডিয়ানরা তাকে ধরে ফেললে।
দু-চার দিন পরে অন্যান্য বোম্বেটেদের সঙ্গে সেই ফরাসি আবার সঙ্গীর খোঁজে ঘটনাস্থলে এসে হাজির হল।
দেখা গেল, সেখানে একটা অগ্নিকুণ্ড রয়েছে, কিন্তু তার ভিতরে আগুন নেই। খানিক তফাতে পড়ে রয়েছে কতকগুলো হাড়। বোম্বেটেরা আন্দাজ করলে, স্প্যানিয়ার্ড ভায়ার দেহে 'রোস্ট' বানিয়ে রেড ইন্ডিয়ানরা উদর পরিতৃপ্ত করেছে! অবশ্য এ অনুমান ভুল হতে পারে। কিন্তু স্প্যানিয়ার্ডকে আর পাওয়া যায়নি।
এদিকে লোলোনেজের অবস্থা কেমন দাঁড়িয়েছে দেখুন। দলের অনেকে তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ায় সে শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। বিপদের উপর বিপদ! রেড ইন্ডিয়ানরা স্প্যানিয়ার্ডদের সঙ্গে যোগ দিয়ে পিছনে লেগেছে। বোম্বেটেদের তারা বুঝেছে। এই হতচ্ছাড়া বোম্বেটেগুলো হচ্ছে কলেরা, বসন্ত ও প্লেগের মতো সমস্ত মানুষ জাতেরই শত্রু! এদের উচ্ছেদ না করতে পারলে শান্তি নেই!
দিনের পর দিন তাদের সঙ্গে লড়ে লড়ে বোম্বেটেদের অধিকাংশই মারা পড়ল। তবু লোলোনেজ ফেরবার নাম মুখে আনে না!
কিন্তু শেষটা ফিরতে হল। এবার ফিরে লোলোনেজ তার সত্যিকার স্বদেশে গেল— অর্থাৎ নরকে; এবং সেই মহাপ্রস্থানের দৃশ্য লোলোনেজেরই উপযোগী।
ডেরিয়েন প্রদেশের রেড ইন্ডিয়ানরা একদিন বোম্বেটেদের ক্ষুদ্র দলকে আক্রমণ করলে। তাদের বেশির ভাগ মারা পড়ল, কতক পালাল, কতক বন্দি হল। বন্দিদের ভিতরে ছিল লোলোনেজ স্বয়ং! হাজার হাজার বন্দির রক্তে যার হাত এখনও ভিজে আছে, সেই লোলোনেজ আজ বন্দি!
এমন বন্দিকে যেভাবে অভ্যর্থনা করতে হয়, রেড ইন্ডিয়ানরা তা-ই করলে। তারা আগে লোলোনেজকে একটা গাছের গুঁড়িতে বাঁধলে। তারপর তার সম্মুখে বড়ো অগ্নিকুণ্ড জ্বাললে।
কেউ হয়তো জীবন্ত লোলোনেজের নাক কেটে নিয়ে আগুনে ফেলে দিলে। কেউ কেটে নিলে কান। কেউ কাটলে জিভ। কেউ কাটলে হাত এবং কেউ বা পা। এইভাবে ক্রমে ক্রমে তার ভয়াবহ মৃত্যু ঘটল। তার দেহের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যখন পুড়ে ছাই হয়ে গেল, রেড ইন্ডিয়ানরা তখন সেই ছাইগুলো নিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দিলে— যাতে এই অমানুষিক মানুষের কোনও ঘৃণিত স্মৃতিই পৃথিবীকে আর কলঙ্কিত না করতে পারে!
তার পাপসঙ্গীদেরও ওই দুর্দশাই হল। কেবল একজন অনেক সাধ্যসাধনার পর কোনওগতিকে শেষটা মুক্তি পেয়েছিল; বোম্বেটেদের এই শোচনীয় পরিণামের কথা প্রকাশ পায় তার মুখেই।
লোলোনেজের পরিণামই আভাস দেয় যে, জীবের শিয়রে হয়তো সত্যই কোনও অদৃশ্য মহাবিচারকের দৃষ্টি সর্বদাই সজাগ হয়ে আছে!
অষ্টম পরিচ্ছেদ। এ অঞ্চলের জানোয়ার
যে মুলুকের মানুষ-জানোয়ারের কথা নিয়ে এত আলোচনা করছি, সেখানে জলে-স্থলে আসল জানোয়ারও আছে অনেকরকম। মাঝখানে একটুখানি হাঁপ ছাড়বার জন্যে তাদের কারো কারো কথা এখানে কিছু বলতে চাই।
এখানে স্থলে থাকে অজগর, জাগুয়ার, পুমা, বানর, টেপির, প্রবাল সাপ, অন্ধ সাপ, আর্মাডিলো, ভ্যাম্পায়ার বাদুড় প্রভৃতি এবং জলে থাকে কুমির, হাঙর, লন্ঠনমাছ, ব্যাংমাছ, কাছিম, শুশুক, অক্টোপাস, খুনে তিমি, স্কুইড, উকোমাছ, ছিপধারী মাছ, পাইপমাছ, সিল, উড়ন্ত মাছ, ফিতেমাছ এবং অন্যান্য তিমিজাতীয় মাছ প্রভৃতি— সব জীবজন্তুর ফর্দও এখানে দেওয়া অসম্ভব। এদের মধ্যে অনেক জন্তুই খোশমেজাজে ও বোম্বেটেদের চেয়ে কম হিংসুটে নয়, একটু সুবিধা পেলেই মানুষকে ফলার করবার জন্যে তারা হাঁ করে ছুটে আসে!
দু-একটা জন্তুর ভীষণ প্রকৃতির কথা এখানে বলব।
এখানে যে জাতের কুমির পাওয়া যায়, তাদের 'কেম্যান' বলে ডাকা হয়। ভারতীয় কুমিরের সঙ্গে তাদের চেহারা ও প্রকৃতি ঠিক মেলে না। বোম্বেটেরা এইসব কুমিরের ভয়ে সর্বদাই তটস্থ হয়ে থাকত। একজন বোম্বেটে এই 'কেম্যান' সম্বন্ধে যা বলছে তা হচ্ছে এই।
'এইসব কেম্যান ভয়ংকর জীব। সময়ে সময়ে এক-একটা সত্তর ফুট লম্বা কেম্যানও দেখা গিয়েছে। নদীর ধার ঘেঁষে এমন নিশ্চেষ্ট হয়ে তারা ভাসতে থাকে যে দেখলেই মনে হয়, যেন একটা পুরোনো গাছ পড়ে গিয়ে জলে ভাসছে। সেই সময়ে কোনও গোরু কি মানুষ নদীর ধারে এলে আর তার বাঁচোয়া নেই!
এদের দুষ্টু বুদ্ধিও বড়ো কম নয়। শিকার ধরবার আগে তিন-চার দিন ধরে এরা উপোস করে। সেই সময়ে ডুব মেরে নদীর তলায় গিয়ে কয়েক মন পাথর বা নুড়ি গিলে ফেলে এরা নিজেদের দেহ আরও বেশি ভারী করে তোলে। ফলে তাদের স্বাভাবিক শক্তি অধিকতর বেড়ে ওঠে।
কেম্যানরা শিকার ধরে টাটকা মাংস খায় না। আধপচা না-হওয়া পর্যন্ত তাদের জলের তলায় ডুবিয়ে রাখে। তাদের আরও অদ্ভুত রুচি আছে। এখানকার লোকেরা নদীর কাছাকাছি জায়গায় যদি মরা জন্তুর চামড়া শুকোবার জন্যে রেখে দেয়, তাহলে কেম্যানরা প্রায়ই ডাঙায় উঠে সেগুলো চুরি করে নিয়ে পালায়। সেই চামড়াগুলো কিছুদিন জলে ভিজলেই তাদের লোমগুলো ঝরে পড়ে যায়। তখন তারা সেগুলো খেয়ে ফেলে।
একদিন একজন লোক নদীর জলে তার তাঁবু কাচছিল। হঠাৎ একটা কেম্যান এসে সেই তাঁবু কামড়ে ধরে জলে ডুব মারবার চেষ্টা করলে। সে ব্যক্তি অত সহজে তাঁবু খোয়াতে নারাজ হল— তাঁবুর একদিক ধরে প্রাণপণে টানাটানি করতে লাগল। বাধা পেয়ে কেম্যানের মেজাজ গেল চটে। সে এক ডিগবাজি খেয়ে জল থেকে ডাঙায় উঠে তাঁবুর অধিকারীকেও নিয়ে নদীর মধ্যে ডুব মারবার ফিকির করলে।
ভাগ্যে লোকটির কাছে একখানা বড়ো কসাই-ছুরি ছিল এবং ভাগ্যে সে কেম্যানের দেহের ঠিক জায়গায় ছুরিখানা দৈবগতিকে বসিয়ে দিতে পারলে, তাই লোকটিকে ছেড়ে দিয়ে সেই জলদানব তখনই খাবি খেতে বাধ্য হল! তার পেট ফেঁড়ে পাওয়া গেল রাশি রাশি বড়ো বড়ো নোড়ানুড়ি!
কেবল বড়ো বড়ো জীব নয়, কেম্যানরা পুঁচকে মাছি পেলেও টপ করে খেয়ে ফেলতে ছাড়ে না।
কেম্যানরা ডাঙায় উঠে ডিম ছাড়ে এবং ডিমগুলোর উপরে পা দিয়ে বালি উড়িয়ে দেয়। রোদের আঁচে ডিম ফোটে, এবং বাচ্চাগুলো ডিম ছেড়ে বেরিয়েই জলের ভিতরে চলে যায়। পাখিরা অনেক সময় ডিম নষ্ট করে। মা কেম্যান সেদিকেও নজর রাখতে ভোলে না। পাখির ঝাঁক আসবার সম্ভাবনা দেখলে প্রায়ই তারা নিজেদের ডিম আবার কোঁৎকোঁৎ করে গিলে ফেলে! তারপর বিপদ কেটে গেলে ডিমগুলোকে ফের হড়াৎ করে উগরে বার করে দেয়!
ডিম ফুটলে মা কেম্যান তার বাচ্চাদের নিয়ে জলে খেলা করে। আমি স্বচক্ষে দেখেছি, খেলা করতে করতে বাচ্চা কেম্যানরা তাদের মায়ের মুখের ভিতর দিয়ে পেটের ভিতরে গিয়ে ঢুকছে, আবার বেরিয়ে আসছে!
নদীপ্রধান জায়গায় আড্ডা গাড়তে হলে এই কেম্যানদের ভয়ে সব সময়েই আমরা ব্যস্ত থাকতুম। রাত্রে কাউকে পাহারায় না রেখে ঘুমোতে পারতুম না।
আমাদের দলের একজন লোক একবার তার কাফ্রি চাকরের সঙ্গে বনের ভিতরে ঢুকেছিল। কোথায় কোন ঝোপে একটা পাজি কেম্যান ঘাপটি মেরে ছিল, হঠাৎ সে বেরিয়ে এসে লোকটির একখানা পা কামড়ে ধরে মাটিতে পেড়ে ফেললে। তা-ই না দেখেই কাফ্রি চাকরটা— সাহায্য করা দূরে থাক— টেনে লম্বা দিলে।
আমাদের বন্ধু ভীরু ছিল না, বিপদে পড়ে ভেবড়ে গেল না। তার গায়ে জোরও ছিল যথেষ্ট, যদিও সে জোর কেম্যানের পাল্লায় পড়ে বেশি কাজে লাগল না। কিন্তু সে তার লম্বা ছুরিখানা নিয়ে কেম্যানের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগল। এ যুদ্ধ ডাঙায় হচ্ছিল বলেই রক্ষা, তাই খানিকক্ষণ যোঝাযুঝির পরে অনেকগুলো ছুরির ঘা খেয়ে কেম্যানটা ছটফট করতে করতে মারা পড়ল। আমাদের বন্ধুর সর্বাঙ্গ তখন ক্ষতবিক্ষত। রক্তপাতে নেহাত দুর্বল হয়ে সেইখানেই মড়ার মতো পড়ে রইল।
এতক্ষণ পরে কাফ্রি বীরের মনে হল, তার মনিবের অবস্থাটা কীরকম, একবার উঁকি মেরে দেখে আসা উচিত! তার মনিবের দেহ কেম্যানের উদরে অদৃশ্য হয়ে যায়নি দেখে সে আশ্বস্ত হয়ে তাকে পিঠে তুলে নিয়ে প্রায় তিন মাইল পথ পেরিয়ে আমাদের কাছে এসে হাজির হল। আমরা তখনই তাকে জাহাজে নিয়ে এলুম।
এই বদমাইশ কেম্যানরা প্রায়ই আমাদের জাহাজের কাছে আসত এবং জাহাজের গায়ে আঁচড়াআঁচড়ি করত। একদিন দড়িতে লোহার হুক লাগিয়ে আমরা একটা মস্ত কেম্যান ধরলুম। ধরা পড়ে সে কিন্তু জলের দিকে গেল না, উলটে জাহাজের মই বেয়ে উপরদিকেই উঠতে লাগল! তখন আমরা ব্যস্ত হয়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তার দফা একেবারে রফা করে দিলুম!
ও মুলুকে খোলা হাওয়ায় রাত্রে কি ঘুমিয়েও নিশ্চিন্ত হওয়ার জো আছে? ওখানে রাত্রে পিশাচ বাদুড়রা শিকার খোঁজে! তারা এমন চুপিসারে এসে মানুষের গায়ে ক্ষুরধার দাঁত দিয়ে ছ্যাঁদা করে রক্ত টেনে নেয় যে, মানুষের ঘুম প্রায়ই ভাঙে না। আর না-ভাঙাই ভালো! কারণ রক্তপানের পর ওই পিশাচ বাদুড়েরা লালা দিয়ে ক্ষতস্থানের মুখ বন্ধ করে দিয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ বাধা পেয়ে তারা যদি উড়ে যেতে বাধ্য হয়, তাহলে ক্ষতের রক্ত পড়া আর সহজে বন্ধ হতে চায় না। পিশাচ বাদুড়ের লালা কেবল রক্ত বন্ধ করে না, ক্ষতস্থান বিষিয়ে উঠতেও দেয় না।
এ-দেশে বাঘজাতীয় জন্তুদের মধ্যে জাগুয়ার আর পুমাই প্রধান। জাগুয়ার পুমার চেয়ে আকারে বড়ো হয় এবং তার প্রকৃতিও বেশি হিংস্র। তারা প্রায়ই মানুষকে আক্রমণ করতে ছাড়ে না। তাদের আক্রমণ আরও বিপজ্জনক এইজন্যে যে, তারা গাছের ডালে পাতার আড়ালে লুকিয়ে বসে থাকে এবং তাদের কখন যে কার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়বার বিদঘুটে শখ হবে, আগে থাকতে তা জানতে পারা যায় না।
পুমারাও গাছে চড়তে পারে। ব্রেজিলে তাদের 'কাউগার' বলে ডাকা হয়। উত্তর আমেরিকায় তাদের আর-একটা নাম— 'পেন্টার'। 'পুমা' হচ্ছে পেরু দেশীয় নাম— যদিও ওই নামই বেশি চলে। তারা ল্যাজসুদ্ধ লম্বা হয় ছয় থেকে নয় ফুট পর্যন্ত।
পুমারা সবচেয়ে খেতে ভালোবাসে ঘোড়ার মাংস। অভাবে গোরু, মোষ, শূকর, হরিণ, ভেড়া, খরগোশ— এমনকী ইঁদুর ও শামুক পর্যন্ত! বানরও তাদের মনের মতো। বানররা এ গাছ থেকে ও গাছে লাফিয়েও পার পায় না, কারণ গাছে গাছে লাফালাফি করতে বানরদের চেয়ে পুমারাও কম তৎপর নয়। মাটি থেকে বিশ ফুট উঁচুতে লাফিয়ে পুমারা গাছের ডালে চড়তে পারে! দীর্ঘ লম্ফে তারা প্রায় চল্লিশ ফুট জমি পার হয়ে যায়!
কিন্তু মানুষের পক্ষে পুমা মোটেই বিপজ্জনক নয়। কারণ তারা মানুষকে সহজেই কাত করে ফেলতে পারলেও সাধারণত মানুষকে তেড়ে আক্রমণ করে না। এমনকী, অনেক সময়ে মানুষ তাকে আক্রমণ করলেও সে আত্মরক্ষার চেষ্টা পর্যন্ত করে না! অথচ এই পুমা তার চেয়ে বড়ো ও হিংস্র জীব জাগুয়ারকেও আক্রমণ করে।
মধ্য আমেরিকার এক কাঠুরে একদিন জঙ্গলে গিয়েছিল। হঠাৎ একটা পুমা ল্যাজ তুলে বনের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল এবং আদুরে বিড়ালের মতো ঘড়র ঘড়র শব্দ করতে করতে সেই কাঠুরের পায়ের ফাঁক দিয়ে খেলাচ্ছলে আনাগোনা করতে লাগল! কিন্তু সেই পুমা বেচারার অদৃষ্ট ছিল নেহাত মন্দ। কারণ কাঠুরে এমন ভয় পেলে যে, তার কুড়ুলের বাড়ি পুমাকে দিলে এক ঘা বসিয়ে! পুমা তখন সেই বদরসিকের কাছ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হল।
হাডসন সাহেব বলেন, 'আমি একবার একটা পুমাকে বধ করে অত্যন্ত দুঃখিত হয়েছিলুম। তাকে ধরেছিলুম আমি গলায় ফাঁসকল লাগিয়ে। সে একটা পাথরে ঠেসান দিয়ে চুপ করে বসে রইল। আমি যখন ছোরা তুললুম সে পালাবার চেষ্টা পর্যন্ত করলে না। তাকে দেখে মনে হল, আমি যে তাকে বধ করব সে যেন তা বুঝতে পেরেছে! সে কাঁপতে লাগল, তার দু-চোখে জল ঝরতে লাগল, সে করুণস্বরে আর্তনাদ করতে লাগল। তাকে বধ করার পর আমার মনে হল আমি যেন হত্যাকারী!'
রেড ইন্ডিয়ানরা কিছুতেই পুমাকে মারতে চায় না। তাদের বিশ্বাস, পুমাকে বধ করলে সেই মুহূর্তেই মানুষের মৃত্যু হয়। রেড ইন্ডিয়ানরাই হচ্ছে আমেরিকার আদিম অধিবাসী। তারা পুমাকে মারে না বলেই বোধহয় পুমাও মানুষকে হিংসা করতে অভ্যস্ত হয়নি।
গোরিলার মতো বড়ো জাতের বানর পৃথিবীতে আর নেই বলে শোনা যায়। কিন্তু হালে দক্ষিণ আমেরিকায় টাররা নদীর ধারে অদ্ভুত ও বৃহৎ এক অজানা জাতের বানরের সন্ধান পাওয়া গেছে।
একদল লোক নদীর ধার দিয়ে যাচ্ছিল, আচম্বিতে দুটো প্রকাণ্ড বানর জঙ্গল থেকে বেরিয়ে তাদের আক্রমণ করে। একটাকে তারা গুলি করে মেরে ফেললে এবং অন্যটা আবার জঙ্গলের আড়ালে পালিয়ে গেল। যেটা মারা পড়ল সেটা স্ত্রীজাতীয় বানর হলেও তার মাথার উচ্চতা পাঁচ ফুটেরও বেশি। এর থেকেই বোঝা যায়; এ জাতের নর-বানররা মাথায় আরও বেশি ঢ্যাঙা। এই অদ্ভুত জীব অনেকটা গোরিলার মতো দেখতে হলেও গোরিলা নয় মোটেই। পণ্ডিতরা বলছেন, এরা মানুষ ও বানরের মাঝামাঝি জীব! এই নতুন আবিষ্কার জীবতত্ত্ববিদদের মধ্যে বিশেষ উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। পণ্ডিতরা বহুদিন ধরে মানুষ ও বানরের মাঝামাঝি জীবের সন্ধান করে আসছেন, হয়তো এরা তাঁদের চিন্তার খোরাক জোগাবে। এদের গায়ের জোর কত, আজও সে পরীক্ষার সুবিধা পাওয়া যায়নি, তবে শক্তিতে হয়তো এরাও গোরিলার চেয়ে কম যায় না।
নবম পরিচ্ছেদ। মহাবীর গভর্নর
এইবার কাপ্তেন মর্গ্যানের পালা শুরু করা যাক। প্রথম পরিচ্ছেদেই মর্গ্যানের মোটামুটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও ছবি দিয়েছি। এই চাষার ছেলে মর্গ্যান বোম্বেটের ব্যবসায় অবলম্বন করেও কেমন করে 'স্যার' পদবি পেয়ে লাটের গদিতে বসেছিল তারই বিচিত্র ইতিহাস বলব। এ সত্য ইতিহাস যে-কোনও কাল্পনিক উপন্যাসেরও চেয়ে চিত্তাকর্ষক।
মর্গ্যানের আর-একটা উপাধি হচ্ছে— 'বোম্বেটের রাজা'! লোলোনেজের চেয়ে সে কম শক্তির পরিচয় তো দেয়নি বটেই, বরং সময়ে সময়ে তার কীর্তি লোলোনেজের যশোগৌরবকেও ম্লান করে দিয়েছে!
হেনরি মর্গ্যানের জন্ম ইংল্যান্ডের ওয়েলস প্রদেশে। তার বাবা ছিলেন এক সাধু ও ধনী চাষি— নিজের সমাজে তিনি ছিলেন এক মাননীয় ব্যক্তি। কিন্তু ছেলে-বয়স থেকেই বাপের কাজে মর্গ্যানের একটুও রুচি ছিল না। অতএব পিতার আশ্রয় ছেড়ে সে সাগরগামী জাহাজে একটা নিচু কাজ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
সে কাজের মেয়াদ ফুরোবার পর মর্গ্যান এল জামাইকা দ্বীপে। এটি ছিল বোম্বেটেদের আর- একটি প্রিয় দ্বীপ। বেকার হয়ে বসে না থেকে মর্গ্যান বোম্বেটেদের এক জাহাজে চাকুরি গ্রহণ করলে। সমুদ্রে তিন-চারবার বোম্বেটেধর্ম পালন করে সে এ বিষম ব্যবসায়ের যা কিছু শেখবার সব শিখে ফেললে— এমন ভালো ছাত্র বোম্বেটেরা খুব কমই পেয়েছে।
তারপর কয়েকজন সঙ্গীর সঙ্গে পরামর্শের পর মর্গ্যান স্থির করলে, তারাও সকলে মিলে রোজগারের পয়সা দিয়ে একখানা জাহাজ ক্রয় করবে। রত্নাকর বহু রত্নের আকর— একখানা জাহাজ কিনলেই তা আহরণ করা ভারী সহজ।
জাহাজ কেনা হল। দলের ভিতরে মর্গ্যানই ছিল সকলের চেয়ে সাহসী, বিদ্বান ও বুদ্ধিমান। কাজেই দলের বাকি সবাই একবাক্যে তাকেই দলপতি বা কাপ্তেন বলে মেনে নিলে। সেইদিন মহাবিচারকও হয়তো ঘুমিয়ে পড়েন!
প্রথমবারের সমুদ্রযাত্রাতেই নতুন কাপ্তেনের উপরে অদৃষ্ট সুপ্রসন্ন হল। সে একে একে অনেকগুলো জাহাজ দখল করে আবার জামাইকায় ফিরে এল। এবং এই অভাবিত সাফল্যে বোম্বেটেদের ভিতরে তার মানসম্ভ্রম বেড়ে উঠল অত্যন্ত!
জামাইকা দ্বীপে ছিল এক বুড়ো বোম্বেটে, তার নাম ম্যানসভেল্ট। সে এই সময়ে খুব বড়ো এক নৌবাহিনী গঠন করে চারিদিকে লুঠপাট করবার আয়োজনে ব্যস্ত ছিল। সে দেখলে, মর্গ্যান হচ্ছে একজন মস্ত কাজের লোক। অতএব তাকে সে নিজের ভাইস অ্যাডমিরালের পদে নির্বাচন করে নিলে। ভুল নির্বাচন হয়নি! এই হল মর্গ্যানের বোম্বেটে-জীবনের দ্বিতীয় উন্নতি।
পনেরোখানা জাহাজ ও পাঁচশো বোম্বেটে নিয়ে ম্যানসভেল্ট ও মর্গ্যান সমুদ্রে পাড়ি দিলে। তারা প্রথমেই স্প্যানিয়ার্ডদের দ্বারা অধিকৃত সেন্ট কাথারাইন দ্বীপে গিয়ে নামল। তারপর লড়াই করে স্প্যানিয়ার্ডদের কাছ থেকে সেই দ্বীপটা কেড়ে নিলে।
কিন্তু তার অল্প দিন পরেই বুড়ো বোম্বেটে ম্যানসভেল্ট পৃথিবীর লীলাখেলা সাঙ্গ করে ভগবানের কাছে জবাবদিহি করতে চলে গেল।
তারপর কাপ্তেন মর্গ্যান নিজেই এক নৌবাহিনী গঠন করলে। বারোখানা ছোটো বড়ো জাহাজ ও সাতশো লোক নিয়ে আবার সে বেরিয়ে পড়ল। দু-একটা ছোটোখাটো শহর লুট করলে। কিন্তু লুটের মাল ভাগ করবার সময়ে বোম্বেটেদের মধ্যে এমন মনকষাকষি হল যে, কাপ্তেন মর্গ্যানের কাছ ছেড়ে একদল লোক রাগ করে চলে গেল। তাদের সন্দেহ হয়েছিল, মর্গ্যান জুয়াচুরি করে অনেক টাকা সরিয়ে ফেলেছে। খুব সম্ভব, তাদের সে সন্দেহ মিথ্যা নয়। যারা দল ছাড়ল তারা সবাই ফরাসি। মর্গ্যানের সঙ্গে রইল কেবল ইংরেজ বোম্বেটেরা।
কিন্তু দল ছোটো হয়ে গেল বলে মর্গ্যান একটুও দমল না। আরও কিছু লোক ও জাহাজ সংগ্রহ করে মর্গ্যান আর-একদিকে আবার পাড়ি দিলে। কোথায় যাওয়া হবে সে কথা কারো কাছে প্রকাশ করলে না। খালি বললে, 'আমি তোমাদের সর্দার, তোমাদের ভালো মন্দের জন্যে আমিই দায়ী রইলুম। আমাকে বিশ্বাস করো, তাহলেই চটপট তোমরা ধনী হতে পারবে।'
বোম্বেটেরা মর্গ্যানের কথায় বিশ্বাস করলে।
দিনকয় পরে তারা কোস্টারিকা দ্বীপে গিয়ে উপস্থিত হল।
তখন মর্গ্যান বললে, 'আমরা পোর্টো বেলো শহর লুট করতে যাচ্ছি। একথা আমি আর কাউকে বলিনি, সুতরাং চরের মুখে খবর পেয়ে শত্রুরা সাবধান হওয়ার সময়ও পায়নি।'
দু-একজন প্রধান বোম্বেটে বললে, 'পোর্টো বেলো হচ্ছে মস্ত শহর, সেখানে অনেক সৈন্য আছে। আমাদের লোকসংখ্যা মোটে সাড়ে চারশো। কেমন করে আমরা অত বড়ো শহর দখল করব?'
মর্গ্যান বললে, 'আমাদের দল ছোটো বটে, কিন্তু আমাদের জান খুব বড়ো। দল ছোটো হলেই একতা আর লাভের সম্ভাবনা বেশি। কুছ পরোয়া নেই— এগিয়ে চলো!'
অতঃপর পোর্টো বেলো নগরের একটু বর্ণনা দিতে হবে। ওয়েস্ট ইন্ডিজে স্পেনীয় রাজ্যের মধ্যে পোর্টো বেলো তখন দুর্ভেদ্য নগর হিসাবে হাভানা ও কার্টেজেনার পরেই তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিল। বন্দরের পিছনেই নগরকে রক্ষা করবার জন্যে দুটি বড়ো বড়ো দুর্গ আছে। এই দুর্গ দুটির অজ্ঞাতসারে বন্দরের মধ্যে কোনও জাহাজ বা নৌকা প্রবেশ করতে পারে না। দুর্গ দুটিও এমন সুরক্ষিত যে, সকলে তাদের অজেয় বলে মনে করে। প্রথম দুর্গটির মধ্যে তিনশো সৈন্য থাকে। নগরের এখনকার জনসংখ্যা সাড়ে নয় হাজারের উপরে, তখন কম ছিল।
মর্গ্যান সরাসরি বন্দরে প্রবেশ না করে, সেখান থেকে তিরিশ মাইল দূরে সমুদ্রকূলে চুপিসারে জাহাজ লাগালে। তারপর স্থলে পদব্রজে ও নদীতে নৌকায় চড়ে তারা প্রথম দুর্গটির কাছে এসে পড়ল। দুর্গের অধিবাসীদের বলে পাঠালে— হয় আত্মসমর্পণ করো নয় মরবার জন্যে প্রস্তুত হও।
উত্তরে দুর্গের কামানগুলো ভৈরব হুংকারে অগ্নিবর্ষণ করলে। কামান গর্জন শুনে দূর থেকে নগরের বাসিন্দারা সভয়ে বুঝতে পারলে যে, কাছেই কোনও মস্ত বিপদ এসে আবির্ভূত হয়েছে।
নিকটবর্তী অঞ্চলের স্প্যানিয়ার্ডরা বোম্বেটেদের বাধা দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করলে। কিন্তু কোনও ফল হল না, তারা হেরে গেল, অনেকে বন্দি হল। দুর্গের ভিতরের সৈন্যরাও শেষ পর্যন্ত দুর্গ রক্ষা করতে পারলে না। কোনওরকম পূর্বাভাস না দিয়ে শত্রু এমন অতর্কিতে শিয়রে এসে পড়েছিল যে, তার কবল থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভবপর হল না। মর্গ্যান দুর্গ দখল করলে।
মর্গ্যান হুকুম দিলে, 'প্রত্যেক বন্দিকে কেটে দুখানা করে ফেলো! শহরের লোকরা তাহলে বুঝতে পারবে, আমরা বড়ো লক্ষ্মী ছেলে নই— আমাদের বাধা দিলে তাদেরও নিশ্চিত মরণ!'— বন্দিদের মাথাগুলো উড়ে গেল।
দুর্গের ভিতরের যে সকল সৈন্য ও সৈন্যাধ্যক্ষরা ধরা পড়েছিল, তাদের একটা ঘরে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। এইবার বারুদখানায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া হল, দুর্গসুদ্ধ সমস্ত প্রাণী শূন্যে উড়ে পঞ্চভূতে মিলিয়ে গেল। কেবল দুর্গের অধ্যক্ষ প্রাণ নিয়ে নগরে প্রস্থান করতে পারলেন।
বোম্বেটেরা নগর আক্রমণ করতে চলল। সেখানকার বাসিন্দারা তখনও আত্মরক্ষার সময় পায়নি— তারা আত্মরক্ষা করতে পারলেও না। পোর্টো বেলোর গভর্নর তাদের কোনওরকমে উত্তেজিত করতে না পেরে, বাকি যে দুর্গটা তখনও শত্রুহস্তগত হয়নি, তার মধ্যে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলেন।
বোম্বেটেরা নগর দখল ও লুট করে অনেক পাদরিকে সপরিবারে বন্দি করলে। ওদিকে দুর্গ থেকে তাদের উপরে গোলাগুলি-বৃষ্টি হচ্ছিল অজস্রধারে। ব্যতিব্যস্ত হয়ে বোম্বেটেরাও দুর্গ আক্রমণ করলে। তাদের এ আক্রমণের আর-এক উদ্দেশ্য, শহর থেকে অনেক নাগরিক বহু ধনসম্পত্তি নিয়ে কেল্লার ভিতরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল।
সারাদিন যুদ্ধ চলল— কোন পক্ষের জয় হবে তখনও তা অনিশ্চিত। অনেক বোম্বেটে মারা পড়ল— তবু তারা কেল্লার কাছ ঘেঁষতে পারলে না। তারা বোমা ছাড়বার সুযোগ পর্যন্ত পেলে না— কেল্লার পাঁচিলের কাছে গেলেই উপর থেকে হুড়মুড় করে ভারী ভারী পাথর ও জ্বলন্ত বারুদ এসে পড়ে তাদের যমালয়ে পাঠিয়ে দেয়।
মর্গ্যান প্রায় হতাশ হয়ে পড়ে শেষ উপায় অবলম্বন করলে।
সে আগে কেল্লার পাঁচিলে ওঠবার জন্যে খুব উঁচু দশ-বারোখানা মই তৈরি করালে। তারপর বন্দি পাদরি ও তাঁদের স্ত্রী-কন্যাদের বললে, সেই মইগুলো পাঁচিলের গাঁয়ে লাগিয়ে দিয়ে আসতে।
গভর্নরকে জানানো হল, 'এখনও আত্মসমর্পণ করো।'
গভর্নর বললেন, 'প্রাণ থাকতে নয়।'
তখন মই নিয়ে যাওয়ার হুকুম হল। মর্গ্যান ভেবেছিল, সপরিবারে ধর্মযাজকেরা মই নিয়ে অগ্রসর হলে গভর্নর তাঁদের উপরে আর গুলিবৃষ্টি করতে পারবেন না।
বোম্বেটের দল পাদরিদের পিছনে পিছনে এগিয়ে পিস্তল উঁচিয়ে বললে, 'শীঘ্র পাঁচিলে গিয়ে মই লাগাও। নইলে গুলি করে মেরে ফেলব।'
কেল্লার পাঁচিলের উপরেও গভর্নর সৈন্য সাজিয়ে রেখেছিলেন, তারাও বন্দুক তুললে।
পাদরি ও তাঁদের পরিবারবর্গ করুণ চিৎকারে স্প্যানিয়ার্ডদের বললেন, 'আমরা তোমাদেরই ধর্মযাজক বাবা, আমাদের মেরো না।'
কিন্তু মর্গ্যান এই বীর ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ গভর্নরকে ভুল বুঝেছিল— সৈনিকধর্ম পালনের জন্যে তিনি আর সব ধর্মকে বর্জন করতে প্রস্তুত।
সপরিবারে ধর্মযাজকেরা কাঁধে মই নিয়ে অগ্রসর হলেন, সঙ্গে সঙ্গে কেল্লার উপর থেকে শিলাবৃষ্টির মতো গোলাগুলি এসে তাঁদের ভূতলশায়ী করতে লাগল। বাইরে থেকে শত্রুই হোক আর মিত্রই হোক, কেল্লার ত্রিসীমানায় কাউকে আসতে দেওয়া হবে না— এই ছিল গভর্নরের প্রতিজ্ঞা।
পাদরি ও তাঁদের পরিবারবর্গের দেহ একে একে মাটির উপরে আছড়ে পড়তে লাগল। কিন্তু তবু তাঁরা কোনওরকমে পাঁচিলের গায়ে মই লাগিয়ে পালিয়ে এলেন। তখন বোম্বেটেরা বোমা ও বারুদের পাত্র হাতে করে পাঁচিলের উপরে গিয়ে দাঁড়াল এবং কেল্লার ভিতরে সেইসব নিক্ষেপ করতে লাগল।
স্প্যানিয়ার্ডরা তখন বাধ্য হয়ে আত্মসমর্পণ করলে।
কিন্তু সেই বীর গভর্নর! কোনও আশা নেই, তবু তিনি অটল! তখনও নিজের সৈন্যদের ডেকে তিনি বলছেন, 'অস্ত্র নাও, অস্ত্র নাও! শত্রু বধ করো!'
কেউ তাঁর কথায় কান পাতলে না, তারা বোম্বেটেদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে জীবনভিক্ষা করতে লাগল।
'তবে মর কাপুরুষ কুকুরের দল!'— এই বলে তাঁর যেসব সৈন্য কাছাকাছি ছিল, মুক্ত তরবারি নিয়ে তিনি তাদের উপরে গিয়ে পড়লেন এবং নিজের হাতেই সৈন্যদের বধ করতে লাগলেন।
বোম্বেটেদের নীচ হৃদয় পর্যন্ত এই অসাধারণ বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে গেল। তারা সসম্ভ্রমে বললে, 'এখন আপনি আত্মসমর্পণ করবেন তো?'
গভর্নর দৃঢ়হস্তে অসিধারণ করে সগর্বে মাথা তুলে বললেন, 'নিশ্চয়ই নয়! কাপুরুষের মতো তোদের হাতে আমি ফাঁসিতে মরব না— আমি মরতে চাই লড়াই করতে করতে বীর সৈনিকের মতো।'— বলেই তিনি তিনি আবার আক্রমণ করলেন।
গভর্নরের সহধর্মিণী ও কন্যা কাঁদতে কাঁদতে কাকুতিমিনতি করতে লাগলেন, 'ওগো তুমি অস্ত্র ছাড়ো! আত্মহত্যা করে আমাদের পথে বসিয়ো না!'
কিন্তু সেই বীরের পাথর-প্রাণ কোনও অশ্রুই নরম করতে পারলে না— সিংহের মতো একলাই তিনি অগুনতি শত্রুর সঙ্গে যুঝতে লাগলেন।
বোম্বেটেরা তাঁকে জীবন্ত অবস্থায় বন্দি করবার জন্যে অনেক চেষ্টা করলে কিন্তু পারলে না। শেষ পর্যন্ত শত্রু মারতে মারতে নিজের শেষ রক্তপাত করে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে অন্তিম নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। সে জাতির মধ্যে এমন বীরের জন্ম হয়ে সে জাতি ধন্য!
তারপর যা হওয়ার তা হল। অত্যাচার, লুণ্ঠন, হত্যা। পোর্টো বেলোর যত ঐশ্বর্য দুর্গের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়েছিল, সমস্তই বোম্বেটেরা হস্তগত করলে। অত বড়ো বীর গভর্নরের হাত থেকে অমন অজেয় দুর্ভেদ্য দুর্গ এত কম সৈন্য নিয়ে মর্গ্যান যে কী করে কেড়ে নিলে, সকলেরই কাছে সেটা প্রহেলিকার মতো বোধ হল।
পানামা নগরের স্প্যানিয়ার্ড গভর্নর সবিস্ময়ে বোম্বেটেদের কাছে দূত পাঠিয়ে জানতে চাইলেন,
'কোন আশ্চর্য হাতিয়ার দিয়ে তোমরা দুর্গের অত বড়ো বড়ো কামান ব্যর্থ করে দিয়েছ?'
মর্গ্যান সহাস্যে দূতের হাতে একটা ছোটো পিস্তল দিয়ে বলে পাঠালে, 'কেবল এই আশ্চর্য হাতিয়ার দিয়ে আমি কেল্লা ফতে করেছি! এই অস্ত্র আমি এক বৎসরের জন্যে আপনাকে দান করলুম। তারপর নিজেই পানামায় গিয়ে আমার অস্ত্র আবার আমি ফিরিয়ে আনব।'
পানামার গভর্নর তখনই সেই পিস্তল ফেরত পাঠিয়ে বললেন, 'এ অস্ত্রে আমার দরকার নেই। তোমাকে আর কষ্ট করে পানামায় আসতে হবে না। কারণ পোর্টো বেলোর মতো এত সহজে পানামা আত্মদান করবে না।'
পোর্টো বেলো (পানামা প্রদেশের একটি নগর) শহরে শরীরী মড়কের মতো একপক্ষকাল বাস করে চারিদিকে হাহাকার তুলে মর্গ্যান সদলবলে আবার জাহাজে এসে উঠল। বিপুল ঐশ্বর্য নিয়ে তারা কিউবা দ্বীপে ফিরে এল। বোম্বেটেদের সবাই বুঝলে, লোলোনেজের অভাব পূরণ করতে পারে এখন কেবল এই কাপ্তেন মর্গ্যান! তার তারকা আজ উদীয়মান!
দশম পরিচ্ছেদ। অমানুষী অত্যাচার ও অগ্নিপোত
মর্গ্যান তারপর এল জামাইকা দ্বীপে— এখানকার গভর্নর হচ্ছেন তারই স্বজাতি, অর্থাৎ ইংরেজ।
মর্গ্যানের শক্তি ও খ্যাতি শুনে ফুলমধুলোভী ভ্রমরের মতো চারিদিক থেকে বোম্বেটের পর বোম্বেটে এসে তার দলে যোগ দিতে লাগল— তাদের বেশির ভাগই ইংরেজ। জামাইকার গভর্নর পর্যন্ত তাকে আর বোম্বেটের মতো অভ্যর্থনা করলেন না— এমনকী তাকে একখানা মস্ত বড়ো জাহাজও দান করলেন। এমন দান পেয়ে মর্গ্যানের আনন্দ আর ধরে না, কারণ এর উপরে ছিল ছত্রিশটা কামান! এত বড়ো জাহাজ কোনও বোম্বেটেরই ভাগ্যে জোটে না।
সেই সময়ে ওখানে এসে একখানা বড়ো ফরাসি জাহাজও নোঙর করেছিল, তার উপরে ছিল চব্বিশটা ইস্পাতের ও বারোটা পিতলের কামান। এ জাহাজখানাকে পেলে তার শক্তি অত্যন্ত বেড়ে উঠবে বলে মর্গ্যান ফরাসিদের কাপ্তেনকে নিজের দলে যোগ দেওয়ার জন্যে আহ্বান করলে। কিন্তু ফরাসিরা রাজি হল না— ইংরেজ বোম্বেটেদের তারা বিশ্বাস করে না।
মর্গ্যানের ভারী রাগ হল— ফরাসিদের সাজা দেওয়ার জন্যে ছুতো খুঁজতে লাগল। ছুতো পাওয়াও গেল।
কিছুদিন আগে সমুদ্রে খাদ্যাভাব হওয়ার দরুন ফরাসিরা একখানা ইংরেজ জাহাজ থেকে খাদ্য সংগ্রহ করেছিল এবং তখন জাহাজে টাকা ছিল না বলে ইংরেজদের সঙ্গে এই ব্যবস্থা করেছিল যে, জামাইকায় ফিরে এসে তারা খাবারের দাম কড়ায়-গন্ডায় চুকিয়ে দেবে।
ব্যাপারটা কিছু অন্যায় নয়। কিন্তু এই ছুতোই বিবেকবুদ্ধিহীন মর্গ্যানের পক্ষে যথেষ্ট হল। সে বাইরে কিছু না ভেঙে ফরাসি জাহাজের কাপ্তেন ও কয়েকজন পদস্থ কর্মচারীকে নিজের জাহাজে নিমন্ত্রণ করলে। তারা কোনওরকম সন্দেহ না করেই নিমন্ত্রণ রাখতে এল। তখন তাদের হাতে পেয়ে দুষ্ট মর্গ্যান বললে, 'ইংরেজদের কাছ থেকে তোমরা খাবার কেড়ে নিয়েছ। সেই অপরাধে তোমাদের বন্দি করলুম।'— তারপর সে জামাইকার গভর্নরের দেওয়া বড়ো জাহাজখানায় বন্দিদের পাঠিয়ে দিলে।
আবার নতুন সমুদ্রযাত্রা করবার দিন স্থির হল। ইংরেজ বোম্বেটেরা আসন্ন লাভের আনন্দে জাহাজে জাহাজে উৎসবে মেতে উঠেছে! নাচ-গান-বাজনা চলছে— সবাই মদের নেশায় বেহুঁশ।
আচম্বিতে একসঙ্গে যেন অনেকগুলো বাজ ডেকে উঠল এবং সমুদ্রের বুকে যেন দপ করে জ্বলে উঠল একসঙ্গে শত শত বিদ্যুৎ!... চারিদিকে সাড়া পড়ে গেল।
মর্গ্যানের সেই বড়ো সাধের বিরাট জাহাজ শূন্যে উড়ে গেল ভেঙে গুঁড়ো হয়ে। মাত্র তিরিশজন লোক কোনওগতিকে রক্ষা পেল এবং এক মুহূর্তেই মারা পড়ল তিনশো পঞ্চাশজন ইংরেজ।
বোম্বেটেদের মতে, বন্দি ফরাসি কাপ্তেন ও তাঁর সঙ্গীরাই নিজেদের মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও জাহাজের বারুদখানায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন।
মর্গ্যানের সেই বিশ্বাসঘাতকতার ফল তাকে হাতে হাতেই পেতে হল।
অত বড়ো জাহাজ ও এত লোক হারিয়ে মর্গ্যান একেবারে ভেঙে পড়ল। কিন্তু সে বেশিক্ষণের জন্যে নয়। রাগে অজ্ঞান হয়ে বাকি বোম্বেটেদের নিয়ে আবার ফরাসিদের সেই বড়ো জাহাজখানা আক্রমণ ও অধিকার করলে।
তারপর তারা সমুদ্রের জলে নিজেদের দলের বোম্বেটেদের লাশ খুঁজতে লাগল— অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্যে নয়, লুণ্ঠন করবার জন্যে। যাদের আঙুলে আংটি ছিল তাদের আংটিসুদ্ধ আঙুল কেটে নেওয়া হল, যাদের পকেটে টাকাকড়ি ছিল তাদের পকেট থেকে টাকাকড়ি চুরি করা হল। তারপর মৃতদেহগুলোকে সামুদ্রিক জীবদের মুখে সমর্পণ করে তারা অম্লানবদনে আবার জাহাজে উঠে অগাধ সাগরে পাড়ি দিল।
দলের সাড়ে তিনশো লোক মারা পড়ল, তবু মর্গ্যানের নামের জোরে সঙ্গীর সংখ্যা হল যথেষ্ট! পনেরোখানা জাহাজে প্রায় হাজারখানেক বোম্বেটে তার সঙ্গে চলল। দুরাত্মার পাপসঙ্গীর অভাব হয় না। সবচেয়ে বড়ো জাহাজে রইল মর্গ্যান নিজে— কিন্তু তাতে কামান ছিল মোটে চোদ্দোটা, তাও ছোটো ছোটো।
এবার মর্গ্যান কিছু মুশকিলে পড়ল। কারণ যাত্রারম্ভের সময়ে তার মাথায় অনেক বড়ো বড়ো ফন্দি ছিল; কিন্তু কিছুদিন পরে তার দলের প্রায় পাঁচশো লোকসুদ্ধ সাতখানা জাহাজ অকূল সাগরে কোথায় হারিয়ে গেল। মর্গ্যান কিছুকাল অপেক্ষা করেও তাদের দেখা পেলে না। কাজেই এখানে-ওখানে ছোটোখাটো ডাকাতি করেই সে সময় কাটাতে লাগল।
মর্গ্যানের দলে এক ফরাসি কাপ্তেন আছে, সে আগে ছিল বিখ্যাত লোলোনেজের সঙ্গে। সে পরামর্শ দিলে, 'আপনিও মারাকেবো শহর লুট করবেন চলুন। আমি সেখানকার পথঘাট চিনি, আমাদের কোনও কষ্ট হবে না।'— এ প্রস্তাবে মর্গ্যানের নারাজ হওয়ার কারণ ছিল না।
তারা মারাকেবোর সমুদ্রে এসে হাজির হল। তারপর লুকিয়ে লুকিয়ে যখন শহরের খুব কাছে এসে পড়ল, স্প্যানিয়ার্ডরা তখন তাদের দেখতে পেলে। লোলোনেজের নগর লুণ্ঠনের পর তারা এখন আর-একটা নতুন কেল্লা তৈরি করেছিল— সেইখানে বোম্বেটেদের সঙ্গে তাদের বিষম যুদ্ধ হল। কিন্তু এবারেও স্প্যানিয়ার্ডরা জিততে পারলে না, মারাকেবো শহরের হতভাগ্য বাসিন্দারা আবার নরকযন্ত্রণা ভোগ করলে। সেই একই বিয়োগান্ত নাটকের পুনরভিনয়। সবিস্তারে আর বর্ণনা করবার দরকার নেই।
তারপর জিব্রালটার নগরের পালা। কিন্তু লোলোনেজ তাদের যে সর্বনাশ করে গিয়েছিল, জিব্রালটারের বাসিন্দারা এখনও তা ভুলতে পারেনি। কাজেই বোম্বেটেদের সাড়া পেয়ে তারা পঙ্গপালের মতো দলে দলে শহর ছেড়ে পলায়ন করতে লাগল— সমস্ত মূল্যবান জিনিস সঙ্গে নিয়ে।
বোম্বেটেরা শহরে ঢুকে দেখলে— সে এক নিঝুমপুরী। না আছে রসদ, না আছে ধনরত্ন, না আছে জনমনুষ্য! চারিদিক সমাধির মতো খাঁ খাঁ করছে!
কেবল একটি লোক পালায়নি। তার পোশাক ময়লা, তালি মারা, ছেঁড়াখোঁড়া। বোম্বেটেরা জানত না যে, সে জন্মজড়ভরত— পাগল বললেও চলে।
তারা তাকে যত কথা শুধোয়, সে খালি বলে, 'আমি কিছু জানি না, আমি কিছু জানি না।'
বোম্বেটেরা তখন তাকে নিজেদের প্রথামতো বিষম যন্ত্রণা দিতে শুরু করলে।
পাগলা বললে, 'ওগো, আর যাতনা দিয়ো না! আমার সঙ্গে চলো, আমি তোমাদের আমার সমস্ত ঐশ্বর্য দান করছি!'
বোম্বেটেরা ভাবলে, এ লোকটা নিশ্চয়ই কোনও ধনী ব্যক্তি, কেবল তাদের চোখে ধুলো দেওয়ার ফিকিরেই গরিবের সাজ পরেছে।
অতএব তারা তার সঙ্গে সঙ্গে চলল, পাগলা তাদের নিয়ে একখানা ভাঙা কুঁড়েঘরে গিয়ে বললে, 'দেখো, আমার কত ঐশ্বর্য!'
ঘরের ভিতরে ছিল কেবল কতকগুলো মাটির বাসন ও গুটি তিনেক টাকা।
বোম্বেটেরা খাপ্পা হয়ে বললে, 'কী! আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা? দেখ তবে মজাটা।'
পাগলা বললে, 'জানো আমি কে? আমার নাম হচ্ছে শ্রীযুক্ত সিবাস্টিয়ান স্যানসেজ, আমি হচ্ছি মারাকেবোর লাটসাহেবের ভাই।'
বোম্বেটেরা তার কথা সত্য ভেবে নিয়ে অধিকতর লুব্ধ হয়ে তাকে আবার যন্ত্রণা দিতে লাগল। তাকে দড়িতে বেঁধে শূন্যে টেনে তুললে এবং তার গলায় ও দুই পায়ে বিষম ভারী ভারী বোঝা ঝুলিয়ে দিলে। তারপর সেই অভাগাকে পাপিষ্ঠরা জ্যান্ত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে মারলে।
বোম্বেটেরা তারপর সে দেশের বনে বনে চারিদিকে খুঁজে বেড়াতে লাগল এবং অনেক চেষ্টার পর একে একে প্রায় আড়াইশো স্প্যানিয়ার্ডকে গ্রেপ্তার করলে।
স্প্যানিয়ার্ডদের সঙ্গে ছিল এক কাফ্রি গোলাম।
মর্গ্যান তাকে হুকুম দিলে, 'ওরা কিছুতেই যখন টাকার কথা বলবে না, তখন ওদের দল খানিকটা হালকা করে দে!'
কাফ্রি গোলাম একে একে কয়েকজনকে হত্যা করলে— অন্যান্য বন্দিদের চোখের সামনেই। তারপর বোম্বেটেদের খুশি করবার জন্যে সেই দুষ্ট কাফ্রি একজন বৃদ্ধ স্প্যানিয়ার্ডকে দেখিয়ে বললে, 'ওই লোকটা অনেক টাকার মালিক।'
বুড়োর কপাল পুড়ল। বোম্বেটেরা টাকা চাইলে, বুড়ো বললে, 'এ পৃথিবীতে আমার যথাসর্বস্ব হচ্ছে চারশো টাকা।'
বোম্বেটেরা বিশ্বাস করলে না। দড়ি দিয়ে বেঁধে তারা সেই বুড়োর দুখানা হাতই মড়মড় করে ভেঙে দিলে। তারপর তার হাত ও পায়ের বুড়ো আঙুলে দড়ি বেঁধে তাকে শূন্যে টেনে তুললে। সেই অবস্থায় তারা লাঠি দিয়ে দড়ির উপরে এমন ঝাঁকানি মারতে লাগল যে, প্রত্যেক ঝাঁকানির সঙ্গেই বৃদ্ধের ক্ষীণ প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা হল। এই বর্বরোচিত নিষ্ঠুরতাতেও খুশি না হয়ে বোম্বেটেরা বুড়োর পেটের উপরে সেই অবস্থাতেই আড়াই মন বোঝা চাপিয়ে দিলে। এবং সেই সঙ্গে আগুন জ্বেলে হতভাগ্যের দাড়ি-গোঁফ, চুল ও মুখের চামড়া— সব পুড়িয়ে দিলে। তারপর তাকে নামিয়ে একটা থামে বেঁধে রাখা হল এবং চার দিন তাকে প্রায় অনাহারে রাখা হল বললেই চলে।
বুড়ো বেচারি খুব ছোটো একটা সরাইখানা চালিয়ে কোনওরকমে দিন গুজরান করত। অনেক কষ্ট ও অনেক চেষ্টার পর কিছু টাকা ধার করে এনে বোম্বেটেদের দিয়ে সে যাত্রা সে মুক্তি পেল বটে, কিন্তু তার দেহ এমন ভয়ানকভাবে পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল যে, খুব সম্ভব তাকে আর বেশি দিন এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে হয়নি।
এরাই হচ্ছে প্রেমের অবতার খ্রিস্টদেবের শিষ্য— যাঁর ধর্মের বড়ো মন্ত্র হচ্ছে প্রেমের মন্ত্র। এবং এরাই ভারতবাসীদের ও আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের ঘৃণা করে বর্বর বলে। উপরন্তু এদের মতে এশিয়ার বাসিন্দারা নাকি নিষ্ঠুরতায় পৃথিবীতে অতুলনীয়। কিন্তু যেসব অকথ্য নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়ে ইংরেজ-রাজের কাছ থেকে মর্গ্যান সম্মান, উপাধি ও উচ্চপদ লাভ করেছে, সেগুলোকে আমরা কি পরম করুণার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত বলে মাথায় তুলে রাখব? মর্গ্যান ওখানে পূর্বকথিত ব্যাপারটিরও চেয়ে ভয়ানক এমন সব পৈশাচিক কাণ্ডের অনুষ্ঠান করেছিল, পাঠকরা সহ্য করতে পারবেন না বলে এখানে সেগুলোর কথা আর বললুম না। তাদের তুলনায় ঢের বেশি ভদ্র ও শান্ত দুটো দৃষ্টান্ত এখানে দিচ্ছি।
অনেক স্প্যানিয়ার্ডকে ধরে মর্গ্যান পায়ে ও হাতে পেরেক মেরে ক্রুশে বিদ্ধ করে রেখেছিল— সঙ্গে সঙ্গে তাদের হাতের ও পায়ের আঙুলগুলোর ফাঁকে জ্বালিয়ে দিয়েছিল তৈলাক্ত সলতে। এবং আরও অনেককে ধরে-বেঁধে অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে তাদের পাগুলোকে এমন কৌশলে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিল যে, যাতে তারা 'রোস্ট'-এর মতো ধীরে ধীরে সিদ্ধ হয়। এত জঘন্য অত্যাচার কেবল সামান্য টাকার জন্যেই— যে টাকা পরে বোম্বেটেরা মদ খেয়ে জুয়া খেলে দু-দিনেই উড়িয়ে দেবে!
জিব্রালটার শহরে ঐশ্বর্যলাভের দিক থেকে কিছুই সুবিধা করে উঠতে না পেরে মর্গ্যান বুঝলে, এ যাত্রা কপাল তার ভালো নয়। কিন্তু সেই সময়েই খবর পাওয়া গেল, জিব্রালটারের গভর্নর অনেক ধনরত্ন ও শহরের স্ত্রীলোকদের নিয়ে নদীর মাঝখানে একটা দ্বীপে গিয়ে লুকিয়ে আছেন। মর্গ্যান অমনি নৌকা ভাসিয়ে সদলবলে তাদের ধরতে ছুটল।
খবর পেয়ে গভর্নর দ্বীপ থেকে পালিয়ে সকলকে নিয়ে একটা পাহাড়ের শিখরে উঠে বসে রইলেন। বোম্বেটেরাও নাছোড়বান্দা— তারাও পিছনে পিছনে ছুটল। তখন বর্ষাকাল। ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি পড়ছে। পাহাড়ে যাওয়ার পথে নদীর জল ফুলে উঠেছে। স্রোতের তোড়ই বা কী! নদী সেদিন পৃথিবীকে অনেকগুলো বোম্বেটের পাপভার সইবার দায় থেকে নিষ্কৃতি দিলে— স্রোতের টানে তারা একেবারে সটান পাতালে চলে গেল।
পাহাড়ের তলায় গিয়ে মর্গ্যানের সব আশা ফুরিয়ে গেল। খাড়া পাহাড়ের গা— পাঁচ-সাত হাত উপরেও ওঠবার উপায় নেই। একটিমাত্র সরু লিকলিকে পথ টঙে গিয়ে উঠেছে— সে পথে সার বেঁধে পাশাপাশি দুজন যেতে পারে না। টং থেকে যদি একজনমাত্র স্প্যানিয়ার্ড গুলি চালায়, তাহলে একে একে শত শত বোম্বেটের দেহ হবে পপাত ধরণিতলে। তার উপরে বৃষ্টির জলে বোম্বেটেদের সমস্ত বারুদ ভিজে জবজবে হয়ে গিয়েছে।
এই সময়ে যদি মাত্র পঞ্চাশজন স্প্যানিয়ার্ড বুক বেঁধে আক্রমণ করত, তাহলে সেই চার-পাঁচশো বোম্বেটে মনুষ্যসমাজকে আর যন্ত্রণা দেওয়ার সুযোগ পেত না। কিন্তু ঘা খেয়ে খেয়ে স্প্যানিয়ার্ডরা তখন নেতিয়ে পড়ে সব সাহস থেকেই বঞ্চিত হয়েছে। তারা আক্রমণ করবে কী, গাছের পাতাটি নড়লেও 'ওই বোম্বেটে আসছে' ভেবে আঁতকে পালিয়ে যায়।
কিন্তু মর্গ্যান তা বুঝতে পারেনি। সেই সরু পথে যেন সাক্ষাৎ মৃত্যুর ছায়া দেখে সে আর অগ্রসর হতে সাহস করলে না, সমস্ত লোকজন নিয়ে মনেপ্রাণে সেখান থেকে সরে পড়ল।
জিব্রালটার নগরে ফিরে এসে পাঁচ হপ্তা ধরে নারকীয় কাণ্ড করবার পর বোম্বেটেরা বিষম এক দুঃসংবাদ পেলে। স্প্যানিয়ার্ডদের তিনখানা বড়ো বড়ো যুদ্ধজাহাজ মারাকেবো বন্দরে এসে হাজির হয়েছে। সবচেয়ে বড়ো জাহাজখানায় কামান আছে চল্লিশটা, তার চেয়ে কিছু ছোটো জাহাজে তিরিশটা, সবচেয়ে ছোটো জাহাজে চব্বিশটা। মর্গ্যানের সবচেয়ে বড়ো জাহাজেও চোদ্দোটার বেশি কামান নেই।
বোম্বেটেদের ফেরবার পথ হচ্ছে মারাকেবো বন্দরের ভিতর দিয়েই। তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! আর বুঝি রক্ষা নেই— পাপের প্রায়শ্চিত্ত হওয়ার সময় এসেছে!
কিন্তু সত্যিকার নেতার আসল গুণ হচ্ছে, দারুণ বিপদেও হাল না-ছাড়া! এ গুণ মর্গ্যানেরও ছিল। সে বুক ফুলিয়ে বললে, 'কুছ পরোয়া নেই! আসুক ওরা— আমরাও লড়াই করব!'
স্প্যানিয়ার্ড নৌবাহিনীর অ্যাডমিরালের এক চিঠি এল:
'বোম্বেটে সর্দার মর্গ্যান, আমাদের মহারাজের রাজত্বে এসে তুমি যেসব ভীষণ উৎপাত করছ, তা আমি শুনেছি। অতঃপর তুমি যদি আমার কাছে বিনা বাক্যব্যয়ে আত্মসমর্পণ করো আর লুটের সমস্ত মাল ও বন্দিদের ফিরিয়ে দাও, তাহলে আমি স্বীকার করছি, তোমাদের সকলকেই ছেড়ে দেব। আর আমাদের কথা যদি না শোনো, তাহলে এও প্রতিজ্ঞা করছি যে, তোমাদের প্রত্যেককেই আমি বধ না করে ছাড়ব না!'
বোম্বেটেদের পরামর্শসভা বসল। মর্গ্যানের কথার উত্তরে সকলেই একবাক্যে বললে, 'সর্দার, জান কবুল! এত বিপদ সয়ে আমরা যে লুটের মাল পেয়েছি আর তা ফিরিয়ে দেব না! যতক্ষণ আমাদের শেষ রক্তবিন্দু থাকবে ততক্ষণ আমরা আত্মসমর্পণ করব না!'
তবু যদি ভালোয় ভালোয় এই বিপদ চুকে যায়, সেই আশায় মর্গ্যান অ্যাডমিরালের কাছে তিনটি প্রস্তাব করে পাঠালে: প্রথমত, আমরা আর মারাকেবো শহরের কোনও অনিষ্ট করব না বা বাসিন্দাদের কাছ থেকে কোনও অর্থ দাবি করব না। দ্বিতীয়ত, বন্দিদের আমরা স্বাধীনতা দেব। তৃতীয়ত, কেবল জিব্রালটারের বাসিন্দারা আমাদের যে অর্থ দেবে বলে স্বীকার করেছে, তা না-পাওয়া পর্যন্ত এখানকার চারজন প্রধান ব্যক্তি জামিনদার রূপে আমাদের সঙ্গে থাকবে।
অ্যাডমিরাল জবাবে বলে পাঠালেন: 'তোমাদের আর দু-দিন সময় দিলুম। এর মধ্যে যদি আত্মসমর্পণ না করো, তাহলে তোমাদের কাউকে আমি ক্ষমা করব না।'
মর্গ্যান খাপ্পা হয়ে বললে, 'সাজো তবে সবাই রণসাজে! নিজের জোরে আমরা এই ফাঁদ ছিঁড়ে বেরিয়ে যাব। দেখি, আমাদের কে রুখতে পারে!'
তখনই তারা সর্বাগ্রে একখানা অগ্নিপোত নির্বাণে নিযুক্ত হল। অগ্নিপোত কাকে বলে এ দেশের অনেকেই বোধহয় তা জানেন না। সেকালে জলযুদ্ধে প্রায়ই এই অগ্নিপোত ব্যবহৃত হত। এই অগ্নিপোতের ভিতরে সহজে জ্বলে ওঠে এমন সব জিনিস ভালো করে ঠেসে দেওয়া হত। তার বাইরেটা হত সাধারণ জাহাজের মতোই— কাজেই শত্রুপক্ষ তাকে সন্দেহ করতে পারত না। তারপর সেই অগ্নিপোতখানার ভিতরে আগুন লাগিয়ে শত্রুদের নৌবাহিনীর মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হত। শত্রুদের জাহাজগুলোর কাছে সে যখন যেত, তার সর্বাঙ্গ অগ্নিময় এবং সেই আগুন শত্রুদের জাহাজও অগ্নিময় করে তুলত। আজকালকার যুদ্ধজাহাজ হয় শীঘ্রগামী ও লৌহময়, তাই অগ্নিপোতের ব্যবহার এখন উঠে গেছে।
বোম্বেটেরা সমস্ত ধনরত্ন নিয়ে বড়ো বড়ো নৌকায় চড়ে বসল, অগ্নিপোতখানাকে সঙ্গে নিলে, তারপর মারাকেবো বন্দরের দিকে তারা অগ্রসর হল, অগ্নিপোতখানা যেতে লাগল আগে আগে।
তারা সন্ধ্যার সময়ে বন্দরে গিয়ে স্প্যানিয়ার্ড নৌবাহিনীকে দেখতে পেলে। এগুলো প্রকাণ্ড জাহাজই বটে, এদের সঙ্গে সাধারণভাবে লড়াই করবার সাধ্য তাদের ছিল না।
দুই পক্ষই পরস্পরকে দেখতে পেয়ে পরস্পরের দিকে অগ্রসর হল।
বোম্বেটেদের অগ্নিপোত দেখে স্প্যানিয়ার্ডরা তার সাংঘাতিক স্বরূপ আন্দাজ করতে পারলে না। তারা ভাবলে, একখানা অতিসাহসী বোম্বেটে জাহাজ একলাই তাদের আক্রমণ করতে আসছে। অতিসাহসের মজাটা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যে তারা বিপুল উৎসাহে তাকে আক্রমণ করবার জন্যে বেগে তেড়ে এল।
কিন্তু তার কাছে এসেই তাদের চক্ষুস্থির! এ যে অগ্নিপোত, এর ভিতরে যে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠেছে এবং সে আগুন হু হু করে বেড়ে উঠছে মুহূর্তে মুহূর্তে!
স্প্যানিয়ার্ডদের জাহাজ তিনখানা পালিয়ে বাঁচবার চেষ্টা করল— কিন্তু তখন পালাবারও সময় নেই। অগ্নিপোত একেবারে সব চেয়ে বড়ো শত্রু-জাহাজের পাশে গিয়ে লাগল— তখন তার ভিতরকার অগ্নি ঠিক যেন অসংখ্য জ্বলন্ত রক্তদানবের মতো মহাশূন্যে বাহু তুলে তাথই তাথই তাণ্ডবনৃত্য করছে! মাঝে মাঝে তার গর্ভস্থ বারুদ বিস্ফোরণের ভৈরব— কান কালা হয়ে যায়!
দেখতে দেখতে স্প্যানিয়ার্ডদের অতিকায় জাহাজখানাও অগ্নিপোতের মতোই অগ্নিময় হয়ে উঠল! এবং দেখতে দেখতে তার একাংশ আগুনে পুড়ে জীর্ণ হয়ে সমুদ্রগর্ভে অদৃশ্য হয়ে গেল!
স্প্যানিয়ার্ডদের দ্বিতীয় জাহাজখানা ভয়ে আর সেখানে দাঁড়াল না, তাড়াতাড়ি বন্দরের নিরাপদ অংশে ঢুকে পড়ে একেবারে কেল্লার তলায় গিয়ে উপস্থিত হল। পাছে সেখানা বোম্বেটেদের হাতে গিয়ে পড়ে, সেই ভয়ে স্প্যানিয়ার্ডরা নিজেরাই তাকে জলের ভিতরে ডুবিয়ে দিলে।
বোম্বেটেরা তৃতীয় জাহাজখানাকে পালাতেও দিলে না। তারা চারিদিক থেকে প্রবল বেগে তাকে আক্রমণ করলে। এমন দুর্জয় নৌবাহিনীর এই কল্পনাতীত পরিণাম দেখে স্প্যানিয়ার্ডরা তখন ভয়ে ও বিস্ময়ে এত স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছে যে, বোম্বেটেদের সঙ্গে তারা মাথা ঠিক রেখে লড়তেও পারলে না। অল্পক্ষণ যুদ্ধের পরেই তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হল।
কাপ্তেন মর্গ্যানের এই বিচিত্র ও অপূর্ব জয়কাহিনি যখন ইংল্যান্ডে গিয়ে পৌঁছোল, তখন সেখানেও তার নামে ধন্য ধন্য রব উঠল। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজে বোম্বেটে মহলে তার নাম হল যেন উপাস্য দেবতার নাম! কথায় বলে, ঢাল নেই-খাঁড়া নেই, নিধিরাম সর্দার! কিন্তু ঢাল-খাঁড়া না থাকলেও কেবল উপস্থিত বুদ্ধিবলে যে কী অসাধ্য সাধন করা যায়, নিধিরাম তা জানলে আজ তাকে ঠাট্টার পাত্র হতে হত না। কেবল বুদ্ধিবলেই কাপ্তেন মর্গ্যান আজ বিনা জাহাজে জলযুদ্ধ-বিজয়ী নাম কিনলে!
একাদশ পরিচ্ছেদ। একটিমাত্র তিরে কেল্লা ফতে!
যেমন হয়, এবারেও তেমনই হল! জুয়া খেলা, মাতলামি, বদমাইশি! নিজেদের প্রাণের বিনিময়ে, শত শত সাধুর জীবনদীপ নিবিয়ে দিয়ে, দুনিয়ার অভিশাপ কুড়িয়ে বোম্বেটেরা যে টাকা রোজগার করলে, জামাইকা দ্বীপে ফিরে এসে তা দু-হাতে বদখেয়ালিতে উড়িয়ে দিতে তারা কিছুমাত্র বিলম্ব করলে না!
অল্প দিন পরেই দেখা গেল, বোম্বেটেদের পকেট আর বাজে না, তা একেবারেই ফক্কা!
কাপ্তেন মর্গ্যান ছিল চালাক মানুষ। উড়নচণ্ডীর পুজো সে করেনি কোনওদিন, খরচ করত বুঝেসুঝে। কাজেই এর মধ্যেই সে এমন দু-পয়সা জমিয়ে ফেলেছিল যে ইচ্ছে করলেই বাকি জীবনটা পায়ের উপরে পা দিয়ে গদিয়ান হয়ে বসে বসে খেতে পারত।
কিন্তু তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা সামান্য ছিল না। সে চায় এমন যশের শিখরে উঠে দাঁড়াতে, যার নাগাল কেউ পাবে না! দুনিয়ার অনেক ছোটো ডাকাত পরে রাজা-মহারাজা হয়েছে, সাগরবাসী বোম্বেটেই বা কেন দেশমান্য মহাপুরুষ হতে পারবে না? হয়তো এমনই সব কথা ভেবেই মনটা তার উসখুস করছিল আবার সাগরে আর সাগরের তীরে তীরে কালবৈশাখীর মতো ছুটে যেতে!
এমন সময়ে এসে ধরনা দিলে তার লক্ষ্মীছাড়া চ্যালাচামুণ্ডার দল!
'কী হে, খবর কী? মুখ অত শুকনো কেন?'
'সর্দার! আমরা খেতে পাচ্ছি না!'
'বেশ তো, সেজন্য ভাবনা কী? টাকা রোজগার করো!'
'আমরা তো সেইজন্যেই তোমার কাছে এসেছি, সর্দার! আমরা খেতে পাচ্ছি না। আমরা টাকা রোজগার করতে চাই। আমরা আবার সমুদ্রে ভাসতে চাই!'
মর্গ্যান হাসিমুখে বললে 'আচ্ছা, তা-ই হবে। তোমরা প্রস্তুত হও।'
'আমরা প্রস্তুত। পাওনাদার হতভাগারা ভারী ছোটোলোক, তারা এখানে আমাদের আর তিষ্ঠোতে দিচ্ছে না!'
মর্গ্যান যাত্রার জন্যে প্রস্তুত হতে লাগল। এবার সে যে আয়োজনে নিযুক্ত হল, তার আগে পৃথিবীতে আর কোনও পেশাদার বোম্বেটে স্বপ্নেও তা করেছে কি না সন্দেহ! তার আয়োজনের বিপুলতা দেখলে তাকে আর বোম্বেটে বলেও মনে হবে না। ছোটোখাটো লুঠপাট বা রাহাজানি যারা করে, পৃথিবী তাদের ডাকাত বলে ডাকে। কিন্তু চেঙ্গিজ খাঁ, তৈমুর লং, আলেকজান্ডার, সিজার, নাদির শাহ বা নেপোলিয়নকে ডাকাত বলতে সাহস করে না কেউ। এই হিসাবে, মর্গ্যানও আজ বেঁচে থাকলে, তাকে বোম্বেটে বলে ডাকলে হয়তো মানহানির মামলা আনতে পারত!
মর্গ্যানের এবারকার নৌবাহিনীতে জাহাজের সংখ্যা হল সাঁইত্রিশখানা! অ্যাডমিরালের— অর্থাৎ মর্গ্যানের— জাহাজে ছিল বাইশটা প্রকাণ্ড কামান ও ছয়টা ছোটো পিতলের কামান। বাকি কোনওখানাতে বিশটা, কোনওখানাতে আঠারোটা, কোনওখানাতে ষোলোটা, এবং সবচেয়ে ছোটো জাহাজেও কামানের সংখ্যা ছিল অন্তত চারটে। লোকও গেল অনেক। তাদের নাবিক ও চাকরবাকর ছিল ঢের, কিন্তু তাদের বাদ দিলেও সৈনিক বা বোম্বেটেরা গুনতিতে দাঁড়াল পুরোপুরি দুই হাজার! এবারে মর্গ্যান নিজের দলকে আর বোম্বেটের দল বলতেও রাজি হল না, তার মতে তারা হচ্ছে ইংল্যান্ডপতির কর্মচারী! যারা ইংল্যান্ডের রাজার মিত্র নয়, তাদের সঙ্গেই সে নাকি লড়াই করতে যাচ্ছে! ইংল্যান্ডের রাজার বিনা হুকুমের ও বিনা মাহিনার ভৃত্য হয়ে তারা নিজেদের পাপকার্য অর্থাৎ নরহত্যা, দস্যুতা ও লুণ্ঠনকেও বৈধ বলে প্রমাণিত করতে চলল।
তারপর আরম্ভ হল আগেকার দৃশ্যেরই পুনরভিনয়— জলে স্প্যানিয়ার্ড জাহাজ দেখলেই তারা দখল করে, স্থলে স্প্যানিয়ার্ডদের শহর বা গ্রাম পেলেই লুণ্ঠন করে, বন্দিদের মেরে ফেলে বা মারাত্মক শাস্তি দেয়। সেন্ট কাথারাইন দ্বীপও তারা অধিকার করলে। কিন্তু এসব কথা আর খুঁটিয়ে না বললেও চলবে।
আমরা এখানে বোম্বেটে মর্গ্যানের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল ঘটনার কথাই বলব— অর্থাৎ পানামা অধিকার।
পানামার নাম জানে না, সভ্য পৃথিবীতে এখন এমন লোক বোধহয় নেই। সকলেই জানেন, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সংযোগস্থলে আছে এই নগরটি। পানামায় তখন ছিল স্প্যানিয়ার্ডদের প্রভুত্ব, এখন তা স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। পানামা নগরের বর্তমান লোকসংখ্যা৫৯,৪৫৮।
কিন্তু পানামার পথঘাট বোম্বেটেদের ভালো করে জানা ছিল না। কাপ্তেন মর্গ্যান তখন পানামা অঞ্চলের কোনও ডাকাতকে খুঁজতে লাগল। পৃথিবীতে সাধু খুঁজে পাওয়াই প্রায়ই অসম্ভব ব্যাপার, অসাধুর সন্ধান পাওয়া তো অত্যন্ত সহজ! অবিলম্বেই পানামার তিন ডাকাতকে পাওয়া গেল— নৃশংস ও নিম্নশ্রেণির ডাকাত। লুটের লোভে তারা এক কথাতেই মর্গ্যানের পথপ্রদর্শক হওয়ার জন্যে আগ্রহ প্রকাশ করলে।
পানামায় যেতে হলে চাগ্রে নদীর ধারে একটা দুর্ভেদ্য কেল্লা পার হয়ে যেতে হয়। মর্গ্যান আগে সেই কেল্লাটা দখল করবার জন্যে সৈন্য ও সেনাপতি পাঠিয়ে দিলে। যেমন নেতা, তেমনই সেনাপতি। তার নাম কাপ্তেন ব্রোডলি, এ অঞ্চলে অগুনতি ডাকাতি করে সে দুর্নাম কিনতে পেরেছে যথেষ্ট। তিন দিন পরে সে চাগ্রে দুর্গের কাছে গিয়ে হাজির হল— স্প্যানিয়ার্ডরা তাকে সেন্ট লরেন্স দুর্গ বলে ডাকত। এই দুর্গটি উঁচু পাহাড়ের উপর অবস্থিত— তার চারিদিকে শক্ত পাথরের মতো পাঁচিল। পাহাড়ের শিখরদেশ দুই ভাগে বিভক্ত, মাঝখানে তিরিশ ফুট গভীর এক খাল। সেই খালের উপরকার টানা সাঁকোর সাহায্যে দুর্গের একমাত্র প্রবেশপথের ভিতরে ঢোকা যায়। বড়ো দুর্গের তলায় আছে আবার একটা ছোটো কিন্তু রীতিমতো মজবুত কেল্লা— আগে সে কেল্লা ফতে না করে নদীর মুখে প্রবেশ করাই অসম্ভব।
গুণধর বোম্বেটেদের সঙ্গে চোখের দেখা হতেই স্প্যানিয়ার্ডরা মুষলধারে গোলাগুলি বৃষ্টি শুরু করলে। কেল্লা তখনও মাইল তিনেক তফাতে। পথঘাট ধুলোকাদায় ভরা, চলতে বড়ো কষ্ট। তবু বোম্বেটেরা দাঁড়াল না, তারা যত এগোয় স্প্যানিয়ার্ডরা ততই পিছিয়ে যায়। এইভাবে অগ্রসর হয়ে বোম্বেটের দল দুর্গের কাছে খোলা জমিতে এসে পড়ল।
ইতিমধ্যেই তাদের লোকক্ষয় হয়নি বড়ো কম। কিন্তু এখন তাদের বিপদ আরও বেড়ে উঠল। খোলা জমি, শত্রুপক্ষের গুলির ধারা সিধে তাদের দিকে ছুটে আসছে, কোথাও এমন ঠাঁই নেই যে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করা যায়। সামনেই কামানের সারের পর সার সাজিয়ে খাড়া হয়ে আছে বিরাট ওই দুর্গ, দেখলেই মনে হয় ওকে দখল করা অসম্ভব। এবং এই মুক্ত স্থানে আর অপেক্ষা করাও সম্ভবপর বা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এখন হয় পালানো, নয় আক্রমণ করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। পালালে অপমান, এগোলেও পরাজয় বা মৃত্যু!
হতাশভাবে গোলোকধাঁধায় পড়ে বোম্বেটেরা অনেকক্ষণ পরামর্শের পর স্থির করল— দুর্গ আক্রমণ করতেই হবে— মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন!... এক হাতে তরবারি ও আর এক হাতে বোমা নিয়ে তারা অগ্রসর হতে লাগল অকুতোভয়ে!
স্প্যানিয়ার্ডরা দুর্গপ্রাকার থেকে কামান ছুড়ছে, ছুড়ছে আর ছুড়ছেই! বোম্বেটেরা হতাহতের ভিতর দিয়ে পথ করে যখন আরও কাছে এগিয়ে এল, স্প্যানিয়ার্ডরা তখন চিৎকার করে বললে, 'ওরে ইংরেজ কুত্তার দল! তোরা হচ্ছিস ভগবান আর আমাদের রাজার শত্রু! আয়, এগিয়ে আয়, তোদের পিছনে যারা আছে তারাও এগিয়ে আসুক! তোদের আর এ যাত্রা পানামায় যেতে হচ্ছে না।'
বোম্বেটেরা কেল্লার পাঁচিলের উপরে ওঠবার চেষ্টা করলে— কিন্তু বৃথা! গরম গরম গোলার ঝড়ে ও গুলির বৃষ্টিতে জীবন্ত সব দেহ মুহূর্তে মৃতদেহে পরিণত হল! তখন সে রাত্রের মতো তারা যুদ্ধে ক্ষান্তি দিয়ে পালিয়ে এল।
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে আবার যুদ্ধ আরম্ভ! বোম্বেটেরা বোমা ছুড়ে যখন কেল্লার পাঁচিলকে কাবু করবার চেষ্টা করছে, তখন আশ্চর্য এক কাণ্ড হল! তখন বন্দুকের ব্যবহার আরম্ভ হলেও ধনুকের ব্যবহার একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। স্প্যানিয়ার্ডরা বন্দুকের সঙ্গে ধনুকও ছুড়ছিল। হঠাৎ একটা তির এসে একজন বোম্বেটের দেহকে এ ফোঁড়-ও ফোঁড় করে দিলে। কিছুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করেই সে সেই তিরটা নিজের বুকের উপর থেকে একটানে আবার উপড়ে ফেললে। তারপর তার কী খেয়াল হল, খানিকটা তুলো নিয়ে তিরের গায়ে জড়িয়ে সেটা নিজের বন্দুকের নলচের ভিতরে পুরে দুর্গ লক্ষ করে সে গুলি ছুড়লে! গুলির সঙ্গে তিরটাও বন্দুকের ভিতর থেকে বেরিয়ে দুর্গের ভিতরে গিয়ে পড়ল। দুর্গের ভিতরে যেসব বাড়ি ছিল সেগুলোর ছাদ হচ্ছে তালপাতায় ছাওয়া। তির সংলগ্ন জ্বলন্ত তুলোর গুণে দুই-তিনখানা বাড়ির ছাদে আগুনের শিখা দেখা দিলে। যুদ্ধে ব্যস্ত স্প্যানিয়ার্ডরা সেদিকে নজর দেওয়ার সময় পেলে না। সকলের অজ্ঞাতসারেই সেই অদ্ভুত উপায়ে প্রজ্বলিত অগ্নি একরাশ বারুদের স্তূপকে স্পর্শ করলে— সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ অগ্ন্যুৎপাত, বিষম বারুদ-গর্জন, বহু কণ্ঠের সচকিত চিৎকার ও স্প্যানিয়ার্ডদের সভয়ে ছুটোছুটি! যুদ্ধ ভুলে সকলেই তাড়াতাড়ি আগুন নেভাবার চেষ্টা করতে লাগল।
বোম্বেটেরা এমন মহাসুযোগ ত্যাগ করলে না, দৈবের অনুগ্রহে আবিষ্কৃত পূর্বকথিত উপায়ে তারা দুর্গের আরও নানা জায়গায় অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি করলে। স্প্যানিয়ার্ডদের ভয়, কাতরতা ও ব্যস্ততা বেড়ে উঠল— একটা আগুন নেভায় তো আরও দু-জায়গায় দপদপ করে নতুন আগুন জ্বলে ওঠে!
সেই আগুনে অবশেষে অনেক জায়গায় দুর্গের বেড়া উড়েপুড়ে গেল এবং প্রাচীরের বিরাট মৃত্তিকাস্তূপ ধসে নীচেকার খাল ভরাট করে ফেললে! বোম্বেটেরা তার সাহায্যে অনায়াসে খাল পার হয়ে দুর্গের প্রথম প্রাচীরের ভিতরে গিয়ে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল।
তবু যুদ্ধ থামল না— গভীর রাত্রে মানুষেরা স্বজাতিকে ধ্বংস করবার জন্যে বন্য পশুর মতো যুঝতে লাগল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বোম্বেটেদের কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারলে না। সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হল দেখে বীর স্প্যানিয়ার্ডরা আত্মসমর্পণের চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয় ভেবে দলে দলে জলে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নিলে। দুর্গের গভর্নরও জীবন থাকতে আত্মদান করলেন না, বোম্বেটেরা যখন তাঁর দেহ স্পর্শ করতে পারলে তখন তাঁর আত্মা পরলোকে। দুর্গের তিনশো চোদ্দোজন লোকের মধ্যে জ্যান্ত অবস্থায় পাওয়া গেল মাত্র তিরিশজন লোক— তাদের মধ্যেও কুড়িজন আহত। কেবল নয়জন লোক পানামার গভর্নরের কাছে খবর দিতে গেছে— বাকি সবাই মৃত! বোম্বেটেদেরও ক্ষতি বড়ো সামান্য নয়। তাদের একশোজন হত ও সত্তরজন আহত হয়েছে।
জীবিত স্প্যানিয়ার্ডরা শারীরিক যন্ত্রণার চোটে স্বীকার করতে বাধ্য হল যে, পানামার গভর্নর বোম্বেটেদের আগমনের সব খবরই আগে থাকতেই পেয়েছেন এবং আগে থাকতেই তাদের ভালো করে অভ্যর্থনা করবার জন্যে দস্তুরমতো প্রস্তুত হয়ে আছেন। চাগ্রে নদীর ধারে সর্বত্রই তাঁর সৈন্যরা অপেক্ষা করছে এবং সর্বশেষে তিনিও অপেক্ষা করছেন তিন হাজার ছয়শো সৈন্য নিয়ে।
অতঃপর বোম্বেটেদের উচ্চ জয়ধ্বনির মধ্যে কাপ্তেন মর্গ্যান তার বাকি বারোশত সৈন্য নিয়ে দুর্গের মধ্যে প্রবেশ করলে। পানামা বিজয়ের পথের কাঁটা দূর হয়েছে। সকলের মুখেই হাসি আর ধরে না।
যে একশো বোম্বেটে অর্থলোভে সেখানে প্রাণ দিলে, জীবিত সঙ্গীদের মুখের হাসি দেখবার সুযোগ তাদের দেহহীন আত্মারা সেদিন পেয়েছিল কি না কে জানে!
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। পানামার যুদ্ধ
১৬৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৮ আগস্ট তারিখে কাপ্তেন মর্গ্যান চাগ্রে দুর্গ ছেড়ে পানামা নগরের দিকে অগ্রসর হল সদলবলে।
যাত্রা শুরু হল জলপথে, নদীতে নৌকায় চড়ে। যতই অগ্রসর হয়, দেখে নদীর দুই নির্জন তীর মরু-শ্মশানের মতো হা হা করছে, শস্যখেতে কৃষক নেই, গ্রামে বাসিন্দা নেই, পথে কুকুর-বিড়াল নেই, কোথাও জীবনের এতটুকু চিহ্ন পর্যন্ত নেই! স্প্যানিয়ার্ডরা সবাই পালিয়েছে তাদের ভয়ে এবং সঙ্গে করে নিয়ে গেছে জীবনের যত কিছু আনন্দ!
প্রথম থেকেই ঘটল খাদ্যাভাব। মর্গ্যান সঙ্গে বেশি খাবার নিয়ে ভারগ্রস্ত হতে চায়নি, ভেবেছিল পথে লোকালয়ে নেমে তরোয়াল উঁচিয়ে বিনামূল্যে প্রচুর খাদ্য আদায় করবে। তার সে আশায় ছাই পড়ল। মানুষ নেই, খাবারও নেই। শূন্য উদরের অভাব ভোলবার জন্যে বোম্বেটেরা তামাকের পাইপ মুখে দিয়ে অন্যমনস্ক হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে।
তারপর জলপথে নৌকাও হল অচল। বৃষ্টির অভাবে নদী ক্রমেই শুকিয়ে আসছে। নৌকা ছেড়ে বোম্বেটেরা ডাঙায় নামল। চলতে চলতে তারা কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করতে লাগল, শত্রুরা তাদের আক্রমণ করতে আসুক! কারণ শত্রুরা এলে খাবারও তাদের সঙ্গে আসবে এবং শত্রু মেরে তারা সেই খাবারে ভাগ বসাতে পারবে!
আজ যাত্রার চতুর্থ দিবস। আজ শত্রুদের বদলে তাদের পরিত্যক্ত একটা ছাউনি পাওয়া গেল, তার ভিতরে পড়ে ছিল অনেকগুলো চামড়ার ব্যাগ, হয়তো ভুলে ফেলে গেছে! ক্ষুধার্ত বোম্বেটেরা পরম আনন্দে সেই শুকনো চামড়ার ব্যাগগুলো নিয়েই কাড়াকাড়ি করতে লাগল— গরম জলে সিদ্ধ ও নরম করে সেই ব্যাগের চামড়াই খেয়ে আজ তারা পেটের জ্বালা নিবারণ করবে!
পঞ্চম দিনে তারা আর-এক জায়গায় এসে স্প্যানিয়ার্ডদের আর-একটা পরিত্যক্ত ছাউনি আবিষ্কার করলে। কিন্তু হায় রে, একটা চামড়ার ব্যাগ পর্যন্ত এখানে পাওয়া গেল না! কী দুর্ভাগ্য! এ হতচ্ছাড়া দেশে কি একটা জ্যান্ত কুকুর বা বিড়াল পর্যন্ত ল্যাজ নাড়ে না? নিদেন দু-চারটে ইঁদুর?
লোকে গালাগালিতে জুতো খেতে বলে। তারাও হয়তো জুতো খেতে রাজি ছিল— ব্যাগ আর জুতোর চামড়ায় তফাতটা কী? কিন্তু জুতোগুলোও খেয়ে ফেললে খালি পায়ে এইসব কাঁটাভরা জঙ্গল আর কাঁকরভরা উঁচু-নিচু পথ দিয়ে ক্রোশের পর ক্রোশ পার হয়ে ধনরত্ন লুটতে যাবে কেমন করে?
তারা বাংলা দেশের সেপাই হলে জুতোগুলো এত সহজে রেহাই পেত না। বাংলায় খালি পায়ে কাঁকর বেঁধে না, কাঁটা ফোটে না!
অনেকে বোধ করি অবাক হচ্ছেন? কিন্তু এতে অবাক হওয়ার কী আছে? পেটের জ্বালা কেমন, দুর্ভিক্ষের দেশ তা জানে। পেটের জ্বালায় মানুষ মানুষের মাংসও বাদ দেয় না। ইতালির এক কারারুদ্ধ কাউন্ট নাকি খিদের চোটে নিজের ছেলের মাংসও খেতে ছাড়েননি।
...এই নির্জন মরু-শ্মশানে দেবতার হঠাৎ এ কী আশীর্বাদ! কলির দেবতারাও হয়তো ভিতু, কারণ প্রায়ই তাঁরা অসাধুর দিকেই মুখ তুলে চান। বোম্বেটেরা পথের মাঝে এক পাহাড়ের গুহা আবিষ্কার করলে, তার ভিতরে পাওয়া গেল খাবারের ভাণ্ডার— এমনকী ফল আর মদ পর্যন্ত! সম্ভবত স্প্যানিয়ার্ডরা পালাবার সময়ে এগুলো এখানে লুকিয়ে রেখে গিয়েছিল।
সবাই উপোসি শকুনির মতো সেই ভাণ্ডার লুণ্ঠন করলে। ভালো করে না হোক, পেট তবু কতকটা ঠান্ডা হল।
ষষ্ঠ দিনেও পথের শেষ নেই। কখনো জলপথ, কখনো স্থলপথ— যখন যেমন সুবিধা। আবার অশ্রান্ত ক্ষুধার আবির্ভাব। চারিদিক তেমনই নিরালা আর নিঝুম, যারা পালিয়েছে তারা খাবারের গন্ধটুকু পর্যন্ত চেঁচেমুছে নিয়ে পালিয়েছে! বোম্বেটেরা মনে মনে কেবল শত্রুকে ডাকতে লাগল। শত্রু! সে-ও আজ মিত্রের মতো! কেউ গাছের পাতা ছিঁড়ে ও কেউ মাঠের ঘাস উপড়ে মুখে পুরে উদরের শূন্যতাকে ভরাবার চেষ্টা করতে লাগল। স্প্যানিয়ার্ডরা লড়ে তাদের এমন জব্দ করতে পারত না! গা-ঢাকা দিয়ে তারা তাদের কী মারাত্মক শাস্তিই দিচ্ছে! প্রায় দেড়শো বৎসর পরে নেপোলিয়ন এবং খ্রিস্ট জন্মাবারও আগে পারস্যের এক সম্রাট রুশ-দেশ আক্রমণ করতে গিয়ে এমনই শাস্তিই পেয়েছিলেন।
শয়তানদের উপরে আবার দেবতার দয়া হল! এবারে এক চাষার বাড়িতে তারা পেলে ভুট্টার ভাণ্ডার। ভাঁড়ার লুটে তারা যত পারলে খেলে, বাকি মাল সঙ্গে করে নিয়ে চলল। কিন্তু বারোশো ক্ষুধার্ত ডাকাতের কাছে সে ভুট্টার অস্তিত্ব আর কতক্ষণ! ক্ষুধা মিটল না, তবে আপাতত প্রাণ রক্ষা হল বটে!
সপ্তম দিনে দেখা গেল— দূরে একটা ছোটো শহর, তার উপরে উড়ছে ধোঁয়া। বোম্বেটেরা আনন্দে নেচে উঠল। কারণ বিনা কার্য হয় না, আগুন বিনা ধোঁয়া হয় না। আর আগুন মানুষ ছাড়া আর কেউ জ্বালে না। বাসিন্দারা নিশ্চয়ই রাঁধছে— ও ধোঁয়া উনুনের ধোঁয়া।
পাগলের মতো তারা শহরের দিকে ছুটল— শূন্যে আকাশকুসুম চয়ন করতে করতে! এই তো শহর তাদের সামনেই!
কারণ বিনা কার্য হয় না, আগুন বিনা ধোঁয়া হয় না। আর, আগুন মানুষ ছাড়া আর কেউ জ্বালে না।... হ্যাঁ, এ আগুনও মানুষই জ্বেলেছে বটে, স্প্যানিয়ার্ডরা শহর ছেড়ে অদৃশ্য হয়েছে এবং যাওয়ার সময়ে শহরে আগুন লাগিয়ে দিয়ে গেছে। বোম্বেটেরা এখানে খুদকুঁড়োটি পর্যন্ত পেলে না। একটা জ্যান্ত বা মরা কুকুর-বিড়ালও শত্রুরা রেখে যায়নি।
একটা আস্তাবলে পাওয়া গেল কেবল প্রচুর মদ আর পাঁউরুটি। অমনি তারা সারি সারি বসে গেল ফলারে! কিন্তু পানাহার শুরু করতেই তাদের শরীর যাতনায় দুমড়ে পড়ল। চারিদিকে রব উঠল— 'শত্রুরা খাবারে বিষ মিশিয়ে রেখে গেছে!' ভয়ে আঁতকে উঠে থু থু করে তারা তখনই মুখের খাবার ধুলোয় ফেলে দিলে।
অষ্টম দিনে বোম্বেটেরা পানামা নগরের খুব কাছে এসে পড়ল। ঘণ্টা দশেক পথ চলার পর তারা বনের ভিতরে একটা পাহাড়ের কাছে এসে দাঁড়াতে-না দাঁড়াতেই তাদের উপরে ঝাঁকে ঝাঁকে তিরবৃষ্টি হতে লাগল। তির দেখেই বোঝা গেল, কারণ এসব তির যারা ছুড়ছে তাদের টিকিটি পর্যন্ত কারো নজরে পড়ল না।
বোম্বেটেরা বনপথে এগোবার চেষ্টা করলে, অমনি রেড ইন্ডিয়ানরা বিকট চিৎকার করতে করতে তাদের দিকে ছুটে এল। কিন্তু একে তাদের দল বোম্বেটেদের মতো পুরু নয় তার উপরে তাদের আগ্নেয় অস্ত্রেরও অভাব, সুতরাং বেশিক্ষণ তারা যুঝতে পারলে না। রেড ইন্ডিয়ান সর্দার আহত হয়ে পড়ে গিয়েও আত্মসমর্পণ করলে না, কোনওরকমে একটু উঠে বসে একটা বোম্বেটের দিকে বর্শা নিক্ষেপ করলে, কিন্তু পরমুহূর্তেই পিস্তলের গুলিতে তার যুদ্ধের শখ এ জীবনের মতন মিটে গেল!
খানিক পরেই একটা বনের ভিতরে পাওয়া গেল দুটো পাহাড়। একটা পাহাড়ের উপরে উঠে বোম্বেটেরা দেখলে, অন্য পাহাড়টার উপরে চড়ে বসে আছে স্প্যানিয়ার্ড ও রেড ইন্ডিয়ানরা। তারা তখন নীচে এল। তা-ই দেখে শত্রুরাও নীচে নামতে লাগল। বোম্বেটেরা ভাবলে, এইবারে বুঝি আবার যুদ্ধ বাধে! কিন্তু শত্রুরা এখানে লড়াই না করেই কোথায় সরে পড়ল!
সেরাত্রে বোম্বেটেদের বিষের পাত্র কানায় কানায় পূর্ণ করবার জন্যে আকাশে দেখা দিলে ঘনঘটা এবং তারপরেই নামল অশ্রান্ত বৃষ্টিধারা। নিরাশ্রয়ের মতো সেই ঝড়বাদলকে তাদের মাথা পেতেই গ্রহণ করতে হল। পরদিন সকালে— অর্থাৎ যাত্রার নবম দিনে প্রায় অনাহারে জলে ভিজে অত্যন্ত দুঃখিতভাবে তারা কাদা ভাঙতে ভাঙতে আবার অগ্রসর হল।
আচম্বিতে পথ সমুদ্রতীরে এসে পড়ল এবং দেখা গেল খানিক তফাতে কতকগুলো ছোটো ছোটো দ্বীপ রয়েছে। বোম্বেটেরা তখনই নৌকায় চেপে দেখতে গেল, সেসব দ্বীপের ভিতরে কী আছে!
সে দ্বীপে পাওয়া গেল গোরু, মোষ, ঘোড়া এবং সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় গাধা। বোম্বেটেরা মনের খুশিতে তাদের দলে দলে বধ করতে আরম্ভ করলে। তখনই তাদের ছাল ছাড়িয়ে আগুনের ভিতরে ফেলে দেওয়া হল। মাংস সিদ্ধ হওয়া পর্যন্তও তারা অপেক্ষা করতে পারলে না, ক্ষুধার চোটে প্রায় কাঁচা মাংসই চিবিয়ে খেতে লাগল। আজ এতদিন পরে এই প্রথম তারা মনের সাধে পেট ভরে খাওয়ার সুযোগ পেলে!
খাবার খেয়ে নতুন শক্তি পেয়ে মর্গ্যানের হুকুমে আবার তারা পথে নামল। সন্ধ্যা যখন হয়- হয় তখন দেখা গেল, দূরে প্রায় দুইশত স্প্যানিয়ার্ড তাদের গতিবিধি লক্ষ করছে এবং তাদের পিছন থেকে দেখা যাচ্ছে পানামা শহরের একটা উঁচু গির্জার চুড়ো।
বোম্বেটেরা আশ্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বিপুল উল্লাসে জয়ধ্বনি করে উঠল— চারিদিকে পড়ে গেল আনন্দের সাড়া। এইবারে তাদের পথশ্রম, রোদে পোড়া, জলে ভেজা ও পেটের জ্বালা শেষ হল। আসল যুদ্ধ এখনও হয়নি বটে, নগর এখনও নাগালের বাইরে বটে, কিন্তু সে অসুবিধা বেশিক্ষণ আর ভোগ করতে হবে না! আর তাদের বাধা দেয় কে?... সে রাতের মতো তাঁবু গেড়ে তারা ঘুমিয়ে পড়ল।
সকাল হল। শত্রুদের পঞ্চাশজন অশ্বারোহী এসে দূর থেকেই চেঁচিয়ে শাসিয়ে গেল, 'ওরে পথের কুকুরের দল! এইবারে আমরা তোদের বধ করব!'— তারপরেই পানামা নগর থেকে গোলাবৃষ্টি আরম্ভ হল— কিন্তু মিথ্যা সে গোলাগুলোর গোলমাল, কারণ গোলাগুলোর একটাও তাদের কাছ পর্যন্ত এসে পৌঁছোল না।
দশম দিনের সকালে বোম্বেটেরা বসে বসে নিশ্চিন্ত প্রাণে খানা খেয়ে নিলে— অনেকেরই এই শেষ খানা!
তারপরেই জেগে উঠল তাদের জয়ঢাক আর রণভেরিগুলো। বোম্বেটেরা শ্রেণিবদ্ধ হয়ে সমতালে পা ফেলতে ফেলতে অগ্রসর হল।
দেখা গেল, দূরে কামানের সারের পর সার সাজিয়ে স্প্যানিয়ার্ডরা যুদ্ধক্ষেত্রে অপেক্ষা করছে। তারা জানে, বোম্বেটেরা এই পথেই আসবে।
এমন সময়ে সেই পথপ্রদর্শক ডাকাতরা মর্গ্যানকে ডেকে বললে, 'হুজুর, এ পথে অনেক কামান, অনেক বাধা! বনের ভিতর দিয়ে আর-একটা পথ আছে, সেটা ভালো নয় বটে কিন্তু সেখান দিয়ে খুব সহজেই শহরে পৌঁছোনো যাবে।'
মর্গ্যান তাদের কথামতোই কাজ করলে— বোম্বেটেরা অন্য পথ ধরলে।
স্প্যানিয়ার্ডদের প্রথম চাল ব্যর্থ হল। বোম্বেটেরা যে হঠাৎ পথ বদলাবে, এটা তারা আশা করেনি। তাদের সমস্ত আয়োজন হয়েছিল এইখানেই। বাধ্য হয়ে তারাও অন্য পথে বোম্বেটেদের বাধা দেওয়ার জন্যে ছুটল— তাড়াতাড়িতে ভারী ভারী কামানগুলোকে এখান থেকে টেনে নিয়ে যাওয়ারও সময় পেলে না। এই ভুল হল তাদের সর্বনাশের কারণ।
বোম্বেটেরা সভয়ে দেখলে, শত্রুর যেন শেষ নেই! কাতারে কাতারে লোক তাদের আক্রমণ করবার জন্যে বিকট চিৎকারে ধেয়ে আসছে— তাদের পিছনে আবার কাতারে কাতারে সৈন্য। এত শত্রু-সৈন্য এক জায়গায় তারা আর কখনো দেখেনি! অশ্বারোহী, পদাতিক, কামানবাহী— কিছুরই অভাব নেই!
তার উপরে আছে আবার হাজার হাজার বুনো মোষের পাল— রেড ইন্ডিয়ান ও কাফ্রিরা মোষগুলোকে তাদের দিকেই তাড়িয়ে আনছে! সেকালে ভারতের রাজারা যুদ্ধক্ষেত্রে যেভাবে হাতির পাল ব্যবহার করতেন, এরা এই বুনো মোষগুলোকে ব্যবহার করবে সেইভাবেই!
একটা ছোটো পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বোম্বেটেরা শত্রুদের এই বিপুল আয়োজন লক্ষ করতে লাগল। এখন তাদের পালাবারও পথ বন্ধ। পিছনে জেগে আছে জনহীন, আশ্রয়হীন ও খাদ্যহীন সেই নির্দয় শ্মশানভূমি! নিজেদের বিপদসংকুল অবস্থার কথা ভেবে বোম্বেটেরা একেবারে মরিয়া হয়ে উঠল। তারা স্থির করলে— হয় মরবে, নয় মারবে! তারা পালাবেও না, আত্মসমর্পণও করবে না!
রণভেরি বেজে উঠল। মর্গ্যান সর্বাগ্রে দুইশত বাছা বাছা সুদক্ষ ফরাসি বন্দুকধারীকে দলের আগে আগে পাঠিয়ে দিলে।
স্প্যানিয়ার্ডরাও অগ্রসর হতে হতে চিৎকার করে উঠল, 'ভগবান আমাদের রাজার মঙ্গল করুন!'
প্রথমেই আসছে শত্রুদের অশ্বারোহী সৈন্যদল। কিন্তু খানিক এগিয়েই তারা এক জলাভূমির উপরে এসে পড়ল— সেখানে ঘোড়া নিয়ে ঘোরাফেরাই দায়!
বোম্বেটে বন্দুকধারীরা এ সুযোগ অবহেলা করলে না, তারা মাটির উপরে এক হাঁটু রেখে বসে, টিপ টিপ করে বন্দুক ছুড়লে এবং অনেকেরই লক্ষ্য হল অব্যর্থ! ঘোড়সওয়াররা জলাভূমির ভিতরে হাঁকপাঁক করে বেড়াতে লাগল এবং গুলির পর গুলির চোটে হয় ঘোড়া নয় সওয়ার হত বা আহত হয়ে নীচে পড়ে যেতে লাগল।
অশ্বারোহীদের আক্রমণে ফল হল না দেখে, বোম্বেটেদের ছত্রভঙ্গ করবার জন্যে বুনো মোষগুলো লেলিয়ে দেওয়া হল। কিন্তু মোষেদের বেশির ভাগই গোলাগুলির আওয়াজে চমকে ও ভড়কে অন্যদিকে ছুটে পালাল, যারা এগিয়ে গেল তাদের বেশি রাগ হল মানুষের বদলে রঙিন নিশানগুলোরই উপরে। তারা পতাকা লক্ষ করে তেড়ে এল এবং সেই ফাঁকে বোম্বেটেরা তাদের গুলি করে নিশ্চিন্তপুরে পাঠিয়ে দিলে।
তারপর আরম্ভ হল বোম্বেটেদের সঙ্গে স্প্যানিয়ার্ড পদাতিকদের লড়াই। বোম্বেটেরা জানত, হারলে তারা কেউ আর প্রাণে বাঁচবে না। তাই তারা এমন মরিয়া হয়ে লড়তে লাগল যে, এক-একজন বোম্বেটেকে তিন-চারজন স্প্যানিয়ার্ড মিলেও কায়দায় আনতে পারলে না। বোম্বেটেদের এক হাতে পিস্তল, আর-এক হাতে তরোয়াল— দূরের শত্রুকে গুলি ছুড়ে মারে, কাছে পেলে বসিয়ে দেয় তরোয়ালের কোপ! তারা অসম্ভব শত্রু! ঘণ্টা দুইয়ের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ। স্প্যানিয়ার্ডরা যে যেদিকে পারলে সরে পড়ল— ছয়শোজন মৃত সঙ্গীর দেহ যুদ্ধক্ষেত্রে ফেলে রেখে।
এত আয়োজনের পর এত শীঘ্র লড়াই শেষ হয়ে যাবে, এটা কেউ কল্পনা করতে পারেনি। পানামার পতন হল।
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ। পলাতক বিজয়ী নেতা
খুব সহজে ও অল্প সময়ের মধ্যেই চেঙ্গিজ খাঁ, আলেকজান্ডার, সিজার ও নেপোলিয়ন শত্রু-সৈন্য ধ্বংস করতে পারতেন বলেই তাদের আজ এত নাম।
তাঁদের সঙ্গে বোম্বেটে মর্গ্যানের তুলনাই চলে না। কিন্তু মর্গ্যানের পানামা বিজয় যে বিশেষ বিস্ময়জনক ব্যাপার, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই।
পূর্বকথিত দিগবিজয়ীরা এক বা একাধিক সমগ্র জাতির সাহায্য পেয়েই বড়ো হয়েছিলেন।
কিন্তু মর্গ্যান হচ্ছে কতকগুলো জাতিচ্যুত, সমাজ থেকে বিতাড়িত, নীতিজ্ঞানশূন্য, হীন বোম্বেটের সর্দার। এবং তাদের শত্রুরা হচ্ছে অসংখ্য স্প্যানিয়ার্ড সৈনিক, প্রবল পরাক্রান্ত স্পেন সাম্রাজ্যের অতুলনীয় শক্তি তাদের পিছনে, অস্ত্রশস্ত্রে ও সংখ্যাধিক্যে বোম্বেটেদের চেয়ে তারা ঢের বেশি বলিষ্ঠ। তবু যে তারা এত অনায়াসে হার মানতে বাধ্য হল, এটা একটা মস্ত স্মরণীয় ব্যাপার বলে স্বীকার করতেই হবে।
পানামার পতন হল। তারপর যেসব কাণ্ড আরম্ভ হল পাঠকরা তা কল্পনাই করতে পারছেন। বোম্বেটেরা প্রথমে দু-চোখে হত্যা করতে লাগল— সৈনিক, সাধারণ নাগরিক, কাফ্রি, বালক, নারী ও শিশু— খাঁড়া পড়ল নির্বিচারে সকলেরই উপরে। বোম্বেটেরা দলে দলে ধর্মযাজক বা পাদরি বন্দি করলে, প্রথমে তাদেরও পাদরি হত্যা করতে বিবেকে বাধল, তাই তাদের ধরে মর্গ্যানের কাছে নিয়ে গেল।
মর্গ্যান পাদরিদের কান্নায় কর্ণপাত না করে বললে, 'মারো, মারো, সবাইকে মারো!'
লুণ্ঠন চলতে লাগল। পলাতকরা অনেক ধনরত্ন নিয়ে পালিয়েছিল, কিন্তু তখনও শহরে ছিল প্রচুর ঐশ্বর্য। সব পড়ল বোম্বেটেদের হাতে— হিরা, চুনি, পান্না, মুক্তো, সোনা-রুপোর আসবাব ও তাল এবং টাকাকড়ি আর যা কিছু।
তারপর মর্গ্যান জনাকয়েক বোম্বেটেকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললে, 'তোমরা চুপি চুপি শহরে আগুন লাগিয়ে দিয়ে এসো।'
কেউ কিছু টের পাওয়ার আগেই একদিন অকস্মাৎ সেই বৃহৎ নগরের উপরে অগ্নির রাঙা টকটকে জিভ লকলক করে জ্বলে উঠল। স্প্যানিয়ার্ডরা সবাই সেই আগুন নেভাতে ছুটল, এর মধ্যে তাদের সর্দারের হাত আছে না জেনে অনেক বোম্বেটেও তাদের সাহায্য করতে গেল, কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না— দেখতে দেখতে বিরাট অগ্নির বেড়াজালের মধ্যে গোটা শহরটাই ধরা পড়ল! বড়ো বড়ো প্রাসাদ, অট্টালিকা, কারুকার্য করা গির্জা, মঠ, গৃহস্থ ও গরিবের বাড়ি সমস্তই গেল আগুনের গর্ভে! সেই অগ্নিকাণ্ডে ছোটো-বড়ো আট হাজার বাড়ি পুড়ে একেবারে ছাই হয়ে গেল।
মর্গ্যান রটিয়ে বেড়াল, 'স্প্যানিয়ার্ডরাই এই কাণ্ড করেছে!'
লুণ্ঠনের পর নির্যাতন। গুপ্তধনের সন্ধান। নির্যাতনের শত শত দৃষ্টান্তের মধ্যে একটা এখানে দেখাচ্ছি। জনৈক ধনী ভদ্রলোক বোম্বেটেদের ভয়ে ধনরত্ন নিয়ে পালিয়ে যান। তাঁর গরিব চাকরটা মনিবের একটা দামি পোশাক পেয়ে বুদ্ধির দোষে সেটা নিজে পরে ফেললে। কাঙালের ঘোড়ারোগ বরাবরই সাংঘাতিক। বোম্বেটেরা তাকে দেখেই ধরে নিলে, সে কোনও মস্তবড়ো লোক।
তার কাছ থেকে তারা টাকা দাবি করলে। সে কোত্থেকে টাকা দেবে? সে বললে, 'আমি চাকর ছাড়া আর কিছু নই। এ পোশাক আমার মনিবের।'
বোম্বেটেরা বিশ্বাস করলে না। তখন প্রথমেই তারা সে বেচারার হাত দুখানা দুমড়ে একেবারে ভেঙে দিলে। তাতেও মনের মতো জবাব না পেয়ে তারা সেই চাকরের কপালের উপর দড়ির ফাঁস লাগিয়ে এমন জোরে পাকাতে লাগল যে, চামড়ায় টান পড়ে তার চোখ দুটো ডিমের মতো বড়ো হয়ে ঠিকরে পড়বার মতো হয়ে উঠল। তখনও গুপ্তধনের সন্ধান মিলল না। তারপর তাকে শূন্যে দড়িতে ঝুলিয়ে রেখে ঘুসি ও চাবুক মারা হতে লাগল। তার নাক ও কান কেটে নেওয়া হল— জ্বলন্ত খড় নিয়ে মুখে ছ্যাঁকা দেওয়া হতে লাগল। শেষকালে সে এই পৈশাচিক যাতনা থেকে মুক্তি পেলে বর্শার আঘাতে। অভাগা মরে বাঁচল।
তিন হপ্তা পরে দুরাত্মা মর্গ্যান পানামার ভস্মস্তূপ ছেড়ে বিদায় গ্রহণ করলে।
সঙ্গে করে নিয়ে চলল ছয়শো বন্দিকে— প্রচুর টাকা না পেলে সে তাদের ছাড়তে রাজি নয়। সেই ছয়শত স্ত্রী, পুরুষ, শিশু, বালক, যুবা ও বৃদ্ধ বন্দির মিলিত ক্রন্দনে আকাশ যেন ফেটে যাওয়ার মতো হয়ে উঠল।
ভেড়ার পালের মতো বন্দিদের আগে আগে তাড়িয়ে নিয়ে বোম্বেটেরা অগ্রসর হয়। মর্গ্যানের হুকুমে বন্দিদের পানাহারও প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হল।
অনেক নারী আর সইতে না পেরে মর্গ্যানের পায়ের তলায় হাঁটু গেড়ে বসে কাতর মিনতির স্বরে বলল, 'ওগো, আর আমরা পারি না। আপনার পায়ে পড়ি, আমাদের ছেড়ে দিন— আমরা স্বামী-পুত্রের কাছে ফিরে যাই! আমাদের যথাসর্বস্ব গেছে, তবু পাতার কুঁড়ে তৈরি করে স্বামী-পুত্রের সঙ্গে বাস করব!'
নিরেট লোহার মতো সুকঠিন মর্গ্যান বললে, 'আমি এখানে কান্না শুনতে আসিনি— এসেছি টাকা রোজগার করতে। টাকা দিলেই ছাড়ান পাবে, নইলে সারাজীবন বাঁদি হয়ে থাকবে!'
সমুদ্রের ধারে গিয়ে মর্গ্যান বোম্বেটেদের সঙ্গে লুটের মাল ভাগ করতে বসল। নিজের মনের মতো হিসাব করে সকলকে সে অংশ দিলে।
কিন্তু সে অংশ সন্দেহজনক। এত বড়ো শহর লুটে এত পরিশ্রমের পর এই হল পাওনা, এত কম টাকা!
প্রত্যেক বোম্বেটে বিষম রাগে গরগর করতে লাগল। তাদের দৃঢ়বিশ্বাস হল, মর্গ্যান তাদের ফাঁকি দেওয়ার জন্যে বেশির ভাগ দামি মালই সরিয়ে ফেলেছে! মর্গ্যানকে তারা মুখের উপরে কিছু খুলে বলতে সাহস করল না বটে, কিন্তু প্রত্যেকেই মারমুখো হয়ে রইল।
মর্গ্যান বুঝলে, গতিক সুবিধার নয়, এরা প্রত্যেকেই মরিয়া লোক, যে-কোনও মুহূর্তে সে বিপদে পড়তে পারে।
আচম্বিতে একদিন দেখা গেল, চারখানা জাহাজ ও জনাকয়েক খুব বিশ্বাসী লোক নিয়ে চোর মর্গ্যান একবারে অদৃশ্য হয়েছে! একরাত্রেই সে সমস্ত ধনরত্ন নিয়ে চলে গেল— বোম্বেটেরা তাকে ধরতে পারলে না। ধরতে পারলে কী হত বলা যায় না।
তারপর? তারপর মর্গ্যান আর কখনো বোম্বেটেদের সর্দার হয়নি। হওয়ার উপায়ও ছিল না, হওয়ার দরকারও ছিল না।
মর্গ্যানের চূড়ান্ত সৌভাগ্যের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। তার নামডাক শুনে ইংল্যান্ডের রাজা তাকে দেখতে চাইলেন। তার সঙ্গে বন্ধুর মতো ব্যবহার করলেন। তাকে 'স্যার' উপাধি দিলেন। তাকে জামাইকা দ্বীপের গভর্নর করে পাঠালেন। চোর, জোচ্চোর, খুনি, চরিত্রহীন, ডাকাত ও বোম্বেটে মর্গ্যান হল হাজার হাজার সাধুর দণ্ডমুণ্ডের কর্তা— স্যার হেনরি মর্গ্যান!
বিশ্বের শিয়রে মহাবিচারক মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়েন!
কিন্তু স্প্যানিয়ার্ডদেরও শাস্তির দরকার হয়েছিল। তাদের ভীষণ অত্যাচারে আমেরিকা নিদারুণ যন্ত্রণায় হাহাকার করছিল। ভগবানের মূর্তিমান অভিশাপেরই মতো হয়তো তাই মর্গ্যান, লোলোনেজ, পোর্তুগিজ ও ব্রেজিলিয়ানোর দল এসে আবির্ভূত হয়েছিল স্প্যানিয়ার্ডদের মাঝখানে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন