হেমেন্দ্রকুমার রায়

নারীকে বলি আমরা শক্তিহীনা, অবলা। আবার নারীকে বলি আমরা শক্তিরূপিণী, যিনি সকল শক্তির উৎস তিনি হচ্ছেন ভগবতী।
সাধারণত মানুষরা নারীকে দুর্বলা বলেই জানে আর মানে। তাদের মতে, নারীকে আদ্যাশক্তির আসনে বসিয়েছে কেবল কবির কল্পনাই।
কিন্তু তা-ই কি? ঐতিহাসিক ভারতবর্ষে আলেকজান্ডার দি গ্রেটের অভিযানের সময়েও আমরা কী দেখেছি? গ্রিক সৈন্যদের কাপুরুষোচিত আক্রমণের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছেন দলে দলে ভারতীয় নারী। অসংখ্যের সামনে নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে তাঁরা নিজেরা মরেছেন শত্রুর পর শত্রু মারতে মারতে।
সুলতানা রাজিয়া, রানি দুর্গাবতী, চাঁদবিবি, রানি লক্ষ্মীবাই প্রভৃতি ভারতীয় নারীরা দেখা দিয়েছেন মূর্তিমতী শক্তির ভূমিকাতেই। দৃষ্টিদূতকে সাগরের ওপারে প্রেরণ করলেও দেখা যাবে ইংল্যন্ডের বডিসিয়া (Boadicia) ও ফ্রান্সের জোয়ান অফ আর্ক প্রভৃতি বীরনারীকে।
হাল বাংলার নারীও যে শক্তিহীনা নন তা প্রমাণিত করবার জন্যে বেশি বাক্যব্যয় করতে হবে না। চোখের সামনেই আছেন চট্টগ্রাম বিপ্লবের প্রীতিলতা দেবী। শত্রু বধ করতে করতে তিনি দেশমাতৃকার চরণে পরিয়ে দিয়েছিলেন নিজের বুকের রক্ত-আলতা।
আধুনিক বীর-ভারতের শ্রেষ্ঠ সন্তান নেতাজি সুভাষও কেবল পুরুষদের নিয়েই ইংরেজ তাড়াতে যাননি। তাঁরও পতাকার ছায়ায় গিয়ে দৃপ্ত বুকে দাঁড়িয়েছিলেন রণরঙ্গিণী ভারতীয় নারীরা।
বিখ্যাত নগরে নগরে এবং অখ্যাত পল্লিতে পল্লিতে ভারতের নারীরা আজও শান্ত মুখে ঘরসংসার ও আত্মীয়স্বজন নিয়ে নিযুক্ত হয়ে আছেন, বহিঃপৃথিবীর চোখের আড়ালে। কিন্তু আবার যেদিন আসবে দেশের ডাক, সেদিনই তাঁদের ভিতর থেকে আত্মপ্রকাশ করবে মহাশক্তির অপূর্ব আত্মা! নারী বললেই অবলা বুঝায় না।
শ্রীদুর্গার এক নাম 'মহিষমর্দিনী'। আধুনিক মন বলে মহিষমর্দিনীর কাহিনি হচ্ছে পৌরাণিক গল্প।
আমরাও মহিষমর্দিনীর কাহিনি বলব। কিন্তু এটি পৌরাণিক গল্প নয়।
১৪৮৬ থেকে ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজা মানসিংহ ছিলেন গোয়ালিয়রের সর্বেসর্বা। গোয়ালিয়রের পৃথিবীবিখ্যাত শৈলদুর্গের মধ্যে আজও তাঁর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত প্রাসাদ ও মানমন্দির প্রভৃতি বিদেশি দর্শকের বিস্মিত দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
গোয়ালিয়র দুর্গ থেকে উত্তর-পূর্বদিকে কিছু দূর অগ্রসর হলে পাওয়া যায় রাও নামে গ্রাম। তারই কাছে আছে এক গভীর অরণ্য। সেইখানে শিকার করতে গিয়েছেন রাজা মানসিংহ।
বনে ছিল বাঘ, বরাহ ও হরিণ প্রভৃতি। শিকারের সময়ে তখন প্রধান অস্ত্র ছিল তির-ধনু ও বল্লম এবং শিকারিরা সাধারণত থাকত অশ্বপৃষ্ঠে।
রাজা সঙ্গীদের সঙ্গে সারাদিন কাটিয়ে দিলেন বনে বনে। সেদিন তাঁরা কী কী পশু শিকার করলেন ইতিহাসে তা লেখা নেই। তবে রাজপুতরা যখন বরাহ শিকার করতে অত্যন্ত ভালোবাসেন, তখন একাধিক বরাহ যে সেদিন জীবনলীলা সংবরণ করেছিল, এটুকু অনায়াসেই অনুমান করা যেতে পারে। আর প্রাণ দিয়েছিল বোধ করি একাধিক মৃগও।
কিন্তু সূর্যাস্তকালে বনের বাইরে লোকালয়ে এসেই সেদিন রাজা মানসিংহ করলে সবচেয়ে বড়ো শিকার।
তা বরাহ নয়, মৃগও নয়, সে দুর্লভ শিকারের নাম, মৃগনয়না।
কলস্বরে গান গাইতে গাইতে এবং কূলে কূলে নাচতে নাচতে বয়ে যাচ্ছিল রাই নদী।
গ্রামের মেয়েরা মাথায় জলের কলসি নিয়ে ফিরে আসছিল ঘরের দিকে। তারা গুজরিদের মেয়ে।
তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে চোখকে মাতিয়ে তোলে একটি তরুণীর রূপলাবণ্য ও বিচিত্র তনুর ছন্দ! দৃষ্টিতে তার কবিতার মাধুর্য, গঠনে তার বলিষ্ঠতার ইঙ্গিত!
এমন অতুলনীয় রূপ জীবনে আর কখনো দেখেননি মানসিংহ। অভিভূত হয়ে তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখের সুমুখ থেকে তরুণী যখন একটি মোহনীয় স্বপ্নপ্রতিমার মতো অদৃশ্য হয়ে গেল, রাজার তখন হুঁশ হল।
তাড়াতাড়ি একজন পারিষদকে ডেকে বললেন, 'শীঘ্র ওই মেয়েটির পিছনে পিছনে গিয়ে ওর পরিচয় জেনে এসো।'
যথাসময়ে পারিষদ ফিরে এসে বললে, 'মহারাজ, আশ্চর্য কাহিনি শুনে এলুম।'
'কীরকম?'
'ও বড়ো সহজ মেয়ে নয়!'
'কঠিন মেয়ে?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ মহারাজ! যাকে বলে সুকঠিনা কন্যা। আপনার কোনও পালোয়ানও ওর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না!'
'বলো কী হে! তুমি কি আমাকে হতবুদ্ধি করবার চেষ্টায় আছ?'
'মোটেই নয় মহারাজ, মোটেই নয়! কী শুনে এলুম জানেন? ওর নাম মৃগনয়না।'
'বেশ তো, তারপর?'
'কিন্তু ও হচ্ছে মহিষমর্দিনী!'
'কী যে বাজে বকছ!'
'বাজে নয় মহারাজ! কিছুদিন আগে একটা দুর্ধর্ষ বন্য মহিষ মৃগনয়নাকে আক্রমণ করেছিল। কিন্তু সে একলাই সেই মহিষটার দর্পচূর্ণ করে দেয়!'
মানসিংহ সবিস্ময়ে বললেন, 'নারীর দেহে এমন অমানুষিক শক্তি কেমন করে সম্ভবপর হল?'
পারিষদ বললে, 'মৃগনয়নার মতে তাকে শক্তিমতী করেছে রাই নদীর জল!'
মানসিংহ মনে মনে বললেন, যার দেহে একসঙ্গে এমন শক্তি আর সৌন্দর্যের মিলন, সে যে দেবতারও বাঞ্ছনীয়! এমন কন্যাই আমার রানি হবার যোগ্য।
যথাসময়ে ঘটক গেল মৃগনয়নার কাছে।
রাজার প্রস্তাব শুনে মৃগনয়না বললে, 'রানি হতে আমি রাজি আছি, কিন্তু এক শর্তে।'
'কী শর্ত মা?'
'প্রাসাদের তলা দিয়ে যদি বয়ে যায় রাই নদীর পবিত্র ধারা, তবেই আমি রাজার কণ্ঠে মাল্যদান করব।'
রাজা মানসিংহ শর্তের কথা শুনে বললেন, 'নিশ্চয়, নিশ্চয়! মৃগনয়নার ইচ্ছা আমি পূর্ণ করব।'
মানসিংহের মহিষী হলেন মহিষমর্দিনী মৃগনয়না।
গোয়ালিয়র দুর্গের মধ্যে গুজরি-কন্যা মৃগনয়নার জন্যে নির্মিত হল প্রস্তরের এক প্রকাণ্ড প্রাসাদ। দৈর্ঘ্যে তিনশো ফুট ও প্রস্থে দুইশো ত্রিশ ফুট। প্রাসাদটি দ্বিতল এবং অপূর্ব কারুকার্যে বিচিত্র। তার নাম রাখা হল 'গুজরি মহল'।
রাই নদী থেকে খাল কেটে প্রাসাদের তলায় নিয়ে আসা হল তার নির্মল ধারা— মৃগনয়না যা ব্যবহার করতেন প্রত্যহ।
মৃগনয়না আজ নেই বটে, কিন্তু দেশ-বিদেশ থেকে এখনও ভ্রমণকারীরা এসে গুজরি-মহলের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারে না। রাই নদীর জল আজ প্রাসাদের তলায় এসে নাচে না বটে, কিন্তু সেই পুরাতন খালের চিহ্ন এখনও লুপ্ত হয়ে যায়নি।
মৃগনয়না কেবল রূপবতী ও শক্তিমতী নয়, কলাবতীও। সংগীতকলার প্রতি তাঁর ছিল অসাধারণ অনুরাগ। তাঁর বিপুল আগ্রহে ও সাদর আমন্ত্রণে ভারতের নানা প্রদেশ থেকে শ্রেষ্ঠ সংগীতাচার্যরা গোয়ালিয়রে এসে অলংকৃত করেছিলেন মানসিংহের সভা।
তারই ফলে সংগীতজগতে গোয়ালিয়র আজও বিশেষ একটি উচ্চাসন অধিকার করে আছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন