হেমেন্দ্রকুমার রায়

এক ঠাকুর হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। আর-এক ঠাকুর তাঁরই ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ। বাংলার দুই রত্ন। ঠাকুরের মতোই প্রণম্য।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অঙ্গনে প্রবেশ করলে বাঁদিকে চোখে পড়ে একখানি লাল রঙের দোতলা বাড়ি। প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ে রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে এই বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয় 'বিচিত্রা' সভা। নানা কারণে এ সভা বিচিত্র ছিল সত্য সত্যই। বাংলা দেশে তার আগে বা পরে এর চেয়ে স্মরণীয়, লোভনীয় বা এর সঙ্গে তুলনীয় অন্য কোনও সভা বা সমিতি আর দেখা যায়নি।
কেবল সভা নয়, বিচিত্রা ভবনে ছিল প্রকাণ্ড একটি পুস্তকাগারও। মস্ত এক হলঘরের দেওয়াল জুড়ে সাজানো থাকত উচ্চশ্রেণির সংখ্যাতীত গ্রন্থ, তার মধ্যে ছিল জ্ঞানভাণ্ডারের জ্ঞাতব্য যা-কিছু তথ্য। যে-কোনও সভ্য এইসব বই বাড়িতে নিয়ে যেতে পারতেন।
সভ্যজনদের মধ্যে ছিলেন কলকাতার সেরা সেরা নামী ও গুণী ব্যক্তি। রবীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথের কথা তো বলাই বাহুল্য, অন্যান্য সকলের নামও এখানে উল্লেখ করা সম্ভবপর নয় কেবল স্বর্গীয় কয়েকজনের নাম বললেই সকলে সভ্যদের সম্বন্ধে একটা ধারণা করতে পারবে। প্রমথ চৌধুরী, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রিয়ম্বদা দেবী, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, সমরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অজিতকুমার চক্রবর্তী, সুকুমার রায়, সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কিরণশঙ্কর রায়, সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও গিরিজাকুমার বসু প্রভৃতি।
পুস্তকাগারের উপরেই ছিল সুদীর্ঘ হলঘর। সেখানে বসত মনীষীদের আসর। প্রায়ই শ্রোতা বা দর্শকদের সংখ্যা হত দুইশতেরও বেশি। একদিকে বসতেন মহিলারা, আর-একদিকে পুরুষরা। মাঝখানে বিরাজ করতেন মধ্যমণির মতো স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।
সেখানে হত নাচ, গান, বাদ্যযন্ত্রবাদন, মঞ্চাভিনয়, যাত্রাভিনয়, নাটক, উপন্যাস, গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ পাঠ এবং সাহিত্য ও ললিতকলা নিয়ে অপূর্ব আলোচনা। গায়ক, অভিনেতা, পাঠক ও আলোচকরূপে সবচেয়ে বেশি দেখা দিতেন রবীন্দ্রনাথই। অবনীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ও শ্রীবিধুশেখর শাস্ত্রী এবং অন্যান্য লেখক ও আপন আপন রচনা পাঠ করতেন।
একপ্রান্তে ছবির মতো সুন্দর ছোট্ট রঙ্গমঞ্চ তৈরি করে সেখানে 'ডাকঘর' ও 'বৈকুণ্ঠের খাতা'র যে চমৎকার অভিনয় হয়েছিল, তাও অভাবনীয় ও অবিস্মরণীয়। তেমন উপভোগ্য অনুষ্ঠান এ জীবনে আর দেখবার আশা নেই।
'বিচিত্রা'র সম্পাদক ছিলেন শ্রীরথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সভ্যরূপে নির্বাচিত হতেন বাছা বাছা লোক। সভ্যদের এক পয়সাও চাঁদা দিতে হত না।
এক বৈকালে 'বিচিত্রা'র ঘরে বসে আছেন রবীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, সুকুমার রায় ও তাঁর অনুজ সুবিনয় রায়, সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরও কেউ কেউ।
রবীন্দ্রনাথ বললেন, 'চল আমরা অন্য ঘরে যাই। আজ সুকুমার আর সুবিনয় আমাদের রামায়ণ-গান শোনাবেন।' আমরা গাত্রোত্থান করে পুরাতন ঠাকুরবাড়ির একটি ঘরে গিয়ে বসলুম।
হাসির কবিতা বা ছড়া রচনায় সুকুমার রায়ের মুনশিয়ানা যে কত, সে খবর বাংলা দেশের ঘরে ঘরে গিয়ে পৌঁছেছে। সেদিনও সুকুমার রায় যা শোনালেন তাও হাসির রচনা এবং রচক ছিলেন তিনি নিজেই। সেদিন তাঁর আর-একটি গুণেরও পরিচয় পাওয়া গেল। কৌতুকাভিনয়েও তিনি ওস্তাদ—অতিশয় ভারিক্কি লোকের গুরুগাম্ভীর্যও তিনি নস্যাৎ করে দিতে পারতেন, নিজে একটুও না হেসে।
সকলেই জানেন, ভাবগভীর করুণ অভিনয়ে রবীন্দ্রনাথের কৃতিত্ব ছিল যে-কোনও প্রথম শ্রেণির অভিনেতার সঙ্গে তুলনীয়। রঙ্গমঞ্চের উপরে সাধারণত তিনি গম্ভীররসের ভূমিকাই গ্রহণ করতেন। কিন্তু হাস্যরসেও তিনি বড়ো কম যেতেন না। তাঁর দৈনন্দিন কার্য, আলাপ-আলোচনাও ছিল হাস্যরসে সমুজ্জ্বল, কথায় কথায় ঝরে পড়ত তাঁর কৌতুকনির্ঝর। এবং কেবল কথায় নয় সেই সঙ্গে দেখা যেত মৌখিক বা আঙ্গিক ভাবাভিনয়ও। সেদিনও তারই একটি প্রমাণ পাওয়া গেল।
সুকুমার রায়ের রামায়ণী কৌতুকনাট্যে একটি পঙক্তি ছিল—
''ঐ আসে, ঐ আসে,
ঐ, ঐ, ঐ রে!''
রবীন্দ্রনাথ এই চরণটিকেই কাজে লাগালেন বিশেষ কৌশলে।
সেদিন পালা শেষ হবার পর চিত্তরোচক রসরচনার সঙ্গে তাল রাখবার জন্যেই যেন আসরে এনে রাখা হল এক গামলা রসনারোচক রসগোল্লা। ঠাকুরবাড়িতে মাঝে মাঝে এমনি মনের খোরাকের সঙ্গে দেহের খোরাকের ব্যবস্থা করবার জন্যে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ দেখা যেত। তিনি জানতেন, কেবল শুকনো কথায় চিঁড়ে ভেজে না।
১৩৪৩ সালের ২৫ বৈশাখে পি. ই. এন. ক্লাবের এক সভায় তিনি বলেছিলেন: 'সাহিত্যসেবকদের নিমন্ত্রণ করে এনে পি. ই. এন. ক্লাব যদি মাঝে মাঝে তাঁদের রচনা শোনাবার ও মেলামেশা করবার ব্যবস্থা করেন, তাহলে ভালো হয়। কিঞ্চিৎ আহারাদিরও ব্যবস্থা থাকলে এরকম অনুষ্ঠান মধুরতর হয়ে ওঠে।'
রসগোল্লার গামলা যে অবহেলিত হয়ে রইল না, সে কথা না বললেও চলে। এতক্ষণ মুখ চলছিল কেবল সানুজ সুকুমার রায়ের, এবারে মুখ চলতে লাগল অধিকাংশ শ্রোতার।
সকলের দক্ষিণ হস্ত যখন ঘন ঘন মুখবিবর ও গামলার মধ্যে আনাগোনা করতে ব্যস্ত, তখন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্বেষী চক্ষু এদিকে-ওদিকে দৃষ্টিপাত করে আবিষ্কার করতে পারলে না চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
তিনি বলে উঠলেন, 'এ কী, চারুবাবু কোথায় গেলেন? তিনি যে রসগোল্লা ভালোবাসেন!'
আর সকলেরও চোখ আঁতিপাঁতি করে খুঁজে দেখলে। কিন্তু চারুবাবু দৃশ্যমান নন।
অবনীন্দ্রনাথ খুঁতখুঁত করে বললেন, 'চারুবাবু রসগোল্লা খেলেন না, রস যে জমছে না!'
তারপর রসের গামলা যখন রসগোল্লাহীন হবার উপক্রম, রবীন্দ্রনাথ সহসা আসনের উপরে ঋজু ও উঁচু হয়ে উঠে বসে বাহু বাড়িয়ে দরজার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে সুকুমার-কথিত রামায়ণী ছড়ার জের টেনে এবং মুখে কপট ভয়ের ভাব ফুটিয়ে সুরে তারস্বরে আওড়ে গেলেন—
''ঐ আসে, ঐ আসে,
ঐ, ঐ, ঐ, রে!''
দেখা গেল, এতক্ষণ পরে ঘরের দরজার কাছে আত্মপ্রকাশ করেছে চারুবাবুর হাসি-হাসি মুখ। রবীন্দ্রনাথ বললেন, 'এসো চারু, বসে যাও! বোধহয় এখনও তোমার আশা আছে।' বলা বাহুল্য, শেষ পর্যন্ত হল মধুরেণ সমাপয়েৎ।
এইবারে দ্বিতীয় ঠাকুরের একটি কাহিনি।
চলতি ভাষায় যাকে বলে ব্যাং, কেতাবি ভাষায় তার নাম ভেক, মণ্ডূক ও দর্দুর প্রভৃতি কিন্তু ওসব নামে কবিদের সাধ মেটে না, দর্দুরকে আরও মোলায়েম করে এনে তাঁরা সাদরে ডাকেন দাদুর বা দাদুরি বলে।
কবি বিদ্যাপতি বলেন—
''মত্ত দাদুরী, ডাকে ডাহুকী।''
রবীন্দ্রনাথ বলেন—
''ডাকিছে দাদুরী তমালকুঞ্জতিমিরে।''
ব্যাং ডাকে বর্ষাকালে। বাদলের সঙ্গে ব্যাঙের অচ্ছেদ্য সম্পর্ক, কবিরা তাই বর্ষাবর্ণনার একটা প্রধান অঙ্গ বলে মনে করেন ব্যাঙের ডাককে! কবিবর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তও বলেছেন—
''ব্যাঙ ডাকে ওই গলাফুলো,
আকাশ গলেছে।''
অবনীন্দ্রনাথের বাড়ির পিছনকার বাগানে ঝরছে ঝরঝর বর্ষার ঝরনা। আকাশে বাজে মেঘের বাজনা, বাতাসে ভাসে ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ, গাছের পাতায় পাতায় শোনা যায় টাপুর টুপুর বৃষ্টি নূপুর, কিন্তু তবু জমে না বর্ষার সংগীত! কেন জমে না সে রহস্য চট করে ধরে ফেললেন অবনীন্দ্রনাথ। আরে, বাগানে নেই মত্ত দাদুরি, বর্ষার সংগীত জমবে কেমন করে?
বর্ষা জমাবার উপায় নির্ধারণ করতেও দেরি লাগল না, তৎক্ষণাৎ ভৃত্যদের উপরে হুকুম হল— 'ওরে, যেখান থেকে পারিস গোটাকয়েক ব্যাং ধরে এনে বাগানে ছেড়ে দে শিগগির!'
কাছাকাছি ছিল গোলদিঘি কি হেদুয়ার পুষ্করিণী, শহুরে ভেকদের সাধের বাসা! পাড়ে পাড়ে পালে পালে তারা মনের সুখে গলা ফুলিয়ে একসঙ্গে কণ্ঠসাধনায় নিযুক্ত ছিল, অকস্মাৎ বেয়ারার দল সেখানে হুড়মুড় করে এসে পড়ে হামলা দিলে এবং চটপট তাদের ধরে টপাটপ পুরে ফেললে জলের ভিতরে! তারপর জোড়াসাঁকোয় ফিরে এসে তাদের বাগানের মাঝখানে ছেড়ে দিতে আর কতক্ষণ?
তারপর যখন 'গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা', তখন বোঝা গেল ঠাকুরবাড়ির বাগানে এসেও বাস্তুহারা ভেকগণ একটুও ব্যস্ত হয়নি, সবাই মস্ত মস্ত ওস্তাদের মতো গলা ফুলিয়ে আকাশমুখো হয়ে অশ্রান্ত স্বরে জুড়ে দিয়েছে গ্যাঙর গ্যাঙর তান!
অবনীন্দ্রনাথ ভারী আরাম পেলেন! তাঁর কানে বাজে বর্ষার পরিপূর্ণ ছন্দ, তাঁর প্রাণে জাগে বাদলের আসল আনন্দ!
কিন্তু দিনের পর দিন একনাগাড়ে এই ভেক কনসার্ট শুনতে শুনতে বাড়ির অন্যান্য লোকদের মনের অবস্থা হয়েছিল কেমনধারা, আমাদের তা জানা নেই।
বার্ষিক শিশুসাথী ১৯৫৫

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন