গুপ্ত কবির কদলী-কবিতা

হেমেন্দ্রকুমার রায়

কবিবর ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ছিলেন নতুন বাংলার প্রথম কবি। পুরাতন বাংলার কোনও কবির কাব্যেই স্বদেশপ্রেমের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। জন্মভূমিকে মা বলে ডাকতে পেরেছিলেন সর্বপ্রথমে ঈশ্বরচন্দ্রই। সেইজন্যেই তাঁকে নতুন বাংলার প্রথম কবি বলে ডাকতে পারি।

কয়েকটি দৃষ্টান্ত:

''জন্মভূমি জননীর কোলেতে বসেছি।''

''ভারতের দশা হেরি বিদরে হৃদয়।

জননী দুর্ভাগ্যে যণা তাপিত তনয়।''

''জান না কি জীব তুমি, জননী জনমভূমি,

সে তোমায় হৃদয়ে রেখেছে,

থাকিয়া মায়ের কোলে, সন্তানে জননী ভোলে,

কে কোথায় এমন দেখেছে।''

''জননী ভারতভূমি আর কেন থাক তুমি,

ধর্ম্মরূপ ভূধাহীন হয়ে?

তোমার কুমার ষণ্ড সকলেই জ্ঞানহত

নিজে কেন মর ভার বয়ে?''

বহু-ব্যবহারের ফলে এসব ভাব ও কথা আজকাল এত সাধারণ হয়ে পড়েছে যে, আমাদের হৃদয়তন্ত্রীতে ঝংকার তোলবার ক্ষমতা হয়তো আর ওদের নেই। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্রের সমসাময়িক যুগে ওইসব ভাব এবং 'জননী জনমভূমি' ও 'জননী ভারতভূমি' প্রভৃতি কথা যে বাঙালিদের মনে কতখানি অপ্রত্যাশিত বিস্ময় জাগিয়ে তুলত সেটুকু কল্পনা করা কঠিন নয়।

তবে নীচের এই কয়েকটি পঙক্তি লিখতে পারলে একালেরও যে-কোনও প্রথম শ্রেণির কবি গৌরব অনুভব করতেন:

''ভ্রাতৃভাব ভাবি মনে দেখ দেশবাসিগণে,

প্রেমপূর্ণ নয়ন মেলিয়া।

কত রূপ স্নেহ করি, দেশের কুকুর ধরি,

বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।।''

ঈশ্বরচন্দ্রের কাব্য সমালোচনা করতে বসে বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন: 'দেশবাৎসল্য। বাৎসল্য পরমধর্ম; কিন্তু এ ধর্ম অনেক দিন হইতে বাংলা দেশে ছিল না। কখনো ছিল কি না, বলিতে পারি না। এখন ইহা সাধারণ হইতেছে দেখিয়া আনন্দ হয়, কিন্ত ঈশ্বর গুপ্তের সময়ে ইহা বড়ই বিরল ছিল। তখনকার লোকে আপন আপন সমাজ, আপন আপন জাতি বা আপন আপন ধর্মকে ভালোবাসিত, ইহা দেশবাৎসল্যের ন্যায় নহে—অনেক নিকৃষ্ট। মহাত্মা রামমোহন রায়ের কথা ছাড়িয়া দিয়া রামগোপাল ঘোষ ও হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে বাংলা দেশে দেশবাৎসল্যের প্রথম নেতা বলা যাইতে পারে। ঈশ্বরগুপ্তের দেশবাৎসল্য তাঁহাদিগেরও কিঞ্চিৎ পূর্বগামী।'

এই তো গেল ঈশ্বরচন্দ্রের একটা দিক। আর-একদিক দিয়ে তাঁকে দেখি সাহিত্যগুরু রূপে। নূতন নূতন লেখক তৈরি করবার জন্যে তিনি প্রকাশ করতেন বিপুল উৎসাহ। সেকালের অনেক লেখকেরই হাতেখড়ি হয়েছিল তাঁর সাহিত্য-পাঠশালায়। রচনাশক্তি প্রকাশ করলে ছাত্রদের জন্যে তিনি নগদ টাকা পুরস্কারের ব্যবস্থাও করতেন। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে অন্তত দুইজনের নাম বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছে—বঙ্কিমচন্দ্র ও দীনবন্ধু।

পুরাতন 'সংবাদ প্রভাকর'-এ প্রকাশিত ঈশ্বরচন্দ্রের ছাত্রদের কবিতা পাঠ করবার সুযোগ হয়েছে। ঈশ্বরচন্দ্র কেবল নতুন কবিদের কবিতাই প্রকাশ করতেন না, সেই সঙ্গে প্রকাশ করতেন ছাত্রদের দোষ ও গুণ সম্বন্ধে নিজের মতামতও। তরুণ বঙ্কিমচন্দ্র সম্বন্ধে বলেছিলেন: 'বঙ্কিমের ভাষা কিঞ্চিৎ বঙ্কিম।' তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন সরল ভাষায় লিখতে। পদ্যের চেয়ে গদ্যই বঙ্কিমের পক্ষে অধিকতর উপযোগী, এমন কথাও বলেছিলেন।

সাহিত্যই ছিল ঈশ্বরচন্দ্রের জীবনের একমাত্র সাধনা এবং সেইজন্যেই বাংলা দেশে যাতে সাহিত্যসাধকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তিনি বরাবরই সেই চেষ্টা করে গিয়েছেন। তাঁর এই উক্তিটির তুলনা নেই:

''যে ভাষায় হয়ে প্রীত পরমেশ-গুণ-গীত

বৃদ্ধকালে গান কর মুখে।

মাতৃ-সম মাতৃ-ভাষা, পুরালে তোমার আশা,

তুমি তার সেবা কর সুখে।''

আর-একদিক দিয়েও দেখা যাক কবি ঈশ্বরচন্দ্রকে। প্রথমে তাঁর সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের কথা উদ্ধার করি: 'তিনি সদাই হাস্যবদন; মিষ্ট কথা, রসের কথা, হাসির কথা নিয়তই মুখে লাগিয়া থাকিত। রহস্য এবং ব্যঙ্গ তাঁহার প্রিয় সহচর ছিল। কপটতা, ছলনা, চাতুরী জানিতেন না। তিনি সদালাপী ছিলেন। কথায় হউক, বক্তৃতায় হউক, বিবাদে হউক, কবিতায় হউক, গীতে হউক, লোককে হাসাইতে বিলক্ষণ পটু ছিলেন।... তিনি রস ব্যতীত এক দণ্ড থাকিতে পারিতেন না।'

ঈশ্বরচন্দ্রের রসের কবিতা অনেক আছে, তা নিয়ে আমার নাড়াচাড়া করবার দরকার নেই, পাঠকরা অনায়াসেই সেগুলির আস্বাদ গ্রহণ করতে পারবেন।

তিনি খাবার জিনিস নিয়ে কতকগুলি কবিতা লিখেছেন, যেমন 'পাটা' 'এণ্ডাওয়ালা তপ্স্যা মাছ' ও 'আনারস' প্রভৃতি কিন্তু তাঁর কদলী-কবিতা রচনার কথা কি আপনাদের জানা আছে?

বঙ্কিমচন্দ্রের মুখে জানতে পারি: 'ঈশ্বর গুপ্ত মেকির উপরে গালিগালাজ করিতেন। মেকির উপর যথার্থ রাগ ছিল। মেকি বাবুরা তাঁহার কাছে গালি খাইতেন, মেকি সাহেবেরা গালি খাইতেন, মেকি ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতেরা ''নস্য লোসা দধি চোসা''র দল গালি খাইতেন।'

ঠিক কারণ জানি না, তবে অনুমানে বোধ হয়, 'সংবাদ প্রভাকর'-এ ঈশ্বরচন্দ্রের কোনও মন্তব্য পাঠ করে একদল ক্রুদ্ধ ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতের মুণ্ডিত মস্তকের শিখাগুলো অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে উঠল। তাঁরা মারমুখো হয়ে ঈশ্বরচন্দ্রের কাঁচরাপাড়ায় বাসভবনের দিকে ধাবমান হলেন।

তখন বেলা দুপুর। কবি বসেছেন মধ্যাহ্নভোজনে এবং খাদ্য পরিবেশন করছেন কবিজায়া দুর্গামণি দেবী।

এমন সময় বাড়ির সদর দরজায় এসে হানা দিলেন দুর্বাসার আধুনিক অবতারের দল। সে এক বিষম গণ্ডগোল।

কেউ চিৎকার করছেন, 'ওরে পাষণ্ড ঈশ্বরগুপ্ত, বেরিয়ে আয় তুই ভিতর থেকে, আমরা আজ তোর শাস্তিবিধান করব।'

কেউ বলছেন, 'আজ তোকে পইতে ছিঁড়ে অভিশাপ দেব।'

কেউ বলছেন, 'আজ তোকে ভস্ম করে ফেলব।'

দুর্গামণি দেবী তো তয়ে তটস্থ! ঈশ্বরচন্দ্র তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে ও হাত-মুখ ধুয়ে নিয়ে হাসতে হাসতে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালেন।

তারপর কথাবার্তার ধরনটা হল বোধ করি এইরকম:

মনে মনে সব বুঝে, কিন্তু মুখে হেসে ঈশ্বরচন্দ্র শুধোলেন, 'দেবতারা হঠাৎ এখানে পায়ের ধুলো দিতে এলেন কেন?'

ও তরফ থেকে জবাব এল, 'জেনেশুনে আবার ন্যাকা সাজা হচ্ছে? ''সংবাদ প্রভাকর''-এ তুই আমাদের নামে কী দোষারোপ করেছিস?

কবি বললেন, 'প্রভুরা যখন ''প্রভাকর'' পাঠ করেছেন, তখন আমাকে আর জিজ্ঞাসা করে মুখ-ব্যথা করছেন কেন?'

প্রভুরা সগর্জনে ভবিষ্যদবাণী করলেন, 'সর্বনাশ হবে, তোর সর্বনাশ হবে।'

বাড়ির কাছেই ছিল কলা গাছের ঝাড়। সেইদিকে তাকিয়ে হঠাৎ এক ব্রাহ্মণ-সন্তানের মাথায় জাগল দুষ্টুবুদ্ধি। ব্যঙ্গের স্বরে তিনি বলে উঠলেন, 'ওঃ ভারী তো কবি। ফরমাশ করলে এখনই তুই মুখে মুখে কবিতা রচনা করতে পারবি?'

কবি যুক্তকরে বললেন, 'আজ্ঞে, হুকুম দিলেই পারি।'

'উত্তম। এখনই কদলী নিয়ে একটা কবিতা রচনা কর দেখি।'

'যথা আজ্ঞা। কিন্তু কবিতা শুনে প্রভুরা আরও বেশি ক্রুদ্ধ হবেন না তো?'

'না, না, আমরা অভয় দিচ্ছি!'

কবি বললেন:

''গোলোকবিহারী হরি,

ভৃগুপদ বক্ষে ধরি

তোদের মান বাড়িয়েছে।

শোন রে শোন নেড়ে নেড়ে,

গলায় দড়ি ভেড়ে ভেড়ে

তাইতে তোদের প্রণাম করি,

(দুই হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে)

নইলে কলা কেঁদেছে।''

অবশ্য গাছের কলার বদলে কবি দেখালেন হাতের কলা, তবে সেকালকার ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা নিতান্ত বেরসিক ছিলেন না, গুপ্ত কবির অভিনব কদলী-কবিতা শ্রবণ করে সম্ভবত তাঁরা মুখবন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

ঘটনাটি বললুম আমার নিজের ভাষায়। গল্পটি শুনেছিলুম আমার স্বর্গীয় পিতৃদেবের মুখে।

মাসিক বসুমতী নভেম্বর ১৯৪৭

সকল অধ্যায়
১.
ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতে
২.
ভগবানের চাবুক
৩.
মহাভারতের শেষ মহাবীর
৪.
হন্তারক নরদানব
৫.
রক্ত বাদল ঝরে
৬.
আলেকজান্ডার দি গ্রেট
৭.
দিগবিজয়ী নেপোলিয়ন
৮.
পঞ্চনদের তীরে
৯.
উপন্যাসের চেয়ে আশ্চর্য
১০.
সত্যিকার অ্যাডভেঞ্চার
১১.
সাত হাজারের আত্মদান
১২.
মরা মানিক আর জ্যান্ত মানিক
১৩.
ভারতের একমাত্র সুলতানা
১৪.
সূর্য দেবী, পর্মল দেবী
১৫.
মারাঠার লিওনিডাস
১৬.
মুসলমানের জহরব্রত
১৭.
মৃগনয়না মহিষমর্দিনী
১৮.
ব্যাঘ্রভূমির বঙ্গবীর
১৯.
অনামা বীরাঙ্গনা
২০.
ভারতের থার্মোপলি
২১.
সিরাজের বিজয় অভিযান
২২.
ছত্রপতির অ্যাডভেঞ্চার
২৩.
ইতিহাসের রক্তাক্ত দৃশ্য
২৪.
মহাভারতের মহারথ
২৫.
'বীরাঙ্গনা, পরাক্রমে ভীমা-সমা'
২৬.
রক্ত পাথারের সাঁতারু
২৭.
ছত্রপতির ছত্রভঙ্গ
২৮.
তিন সম্রাটের ত্র্যহস্পর্শ-যোগ
২৯.
আলেকজান্ডারের পলায়ন
৩০.
ওষ্ঠাধরে রাজদণ্ড
৩১.
ইতিহাস আশ্রিত রচনা
৩২.
এ যুগের সবচেয়ে বড়ো ডাকাত
৩৩.
আধুনিক রবিনহুড
৩৪.
ইয়াঙ্কি খোকা-গুণ্ডা
৩৫.
গুপ্ত কবির কদলী-কবিতা
৩৬.
ভাঙা অমিত্রাক্ষরের স্রষ্টা কে?
৩৭.
নূতন বাংলার প্রথম কবি
৩৮.
বুদ্ধদেব
৩৯.
বাংলাদেশে বোম্বেটেরাজ
৪০.
ঋষি টলষ্টয়
৪১.
দুই ঠাকুরের কাহিনি
৪২.
আশ্চর্য মূর্খ পণ্ডিত
৪৩.
অতুল্য শ্রুতিধর
৪৪.
বর্গি এল দেশে
৪৫.
প্রথম বাঙালি সম্রাট
৪৬.
জগন্নাথদেবের গুপ্তকথা
৪৭.
মরণ বিজয়ীর দল
৪৮.
সত্যিকার দানব-দানবী
৪৯.
প্যারিসের কুব্জ-রাজা
৫০.
ফরাসি বিপ্লবে বাঙালির ছেলে
৫১.
বিখ্যাত চোরের অ্যাডভেঞ্চার
৫২.
টেলিফোনে গোয়েন্দাগিরি
৫৩.
প্যারির বালক-বিভীষিকা
৫৪.
পৃথিবীর প্রথম গোয়েন্দা কাহিনি
৫৫.
শিবদাস ভাদুড়ি
৫৬.
সেকালের সপ্ত আশ্চর্য

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%