সত্যিকার অ্যাডভেঞ্চার

হেমেন্দ্রকুমার রায়

মগধ রাজ্য ছিল তখন আর্যাবর্তের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। এক মগধের রাজধানী পাটলিপুত্র ছিল ভারতের সবচেয়ে বড়ো শহর। আজ আমরা যে দিল্লির এত নাম শুনি, তখনও তার জন্মই হয়নি। দিল্লি শহরের প্রতিষ্ঠা হয়েছে মাত্র দশম শতাব্দীতে। লৌকিক প্রবাদ ও কাল্পনিক কাব্য প্রাগৈতিহাসিক যুগের ইন্দ্রপ্রস্থ এবং কুরু-পাণ্ডবের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক আবিষ্কার করতে চায় বটে, কিন্তু ইতিহাসে আমরা যে দিল্লির নাম শুনি, দশম শতাব্দীর শেষ ভাগে তার জন্ম। এবং সে বিখ্যাত হয়েছে মুসলমানদেরই দ্বারা। দিল্লি জন্মাবার আগেই ভারতব্যাপী অখণ্ড হিন্দু-সাম্রাজ্য এবং স্বাধীন আর্য-গৌরব হয়েছিল বিলুপ্ত।

কিন্তু পাটলিপুত্রের ভিত্তি-প্রতিষ্ঠা হয় বুদ্ধদেবের সমসাময়িক অজাতশত্রুর দ্বারা, খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতাব্দীতে, অর্থাৎ দিল্লি-প্রতিষ্ঠার দেড় হাজার বছরেরও আগে! এবং সেখানে আসল শহর বসান অজাতশত্রুর নাতি উদয়। তারপর মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত যখন পাটলিপুত্রকে করেন সমগ্র আর্যাবর্তের রাজধানী, বিদেশি ঐতিহাসিকদের মতে, তখন সে ছিল সারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো শহর! আজকের হিন্দুরা তাদের অতীত গৌরব নিয়ে যেসব গর্ব করে, তার অধিকাংশেরই সঙ্গে আছে পাটলিপুত্রের সম্বন্ধ; কারণ মৌর্য বংশের পরে আরও বহু রাজবংশের উত্থান-পতন হয়েছে তারই সিংহাসনে। মোগল প্রভাবের আগে পাটলিপুত্রের চেয়ে প্রধান নগর ভারতবর্ষে আর ছিল না। লোকে তার আরও দুটি নাম রেখেছিল— কুসুমপুর, পুষ্পপুর। পাটলিপুত্রের ধ্বংসাবশেষের ওপরে আজ বাস করছে পাটনা শহর।

মহাপদ্ম নন্দ ছিল এক নাপিতের ছেলে। তার ষড়যন্ত্রে নগধের ক্ষত্রিয় রাজা মারা পড়লেন। মহাপদ্ম তখন রাজদণ্ড কেড়ে নিয়ে সিংহাসন দখল করলে। রাজা হয়ে সে এত ক্ষত্রিয় বধ করেছিল যে, লোকে তাকে দ্বিতীয় পরশুরাম বলে ডাকত।

খুব সম্ভব মহাপদ্মের ছেলেরই নাম ধননন্দ। সে অতুল ঐশ্বর্যের অধিকারী বলেই সকলে তাকে ওই নামে ডাকত। সে রাজা হল বটে, কিন্তু জাতে নিচু ও পাপী বাপের ছেলে বলে প্রজারা তাকে দু-চোখে দেখতে পারত না।

ভারত-সীমান্তের বিশ্ববিখ্যাত তক্ষশিলা নগর থেকে এক মহাপণ্ডিত, তীক্ষ্নবুদ্ধি ও তেজস্বী ব্রাহ্মণ পাটলিপুত্রে এলেন অদৃষ্ট-পরীক্ষা করবার জন্যে। তাঁর নাম বিষ্ণুগুপ্ত।

ধন-নন্দ বিষ্ণুগুপ্তকে নিজের ধনশালার অধ্যক্ষের পদে নিযুক্ত করলেন। এবং তাঁকে এতটা স্বাধীনতা দিলেন যে, রাজার হুকুম না নিয়েই তিনি এক কোটি টাকা পর্যন্ত দান করতে পারতেন? সুতরাং এটাও দেখা যাচ্ছে যে, দানশীলতার দিক দিয়ে ধননন্দ ছিলেন কাব্যে বর্ণিত দাতাকর্ণের মতোই উদার!

কিন্তু কিছুকাল পরেই তেজস্বী বিষ্ণুগুপ্তের উদ্ধত স্বভাব রাজার পক্ষে হয়ে উঠল অসহনীয়। ব্রাহ্মণের চাকরি গেল এবং সম্ভবত কর্মচ্যুত করবার সময়ে রাজা তাঁকে অপমানকর কথা বলতেও ছাড়েনি।

বিষ্ণুগুপ্ত প্রতিজ্ঞা করলেন, নন্দবংশ ধ্বংস করে এ অপমানের প্রতিশোধ নেবেন।

সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশ নিয়ে বিষ্ণুগুপ্ত মগধ রাজ্য ছেড়ে সুদূর স্বদেশে ফিরে যাচ্ছেন, হঠাৎ পথে তাঁর চোখে পড়ল এক অদ্ভুত দৃশ্য।

এক পল্লিপ্রান্তে কয়েকটি রাখাল ছেলে খেলা করছে। তাদের ভিতরে একটি ছেলে রাজা হয়ে মাঝখানে বসে করছে বিচারের অভিনয়।

বিষ্ণুগুপ্তের তীক্ষ্ন দৃষ্টি দেখলে, শিশুর মুখে কেবল প্রতিভারই প্রকাশ নেই, সত্যিকার রাজলক্ষণও রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে তিনি জানলেন, শিশুর জন্ম রাজবংশেই বটে, কিন্তু চোরে তাকে মায়ের কাছ থেকে চুরি করে এক শিকারির কাছে বিক্রি করেছে। শিশুর বাপ যুদ্ধে মারা পড়েছেন।

বিষ্ণুগুপ্ত টাকা দিয়ে শিশুকে কিনে নিলেন। তারপর তক্ষশিলায় ফিরে গিয়ে নিজের হাতেই কেবল তার খাওয়া-পরার নয়, শিক্ষাদীক্ষারও ভার গ্রহণ করলেন। বোধহয় এর মধ্যে তাঁর বিশেষ অভিপ্রায় ছিল। বোধহয় তিনি স্থির করেছিলেন, এই ক্ষত্রিয় শিশু হবে যখন সাবালক, তখন তাকেই তিনি ব্যবহার করবেন তাঁর পরম শত্রু ধননন্দের বিরুদ্ধে অস্ত্রের মতো।

বিষ্ণুগুপ্তের ঘরে শিশু দিনে দিনে বড়ো হতে থাক, সেই অবসরে তোমাদের সঙ্গে দুটো কথা কয়ে নি।

ভারতবর্ষে বিষ্ণুগুপ্ত আজও আর দুটি নামে বিখ্যাত হয়ে আছেন—অর্থশাস্ত্রের লেখক কৌটিল্য এবং সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রী চাণক্য বলে।

আর তাঁর পালিত-পুত্রের মতো হাতে-গড়া ওই শিশুকেই ইতিহাস আজ ভারতের প্রথম সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত নামে ডাকে!

তোমরা অনেকে নিশ্চয় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা 'চন্দ্রগুপ্ত' নাটক পড়েছ বা তার অভিনয় দেখেছ? কিন্তু তোমরা ভালো করে জেনে রাখো যে, ওই নাটকের চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে সত্যিকার ইতিহাসের চন্দ্রগুপ্তের মিল আছে খুব অল্পই। আসল চন্দ্রগুপ্তের গল্প একেবারে অন্যরকম!

এইখানে আর-একটা কথাও বলে রাখি। চন্দ্রগুপ্তের প্রথম জীবন সম্বন্ধে নানা মুনির নানা মত। আর-একটি মত হচ্ছে এই: চন্দ্রগুপ্ত নাকি নন্দ রাজার বিরাগভাজন হয়েছিলেন। রাজা তাঁর প্রাণদণ্ডের হুকুম দেন। চন্দ্রগুপ্ত মগধ ছেড়ে পালিয়ে উত্তর ভারতের সীমান্ত-প্রদেশে গিয়ে হাজির হন। এ মত গ্রিক ঐতিহাসিকের। আমরা কিন্তু এ সম্বন্ধে বিদেশি লেখকের চেয়ে প্রাচীন ভারতীয় লেখকের মতোই অধিকতর নির্ভরযোগ্য বলে মনে করি। এখন আবার গল্প শুরু করবার সময় হয়েছে।

কয়েক বৎসর কেটে গেছে। চন্দ্রগুপ্ত এখন যুবা। কেবল দেহের নয়, তাঁর মনের যৌবনও অসাধারণ। চোখের সামনে সর্বদাই তিনি বৃহত্তর ভারতের সমুজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন। সমস্ত আর্যাবর্ত তখন সনাতন হিন্দু আদর্শ হারিয়ে ফেলেছে। ভারতের অধিকাংশ ছোটো ছোটো খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত—কোনও রাজ্যের সঙ্গে কোনও রাজ্যের মিল নেই। আর্যাবর্তের সবচেয়ে বড়ো রাজা হচ্ছেন নন্দ, কিন্তু অত্যাচারিত প্রজারা তাঁকে চায় না। চন্দ্রগুপ্ত কল্পনায় দেখেন, নন্দকে তাড়িয়ে মগধের সিংহাসনে বসেছেন তিনি এবং যত ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ রাজাকে দমন করে ভারত জুড়ে এমন এক মহাসাম্রাজ্য স্থাপন করেছেন যার মধ্যে হয়েছে নবজাগ্রত আর্য-আদর্শের পূর্ণ-প্রতিষ্ঠা। বলা বাহুল্য, শিষ্যের মনে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে দিয়েছেন চাণক্যই।

আজ থেকে দুই হাজার তিনশো বছরেরও আগেকার কথা—অর্থাৎ তখন পৃথিবীতে খ্রিস্ট ও মুসলমান ধর্মের স্বপ্নও কেউ দেখেনি। ইয়োরোপে একমাত্র উল্লেখযোগ্য সভ্য জাতি ছিল পৌত্তলিক গ্রিকরা এবং ভারতের হিন্দুরাও তখন মূর্তি গড়ে ঠাকুর পুজো করত না।

এই সময়েই একদিন বাঁধভাঙা বন্যাপ্রবাহের মতো দিগবিজয়ী আলেকজান্ডার সসৈন্যে ছুটে এলেন ভারত-বিজয় করতে।

উত্তর ভারতের ছোটো ছোটো রাজারা তখন যদি একসঙ্গে মিলেমিশে বাধা দিতেন, তাহলে গ্রিকদের ভারতের ভিতরে আর ঢুকতে হত না। কিন্তু তাঁরা প্রত্যেকই কম সৈন্য নিয়ে বোকার মতো গ্রিকদের বিপুল বাহিনীকে বাধা দিতে গিয়ে খুব সহজেই একে একে হেরে গেলেন।

হয়তো চাণক্যের পরামর্শেই এই সময় চন্দ্রগুপ্ত কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলবার জন্যে আলেকজান্ডারের সঙ্গে দেখা করে বলেন, 'মগধই হচ্ছে আর্যাবর্তের সবচেয়ে বড়ো রাজ্য, তাকে জয় না করলে ভারত জয় করা হবে না। আপনি যদি আমার সঙ্গে মগধে যান তাহলে অনায়াসেই নন্দকে হারিয়ে দিতে পারবেন, কারণ প্রজারা তার বিপক্ষে।' আলেকজান্ডার উত্তরে কী বলেন তা প্রকাশ পায়নি। তবে উত্তর নিশ্চয়ই সন্তাোষজনক হয়নি, কারণ তাঁর কাছ থেকে চন্দ্রগুপ্তকে হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছিল।

চন্দ্রগুপ্ত ও চাণক্য তখন দুটি মহাব্রত গ্রহণ করলেন। একটি হচ্ছে মগধের সিংহাসন অধিকার করা এবং আর-একটি হচ্ছে, ভারতের মাটি থেকে যবন ও গ্রিকদের তাড়িয়ে দেওয়া।

উত্তর ভারত-সীমান্তে তখন যেসব জাতি বাস করত, আজকের মতন সেদিনও তারা ছিল দুর্ধর্ষ ও অত্যন্ত যুদ্ধপ্রিয়। যদিও ধর্মে তখন তারা হিন্দু ছিল, কিন্তু শাস্ত্র ফেলে অস্ত্র নিয়েই তারা মরণ-খেলা খেলতে ভালোবাসত। ধরতে গেলে তারাই ছিল ভারতের সিংহদ্বারের রক্ষক। গ্রিক, পারসি, শক, হূন ও মুসলমান দিগবিজয়ীরা ভারতে প্রবেশ করতে এসে বরাবরই তাদের কাছ থেকে পেয়ে এসেছে বাধার পর বাধা। প্রচণ্ড রক্তসাগরে তাদের হাজার হাজার মৃতদেহ না ডুবিয়ে কেউ আর্যাবর্তের ভিতরে ঢুকতে পারেনি। ভারতের সিংহদ্বার রক্ষা করবার জন্যে যুগে যুগে তারা যে কতবার আত্মদান করেছে, তার হিসাব কেউ লিখে রাখেনি। চন্দ্রগুপ্ত তাদেরই ভিতর থেকে বেছে বেছে সৈন্য সংগ্রহ করতে লাগলেন। আয়োজন সম্পূর্ণ করে স্বদেশে ফিরে এসে তিনি আক্রমণ করলেন ধননন্দকে। কিন্তু মগধের বিপুল বাহিনী তাঁকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেললে, তিনি পরাজিত হয়ে আবার উত্তর ভারতে পালিয়ে গেলেন।

ইতিমধ্যে আলেকজান্ডারও উত্তর ভারতের এক অংশ দখল করে মগধের দিকে এগুবার আয়োজন করতে লাগলেন। কিন্তু মগধের বিপুল পরাক্রমের কথা শুনে গ্রিক সৈন্যরা ভয় পেয়ে এমন বিদ্রোহ প্রকাশ করলে যে, আলেকজান্ডারের আর ভারত-বিজয় করা হল না, উত্তর ভারত রক্ষা করবার জন্যে চারিদিকে গ্রিক সৈন্য ও শাসনকর্তা রেখে তিনি আবার স্বদেশে প্রস্থান করতে বাধ্য হলেন।

ওদিকে প্রথমবার বিফল হয়েও চন্দ্রগুপ্ত হাল ছাড়েননি। পার্বত্য জাতিদের ভিতর থেকে আবার তিনি নূতন একদল সৈন্য সংগ্রহ করলেন।

প্রাচীন নাটক 'মুদ্রারাক্ষস'-এর মতে চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রী গুরু চাণক্য এই সময়ে পার্বত্য প্রদেশের পর্বতক নামে এক শক্তিশালী রাজাকে নিজেদের দলভুক্ত করেন। জৈন 'স্থবিরাবলিচরিত'-এও ওই কথা পাওয়া যায় এবং বৌদ্ধ গ্রন্থাদিতেও দেখা যায় চন্দ্রগুপ্ত পর্বত নামে রাজার কাছ থেকে সাহায্য পেয়েছিলেন। আধুনিক ঐতিহাসিকরা বলেন, ওই পর্বতক বা পর্বত আলেকজান্ডারের কাছে পরাজিত বিখ্যাত বীর পুরু ছাড়া আর কেউ নন।

নানা প্রদেশের নানা জগতের লোকের ভিতর থেকে সৈন্য বেছে নিয়ে চন্দ্রগুপ্ত গড়ে তুললেন এক প্রকাণ্ড বাহিনী! কিন্তু এবারে তিনি প্রথমেই মগধের দিকে গেলেন না, উত্তর ভারতেই তুললেন গ্রিকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ধ্বজা! সীমান্ত ও পাঞ্জাবের দেশে দেশে তিনি ছুটতে লাগলেন অগ্নিমূর্তি ধারণ করে, চতুর্দিকে ভারতের শত্রু গ্রিকদের রক্ত ছড়াতে ছড়াতে! তাঁর বীরত্ব ও দেশভক্তির প্রেরণা লাভ করে ভারতবাসীরাও জেগে উঠল প্রবল জাতীয় ভাবের তীব্র উদ্দীপনায়! বিপদ দেখে গ্রিক দস্যুরা যখন ভারতের মাটি ছেড়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচালে তখন সমগ্র উত্তর ভারত চন্দ্রগুপ্তের করতলগত এবং তাঁর অধীনস্থ সৈন্যদলেরও সংখ্যা হয় না!

দেশের পর দেশ জয় করতে করতে চন্দ্রগুপ্ত আবার মগধে ফিরে এলেন। ধননন্দের সঙ্গে আবার তাঁর যুদ্ধ হল এবং সে যুদ্ধে বিজয়ী হলেন চন্দ্রগুপ্তই। চাণক্যের প্রতিহিংসা শান্ত হল—নন্দ সবংশে মারা পড়ল, চন্দ্রগুপ্ত আরোহণ করলেন পাটলিপুত্রের সিংহাসনে। এই চিরস্মরণীয় ঘটনার কাল হচ্ছে খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ কি ৩২২ শতক।

কিছুদিন যেতে-না যেতেই চন্দ্রগুপ্তের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন হল সফল।

কিন্তু চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসনলাভের বছর পনেরো-ষোলো পরে আলেকজান্ডারের সেনাপতি ও প্রাচ্য গ্রিক সাম্রাজ্যের অধীশ্বর সেলিউকস আবার এলেন ভারত-বিজয়ে। তবে এবারে ভারত আর একতাহীন ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল না। সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের অধীনে ছিল তখন আট হাজার যুদ্ধরথারোহী চব্বিশ হাজার সৈন্য, নয় হাজার রণহস্তীর সঙ্গে ছত্রিশ হাজার যোদ্ধা, ত্রিশ হাজার অশ্বারোহী ও ছয় লক্ষ পদাতিক! সেলিউকস সিন্ধু নদ পার হয়েছেন শুনে চন্দ্রগুপ্ত সসৈন্যে তাঁকে আক্রমণ করলেন এবং রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে ভারতের তরবারি করলে গ্রিক বীরত্বকে ভূমিসাৎ! পরাজিত সেলিউকস কাবুল, কান্দাহার, হিরাট ও মাক্রাণ প্রভৃতি রাজ্য ক্ষতিপূরণস্বরূপ চন্দ্রগুপ্তের হাতে ছেড়ে দিলেন—ভারতের সীমান্ত এগিয়ে গেল পারস্যের সীমান্ত পর্যন্ত! সেইসঙ্গে সেলিউকস নিজের মেয়ের সঙ্গেও চন্দ্রগুপ্তের বিয়ে দিলেন—রূপকথায় যাকে বলে, অর্ধেক রাজ্যের সঙ্গে রাজকন্যাদান!

গ্রিক জীবনীলেখক প্লুটার্ক বলেন, সেলিউকসকে হারিয়ে চন্দ্রগুপ্ত বেরিয়ে পড়লেন দিগবিজয়ে এবং নিজের ছয় লক্ষ সৈন্য নিয়ে সমস্ত শত্রু বধ করে সারা ভারতের ওপরে উড়িয়ে দিলেন বিজয়পতাকা! চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্য হয়ে উঠল এত বড়ো, যার তুলনায় আজকের ইংরেজ-অধিকৃত ভারতবর্ষও ছোটো বলা চলবে। অথচ আধুনিক ভারতবাসীর মুখ বন্ধ করবার জন্যে ইংরেজরা যখন-তখন বলে, 'আমাদের আগে ভারতবাসীরা কখনো এত বড়ো সাম্রাজ্যের মধ্যে এক জাতির মতো বাস করেনি!'

বড়ো বড়ো ঐতিহাসিকরা সবিস্ময়ে বলেছেন, চন্দ্রগুপ্ত একেবারে অনাথ ও সহায়সম্পদহীন হয়েও মহাপরাক্রান্ত ও বিশ্বজয়ী গ্রিকদের পরাজিত ও বিতাড়িত করে ভারতকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করলেন, প্রতাপশালী ও আর্যাবর্তের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা ধননন্দকে হারিয়ে মগধের সিংহাসন দখল করলেন, ভারতব্যাপী সাম্রাজ্য স্থাপন করলেন এবং গ্রিক রাজ সেলিউকসের দর্পচূর্ণ করে ভারতের বাইরেও বিপুল এক রাজ্য লাভ করলেন। মাত্র আঠারো বৎসরের মধ্যে এইসব অসম্ভব কীর্তি সম্ভবপর করে ভারতের ইতিহাসে আজও তিনি অতুলনীয় হয়ে আছেন!

সাম্রাজ্যকে অধিকতর দৃঢ় ভিত্তির ওপরে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্যে সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত আরও ছয় বৎসরকাল রাজদণ্ড ধারণ করে রইলেন বটে, কিন্তু সত্যিকার আর্যাবর্তের রাজর্ষি তিনি, মন তাঁর ভরে গেল অসীম বৈরাগ্যে! ভারত-উদ্ধার ব্রত উত্থাপিত হয়েছে, এখন মিথ্যা এই শক্তির মোহ, তুচ্ছ এই পার্থিব ঐশ্বর্য, ব্যর্থ এই যশ-মর্যাদা! পুত্র বিন্দুসারের হাতে সাম্রাজ্যের শাসনভার দিয়ে সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত রাজমুকুট খুলে ফেললেন, গ্রহণ করলেন সন্ন্যাসীর গৈরিক বস্ত্র এবং চলে গেলেন সুদূর দক্ষিণ ভারতে, মহিশূর প্রদেশ। তখনও তাঁর পঞ্চাশ বৎসর বয়স হয়নি! তাঁর মৃত্যুও বিস্ময়কর, কারণ অল্পদিন পরেই উপবাস-ব্রত নিয়ে স্বেচ্ছায় তিনি দেহত্যাগ করেন!

চন্দ্রগুপ্তের আবির্ভাব কবির কল্পনায় নয়, তিনি হচ্ছেন ঐতিহাসিক ব্যক্তি। এবং বিচার করলে বোঝা যাবে যে, একসঙ্গে বীরত্ব, মানবতা ও মহানতার কথা ধরলে পৌরাণিক ভীমার্জুনেরও চেয়ে তাঁর মহিমা হচ্ছে উচ্চতর।

রোশনাই, ভরদ্বাজ পাবলিশিং হাউস, ১৯৪০

সকল অধ্যায়
১.
ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতে
২.
ভগবানের চাবুক
৩.
মহাভারতের শেষ মহাবীর
৪.
হন্তারক নরদানব
৫.
রক্ত বাদল ঝরে
৬.
আলেকজান্ডার দি গ্রেট
৭.
দিগবিজয়ী নেপোলিয়ন
৮.
পঞ্চনদের তীরে
৯.
উপন্যাসের চেয়ে আশ্চর্য
১০.
সত্যিকার অ্যাডভেঞ্চার
১১.
সাত হাজারের আত্মদান
১২.
মরা মানিক আর জ্যান্ত মানিক
১৩.
ভারতের একমাত্র সুলতানা
১৪.
সূর্য দেবী, পর্মল দেবী
১৫.
মারাঠার লিওনিডাস
১৬.
মুসলমানের জহরব্রত
১৭.
মৃগনয়না মহিষমর্দিনী
১৮.
ব্যাঘ্রভূমির বঙ্গবীর
১৯.
অনামা বীরাঙ্গনা
২০.
ভারতের থার্মোপলি
২১.
সিরাজের বিজয় অভিযান
২২.
ছত্রপতির অ্যাডভেঞ্চার
২৩.
ইতিহাসের রক্তাক্ত দৃশ্য
২৪.
মহাভারতের মহারথ
২৫.
'বীরাঙ্গনা, পরাক্রমে ভীমা-সমা'
২৬.
রক্ত পাথারের সাঁতারু
২৭.
ছত্রপতির ছত্রভঙ্গ
২৮.
তিন সম্রাটের ত্র্যহস্পর্শ-যোগ
২৯.
আলেকজান্ডারের পলায়ন
৩০.
ওষ্ঠাধরে রাজদণ্ড
৩১.
ইতিহাস আশ্রিত রচনা
৩২.
এ যুগের সবচেয়ে বড়ো ডাকাত
৩৩.
আধুনিক রবিনহুড
৩৪.
ইয়াঙ্কি খোকা-গুণ্ডা
৩৫.
গুপ্ত কবির কদলী-কবিতা
৩৬.
ভাঙা অমিত্রাক্ষরের স্রষ্টা কে?
৩৭.
নূতন বাংলার প্রথম কবি
৩৮.
বুদ্ধদেব
৩৯.
বাংলাদেশে বোম্বেটেরাজ
৪০.
ঋষি টলষ্টয়
৪১.
দুই ঠাকুরের কাহিনি
৪২.
আশ্চর্য মূর্খ পণ্ডিত
৪৩.
অতুল্য শ্রুতিধর
৪৪.
বর্গি এল দেশে
৪৫.
প্রথম বাঙালি সম্রাট
৪৬.
জগন্নাথদেবের গুপ্তকথা
৪৭.
মরণ বিজয়ীর দল
৪৮.
সত্যিকার দানব-দানবী
৪৯.
প্যারিসের কুব্জ-রাজা
৫০.
ফরাসি বিপ্লবে বাঙালির ছেলে
৫১.
বিখ্যাত চোরের অ্যাডভেঞ্চার
৫২.
টেলিফোনে গোয়েন্দাগিরি
৫৩.
প্যারির বালক-বিভীষিকা
৫৪.
পৃথিবীর প্রথম গোয়েন্দা কাহিনি
৫৫.
শিবদাস ভাদুড়ি
৫৬.
সেকালের সপ্ত আশ্চর্য

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%