হেমেন্দ্রকুমার রায়

সকলেই অবাক! এবং হতভম্ব!
এমন অসম্ভব মানুষ কেউ কখনো দেখেনি। এমন আশ্চর্য শক্তির কথা কেউ কোনওদিন শোনেনি।
পৃথিবীতে ঢের ঢের জ্ঞানী ও পণ্ডিত জন্মেছেন— নানা শাস্ত্রে যাঁদের অধিকার দেখে লোকের মনে জেগেছে পরম বিস্ময়। কিন্তু সর্বশাস্ত্রে যাঁর সমান অধিকার আছে, এমন কোনও মানুষকে কবির কল্পনার বাইরে কেউ দেখেছেন কি?
কতটুকু মানুষের জীবন এবং অসংখ্য হচ্ছে শাস্ত্রের সংখ্যা। সর্বশাস্ত্র নখদর্পণে রাখা কি সম্ভবপর?
এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন ফ্রান্সের পিয়ের লিউটেক।
গত শতাব্দীর শেষের দিকে—প্যারিস নগরে তিনি করেন প্রথম আত্মপ্রকাশ। সে-এক বিপুল বিস্ময়কর ব্যাপার! মন বিশ্বাস করতে চায় না, বিশ্বাস না করেও উপায় নেই।
যে-কেউ যে-কোনও বিষয় নিয়ে যা-কিছু জিজ্ঞাসা করে, মুখে মুখে তিনি দেন তার সঠিক উত্তর! এজন্যে তাঁকে কোনও তথ্যগ্রন্থের পাতা ওলটাতে হয় না।
দর্শনশাস্ত্র, মনোবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জ্যোতিষ, শারীরবিজ্ঞান, স্বাস্থ্যতত্ত্ব, চিকিৎসাবিজ্ঞান, অর্থবিদ্যা, বলবিদ্যা, পাটিগণিত, জ্যামিতি, জীবগণিত, ত্রিকোণমিতি, পরিসংখ্যান ভূগোল, সাহিত্য, শিল্প ও ইতিহাস প্রভৃতি সম্পর্কীয় যে-কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতেন তিনি সঙ্গে সঙ্গে!
এমন সব গুপ্ত বিদ্যা আছে, সুপণ্ডিতরাও যার সঙ্গে পরিচিত নন। কিন্তু সেসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করেও লিউটেককে ঠকাবার উপায় ছিল না।
তাঁর স্মৃতিপথে জমা থাকত অতি তুচ্ছ বিষয়ও, পণ্ডিতদের কাছে সর্বদাই যা পরিত্যক্ত হয়। সেদিক দিয়েও কেউ তাঁকে হার মানাতে পারত না।
এ যেন অমানুষিক শক্তি!
দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে লিউটেকের নাম। মুখে মুখে শোনা কথায় লোকের বিশ্বাস হয় না, সবাই সামনে এসে তাঁর ক্ষমতার পরিচয় পেতে চায়।
লিউটেকের আপত্তি নেই। তিনি থিয়েটার ভাড়া নেন। টিকিট কেনবার জন্যে ভিড় ভেঙে পড়ে, প্রেক্ষাগারে তিলধারণের ঠাঁই থাকে না।
জনে জনে যথেচ্ছ প্রশ্ন করে এবং মুখে পায় যথাযথ উত্তর। কেউ নিরাশ হয়ে ফেরে না। সকলের তাক লেগে যায়। লিউটেক যেন মূর্তিমান 'এনসাইক্লোপিডিয়া'!
তবু লোকের সন্দেহ হয়। নানাজনে নানা কথা বলে। একটিমাত্র ক্ষুদ্র বস্তিতে এমন অগাধ জ্ঞানের স্থানসংকুলান হওয়া অসম্ভব। এর মধ্যে নিশ্চয়ই কোনও কারসাজি আছে।
একটা কথা ওঠে। এও তো দেখা যায়, জাদুকররা মঞ্চের উপরে দাঁড়িয়ে প্রেক্ষাগারে উপস্থিত দর্শকদের মনের কথা বলে দেয়। কিন্তু তারা অন্তর্যামী নয়, কার্যোদ্ধার করে কলাকৌশলে। এও তেমনি কোনও ব্যাপার আর কী!
হয়তো প্রেক্ষাগারে গিয়ে বসে দলে দলে লিউটেকের নিজের লোক। তারা কে কী প্রশ্ন করবে এবং তিনি কী উত্তর দেবেন, সেটা আগে থাকতেই স্থির করা থাকে।
লিউটেকের কানে উঠল এইসব গুজব। তিনি তৎক্ষণাৎ জোর গলায় জানিয়ে দিলেন, ডেকে আনো সব নানা শাস্ত্রের পণ্ডিত আর বড়ো বড়ো বৈজ্ঞানিককে। আমি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রত্যেক বিশেষজ্ঞের প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি আছি।
অবিলম্বে সেই সুযোগ ঘটল। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে লিপজিগ নগরে প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিকদের এক গুপ্তসভার অধিবেশন হয়। আমন্ত্রিত বৈজ্ঞানিক ছাড়া সেখানে আর কারোর প্রবেশ করবার উপায় ছিল না। সেই সভায় আহত হলেন লিউটেক। পাছে লুকিয়ে কোনও লোক কোনও উপায়ে সেখানে ঢুকে পড়ে সেই ভয়ে ব্যবস্থা করা হল, দ্বারে থাকবে কড়া পাহারা এবং প্রত্যেক বৈজ্ঞানিককেই নিজের আমন্ত্রণপত্র দেখিয়ে সভাস্থলে প্রবেশ করতে হবে।
লিউটেক যথাসময়ে সেখানে গিয়ে হাজির হলেন পরীক্ষার্থীর মতো এবং পরীক্ষিত হয়ে ফিরে এলেন যশের মুকুট মাথায় পরে! বিদ্বজ্জনদের গুপ্তসভায় তাঁর উপরে প্রশ্নবাণ বর্ষণ করা হয়েছিল সুদীর্ঘ তিন-ঘণ্টাকাল ধরে, কিন্তু কেউ তাঁকে পরাস্ত করতে পারেননি!
হার মানলেন পণ্ডিতরাই। তাঁদের একবাক্যে স্বীকার করতে হল, এমন অদ্ভুত ও বিচিত্র স্মৃতিশক্তির তুলনা নেই।
মুখ বন্ধ হল নিন্দুকদের এবং বেড়ে উঠল লিউটেকের বাজারদর! তাঁকে দেখবার ও তাঁর মুখের কথা শোনবার জন্যে জনসাধারণের মধ্যে জাগল প্রবল আগ্রহ এবং তিনি থিয়েটার ভাড়া নিলে প্রেক্ষাগারে ছুটে আসে কাতারে কাতারে দর্শক। লিউটেক দুই হাতে টাকা লুটতে লাগলেন।
কিন্তু আর-একদিক দিয়ে লিউটেক চরিত্রের এক অদ্ভুত বিশেষত্ব প্রকাশ পেয়েছে। তিনি ছিলেন মহাফুর্তিবাজ লোক—ভালো খাওয়া-পরা এবং উদ্দাম আমোদ-প্রমোদ ছাড়া তাঁর জীবনে আর কোনও লক্ষ্যই ছিল না। আর সেইজন্যে এক হাজার টাকা হাতে এলে তিনি উড়িয়ে দিতেন দুই হাজার টাকা। অজস্র টাকা রোজগার করেও অর্থাভাবের জন্যে তাঁকে বার করতে হত হাজার হাজার টাকা!
পাওনাদারদের তাগাদায় জীবন তাঁর অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, মহাজনরা নালিশ করবে বলে শাসায়, প্রশ্নোত্তর-সভায় কোনও কোনওদিন এমন অভদ্র প্রশ্নও শোনা যায়—'মশাই, কবে আপনি দরজির দোকানের দেনা শোধ করবেন?'
শেষটা নাজেহাল হয়ে লিউটেক স্বদেশ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন— আরও বেশি টাকা রোজগার করবার জন্যে। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইয়োরোপের দেশে দেশে সফর করতে গেলেন। তাঁর যশ তখন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, সকলেই তাঁকে দেখতে চায়। কিন্তু বিনামূল্যে তিনি তো দেখা দেবার পাত্র ছিলেন না, কাজেই তাঁর অর্থোপার্জনও হল যথেষ্ট! দুই বৎসর পরে দেশে ফিরে এসে তিনি প্রত্যেক মহাজনের দেনা শোধ করে দিলেন।
পাওনাদাররা একেবারেই অবাক! কারণ দেশে বসেই তারা খবর রেখেছিল যে, লিউটেক বিদেশে গিয়েও নির্বোধের মতো দরাজ হাতে টাকা উড়িয়ে দিয়েছেন। তবু ঋণ পরিশোধ করার টাকা তিনি পেলেন কোথায়?
আবার লিউটেকের প্রশ্নোত্তর-সভায় দর্শনার্থীর জনতা জমে, আবার তিনি পান তোড়া তোড়া টাকা উপহার এবং আবার তিনি সে সমস্ত ফুঁকে দেন বেপরোয়ার মতো। কিন্তু জীবনকে উপভোগ করবার জন্যে দরকার আরও বেশি—আরও বেশি টাকা! আবার রাশি রাশি টাকা ঋণ করবার প্রয়োজন হয়। আবার ঋণের পরিমাণ মাত্রা ছাড়িয়ে যায় এবং আরম্ভ হয় পাওনাদারদের জোর তাগাদা।
আবার লিউটেক মালপত্তর গুছিয়ে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েন। দেশে দেশে সফর করেন। বিদেশেও নিজের অদ্ভুত মস্তিষ্কের খেল দেখিয়ে রোজগার করেন টাকার কাঁড়ি, কিন্তু নবাবি করে উড়িয়ে দেন সমস্তই। দুই বৎসর পরে স্বদেশে ফিরে আসেন এবং পাওনাদারদের সমস্ত প্রাপ্য চুকিয়ে দেন।
আবার সবাই চমৎকৃত! কোথায় পেলেন তিনি দেনা শোধ করবার মতো অতিরিক্ত অর্থ?
তারপর হঠাৎ হৃদরোগে লিউটেকের মৃত্যু হল। জানা গেল তখন অতিরিক্ত অর্থরহস্য।
পাশ্চাত্য দেশের বৈজ্ঞানিক সমাজ প্রচুর অর্থের বিনিময়ে অসাধারণ মস্তিষ্ক ক্রয় করে। শর্ত থাকে, বিক্রেতার মৃত্যুর পর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্যে তাঁর মস্তিষ্ককে অধিকার করা হবে। যে সমাজ টাকা দেয়, তারই দাবি থাকে মস্তিষ্কের উপরে।
কিন্তু লিউটেকের মৃত্যুর পর তাঁর মস্তিষ্কের উপরে দাবি করে বসল ইয়োরোপের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সমাজ, তাদের সংখ্যা হল পঁচাত্তর!
অর্থাৎ প্রতারক লিউটেক পঁচাত্তরটি বৈজ্ঞানিক সমাজের কাছে লুকিয়ে লুকিয়ে নিজের মস্তিষ্ককে বিক্রি করে অসংখ্য টাকা হস্তগত করেছেন। তাই আজ তিনি কুবিখ্যাত, পণ্ডিতসমাজে কেউ তাঁর নাম মুখে আনে না।
মৌচাক এপ্রিল ১৯৫৬

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন