হেমেন্দ্রকুমার রায়

প্রাচীন জগতে এমনধারা সাতটি আশ্চর্য ব্যাপার ছিল, একালের এই বৈজ্ঞানিক যুগেও যাদের তুলনা খুঁজে পাওয়া যায় না। এখনকার কাজের চেয়ে তখনকার কাজের গৌরব ছিল অনেক বেশি। ধরো, একালকার আমেরিকার 'এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়'-এর কথা। তার উচ্চতা হচ্ছে এক হাজার দুইশো পঞ্চাশ ফুট। তার সব-উপরতলায় যেসব মানুষ বাস করে, তারা মেঘের মুলুকে থাকে বললেও অত্যুক্তি হয় না। বাইবেলে 'টাওয়ার অফ ব্যাবেল' নামে প্রাচীন জগতের এক সুদীর্ঘ বিস্ময়কর ভবনের উল্লেখ আছে। কিন্তু একালের 'এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং' বোধহয় তাকেও হার মানিয়েছে। তবু তাকে দেখলেও আজকালকার লোক বিস্মিত হয় না। কারণ একালে অভিজ্ঞতা নিয়ে মানুষ সেকালের তুলনায় অত্যন্ত সহজে ও অল্প সময়ে বড়ো বড়ো অসাধারণ কাজ করে ফেলতে পারে। কিন্তু একালের তুলনায় সেকাল জ্ঞানে-বিজ্ঞানে ও কলকবজা-যন্ত্রপাতির ব্যবহারে ছিল কত বেশি অজ্ঞ! তবু ধরতে গেলে কেবল শুধু হাতে মস্তিষ্কের আর দেহের শক্তির এবং সামান্য কয়েকটি জিনিসের সাহায্যে, সেকালের মানুষ যে অতুলনীয় সপ্তকীর্তির প্রতিষ্ঠা করেছিল, তোমাদের কাছে আজ তারই সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিতে চাই। অবশ্য সেই সপ্ত আশ্চর্য কীর্তির অধিকাংশই এখন কেবল ঐতিহাসিক গল্পে শোনা বা পড়া যায়, কারণ তারা বহুকাল আগেই পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে বিলুপ্ত হয়েছে; কোনও কোনওটির কিছু কিছু ভাঙাচোরা অংশ আজ জাদুঘরের ভিতরে যত্ন করে তুলে রাখা হয়েছে; কেবল প্রায় অটুট অবস্থায় টিকে আছে সবচেয়ে প্রথম আশ্চর্য, অর্থাৎ—
মিশরের পিরামিড
পিরামিডের নাম তোমরা সকলেই শুনেছ। বিখ্যাত পিরামিড আছে তিনটি এবং তাদের ভিতরেও সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে, চিয়োপস (বা খুপুর)-এর পিরামিড। আগ্রার তাজমহলের মতন মিশরের পিরামিডও হচ্ছে সমাধিমন্দির। চিয়োপস ছিলেন মিশরের চতুর্থ বংশের রাজা। তাঁরই মৃতদেহের উপরে প্রায় চল্লিশ বিঘা জায়গা জুড়ে এই অতি বৃহৎ পিরামিড হাজার হাজার বৎসর পরে আজও নীলাকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে আছে সমাধিগৃহে যাবার জন্যে মাত্র কতকগুলি পথ, তা ছাড়া বাকি সমস্তটাই নিরেট ও কঠিন গ্রানাইট পাথরের তৈরি। এর উচ্চতা হচ্ছে কিছু-কম পাঁচশো ফুট। এর অনেক প্রস্তরখণ্ড লম্বায় বিশ ফুটের কম হবে না। সেই সেকালের কারিগররা এত বড়ো পাথর যে কী করে অত উঁচুতে টেনে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, তা-ই ভেবে সবাই হয় অবাক। পিরামিডের সমস্তটা গড়তে অমনি বড়ো বড়ো তেইশ লক্ষ প্রস্তরখণ্ডের দরকার হয়েছিল এবং এই একটিমাত্র সমাধিমন্দির সম্পূর্ণ করে তুলেছিল এক লক্ষ গোলামে মিলে সুদীর্ঘ বিশ বৎসর ধরে। প্রত্যেক পাথরকে পরস্পরের সঙ্গে এমন সুকৌশলে জুড়ে দেওয়া হয়েছে যে তাদের ফাঁকে একখানা পাতলা কাগজও গলিয়ে দেওয়া যায় না। এই পিরামিডের বয়স ছয় হাজার ছয়শো বৎসরেরও বেশি। তারপর দ্বিতীয় আশ্চর্য—
ঝুলন্ত বাগান
প্রাচীনকালে ব্যাবিলন নামে এক প্রসিদ্ধ দেশ ছিল, পুরাতত্ত্ববিদরা তার ধ্বংসাবশেষকে একালে মাটি খুঁড়ে বার করেছেন। ওইখানে আড়াই হাজার বৎসরেরও আগে রাজত্ব করতেন দ্বিতীয় নেবুখাদ রেজজার। কেবল মস্ত বড়ো দিগবিজয়ী ছিলেন না, ব্যাবিলনকে নতুন করে নতুন রূপে গড়েও দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর অপূর্ব প্রাসাদের কথা পৃথিবী আজও ভোলেনি। আমাদের রাবণ রাজা যেমন স্বর্গের সিঁড়ি গড়বার চেষ্টা করেছিলেন, ঐতিহাসিকদের মতে, বাইবেলে বিখ্যাত পূর্বোক্ত টাওয়ার অফ ব্যাবেল বা আকাশ-ছোঁয়া ব্যাবেলের বুরুজ তৈরি করেছিলেন তিনিই, সশরীরে স্বর্গে গিয়ে হাজির হবার জন্যে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড়ো ও আশ্চর্য কীর্তি হচ্ছে ঝুলন্ত বাগান। রাজার রানির নাম ছিল অমিতিস, তিনি পাহাড়ে-দেশের মেয়ে। ব্যাবিলন আমাদের বাংলা দেশের মতো সমতল ছিল বলে রানির মোটেই পছন্দ হত না। তাঁরই মন ঠান্ডা রাখবার জন্যে রাজা করেছিলেন এই বিচিত্র ঝুলন্ত বাগানের ব্যবস্থা। বারো বিঘারও বেশি জমি জুড়ে ছিল এই বাগান। পঁচাত্তর ফুট উঁচু খিলানের উপরে চাতাল; আবার সেইরকম খিলান, আবার চাতাল; তারপরেও খিলান আবার চাতাল— এইভাবে সর্বশেষে চাতাল উঠল গিয়ে মাটি থেকে তিনশো ফুট উপরে। ওইসব চাতালের উপরে তৈরি হল ভোজন বা বিলাসগৃহ, বড়ো বড়ো গাছ ও লতাকুঞ্জ প্রভৃতি। নানান জায়গা থেকে বাছাই-করা দুর্লভ ফুলের চারা এনে বাগানকে রঙে রঙে রঙিন করে তোলা হল। বুঝে দেখো, পৃথিবীর তিনশো ফুট উপরে ফুলের বাগান! ভাবলেও অবাক হতে হয় না কি? সকলের উপরে সৃষ্টি করা হল কৃত্রিম হ্রদ, ইউফ্রেটিস নদী থেকে তার ভিতরে জল তোলা হত গাছে গাছে জলের জোগান দেবার জন্যে। রানি তখন খুব খুশি হলেন নিশ্চয়, কারণ সমতল দেশেও তিনি মাটি ছেড়ে তিনশো ফুট উপরে উঠে সামনে দেখতেন, সরোবরের টলটলে নীল পদ্মের রং-মাখানো জলের লীলা, সবুজের স্বপ্ন-দোলানো বাহারি গাছে গাছে ফল-ফুলের সুষমা, মধুর পিপাসায় উড়ে আসে দলে দলে প্রজাপতিরা, পাখনায় পাখনায় ইন্দ্রধনুর ছন্দ নাচিয়ে এবং ঝিলমিলে পাতার সঙ্গে তালে তালে দুলে দুলে গান গায় কত পাখি কত সুরের ফোয়ারা খুলে দিয়ে! কিন্তু সে খুশির দিন আজ নিয়েছে অনন্ত বিদায়! আজ সে রাজা-রানিও নেই, বাগানও নেই, ব্যাবিলনও নেই— আছে কেবল স্মৃতি, তাও খুব স্পষ্ট নয়!
তৃতীয় আশ্চর্য হচ্ছে—
ডায়েনা দেবীর মন্দির
এশিয়া মাইনরে ইফিসাস নামক স্থানে প্রাচীন গ্রিকদের এক উপনিবেশ ছিল। লিডিয়ার কুবেরের মতো ধনী রাজা ক্রোসাস একসময়ে ইফিসাস অধিকার করেন এবং প্রধানত তাঁরই দানের উপরে নির্ভর করে ডায়েনা মন্দির প্রতিষ্ঠার সূত্রপাত হয়। গ্রিকদের আর্টেমিস ও রোমানদের ডায়েনা একই— অর্থাৎ মৃগয়ার দেবী। তাঁকে চন্দ্রমণ্ডলের ও সতীত্বেরও দেবী বলা হয়। কুমারী গ্রিক মেয়েরা বিশেষ ঘটা করেই তাঁর পূজা করত। যদিও ডায়েনা স্বর্গ-মর্তের একচ্ছত্র অধিপতি গ্রিক দেবতা জুপিটারের কন্যা, তবু এশিয়া মাইনরে এসে তিনি তাঁর পাশ্চাত্য রীতি হারিয়ে অনেকটা প্রাচ্য দেবীর মতন হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর সামনে অনেক জায়গায় নরবলিও দেওয়া হত। গ্রিক সাম্রাজ্যে ডায়েনার মন্দির ছিল অসংখ্য, কিন্তু ইফিসাসের মন্দিরটিই ছিল সবচেয়ে বিখ্যাত। গ্রিকরা এ স্থানকে পীঠস্থান বলে মনে করত, কারণ এখানকার ডায়েনামূর্তি নাকি স্বর্গ থেকেই মর্তে নেমে এসেছিল। খ্রিস্ট জন্মাবার ছয়শত বৎসর আগেই এশিয়া মাইনরে প্রবাসী গ্রিকদের শিল্পকলা এতটা উচ্চস্তরে উঠেছিল যে, তাদের স্বদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ ও পৃথিবীবিখ্যাত বিরাট পার্থেনন মন্দিরেরও চেয়ে চারগুণ বেশি বড়ো করে এই অত্যাশ্চর্য ডায়েনা মন্দির গড়ে তুলতে পেরেছিল। লম্বায় ও চওড়ায় তা ছিল যথাক্রমে ৩৪২ ও ১৬৩ ফুট। এর চারিদিক ঘেরা ছিল একশোটি মর্মরস্তম্ভের অরণ্যে। এবং তার প্রত্যেকটি ছিল ৫৫ ফুট উঁচু। এই বিরাট ডায়েনামন্দিরের সৌন্দর্য ছিল অসাধারণ যে গ্রিকরা তা পৃথিবীতে অদ্বিতীয় বলেই মনে করত। কিন্তু তার কোনও প্রমাণই আজ আর পাবার উপায় নেই। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫৬ অব্দে, যেরাত্রে আলেকজান্ডার দি গ্রেটের জন্ম হয়, আগুনের কবলে পড়ে ডায়েনা মন্দির পুড়ে ভস্মসাৎ হয়ে যায়। পরে আলেকজান্ডার দেবীর জন্যে আর-একটি বৃহৎ ও আশ্চর্য মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন, তারও নির্মাতা ছিলেন সে যুগের বড়ো বড়ো শিল্পী। কিন্তু প্রায় ছয়শত বৎসর পরে বর্বর গথদের আক্রমণে সেই মন্দিরও নষ্ট হয়ে যায়। আধুনিক পুরাতত্ত্ববিদরা মাটির ভিতর থেকে পুরাতন মন্দিরের ভিত খুঁড়ে বার করেছেন এবং তাইতেই জানা গিয়েছে যে, আশি হাজার স্কোয়্যার ফুটব্যাপী ভূমির উপরে ডায়েনা মন্দির প্রতিষ্ঠিত ছিল। ডায়েনার পুরাতন মন্দিরের কতকগুলি ভাঙা অংশ বিলাতের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে।
চতুর্থ আশ্চর্যের নাম—
জুপিটারের মূর্তি
জিয়াস হচ্ছেন গ্রিক দেবতা, রোমানদের দেশে এসে নাম পেয়েছেন জুপিটার। তিনি স্বর্গের অধীশ্বর, শনির পুত্র, দেবতা ও পৃথিবীর মানুষরা তাঁর প্রজা।
বৃষ্টি ও বজ্রবিদ্যুৎ থাকে তাঁরই তাঁবে। তা ছাড়া পৃথিবী শস্য-শ্যামা হয় তাঁরই মহিমায়। তিনি একবার মাথা নাড়লে বিশ্বজগৎ থরথর করে কাঁপে। ছেলেবেলায় বাপের অত্যাচারে পৃথিবীতে পালিয়ে এসে তিনি চাষিদের ঘরে আশ্রয় নেন, তারপর বড়ো হয়ে স্বর্গে ফিরে শনিকে সিংহাসনচ্যুত করে মুকুট পরে স্বর্গপতি হন। তাঁর আরও অনেক গুণ ও কীর্তি আছে, কিন্তু এখানে সেসব বলবার দরকার নেই।
ফিডিয়াস ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাস্কর ও শিল্পী। তাঁরই তত্ত্বাবধানে এথেন্সের অমর পার্থেননের মন্দির গড়া হয়। সেখানে তিনি ছোটো বড়ো এত মূর্তি গঠন করেন যে, সকলে আজও অবাক হয়ে ভাবে, একজনমাত্র লোকের পক্ষে কেমন করে এটা সম্ভবপর হয়েছিল। কিন্তু পৃথিবীর নিয়মই এই, শ্রেষ্ঠ হলেই শত্রু বাড়ে। ফিডিয়াসের খ্যাতি-প্রতিপত্তি দেখে কয়েকজন হিংসুক লোক ষড়যন্ত্র করে, ফলে তিনি পদচ্যুত ও কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। তারপর অনেক কষ্টে মুক্তি পেয়ে এথেন্স শহর ছেড়ে তিনি ওলিম্পিয়ায় পালিয়ে যান, এবং সেখানকার লোকদের আগ্রহে বৃদ্ধ-বয়সে জিয়াস বা জুপিটারের যে অতিকায় মূর্তি গড়েন, সেকালে তাকেই তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি বলে মনে করা হত। সে মূর্তি আজ আর বর্তমান নেই, কিন্তু তার অপূর্ব শ্রেষ্ঠতা ও সৌন্দর্য আজও লোকের স্মৃতিপটে তাকে জীবন্ত বা অমর করে রেখেছে। যেসব প্রাচীন লেখক স্বচক্ষে সেই জুপিটারকে দেখেছেন তাঁরা বলেন, স্বর্গের ও মর্তের এই সম্রাটের দিকে দৃষ্টিপাত করলেই মনের মধ্যে একসঙ্গে ভয় ও ভক্তির সঞ্চার হয়। সেই অতি প্রকাণ্ড মূর্তির দেহ ছিল হাতির দাঁতের ও পোশাক ছিল পাকা সোনায় তৈরি। এবং তার বিরাট সিংহাসন ছিল নাকি আরও বেশি মূল্যবান। কারণ হাতির দাঁত, পাকা সোনা ও অগুনতি মণিমাণিক্য দিয়ে তা প্রস্তুত করা হয়েছিল। সেই সিংহাসনও নাকি গ্রিকদের অলংকৃত শিল্পের সবচেয়ে সেরা নমুনা বলে গণ্য করা হত। এমন অদ্ভুত মূর্তি ও সিংহাসন নষ্ট হয়ে গেছে কেমন করে, তা কেউ জানে না। তবে তখনকার প্রচলিত মুদ্রার উপরে সেই মূর্তির কয়েকটি নকল পাওয়া গিয়েছে। তাতে দেখা যায়, স্বর্গের অধিপতি কারুকার্যে খচিত সিংহাসনের উপরে উপবিষ্ট। মূর্তিটা নাকি এত উঁচু ও বড়ো ছিল যে তার সামনে মানুষদের দেখাত খুদে খুদে চলন্ত পুতুলের মতো। এমন মূর্তি গড়তে কত টাকার সোনা ও হাতির দাঁতের দরকার হয়েছিল, সেটাও তোমরা একবার কল্পনা করে দেখো।
পঞ্চম আশ্চর্য হচ্ছে—
রোডস-এর অতিকায়
গ্রিক পুরাণের মতে, সূর্যালোকের দেবতা হেলিয়োস, চার ঘোড়ায় টানা রথে চড়ে প্রতিদিন শূন্যপথে উদয়লোক থেকে অস্তলোকে যাত্রা করেন। পরে তাঁকে অ্যাপোলো বলেও ডাকা হত।
রোডস হচ্ছে একটি দ্বীপের নাম— এশিয়া মাইনরের তীর থেকে বারো মাইল দূরে অবস্থিত চেয়ার্স নামে এক গ্রিক ভাস্কর ওই দ্বীপের বন্দরের উপরে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্যে সূর্যদেবতা হেলিয়োসের বিরাট এক মূর্তি গঠন করেন। মূর্তিটি ব্রোঞ্জ ধাতুতে গড়া এবং অসংখ্য কারিকরের জন্মাবার দুইশত ষাট বৎসর আগে ওই দেবতামূর্তিকে বন্দরের মুখে এমন এক জায়গায় বেদির উপরে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, যাতে করে দূর সমুদ্র থেকেও ভাসমান জাহাজের নাবিকরা তাকে দেখতে পায়। এবং তীরের উপরে অবস্থিত এই অচল প্রতিমা যে বহু দূরের সচল জাহাজকেও যথেষ্ট সাহায্য করত তাতে আর সন্দেহ নেই, কারণ উচ্চতায় সে ছিল একশো পাঁচ ফুট! কিন্তু সূর্যালোকের দেবতা মর্তলোকে এসে বেশি দিন আত্মরক্ষা করতে পারেননি, কেননা, প্রতিষ্ঠার মাত্র ষাট বৎসর পরেই ভীষণ ভূমিকম্পে তিনি পপাত ধরণিতলে হন, আর উঠে দাঁড়াননি।
প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, বর্তমানকালে আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরের বন্দরে এরও চেয়ে ঢের বেশি বড়ো একটি 'স্বাধীনতা' দেবীর মূর্তি দাঁড় করানো আছে— সেটি হচ্ছে আমেরিকার প্রতি ফ্রান্সের দান। মূর্তিটি তিনশত ফুট উঁচু। এর চেয়ে বড়ো মূর্তি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় নেই।
সেকালের ষষ্ঠ আশ্চর্যের নাম—
মৌসোলাসের সমাধিমন্দির
মৌসোলাস ছিলেন জাতে গ্রিক ও কেরিয়ার রাজা। তাঁর রানি আর্টেমিসিয়া স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিরক্ষার জন্যে স্থির করলেন, একটি আশ্চর্য ও অসাধারণ সমাধিমন্দির প্রতিষ্ঠা করবেন। তখনি চারিদিক থেকে সবচেয়ে বড়ো গ্রিক শিল্পীদের ডেকে আনা হল। এবং এশিয়া মাইনরের হেলিকার্নেসাস নামক জায়গায় বহুকাল ধরে বহু অর্থব্যয়ে অপূর্ব এক সমাধিমন্দির গড়ে তোলা হল; মর্মর প্রস্তরে তার আগাগোড়া মোড়া, চমৎকার স্তম্ভশ্রেণি, চতুর্দিকে অশ্বারোহী মূর্তি, প্রত্যেক থামের পরেই একটি করে প্রতিমা দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন ভঙ্গিমায়, সর্বোচ্চ চূড়ার উপরে অশ্বচালিত রথ, এবং সেই রথের উপরে রাজা মৌসোলাস ও রানি আর্টেমিসিয়ার প্রকাণ্ড মূর্তি। খ্রিস্ট জন্মাবার তিনশত তিপ্পান্ন বৎসর আগে মন্দির গঠন সমাপ্ত হয়, সমগ্র গ্রিক সাম্রাজ্যে এর চেয়ে বড়ো ও সুন্দর সমাধিমন্দির আর নির্মিত হয়নি। এই মন্দিরের উপরদিকটা ছিল আমাদের দক্ষিণ ভারতের মন্দিরের মতন দেখতে। এর চারিদিকে বেড়ের মাপ ছিল একশো এগারো ফুট এবং উচ্চতা ছিল একশো চল্লিশ ফুট, অর্থাৎ প্রায় কলিকাতার অক্টারলোনি মনুমেন্টের মতো। ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে এমন মোহনীয় স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের ঐশ্বর্য ধর্মযুদ্ধগামী ইয়োরোপীয় খ্রিস্টানেরা ভেঙেচুরে তছনছ করে দেয়, সমাধিমন্দিরের পাথর ও মালমশলা তুলে নিয়ে নিজেদের দুর্গ নির্মাণ করে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এখনও এর কোনও কোনও ভগ্নাংশ দেখতে পাওয়া যায়।
শেষ বা সপ্তম আশ্চর্য হচ্ছে—
আলেকজান্দ্রিয়ার আলোকগৃহ
মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরে সমুদ্রপথে যেসব জাহাজ এসে লাগত, তাদের পথনির্দেশ করবার জন্যে রাজা প্রথম টলেমি খ্রিস্ট জন্মাবার তিনশত বৎসর আগে একটি আলোকগৃহ বা 'লাইটহাউস' তৈরি করিয়ে দেন। ওই আলোকগৃহের উচ্চতা ছিল চারিশত ফুট, সুতরাং সমুদ্রের কত দূর থেকে যে তার চূড়ার আলো দেখা যেত, তোমরা অনায়াসেই তা অনুমান করতে পারো। অনেকের মতে তার দৈর্ঘ্য ছিল ছয়শত ফুট এবং পঁচিশ মাইল দূর থেকে দেখা যেত তার আলো। সাদা পাথরে গড়া এই সুদীর্ঘ বাড়িটি অনেক তলায় বিভক্ত ছিল। কিন্তু তার মোট অংশ ছিল তিনটি। প্রথমে চারকোনা বুরুজ, তারপর আটকোনা বুরুজ এবং তারপর গোল বুরুজ। সেই গোল স্তম্ভাকৃতি অংশের জানালাগুলো ছিল সমুদ্রের দিকে এবং সারারাত ধরে জানালায় জানালায় মশালের শিখা ও আগুন জ্বালিয়ে রাখা হত। প্রাচীনকালে এই আলোকগৃহটিকে পিরামিডের মতোই বিস্ময়কর বলে মনে করা হত বটে, কিন্তু পিরামিডের মতো সে দীর্ঘজীবী হতে পারেনি, প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গেই অদৃশ্য হয়ে গেছে।
আর-একটা কথা শুনলে তোমরা বোধ করি অত্যন্ত বিস্মিত হবে। সেই বাইশশো তেইশশো বৎসরের আরও আগেই আমাদের ভারতবর্ষীয় নাবিকরা সমুদ্রগামী স্বদেশি জাহাজে চড়ে আলেকজান্দ্রিয়ায় বাণিজ্য করবার জন্যে গমন করত। সুতরাং ওই বিখ্যাত 'লাইটহাউস'-এর উজ্জ্বল আলো যে তাদেরও সাহায্য করেছিল, তাতে আর কোনোই সন্দেহ নেই।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন