হেমেন্দ্রকুমার রায়

এক। পটভূমিকা
ইতিহাস যখন লিখিত হয়নি, জলদস্যু বা বোম্বেটের অত্যাচার আরম্ভ হয়েছে তখন থেকেই। খ্রিস্টপূর্ব যুগেও দেখা যায় প্রাচীন মিশর, গ্রিস ও রোমের সমুদ্রযাত্রী জাহাজ বোম্বেটেদের পাল্লা থেকে রেহাই পায়নি। এমনকী, বিশ্ববিখ্যাত রোমান দিগবিজয়ী জুলিয়াস সিজারকে পর্যন্ত একবার বোম্বেটেরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ইংরেজিতে Pirate বলতে বোঝায় বোম্বেটে এবং গ্রিক Peirates থেকে ওই শব্দটির উৎপত্তি। উপরন্তু পোর্তুগিজ Bombardier শব্দটি ভেঙে গড়া হয়েছে বাংলায় চলতি 'বোম্বেটে' শব্দটি।
প্রাচীন ভারতবাসীরাও সাগরযাত্রায় বেরিয়ে যখন-তখন ধরা পড়ত বোম্বেটেদের ফাঁদে। তারপর অষ্টম শতাব্দীতে ভারতের মাটিতে মুসলমানরা যে প্রথম ইসলামের পতাকা রোপণ করবার সুযোগ পায়, তারও মূলে ছিল ভারত সাগরের বোম্বেটেরাই। কিন্তু সে হচ্ছে ভিন্ন কাহিনি, এখানে বলবার জায়গা নেই।
তারপর মধ্যযুগের ইয়োরোপে ইংরেজ, ফরাসি, স্পেনীয়, পোর্তুগিজ ও উত্তর আফ্রিকার মুসলমান বোম্বেটেদের ভয়াবহ অত্যাচারে সমুদ্রযাত্রা অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল এবং জলদস্যুতা পরিণত হয়েছিল একটি রীতিমতো লাভজনক ব্যবসায়ে। ক্রমে ক্রমে পাশ্চাত্য বোম্বেটেদের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর অন্যান্য সমুদ্রেও। আফ্রিকা ও আমেরিকার মধ্যবর্তী অঞ্চলে বোম্বেটেদের প্রাধান্য এতটা বেড়ে ওঠে যে, তারা জল ছেড়ে ডাঙায় নেমেও দেশের পর দেশে হানা দিতে ভয় পেত না।
বোম্বেটেদের সাহস বাড়বে না কেন? বড়ো বড়ো ইংরেজ বোম্বেটে ইংল্যান্ডের রাজাদের কাছ থেকেও আশকারা পেয়েছে। অনেক বোম্বেটের জন্ম আবার সম্ভ্রান্ত পরিবারে। স্পেন বা ফ্রান্সের সঙ্গে যখন লড়াই চলত, ইংল্যান্ডের রাজারা তখন বোম্বেটেদেরও লেলিয়ে দিতে লজ্জিত হতেন না এবং তারাও প্রশ্রয় পেয়ে স্পেন বা ফ্রান্সের যে-কোনও জাহাজের উপরে হামলা দিয়ে অমানুষিক অত্যাচার করত। হেনরি মর্গ্যান ছিল সতেরো শতাব্দীর এক কুখ্যাত ইংরেজ বোম্বেটে। সে কেবল জলপথে নয়, স্থলপথেও শত শত নরহত্যা করেছে এবং নির্বিচার লুণ্ঠনের পর বহু জনপদকে করেছে অগ্নিমুখে সমর্পণ। তাকে বন্দি করে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। কিন্তু রাজা দ্বিতীয় চার্লস তার সঙ্গে আলাপ করে এমন মুগ্ধ হলেন যে, শাস্তি দেওয়া দূরের কথা, মর্গ্যানকে 'স্যার' উপাধিতে ভূষিত করে জামাইকা দ্বীপের শাসনকর্তার আসনে বসিয়ে দিলেন।
জনৈক ইংরেজ বোম্বেটে একবার ভারত সাগরে এসে মোগলদের জাহাজের উপরে চড়াও হয়ে বাদশাহ আলমগিরের পরিবারভুক্ত দুজন রাজকন্যাকেও বন্দিনি করতে ভয় পায়নি।
সুন্দরবন ছিল আগে বর্ধিষ্ণু লোকালয়, পরে পরিণত হয়েছে বিজন জলাজঙ্গলে, মানুষের বিচরণভূমি দখল করেছে হিংস্র পশুর দল। কারণ? পোর্তুগিজ ও মগ বোম্বেটেদের অত্যাচার।
দুজন মেয়ে-বোম্বেটেরও নাম বিখ্যাত— আন রোনি ও মেরি রিড। জাতে ইংরেজ। তাদেরও গল্প অতিশয় চিত্তাকর্ষক, কিন্তু আমরা বোম্বেটেদের ইতিহাস লিখতে বসিনি। ভূমিকার জন্যে যতটুকু চাই, ততটুকু ইঙ্গিতই দিলুম, আপাতত এ সম্বন্ধে আর বেশি বাক্যব্যয় করবার দরকার নেই। এইবার মূল কাহিনি শুরু করা যাক।
যার কথা বলব তার আসল নাম হচ্ছে এডওয়ার্ড টিচ, কিন্তু 'কালোদেড়ে' ডাকনামেই সে সর্বত্র পরিচিত (যেমন কুখ্যাত মুসলমান বোম্বেটে উরুজ পরিচিত ছিল 'লালদেড়ে' ডাকনামে)। সে কেবল স্পেন ও ফ্রান্সের শত্রুই ছিল না, নিজের জাতভাই ইংরেজদেরও সুবিধা পেলে ছেড়ে দিত না এবং সমগ্র ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জ তার নাম শুনলেই ভয়ে কেঁপে সারা হত। আঠারো শতাব্দীর প্রথমদিকেই তার উত্থান এবং পতন। আমেরিকায় তখন ইংরেজদেরই রাজত্ব।
দুই। নায়কের মঞ্চে প্রবেশ
উত্তর আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্বদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জ। তারই উত্তরে আছে সাতশো আশি মাইল লম্বা বাহামা দ্বীপপুঞ্জ— তাদেরও ওয়েস্ট ইন্ডিজের অন্তর্গত বলে মনে করা হয়। আমেরিকার দিকে যাত্রা করবার পর কলম্বাসের চোখে পড়ে সর্বপ্রথমে বাহামা দ্বীপই।
বাহামার অন্যতম দ্বীপ নিউ প্রভিডেন্স এবং সেখানে ছিল বোম্বেটেদের জাহাজ ভেড়াবার এক মস্ত আড্ডা। আমাদের কাহিনির সূত্রপাত সেখানেই।
বোম্বেটেদের নিজস্ব এক কালো পতাকার নাম ছিল 'জলি রোজার'— তার উপরে সাদা রঙে আঁকা থাকত কোনাকুনিভাবে রক্ষিত দুটো অস্থিখণ্ডের উপরে একটা মড়ার মাথা। সাগরপথের যাত্রীরা এই কৃষ্ণপতাকা বা 'জলি রোজার'কে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মতো ভয় করত। সৌভাগ্যের বিষয়, 'জলি রোজার'-এর অস্তিত্ব আজ লুপ্ত।
নিউ প্রভিডেন্স দ্বীপের বোম্বেটে-বহরের জাহাজঘাটে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন কাপ্তেন বেঞ্জামিন হর্নিগোল্ড। লোকের চোখ ভোলাবার জন্যে তাঁর জাহাজের উপরে উড়ছে এখন ইংল্যান্ডের রাজপতাকা বা 'ইউনিয়ন জ্যাক'। কিন্তু সমুদ্রে পাড়ি দিলেই সেখানে 'ইউনিয়ন জ্যাক'-এর জায়গা জুড়ে বসবে সর্বনেশে 'জলি রোজার'— কারণ তিনি হচ্ছেন একজন নামজাদা জলদস্যু!
হর্নিগোল্ড আজ কয়েকদিন জাহাজঘাটায় অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়েছেন একজন সহকারী অধ্যক্ষের জন্যে। সহকারী অধ্যক্ষের অভাবে জাহাজের কার্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভবপর নয়। কিন্তু শহরের বিভিন্ন শুঁড়িখানা ও গুন্ডাপাড়ায় ঘুরেও তিনি মনের মতো সহকারী খুঁজে পাননি এবং সেই অভাবের জন্যে তাঁর জাহাজ বন্দরের মধ্যেই বন্দি হয়ে আছে।
নিজের মনেই গজগজ করে তিনি বললেন, 'এমন তন্ন তন্ন করে খুঁজেও এক বেটা মনের মতো পাষণ্ড গুন্ডার পাত্তা পাওয়া গেল না! আমার জাহাজের খুনে-বদমাইশগুলোকে শায়েস্তা করতে হলে যে খোদ শয়তানের মতো ধড়িবাজ লোক দরকার!'
আচম্বিতে কাছ থেকেই কে পাগলের মতো হো হো করে অট্টহাসি হেসে উঠল— দস্তুরমতো শয়তানি হাসি!
চমকে উঠে নিজের পিস্তলের উপরে হাত রেখে হর্নিগোল্ড রুখে ফিরে দাঁড়ালেন— সত্য সত্যই কি তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ করতে এখানে এসে আবির্ভূত হয়েছে স্বয়ং শয়তান?
কিন্তু কিমাশ্চর্যমতঃ পরম! এ যে কবির ভাষায়— 'পর্বতের চূড়া যেন সহসা প্রকাশ!'
জাহাজঘাটার অন্যান্য লোকদের মাথা ছাড়িয়ে ঊর্ধ্বে জেগে উঠেছে দৈত্যের মতো এক অসম্ভব মনুষ্যদেহ— যেমন লম্বা, তেমনি চওড়া! যেন বামনদের মাঝখানে এক বিরাট পুরুষ! তার মহাবলিষ্ঠ বিপুল বপুর সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে লৌহকঠিন পেশির পর পেশির তরঙ্গায়িত গতি। সেই রুক্ষ কেশকণ্টকিত মুখে আগুনের ফিনকির মতো জ্বলছে দুটো কুচুটে কুতকুতে চক্ষু। মাথায় পুরু কালো চুল— এবং চোখ-নাকের পাশে ও তলায় সে কী কৃষ্ণ ও ঘন শ্মশ্রুর ঘটা! কয়েকটা যত্নরচিত বেণিতে বিভক্ত হয়ে সেই প্রকাণ্ড চাপদাড়ি ঝুলে পড়েছে একেবারে কোমর পর্যন্ত। কেবল বিনুনি বেঁধেই দাড়ির পরিচর্যা শেষ করা হয়নি— তার উপরে তাকে আবার অলংকৃত করা হয়েছে রংচঙে সব রেশমি ফিতে দিয়ে! তার বক্ষবন্ধনীতে ঝুলছে তিনজোড়া পিস্তল এবং গলায় আছে সোনা ও রুপোয় গড়া হার!
তারপর বিস্ময়ের উপরে বিস্ময়! মাথার টুপির তলা থেকে ঝুলে পড়ে কয়েকটা মৃদু-জ্বলনশীল পলিতা সেই ভীষণ মুখখানা অধিকতর ভয়াল ও বাতাসকে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে গন্ধকের উগ্র গন্ধে!
যেন অপচ্ছায়ামূর্তি! থতমত খেয়ে দুই পা পিছিয়ে পড়লেন হর্নিগোল্ড! এমন ধারণাতীত দৃশ্য তিনি জীবনে আর দেখেননি।
পরমুহূর্তেই তাঁর সন্দেহ হল যে, মূর্তি তাঁকে দেখেই হাসছে যেন বিশ্রী ব্যঙ্গের হাসি!
এই কথা মনে হতেই কাপ্তেন হর্নিগোল্ড খেপে গিয়ে পিস্তল বাগিয়ে ধরে কুপিত কণ্ঠে বললেন, 'ওরে কালোদেড়ে শয়তান, আমাকে দেখে ঠাট্টা? মজাটা দেখবি নাকি?'
কিন্তু কোনও মজাই দেখানো হল না— ধাঁ করে তাঁর মনে পড়ে গেল একটা কথা। তাড়াতাড়ি গলার স্বর নামিয়ে তিনি বললেন, 'টিচ? তুমি কি এডওয়ার্ড টিচ?'
'সঠিক আন্দাজ! আমি এডওয়ার্ড টিচই বটে, দেশ আমার ব্রিস্টলে।'
'সবাই তোমাকে কালোদেড়ে বলে ডাকে তো?'
পলিতার আগুন তখন দাড়ির উপরে নেমে এসেছে এবং চারিদিক ভরে উঠেছে গন্ধকের গন্ধের সঙ্গে চুল-পোড়া দুর্গন্ধে! কালোদেড়ে তার শ্মশ্রুর বেণিগুলো তাড়াতাড়ি কাঁধের উপরে তুলে দিয়ে বললে, 'হ্যাঁ, আমি কালোদেড়েই বটে! একটু আগেই আপনি যা বলেছিলেন আমি শুনতে পেয়েছি। জাহাজের বেয়াড়া বেহেড লোকগুলোকে শায়েস্তা করবার জন্যে আপনার বেপরোয়া সহকারী দরকার?'
কালোদেড়ে কথা কইতে কইতে মিটমিট করে আড়চোখে তার দিকে চেয়ে বিদ্রুপের হাসি হাসছে দেখে তপ্ত হয়ে উঠল হর্নিগোল্ডের বুকের রক্ত! এমন দুঃসহ বেয়াদবি দেখলে যে-কোনও বোম্বেটে-জাহাজের মালিক তৎক্ষণাৎ তার মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু এই শ্রেণির একজন দুষ্ট ও ধৃষ্ট সহকারীর অভাবে তাঁর জাহাজ অচল হয়ে পড়েছে বলে মনের রাগ মনেই চেপে তিনি বললেন, 'তাহলে আমার জাহাজের অবাধ্য লোকগুলোর ভার আমি তোমার হাতেই সমর্পণ করলুম! কিন্তু তোমার ওই যাচ্ছেতাই জ্বলন্ত পলতেগুলো আর আমি সইতে পারছি না, ওগুলো নিভিয়ে ফেলো!'
তিন। আগন্তুকের স্বরূপ
উপযোগী বাতাস পেয়ে জাহাজ বন্দর ছেড়ে ভেসে চলল আমেরিকার দক্ষিণপূর্ব দিকে। দু-দিন পরেই কাপ্তেন হর্নিগোল্ডের বুঝতে বাকি রইল না যে, সহকারীরূপে যাকে তিনি নিযুক্ত করেছেন, দুর্বৃত্ততায় সে শয়তানেরই জুড়িদার বটে! কাপ্তেনের ঘরের আওতাতেই দাঁড়িয়ে সে নোংরা, অশ্রাব্য ভাষায় চেঁচিয়ে শপথ করে এবং টুপি থেকে ঝুলন্ত পলিতাগুলোকে আগুন লাগিয়ে যথেচ্ছভাবে যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই ছোড়ে ছয়-ছয়টা পিস্তল— কেউ হত বা আহত হল কি না তা নিয়ে মোটেই মাথা ঘামায় না! একে তো সেই বিপুলবপু, নরদানবের চেহারা দেখলেই পেটের পিলে চমকে যায়, তার উপরে তার পাশবিক গর্জন শুনে এবং পিস্তলগুলো নিয়ে মারাত্মক খেলা দেখে মহাপাষণ্ড বোম্বেটেগুলো পর্যন্ত আতঙ্কে থরহরি কম্পমান দেহে জাহাজের আনাচকানাচে গা-ঢাকা দেয় এবং তাদের মুখের ভাব যেন জাহির করতে চায়— ছেড়ে দে বাবা, কেঁদে বাঁচি!
কালোদেড়ের সামনে গেলে সকলেরই অবস্থা হয় ভীরু ভেড়ার মতো।
একদিন সে হাঁক ছেড়ে ডাক দিলে, 'এই রাবিশের দল, আজ আমরা এক নিজস্ব নরক তৈরি করব! দেখব কতক্ষণ আমরা নরকযন্ত্রণা সহ্য করতে পারি! চল সবাই জাহাজের নীচের তলায়!'
ধ্রুম, ধ্রুম, ধ্রুম! পিস্তলের পর পিস্তলের ধমক! ভয়ে কেঁচোর মতো বোম্বেটের দল নীচের তলায় গিয়ে হাজির হতে দেরি করলে না। তারপর দুমদাম করে বন্ধ করে দেওয়া হল সব দরজা। অগ্নিসংযোগ করা হল বড়ো বড়ো গন্ধকের কুণ্ডে। দাউদাউ করে আগুন জ্বলল না বটে, কিন্তু হু হু করে গন্ধকের ধোঁয়া বেরিয়ে ক্রমেই কুণ্ডলিত ও পুঞ্জীভূত হয়ে সেই রন্ধ্রহীন বদ্ধ জায়গাটাকে করে তুললে ভয়ংকর দুঃসহ! দৃষ্টি হয়ে যায় অন্ধ, শ্বাসপ্রশ্বাস হয়ে আসে রুদ্ধ, অন্তিমকাল মনে হয় আসন্ন! অমন যে বেপরোয়া, নিষ্ঠুর, হিংস্র ও নরঘাতক বোম্বেটের দল, তারাও হাঁচতে হাঁচতে, কাশতে কাশতে, হাঁপাতে হাঁপাতে ও মৃত্যুভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাঁটু গেড়ে কালোদেড়ের সামনে বসে পড়ে আর্তস্বরে চেঁচাতে লাগল— 'প্রাণ যায়, বাঁচাও! দরজা খুলে দাও, দরজা খুলে দাও, দরজা খুলে দাও!'
দুই হাতে দুটো করে পিস্তল ছুড়তে ছুড়তে কালোদেড়ে বিকটস্বরে অট্টহাস্য করে নেচে নেচে বলে উঠল, 'একবার নরকে ভরতি হলে আমার শয়তানদাদা আর তোদের ছুটি দেবে না— এই বেলা সময় থাকতে থাকতে নরকবাসের অভ্যাসটা করে নে রে!'
'গেলুম, গেলুম,— আর নয়! বাবা রে, দম বন্ধ হয়ে এল!'
তখন দরজা খুলে দিয়ে কালোদেড়ে গর্জন করে বললে, 'কেমন, এখন বুঝলি তো, এ জাহাজের আসল কর্তা কে?'
জাহাজের উপর থেকে কালোদেড়ের আস্ফালন শুনতে শুনতে কাপ্তেন হর্নিগোল্ডের বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি বুঝলেন, এমন সাংঘাতিক সহকারীর সঙ্গে সমুদ্রযাত্রা করা অতিশয় বিপজ্জনক। ভাবতে লাগলেন, এখন কোন উপায়ে এই নারকীয় পাল্লা থেকে ভালোয় ভালোয় ছাড়ান পাওয়া যায়?
চার। কালোদেড়ের বিদায়ি সেলাম
আরও কয়েকদিন যেতে-না যেতেই কাপ্তেনের ভয় আরও বদ্ধমূল হয়ে উঠল।
একদিন সমুদ্রে আবির্ভূত হল দুই-দুইখানা জাহাজ— তারা আসছে যথাক্রমে হাভানা ও বারমুডা থেকে।
হর্নিগোল্ডের জাহাজে অমনি উড়িয়ে দেওয়া হল হাড় ও মড়ার মাথা আঁকা কালো 'জলি রোজার' পতাকা।
আগন্তুক দুই জাহাজই সেই অশুভ পতাকা দেখে শিউরে উঠে আত্মসমর্পণ করলে বিনা বাক্যব্যয়ে।
হর্নিগোল্ড জাহাজ দুখানা নিঃশেষে লুণ্ঠন করলেন বটে, কিন্তু তাদের লোকজনদের অক্ষত দেহেই মুক্তি দিলেন। অকারণে তিনি রক্তপাতের পক্ষপাতী ছিলেন না।
কিন্তু কালোদেড়ে দারুণ ক্রোধে ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে গর্জন করে উঠল, 'ওদের সবাইকে ফেলে দাও সমুদ্রে, ওরা মাছেদের খোরাক হোক!'
হর্নিগোল্ড দৃঢ়স্বরে বললেন, 'এ জাহাজের কাপ্তেন হচ্ছি আমি, তুমি হুকুম দেওয়ার কেউ নও!'
কালোদেড়ে বললে, 'মরা মানুষ কথা কয় না, সাক্ষ্য দিতে পারে না। আমি কাপ্তেন হলে কখনো ওদের ছেড়ে দিতুম না।'
হর্নিগোল্ড বললেন, 'ভয় নেই, ভয় নেই। তুমি যাতে কাপ্তেন হতে পারো, শীঘ্রই আমি সে ব্যবস্থা করে দেব।'
কালোদেড়ের মুখে হাসি ফুটল বটে, কিন্তু সে হাসি হচ্ছে দস্তুরমতো বিষাক্ত।
বাসনা পূর্ণ হল না বলে মনের দুঃখ ভুলবার জন্যে সে সদ্যলুণ্ঠিত জাহাজ থেকে একটা মদের পিপে টেনে এনে নিজের দলের সবাইকে ডাক দিয়ে বললে, 'চলে আয় সব তৃষ্ণার্তের দল। পেট ভরে মদ খা আর প্রাণ ভরে ফুর্তি কর!'
জাহাজের উপরে বইল যেন মদের ঢেউ! কালোদেড়ের টুপি থেকে লম্বমান জ্বলন্ত পলিতাগুলোও দেখাতে লাগল যেন অভিনব দেওয়ালির বাঁধা-রোশনাই! মদে চুমুকের পর চুমুক দিতে দিতে বলতে লাগল, 'জানিস তোরা আমার বাহাদুরি? এ অঞ্চলের বারোটা বন্দরে আছে আমার এক ডজন বউ— আমি কি যে-সে লোক রে? দু-দিন সবুর করলেই দেখবি আমি হয়েছি নিজস্ব জাহাজের মালিক আর তার নাবিকরা হয়েছে পুরোপুরি আমারই তাঁবেদার!'
তার সাধ পূর্ণ হল দিনকয়েক পরেই।
সমুদ্রে ঢেউ কেটে এগিয়ে আসছে একখানা বাণিজ্যপোত।
বোম্বেটে জাহাজের কৃষ্ণপতাকা দেখেও তার লোকজনরা দমল না, লড়াই করবার জন্যে প্রস্তুত হতে লাগল।
কালোদেড়েও তো তা-ই চায়— মারামারি, রক্তারক্তি, খুনোখুনি! কাপ্তেন হর্নিগোল্ডকে ইচ্ছার বিরুদ্ধেও সায় দিতে হল।
বোম্বেটে জাহাজ থেকে হুংকার দিয়ে উঠল কামানের সারি এবং সঙ্গে সঙ্গে সায় দিয়ে তপ্ত বুলেট প্রেরণ করতে লাগল বন্দুকগুলোও! মড়মড় করে ভেঙে পড়ল বাণিজ্যপোতের কয়েকখানা তক্তা এবং শোনা গেল আহতদের সকরুণ আর্তনাদ!
দুই জাহাজ পাশাপাশি হতেই কান-ফাটানো ভৈরব গর্জন করে মহাকায় কালোদেড়ে মূর্তিমান অভিশাপের মতো লাফ দিয়ে পড়ল বাণিজ্যপোতের উপরে এবং শূন্যে বনবন করে ঘুরতে লাগল তার রক্তলোভী, শানিত ও বৃহৎ তরবারি! যারা বাধা দিতে এল তাদের কেউ প্রাণে বাঁচল না।
নিজের জাহাজে দাঁড়িয়ে কাপ্তেন হর্নিগোল্ড আশা করেছিলেন শত্রুবেষ্টিত কালোদেড়ে এ যাত্রা আর আত্মরক্ষা করতে পারবে না। এ কথাও ভেবেছিলেন, নিজেই পিস্তল ছুড়ে পথের কাঁটা দূর করবেন— কিন্তু হায়, পিস্তলের গুলি অতদূরে পৌঁছোবে বলে মনে হল না।
ব্যর্থ হল হর্নিগোল্ডের আশা! শোনা গেল কালোদেড়ের ষণ্ড-কণ্ঠের সঙ্গে অমান্য বোম্বেটেদের হইহুল্লোড়, জয়ধ্বনি। বাণিজ্যপোত অধিকৃত এবং তার লোকলশকর হল আহত বা বন্দি!
বন্দি যাত্রীদের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে কালোদেড়ে নির্দয় হুকুম দিলে, 'ওদের সমুদ্রে ফেলে দে, ওরা মাছেদের উপবাস ভঙ্গ করুক!'
যাত্রীদের কণ্ঠে কণ্ঠে জাগল গগনভেদী ক্রন্দনধ্বনি, কিন্তু সেদিকে কর্ণপাত না করে কালোদেড়ে বললে, 'এইবারে বন্দি নাবিকদের ব্যবস্থা কর! যারা আমাদের দলে যোগ দিতে না চাইবে, তারাও হবে মাছেদের খোরাক! আহত শত্রুগুলোকেও ওই সঙ্গে জলে ফেলে দে!'
চিৎকার ও হাহাকার কোনও কিছুতেই কান না পেতে বোম্বেটেরা কালোদেড়ের হুকুম তামিল করতে লাগল।
কালোদেড়ে চেঁচিয়ে হর্নিগোল্ডকে ডেকে বললে, 'শুনুন কাপ্তেন! এ জাহাজখানা এখন আমাদের!'
হর্নিগোল্ড বললেন, 'আমাদের নয় বাপু, খালি তোমার! আজ থেকে তুমি হলে কাপ্তেন টিচ!'
'কাপ্তেন'-এর পদে উন্নীত হয়ে কালোদেড়ের ওষ্ঠাধরের উপর দিয়ে হাসির ঝিলিক খেলে গেল বটে, কিন্তু মনে মনে সে সন্তুষ্ট হল না। এখানা হচ্ছে মাত্র 'স্লুপ' (এক মাস্তুলের ছোটো জাহাজ), সে চায় বহু বড়ো বড়ো জাহাজের বহর চালনা করতে। হর্নিগোল্ডের জাহাজখানাও 'স্লুপ' শ্রেণিভুক্ত।
কয়েকদিনের বিশ্রাম। তারপর আবার নতুন শিকারের সন্ধানে সমুদ্রযাত্রা।
দুই দিনের মধ্যেই জুটল এক পরম লোভনীয় শিকার— একখানা মস্ত বড়ো ফরাসি জাহাজ!
চোখে-কানে ভালো করে কিছু দেখবার ও শোনবার আগেই বোম্বেটেদের জাহাজ দুখানা তিরবেগে তার দুইপাশে গিয়ে একসঙ্গে প্রচণ্ড গোলাগুলি বৃষ্টি করতে লাগল— ফরাসি জাহাজখানার অবস্থা হল টলমল, দলে দলে মাল্লা মৃত ও জখম হয়ে লুটিয়ে পড়ল এবং তারপরই দেখা গেল, এক রোমশ নরদানবের পিছনে পিছনে বোম্বেটেরা দলে দলে উঠছে আক্রান্ত জাহাজের পাটাতনের উপরে। তখনও যেসব হতভাগ্য জীবন্ত ছিল তারাও জাহাজের পাটাতন থেকে নিক্ষিপ্ত হয়ে সশরীরে করলে পাতালপ্রবেশ!
কালোদেড়ে তৎক্ষণাৎ সেই নতুন ও প্রকাণ্ড জাহাজের নাম রাখলে— 'প্রতিহিংসা'!
তারপর জলের ধারে গিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললে, 'ওহে নরকের খোকা হর্নিগোল্ড! তোমার ওই পুঁচকে খেলো জাহাজকে আমি এইখান থেকেই বিদায়ি সেলাম ঠুকছি! আমি নিজের পছন্দমাফিক জাহাজ পেয়েছি, তোমাকে এর মালপত্তরেরও ভাগ দেওয়া হবে না— হে হে হে হে, বুঝলে বাপু?'
কাপ্তেন হর্নিগোল্ড কোনও জবাব দিলেন না, নিজের জাহাজের মুখ ঘুরিয়ে আবার ফিরে চললেন নিউ প্রভিডেন্সের দিকে। বোম্বেটেগিরিতে তাঁর ঘৃণা ধরে গিয়েছে, তিনি এই নিষ্ঠুর ও নিকৃষ্ট ব্যবসায় ছেড়ে দেবেন।
পাঁচ। পলাতক রণতরি
কালোদেড়ের নাম লোকের মুখে মুখে ফিরতে দেরি লাগল না।
প্রথমেই তার কবলগত হল একখানা ইংরেজ জাহাজ— 'গ্রেট আলেন'।
তারপরেই প্রমাণিত হল কালোদেড়ে যে-সে সাধারণ বোম্বেটে নয়! সে কেবল আত্মরক্ষায় অক্ষম সওদাগরি জাহাজ দেখলেই তেড়ে এসে হাতিয়ার হাঁকড়ায় না এবং রণতরির সামনে পড়লেই চটপট চম্পট দিয়ে প্রাণ বাঁচাবার চেষ্টা করে না।
'স্কারবরো' হচ্ছে ইংরেজদের বৃহৎ যুদ্ধজাহাজ, তার পাটাতনে সাজানো সারে সারে ভারী ভারী কামান এবং তার নৌসেনাদের প্রত্যেকেই বন্দুকের অধিকারী।
হঠাৎ 'স্কারবরো' গিয়ে হাজির বোম্বেটের 'প্রতিহিংসা'র সামনে।
যুদ্ধজাহাজের নায়ক বরাবরই দেখে এসেছেন, রণতরির সম্মুখীন হলেই বোম্বেটেরা তাড়াতাড়ি জাহাজের সব পাল খাটিয়ে দিয়ে বাঘের সামনে ভীরু হরিণের মতো পালাবার চেষ্টা করে। সেই চেষ্টা ব্যর্থ করবার জন্যে তিনি আগে থাকতেই নিজের জাহাজের সব পাল তুলে দিয়ে কামান দাগতে দাগতে বেগে এগিয়ে গেলেন।
কিন্তু কী আশ্চর্য, 'প্রতিহিংসা' পালাবার কোনও চেষ্টাই করলে না!
মুখভরা হাসি নিয়ে নিজের জাহাজের পাটাতনের উপরে অচল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কালোদেড়ে, তার বেণিবদ্ধ শ্মশ্রু দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে দুই স্কন্ধের উপরে নিক্ষিপ্ত, তার টুপিতে সংলগ্ন প্রজ্বলিত পলিতাগুলো অগ্নিসর্পশিশুর মতো জোর হাওয়ায় দিকে দিকে ছিটকে পড়ে যেন ছড়িয়ে দিচ্ছে আগুনের হলকা!
বোম্বেটে গোলন্দাজরাও কামানে অগ্নিসংযোগ করতে উদ্যত হল।
কালোদেড়ে বললে, 'আর-একটু সবুর করো, এখনও কামান দাগার সময় হয়নি। ওদের আরও কাছে আসতে দাও।'
তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে সে দেখতে লাগল, দুই জাহাজের মাঝখানকার দূরত্ব ক্রমেই কমে আসছে! তারা প্রায় সামনাসামনি এসে পড়ল অবশেষে।
আচম্বিতে শূন্যে তরবারি চালনা করে কালোদেড়ে হুংকার দিয়ে হুকুম দিলে, 'সময় হয়েছে! কামান ছোড়ো!'
'প্রতিহিংসা'র সমস্ত কামান একসঙ্গে গর্জন করে উঠল— গুড়ুম, গুড়ুম, গুড়ুম, গুড়ুম!
যুদ্ধজাহাজ 'স্কারবরো' প্রথম আক্রমণেই বেধড়ক মার খেয়ে একেবারে কাত হয়ে পড়ল! বিপুল বিস্ময়ে নৌসেনানায়ক কোনওরকমে নিজের রণতরি সামলে নিয়ে সেখান থেকে তাড়াতাড়ি সরে পড়ে নিজেদের মানরক্ষা করতে না পারলেও রক্ষা করলেন পৈতৃক প্রাণগুলো!
বোম্বেটে-জাহাজের পিছনকার সব চেয়ে উঁচু পাটাতনের উপরে দেখা গেল— গগনভেদী চিৎকারে দিগবিদিক কাঁপিয়ে বিরাটবপু কালোদেড়ে ইংরেজ নৌসেনাদের উপরে গালাগালি ও অভিশাপ বর্ষণ করছে এবং মাথার উপরে বনবনিয়ে তরবারি ঘোরাতে ঘোরাতে কখনো লাফ মারছে শূন্যপথে ও কখনো মেতে উঠছে তাণ্ডবনৃত্যে।
ছয়। গৌরবের তুঙ্গশিখরে
ইংরেজ রণতরিকে হারিয়ে দেওয়ার পর কালোদেড়ের খাতিরের সীমা রইল না। তার নাম শুনলেই দেহপিঞ্জর ছেড়ে ভয়ে উড়ে যেতে চায় লোকের প্রাণপাখি! বিশেষত মালবাহী জাহাজি কাপ্তেনদের দুর্ভাবনার অন্ত নেই। যার দেখা পেলে যুদ্ধে নিরস্ত হয়ে পিটটান দেয় ইংল্যান্ডরাজের সশস্ত্র ও সসজ্জ রণতরি, তার সঙ্গে মুখোমুখি হলে নিরস্ত্র ও নির্বল সওদাগরি জাহাজ কতটুকু বাধা দিতে পারে?
না, বাধা দিতে পারেনি সত্য সত্যই। আর এই সত্য বোঝা গেল কিছুদিন যেতে-না যেতেই। কারণ উপরি-উপরি কয়েকখানা জাহাজ বন্দি করে কালোদেড়ে হয়ে দাঁড়াল রীতিমতো এক নৌবহরের অধিকারী। যেসব জাহাজ উল্লেখযোগ্য মনে হল না, সেগুলোকে সে বিনা বাক্যব্যয়ে ডুবিয়ে দিলে মহাসাগরের অতল পাতালে! সফল হল কালোদেড়ের বহুদিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা— তার তাঁবে এখন এসেছে সত্য সত্যই নৌবহর! কোনও সওদাগরি জাহাজ আজ অস্ত্রবলে বলীয়ান হলেও তার সঙ্গে আর পাল্লা দিতে পারবে না!
বন্দি বা ধৃত জাহাজের অসংখ্য লোক প্রাণ দিলে বোম্বেটেদের বন্দুক বা অন্যান্য অস্ত্রের মুখে। তুলনায় তাদের ভাগ্য ভালোই বলতে হবে। কিন্তু যারা মরল না এবং যারা জখম হয়েও বেঁচে রইল তাদের পরিণাম হল মর্মবিদারক। কালোদেড়ের নিদারুণ নির্দেশে সাগরে ঝাঁপ খেতে বাধ্য হয়ে তাদের প্রত্যেকেই লাভ করলে সজ্ঞানে সলিলসমাধি! ভালোয় ভালোয় আত্মসমর্পণ করেও বাঁচোয়া নেই, কেঁদেকেটে হাতে-পায়ে ধরে ক্ষমা চাওয়াও ব্যর্থ— কালোদেড়ের পাষাণ হৃদয়ে কেউ দেখেনি দয়ামায়ার ছিটেফোঁটাও! তার মুখে শোনা যায় একই ধরনের উক্তি, 'ওদের জোর করে ছুড়ে ফেলে দে সমুদ্রে! হোক ওরা মাছেদের খোরাক— করুক ওরা হাঙরদের উদরপূরণ!'
সে সময় অসীম সাগরের আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে কত হাজার মানুষের তীব্র ক্রন্দনধ্বনি শুনে চমকিত হয়ে উঠেছিল প্রতিধ্বনির পর প্রতিধ্বনি, কোথাও তার কোনও হিসাব লেখা নেই!
তার দুষ্কর্মের সাক্ষ্য হতে পারে এমন কোনও মানুষ বা জাহাজের অস্তিত্ব রক্ষা করা কালোদেড়ের কাছে ছিল দস্তুরমতো নির্বুদ্ধির কাজ।
সাত। কালোদেড়ের নতুন বউ
এক জাহাজের অধ্যক্ষকে বলে 'কাপ্তেন' এবং একাধিক জাহাজের অধ্যক্ষ 'কমোডোর' নামে পরিচিত। কালোদেড়ে গ্রহণ করলে উচ্চতর 'কমোডোর' উপাধি।
সে বললে, 'আহা, আজ আমার মা বেঁচে থাকলে পুত্রের গৌরবে হতেন গৌরবিনী!'
কিন্তু মা পরলোকে গেলেও ইহলোকে বসে এতটা গৌরব চুপচাপ ধাতস্থ করাও যায় না। অতএব সে নির্দেশ দিলে, 'উৎসব করো!'
কালোদেড়ের বোম্বেটে-শাস্ত্রে উৎসবের অর্থ হচ্ছে নারকীয় কাণ্ড। সাগরের দিকে দিকে তার নৌবহরের গোলন্দাজরা সমস্ত কামান থেকে ক্রমাগত অগ্নিবৃষ্টি করে দেখাতে লাগল বিরাট ও ভয়ংকর আগ্নেয় দৃশ্য!
দৈবগতিকে ও দুর্ভাগ্যক্রমে যারা তথাকথিত উৎসবের সেই অগ্ন্যুৎপাতের মধ্যে এসে পড়ল, তারা যে কেউ ধনেপ্রাণে রক্ষা পেলে না, সে কথা বলাই বাহুল্য। একে একে জলে ডুব মারলে চার-চারখানা লুণ্ঠিত জাহাজ।
তারপর নামে উৎসব শেষ হল বটে, কিন্তু জলপথে ছুটোছুটি করে জাহাজের পর জাহাজের উপরে হানা দিয়ে লুঠতরাজ, রক্তপাত ও নরহত্যা প্রভৃতি পৈশাচিক কাণ্ড চলল অবিশ্রান্ত।
কালোদেড়ে ধনী যাত্রীদের কিন্তু প্রাণে মারত না, বন্দি করত। বন্দরে পৌঁছে আত্মীয়দের কাছে খবর পাঠিয়ে প্রচুর টাকা মুক্তিমূল্য আদায় না করে তাদের ছেড়ে দেওয়া হত না। বলা বাহুল্য, ইতিমধ্যে ধনী বন্দিদের জড়োয়া গহনা ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিস লুণ্ঠিত হয়ে উঠত গিয়ে কালোদেড়ের প্রশস্ত ভাণ্ডারে। এইভাবেও সে প্রভূত ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়েছিল।
ওই অঞ্চলে সমুদ্রের চারিদিকে আছে অসংখ্য ছোটো ছোটো দ্বীপ। সেইসব নামহীন দ্বীপে কোনও মানুষ বাস করে না, তাদের কোথায় কী আছে তাও কেউ জানে না। প্রবাদ, এমনই কোনও অজানা দ্বীপে কালোদেড়ে এডওয়ার্ড টিচ তার বিপুল ঐশ্বর্য লুকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু সেই গুপ্তধনের ঠিকানা কেউ আদায় করতে পারেনি।
কালোদেড়ে বলত, 'আমি আর শয়তান ছাড়া আমার গুপ্তধনের ঠিকানা আর কারো জানা নেই।'
তার বসনভূষণও এখন জাহির করে প্রচুর জাঁকজমক। তার হাতের প্রত্যেক আঙুলে শোভা পায় হিরা-পান্না-বসানো আংটি। তার গলায় দোলে অনেকগুলো সোনার হারের লহর। তার বুকের বন্ধনীতে ঝোলে এখন নূতন যে তিনজোড়া পিস্তল, তাদের নলচেগুলো রুপো দিয়ে গড়া এবং তাদের কুঁদোগুলো মূল্যবান প্রস্তর দিয়ে অলংকৃত।
কালোদেড়ের এক প্রধান সহকারী ও প্রিয়পাত্র ছিল ইস্রায়েল হ্যান্ডস। একদিন তাকে ডেকে সে চুপি চুপি বললে, 'আমাদের দল কি অতিরিক্ত ভারী হয়ে পড়েনি?'
'নিশ্চয়! এত লোককে লাভের অংশ দিতে দিতে আমাদের নিজেদের আয়ের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।'
'ঠিক ধরেছ হ্যান্ডস। তাহলে কৌশলে অংশীদারের দল হালকা করে ফেলা যাক!'
বিভিন্ন ওজর দেখিয়ে দুইবারে দুই দল লোককে বিভিন্ন বিজন দ্বীপে নামিয়ে দিয়ে বাছা বাছা লোক নিয়ে কালোদেড়ে দূর সমুদ্রে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল— একবারও ভেবে দেখলে না যে, এতদিন বিশ্বস্তভাবে যারা তার হুকুম মেনে এসেছে, জনহীন অজানা দ্বীপে পরিত্যক্ত হয়ে তাদের দুরবস্থা উঠবে কতখানি চরমে! পরে সে কেবল এইটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে হালকা দল নিয়ে কাজ করলে পকেট বেশি ভারী হয় বটে, কিন্তু আত্মরক্ষার দিক দিয়ে সৃষ্টি হয় গুরুতর সমস্যা!
বৎসরকালব্যাপী লুঠতরাজ ও নরমেধ যজ্ঞের পর আটলান্টিক মহাসাগর ও তার তীরবর্তী দেশগুলো যখন হয়ে উঠেছে প্রায় অরাজক ও হত্যা-হাহাকারে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত এবং সবাই যখন দুঃখে-শোকে-ক্রোধে একান্ত মরিয়া হয়ে কালোদেড়ের বিরুদ্ধে একবাক্যে করেছে বিদ্রোহ ঘোষণা, তখন সে একদিন অম্লানবদনে বললে, 'হ্যান্ডস, চলো নর্থ ক্যারোলিনার দিকে। দিনরাত খালি জল আর জল দেখতে আমার আর ভালো লাগছে না!'
'জল দেখা ছাড়া আর উপায় কী? স্থলে নামলেই তো আমাদের ধরা পড়ে ফাঁসিকাঠের দোলনায় দুলতে হবে!'
'কুছ পরোয়া নেই। আমরা ফাঁসির দোলনায় দুলব না— রাজার কাছে মার্জনা ভিক্ষা করব।'
হ্যান্ডস সবিস্ময়ে বলে উঠল, 'বলেন কী, কর্তা? মার্জনা ভিক্ষা? কে আমাদের মার্জনা করবে?'
'গভর্নর চার্লস ইডেন আমাদের হাসিমুখে মার্জনা করবেন।'
'বলেন কী, হাসিমুখে?'
'হ্যাঁ। গভর্নর ইডেন বড়ো ভালো লোক হে। যুক্তি মানেন। আমার যুক্তি কী জানো ভায়া? উৎকোচ! ঘুসখোরকে বশ করা মোটেই কঠিন নয়।
নর্থ ক্যারোলিনা হচ্ছে আমেরিকার আটলান্টিক সাগরতীরের একটি প্রদেশ। সেই প্রদেশের বাথ নগরে বাস করেন ইংল্যান্ডের রাজপ্রতিনিধি চার্লস ইডেন। কালোদেড়ের জাহাজ গিয়ে নোঙর ফেললে সেইখানেই।
মানুষ চিনতে ভুল করেনি কালোদেড়ে। গভর্নর ইডেন তার যুক্তি অকাট্য বলেই মেনে নিলেন। উচিতমতো উৎকোচ হজম করে তিনি কালোদেড়ের সমস্ত অপরাধ কেবল রাজার নামে ক্ষমাই করলেন না, উপরন্তু তার সঙ্গে জমে উঠল তাঁর দস্তুরমতো দোস্তি— যাকে বলে দহরম মহরম আর কী! সবাই অবাক! হতভম্ব!
বাথ শহরের একটি মেয়েকে দেখে কালোদেড়ের ভারী পছন্দ হল। তৎক্ষণাৎ সে করলে বিবাহের প্রস্তাব। কন্যাও নারাজ নয়। তখন সদাশয় গভর্নর বললেন, 'আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এই শুভকার্য সম্পন্ন করব।'
এটি কালোদেড়ের ত্রয়োদশ কি চতুর্দশ বিবাহ তা ঠিক করে বলা যায় না। বিবাহে নিতবরের আসন গ্রহণ করলে গভর্নরের সেক্রেটারি টোরিয়াস নাইট। খুব ঘটা করে শুভকার্য সম্পন্ন হল বটে, তবে শহরের বনিয়াদি বংশের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ আমন্ত্রিত হয়েও উৎসবে যোগদান করলেন না।
কিন্তু কালোদেড়ে তাঁদের উপরেও নিলে একহাত! খুব জমকালো সাজপোশাক পরে সে স্ত্রী-কে সঙ্গে নিয়ে একে একে বিখ্যাত সম্ভ্রান্তবংশীয়দের বাড়িতে গিয়ে হাজির হয় আর দারোয়ান ও খানসামাদের ডেকে বলে, 'তোমাদের মনিবকে গিয়ে খবর দাও, স্বয়ং শ্রীমতী টিচ দ্বারদেশে অপেক্ষা করছেন।'
দারোয়ান ও খানসামাদের ইতস্তত করতে দেখলেই কালোদেড়ে তার রত্নখচিত ও রুপোয় বাঁধানো পিস্তলগুলো গুড়ুম গুড়ুম শব্দে ছুড়তে শুরু করে দেয়, দিকে দিকে বোঁ বোঁ করে ছুটতে থাকে গরমাগরম বুলেট এবং দারোয়ান ও খানসামারা হয় ভয়ে থরহরি কম্পমান। তারপরেই দরজা খুলতে ও গৃহস্বামীর আতিথ্যলাভ করতে বিলম্ব হয় না। কালোদেড়ে বার বার এইভাবে প্রমাণিত করলে সেই পুরাতন সত্য কথাটাই— জোর যার, মুলুক তার!
এখানে এসেও কিন্তু কালোদেড়ে নদীপথে বোম্বেটেগিরি ছাড়ল না— বহু জাহাজ থেকে মালপত্তর ও ধনরত্ন লুণ্ঠিত হতে লাগল এবং বলা বাহুল্য যে, গোপনে তার লাভের অংশ থেকে বঞ্চিত হলেন না স্বয়ং গভর্নরও!
জাহাজের মালিকদের কাছ থেকে অভিযোগ এলে গভর্নর ইডেন মুখে যথেষ্ট সহানুভূতি প্রকাশ করলেও কাজে কিছুই করেন না। জাহাজের মালিকরা শেষটা এখানে হতাশ হয়ে পার্শ্ববর্তী প্রদেশ ভার্জিনিয়ার গভর্নর স্পটসউডের কাছে গিয়ে নিজেদের জরুরি নালিশ জানালেন।
ফল পাওয়া গেল হাতে হাতে। গভর্নর স্পটসউড তৎক্ষণাৎ ঘোষণা করে দিলেন যে কালোদেড়েকে গ্রেপ্তার বা বধ করতে পারবে, তাকেই হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। সঙ্গে সঙ্গে ইংল্যান্ডের নৌবহরের দক্ষ যোদ্ধা লেফটেন্যান্ট রবার্ট মেনার্ডের উপরে হুকুম জারি হল, তিনি যেন অবিলম্বে কালোদেড়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন।
গভর্নর ইডেনের সেক্রেটারি টোরিয়াসও কালোদেড়ের কাছ থেকে অল্পবিস্তর ঘুস খেয়ে তার ভক্ত হয়ে পড়েছিল। ইংরেজ নৌসেনাদের এই যুদ্ধ-প্রস্তুতির কথা শুনেই সে প্রমাদ গুনে বোম্বেটের কাছে তাড়াতাড়ি খবর পাঠিয়ে দিলে।
আট। শয়তানি ফুর্তি
কিন্তু খবর পেয়েও কালোদেড়ে কিছুমাত্র দমল না বা ভীত হল না। নিজের দলের সবাইকে ডেকে অবহেলা ভরে বললে, 'ওহে শুনেছ? টোরিয়াস চিঠি লিখে জানিয়েছে যে, রাজার সৈন্যরা নাকি আমাদের শাস্তি দিতে আসছে। জাহান্নামে যাক রাজা! যারা আসতে চায় আসুক তারা! আমি তো জাঁকিয়ে বসে আছি নিজের আড্ডায়— সিংহের গহ্বরে ঢুকে ফেরুপাল কী করতে পারে?'
তখন সন্ধ্যাকাল। হ্যান্ডস ও আরও দুইজন বোম্বেটেকে নিয়ে কালোদেড়ে নিজের কামরার ভিতরে প্রবেশ করে খুব খুশিমুখে বললে, 'আবার লড়াই হবে— কী মজা রে, কী মজা! ঢালো মদ, প্রাণ ভরে পান করো— আজ আমাদের আনন্দের দিন! দেখা যাক, কে কত বেশি মদ খেতে পারে!'
একটা টেবিলের চারিদিক ঘিরে বসে চারজনে মিলে মদ্যপান শুরু করে দিলে। বাতির আলোতে খালি কালোদেড়ের গলার হার ও আঙুলের আংটিগুলো নয়, মুখের দাড়ি-গোঁফের ঘন জঙ্গলের ভিতর থেকে তার খুদে খুদে চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলছিল— এবং জাহির করছিল যেন কোনও নির্দয় কৌতুকের রহস্যময় ইশারা!
শয়তানের কাছে গিয়ে শয়তানি ছাড়া আর কী আশা করা যায়? বোধ করি সেই কারণেই প্রচুর মদ্যপান করেও জনৈক চালাক বোম্বেটে নেশায় ঝিমিয়ে পড়েনি— নিজের দৃষ্টিকে রেখেছিল অত্যন্ত জাগ্রত!
হঠাৎ সে দেখলে, কালোদেড়ের দুটো পিস্তলসুদ্ধ দুখানা হাত ধীরে ধীরে টেবিলের তলায় গিয়ে ঢুকল। সে চটপট উঠে দাঁড়িয়ে একটা ওজর দেখিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল উদ্ভ্রান্তের মতো।
অকস্মাৎ বিকট চিৎকার করে কালোদেড়ে এক ফুঁয়ে নিবিয়ে দিলে বাতিটা এবং অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে ছুড়লে তার পিস্তল দুটো! তারপরেই আগ্নেয়াস্ত্রের গর্জন ও ভয়াবহ আর্তনাদ এবং একটা ভারী দেহপতনের শব্দ!
তাড়াতাড়ি আলো জ্বেলে দেখা গেল, হ্যান্ডস দুই হাতে হাঁটু চেপে যন্ত্রণায় ছটফট করছে এবং তার আহত হাঁটু থেকে হু হু করে বেরোচ্ছে রক্তের ধারা!
একজন বোম্বেটে জিজ্ঞাসা করল, 'এর অর্থ কী?'
হা হা করে হাসতে হাসতে কালোদেড়ে বললে, 'এর অর্থ হচ্ছে, মাঝে মাঝে এক-একজনকে শাস্তি না দিলে সবাই ভুলে যাবে যে, এ জাহাজের আসল কর্তা কে?' তারপর সে হেঁট হয়ে পড়ে বললে, 'চলো এসো হ্যান্ডস, চলে এসো— তোমার বিশেষ কিছু হয়নি বাপু! হাঁটুর উপরে একটা ছোটো ছ্যাঁদা বই তো নয়, শহরে গিয়ে ডাক্তার দেখালেই দু-দিনে সেরে যাবে— কী বলো হ্যান্ডস?'
কিন্তু হ্যান্ডস কিছুই বললে না, পরদিন সকালেই তাকে দোলায় তুলে শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হল।
নয়। কালোদেড়ের প্রভাতি ভোজ
ওদিকে তরুণ নৌসেনাপতি লেফটেন্যান্ট মেনার্ড প্রস্তুত হচ্ছিলেন যুদ্ধের জন্যে।
বোম্বেটেদের জাহাজ তখন বাহির-সমুদ্রে ছিল না, একটা খাঁড়ির (স্থলভাগে প্রবিষ্ট সমুদ্রের অপ্রশস্ত অংশ) ভিতরে গিয়ে নোঙর ফেলে যুদ্ধের জন্যে অপেক্ষা করছিল।
মেনার্ড বুঝলেন, তাঁর অধীনে 'নাইম' ও 'পার্ল' নামে যে দুখানা প্রকাণ্ড রণতরি আছে, গভীর সাগরের আনাগোনার উপযোগী করে তারা গঠিত। একে তো খাঁড়ির জলপথ সংকীর্ণ, উপরন্তু চড়া পড়েছে তার যেখানে-সেখানে— বড়ো জাহাজ ঢুকলেই চড়ায় আটকে অচল ও অকেজো হয়ে পড়বে।
কালোদেড়ের চালাকি বুঝে নিয়ে রণকুশল মেনার্ড তার ফাঁদে ধরা পড়তে রাজি হলেন না। তিনি 'স্লুপ' বা এক মাস্তুলের দুখানা অপেক্ষাকৃত ছোটো ও হালকা জাহাজ নির্বাচন করলেন— তারা অগভীর জলেও চলাফেরা করতে পারবে অনায়াসেই। তার উপরে তাদের আরও হালকা করবার জন্যে ভারী ভারী কামানগুলোও সরিয়ে ফেলা হল। পরিবর্তে আমদানি করা হল গাদি গাদি বন্দুক— বড়ো কামানের অভাব পূরণ করবে তাদের সংখ্যাধিক্যই!
খবর নিয়ে জানা গেল, বোম্বেটেদের দলে পঁচিশজনের বেশি লোক নেই, কারণ কালোদেড়ে অতিরিক্ত লাভের লোভে দল অতিশয় হালকা করে ফেলেছে। মেনার্ড সঙ্গে নিলেন প্রায় পঞ্চাশজন সৈন্য। পঞ্চাশজন বন্দুকধারীর সামনে দাঁড়ালে পঁচিশজনকে পড়তে হবে যারপরনাই বেকায়দায়— এই ছিল তাঁর ধ্রুবধারণা।
অপরাহ্নকাল।
খাঁড়ির বাঁকের মুখে আচম্বিতে দেখা গেল দুখানা জাহাজের মাস্তুলের চূড়া।
বোম্বেটে জাহাজের প্রহরী চেঁচিয়ে উঠে বললে, 'হুঁশিয়ার! দুখানা জাহাজ আসছে!'
লাফ মেরে পাটাতনের উপরে উঠে কালোদেড়ে একনজরে যা দেখবার সব দেখে নিয়ে বললে, 'হুঁ, রাজার অভিযান! কিন্তু আমার আসার মজাটা ওদের ভালো করেই টের পাইয়ে দেব। বাছারা ঘুঘু দেখেছে, ফাঁদ তো দেখেনি!' সে তখনও জানত না তার ফাঁদ আছে মেনার্ডের নখদর্পণে!
রাজার জাহাজ কাছে এসে পড়ল।
কালোদেড়ে হাঁকলে, 'কে তোমরা?'
মেনার্ড উত্তরে ধীরস্বরে বললেন, 'টের পাবে অবিলম্বেই।'
তিনি তীক্ষ্ন দৃষ্টি চালনা করে বুঝলেন যে, বোম্বেটেদের জাহাজখানা আকারে তাঁদের চেয়ে বিশেষ বড়ো না হলেও ওর মধ্যে নিশ্চয়ই গাদাগাদি করা আছে কামানের পর কামান। ওখানাও এমন হালকাভাবে তৈরি যে এই বিপদসংকুল অগভীর জলেও অনায়াসেই আনাগোনা করতে পারে।
ভ্রূ কুঞ্চিত করলেন মেনার্ড। ওদের পোতপার্শ্বের কামানগুলোর দারুণ অগ্নিবৃষ্টিতে মুষড়ে পড়লে চলবে না, তাঁকে একেবারে বোম্বেটে-জাহাজের পাশাপাশি গিয়ে পড়ে মুষলধারে গুলিবৃষ্টি করে প্রথমেই শত্রুদের রীতিমতো অভিভূত করে ফেলতে হবে। সৈন্য ও বন্দুকের সংখ্যাধিক্যের উপরেই তাঁর প্রধান ভরসা।
কিন্তু জলে এখন ভাটার টান, সময়টা এখানকার যুদ্ধের পক্ষে উপযোগী নয়। জোয়ারের জন্যে কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে— এই স্থির করে মেনার্ড আজকের মতো নোঙর ফেলবার হুকুম দিলেন।
সেদিন রাতে বারে বারে মাতাল কালোদেড়ে পাটাতনের উপরে ছুটে এসেছিল এবং ভয়ানক গলাবাজি করে জানিয়েছিল, 'ওরে রাজার চাকরগুলো, কাল প্রভাতি খানার সময় তোদের সকলকেই হতে হবে আমার শখের জলখাবার!'
মেনার্ড একবার খেপে গিয়ে উত্তরে বলেছিলেন, 'ওরে শুয়োর, শোন! তোর ওই নোংরা উকুনভরা কালো দাড়িতে পেরেক মেরে তোকে আমার জাহাজের গায়ে লটকে দেব— এই আমার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা!'
রাজার জাহাজে নোঙর ফেলা হচ্ছে দেখে কালোদেড়ে আন্দাজে বুঝে নিলে যে, আপাতত বোম্বেটেরা নিরাপদ, কারণ সুচতুর শত্রুরা ভাটার সময়ে অগভীর জলে জাহাজ চালিয়ে বিপদে পড়তে চায় না। সকালে জোয়ার আসার সঙ্গে সঙ্গেই শত্রুপক্ষের আক্রমণ শুরু হবে।
সে একজন বোম্বেটেকে কাছে ডেকে এনে, একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে তার চোখের কাছে নাড়তে নাড়তে ফিসফিস করে বললে, 'ওরে মুখ্যু, ভালো করে শুনে রাখ! যদি দেখিস আমরা হেরে যাচ্ছি আর রাজার সেপাইরা আমাদের জাহাজের উপরে উঠে পড়েছে, তখনই দেশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে আমাদের বারুদখানায় আগুন লাগিয়ে দিবি! তারপর কী মজা হবে জানিস তো? দড়াম করে এক দুনিয়া-কাঁপানো ধুন্ধুমারের সঙ্গে সঙ্গেই আমরা সবাই মিলে সরাসরি গিয়ে নরক গুলজার করে তুলব! কী রে, পারবি তো?'
এই ভয়ানক প্রস্তাব শুনে বোম্বেটে বাবাজির আত্মা শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম! মুখরক্ষা করবার জন্যে তবু সে কোনওরকমে মাথা নেড়ে সায় দিলে।
কালোদেড়ে বললে, 'যা তবে! বারুদখানায় গিয়ে প্রস্তুত হয়ে থাক! কাল এসপার কি ওসপার!'
বোম্বেটে দুরুদুরু বুকে কাঁপতে কাঁপতে প্রস্থান করল।
চাঁদ উঠল। জ্যোৎস্না ফুটল। মদে শুকনো গলা ভিজিয়ে নেওয়ার জন্যে কালোদেড়ে নিজের কামরার দিকে ছুটল এবং যেতে যেতে আর-একবার গর্জিত কণ্ঠে জানিয়ে দিয়ে গেল যে— 'ওরে রাজার দাসানুদাসের দল! শুনে রাখ তোরা! রাত পোয়ালেই আমি তোদের হাড় খাব, মাংস খাব আর চামড়া নিয়ে ডুগডুগি বাজাব— হা হা হা হা হা হা!'
দশ। যুদ্ধজাহাজের দুর্দশা
উষার সিঁদুর-মাখা আকাশ ঢেকে রাখতে পারলে না পাতলা কুয়াশার পরদা। খাঁড়ির বুকে এসেছে জোর জোয়ার। জলে জেগেছে কলকল করে কলহাস্য!
রাজার জাহাজজোড়া এগিয়ে আসছে ধীরে, ধীরে, ধীরে।
মেনার্ড নিজের লোকজনদের ভরসা দিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে বলছিলেন, 'কোনও ভয় নেই— আগে চলো, আগে চলো ভাই! বোম্বেটেরা বড়ো জোরে একবার কি দুইবার কামান ছোড়বার ফুরসত পাবে, তার পরেই আমরা ছুটে গিয়ে হুড়মুড় করে তাদের ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব, দেখব তখন পঁচিশটা বন্দুক কেমন করে সামলায় পঞ্চাশটা বন্দুকের ঠেলা! আগে চলো!'
এতক্ষণ পরে কালোদেড়ের মন দোলায়মান হল সন্দেহদোলায়। কুয়াশার ফিনফিনে পরদা ফুঁড়ে দেখা যাচ্ছে, রাজার জাহাজ দুখানা এগিয়ে আসছে— ক্রমেই এগিয়ে আসছে তার দিকে। ঘনায়মান বিপদ! একেবারে শেষ মুহূর্তেই সে আন্দাজ করতে পারলে, শত্রুরা দলে তার চেয়ে দু-গুণ বেশি ভারী। সে স্থির করলে, জাহাজ নিয়ে খাঁড়ির ভিতরে আরও দুর্গম অংশে গিয়ে আশ্রয় নেবে। সে চেঁচিয়ে হুকুম দিলে 'নোঙর তোলো, নোঙর তোলো!'
কিন্তু সময় নেই— সময় নেই! শত্রু যে শিয়রে! পালাবার পথ যে বন্ধ!
কালোদেড়ে কামান দেগে পথের বাধা দূর করতে চাইলে— হ্যাঁ, এই হচ্ছে বাঁচবার একমাত্র উপায়।
প্রচণ্ড চিৎকারে শোনা গেল তার চরম আদেশ— 'কামান ছোড়ো, একসঙ্গে সব কামান ছোড়ো। আগুনের ঝড়ে উড়িয়ে দাও সামনের সব প্রতিবন্ধক!'
কর্ণভেদী বজ্রনাদ ধ্বনিত করে সোঁ সোঁ শব্দে বাতাস কেটে তীব্র বেগে ছুটে গেল সেই সর্বনাশা অগ্নিপিণ্ডগুলো— কিন্তু হায় রে হায়, তারা রাজার জাহাজকে স্পর্শ করবার আগেই জলের ভিতরে ঝুপ ঝুপ করে পড়ে তলিয়ে গেল!
মেনার্ড বিপুল পুলকে বলে উঠলেন, 'গোলাগুলো গিয়েছে জলের জঠরে— আমরা অক্ষত! এইবারে গর্জন করুক আমাদের বন্দুকগুলো— তারা কেউ ব্যর্থ হবে না।'
গুড়ুম, গুড়ুম, গুম! গুড়ুম, গুম!
রাগে পাগলের মতো হয়ে কালোদেড়ে দেখলে, তার দুজন গোলন্দাজ হাত-পা ছড়িয়ে মৃত্যু-ঘুমে এলিয়ে পড়ল এবং তার জাহাজখানাও চড়ায় আটকে অচল হল। কণ্ঠে তার ফুটতে লাগল প্যাঁচার মতো কর্কশ চিৎকার।
আবার গুড়ুম, গুড়ুম, গুম! ওরে বাবা, গুলির ঝাঁক বনবনিয়ে ছুটছে কানের পাশ দিয়ে। কালোদেড়ে প্রাণ বাঁচাবার জন্যে তাড়াতাড়ি হুমড়ি খেয়ে বসে পড়ল!
কিন্তু এ কী দৈব বিড়ম্বনা! হঠাৎ স্রোতের টানে পড়ে রাজার জাহাজ দুখানার মুখ গেল ঘুরে এবং কালোদেড়েও ছাড়লে না এই দুর্লভ সুযোগ।
তৎক্ষণাৎ লাফ মেরে দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে সে গর্জে উঠল, 'আবার কামান ছোড়ো, আবার কামান ছোড়ো!'
আবার জাগল কামানগুলোর ভৈরব হুংকার! এবারে তারা ব্যর্থ হল না এবং তাদের সঙ্গে যোগ দিতে ছাড়লে না বোম্বেটেদের বন্দুকও!
তারপর মনে হল সেখানে সৃষ্ট হয়েছে অভাবিত এক শব্দময় মহানরক! ফটাফট ফেটে গেল রাজার জাহাজ দুখানার নানা জায়গা, হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল তাদের মাস্তুল, মৃত্যূন্মুখ যোদ্ধাদের চিৎকার ছুটে গেল দিকে দিকে! নৌসেনাদের উনত্রিশজনের মৃতদেহ পড়ে রইল পাটাতনের যেখানে-সেখানে।
বিকট উল্লাসে চেঁচিয়ে কালোদেড়ে বলে উঠল, 'এবার ওদের পেয়েছি হাতের মুঠোর মধ্যে। আবার ছোড়ো কামান-বন্দুক! ডুবিয়ে দাও জাহাজ দুখানা! মড়াগুলোর সঙ্গে জীবন্তরা মেটাক মাছেদের ক্ষুধা!'
লেফটেন্যান্ট মেনার্ড দিকে দিকে ছুটোছুটি করে নিজের দলের হতভম্ব লোকদের উৎসাহিত করতে লাগলেন। এবং ইতিমধ্যে দুই পক্ষের জাহাজ পরস্পরের খুব কাছে এসে পড়ল।
মেনার্ড ভাবলেন একবার যদি সদলবলে ওদের জাহাজে লাফিয়ে উঠতে পারেন তাহলে আর কোনও ভাবনাই থাকে না! কিন্তু তৎক্ষণাৎ তিনি বুঝে ফেললেন, ব্যাপারটা অত সহজ নয়!
দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই কমে আসছে দেখে কালোদেড়ে নতুন হুকুম জারি করলে,'নিয়ে এসো হাতবোমা! সবাই হাতবোমা ছোড়ো!'
নতুন বিপদের সম্ভাবনা দেখে মেনার্ড নিজের সৈন্যদের ডেকে বললেন, 'তাড়াতাড়ি পাটাতনের তলায় গিয়ে গা-ঢাকা দাও!'
দুই পক্ষের জাহাজে জাহাজে লেগে গেল বিষম ঠোকাঠুকি— শোনা যেতে লাগল মড়মড়িয়ে কাঠ ভাঙার শব্দ!
দুম, দুম, দুম! বোমার পর বোমা ফাটার বেজায় আওয়াজ, ধুমধাড়াক্কা! রাজার জাহাজ দুখানার পাটাতন ভগ্ন-চূর্ণ, ধূমায়িত, অগ্ন্যুৎপাতে ভয়াবহ! চোখের সামনে যেন মারাত্মক আতশবাজির খেলা দেখতে দেখতে বিকট উল্লাসে কালোদেড়ে অট্টহাস্য করতে লাগল।
এগারো। কালোদেড়ে কালগ্রাসে
কালোদেড়ের রোমশ, মদমত্ত ও অমানুষিক দেহ তরবারি ঘোরাতে ঘোরাতে মেনার্ডের 'রেঞ্জার' নামক জাহাজের উপরে লাফিয়ে পড়ল এবং তার পিছনে পিছনে অনুসরণ করলে অন্যান্য বোম্বেটেরাও!
হুংকার শোনা গেল তার হিংস্র কণ্ঠে— 'সংহার! সংহার! হা রে রে রে! শুরু হোক প্রলয়কাণ্ড!'
আচম্বিতে পাটাতনের দরজা ঠেলে কৃপাণ তুলে মেনার্ড ও তাঁর সৈন্যদলের আবির্ভাব! ব্যাপারটা এতটা অভাবিত যে বোম্বেটেরা বিস্ময়ে স্তম্ভিত! কিন্তু পলকের মধ্যে নিজেদের হতভম্ব ভাব সামলে নিয়ে তারা সবেগে আক্রমণ করলে— লেগে গেল হাতাহাতি লড়াই! খড়্গে খড়্গে হত্যা-ঝঞ্ঝনা! আগ্নেয়াস্ত্রে ধ্রুম-ধ্রুম! যোদ্ধাদের গর্বিত বাক্যাড়ম্বর!
তারপরেই অন্য জাহাজ থেকেও মেনার্ডের আরও সৈন্য এসে যুদ্ধে যোগদান করে বোম্বেটেদের অবস্থা করে তুললে শোচনীয়। জাহাজের নীচে জলস্রোত, জাহাজের উপরে রক্তস্রোত!
কালোদেড়ে তখনও ভয় পেলে না— তার এক হাতে তরবারি, আর-এক হাতে পিস্তল! মৃতদের পায়ে মাড়িয়ে এবং জীবিতদের ঠেলে সে যেন প্রলয়ংকর মূর্তি ধারণ করে একেবারে মেনার্ডের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে সিংহগর্জনে বলে উঠল, 'আরে রে ঘৃণ্য জীব! নরকে যাওয়ার সময় তোকেও আমি ছেড়ে যাব না!' বৃহৎ তার রক্তস্নাত কৃপাণ, তাকে ঠেকাতে গিয়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল মেনার্ডের তরবারি!
আর রক্ষা নেই! উন্মত্তের মতো অট্টহাসি হেসে ও দীপ্ত অগ্নিবর্ষণ করে কালোদেড়ের ভীমবাহু আবার তুললে তার সাংঘাতিক অস্ত্র— কিন্তু পরমুহূর্তে একজন নৌসৈন্য ছুটে এসে বন্দুকের কুঁদো দিয়ে তার মাথার উপরে করলে প্রচণ্ড আঘাত!
পাটাতনের উপরে ধড়াম করে আছড়ে পড়ল বোম্বেটে-সর্দার। মুহূর্তের মধ্যে চারিদিক থেকে তাকে ছেঁকে ধরলে নৌসৈন্যের দল এবং তরবারি, ছোরা ও বন্দুকের কুঁদো দিয়ে সবাই অশ্রান্ত ও নিষ্ঠুরভাবে বিরাট দেহের উপরে করতে লাগল প্রবল আঘাতের পর আঘাত!
কিন্তু কী অসাধারণ তার সহ্যক্ষমতা ও প্রতিহিংসা-প্রবৃত্তি, সেইসব মারাত্মক আঘাতের পরেও সে কাবু হতে চাইলে না, উলটে দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে বসল এবং তার শেষ পিস্তল তুলে লক্ষ্য স্থির করলে মেনার্ডের দিকে! ওই পর্যন্ত! তার জীবনীশক্তি তখন একেবারে ফুরিয়ে এসেছে, পিস্তল ছোড়বার আগেই সে আবার ধপাস করে পড়ে গেল এবং তার সর্বাঙ্গে জাগল অন্তিম শিহরন! সুদীর্ঘ একটা নিশ্বাস ফেলে সে প্রাণত্যাগ করলে।
তার কালো দাড়ি তখন রক্তরাঙা, সর্বাঙ্গও রক্তভীষণ। গুনে দেখা গেল, তার দেহের পঁচিশ জায়গায় রয়েছে পঁচিশটা প্রাণনাশক আঘাতের চিহ্ন!
যুবক যোদ্ধা মেনার্ড নিহত বোম্বেটে-সর্দারের প্রকাণ্ড মূর্তির দিকে তাকিয়ে রইলেন বিস্ময়-প্রশংসাপূর্ণ নেত্রে। তাঁকে অভিভূত করে ফেলেছে তার বন্য সাহস!
কিন্তু অভিভূত হলেও মেনার্ড নিজের প্রতিজ্ঞা ভুললেন না। একজন সৈনিককে ডেকে বললেন, 'বোম্বেটে-সর্দারের মুণ্ডটা কেটে জাহাজের গায়ে ঝুলিয়ে দাও।'
বলা বাহুল্য, সর্দারের পতনের পর হতাশ হয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল বাকি বোম্বেটেরাও।
এই ভয়ংকর বোম্বেটে দলকে দমন করে লেফটেন্যান্ট মেনার্ড ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
অপরূপা, দেব সাহিত্য কুটীর, ১৯৬০
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন